গল্পের নাম : দীর্ঘ নিঃশ্বাস
শেষ পর্ব
রাইমার সাথে রিশাদের ডিভোর্সের এক বছর হয়েছে। রিশাদের মা বারবার বলছে দেশে যেতে। রিশাদের সাথে রাইমার বিষয়টা ঘটার পর যখন রিশাদের বাবা জানতে পারেন তখন সাথে সাথেই রাইমাদের বাসায় যান।
~ ইকবাল তোর মেয়ে এত জঘন্যতা করতে পারল? এটা যে তোর মেয়ে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না!
~ কি করেছে ঠান্ডা মাথায় বস কথা বলি, আমি তো কিছুই জানিনা।
রাইমার মা পারভীন আহমেদ জানান, রাইমা বা রিশাদ কেউ তো কিছু জানায়নি।
~ তোর মেয়ে তো তাহলে তোর সাথেও প্রতারণা করেছে। রাইমা আমার ছেলেকে ডিভোর্স দিয়েছে। এমনকি নারী নির্যাতনের মামলায় ফাঁসাতে চেয়েছিল কিন্তু অকাট্য প্রমাণের অভাবে আমার ছেলের সাজা হয়নি। রাইমা ওর সহপাঠী আবিরকে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসতো। ইউকে থেকে ছয় মাস পরে দেশে ফিরে আবিরকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিল।
~ কি বলছিস তুই এসব! মেয়ে তো গতকালও কথা বলল। আমি রিশাদের সাথে কথা বলতে চাইলে বিভিন্ন বাহানায় এড়িয়ে যায়।
এরপর রিশাদের বাবা আবিরের ছবি, ডিভোর্স পেপার এর ছবি দেখায়। রাইমার বাবা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেন। বাবা মা দুজনই কান্নাকাটি শুরু করে।
~ বন্ধু আমাকে মাফ করে দে। আমার মেয়ে যে এত বড় অপরাধ করতে পারে এটা জানলে আমি তো ছেলের সাথে বিয়ে দিতাম না।
~ ইকবাল আমি তোকে চিনি তোকে জানি, সেই অনুযায়ী তোর মেয়েকে মূল্যায়ন করা আমার ঠিক হয়নি।
রাইমার বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা রহমান সাহেবের তুলনায় কিছুই না। উনার বড় মেয়ে রাইমা আর ছোট ছেলেটা কলেজে পড়ে। মেয়ে শিক্ষিত ও সুশ্রী আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ে, এই মায়া থেকেই রহমান সাহেব আত্মীয়তা করতে যান। চাইলেই আরো বড় ঘরে ছেলের বিয়ে করাতে পারতেন।
রিশাদ মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে ফোন দেয়।
~ হ্যালো মা, তুমি শুধু শুধু আমার জন্য চিন্তা করছো। এই বছর পারছিনা, আগামী বছর অবশ্যই দেশে যাব।
~ বাবারে, তুই যে ব্যথা পেয়েছিস অন্তরে, ওটা তো আমরা কমাতে পারবো না। সারা জীবন পড়াশোনা নিয়েই থেকেছিস, কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সময়ও তোর ছিল না। তোর সাথে কেন এমনটা হবে (কাদতে থাকেন)
~ মা, এতে তোমাদের কোন দোষ নেই। রাবিত জানালো ইকবাল আংকেল হার্ট অ্যাটাক করেছেন। বাবা আর তুমি দুজনে মিলে উনাদের দেখতে যাবে। উনারাও কিন্তু কোন কিছুর জন্য দায়ী নয়।
আজ রিশাদ বন্ধুদের সাথে বিচে এসেছে। হঠাৎ লক্ষ্য করল রাইমা ওর দিকে এগিয়ে আসছে।
~ কেমন আছো রিশাদ?
~ ভালো।
~ বিয়ে করো নি?
~ না।
~ তোমার এই অতি ভদ্রভাব বিরক্তিকর। চার বছর অনেক কষ্টে তোমার সাথে চলেছি।
~ এখন তো একসাথে নেই। এখনতো ভালো আছো।
~ ভালো না থাকার কোন কারণ নেই। সত্যি কথা বলতে কি, তোমার ছবি দেখে আমার তোমাকে একদমই পছন্দ হয়নি। রোগা রোগা চেহারা, চোখে পাওয়ারি চশমা। আবিরকে তো দেখেছো, কত হ্যান্ডসাম!! তোমার অতিরিক্ত প্যানপ্যানানি স্বভাব এখন আমাকে সহ্য করতে হয় না। আমার সাথে আসলে কোন দিক থেকেই তোমাকে মানায় না।
~ তোমার বাবা মার কাছে ডিভোর্সের কথাটা লুকানো তোমার ঠিক হয়নি। এটা জানতে পেরে আঙ্কেল এখনো অসুস্থ।
~ শুনেছি, বিয়ে করে ফেলো তোমার মতন কাউকে।
রিশাদ আর কথা বাড়ায় না। এই এক বছরে ও অনেক কিছু আয়ত্ত করে ফেলেছে। নিজেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে এনেছে।
আরও তিন মাস কেটে যায়। হঠাৎ একদিন রাইমার ফোন আসে। খুবই বিষন্ন কণ্ঠ।
~ হ্যালো, তুমি কি ব্যস্ত?
~ হ্যাঁ, ব্যস্ত।
~ দুই মিনিট সময় নেব খুব বেশি না।
~ বল, কি বলবে?
~ আবির আমার সাথে চিট করেছে।
~ এটা ওর আত্মীয়-স্বজনকে শোনাও। আমাকে শুনিয়ে কি লাভ।
~ গত চার মাস ধরে, লিন্ডা নামে এক ব্রিটিশ মেয়ের সাথে রিলেশনে আছে। এখন আমাকে ডিভোর্স দিবে বলছে।
~ হ্যান্ডসাম ছেলে তোমার চেয়ে সুন্দরী কাউকে পেয়েছে, ডিভোর্স তো দিতেই পারে। তার ওপর আবার ব্রিটিশ মেয়ে। রাখি এখন কাজ করছি।
ফোনটা রেখে রিশাদের একটু হাসি পেল। রাইমা যার জন্য ওর সাথে চার বছরের সংসার শেষ করে দিয়েছে। যে ছেলে ইউকেতে আসার লোভে, নিজের প্রেমিকাকে অন্যের স্ত্রী বানাতেও রাজি হয়। এই ছেলের কাছে রাইমা গেছে ভালোবাসা খুঁজতে।
কয়েকদিন পর, রাইমার সাথে আবিরের প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হয়।
~ আবির তুমি আমার সাথে এরকম করবে? তোমার জন্য আমি মিথ্যা নাটক করে রিশাদকে ডিভোর্স দিয়েছি। আর তুমি এখন আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ!
~ তুমি সহজে নাগরিকত্ব পাওয়ার লোভে ওকে বিয়ে করেছ। নাগরিকত্ব পেয়েছ আর কি লাগে?
~ তোমার জন্য আমি কিছুই করিনি? তোমার কি এই দেশে আসার অর্থনৈতিক ক্ষমতাটা ছিল? আমি রিশাদের টাকায় তোমাকে এনেছি, তোমার খেয়াল রেখেছি।
~ এসবের জন্য কি সারা জীবন তোমার পায়ে পড়ে থাকবো? চার বছর আরেকজনের সংসার করেছ তারপরও তোমাকে বিয়ে করেছি এটাই বেশি।
রাইমা অনেক কান্নাকাটি করে। আবিরকে কোনভাবেই থামাতে পারেনা। ও দরকারি সবকিছু গুছিয়ে লিন্ডার বাসায় চলে যায়।
এক মাস পর একটা কফিশপে রিশাদের সাথে দেখা হয় রাইমার। রিশাদ ওকে দেখেছে কিন্তু আগ বাড়িয়ে কাছে আসে না। রাইমার চেহারা মলিন হয়ে গেছে। কঠিন ডিপ্রেশনে আছে বোঝা যাচ্ছে।
~ রিশাদ ভালো আছো?
~ হ্যাঁ, ভালো।
~ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না?
~ না, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আমি সময় নষ্ট করি না।
~ তোমার অভিশাপ লেগেছে আমার। আমি তোমাকে অনেক হার্ট করেছি।
~ নাগরিকত্ব পেয়েছ। জবও করছ। ভালোই তো আছো। আমি এখন উঠি। মা আর রাবিতকে রিসিভ করতে হবে।
জাহানারা বেগম বিদেশে ছেলের গোছানো বাড়ি দেখে অনেক খুশি হন। রাবিত তো খুব এক্সাইটেড ইউকে ঘুরে দেখার জন্য। জাহানারা বেগম ছেলের পছন্দের অনেক কিছুই নিয়ে এসেছেন। ছেলের জোরাজোরিতে কিডনির চিকিৎসা করানোর জন্য ইউকেতে এসেছেন।
~ কিরে বাবা, তুই দেখি সবজির বাগানও করেছিস। গাছে কত আপেলও ধরেছে। অনেক ভালো লাগলো রে।
~ বাবাকেও তো আসতে বললাম। বাবা মানা করলো।
~ তোর বাবা এমনই। দেশ ছাড়া কোথাও তার ভালো লাগেনা। বলে যদি মরে যাই, দেশেই যেন মরি।
~ কিন্তু মা দেখো তার দুই ছেলে বিদেশে সেটেল হল।
~ বাবা রায়হানের সাথে কি তোর যোগাযোগ হয়?
~ তিন মাস আগে ফোনে কথা হয়েছিল। ওর মেয়ে হয়েছে।
জাহানারা বেগম আবেগপ্রবণ হয়ে যান। মোবাইলে শুধু নাতনির ছবি দেখেছেন। ওকে বুকে নিতে পারেন নি। রাবিত মাকে থামায়।
~ মা কান্না কাটি করবেনা। আমরা আনন্দের সাথে কাটাবো আর রিশাদ ভাইয়াকেও আনন্দে রাখবো।
এক সপ্তাহ পর রাইমা রিশাদের বাসায় উপস্থিত। রাবিত আর জাহানারা বেগম সামনের গার্ডেনেই ছিল। রাবিত এগিয়ে গেল।
~ কি ব্যাপার, কি দরকারে আপনি এখানে?
~ রাবিত, ভালো আছো ভাইয়া?
~ কে আপনার ভাই। অনেক নাটক করেছেন। আপনার চেহারা দেখে বিকালটাই খারাপ হয়ে গেল।
~ আমি খুব বিপদে পড়ে এসেছি রিশাদের কাছে।
~ অন্যকে বিপদে ফেললে নিজের একসময় না একসময় বিপদে পড়তেই হয়। ভাইয়া বাসায় নেই, আপনি এখন আসতে পারেন।
জাহানারা বেগম একটা কথাও বলেন না। রাইমা হঠাৎ জাহানারা বেগম এর হাত ধরে ফেলে।
~ আমাকে মাফ করে দেন আন্টি। আমি আপনাদের সবাইকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
~ আমি মাফ করার কেউ না। যে নিজের বাবা মাকে এত ছোট করে তার সাথে কি কথা বলব। আমি এখানে সুস্থ হতে এসেছি। অসুস্থ হতে চাই না।
রাইমা সরাসরি চলে যায় রিশাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে।
~ রিশাদ, আমাকে মাফ করে দেয়া যায় না? তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই থাকবো।
~ কে বলেছে, তোমাকে আমি দ্বিতীয়বার আমার জীবনে নিব।
~ রিশাদ তুমি আমাকে অনেক ভালবাসতে।আমার মনে হয় এখনো তুমি আমাকে ভালোবাসো।
~ তোমার যেটা মনে হচ্ছে সেটা একদমই ভুল। আমার সাথে দেখা করবে না আর আমার বাসায়ও কখনো যাবেনা, মনে থাকবে?
~ আমি একটুও ভালো নেই। আবির ডিভোর্সের আবেদন করেছে। আমাকে ও দুনিয়া চিনিয়েছে।
~ তো এখন দুনিয়া চিনে চলো, আমার কাছে কেন?
~ আমি এখানে যা সেভিংস করেছিলাম, ওর জন্য গাড়ি, গিফট ও অনেক স্বাচ্ছন্দে জীবন কাটাতে গিয়ে প্রায় শেষ। আমার চাকরিটাও এখন মনোযোগ দিয়ে করতে পারছি না। নিয়মিত মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছি। কোনভাবেই ঘুম হচ্ছে না। ডিপ্রেশনে আমি বোধ হয় মারা যাব।
~ রাইমা তোমার অনেক কথা শুনলাম। তবে সৃষ্টিকর্তা যে এত তাড়াতাড়ি তোমাকে তোমার কর্মফল দেখাবেন এটা ভাবি নি। মানুষের সাথে এতটা প্রতারণা করা ঠিক না, যতটাতে নিজের চেহারা আয়নাতে দেখতে ভয় হয়। মানুষের দীর্ঘ নিঃশ্বাস বড়ই কঠিন জিনিস। অনেক কিছুই করেছ, এখন হিসাব মিলাতে গেলে বারবার ভুল হবে। তুমি যদি আজ আবিদের সাথে সুখী ও সুন্দর জীবন যাপন করতে, রিশাদ নামে কারো কথা তোমার মনেই থাকত না। আমি তোমাকে মন থেকে মুছে ফেলেছি। আমি হ্যান্ডসাম না, ভালো করে কথা বলতে পারি না ঠিক আছে, তুমি মানুষকে এসব দিয়ে মূল্যায়ন করো। আগে জানলে তোমাকে কখনোই বিয়ে করতাম না। বাবাকে অনেক ভালোবাসি। তিনি তোমাকে পছন্দ করেছেন এজন্য কোন কিছুই না ভেবে রাজি হয়েছি। এবার আসতে পারো।
রাইমা বুঝতে পারে যে অন্যায় সে করেছে তার জীবনে যন্ত্রনা ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই।
সমাপ্ত
