Friday, June 5, 2026







আটপৌরে পর্ব-০৪

#আটপৌরে
পর্ব: ০৪
বড়ো ভাইয়ার সেবার কি যে হলো।উনি কেমন যেনো অনেকটা নিভে গেছেন।পারিবারিক আড্ডাতেও উনাকে কেমন ছাড়াছাড়া লাগে।যেনো এখানে থেকেও তিনি এখানে নেই।
একদিন হঠাৎ করে বলেই ফেললেন মাকে, মা আমার আর ঐ দেশে ভাল্লাগে না।খুব কষ্ট হয়। থাকার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট।এত উঁচুতে উঠে কাজ করতে হয়।মনে হয় যেন সূর্যটা ঠিক আমার মাথার উপরে।গরমে গা কাঁপে।ঘামে পিচ্ছিল হয়ে যায় পা রাখার জায়গাটা।মনে হয় এই বুঝি পা হড়কে পরে যাবো শতশত ফুট নিচে। আর,আমার উচ্চতাজনিত ভয়ও আছে।নিচের দিকে ভুলেও চোখ গেলে মাথা ঘোরে।
মা পান সাজাচ্ছিলেন হাসিমুখে। পাশেই আমিও বসা ছিলাম।
হাসিমুখ মুহুর্তেই মলিন করে তিনি বললেন, এ কি বলছিস বাবা? ওরকম কাজ তো আরো কত জন করে।তোর চাচাতো ভাইয়েরা দেখছিস না কিভাবে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে।তোর যদি বেশিই কষ্ট হয় তবে অন্য কাজ খুঁজে নে না।
– মা বিষয়টা এত সোজা না। যে চাইলেই অন্য কাজ পেয়ে গেলাম।তাছাড়া,ওখানে সব কাজই কঠিন।
– তাহলে বাকিরা কিভাবে করছে?
– করছে আরকি জীবনের মায়া না করে,কষ্ট করে। আমিও তো করলাম চারটা বছর। তাইনা মা? তোমাদের কথা ভেবে কষ্টগুলোকে মাটিচাপা দিয়ে দূরে পরে রইলাম।ইদানীং, বেশিই খারাপ লাগে। মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়ে পরে থাকি দেখারও কেউ নেই। ভাবছি দেশেই থেকে যাবো।টুকটাক যা জমিয়েছি তা দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করবো।অন্তত,পরিবারের কাছে তো থাকবো।বাচ্চাগুলো বড়ো হয়ে যাচ্ছে কত দ্রুত। অথচ আমি দেখছিনা। জীবনে টাকাটাই তো সব না।তাছাড়া, এখন তো অনেকটাই স্বচ্ছলতা এসেছে।সবাই বড়ো হয়েছে্..
মায়ের যেনো মাথায় বাজ পরলো বড়ো ভাইয়ার এসমস্ত কথা শুনে।
চোখ দুটো বড় করে তিনি বললেন, এইসব তোকে বড়োবউ শিখিয়ে পাঠাইছে তাইনা? সংসারে সবাই শান্তিতে থাকছে সেটা ওর সহ্য হচ্ছে না? ও খালি পুরুষমানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখার পক্ষে।হিংসুক তো।খালি ওরই অধিকার আছে তোর উপরে।আমার কিংবা তোর ভাই-বোনদের তো নেই।তুই ওর শিখানো বুলি এনে আমাকে শুনাচ্ছিস। তোকে নিয়ে তো আমি গর্ব করতাম।এখন দেখি তুইও বদলে গেছিস।
মা হঠাৎ করেই কাঁদতে শুরু করলো। আমি মাকে স্বান্তনা দিতে লাগলাম।
আর,বড়ো ভাইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন।
এরপর,ভাইয়া অবশ্য দেশে থাকেন নি।আবারও পারি জমিয়েছেন বিদেশে।চোখের জলে ভাবী আর বাচ্চারা ভাইয়াকে বিদায় জানিয়েছে।
মা বলেছেন,দেশে থেকে করবেটা কি? তোর মেঝোভাই কি ঘোড়ার ডিমের ব্যবসা করতেছে দেখস না? ওই দিয়ে কি চলে নাকি? তাছাড়া,তোর এখনো বিয়ে দেওয়া হলোনা।ছোট ছেলে এখনো চাকরি পেলো না।এখনি ও দেশে আসলে হবে কি করে? কটা বছর আরো থাকুক না।
দেখতে দেখতে বছর কেটে গেলো।প্রতিমাসে বড়ো ভাইয়া বেশ ভালো অঙ্কের একটা টাকাই পাঠাতেন মায়ের কাছে। মা সেসব খরচা করতেন দু’হাতে।
যতোবারই ভাইয়া দেশে আসার কথা বলতেন,ততোবারই একটা সমস্যা দাঁড়িয়ে যেতো।সেটা মিটালে আবার আরেকটা সমস্যা। কোনোবারই আর ভাইয়ার দেশে ফিরা হতো না পরিবারের কাছে।
আমাদের টিনশেড বাড়ির বদলে ছাদ দেওয়া দালান বানানো হলো।
আপার স্বামীর ব্যবসায় বিরাট লস হলো,এরপর থেকে তিনি রোজ আপার সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন।বলতেন,বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দে।
সেই টাকাও মায়ের পীড়াপীড়িতে বড়ো ভাইয়াই দিলো।তবুও,আপার সংসার ঠিকঠাক থাক।
ছোট ভাইয়া এরমাঝে তার প্রিয় বাইক কিনলেন।বললেন,চাকরি চাকরি করে মাথা কুটে লাভ আছে? চাকরি একসময় ঠিক পাবো। কিন্তু,এখন তো শখের সময়।
আত্মীয়-স্বজনরা চিরাচরিত নিয়মের মতোই প্রবাসে থাকা ছেলেটির কাছে ধরিয়ে দিতে লাগলো ফিরিস্তি।কার কি কি চাই সেই লিস্ট।
এভাবে, বছরের পর বছর কাটতে লাগলো।সবাই তো শখের জিনিসগুলো পাচ্ছে ঠিকই।কিন্তু,সবার শখপূরণকারী মানুষটা দিনশেষে কি পাচ্ছে একাকিত্ব ছাড়া?
কম বয়সেই বড়োভাবী কেমন বুড়িয়ে গেলেন।চেহারায় অদ্ভুত ভাবে বয়সের একটা ছাপ পরে গেলো।বাচ্চারাও অতিদ্রুত বড়ো হতে লাগলো।
সময় তো কারো জন্য থেমে থাকেনা।থাকলোও না।

মেঝোভাইয়ার ব্যবসা ততোদিনে মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে।যদিও তিনি পুরো ইনকামের ফিরিস্তি মা’কে দেননা।তবুও,মায়ের ধারণা সে স্বীকার করেনা আদতে ভালো টাকাই কামাচ্ছে।
সংসারে আগের মতোই টাকা দেয়।বাড়তি কিছুই দেয়না সে।বাড়তি টাকা চাইলে একপ্রকার কৈফিয়ত চায়।
মা এতে রেগে যান।ছেলের কাছে মা টাকা চাবে,তার আবার কৈফিয়ত কি?
মেঝো ভাইয়া বলেন,এটা কৈফিয়ত না।কেবল জানতে চাওয়া।বুঝোই তো বহু কষ্টের পয়সা আমার।কাজেই,আমাকে তো জানতেই হবে কোন খাতে ব্যয় করছো সেটা তুমি?
মা মুখ গোমড়া করে হয়তো বলেন,তোর মামার ছোট মেয়ের বিয়ে।ওকে একটা গয়না দিতে হবে।
মেঝো ভাইয়া তা শুনে নাকচ করে দেন।
– ওকে গয়না দেওয়ার দরকার নেই।আমরা এতো কোটিপতি হয়ে যাইনি।ওকে শাড়ি দিবে।শাড়ির টাকা নাও।
অথবা,আপার ছেলেমেয়েদের জন্য দামী কিছু চাইলেও তিনি এমনই করেন।
বলেন,এগুলো বাবার দায়িত্ব। ওদের বাবাকে পালন করতে দাও।তুমি কেনো সবকিছু দিতে হবে?
মা বেজায় অখুশী মেঝো ভাইয়ার উপর।
সবসময় আমাকে বলেন,ওরে কালোযাদু করছে ওর ডাই/নী বউ।মা-বোনের থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করাইছে।এরজন্য, পরিবারের জন্য টান নাই।
মেঝোভাইয়ের সাথে সুবিধা করতে না পেরে মা পুনরায় হাত পাতেন বড়ো ভাইয়ার কাছে।
বড়ো ভাইয়া হলো মায়ের আদর্শ সন্তান।কখনোই মা’কে ফিরান না।কখনো কৈফিয়তও চাননা।মায়ের সব কথা শুনে চলেন।মা’কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন।
মা সবসময় এটা নিয়ে গর্ব করেন।বড়োভাইয়া সবচেয়ে সেরা একথা হরদমই বলেন।
এরইমাঝে,মেঝোভাইয়া হুট করে একদিন জানালেন, তারা এ বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। শহরে যেয়ে থাকবে।ভাইয়ার বেশিরভাগ ব্যবসা এখন তিনি শহরেই স্থানান্ত করছেন।কাজেই,ওখান থেকেই দেখভাল করতে হবে।
মা বিরসমুখে বললেন,শহরে থাকলে যদি বেশি আয় হয় তো শহরে থাকবি।সমস্যা কি?
কিন্তু,মেঝোভাইয়া জানালো সে একা নয়, মেঝোভাবী এবং বাবুও তার সাথেই থাকবে।
এটা শুনে মা ক্ষেপলেন।বললেন,ওরা ভাড়া বাসায় যেয়ে থাকার দরকার কি বাপ? ওরা এখানে থাকুক। বাচ্চাটার দাদীর আদরের দরকার নেই? তোর বউ শহরে থেকে কি করবে? গ্রামে সবার সাথে মিলেমিশে থাকবে এটা ভালো না?
মেঝোভাবী এবার জবাব দিলেন।বললেন, মা বাবুকে তো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে।চাইছি,ওকে ছোট থেকেই ভালো স্কুলে পড়াতে।বুঝেনই তো আজকালকার যুগে তাল মিলানো কঠিন।বাচ্চাদের একটু বেশিই এডভান্স হতে হয়।তাছাড়া,আপনার ছেলে ওখানে একলা কি করে থাকবে? পুরুষমানুষ, ওর কতো কিছুর দরকার আছে।ও কি রান্নাবান্না করতে পারে? সারাদিন কাজ করে রাতে বাসায় ফিরে যদি আবার সব নিজেকে করতে হয় বেচারার তো কষ্ট হয়ে যাবে। আমি না থাকলে ওর খেয়াল রাখবে কে?
মা বিরক্ত হয়ে বললেন,থাক তোমাকে আর পাঁচালী পড়তে হবেনা।তুমি যে নিজের আরামের জন্য যেতে চাও সেকথা আমি জানি।তুমিই তো শ/য়তানি করে ওর মাথায় এসব ঢুকাইছো। নিজের একলার সংসার করবা, এটাই তোমার মতলব।
– এটা যদি মতলব হয়েও থাকে সেটা কি দোষের কিছু? নিজের সংসার করার বয়স কি আমাদের হয়নি? সবাই তো চায় নিজের মনের মতো একটা সংসার সাজাতে।যেখানে ভুল ধরার কেউ থাকবে না।কথায় কথায় খোঁটা দেওয়ার কেউ থাকবেনা।গালি,বকুনি এসব শুনতে হবেনা। ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না। সে যাইহোক,আমার সংসারে আপনার জন্য সবসময়ই সাদর আমন্ত্রণ রইলো।ইচ্ছা হলেই চলে আসবেন। আপনার ছেলে-বউমা-নাতির বাসা বলে কথা।
– ওরকম ঘিঞ্জি শহরে আমি যাইনা।আমার বড়ো ছেলে আমাকে সুন্দর বিল্ডিং বানিয়ে দিয়েছে আমি এখানেই আরামে আছি।তোমার স্বামীর মতো বেয়াদব ছেলের আমার দরকার নেই।যে খালি বউয়ের কথায় নাচে।
– দেখুন মা আপনি ভুল ভাবছেন।
– চুপ করো।আমাকে জ্ঞান দিওনা তো….
মাকে বুঝানোর বৃথা চেষ্টা আর ওরা করলোও না।
একদিন চলেই গেলো বাড়ি ছেড়ে।
মা ওদের কিছুই নিতে দিলেন না।না একটা মশারি,না একটা চামচ….কিচ্ছু না।তিনি বললেন,আলাদা সংসার পাতবে পাতুক।আমি একটা জিনিশও দিবোনা।
তবে,না দিলেও তাদের আলাদা সংসার তো আর থেমে থাকলো না।বেশ সুন্দর ছিমছাম করে সাজিয়ে ফেললো তারা।
আমি একদিন গিয়ে দেখে এসেছিলাম।কি সুন্দর গোছানো,ছিমছাম! দেখলেই চোখ যেন জুড়িয়ে যায়।
মেঝোভাবী দুই সপ্তাহ পরপরই বাবুকে নিয়ে আমাদের এখানে আসতেন, আমাদের দেখতে।মা যদিও মুখ ঘুরিয়ে রাখতো।তবে,বড়ো ভাবী খুব খুশি হতেন।
মেঝো ভাবী আফসোস করতেন অনেক।বলতেন,ভাবী আপনার এ কি হাল হচ্ছে দিনদিন? আপনি এমন কেনো হয়ে যাচ্ছেন? এবার আপনি জোর দিয়ে ভাইয়াকে ফিরতে বলেন।নিজের পক্ষে নিজেকেই কথা বলতে হয়।কেউ আপনার দুঃখ বুঝবে না।আর,ভাইয়া তো অনেক খাটলো কলুর বলদ।আর কতো?
বড়ো ভাবী চোখের জলে বলতেন,আমি তো বলিই। তার চেহারা দেখেই আমি বুঝি তার খুব কষ্ট হয়…কিন্তু,মায়ের বিরুদ্ধে যে তিনি যেতে পারবেন না।তিনি তো খুব মায়ের কথা শোনেন তুমি তো জানোই।
– মায়ের কথা শুনার নামে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে দিতে হবে? নিজের স্ত্রী-সন্তানদের হক্ব আদায় করতে হবেনা? কেবল মায়ের কথা ভাবলেই হবে?

বড়োভাবীকে এমনই একদিন মেঝোভাবী বুঝাচ্ছিলেন আর সেই সমস্ত আড়াল থেকে শুনে ফেলেন মা স্বয়ং।শুনে তো তার মাথায় রক্ত উঠে যায়।
তিনি শুরু করে দেন প্রবল চিৎকার-চেঁচামেচি।
তেড়ে গিয়ে মেঝোভাবীকে মারতে উদ্যত হন।মেঝোভাবী বড়োভাবীর মাথা খাচ্ছে। আর,এসব শুনে শুনে বড়ো ভাবী ভাইয়াকে দেশে আসার প্ররোচনা দিচ্ছে।
দেশে আছেটা কি? দেশে এসে কি লাভ?
বড়ো ভাবী প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান।তিনি কেঁদে কেটে ক্ষমা চাইতে থাকেন।
তবে,মা হুকুমজারি করে দেন,এই বাড়িতে আর মেঝোভাবী পা ফেলতে পারবেনা।মেঝোভাবী এ বাড়িতে আসলে তিনি গলায় ফাঁস নেবেন।তার তিলতিল করে গড়া সংসার ধ্বংসের মূল হোতা মেঝোভাবী।
সেদিন চরমভাবে অপদস্ত হয়ে বাচ্চাকে নিয়ে মেঝোভাবী বেরিয়ে যান এবাড়ি থেকে।
এরপর , মা আরেক দফায় কথা শোনায় বড়ভাবীকে।
শেষে বড়োভাইয়াকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বিচার দেন। কিভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে সেসব বলেন।
বলা বাহুল্য, মায়ের কান্নাকাটি শুনে বড়ো ভাইয়া পুনরায় ভাবীকে কথা শুনিয়েছেন।
এইভাবেই কোনো আনন্দ কিংবা সুখের দোলা ছাড়াই কাটছিলো আমাদের আটপৌরে সংসার।
তবে,আনন্দ যে একদমই ছিলো না তা না।আপা তার বাচ্চাদের নিয়ে আসলেই খুব আনন্দ হতো।
মা হাসতেন মন খুলে।তবে,বড়োভাবীর চেহারা মলিন হয়েই রইতো।কেননা,মায়ের সাথে তখন আপাও সমান তালে তাকে কথা শোনাতো।
একদিন আপা বাড়িতে আছে এমন সময় ছোট ভাইয়া ফিরলো ঢাকা থেকে। আমরা সকলে তো তাকে দেখে খুশি হয়ে গেলাম।
মা একদম তার সবচেয়ে আদরের ছেলেকে দেখে হৈচৈ শুরু করে দিলেন।
ছোট ভাইয়া জানাল,দুইটা সংবাদ আছে।একটা আমাদের খুব ভালো লাগবে।আরেকটা খারাপ লাগবে।
মা ঢোঁক গিলে বললেন,খারাপ লাগবে কেন? কি করেছিস তুই?
আমি বললাম,ভালো সংবাদটাই আগে দাও।
ছোট ভাইয়া হেসে জানালো,তার খুব ভালো একটা চাকরি হয়েছে,অনেক বড়ো পোস্টে।
আমরা সকলে তো চেঁচিয়ে উঠলাম।এটা একদমই অকল্পনীয় ছিলো। ভাইয়া যে শেষমেশ চাকরি পাবে কিংবা করবে আমরা তো ভাবিইনি।
মা তো আনন্দে অশ্রুবর্ষণ শুরু করে দিলেন।
খানিকক্ষণ বাদে ২য় সংবাদটা জানতে চাইলেন।
তখন, ছোট ভাইয়া জানালো,সে একমাস আগে বিয়ে করেছে।
একথা শুনে সকলের চেহারা মলিন হয়ে গেলো।মা বিছানায় ধপ করে বসে পরলেন।বললেন,তুই বিয়ে করলি অথচ,নিজের মাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না?
ভাইয়া এসব সেন্টিমেন্টের ধার ধারলো না।
বিরস মুখে বললো,উফ এখন তো জানালামই।পুরুষমানুষের কি বিয়ের অনুমতী মা-বাপের থেকে নিতে হয়?
মা কাঁদতে বসলেন আয়োজন করে।তার আদরের ছেলের এ কি দূর্গতি।
ছোটভাইয়ার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক।সেই ভার্সিটি লাইফ থেকেই।সে কিছুটা বাউন্ডুলে -বখাটে কিসিমের ছেলে তবে দেখতে সুদর্শন। একদম চশমাটুকু বাদে যেন টিক হুমায়ুন আহমেদের শুভ্র।
আর,আমাদের ছোট ভাবীও উপন্যাসের মতোই ধনী বাবার একমাত্র কন্যা। জানা গেলো,ভাবীর বাবার অফিসেই তার চাকরি হয়েছে।
তাই তো বলি,এতো বড় পোস্ট সে কি করে খসালো? তার কি এতোই যোগ্যতা।
যাইহোক,এসব জেনে মায়ের কান্না থামলো।এতো ধনী পরিবারের জামাই হয়েছে তার ছেলে।একদিক দিয়ে খুশি লাগলেও আবার অন্যদিক দিয়ে মায়ের মনে দোটানা।এই মেয়ে তার ছেলেকে মান্যি করবে তো?
ছোট ভাইয়া বিরক্ত হন।বলেন,মান্যি করার কি আছে? তোমার যে কি কথা মা? আমি কি ওর মালিক আর ও কি আমার দাসী? মান্যিগন্যি আসছে কোথা থেকে? আমরা হলাম স্বামী-স্ত্রী। বন্ধুর মতো।দুইজনই দুইজনকে সম্মান করি,ভালোবাসি।দ্যাটস ইট।
মা চোখ বড়ো বড়ো করে কেবল চেয়ে রইলেন।
এরপর,বললেন,আচ্ছা তোর বউকে আনবিনা?
ছোট ভাইয়া হেসে বললেন,ওকে তো এনেছিই।কিন্তু,একসাথে ঢুকাইনি ঘরে।কারণ,আমি চাইনি ও চেঁচামেচি দেখুক।আগেই তোমাদের জানিয়ে দিলাম।এখন ওকে আনছি দাঁড়াও।
ভাইয়া বাইরে চলে গেলো।
মা আমার আর আপার মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলেন।
একটু পরেই নতুন বউ ঢুকলো।তার পরনে একটা সাদা কামিজ আর জিন্সের প্যান্ট।গলায় মাফলারের মতো কিছু একটা পেঁচিয়ে রেখেছে।চোখে ইয়া বড়ো সানগ্লাস।ঠোঁটে কেমন অদ্ভুত রঙা একটা লিপস্টিক।সে বেশ উঁচু জুতো পরে এসে দাঁড়ালো মায়ের সামনে।
কোনো লজ্জা-আড়ষ্টতা কিছুই তার ভিতরে নেই।
এসেই সে বললো,এসি নেই?
মা কোনোরকমে বললেন, নতুন বউ অথচ একটা শাড়ি….
ছোট ভাইয়া মাকে থামতে বললেন।তবে,আপা চেঁচিয়ে উঠলো।
– কিরে মা’কে থামাচ্ছিস কেন? তোর বউয়ের কি লাজলজ্জা নাই? কোনো সালাম নাই কিছু নাই।আইসা সঙ এর মতো দাঁড়ায় আছে।আবার বলে,এসি নাই…পোশাক- আশাকের এ কি অবস্থা? ছিঃ ছিঃ….
আর,মুহুর্তেই নতুন বউয়ের ঝগড়া লেগে গেলো আপার সাথে।
তুমুল বাকবিতন্ডায় এবার মা-ও যোগ দিলেন।
শেষে নতুন বউ নিজ থেকেই থেমে গেলো।
বললো, আমি এই বস্তিতে এই ঝগরুটে ছোটলোকদের সাথে থাকতে পারবো না।আমি চললাম।আমি কোনো দিনও আর এইবাড়িতে আসবো না। তুমি থাকতে চাইলো থাকো।
মা চেঁচিয়ে বললেন,তুই যা যা…আমার ছেলে এখানেই থাকবে।
কিন্তু,মা’কে অবাক করে দিয়ে ভাইয়াও চলে গেলো নিজের বউয়ের সাথেই।
মা কোথায় রাগ করবেন তা না উল্টা ছোট ভাইয়াই রাগ ঝাড়েন ফোন করলে।
মাকে কথা শোনান।মা শুধু মন খারাপ করেন।আর একটাই কথা মুখস্থ আওড়ান,এই বড়লোক ডাই/নী আমার ছেলের মাথা খাইছে।
ছোট ভাইয়া যদিও তার বউয়ের কোনো দোষ দেখেনা।উল্টা তিনি বলেন,, মা আর আপার প্রথম দিনের এমন ব্যবহার দেখে তার বউ ভড়কে গেছে।আর,এমন ছোটলোকিপনা করার পরেও সে আবার বাড়ি আসবে তা হতেই পারেনা।তার বউয়ের অসম্মান মানে তারও অসম্মান।
মা এসব শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,শ্বশুরের টাকার কেনা গোলাম হইছে।
তবে,গোলাম হোক আর যাই হোক ছোট ভাইয়া কিন্তু বেশ সুখেই দিনাতিপাত করতে লাগলো। নানান দেশে-বিদেশে তারা দুইজন টুর দিচ্ছে।আলিশান ফ্লাটে থাকছে।ফেসবুক ভর্তি শুধু ছোট ভাইয়া আর ভাবীর পোস্ট।
মা সেসব দেখেন আর ছিঃ ছিঃ রব তুলেন।সব দোষ তিনি দেন ছোটভাবীকে।তার ছেলের মাথা এই মেয়েই তো খেয়েছে।
তবে,মেঝো ভাইয়া আর ছোট ভাইয়া তো যারযার সংসারে বেশ থিতু হয়েই গেলেন, একমাত্র বড়োভাইয়া বাদে….
.
লেখিকা: লিলি

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ