#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্বঃ১
১.
–” আমার সাথে তিন বছর সম্পর্ক করার পর, আজ শুনছি অন্যত্র তোমার বিয়ে।”
তীব্র, তীক্ষ্ণ কন্ঠে কথাটা বলে স্নেহা। তার ঠোঁটের কোণে হালকা একরাশ তাচ্ছিল্যের হাসি। কিন্তু, চোখের গভীরে কেমন এক নোনা সমুদ্র লুকিয়ে আছে। নেহাল চুপ। দৃষ্টি নিচু, ঠোঁট শুকনো, যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। মাঠের বাতাসটা ভারি হয়ে আছে। স্নেহা একটু এগিয়ে আসে। ঠোঁটে ব্যাঙ্গ,
–” আচ্ছা, নেহাল! গতকাল রাতেও তো তোমার সাথে আমার কথা হয়েছিলো, তাই না? তখনও তো বলোনি আজ তোমার বিয়ে। বরং, কি সুন্দর হেসে রোমান্টিক কথা গুলো বলছিলে। অথচ, গতকাল ছিলো তোমার হলুদ সন্ধ্যা। আজ তোমার বিয়ে, মানে আজ রাতেই তোমার বাসর রাত। তাহলে, আজ রাতে কি করে কথা বলতে আমার সাথে? নাকি বিয়ে করে এসে, বাসর ঘরে ঢোকার আগে কি জানাতে চেয়েছিলে যে, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?”
নেহাল মুখ তুলে তাকায় না। চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে৷ স্নেহার গলার স্বর ভেঙে আসে, চোখের কোণে চিকচিক করে জল। তবুও মুখে হাসি রাখে স্নেহা। নিজেকে দূর্বল হতে দেবে না সে, অন্তত এই মুহুর্তে না। নেহালের মতো একজন প্র’তা’রকের সামনে সে ভাঙবে না, কান্নার দাগ দেখাবে না। স্নেহা আবার বলে ওঠে,
–” গতকাল রাতে অন্য মেয়ের জন্য শরীরে হলুদ লাগিয়ে, আমাকে বললে, তুমি ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ। তো নেহাল, অসম্পূর্ণ জীবনটা বুঝি আজ সম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে অন্য কারোর সঙ্গে? তুমি জানো? গতকাল রাতেও আমি তোমার কন্ঠ শুনে আরামে ঘুমিয়েছিলাম। তোমার হাসিটা মনে হচ্ছিলো কতো আপন। অথচ, ততক্ষণে তুমি অন্য কারোর জন্য হলুদ লাগিয়ে ছিলে। কিভাবে পারলে তুমি?”
নেহাল এক পলক স্নেহার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নেয়। স্নেহা একটু সময় চুপ থেকে বললো,
–” আজ সকালে যখন জানলাম তোমার বিয়ে, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম। ভেবেছিলাম, মজা করছে হয়তো। কিন্তু, আসলে তো ঘটনা সত্যি।”
নেহাল মৃদু সুরে বলে ওঠে,
–” স্নেহা! আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু।”
–” কিন্তু, কি?”
স্নেহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। নেহাল আস্তে করে বলে,
–” পরিস্থিতি এমন ছিলো যে আমি পারিনি কিছু করতে। বাড়ির চাপ, পরিবারের মান সম্মান, সব কিছু জড়িয়ে গেছে। আমি চেয়েও…”
–” থাক!”
স্নেহা থামিয়ে দেয়।
–” সব বিশ্বাসঘা’ত’কের একটাই অজুহাত থাকে, পরিস্থিতি। তুমি কি আমাকে রিজার্ভ অপশন ভেবেছিলে নেহাল?”
হালকা হাসে স্নেহা। নেহাল তাকিয়ে আছে স্নেহার দিকে। স্নেহা বললো,
–” যাও। তোমার জন্য শুভকামনা থাকলো। তোমার নতুন জীবনে সুখী হও, নেহাল।”
নেহাল তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,
–” স্নেহা! আমার কথাটা শুনো…”
–” না!”
এক শব্দে থামিয়ে দেয় স্নেহা।
–” প্লিজ, নেহাল! তিক্ততা বাড়িয়ো না। আমার জীবনে যথেষ্ট দাগ ফেলেছো তুমি। আর নয়। তোমার নতুন জীবনের জন্য অসংখ্য শুভকামনা থাকলো।”
আর এক মুহুর্ত দাড়ায় না স্নেহা। ধীরে ধীরে হেটে চলে যায় মাঠের গেট পেরিয়ে। নেহাল তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না স্নেহা দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে যায়।
ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে স্নেহা। পায়ের নিচে ভাঙা ইট, ধুলো, গাড়ির হর্ন, সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। চোখের পানি এখন আর চেপে রাখতে পারছে না সে। তিনটা বছর ধরে নেহালের সাথে সম্পর্ক তার। এই তিন বছরে কতো স্বপ্ন, কতোটা ভালোবাসা জমেছিলো হৃদয়ের কোণে। তিন বছর ধরে প্রতিদিন তার উপর যে বিশ্বাস গড়ে তুলেছিলো, আজ তা মুহুর্তেই ভেঙে গেলো।
আজ সকালে এক বন্ধু মারাফত স্নেহার কানে এসেছে, আজ নেহালের বিয়ে। মেয়েটা নেহালদের চেয়েও অনেক ধনী পরিবারের মেয়ে, শহরের নামী ব্যবসায়ীর মেয়ে। বিশ্বাস করতে পারেনি স্নেহা। কিভাবে করবে? গতকাল রাতেও তো ওদের কথা হয়েছিলো। নেহাল কতো সুন্দর করে কথা বলছিলো তখন। কি অদ্ভুত মানুষ! যে মুহুর্তে অন্য কারোর সঙ্গে জীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলো, ঠিক সেই সময়ও স্নেহাকে ভালোবাসার গল্প শােনাচ্ছিলো। সকালবেলা খবরটা শোনার পর নিজের চোখে সবটা দেখতে চেয়েছিলো স্নেহা। তাই, নেহালকে ফোনে ডেকে নেয় বাসার পাশের মাঠে। স্নেহা দুর থেকেই দেখতে পায় সাজানো বাড়ি, বিয়ের কোলাহল। সবকিছু চোখে সূচের মতো বিঁধে যায় স্নেহার।
ফুটপাত দিয়ে হাটছে আর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে স্নেহার। কি করে একটা মানুষ এতোটা বেইমানি করতে পারে? কিভাবে? নেহাল আসলে কি চাচ্ছিলো? তাকে বাইরে প্রেমিকা বানিয়ে রেখে আবার ঘরে বউও রাখতে? ছিহ! এতে জঘন্য মানসিকতা মানুষের কিভাবে হতে পারে? ভেবে পাচ্ছে না স্নেহা। এইভাবে তার ভালোবাসাকে অপমান করলো নেহাল? এতো সময় শক্ত হয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে শরীর যেন ভেঙে আসছে স্নেহার।
ফুটপাতের পাশে একটা বেঞ্চে বসে পড়ে স্নেহা। দুই চোখের অশ্রু ঝাপসা করে দিয়েছে শহরের দৃশ্য। চারপাশে মানুষ ব্যস্ত নিজেদের কাজে। মানুষ চলছে নিজ গতিতে, রিকশা, গাড়ি, হর্নের শব্দ। কেউ জানে না, ঠিক এই মুহুর্তে একটা মেয়ে কতোটা ভেঙে পড়ছে। ক্লান্ত চোখে স্নেহা তাকিয়ে থাকে ব্যস্ত রাস্তার দিকে। সূর্যের তেজ বাড়ছে। সকালই যেন দুপুরের গরমে ঝলসে যাচ্ছে। স্নেহা অনুভব করে, তার ভেতরে তেমনি তাপ, তেমনি পোড়া। একটু পর সে মুখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশটাও আজ কেমন যেন ফ্যাকাশে। রোদ ঝলমল করছে, তীব্র তাপ দিচ্ছে, তাও আকাশটা নিস্তেজ।
স্নেহা ভাবছে, ভালোবাসা কি তবে মিথ্যে? নাকি মানুষই মিথ্যে হয়ে যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে? এক সময় নিজের হাতের দিকে তাকায় স্নেহা। এই হাতই একদিন নেহালের আঙুলে জড়ানো ছিলো, ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি ছিলো। আজ সেই হাত ফাঁকা, নিঃসঙ্গ। স্নেহার নিজেকে চন্দ্রবিন্দুর মতো মনে হয়। যে উচ্চারণে স্পর্শ আছে, কিন্তু স্বর নেই।
…
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ফোনের এলার্ম বেজে উঠে। ঘুমের ঘোরে হাত বাড়িয়ে এলার্মটা বন্ধ করে আরাফ। চোখ খুলে তাকাতেই দেখে, তার বুকের উপর মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে মগ্ন তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ, ছোট্ট চার বছরের মেয়ে আরোহি। মেয়েটার নিঃশ্বাসে এক শান্তি আছে। হালকা হাসে আরাফ। সে আস্তে করে মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, মেয়ের কপালে আস্তে করে চুমু খায়। তারপর মেয়েকে আস্তে করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে উঠে বসে আরাফ। দিনের শুরুটা প্রতিদিনই এমন হয়, আরোহির মুখ দেখে শুরু হয় আর আরাফের কর্মব্যস্ততা দিয়ে শেষ হয়।
ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে আরাফ। রান্নাঘর থেকে খুটখাট আওয়াজ ভেসে আসছে। সেখানে গিয়ে দেখে মা, সায়েরা খাতুন সকালের রান্নায় ব্যস্ত।
–” উঠেছিস, বাবা?”
মৃদু হাসিতে জিজ্ঞেস করলেন সায়েরা খাতুন। আরাফ উত্তর দিলো,
–” হ্যা, আম্মা! খাবার রেডি?”
–” হ্যা! হয়ে এসেছে।”
–” স্নেহা কোথায়? ঘুমাচ্ছে?”
–” না! ও তো মাত্রই বেরিয়ে গেলো।”
–” এই ভোরে? কোথায় গেলো ও?”
–” বললো, একটা কাজ আছে।”
আরাফ আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। চুপচাপ রুমে ফিরে আসে। ছোট্ট আরোহি তখনো বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে। মেয়ের ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করে না তার। কিন্তু, সময় যে বড় নিষ্ঠুর। আরাফ কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় ডাকে,
–” আরোহি! আম্মু! উঠো মা, স্কুলে যেতে হবে।”
আরোহি একটু নড়েচড়ে আবার বালিশে মুখ গুঁজে ফেলে। হালকা হাসে আরাফ। তারপর মেয়ের বালিশটা সামান্য উচু করে ধরে।
–” আমার সোনা বাচ্চা! আম্মাজান! উঠো।”
চোখ মেলে তাকায় আরোহি। আধোঘুমে বিড়বিড় করে বললো,
–” আজকে স্কুলে যাবো না, পাপা!”
–” না, আম্মু যেতে হবে। স্কুল মিস করা যাবে না, সোনা!”
–” একদিন না গেলে কি হয়?”
–” অনেক কিছু হয়, মা! তোমার ফ্রেন্ডসরা তোমাকে মিস করবে। উঠো এখন।”
ঠোঁট উল্টিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে আরোহি। আরাফ হালকা হেসে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে, ওয়াশরুমে চলে যায়। নিজ হাতে ব্রাশ করিয়ে দিয়ে, মুখ ধুইয়ে দেয়। তারপর টাওয়েল দিয়ে মুছে দিয়ে স্কুল ড্রেস পরিয়ে দিলো মেয়েকে। সুন্দর করে পরিপাটি করে মেয়ের চুলও বেঁধে দেয় আরাফ। তারপর মেয়েকে কোলে নিয়ে ডাইনিংয়ে চলে আসে সে। টেবিলের অপর পাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন আফজাল খান, আরাফের বাবা। আরোহি হাসিমুখে বলে,
–” গুড মর্নিং, দাদান!”
–” গুড মর্নিং, দাদুমনি!”
স্নেহভরা কন্ঠে জবাব দেয় আফজাল খান। সায়েরা খাতুন আরোহির খাবারটা এনে দেয়। সবজি আর কলিজা দিয়ে রান্না নরম খিচুড়ি। আরাফ জিজ্ঞেস করলো,
–” আম্মা! ডিম সিদ্ধ করোনি?”
–” হ্যা, বাবা করেছি। নিয়ে আসছি।”
ডিম এনে প্লেটে দেয় সায়েরা খাতুন। আরাফ নিজের হাতে মেয়েকে খাওয়াতে লাগে। মেয়ের খাওয়া শেষ হলে, নিজেও তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষ করে দ্রুত হাতে মেয়ের স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে ফেলে আরাফ। সায়েরা খাতুন টিফিন বক্স রেডি করে এনে দিলে সেটাও মেয়ের ব্যাগে ভরে দেয় সে। অফিসের পোশাক পরে নিজেও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নেয়। আরোহিকে জুতা পরিয়ে দেয়। এক ঘাড়ে মেয়ের স্কুল ব্যাগ, আর এক হাতে নিজের অফিস ব্যাগ নেয়। অন্য হাতে মেয়ের হাত ধরে বলে,
–” চলো মা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
মা, বাবার থেকে বিদায় নিয়ে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসে আরাফ। আগে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর নিজের অফিসে যাবে সে। মেয়ের ছোট্ট হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। যেন, এই পৃথিবীর সব অনিশ্চয়তা থেকে তাকে রক্ষা করবে চিরকাল।
…
দুপুর ১২টা ৩০মিনিট!!
সূর্যের তেজ যেন আজ পু’ড়িয়ে ফেলবে পুরো শহরটাকে। শহর যেন দা’উ দা’উ করে জ্বলছে। রাস্তাঘাটের পিচে ফেটে পড়ছে উত্তাপের ঝিলিক। শহুরে মানুষের মুখে ক্লান্তির রেখা। ঘাম, ধুলো, আর পরিশ্রমে মাখামাখি। কেউ মাথায় ছাতা ধরছে, কেউ আবার ভেজা রুমাল চেপে ধরছে ঘাড়ে। তবুও থেমে নেই কেউ। জীবনের দায়ে, রোজগারের টানে, তপ্ত এই দুপুরেও চলতে হয় তাদের।
এইসব গরম, ধুলো আর ক্লান্তির শহরে কিছু মানুষ আছে যাদের জীবনে রোদ নেই, বৃষ্টি নেই, সময় থেমে থাকে একই জায়গায়। তেমনই এক মানুষের নাম রাহুল চৌধুরী। এই উন্মত্ত গরমের বাইরে, এসি নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা ঘরে ঘুমিয়ে আছে সে। দশতলার উপরে থাকা ফ্লাটে, কাচ ঘেরা জানালা আর ভারি পর্দার আড়ালে, সূর্যের আলোও যেন হার মেনেছে। ঘরটা আধো অন্ধকার। বাতাসে এক ধরনের নিস্তব্ধতা, যেন বাইরের পৃথিবীর সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। রাহুলের শরীরে পাতলা কম্বল, নিঃশ্বাসের সুরে ঘুমের ভারে ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে আছে।
হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠলো। একটানা কর্কশ রিংটোনে ঘুমের আবেশ ছিঁড়ে যায় রাহুলের। বিরক্ত হয়ে বালিশ চাপা দিলো কানে। কিন্তু, তার আধখাওয়া আপেল খচিত আইফোনটি বেজেই যাচ্ছে। অবশেষে চোখ না খুলেই হাতড়াতে হাতড়াতে ফোনটা খুঁজে পেলো। কে কল করেছে না দেখে কল রিসিভ করে ফোন কানে নেয় সে। আধোঘুম কন্ঠে বলে,
–” হ্যালো!”
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত কিন্তু কঠোর এক নারী কন্ঠ ভেসে এলো,
–” দুপুর হয়ে গেছে। তুমি এখনো ঘুমিয়ে?”
রাহুল নাম না দেখেই বুঝে গেলো কন্ঠের মালিককে। কারন, এই কন্ঠ তার পরিচিত। খুব ভালো ভাবেই চেনে। তার মা রিমা ইয়াসমিন।
–” কি বলবে বলো?”
–” ঘুম থেকে উঠো।”
–” পরে উঠবো।”
–” একদম উচ্ছন্নে চলে যাচ্ছো, রাহুল!”
রাহুলের গলায় ঠান্ডা বিদ্রুপ,
–” ভালো হতে গেলে বাবা-মা লাগে। সেইটা তো হয়নি। এখন ভালো বা খারাপ যাই হই, দায় তোমাদের না, আমার। যাই হোক, কেন ফোন করেছো?”
ওপাশে রিনা ইয়াসমিন কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর নরম গলায় বলে ওঠে,
–” আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। আজ আমার বাসায় আসবে?”
–” সন্ধ্যার পর আসলে আসতে পারি।”
–” ঠিক আছে!”
কল কেটে দেয় রাহুল। ফোনটা পাশে ছুড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে। তারপর উঠে বসে থাকে কিছু সময়। ধীরে ধীরে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে যায়। পর্দা সরাতেই আলো ঢুকে পড়ে ঘরে। জানালার ওপাশে রৌদ্র উত্তপ্ত আকাশ, নিচে ছুটে চলা শহর, বিল্ডিং, গাড়ি, মানুষ, গ্লাস লাগানোই কোলাহল আসে না। দশ তালার পর এমনিও কোলাহলের শব্দ কমই থাকে। রাহুল সেইদিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
রাহুলের মনে হয়, এইসব মানুষ কতো কষ্ট করে বাঁচে। কিন্তু, তবুও তারা বাঁচতে চায়। তাদের মুখে ক্লান্তি আছে। কিন্তু, সেই ক্লান্তির ভেতরেই জীবনের তৃষ্ণা আছে। আর সে? সব আছে, কিন্তু কিছুই নেই। রাহুলের মনে হয়, এই বিশাল শহরে যেন সে এক অদৃশ্য মানুষ। তার জীবন যেন একটা নিখুঁত চিত্রকর্ম, কিন্তু তাতে প্রান নেই। সব আছে তার, আলিশান ফ্লাট, দামি গাড়ি, ব্রান্ডেড জামা, কাপড়, জুতো, ইচ্ছে হলেই বিদেশ সফর। এক কথায় বিলাসবহুল জীবন-যাপন তার। কিন্তু, তারপরও মনে হয়, তার জীবনের কোথাও যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে। ভেতরে এক ভ’য়ং’কর শূন্যতা।
মানুষ রোদের তাপে ঘাম ঝরিয়ে ছুটছে তাদের প্রয়োজনের পেছনে। রাহুলের সেই প্রয়োজন নেই। টাকার অভাব নেই, আরামের অভাব নেই। কিন্তু, শান্তির? সে জানে না শান্তি দেখতে কেমন, ছুঁয়ে কেমন লাগে। রাহুল হালকা করে জানালার কাচে হাত রাখে। সূর্যের আলো পড়া হালকা গরম কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। সেই মুখে একটুও তৃপ্তি নেই। এই শহরের ব্যস্ততায়, এই নীরব বিলাসে, সে শূন্য জীবন কাটাচ্ছে। রাহুল নিজের জীবনের সেরা উক্তি রেখেছে, সব কিছু থাকলেই জীবন সম্পূর্ণ হয় না।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
