গল্পের নাম : দীর্ঘ নিঃশ্বাস
প্রথম পর্ব
ইশরাত জাহান এনি
রিশাদের পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। রিশাদ ইউকের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসট্রোফিজিক্স ও কসমোলজির উপর পিএইচডি শেষ করে সেখানেই লেকচারার হিসেবে যোগদান করেছে। এ লেভেল শেষে ও ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় এডমিশন নিয়েছিল। তুখোর মেধাবী ছাত্র ছিল। ফিজিক্সে রেকর্ড পরিমাণ মার্ক পেয়েছিল। ও আগামী সপ্তাহে দেশে আসবে।।
রিশাদের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। অবশেষে রিশাদের বাবা রহমান সাহেবের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইকবাল আহাম্মেদের একমাত্র মেয়ে রাইমার সাথে বিয়ে ঠিক হয়। রিশাদের সাথে বিয়ের পর রাইমা ও ইউকেতে যাবে পিএইচডি করার জন্য। রিশাদ খুবই বিনয়ী আর শান্ত প্রকৃতির ছেলে।
রিশাদ দেশে আসলে রাইমার সাথে খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়। রাইমা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের সাথেও এই দুই মাসে অনেকটা মিশে গেছে। রাইমার স্বতঃস্ফূর্ততা শশুর বাড়ির সবার মন কেড়ে নেয়। রিশাদের মা জাহানারা বেগম এমন পুত্রবধুই চেয়েছিলেন।
রিশাদ আজ ইউকেতে চলে যাবে। লাগেজ গুলো রিশাদের ছোট ভাই রাবিত গাড়িতে ঢুকালো।
➤ভাইয়া চলো দেরি হয়ে যাবে। জ্যামে পড়লে জানোই তো কি অবস্থা হবে।
রিশাদের মা জাহানারা বেগম অঝোর ধারায় কাঁদছেন। বড় ছেলে রায়হানও এভাবে পড়তে গিয়েছিল, সেখানে ওই দেশের মেয়েকে বিয়ে করে মাত্র দুইবার দেশে আসার পর আর আসেনি এমনকি নিজ থেকে তেমন একটা খোঁজ খবরও নেয় না। তিনি চিন্তিত তার এই ছেলের জন্যও।
➤ বাবারে এই মায়ের কথা ভুলে যাবি না তো? তুই ও যদি রায়হানের মত আশা ভঙ্গ করিস তাহলে আমি বেঁচে থাকতেও মরে যাব। তোদের কাছে আমরা বেশি কিছু চাইনা নিয়মিত যোগাযোগ রাখবি আর বছরে একবার দেশে এসে আমাদেরকে দেখে যাবি।
➤ মা আমি এমন কিছু করবো না। তুমি কাঁদবে না তাহলে কিন্তু আমি দেশেই থেকে যাব।
➤ না না বাবা কত কষ্ট করেছিস এই জীবনের জন্য। দোয়া করি বাবা। কাঁদতে কাঁদতে ছেলের কপালে চুমু খেলেন। রাইমা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে।
➤ আরে তুমিও দেখি বাচ্চাদের মত কাঁদছো। বিদেশ কি এখন বেশি দূর নাকি? আমাদেরতো নিয়মিত যোগাযোগ হবে। তাছাড়া কিছুদিন পর তো তুমি যাচ্ছই।
রিশাদের গলাটা ধরে এসেছে। রাইমা কান্নার জন্য কথাই বলতে পারছে না। রিশাদের একমাত্র বোন জয়াও এসেছে। ভাইয়ের জন্য কেঁদে কেঁটে একাকার।
➤ রাইমা তুমিও তো চলে যাবে পিএইচডি কমপ্লিট করতে। আর বোধহয় ভাগ্যে নেই তোমাদের দেখার।
➤ আপা এসব বলবেন না। সবাই একরকম হয় না। আর আমি আপনাদের দেশী মেয়ে।
রাবিত খুব ভালো গান গায়। ছোটবেলা থেকেই বাফায় গান শিখেছে। এখন বিভিন্ন জায়গায় গান গাওয়ার জন্য ডাক আসে। রাবিত স্টেজে ওঠে গান গাওয়ার জন্য। আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে, সব কাপলরা এসেছে। হঠাৎ রাবিট লক্ষ্য
ওর ভাবি রাইমা ও এসেছে পাশে বেশ হ্যান্ডসাম একটি ছেলে বসা । রাবিত ভেবে নিল এটা স্বাভাবিক বন্ধু-বান্ধবদের সাথে এনজয় করতে আসতেই পারে।
প্রথমে রাইমা লক্ষ্য করেনি রাবিত স্টেজে গাইছে। পরে লক্ষ্য করে হাত নাড়িয়ে রাবিতকে ইশারায় বলে বেশ ভালো হচ্ছে গান। অনুষ্ঠান শেষ হয় রাত নয়টায়।
➤ এই রাবিত শোনো আমার বন্ধু আবিরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমরা স্কুল কলেজে একসাথে ছিলাম। হঠাৎ আজ ওর সাথে দেখা। ওর গার্লফ্রেন্ড রাগ করে আজ আসেনি। হাহাহা, বেচারার মনটা খারাপ!
রাইমা আর রাবিত সেই দিন একসাথে বাড়ি ফিরল। দুজনকে এত রাতে বাড়ি ফিরতে দেখে জাহানারা বেগম রেগে গেলেন।
➤ এত রাতে বাড়ি ফিরা হল? কোন ফোনও তোরা দিস না। আবার একসাথে আসছিস, কোথায় ছিলি তোরা?
➤ মা, ভাবি আমার গানের অনুষ্ঠানে ছিল। এজন্য শেষ করে একসাথে আসা।
➤ ভবিষ্যতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে অবশ্যই ফোন দিয়ে জানিয়ে দিবে।
ছয় মাস পর রাইমা চলে যায় রিশাদের কাছে ইউকেতে। রাইমা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী। ইংল্যান্ডে ওর এগ্রি এনভারমেন্টাল ইকোনমিক্স এর উপর আরো উচ্চতর পড়াশোনার জন্য আসা। দুজনেই প্রচন্ড ব্যস্ত দিন কাটাতে থাকে।
রিশাদ যখনই রাইমাকে ফোন দেয় তখনই এংগেজ পায়। ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়। বাসায় এসে রাইমার সাথে কথা বলে।
➤ আচ্ছা রাইমা আজকে মুভি দেখতাম, তোমাকে কতবার কল দিচ্ছিলাম, ধরলেই না।
➤ ও সরি, মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে ছিল।
➤ শ্বশুর বাবা ফোন দিয়েছিল তোমার নাকি বাংলাদেশে যেতে হবে?
➤ হ্যাঁ, অনেক দরকারি কাগজ না উঠিয়েই আমি চলে এসেছি, বাবা আনতে গেলেও দিবেনা। ওসব আমাকেই তুলতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসবো।
➤ আচ্ছা, ঠিক আছে।
➤ রিশাদ এয়ারপোর্টে আসে রাইমাকে বিদায় জানাতে। প্রায় ছয় মাস পর দেশে যাচ্ছে রাইমা। ওর কেমন যেন আনন্দ হচ্ছে সেটা বুঝানো যাবে না।
শ্বশুরবাড়িতে দুই দিন থেকে বাকি সময়টা বাবার বাড়িতেই কাটিয়ে রাইমা চলে আসে আবার ইউকেতে।
এবার ইউকেতে রাইমার আচার ব্যবহারে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে রিশাদ। কিন্তু রাইমা কে কিছু বলে না, বিষয়টা ইগনোর করে। হয়তো বাবা-মা ছেড়ে ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশে আসার জন্য এমনটা হয়েছে। তারমধ্যে পড়াশোনার চাপ তো আছেই।
➤ রাইমা আগামীকাল তো অফ ডে চলো আমরা বিচে চলে যাই।
➤ তুমি যাও, আমি অন্য আরেকদিন যাব।
➤ চল না প্লিজ
➤ আচ্ছা ঠিক আছে।
ছুটির দিনগুলোতে খুব সুন্দর ভাবে দুজনের সময় কাটতে থাকে। রাইমা নিয়মিত তার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়-স্বজনের সাথে যোগাযোগ করে। সবাই ভীষণ খুশি।
এভাবে প্রায় চার বছর কেটে যায়। স্বামীর নাগরিকত্বের সূত্রে রাইমাও নাগরিকত্ব পেয়ে যায়।
নাগরিকত্ব পাওয়ার পর থেকেই রাইমার আচার ব্যবহার সবকিছুতেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কোন কিছুই বলা যায় না রাইমাকে। মনে হয় গায়ে পড়ে ঝগড়া বাজাতে আসে। রিশাদ কিছু বুঝতে পারছে না এমন কি হলো যে রাইমা এমন করছে।
➤ রাইমা চলোনা কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
➤ আমার কাজ আছে তুমি যাও।
➤ ছুটির দিনে কি এমন কাজ?
➤ বললাম না যাব না (চিৎকার দিয়ে বলে)
রিশাদ নিশ্চুপ হয়ে যায়। ঘনঘন এরকম ঘটনা ঘটতে থাকে। আজ সকালে ঘটে অন্যরকম ঘটনা। হঠাৎ রিশাদদের দরজায় ইউকে পুলিশ কড়া নাড়ে। স্থানীয়রা নাকি বিচার দিয়েছে এই বাসায় অনেক চেঁচামেচি হয়। পুলিশ এইবার শুধু ওয়ার্নিং দিয়ে চলে যায়।
রিশাদ খুবই হতাশ হয়ে যায়। অকারনে চিৎকার চেঁচামেচি করে রাইমা। এখন রিশাদের ঘাড়ে সেই দোষ নিতে হল।
রিশাদের মা ফোন করেছেন। বৌমার সাথে কথা বলতে চাইছেন।
➤ রাইমা মা কথা বলবে, ফোনটা ধরো।
➤ তোমার মার সাথে তুমি কথা বল, আমি পারবো না।
➤ এটা কেমন কথা রাইমা? উনি অপেক্ষা করছেন কি ভাববেন?
➤ আমি পারবো না বলে চিৎকার দিতেই
রিশাদ রাইমাকে কষে একটা থাপ্পড় দেয় গত দুই তিন মাস যাবত অনেক সহ্য করেছে কিন্তু আজকে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
সাথে সাথে রাইমা জোরে জোরে চিল্লাতে চিল্লাতে কাঁচের প্লেট বাটি গ্লাস ভাঙতে থাকে। 15 মিনিটের মধ্যে পুলিশ আসে। রাইমা পুলিশের সাথে কথা বলছে।
➤ এই লোকটা আমাকে ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি টর্চার করে প্রতিনিয়ত। আমি ডিভোর্স চাচ্ছি কিন্তু সে জোর করে সংসার করাতে চাচ্ছে। এইজন্য সে আমাকে প্রায়ই মারধর করে।
সাথে সাথে পুলিশ রিশাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়। রিশাদ অবাক দৃষ্টিতে রাইমার দিকে তাকিয়ে ছিল। রাইমা তখন যে বাঁকা হাসিটা দেয় রিশাদ বুঝে নেয় এতদিন রাইমা যা করেছে সবই ইচ্ছাকৃত ছিল।
ডিভোর্স আর নারী নির্যাতনের কেস কোর্টে ওঠে। রিশাদ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে অপরিচিত একটি সুদর্শন ছেলের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে রাইমা বসে আছে। ট্রায়াল শুরু হয়ে গেলে তখন ওর পক্ষের উকিলের কাছে এসে বসে। ইউকেতে ডিভোর্স হওয়া খুব বেশি জটিল বিষয় না।
রিশাদের অর্ধেক সম্পত্তিও রাইমা পেয়ে যায়। অনেক ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে কাজে মনোনিবেশ করে। এতকিছু হয়ে গেছে এখনো দেশে কাউকে জানায়নি। ছোট ভাই রাবিতকে কল দিয়ে অবশেষে সব জানায়, মা বোনকে এখনই কিছু জানাতে নিষেধ করে।
➤ ভাইয়া একটা ছবি পাঠাচ্ছি, দেখতো ছবির এই ভদ্রলোক কিনা?
➤ হোয়াটসঅ্যাপে ছবি দেখে জানায়, হ্যাঁ তুই কিভাবে চিনিস?
➤ ভাইয়া তুমি যখন ইউকেতে ছিলে তখন ভ্যালেন্টাইন্স ডের একটা অনুষ্ঠানে আমি গান গাইছিলাম। তোমার এক্স ওয়াইফ সেই দিন নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভাইয়া তখন সন্দেহ করেও কেন যে সরে এসেছিলাম!
অনেকদিন পর রিশাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে রাইমা এসে উপস্থিত। একটু দূরে সেই ভদ্রলোক দাঁড়ানো।
➤ এখনো নিশ্চয়ই আজাইরা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছ? আমি ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। আমি আর আবির একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আমাদের গভীর প্রেম। যখন বিয়ের কথা বলব তখন হঠাৎ আমার বাবা তোমার বাবাকে বাসায় নিয়ে এসেই আমার সাথে বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলেন। তখন বিষয়টা নিয়ে আমরা দুজনেই ভাবি। তুমি ইউকেতে সিটিজেন, তাই ঝামেলা ছাড়া সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্য তোমাকে বিয়ে করা। আর ওই যে এক সপ্তাহের জন্য দেশে গিয়েছিলাম তখন আবির আমার সাথে ইউকেতে আসে। এখন আমরা বিয়ে করেছি।
রিশাদ এত চক্রান্তের মধ্যে ছিল, একটু সন্দেহেরও অবকাশ ছিল না। রাইমার সবার সাথে মেলামেশা, ভদ্র আচরণ, ভালোবাসা সবই ছিল লোক দেখানো। উদ্দেশ্য শুধু একটাই ছিল তাড়াতাড়ি সিটিজেনশিপ নিয়ে প্রেমিককে বিদেশে এনে, রিশাদ কে ত্যাগ করা। রিশাদ কখনোই কারো কোন ক্ষতি করে নি বা অমঙ্গলও চায় নি। কিন্তু আজ ওর দীর্ঘ নিঃশ্বাস বলে দিচ্ছে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার দিয়ে দিয়েছে।
চলবে….
