#কাজিন_ম্যারেজ_ডট_কম
#পর্বসংখ্যা- ২ (অন্তিম পর্ব)
লেখনীতে: #তিয়াশা_চৌধুরী।
-“চরিত্রের দোষ।”
কথাটা বলার পর সকলে প্রথমে কিছু মূহুর্ত হাসি থামানোর চেষ্টা করলো। যেহেতু শান্ত বড় ভাই, তার অপমানে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসাটা অন্যায় হবে, বেয়াদবি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের আদববান প্রমাণ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হলো তারা। সুজন হেসে ফেলল সবার আগে। তার দেখাদেখি ফিহা, এরপর সিঁথি। হাসি ছড়িয়ে পড়লো ছোঁয়াচে রোগের ন্যায়।
মিমি মুখ ফঁসকে কথাটা বলেও পড়েছে বিপদে। সবার হাসা-হাসি দেখে আড়চোখে তাকালো শান্তর দিকে। বুঝতে পারলো, ক্ষেপে গেছে সে। তাই হাসি আর এলো না। থমথমে মুখে জিভে ঠোঁট ভেজালো। সরাসরি শান্তর দিকে তাকাতে পারলো না।
শান্ত ওদের কান্ড দেখে আর গানের পরবর্তী লাইন বাড়ালোই না। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে গিটার ফেলে দিলো নিচে। রেগে-মেগে হনহনিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে। সুজন জিভে কামড় দিয়ে বলল,
-“ক্ষেপে গেছে ভাই! এভাবে কেন বললি তুই? ওর মতো চরিত্রবান ছেলে তুই তিনটা পাবি না।”
ফিহা বলল,
-“কিন্তু ডায়লগটায় তো দুইটা পাবে না, এরকম বলার কথা ছিলো।”
-“আরেহ, ও কি একাই চরিত্রবান নাকি? আমিও তো ভদ্রলোক। তাই নিজেকে সহ দুইজন। আমাদের মতো তৃতীয়জন পাবি না। এবার ক্লিয়ার?”
সাবিনা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-“এসেছে! সুযোগ পেতেই নিজের প্রশংসার ঝুলি খুলে বসেছে উনি। সরো তো সামনে থেকে।”
সুজন পুরো কথা শুনলোও না। সত্যি সত্যি ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে গেলো শান্তর পিছু পিছু৷ সিঁথি বলল,
-“এখন আর কিছু বলেও লাভ হবে না। আমি সিউর, ভাইয়া এখন গিয়ে দরজা আটকে বসবে আর সকালের আগে খুলবে না। ওর জন্য খেলা নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমরা খেলা শুরু করি।”
মিমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
-“কিন্তু উনি যে আমার উপর রেগে গেলো?”
-“এটা উল্টোপাল্টা কথা বলার আগে ভাবা উচিত ছিলো। এখন বলে আর আলগা আহ্লাদ দেখানো লাগবে না। যত্তসব।”
*********
এই বছর শান্তর জন্মদিন পড়েছে শুক্রবারে। যার ফলে সবাই উপস্থিত হতে পেরেছে আজকের দিনে। শান্তদের চাররুমের বিশাল ফ্ল্যাটটা জনমানুষে পরিপূর্ণ, হৈ-চৈ এর শব্দে মুখরিত।
শান্ত রুম ছেড়েছে বেলা করে। এগারোটা নাগাদ বেরোতেই দেখলো, সবাই হাজির হয়ে গেছে। ড্রইংরুমে বসে মুরব্বিদের গুরুভার আলোচনা। রান্নাঘরে গৃহিণীদের রান্নার আয়োজন। কাজিনদের খোঁজে ভালোমতো আশে-পাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি পরখ করলো শান্ত। সিঁথির রুমের ভিড়িয়ে রাখা দরজা দেখে আন্দাজ করে ফেলল, সবাই ওই রুমে বসেই কোনো খিচুড়ি পাকাচ্ছে৷
এমনসময় মিমির মা এগিয়ে এলো শান্তর দিকে। ভ্রু-কুটি করে জিজ্ঞেস করলো,
-“কী ব্যাপার, শান্ত? শুনলাম কাল রাতে মেজাজ খারাপ করে দরজা আটকেছিস, আর এখন বের হতে হতে বেলা পার?”
শান্ত নিজের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
-“তেমন কিছু না, ছোট মণি। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে।”
ভদ্রমহিলা খুশি হয়ে বললেন,
-“যাক। আচ্ছা শোন, আমরা ভাবছিলাম কী.. এবার তোর জন্য বউ দেখা শুরু করবো। পড়াশোনা শেষ করেছিস, চাকরী করছিস, এবার বিয়েটাও করে নে।”
শান্ত বেশ বিস্মিত হয়ে বলল,
-“আশ্চর্য! মেয়ে দেখা লাগবে কেন?”
মিমির মা অবুঝের ভান ধরে বললেন,
-“ওমা, তো বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা লাগবে না?”
ততক্ষণে সিঁথির রুমে খবর পৌঁছে গেছে শান্তর ডাইনিং এ থাকার। চোখের ইশারায় নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করলো। এরপর মিমির তোয়াক্কা না করেই দল বেঁধে সবাই বেরিয়ে এলো বাইরে।
সুজন এসে শান্তর কাঁধে হাত রেখে বলল,
-“ছোট মা ঠিক বলেছে। এবার বিয়েটা করেই ফেল, ভাই।”
সিঁথি বলল,
-“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভাইয়া বলো, তোমার কেমন বউ লাগবে? আমরা একদম সেরকম মেয়ে খুঁজে আনবো।”
শান্ত কটমটে নজরে তাকালো একে-একে সবার দিকে। জেনে-বুঝে নাটক করছে সবগুলো। শুধু তার মুখ থেকে কথা বের করার প্রচেষ্টা। সেও এত সহজে ধরা দেবে না। সবকটাকে ইচ্ছেমতো ঘুরিয়ে, এরপরই স্বীকার করবে।
ভাবনামাফিক বলল,
-“আচ্ছা, তোরা যখন এত করে বলছিস, তাহলে আর কী.. তবে আমার একটু ভেবে দেখতে হবে।”
তিশা হতচকিত হয়ে বলল,
-“ভেবে দেখতে হবে মানে?”
শান্ত অবলীলায় বলল,
-“মেয়ের বৈশিষ্ট্য। সিঁথি যে জিজ্ঞেস করলো, কেমন মেয়ে লাগবে? তো মেয়েটার কিছু বৈশিষ্ট্য তো ভাবনা-চিন্তা করে দেখা লাগবে আমার। এরপর কাগজে লিখে তোদের দিবো, তোরা সেই মোতাবেক ভাবী খুঁজবি। ঠিক আছে?”
উপস্থিত সকলে হতভম্ব। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো, তারা এতদিন ভুল ধারনা মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলো। কিন্তু এতটাও তো ভুল হওয়ার কথা নয়!
মিমির চোয়াল ঝুলে পড়েছে। স্বল্প বিস্ময়, স্বল্প রাগে। মিশ্র অনুভূতিতে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-“সব বৈশিষ্ট্যর এক বৈশিষ্ট্য আমি বলে দেই? সুন্দর দেখে ভাবী খুঁজবী আমরা। তাই না, শান্ত ভাইয়া?”
শান্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
-“আমি তো কিছু বলিনি। তোকে কে বলেছে যে আমার সুন্দর বউ লাগবে?”
মিমি কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে বলল,
-“এটা আবার বলা লাগে নাকি? এমনি এমনিই বুঝা যায়। ছেলে মানুষ নিজেরা যতই কালাচাঁদ হোক, বউ সবসময় সুন্দর চায়।”
শান্ত ফটাফট জবাব দিলো,
-“আর মেয়ে মানুষ নিজেরা যতই পাঁচ ফুটিয়া হোক, জামাই সবসময় তালগাছের মতো লম্বা চায়।”
তিশা তালি দিয়ে বলল,
-“বাহ বাহ! খুব সুন্দর বলেছো দু’জনেই। সমাজের খাঁটি, গভীর, বাস্তবতা সম্বলিত কথা।”
সুজন ও সিঁথি সমস্বরে বলে উঠলো,
-“তুই চুপ কর! এসেছে কবি-সাহিত্যিক!”
মিমি মহাবিরক্ত হয়ে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
-“মেয়েরা লম্বা জামাই চায়, বলে কী বুঝাতে চাও? তুমি লম্বা বলে সব মেয়েরা লাফাতে লাফাতে তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হবে? তোমার ঠ্যাঙের কিছু অংশ কেটে হাইট কমিয়ে ফেললেই আর হাইট নিয়ে গর্ব করবে না।”
মিমির কথা শেষ করার আগেই শান্তর জবাব রেডি,
-“আর ছেলেরা সুন্দর বউ চায় বলে তুই কি বুঝাতে চাইলি? এখন আমিও বলি, তোর মুখে আলকাতরা মাখবো আমি?”
-“শান্ত ভাইয়া, ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!”
-“এমনিতেও ভালো হচ্ছে না।”
ওদের চেঁচামেচি শুনে শান্তর মা ও সুজনের মা-ও চলে এসেছে ডাইনিং এর মাঝখানে৷ দু’জনের হম্বিতম্বি দেখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে বললেন,
-“সমস্যা কী তোদের? ঝগড়া করছিস কেন?”
শান্ত ভণিতাহীন, জনসম্মুখে বলল,
-“মিমি আমাকে বিয়ের জন্য উস্কানি দিচ্ছে। আবার আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি দেখে ওর জ্বলছে। দেখো ওর কীর্তি!”
মিমির মুখখানা বিশাল এক হা হয়ে এলো। বিস্ময়ে, হতবিহ্বলতায় চক্ষু যেন কোটর ছাড়াবে৷ কোনোরূপ উচ্চারণ করলো,
-“আমি জ্বলছি? মানে.. অ্যাই, কোনদিন থেকে জ্বলছি আমি? আমি একটুও জেলাস না। তুমি বিয়ে করো, যাকে ইচ্ছে তাকে গিয়ে বিয়ে করো। আমার যায়-আসে না।”
শান্ত প্রশ্ন করলো,
-“সিরিয়াসলি? আমি যাকে ইচ্ছা তাকেই বিয়ে করবো?”
মিমি থমকালো। তবে সামলে নিলো নিজেকে। চোখ-মুখ শক্ত করে জবাব দিলো,
-“হু। করো গিয়ে।”
শান্ত ঘোষণা দেয়ার মতো করে বলল,
-“ওকে ফাইন। আম্মু, আমি ওকেই বিয়ে করবো। আয়োজন শুরু করো।”
এক মুহুর্তের জন্য মিমির মনে হলো, তার কানে সমস্যা দেখা গেছে। সে ভুলভাল শুনছে। তবে বিস্ময়ের মাত্রা এতই উচ্চ, যে চোখের পলক ফেলাও দায়। অবশেষে সরাসরি স্বীকারোক্তি শুনে সবাই হাততালি দিলো। সকাল সকাল সফল হয়েছে তাদের পরিকল্পনা। শান্তর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“এই কথাটা আগে স্বীকার করলে সকাল সকাল এত বড় ঝগড়া হতো না।”
শান্ত প্রতিত্তোরে বলল,
-“ঝগড়া বড় হতে কই দেখলে? ছোটই তো ছিলো। ওইতো.. মিমির মতো পাঁচ ফুট।”
উচ্চতা নিয়ে খোঁটা দেয়ায় মিমি ক্ষেপে গেলো। রুক্ষস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
-“শান্ত ভাইয়….”
পুরোটা সমাপ্ত করার আগেই সবাই একত্রে জোর গলায় বলল,
-“নট শান্ত ভাই.. ইট’স শান্ত জামাইইইই…!”
************
দু’সপ্তাহের ব্যবধানে শান্ত-মিমির বিয়ের আয়োজন করা হলো। নভেম্বরের ছত্রিশ তারিখ বেশ ঘটা করে বিয়ে হলো ওদের। বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন তিশার বেশ আফসোস করে বলল,
-“বড়টার জামাই বউ রেখে বিদেশে আছে। ছোট বোনটারও বিয়ে হয়ে গেলো শান্ত ভাইয়ের জোরাজুরিতে। আমি মেঝো বলেই মাঝখানে ফেঁসে গেলাম? আমার কি বিয়ে হবে না?”
সুজন এসে বসলো তিশার পাশে। সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
-“কাঁদিস না, থাক। তোরও বিয়ে হবে। আপাতত তোর দুঃখ কমাতে একটু স্যাড সং ছাড়া দরকার ছিলো। কিন্তু কিন্তু.. বিয়েতে বিরহের গান ছাড়লে শান্ত আমার পিছে জুতো নিয়ে তাড়া করবে।”
বিয়ের রাত। শান্তর ঘরটা ফুলে-ফুলে সাজিয়েছে সকল কাজিন মিলে। মিমিকে বসিয়েছে সাজানো খাটের মাঝখানে। নিজেরা এখনো রুম থেকে বের হয়নি। নিজেদের মাঝে চাপাস্বরে আলাপ করছে কিছু একটা নিয়ে।
এরমধ্যে সুজন এসে হাজির। তাকে দেখামাত্র ফিহা প্রশ্ন করলো,
-“শান্ত ভাইয়া কই?”
সুজন পাঞ্জাবি টানটান করে হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,
-“বাইরে বের হলো একটু আগে।”
মিমি ঘোমটা তুলল। কৌতুহলবশত প্রশ্ন করে ফেলল,
-“কই গেছে শান্ত ভাইয়া?”
প্রত্যেকে বিরক্তিসমেত তাকালো মিমির দিকে। আবারও সমস্বরে চিৎকার ছুড়লো,
-“তোকে বলেছি না, শান্ত ভাই না ডাকতে? এখন থেকে শুধুমাত্র..
শান্ত জামাইইই…!”
~(সমাপ্ত)
