#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২৩
‘এটা আপনার মুখের স্বাদের জন্য না, শরীরের সুস্থতার জন্য দেওয়া হয়েছে। চুপচাপ শেষ করবে।’
শুভ্রর ওমন ভরাট চাহনি আর গম্ভীর গলার স্বর শুনে গল্প আর গাইগুই করল না। পরো খাবার শেষ করল অবশ্যই সেটা না পারতে।
গল্পর খাওয়া শেষ হতেই সূর্য হুড়মুড়িয়ে ডুকল কেবিনে –তার হাতে একটা লাল আর সাদা গোলাপের মিশেলে তৈরি বুকে। এসেই কোনো ডান বাম না দেখে সরাসরি গল্পর দিকে তাকিয়ে কানে এক হাত দিয়ে বলল,
‘সরি দোস্ত আসতে এতো দেরি করার জন্য। আজ মা কে নিয়ে ডক্টরের কাছে যেতে হয়েছিল একটা এ্যাপোয়নমেন্ট ছিল; তাই ভার্সিটিতেও যেতে পারিনি। একটু আগেই তুশি ফোন দিয়ে বলল সবটা। কিন্তু একটা কথা –মাথা ঘুরে পড়ার জন্য তোকে রিক্সাতেই কেনো উঠতে হলো? নরমাল মানুষ তো এমনে দাঁড়িয়ে থেকেই পড়ে আর তোকে রিক্সায় উঠতে হলো?’
গল্প হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো খানিক সময়। পরপরই বলল,
‘এবার একটু শ্বাস নে ভাই, শ্বাস নে। তুই একদমে এতো কথা কীভাবে বলিস? আমাদেরও বলার একটু সুযোগ দে!’
সূর্য শান্ত হলো তবে পাশে তাকাতেই শুভ্রকে দেখে এক গাল হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘আপনি শুভ্র ভাই, রাইট? ফাইনালি আপনার সাথে দেখা হলো।’
শুভ্রও হেসে তার সাথে হাত মিলিয়ে কুশলাদি বিনিময় করে। সূর্য এবার তার আনা ফুলের তোড়া টা গল্পর দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে,
‘উফ…ভুলেই গেছিলাম। এই নে তর জন্য ফুল এনেছি; শুনেছি অসুস্থ মানুষদের নাকি ফুল দিলে তারা প্রফুল্ল হয়ে খুশি হয়! আমি অবশ্য তর খুশির জন্য আনিনি আনতে হয় তাই এনেছি।’
গল্প হেসে সূর্যর থেকে ফুলগুলো নিলো। শুভ্র তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো সেদিকে। সূর্যর থেকে ফুলের তোড়া টা নেওয়া তার চোখে বিঁধল ভীষণ। যদিও সূর্য গল্পর বন্ধু তারপরও এই বিষয় টা তার মোটেই ভালো লাগলো না। কপালে দু আঙুল স্লাইড করে কোনোমতে দেখে গেলো শুধু। গল্পর লাইফে যেনো একটা অলিখিত নিয়ম আছে যে –ফুল যদি নিতেই হয় তবে সে সেটা শুভ্রর থেকেই নিবে। মিনিট দশেক পরে সূর্য বেড়িয়ে গেলো। আর পরপরই ডক্টর গল্পকে ডিসচার্জ করে দিলো। গল্প বের হওয়ার আগে যখন ফুলের তোড়া টা নিবে তখনই শুভ্র বলে বসে,
‘তাহিয়াত ফুল গুলো রেখে যাও।’
গল্প অবাক হয়ে বলে,
‘কেনো?’
শুভ্র একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,
‘তুমি তো এখন অনেকটাই সুস্থ তাইনা! কিন্তু পরবর্তী এই কেবিনে যে এডমিট হবে সে তো অসুস্থ থাকবে অনেক। তুমি বরং তার সুস্থতা কামনা করে এই ফুল গুলো এখানে রেখে গেলে! তাতে করে সেই অসুস্থ ব্যাক্তিটা কতো খুশি হবে ভাবো তো।’
গল্প শুভ্রর এমন লাগামহীন যুক্তির কিছুই বুঝলো না।
‘কিন্তু….’
গল্প পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ্র তাকে কেবিন থেকে নিতে নিতে বল,
‘আরে কোনো কিন্তু নেই চলো তো। লেইট হচ্ছে তো।’
__________________________
শুভ্রর গাড়ি টা হসপিটালের পার্কিং লটেই ছিলো।
শুভ্র গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক তখনই গল্প তার হাত আঁটকে দিলো। বলল,
‘গাড়িতে না প্লিজ।’
শুভ্র ভ্রু কুচকে বললো,
‘তবে কি পায়ে হেঁটে?’
গল্প সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
‘না,তবে আজ চলুন রিক্সায় ঘুরি? আপনার সাথে তো আমি এখনো একবার রিক্সা করে ভালোভাবে ঘুরতে পারিনি! হ্যাঁ, একদিন ঘুরেছিলাম কিন্তু সেটা তো অল্পকিছু সময় ছিলো। অথচ আমি কতো ভেবে রেখেছিলাম যে –আমার যে বর হবে; তার সাথে শহরের অলিতে-গলিতে রিক্সা করে ঘুরে বেরাবো।’
শুভ্র গল্প হেলথ্ নিয়ে চিন্তিত হলো,
‘আজ না যাই তোমার শরীরের কন্ডিশন তো আজ এমনেতেই ভালো না। এখন যদি ঘুরাঘুরি করি তবে তো তা আরও বিগড়াবে।’
গল্প জেদ দেখিয়ে বলল,
‘আমি এখন এই মুহূর্তে ফিট এন্ড ফাইন। এখন একটু ঘুরাঘুরি করলে আরও বেটার ফিল করবো।’
‘কিন্তু….’
‘কি কিন্তু কিন্তু করছেন? ওকে ফাইন… আপনি না যেতে চাইলে আমি আর জোর করবো না। তবে আর কোনোদিন কোথাও যেতেও চাইব না, হুহ।’
কথাটা বলেই গল্প গাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। কিন্তু পথিমধ্যে শুভ্র একহাত টেনে কাছে আনলো। বলল,
‘বাহবা্ এতো রাগ! আমি কখন বললাম যে যেতে পারবো না? আমি শুধু তোমার হেলথ্ কন্ডিশন নিয়ে কনর্সান ছিলাম; নাথিং এলস। ওকে চলো আজ রিক্সা করেই ঘুরবো যতো ইচ্ছে ততো। নাউ হ্যাপি?’
গল্প শুভ্র বাহু জড়িয়ে ধরে খুশিতে আটখান হয়ে বলল,
‘অনেক অনেক খুশি। চলুন তবে আর দেড়ি কেনো!’
শুভ্র একটা রিক্সা নিলো চুক্তিতে তাদের নিয়ে তিনঘণ্টা ইচ্ছে মতো ঘুরাবে। গল্প শুভ্র রিক্সায় চড়ে বসলো; রিক্সা ওয়ালা মামা রিক্সার প্যাডেল ঘুরাতে শুরু করলো। গল্প রিক্সায় উঠে থেকে একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে তার মধ্যে স্পেশাল যেটা তা হলো –সে আর তুশিও নাকি প্রায় সময়ই ময়মনসিংহের কলেজে পড়ার সময় তাদের জমানো টাকা দিয়ে এমনকরে রিক্সা করে ঘুরতো। ভাগ্যক্রমে এক ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ায় এখনও প্রায় সময়ই তারা এভাবে ঘুরে। শুভ্র শুনে হাসলো। হুট করেই গল্পর চোখ যায় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো হাওয়াই মিঠাই এর দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই শুভ্রর কাছে বায়না করে –সে হাওয়াই মিঠাই খাবে। শুভ্র আশ্চর্য হয়ে চাইল গল্পর দিকে বলল,
‘সিরিয়াসলি! তুমি এখন এসব বাচ্চাদের মন ভুলানো খাবার খেতে চাও?’
গল্পর সোজা উত্তর,
‘হ্যাঁ চাই, আর এখনই চাই।’
শেষ পর্যন্ত গল্প ওই গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই খেয়েই শান্ত হলো; তাও একটা না পুরো পাঁচটা হাওয়াই মিঠাই।
শুভ্র এবার হুট করেই চলতি রিক্সা থামাতে বলে দ্রুত নেমে যায়। গল্প জিজ্ঞেস করায় বলে –আসছি তুমি বসো। মিনিট তিনেক এর ব্যবধানে শুভ্র ফিরে আসে তবে হাতে করে নিয়ে আসে এক ঝোঁকা রজনীগন্ধা আর শুভ্রর কথানুযায়ী- নিশিগন্ধা। গল্পর দিকে তা বাড়িয়ে দিতেই গল্প ঠোঁট এলিয়ে মিষ্টি হাসে। শুভ্র রিক্সায় বসে আবারও গল্পর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল। গল্প এবার বলল,
‘আপনি সূর্যর দেওয়া ফুলগুলো কেনো আনতে দিলেন না?’
শুভ্র সরু চোখে চেয়ে বললো,
‘কেনো তোমার আপসোস হচ্ছে আনতে না পারার জন্য?’
‘আপসোস কেনো হবে? তবে নিয়ে আসলে কি হতো?’
শুভ্রর গলাটা এবার একটু গম্ভীর শুনালো,
‘কারনটা আগেই বলেছি তাহিয়াত। এক্সপেক্ট মি; অন্য কোনো ছেলের থেকে ফুল এক্সেপ্ট করা তোমার জন্য নিষিদ্ধ।’
‘আরে বাবা আপনি এতো সিরিয়াস হচ্ছেন কেনো? ও তো আমার বন্ধু তারউপর তার একটা দারুণ রূপবতী গার্লফ্রেন্ডও আছে।’
‘গার্লফ্রেন্ড থাকুক বা বউ অ্যাই ডোন্ট কেয়ার। আমার বউ অন্য ছেলের থেকে ফুল নিবে না এটা ফাইনাল, গট ইট?’
গল্প বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘ইয়েস গট ইট। বাট অ্যাই মাস্ট সে আপনি দারুণ হিংসুটে! সামান্য একটা ফুলের জন্য কেউ এভাবে রিয়েক্ট করে!’
শুভ্র একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
‘অ্যাই নো আমি হিংসুটে। নিজের বউয়ের ব্যাপারে হলে হলাম একটু রক্ষণশীল।’
গল্প আর কিছু বলল না শুধু তার মাথা টা শুভ্রর কাঁধে হেলিয়ে দিল। মাঝে মাঝে তার জন্য বরের এই রক্ষণশীলতা দেখতেও ভালো লাগে। ভালোবাসায় একটু-আধটু রক্ষনশীল হতে হয় তাতে মন্দের কিছু নেই; বরং এই বিষয় টা মাঝে মধ্যে একটু উপভোগ্যও হয়ে উঠে।
গল্পদের রিক্সাটা এবার তার হোস্টেল এরিয়ায় ডুকল। কিন্তু তখনই বাঁধল বিপত্তি টা রিক্সার টায়ার টা পানচার হয়ে গেলো হুট করেই। শুভ্র রিক্সা থেকে নেমেই ভাড়া মিটিয়ে গল্পর হাত ধরে সামনে হাটা ধরলো। কিছুটা পথ হাঁটলেই গল্পর হোস্টেল সামনে।
আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না হয়তো বৃষ্টি হতে পারে। হুট করেই দমকা হাওয়া বইতে শুরু করলো; বাতাসের সাথে রাস্তায় পড়ে থাকা শুকনো পাতা গুলোও তাল মিলিয়ে হুটোপুটি খাচ্ছে। আর তারও তাল মিলিয়ে উড়ছে গল্পর এলো চুল –যা আছড়ে পড়ছে শুভ্রর মুখের কাছটায়। মেয়েদের চুলে কেমন জানি একটা মিষ্টি ঘ্রাণ থাকে; শুভ্র আগে যখন তার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত তখন এমনই মিষ্টি একটা ঘ্রাণ সে পেতো –আর এখন গল্পর চুল থেকেও সে এমনই বাট একটু ডিফরেন্ট এই ঘ্রাণ টা পায়। এই ঘ্রাণ টা তার ভীষণই পছন্দের তাই আপাতত নাক টেনে সেটা নেওয়ার তালে আছে। হুট করে তার চোখ যায় রাস্তার পাশেই একটা ফুল গাছের দিকে যেটা দেখতে মনে হয় গোলাপ কিন্তু আদতে সেটা গোলাপ নয়। তবে কি ফুল সেটা জানারও ইচ্ছে নেই। শুভ্র দুকদম বাড়িয়ে একটা ফুল তুলে আনে এবং সেটা সযত্নে গল্পর কানের পাশে গুঁজে দেয়। গল্প হাসে মিষ্টি। তার মধ্যেই হুট করে আচমকা টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করলো। শুভ্র তৎক্ষনাৎ গল্পর হাত ধরে টেনে নিয়ে ধার করালো পাশেই বাসস্টপের যাত্রী চাউনি টার ভিতর। হাতে চুল ঝারতে ঝারতে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘উফ… এই বৃষ্টি টাও এখনই আসলো! আর মিনিট পাঁচেক পরে আসলে তো তুমি হোস্টেলে চলে যেতে পারতে।’
গল্প সেদিকে খেয়াল নেই হাত দিয়ে বাহিরের বৃষ্টি ছুঁতে ছুঁতে বলল,
‘তাতে কোনো সমস্যাও তো হয়নি। বৃষ্টি না আসলে একটু আগে যেতাম আর এখন নাহয় বৃষ্টির কারনে একটু পর যাবো। আ’ই হ্যাভ নো প্রবলেম।’
শুভ্র পকেট থেকে ফোন বের করে কল লাগালো ড্রাইভার চাচাকে; বলে দিলো যত দ্রুত সম্ভব গল্পর হোস্টেল এরিয়াতে আসতে। শুভ্র ফোন রেখে দেখে গল্প বাহিরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানিতে হাত নাড়াচ্ছে। গল্পকে টেনে একটু ভিতরে নিয়ে এসে বলল,
‘এসব কি তাহিয়াত? ভিজে যাচ্ছো যে সেই খেয়াল আছে? চুপচাপ দাঁড়াও এখানে।’
গল্পর মন আনচান করছে এই ঝুম বর্ষনে ভিজতে। যখনই বৃষ্টি নামে গল্প তখনই ভিজে। বৃষ্টিতে ভিজা তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ গুলোর মধ্যে একটা। এবার সে শুভ্র দিকে কোমল চোখে তাকালো সঙ্গে তার একটা বাহু আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘এ্যাই শুভ্র শুনুন না!’
বউয়ের হঠাৎ এমন গদগদ গলায় কথা শুনে শুভ্র বেশ চমকিত। ভ্রু নাড়িয়ে বলল,
‘বলো শুনছি। কিন্তু অযথা কোনো আবদার করবে না কিন্তু!’
গল্প একটা বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলল,
‘চলুন বৃষ্টিতে ভিজি।’
শুভ্র একবাক্যে প্রত্যাখান করলো,
‘অসম্ভব! তুমি পাগল হয়েছ? এমনেতেই তোমার শরীর ঠিক নেই; তারউপর এখন এই রাতের বেলায় বৃষ্টিতে ভিজলে তার পরিনাম কি হবে আদৌ জানো সেটা!’
গল্প নাছোড়বান্দা গলায় বলল,
‘আরে বৃষ্টিতে ভিজলে আমার কোনো সমস্যা হয় না। আমি অভ্যস্ত এটাতে। আপনি জানেন –আমি রাত দুটোর সময়ও বৃষ্টিতে ভিজেছি। প্লিজ একটু ভিজি না শুভ্র, প্লিইজ…’
শুভ্র আবারও কড়া গলায় বললো,
‘একদমই না। জেদ করবে না একদম।’
গল্প গাল ফুলিয়ে বলল,
‘আপনি এমন কাঠখোট্টা স্বভাবের কেনো? দেখুন ওয়েদার টা কতো সুইট! সাথে আপনার লাইসেন্স প্রাপ্ত বউ দাঁড়িয়ে আছে –আর তার সাথে কিনা বৃষ্টি বিলাসের সুযোগ পেয়েও তার স্বাদ নিবেন না? এতো ভারী অন্যায় মশাই।’
শুভ্র কিছু না বলে গল্পর দিকে সরু চোখে তাকাল যে এই মুহূর্তে তাকে বৃষ্টিতে ভিজার পারমিশন দিতে কতোই না ভোলা-ভালা কথা বলছে। গল্প হুট করে বলে বসলো,
‘আপনি ভিজলে ভিজুন না ভিজলে নাই; আমি গেলাম।’
কথাটা বলেই গল্প একছুটে বৃষ্টিতে নেমে পড়লো। ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটলো যে শুভ্র বাঁধা দেওয়ার সুযোগও পেলো না। শুভ্র ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই চেঁচাল,
‘তুমি কিন্তু কথার অবাধ্য হচ্ছো তাহিয়াত। আমি মানা করার পরও তুমি কীভাবে বৃষ্টিতে নেমে পড়লে? এখনই উঠে আসো বলছি।’
গল্প বৃষ্টি ভিজতে পেরে বেজায় খুশি আর তারচেয়েও বেশি খুশি শুভ্রকে ফাঁকি দিয়ে বৃষ্টিতে নামতে পারায়। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
‘এ্যাহ বললেই হলো? এতোক্ষণ ধরে এতো রিকুয়েষ্ট করলাম পারমিশন দিতে কিন্তু দিলেন না। আর এখন আপনি বললেই বুঝি আমি উঠে যাবো! অসম্ভব আমি তো উঠছি না। এক কাজ করুন আপনিও ভিজুন আমার সাথে।’
শুভ্র আবারও চেঁচাল,
‘আমি আবারও বলছি তাহিয়াত উঠে আসো। শরীর খারাপ করবে কি….’
শুভ্র বাকি কথা শেষ করার আগেই গল্প তাকে আচমকা হাত টেনে বৃষ্টির মধ্যে নিয়ে আসলো। শুভ্র বিস্ময়ে হতবিহ্বল। শুভ্রর ওমন লটকে যাওয়া মুখ দেখে গল্প হাসলো একচোট। বলল,
‘এবার আপনিও ভিজুন আমিও ভিজি –ইকুয়্যাল ইকুয়্যাল। আর শুনুন মশাই, মাঝে মাঝে একটু-আধটু বৃষ্টি বিলাস করতে হয় তাহলে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয় সঙ্গে মস্তিষ্কও চাঙ্গা হয়।’
শুভ্র একটু বিরক্ত হলো বৈকি। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো পুরো রাস্তায় একটা কাকপক্ষীও নেই মানুষ তো দূরে থাক। থাকবে কেমনে এখন এমনেতেই বেশ রাত তারউপর এতো বৃষ্টি। শুভ্রর চোখ গুলো হঠাৎই নিবদ্ধ হলো দু’হাত ছড়িয়ে বৃষ্টি বিলাসে নিমত্ত রমনীটির দিকে। গল্পকে এই মুহূর্তে ভীষণই প্রাণোচ্ছল লাগছে যে দিনদুনিয়া ভুলে বৃষ্টিতে ভিজতে মগ্ন আপাতত।
শুভ্রর চোখে হুট করেই কেমন জানি একটা ঘোর লেগে গেলো। আনমনেই গল্পর কাছে আগাতে থাকলো। শুভ্র আচমকা গল্পকে একহাত টেনে তার বুকের মধ্যে এনে ফেলে। হুট করে এমন হওয়ায় গল্প বেশ চমকেছে। চমকানোটা আরেকটু বাড়লো তখন –শুভ্র যখন তার ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট ছুয়ালো। গল্প কেমন জানি কেঁপে উঠলো। শুভ্রর কোমরের কাছে ভিজা ছুপছুপে শার্ট টা খামচে ধরে বলল,
‘এটা কী হচ্ছে শুভ্র?’
শুভ্র ওই ভেজা নেশালো চোখে গল্পর দিকে তাকাল। শুভ্রর ওই তাকানোতে কি ছিলো গল্প তা জানে না –কিন্তু শুভ্রর ওই এক দৃষ্টিতে যেনো গল্পর ছোটমোটো হৃদয় টা খানখান হলো। শুভ্রর ওই ভিজা চুল থেকে টুপটাপ করে পানি গুলোকে ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম আলোয় মুক্তর দানার মতো লাগলো তার কাছে। শুভ্র এবার তার কানের কাছে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো,
‘প্রেম বিলাস হচ্ছে একটু-আধটু; সঙ্গে বৃষ্টি বিলাসও।’
গল্প শুভ্রর চুলগুলো এলোমেলো ভাবে নাড়া দিয়ে বলল,
‘বৃষ্টি বিলাস করতে হলে একটু দূরে যান। আমাকেও একটু মন মতো বৃষ্টি বিলাস করতে দিন।’
কথাটা বলে গল্প সরতে চাইলে শুভ্র আরেকটু শক্ত করে তার কোমর আঁকড়ে ধরে আচমকাই গল্পর গলায় নাক ঘেঁষে নেশালো গলায় বলল,
‘আর প্রেম বিলাস? সেটা কীভাবে করবো? তার জন্য একটা বউ দরকার না! আপাতত তো আমার একটাই বউ তাকে নিয়েই করি কেমন!’
গল্প সরু চোখে চেয়ে বলল,
‘আরেকটা বউ বানানোর ইচ্ছে আছে নাকি?’
শুভ্র একটু দুষ্ট হাসল,
‘তুমি কি পারমিশন দিবে নাকি? দিলে বলো!’
গল্প আচমকাই কেমন জানি হিংস্র হয়ে উঠলো। দুহাতে শুভ্রর শার্টের কলার টেনে বলল,
‘খুন করে ফেলবো –আমি ছাড়া অন্য মেয়ের চিন্তা মাথায় আনলে আপনার খবর আছে।’
কথাটা বলেই চোখের কড়া শাসনি দিয়ে গল্প রেগে সামনের দিকে দুপদাপ পা চালিয়ে চলতে লাগলো। শুভ্র একটু ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তবে পরপরই বউয়ের পিছনে ছুটতে ছুটতে হাঁক ছাড়লো,
‘আরে তাহিয়াত দাঁড়াও আমি মজা করেছিলাম।’
গল্প থামে না। সে হাঁটতেই থাকে; তবে হুট করেই নিজেকে সে শূন্যে অনুভব করলো। শুভ্র তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়েছে। গল্পর রাগে ফোলা ফোলা গাল দুটো তে চারটে চুমু খেলো বেশ সময় নিয়ে। বলল,
‘আরে বাবাহ এতো রাগলে হয়? আমি তো জাস্ট মজা করেছি। তুমি এতো সিরিয়াস হয়ে গেলে কেনো?’
গল্প তখনো কিছু বললো না; চুপচাপ রইলো। শুভ্র এবার তার গলায় আবারও নাক ঘেঁষে চুমু খেলো কয়টা। গল্প তার শার্টের কলার টা কামচে ধরলো। শুভ্র ভীষণ আশ্লেষে বলল,
‘সরি ওকে! আর কখনো বলবো না প্রমিস।’
গল্প তার হাতে থাকা রজনীগন্ধার তোড়া টা দিয়ে শুভ্রর বাহুতে মারলো। বলল,
‘এটা রাস্তা শুভ্র, অ্যাই হোপ ভুলে যাননি?’
‘তো? কি হয়েছে? আশেপাশে তো একটা মশাও নেই।’
গল্প হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে বলল,
‘আমাকে নামান আমি হেঁটে যাবো।’
শুভ্র গল্পর কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাকে চুমু খেলো। বলল,
‘তার আগে সরি মঞ্জুর হয়েছে কিনা বলো?’
গল্প হাসফাস করে উঠলো। কোনোমতে বলল,
‘হয়েছে হয়েছে এবার নামান। কেউ দেখে ফেললে আমার মানসম্মান সব শেষ।’
শুভ্র ছাড়লো তো না-ই বরং আরেকটু শক্ত করে আগলে ধরে বলল,
‘আপনি এখন অসুস্থ তাহিয়াত। আর আমি কি করে একজন অসুস্থ মানুষকে হেঁটে যাওয়ার কষ্ট দেই বলুন! আমি আবার খুবই দয়াবান মানুষ অন্যর কষ্ট একদমই সহ্য হয় না –আর সে যদি হয় নিজের বউ তবে তো প্রশ্নই আসে না।’
গল্প কিছু ছাড়া পাওয়ার জন্য চোটপাট করেও যখন কাজ হলো না। তখন নিজের মাথাটা শুভ্রর ভিজে যাওয়া শার্টের বুকে এলিয়ে দিলো। সঙ্গে সঙ্গেই সে তার নাকে এসে ঠেকলো রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস –যা এতোক্ষণ সে টেরই পাচ্ছিল না। অথচ ফুলগুলো তার হাতেই ছিলো কিন্তু তার তীব্র সুবাস টা লাগছে এখন– কি আশ্চর্য!!
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২৪
মাঝখানে কেটে গেছে দেড়-মাসের মতো সময়। এর মধ্যে গল্পর সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হয়েছে গত দুদিন হলো। আজ সে ময়মনসিংহ যাচ্ছে সাথে অবশ্য তুশিও আছে। শুভ্র দুটো আইসক্রিম আর নানান ধরনের অনেকগুলো চকলেট কিনে দিয়েছে গল্প আর তুশিকে। এর মধ্যেই ট্রেনের লাস্ট হুইসেল বেজে উঠতেই তুশি শুভ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘খোদা হাফেজ শুভ্র ভাই। আরেকবার বিয়ের গেইটে দেখা হবে। শুনুন, টাকা দেওয়ার বেলায় কোনোরকম কৃপণতা চলবে না কিন্তু বলে দিলাম! বউ আনতে গেলে দুটো বিষয় অবশ্যই জোড়ালো হতে হয় –এক উদার মন আর দুই উদার হস্ত।’
তুশির কথায় শুভ্র হেসে ফেললো। বলল,
‘এখন থেকেই আমাকে লুট করার প্ল্যানিং করা হচ্ছে নাকি?’
তুশি শুভ্রকে একটু শুধরে দিয়ে বলে,
‘ওটা লুট না শুভ্র ভাই! ওটা আপনার শালিকাদের হক।’
শুভ্র আবারও হাসলো। বুকে হাত দিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
‘যথাআজ্ঞা। যেহেতু হক; তবে তো মানতেই হয়।’
ট্রেনের চাকা তখন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে সেটা শুভ্রর দৃষ্টি সীমানার বাহিরে চলে গেলো; তখন সে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে স্টেশন থেকে বের হলো। অফিসের একটা মিটিং টাইম পিছিয়ে ছুটে এখানে এসেছিল গল্পকে বিদায় জানাতে।
শুভ্র গল্প আর তুশির জন্য পুরো একটা কেবিন বুক করে দিয়েছে যাতে রিল্যাক্সে যেতে পারে। গল্প একটা ম্যাগাজিন দেখছিল তুশি সেটা ছু মেরে নিয়ে বলল,
‘ওহো রাখ তো এসব! আমার কথা শুন এখন। তর বিয়েতে কি কি করব আমি সব প্ল্যানিং করছি সেটা শুন।’
গল্প বিরক্তি নিয়ে বললো,
‘এখন পর্যন্ত এসব প্ল্যানিং তুই কম হলেও পাঁচশ বার শুনিয়ে আমার কান ঝালাপালা করে ফেলেছিস! আর কতো শুনবো? তাছাড়া তরা কি শুভ্রর থেকে পাওয়া কমিশনের ভাগ আমাকে দিবি? দিলে বল কষ্ট হলেও একটু আগ্রহ নিয়ে শুনি!’
‘এ্যহ শখ কতো আসছে কমিশনের ভাগ চাইতে! যা ফুট! এটা দুলাভাইয়ের শালিকাদের ভাগ নট তার বউয়ের।’
তুশি বলে গেলো একেরপর এক বিয়ে নিয়ে তার করা প্ল্যানিং; গল্প সবটা শুনলো এবং এটাও বুঝতে পারলো –শুভ্রকে বেশ টাকা খসাতে হবে এদের জন্য।
___________________________________
গল্প আর শুভ্রর বিয়ের ডেইট ফিক্সড হয়েছে এই মাসের দশ তারিখ অর্থাৎ হাতে আছে আর পাঁচ দিন। গল্প এসেছে আজ নিয়ে দুদিন আর এসে থেকে মেয়েটা শুধু ঘুমিয়েই যাচ্ছে। ছাব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মনে হয় বিশ ঘন্টাই মেয়েটা ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে। নীলুফার এই নিয়ে ভারি বিরক্ত হলেন; আজ বাদে কাল বিয়ে আর এই মেয়ে পড়ে পড়ে খালি ঘুমায়। এখন বাজে সকাল এগারোটা আর গল্প এখনো ঘুমাচ্ছে –নীলুফার এবার হাতের কাজ ফেলে মেয়ের জন্য একটা প্লেটে করে রুটি নিয়ে গেলো।
‘গল্প এ্যাই গল্প উঠ! কতো বেলা হয়েছে দেখেছিস! তর ঘুমের বহার দেখে মনে হচ্ছে এতোদিন নির্ঘুম ছিলি! উঠ তো।’
গল্প এবার আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। হায় তুলতে তুলতে বলল,
‘নির্ঘম-ই ছিলাম আম্মু। এক্সামের যে প্যারাটা গেলো একটু স্বস্তিতে শ্বাস ফেলতে পারিনি। এখন একটু রিলাক্স হয়েছি ঘুমাব না!’
নীলুফার হাতের প্লেট টা বেড সাইডের ছোট ড্রয়ারের উপর রেখে কাঁথা ব্যাস করতে করতে বললেন ,
‘ঘুমাতে কে না করেছে, ঘুমা। কিন্তু না খেয়ে দেয়ে কেনো ঘুমাবি। এখন প্রায় দুপুর হতে চলল আর তুই সকালের নাস্তা টাই করিস নি; এমন করলে তো অসুখ হবে। দুদিন পর বিয়ে সে খেয়াল আছে!’
গল্প কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলো। বিয়ের কথা ভাবলেই তার মনে আনন্দ আর কষ্ট একসঙ্গে ভেসে উঠে। আনন্দ হয় এটা ভেবে যে –এরপর থেকে সে আর শুভ্র একসঙ্গে থাকতে পারবে; আর কষ্ট হয় এটা ভেবে যে –এবার তো তাকে সত্যি সত্যিই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। নিজের বাড়ি ছাড়ার কথা মনে হলেই বিয়েটাকে তার মারাত্মক বেয়াদব একটা বিষয় বলে মনে হয়।
গল্পর ধ্যন ভাঙে নীলুফার ডাকে। সে হাতে করে প্লেট নিয়ে তার সামনে রুটি ধরে বলে,
‘উফ… তোকে নিয়ে আর পারি না। এতো কি ভাবছিস হা কর খাইয়ে দিচ্ছি। এতো বড়ো হয়েছিস এখনো নিজের যত্ন ঠিকঠাক নিতে পারিস না –শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার পর যে কি করবি আমি তো সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে যাই।’
গল্প রুটি চিবুতে চিবুতে বলে,
‘তোমাকে এতো চিন্তা করতে কে বলেছে। যা হবে দেখা যাবে।’
‘চিন্তা যে কেনো করি সেটা তো তুমি বুঝবে না; আগে মা হও তারপর বুঝতে পারবে মা দের কেনো এতো চিন্তা হয়।’
গল্প কিছু না বলে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মুচকি হেসে মনে মনে বলল— এতো চিন্তা করো না আম্মু।
শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার পর তোমার কেয়ারলেস মেয়ের কেয়ার করার জন্য শ্বশুরের সুইট বড়ো ছেলেটিই আছে। ভদ্রলোক আবার বউয়ের প্রতি ভীষণ কেয়ারিং।
গল্প কথা গুলো ভাবছে আর মনে মনে হাসছে। গল্প এবার জিজ্ঞেস করলো,
‘আম্মু আপা আর দুলাভাই রা কবে আসবে? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কিছুই তো ক্লিয়ার করে বলল না।’
নিলুফার উদাস হয়ে বললেন,
‘বলেছে তো কালকেই আসবে। কিন্তু দেখা যাক; তাদের তো কি জানি বলে যখন-তখন ইমার্জেন্সি পড়ে যায় আবার। এতো ব্যস্ত হবে জানলে কল্পকে আমি কখনো বলতামই না যে ডাক্তারি পড়।’
গল্প মায়ের কথায় হেসে ফেললো। বলল,
‘কিন্তু আম্মু রিমেম্বার –তোমার বড় মেয়ে ডাক্তার হোক সবচেয়ে বেশি কিন্তু তুমিই সেটা চাইতে। এখন এসব বলছ কেনো? ডাক্তার হতে গেলে তো এমন ব্যস্ততা মেনে নিতেই হবে; কিছু তো করারও নেই হু।’
নিলুফার একটু গর্ব করে হাসলেন। তিনি তার দুই মেয়েকে নিয়েই অনেক গর্ব বোধ করেন। কি মিষ্টি দুটো মেয়ে সৃষ্টিকর্তা তাকে উপহার দিয়েছেন এ নিয়ে তার মন সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায় ভরে উঠে।
______________________________
‘কি রে শুভ্র, এমন মনমরা হয়ে বসে আছিস কেনো? এতো কথা বলছি অথচ তর কোনো সারা-শব্দ নেই কেনো?’
ফাহিমের কথায় শুভ্রর কোনো হেলদোল লক্ষ্য করা গেলো না। আরাফ এবার একটু হেসে টিপ্পনী কেটে বলল ,
‘আরে বুঝতে পারছিস না ফাহিম— শুভ্র কেনো মনমরা? কারনটা হলো তার বউ। কেয়ার থেকে শুনলাম গল্প নাকি আজ কদিন হলো বাড়িতে গেছে; আরে সামনে বিয়ে না! আর বউকে ক’দিন না দেখেই আমাদের শুভ্র টা দেখ কেমন শুকিয়ে গেছে।’
আরাফের কথায় ফাহিম একটু এগিয়ে শুভ্রর মুখ টা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ভাবুক হয়ে বলল,
‘আসলেই তো। শুভ্র টা সত্যি সত্যিই বউয়ের চিন্তায় শুকিয়ে কেমন আমসি হয়ে গেছে, আহারে।’
ফাহিমের কথা বলার ধরনে সাব্বির আর আরাফ শব্দ করে হেসে ফেললো। শুভ্র এবার বিরক্ত হয়ে বন্ধুদের দিলো ধমক,
‘চুপ করবি তরা। তোদের মতো ফাজিলের দল আমার ভাগ্যই জুটতে হলো?’
আরাফ মন খারাপের ভান করে বলল,
‘শুভ্র এটা তুই আমাদের বলতে পারলি? আমরা সত্যিই হতাশ তর থেকে এসব শুনে।’
শুভ্র সরু চোখে চেয়ে বলল,
‘ড্রামা-বাজের দল এবার ড্রামাটা বন্ধ কর।’
তাদের হাসি তামশার মধ্যেই ওয়েটার খাবার নিয়ে আসলো। খাবার শেষ করে শুভ্র চটজলদি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,
‘আমি আজ যাচ্ছি, একটা জরুরি কাজ আছে।’
সাব্বির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘জরুরি কাজ? একটু আগেই না সব কাজ শেষ করে এখানে এসেছিস! তাহলে এখন আবার কি কাজ?’
শুভ্র ফোনটা পকেটে ডুকাতে ডুকাতে বলে,
‘আছে একটা কাজ –যেটা সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট।’
কথাটা বলেই শুভ্র গটগট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলো পিছনে রেখে গেলো –তিন জোড়া বিস্মিত চোখ।
শুভ্র গাড়ি স্টার্ট করেই শাওন কে কল লাগালো। রিসিভ হলো মুহুর্তেই। শুভ্র আগেপিছে কিছু না বলেই বলল,
‘শুন, আম্মুকে বলে দিস আজ আমি বাসায় ফিরতে পারবো না। একটা খুব জরুরি কাজে আঁটকে গেছি, শেষ করে আসতে হবে।’
কথাটা বলেই শাওনের থেকে কিছু না শুনেই সে ফোন কাটলো। ঘন্টা তিনেক পর তার গাড়িটা এসে থামলো ময়মনসিংহ শহরে গল্পদের “বাবুঁই নীড়”
বাসাটার সামনে। গল্প দের বাসার এই নামটা শুভ্র দারুণ পছন্দ হয়েছে বলতেই হয় তার শ্বশুর মশাই বাড়ির জন্য চমৎকার একটা নাম সিলেক্ট করছে।
রাত তখন প্রায় তিনটে বাজে। শুভ্র ডায়াল করলো এই বাবুঁই নীড়ের তার সবচেয়ে আদুরে বাবুঁই গল্পর নাম্বারে। গল্প তখন বেগুড়ে ঘুমাচ্ছে আর তাই দুটো কল হওয়ার পরেও তা রিসিভ হলো না। কিন্তু তিন নাম্বার কলটা রিসিভ হলো। ঘুমু ঘুমু কন্ঠে কোনোমতে বললো,
‘হ..হ্যালো কে?’
শুভ্র টানা এতোক্ষণ ড্রাইভ করার পর যে একটু ক্লান্তি অনুভব করছিল তা যেনো এই ঘুমু ঘুমু রিনরিনে আওয়াজে উড়ে গেলো। একটু প্রশান্তি হেসে বলল,
‘তোমার বর বলছি। ঘুমাচ্ছিলে বুঝি?’
গল্প এবার ঘুমের মধ্যেই কপাল কুঁচকে বলল,
‘আপনি এতো রাতে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন আমি ঘুমাচ্ছি কিনা? আমাকে ঘুমাতে দিন শুভ্র।’
শুভ্র গাড়িতে আরাম করে হেলান দিয়ে বললো,
‘ঘুমাবে পরে এখন নিচে আসো।’
গল্প এবার চোখ খুলল। আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘নিচে আসবো মানে? আপনি কোথায়?’
‘তোমাদের বাসার সামনে। জলদিই আসো। আর হ্যাঁ আসার আগে একটা শাড়ি পড়ে আসবে কিন্তু প্লিজ।’
গল্পর ঘুম ততক্ষণে ছুটে গেছে একলাফে সে বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গেলো। বিস্ময় নিয়ে দেখলো সত্যিই শুভ্র গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবার তাকে দেখে হাতও নাড়াচ্ছে। কানে এখনো সেলফোন টা সেটা থেকে ভেসে আসলো শুভ্রর গলা,
‘কি বিশ্বাস হলো? লিসেন, শাড়ি টা কিন্তু অবশ্যই পড়ে আসবে। আ’ম ওয়েটিং!’
#চলবে
