#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#পর্ব_০৩
______________
৪.
বাড়ির উঠোন জুড়ে ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষজন। চারদিক গমগম করছে কোলাহলে, আজ আয়েশার বিয়ে। সেজন্যই উৎসুক পাড়া পড়শীরা বর দেখতে ছুটে এসেছে। আয়েশার বিয়ে সৌরভ মাস্টারের সাথে হচ্ছে বলে অনেকেই হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে। চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এককোনায়। সেদিকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না হালিমা বেগম। তাদের দেখেও না দেখার ভান করছেন তিনি। এমন ভাব—যার জ্বলছে জ্বলুক তাতে আমার কী? মেয়ে আমার সুখী হলেই ষোলোআনা চুকিয়ে যাবে। বিয়ের আনন্দ ও হাসির ঝিলিক ঝরছে সবার মুখে মুখে। আলো ওর মাস্টার মশাই -এর পাশে আসন পেতে বসেছে। তার ঠিক সামনেই কাজী সাহেব বসে আছেন, সৌরভ আর আয়েশার বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন তিনি। আয়েশা কবুল বলেছে আগেই এবার সৌরভের পালা। কাজী সাহেবের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো, ‘বলো বাবা কবুল।’
সৌরভ গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ও দৃঢ় স্বরে তিনবার কবুল বলল। বিয়ে সম্পূর্ণ হলো তাদের। আজ থেকে সে আলোর বাবা। গর্বে বুক ফুলে উঠল তার। সৌরভ দু-হাত বাড়িয়ে কোলে নিলো আলোকে। আলো তখন খিলখিল শব্দে হাসল। কোমল গলায় বলল, ‘মাস্টার মশাই।’
সৌরভ হাসিমুখে বলল, ‘হু?’
আলো বলল, ‘চলুন, মায়ের কাছে যাই।’
‘এখন?’
‘হু।’
‘আরেকটু পর।’
‘পরে কেনো?’
‘এখনো সময় হয়নি আলো। সঠিক সময় এলে তোমার নানী নিজেই আমাদের তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন।’
আলো জিজ্ঞেস করল,
‘সময় কখন হবে?’
‘এইতো মা, একটু পরেই।’
‘আচ্ছা।’
হালিমা বেগম ভেতর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হাতে তার মিষ্টির কার্টুন। পাড়া-পড়শী যারা এই আনন্দের সময় পাশে ছিলেন তাদেরকে মিষ্টি খাওয়ালেন তিনি। কাউকেই দাওয়াত দেওয়া হয়নি। ঘরোয়া ভাবে বিয়েটা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু কীভাবে যেন সবাই জেনে গেল বিষয়টা। তাদের আসাতে মন খারাপ করেননি হালিমা বেগম—বরং খুশি হয়েছেন। তবে কষ্ট লাগছে কিছুটা, কাউকে একবেলা খাওয়াতে পারলেন না। গরিব মানুষ। অতো চাকচিক্য করার পয়সা যে নেই। সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নেই। তাই। মিষ্টি দিয়েই চালিয়ে দিলেন। সবশেষে, সৌরভকে নিয়ে গেল সে ঘরে যে ঘরে আয়েশা আছে। সৌরভ আর আয়েশা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন হালিমা বেগম। কিসব নিয়ম নীতি আছে সেগুলোই পূরণ করছেন। নিয়ম শেষ হতেই ঘর ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগল
আয়েশা ও সৌরভের বিদায় মূহুর্ত গনিয়ে এসেছে। বাড়ির সামনেই একটা বেবিট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। নতুন বউ নিয়ে বেবিট্যাক্সিতে চড়ে সৌরভ। একসময় বেবিট্যাক্সি ছুটে গেল গ্রামের সেই চেনা পরিচিত রাস্তা ধরে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল তারা। সদরদরজায় দাঁড়িয়ে আছেন মফিজ আকবর। নতুন বউকে বরণ করে ঘরে তুললেন তিনি। এখানেও কিছু নিয়মনীতি আছে। সেগুলো মফিজ নিজেই পালন করলেন। বাড়িতে কোনো স্ত্রীলোক নেই। তাই। সব কাজ মফিজকেই করতে হয়েছে। রাত আটটার দিকে খাবার খেয়ে রুমে চলে যায় আয়েশা ও আলো। বিছানায় শুতেই ঘুমিয়ে গেছে মেয়েটা। আয়েশা তখন জানালার পাশে গিয়ে বসে। নতুন জীবন, নতুন আলো, নতুন সবই তবু কোথায় যেন এক খাদ রয়ে গেছে। আয়েশা ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। সহসা পায়ের শব্দ শুনে চকিত তাকাল আয়েশা। সৌরভ ঘরে ঢুকেছে। সে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এলো আয়েশার কাছে। আয়েশা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল তখন। সৌরভ জানালার বাইরে উঁকি দিলো একবার তারপর দু-হাত পেছনে ভাজ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মেরুদণ্ড টানটান করে বলল, ‘সব কত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল, তাই না?’
‘হু।’
‘গত সপ্তাহে তোমার মাকে বলেছিলাম বিয়ের কথা আর আজ তুমি আমার বউ।’
এ কথার পিঠে চুপ করে রইল আয়েশা। সৌরভ বলল, ‘কি হয়েছে তোমার, কথা বলছো না কেন?’
আয়েশা চোখ তুলে তাকাল। বলল, ‘কি হবে আমার? কিছুই তো হয়নি।’
সৌরভ ঠোঁট উল্টিয়ে ফেলল। পাশে থাকা আরামকেদারায় বসতে বসতে বলল, ‘কিছু তো অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু কী? ধরতে পারছি না আমি।’ একটু থেমে সৌরভ আবারও বলল, ‘তোমাকে বিয়ে করতে জোর করেছিল কেউ?’
আয়েশা নিবিড়ভাবে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। বলল, ‘না।’
‘তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হঠাৎ রাজি হলে কেন? আমি যতদূর শুনেছি, তুমি এর আগে অনেকের প্রস্তাব নাকচ করেছো। আমার বেলায় রাজি হলে কেন?’
আয়েশা ঘুরে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করছে চাঁদ ও তাঁরকা, জ্যোৎস্নার আলো চারদিক ঝলমল করছে। মৃদু বাতাসে গাছের ডালপালা মৃদু দুলছে, বাড়ির পেছনের পুকুর টায় জ্যোৎস্না পড়েছে। বাতাসের সাথে পানি ঢেউ খাচ্ছে আর জ্যোৎস্নার আলো চিকচিক করে উঠছে। সৌরভের প্রশ্নের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিলো না আয়েশা। সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর সৌরভের দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘আলো আপনাকে খুব পছন্দ করে।’
সৌরভ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
‘শুধু কি আলোর জন্য ই বিয়ে করেছো?’
আয়েশা মাথা নাড়ল।
‘হ্যাঁ।’
‘জানতে পারি কেনো?’
আয়েশা হাসল। চাপা হাসি। তারপর বলল, ‘আপনিও তো তাই করেছেন। আপনি হতে চেয়েছিলেন আলোর বাবা, আমি আপনার সেই ইচ্ছাটাই পূরণ করেছি।’
সৌরভ অপার বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় করে শুধালো, ‘তুমি জানতে?’
‘হ্যাঁ। সেজন্যই তো বলেছি—আলো আপনাকে খুব পছন্দ করে। আলো আমার মেয়ে। আমি ওর কষ্ট বুঝি। সবার বাবা আছে শুধু ওর বাবা নেই। মেয়েটা কষ্ট পায়। ওর মন কাঁদে বাবার জন্য। কি আর করার? দুর্ভিক্ষের সময় তিনি যে মারা গেছেন।’ আয়েশা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, ‘আলো বাবা ডাকতে চায়। কিন্তু ডাকতে পারে না। আলোর সাথে কারো এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই। আমার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন ওর নানার প্রতিও এত টান ছিল না। কিন্তু ও আপনি বলতে অজ্ঞান। সারাক্ষণ শুধু মাস্টার মশাই। মেয়েটা ভীষণ ভালোবাসে আপনাকে। তাছাড়া আপনাকে বিয়ে করার পেছনে আরও একটা বড় কারণও অবশ্য আছে।’
আয়েশার এ কথার পিঠে ভ্রু কুঞ্চিত করল সৌরভ। কি এমন কারণ? যার জন্য আয়েশা তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনের মধ্যে কৌতূহল জেগে ওঠল। জানার তীব্র আকাঙ্খা থেকে সৌরভ জিজ্ঞেস করল, ‘কী কারণ?’
আয়েশা একটু দম নিয়ে বলল, ‘আমি বুঝতে পারি, আমার শরীরের ভেতরে অনেক বড় একটা রোগ হয়েছে। যে কোনো সময় মরে যেতে পারি। জানি না হঠাৎ কবে মরে যাই? তখন আমার মেয়েটার এই দুনিয়ায় কেউ থাকবে না। ও একা হয়ে যাবে। মানুষের লাণ্থি-উষ্ঠা খাবে। আমি মা হয়ে সে-সব সহ্য করতে পারব না। আমি বিয়ে করতে এজন্যই রাজি হয়েছি যে, আমার হঠাৎ কিছু হয়ে গেলে আপনি ওকে দেখেশুনে রাখবেন। কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দিবেন না। আমি চাই, ও সবসময় ভালো থাকুক। মাস্টার মশাই, আপনি আমাকে কথা দিন—আমি যদি হঠাৎ মারা যাই, আপনি আমার মেয়েটার খেয়াল রাখবেন। আমাকে কথা দিন আপনি।’
আয়েশা উত্তেজিত হয়ে গেল। এ পর্যায়ে উঠে দাঁড়াল সৌরভ। আয়েশাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি চিন্তা করো না। তোমার কিছুই হবে না। আমি তোমাকে শহরে নিয়ে যাবো। শহরের সবচেয়ে ভালো ডক্টরকে দেখাব।’
আয়েশা বলল,
‘কিন্তু?’
সৌরভ ওর তর্জনী আয়েশার ওষ্ঠদ্বয়ে রেখে বলল, ‘কোনো কিন্তু নয়, আমি তোমাকে ডক্টর দেখাবোই। সব রকম টেস্ট করাবো। দেখবে তোমার কিচ্ছু হয়নি। তুমি যে বলো তোমার অনেক বড় রোগ হয়েছে। এটা তোমার মনের ভুল। আমি প্রমাণ দেবো তোমাকে। তুমি অনেক দিন বাঁচবে। আমরা দুজন একসাথে আলোর খেয়াল রাখব।
আয়েশার দু-চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সৌরভ আলগোছে চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, ‘আমি থাকতে তোমাদের চিন্তা কিসের? আজ থেকে তোমাদের সমস্ত দায়িত্ব আমার। সারাদিন অনেক দখল গিয়েছে এখন এসো। ঘুমাবে।’
‘হু।’
ফজরের পরপর ঘুম ভাঙলো সৌরভের। ঘুম থেকে উঠেই আলোর কপালে শুকনো চুমু খেলো সে। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুরে তাকাল। আয়েশাকে ডাকার জন্য তার দিকে একটু ঝুকে গেল সে। কয়েকবার আওয়াজ দিলো তাকে। কী আশ্চর্য! আয়েশার সাড়াশব্দ নেই। কি হয়েছে ওর? সৌরভ সোজা হয়ে বসল। আয়েশার হাত ধরতেই চমকে উঠল সে। বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে হাত। বুকের ভেতর ধক করে উঠল সৌরভের। স্তব্ধ হয়ে গেল সে। কি করবে না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। এভাবে কয়েক মিনিট পেরিয়ে যেতেই ‘আয়েশা’ বলে চিৎকার করে উঠল সৌরভ। তার চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো মফিজ। দরজায় কষাঘাত করতেই দরজা খুলে দিলো সৌরভ। সকাল হলো। গতকাল যারা বিয়ের কনে দেখতে এসেছিল, আজ তারাই মৃতদেহ দেখতে এসেছে। বিয়ে বাড়ির আনন্দ এক রাতেই মৃত বাড়ির কান্নায় পরিনত হয়েছে। দুনিয়ার সব সুখ-দুঃখের হিসাবনিকাশ চুকিয়ে ওপারে চলে গেল আয়েশা। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন হালিমা বেগম। মেয়ের মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন তিনি। এ কী হয়ে গেল তার? কি সর্বনাশ। আলো ওর মায়ের বুকের ওপর পড়ে কাঁদছে। অস্ফুটস্বরে বলল, ‘মা, মা ও মা উঠো না। তুমি এখানে শুয়ে আছো কেন? ও মা উঠো। তোমার কষ্ট হচ্ছে না মা? মা গো। আমাকে কোলে নাও না মা। ও মা। উঠো।’
আয়েশার মৃতদেহ উঠোনে রাখা হয়েছিল। ধুলোবালি লেগে আলোর জামা ময়লা হয়ে গেল। সৌরভ তাকে কোলে তুলে নেয়। তাকে নিয়ে একটু দূরে চলে গেল সে। আলো কান্না করতে করতে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মায়ের কাছে যাবো। আমাকে যেতে দাও।’
পাড়া পড়শীরা হায় হায় করছেন। মাত্র কাল বিয়ে হলো আর আজই মরে গেল। কি দূর্ভাগ্য মেয়ের। একটা দিন সংসার করতে পারলো না। আফসোস করতে লাগল সবাই। মৃত লাশ বেশিক্ষণ রাখার নিয়ম নেই। যত দ্রুত সম্ভব কবর দিতে হয়। দুপুর বারোটার মধ্যে জানাজা ও দাফনকাজ সম্পূর্ণ হলো আয়েশার। আয়েশা অসুস্থ ছিল। কেউ জানতেই পারলো না সে কি রোগে আক্রান্ত ছিল। কেনোই বা মারা গেল। কেউ জানতে পারলো না।
চলবে…..
