#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৩
গল্প শেষ বারের মতো চোখে কাজল টা টেনে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা টেনে নিলো। আয়নায় নিজেকে একবার পুরোপুরি পরখ করে ঠোঁট চেপে বলল— নাহ্ ঠিকঠাক। আজ তারা শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে আর কিছুক্ষণ বাদেই ট্রেন। শুভ্র আসবে তাকে নিতে। গল্পর হুট করেই মনে হলো সে শাড়ি পড়ে যাবে আজ; তার অবচেতন মন কোথাও একটা যেনো বলছিল –শুভ্র তোকে শাড়িতে পছন্দ করে; গল্পও মনকে আস্কারা দিয়ে তাই পরে ফেললো। নিজের বাচ্চামিতে নিজেই হাসল গল্প। তার পরনের শাড়িটা কেয়ার দেওয়া। চমৎকার একটা শাড়ি, সবুজের মধ্যে ইয়েলো কালারের কম্বিনেশন দারুণ মানিয়েছে তা গল্পর গরনে।
তুশি এতোক্ষণ ধরে গল্পর হালচাল দেখছিল এবার ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
‘তুই ট্যুরে যাওয়ার জন্য এতো এক্সাইটেড; নাকি এই সুযোগে শুভ্র ভাইয়ের সাথে ট্যুরের নাম করে ফ্রি-তে হানিমুন টা হয়ে যাচ্ছে বলে, তার জন্য এক্সাইটেড বেইব? হুম হুম?’
তুশির চোখেমুখে দুষ্ট হাসি। গল্পর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাতে নাচাতে কথাটা জিজ্ঞেস করলো। হানিমুন কথাটায় গল্প দারুণ লজ্জা পেলো। তুশির উপর মিছে রাগ দেখিয়ে বাহুতে আঘাত করলো। তীব্র বিরোধিতা নিয়ে বললো,
‘তুই আজকাল অতিরিক্ত বুঝছিস তুশির বাচ্চা! অবশ্যই আমি ট্যুরে যাওয়ার জন্যই এক্সাইটেড। এখন পর্যন্ত একবারও তো যেতে পারলাম না ট্যুরে! লাইফের ফাস্ট ট্যুর এক্সাইটেড তো হবই।’
তুশি নিজেও জানে গল্প এই ট্যুরটা নিয়ে অনেক এক্সাইটেড। মেয়েটা সেবার এতো বলেও বাসা থেকে পারমিশন পায়নি বলে কি মন খারাপই না করেছিল!! তার জন্য পরে তুশি নিজেও তার ট্যুরে যাওয়াটা ক্যানসেল করেছিল। তুশি গল্পকে আরেকটু খুঁচিয়ে বলল,
‘তা নাহয় বুঝলাম ফাস্ট ট্যুর তাই এতো এক্সাইটেড। কিন্তু ট্যুরে যাওয়ার সময় যে কেউ বুঝি এমন করে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে যায়!’
গল্প তীক্ষ্ণ চোখে চাইল তুশির দিকে। তুশি পরক্ষনেই কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো করে বলল,
‘ওও… হ্যাঁ যায় তো। বরের সাথে হানিমুন….ওপস ট্যুরে গেলে যায়। আমিও না আজকাল সব কেমন গুলিয়ে ফেলি! ’
কথাটা বলেই তুশি চোখ টিপল। গল্প ততক্ষণে ভালোই ক্ষেপেছে বেডে থাকা কুশন দিয়ে ইচ্ছে মতো তুশিকে মারছে আর বলছে,
‘আমার মর্জি আমি শাড়ি পড়ব নয়তো জিন্স পড়ব, তাতে তর কি? বদমাশ মেয়ে কখন থেকে জ্বালাচ্ছিস আমায়।’
তুশি এবার হাসতে হাসতে বলল,
‘জিন্স কেনো চাইলে শর্টসও পড়তে পারিস। এখন থাম নয়তো যেটা পরে আছিস সেটা খুলে যাবে। চেয়ে দেখ অলরেডি তর শাড়ির অবস্থা নাজুক।’
গল্প থামলো এবার। তুশির কথায় নিজের দিকে একবার তাকাতেই দেখে সত্যিই হুড়োহুড়িতে তার শাড়ির অবস্থা নাজুক। গল্প এবার দ্বিগুণ ক্ষেপল, সে এতো কষ্ট করে সকাল থেকে শাড়ি টা নিজে নিজে পড়েছে আর এখন কিনা এই বিচ্ছিরি হাল।
‘তুশির বাচ্চা তোকে তো আজ….’
বাকি কথা বলার আগেই তুশি ওকে থামিয়ে বলে,
‘আমাকে পরে দেখিস এখন শাড়ি টা ঠিক করতে দে। নয়তো ট্রেন তোকে ছাড়াই শেষ হুইসেল টা বাজিয়ে দিবে।’
গল্প আর কিছু বলল না। তুশি নিচে বসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে লাগলো। গল্পর শাড়ি গুছানো হতেই তার সেলফোন টা বেজে উঠলো। শুভ্র কল দিচ্ছে। রিসিভ করতেই বলল,
‘তৈরি হয়েছো? আমি তোমার হোস্টেলের সামনেই।’
‘হু রেডি, আসছি আমি।’
গল্প ফোন রেখে আবারও শেষবারের মতো নিজেকে আয়নায় একঝলক দেখে নিয়ে কাঁধে ব্যাগ তুলে। তুশি ওকে দেখে ঠোঁট চেপে বলল,
‘কিছু একটা মিসিং গল্প। ওহ্! দাঁড়া।’
বলেই তুশি তার টিপের পাতা থেকে একটা ছোট টিপ নিয়ে গল্পর কপালে দিয়ে দিলো। বলল,
‘নাউ পারফেক্ট। এখন যা।’
গল্প মিষ্টি হেসে লাগেজ টা নিয়ে তুশির থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
গল্পকে দূর থেকে গেইট পেরুতে দেখেই শুভ্রর দৃষ্টি থমকাল। ডান হাতটা আপনা-আপনি বুকের বা পাশে নিয়ে অস্ফুটে বলল– মাশাল্লাহ!
পরপরই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে গল্পর থেকে লাগেজ টা নিলো। গল্প মৃদু হেসে পা বাড়ালো। গাড়িতে বসে গল্প জিজ্ঞেস করলো,
‘কেয়া আপুরা কোথায় থাকবে?’
‘ওরা সবাই স্টেশনেই থাকবে।’
আধঘন্টা বাদে শুভ্রদের গাড়িটা এসে থামলো কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে। শুভ্র নেমে গাড়ির পিছন থেকে তার আর গল্পর লাগেজ দুটো বের করলো। গল্প গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে অন্যদের খুঁজছে। শুভ্র তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল,
‘যাদেরকে খুঁজছ তারা অলরেডি প্লার্টফর্মের ভিতর ওয়েট করছে।’
গল্প অবাক হয়ে বলল,
‘ওরা আগেই এসে গেছে?’
‘জ্বি, এবার চলুন।’
গল্প হ্যাঁ সূচক মাথা দুলিয়ে শুভ্রর সাথে পায়ে পা মিলিয়ে প্লার্টফর্মের ভিতরে চলল। শুভ্রদের দেখেই কেয়া ছুটে এলো। গল্পকে জড়িয়ে ধরে আগাগোড়া পরখ করে বলল,
‘ওহো…ইউ আর লুকিং টু মাচ প্রিটি ডিয়ার। মাশাল্লাহ।’
কথাটা বলেই কেয়া থামলো। গল্প লাজুক হাসলো। কেয়া আবারও বললো,
‘আমি বলেছিলাম না এই শাড়িতে তোমাকে খুব মানাবে! অবশ্য তোমার মতো কিউটি কে তো সবকিছুইতেই ভালো লাগে।’
তাদের কথার মধ্যেই ফাহিম তাড়া দিয়ে বলল,
‘বাকি কথা ট্রেনে বলিস বোন। এবার গাড়িতে উঠ, পাঁচ মিনিটেই ট্রেন ছাড়বে।’
তারপর আবারও কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে শুভ্রর দিকে একটা টিকেটের কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘শুভ্র এই নে তোদের কেবিনের টিকিট।’
শুভ্র ভ্রু কুচকে ফেললো। বলল,
‘কেবিনের টিকেট মানে? আমাদের সবার সিট একসঙ্গে না?’
কেয়া এগিয়ে এসে বলল,
‘নারে তর আর গল্পর জন্য আমাদের সাথে সিট বুকিং করতে মনে ছিলো না। তাই পরে একটা কেবিন বুক করে দিলাম। এখন ধর, চুপচাপ যা।’
গল্প মন খারাপ করে ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘কেবিন কেনো বুক করলে আপু? আমিতো ভেবেছিলাম সবাই একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে দিতে যাবো। অনেক মজা হতো তবে!’
কেয়া কিছু বলার আগেই আরাফ গল্পর কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
‘একদমই আমিও তো তাই ভেবেছিলাম কেয়া; তুমি কেনো আলাদা কেবিন… ’
আরাফের কথা শেষ হবার আগেই কেয়া তার কোমরে চিমটি কেটে চোখের ইশারায় শাসালো। আরাফ বউয়ের ওই চাহনিতে ঘাবড়াল। সে কি কিছু ভুল বলল নাকি? পাশ থেকে ফাহিম কেয়াকে আরেকটু খুঁচিয়ে বলে,
‘বিয়ের এতো দিনেও তুই এটাকে বলদ থেকে মানুষে ট্রান্সফার করতে পারলি না! তর জন্য দুঃখ হচ্ছে কেয়া।’
আরাফ চেতে উঠে বলল,
‘একদম আগুনে ঘি ঢালবি না শা লা। গল্প ভুলটা কোথায় বলেছে! আমিতো… ’
বাকি কথা শেষ হবার আগেই কেয়া তার অদৃশ্য হাত দিয়ে বারকয়েক কপাল চাপড়াল। তারপর আরাফের দিকে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলল,
‘শুভ্র-গল্প ওরা নিউলি ম্যারিড কাপল আরাফ। ওদের একটু আলাদা স্পেসের প্রয়োজন আছে, হু! আশা করি বুঝে এসেছে। এবার দয়া করে চুপ থাকো।’
আরাফ এবার বুঝতে পারল বিষয়টা। আসলে ও এতো তলিয়ে ভাবতে যায়নি তাই এমনটা বলেছিল।
কেয়া একটু এগিয়ে গল্পকে বলল,
‘আলাদা তো কি হয়েছে? বগি তো আলাদা না, ওটা একসঙ্গেই। আর এতো মুখ ভার করতে হবে না। আমরা সবাই প্রথমে তোমাদের কেবিনে আড্ডা দিব। তারপর যে যার সিটে যাব। হ্যাপি?’
গল্প হেসে দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝাল –সে খুব খুশি। তারপর সবাই একে একে ট্রেনে উঠলো। শুভ্ররা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত কেবিনে গেলো। মিনিট পনেরো পেরুলেও কেয়ারা কেউ এখনো আসছে না দেখে গল্প বারবার উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। শুভ্র গল্পর অস্থিরতা দেখে বলল,
‘রিল্যাক্স হও। ওরা আসবে যখন বলেছে; তখন নিশ্চয়ই আসবে।’
গল্প স্থির হলো। শুভ্র এবার প্রশ্ন ছুড়লো,
‘এই শাড়িটা তোমাকে কেয়া দিয়েছে?’
গল্প ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ। আপু দিয়েছে, ওইদিন কেয়া আপুর সাথে শপিংয়ে গিয়েছিলাম তখন দিল। আমাকে বলেওনি এটা আমার জন্য নিয়েছে, তারপর আসার সময় হুট করেই হাতে শপিং ব্যাগ টা ধরিয়ে দিয়ে বলে -এটা তোমার।’
শুভ্র ভ্রু কুচকে বললো,
‘তুমি কেয়ার সাথে মার্কেটে গিয়েছিলে? আমাকে তো বলো নি। কবে গিয়েছিলে?’
গল্প এবার ইতস্তত করে। শুভ্র কি রাগ করল, তাকে না জানানোতে? বলল,
‘যেদিন আপনি ট্যুরের কথা বললেন সেদিন বিকেলে। আর এর পরে আপনাকে জানানোর সময় হয়ে উঠেনি, তাই।’
শুভ্র গল্পর ইতস্তত দেখে হেসে ফেললো। বলল,
‘ওকে ওকে। আমি জাস্ট এমনই জানতে চাইছিলাম।’
ওদের কথার মধ্যেই কেবিনে হুড়মুড়িয়ে আরাফ-রা ডুকল। আরাফ শুরুতেই বিরক্ত নিয়ে বলল,
‘আর বলিস না, আরও আগেই এসে পড়তাম। কিন্তু ওই ফাজিল টিটির বাচ্চা নিমিয়ে নিমিয়ে এতো সময় নিয়ে টিকিট চেক করছে। উফফ…! ’
আরাফের কথায় গল্প হেসে ফেললো। কেয়া এসে গল্পর সামনা সামনি বসলো। এতোক্ষণের নিরব কেবিন টা মুহূর্তেই যেনো খিলখিলিয়ে উঠলো।
_____________________
ঘন্টাখানেক আড্ডার পর সবাই শুভ্রদের কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। ওরা চলে যেতেই কেবিন টা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো –শুনা যাচ্ছে শুধু ট্রেনের ঝকঝক শব্দ। শুভ্র জিজ্ঞেস করলো,
‘ক্ষুদা পেয়েছে? ট্রেনে আবার খাবারের ব্যবস্থা আছে, কিনে আনব কিছু?’
গল্প মাথা ঝাঁকিয়ে না করল। বলল,
‘সকালে খেয়ে এসেছি। আপনি চাইলে খেয়ে নিন।’
‘আমিও ব্রেকফাস্ট করে এসেছি।’
ব্যস এতটুকু কথাই তারপর আবার সব নিরব। শুভ্র দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে মন দিয়ে একটা ফাইল চেক করছে। গল্প বেশ বিরক্ত হলো। মানছে তারা ঘুরতে গেলেও মেইন পার্পস শুভ্রদের অফিসিয়াল কাজ। কিন্তু তাই বলে ট্রেনের মধ্যেও কি তাকে কাজে ডুবে থাকতে হবে? পাশে যে তার একটা বউ বসে আছে সে খেয়াল জনাবের নেই! আছে শুধু কাজের খেয়াল। গল্পর ইচ্ছে হলো শুভ্রর হাত থেকে ফাইলটা কেড়ে নিয়ে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে বলতে– এতো কিসের কাজ হ্য? পাশে বউ রেখে আপনি ফাইল নিয়ে কেনো পড়ে থাকবেন? এখন আমার সাথে গল্প করুন।
কথাগুলো বলা হয়না। তবে মনে মনে দুষ্ট হেসে মহাশয়কে ডিসট্রাব করতে চেয়ে কিছু একটা ফন্দি আঁটল। পরপরই ঘুমের হাই তুলতে তুলতে সিটের পিছনে মাথা এলিয়ে দেয়; দু’মিনিটের মাথায় গল্প মাথা সিট থেকে শুভ্রর কাঁধে এসে টেকে। শুভ্র তখনও ফাইল চেকিং করতেই ব্যস্ত হঠাৎ করেই তার ঘাড়ে ভারী কিছু একটা অনুভব করতেই পাশ ফিরে দেখে গল্প তার কাঁধে মাথা এলিয়ে ঘুমের আয়োজন করেছে। হাসল শুভ্র পরপরই চিন্তিত হয়ে গল্পর মাথাটা ঠিক করে তার কাঁধে রাখল। বাহিরের আবহাওয়া ঠান্ডা তাই বাতাসের ঝাপটাও বেশ শীতল। শুভ্র তার কোট টা গল্পর গায়ে জড়িয়ে দিলো যাতে ঠান্ডা না লাগে। ব্যাস সে আবারও তার কাজে মনোযোগ দিলো।
শুভ্রর এই যত্ন টুকু –সবটাই গল্প চোখ বন্ধ করে পরম আবেশে গ্রহণ করেছে। বলাবাহুল্য সে একদমই ঘুমায়নি। ঘুমের ভান ধরে নিজের মাথাটা শুভ্রর কাঁধে এলিয়ে ছিল শুধু, এই যাহ। উফফ…এই কাঁধ-টায় এতো শান্তি শান্তি ফিল হচ্ছে কেনো? তার চোখে তো এবার সত্যি সত্যিই ঘুমেরা হানা দিচ্ছে। আবার তার অবচেতন মনে ট্রেনের মৃদু মৃদু ঝাঁকিতে উত্তম-সুচিত্রার একটা গানও উঁকি দিচ্ছে–– এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলোতো?
গল্প লাইনটা দু-একবার মনে মনে গুনগুনিয়ে আওড়াল; তারপর কখন যে ঘুমে তলিয়ে গেল তা বুঝা গেলো না।
মিনিট দশেক পর শুভ্রর ফাইল চেকিং শেষ হয়। ততক্ষণে গল্প ঘুমিয়ে কাদা –আর গল্প মাথাটা শুভ্রর কাঁধ থেকে টাই করে নিয়েছে তার প্রশস্ত বুকে। জানালা দিয়ে বাতাসের বেশ বেগ আসছে। গল্পর মুখে তার চুলগুলো বাতাসের তোপে এলোমেলো হয়ে বারবার হুটোপুটি খাচ্ছে। শুভ্র তা দেখে হাসলো খানিক। পরপরই ওই শক্ত হাতের আলতো স্পর্শে চুলগুলো খুব যত্ন নিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিল।
শুভ্র নির্নিমেষ অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে রইলো গল্পর ঘুমন্ত মুখের দিকে। পরপরই খেয়াল করল গল্পর কপালে একটা ছোট কালো টিপ। শুভ্র ভ্রু কুচকে ফেললো। তারপর হুট করেই গল্পর কপাল থেকে ওই টিপটা তুলে ফেলে দিলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘এই কপালে টিপ মানায় না তাহিয়াত। আপনার কপাল শুধু দুটো কাজের জন্য –এক আল্লাহর সেজদা আর দুই –বরের ঠোঁটের স্পর্শ। ওহো! আপনার কপালে তো এখনো অব্দি আপনার বরের ঠোঁটের স্পর্শই পেলো না। ওয়েট…’
কথা গুলো আপন মনে বলেই শুভ্র পরম আবেশে গল্পর কপালে চুমু খেলো অনেক টা সময় নিয়ে। অথচ ঘুমন্ত গল্প কিছুই টের পেলো না। কেমন জানি আদুরে বিড়াল ছানার মতো শুভ্রর বুকে আরেকটু মুখটা দাবিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমালো। শুভ্র হেসে ফেললো তা দেখে। পরপরই গল্পর গায়ের কোট টা আরেকটু জড়িয়ে দিলো ভালো করে।
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৪
‘শুভ্র এ্যই ব্যাটা, আমাদের ট্রেন টা শ্রীমঙ্গলে এসে থেমেছে বিগত পাঁচ মিনিট আগে। তুই কি ট্রেনের কেবিনেই সংসার পাতার পায়তারা করছিস নাকি?’
ফাহিমের চেঁচামেচিতে কেয়া বিরক্ত হলো বটে। বলল,
‘তুই এমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেনো? ওরা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।’
দরজার বাহিরে ফাহিম আর কেয়ার কথার আওয়াজে শুভ্র সচকিত হয়ে উঠে। কাল রাত জেগে প্রজেক্টের কাজ করায় একটু ক্লান্ত বোধ করছিল; কেবিনের ভিতর আসা ফুরফুরে ঠান্ডা হওয়ায় তার চোখটা এইতো আধঘন্টা হবে লেগেছিলো একটু। আর এরিমধ্য তারা শ্রীমঙ্গলে পৌঁছেও গেলো! পাশ ফিরে দেখে গল্প এখনো ঘুমে বিভোর। শুভ্র যারপরনাই অবাক গল্পর ঘুমের এমন গতিবিধি দেখে। কেউ এতো ঘুমাতে পরে বুঝি? ওপাশ থেকে আবারও ফাহিমের গলার আওয়াজ আসে,
‘শুভ্র ভাই আমার, এবার নিদ্রা থেকে উঠ। বাকি ঘুম রিসোর্টে গিয়ে ঘুমাস।’
শুভ্র বিরক্ত হলো ওর বাদুড় বন্ধু গুলোর উপর। ওদিকে পাত্তা না দিয়ে গল্পকে আস্তে করে ডাকল এবার,
‘তাহিয়াত এ্যাই তাহিয়াত.. উঠো আমরা এসে গেছি তো।’
গল্প চোখ পিটপিট করে চাইল। নিজের মাথাটা কোথায় আছে বুঝতে দু সেকেন্ড সময় নিলো। পরপরই চোখ তুলে শুভ্রর দিকে চাইতেই সে হেসে বললো,
‘বাপরে তুমি এতো ঘুমাতে পারো, সেই কখন ঘুমিয়েছিলে আর এখনও উঠতে মন চাইছে না! এবার তো উঠতে হবে আমরা এসে গেছি।’
গল্প লাজুক হাসলো বলল,
‘আসলে আজকের ওয়েদারটা অনেক ঠান্ডা ছিলো তাছাড়া জার্নিতে ঘুমানো আমার হ্যাভিট।’
দরজার ওপাশ থেকে এবার আরাফের গলার আওয়াজ এলো,
‘এ্যই ভাই তরা জিন্দা আছিস কিনা বল আগে?’
গল্প বিস্ময় নিয়ে শুভ্রর দিকে তাকাতেই ও বলল,
‘চলো চলো নাহলে বাদড় গুলো এবার তান্ডব শুরু করবে। অবশ্য অলরেডি শুরু করেই দিয়েছে।’
শুভ্র লাগেজ হাতে নিয়ে সামনে এগুলো। গল্প তার পিছন পিছন বেরুলো। ওরা করিডোরে আসতেই ফাহিম টিপ্পনী কেটে বলল,
‘তরা যে জিন্দা আছিস এটা জেনে আমরা পুলকিত ভাই। এতো ডাকার পরও যখন সারা শব্দ দিচ্ছিলি না বিশ্বাস কর আমরা মারাত্মক ভয় পেয়েছিলাম। ভাবলাম অজ্ঞান পার্টি বুঝি তোদের কেবিনে ডুকে অজ্ঞান টজ্ঞান করে দিয়েছে নাকি!’
শুভ্র সরু চোখে তাকাল ফাহিমের দিকে। তবে কেয়া আরেকটু ফোড়ন কেটে বলল,
‘আহা শুভ্রর হুশ উড়াতে অজ্ঞান পার্টির প্রয়োজন নেই ফাহিম। তার হুশ উড়াতে একজনই যথেষ্ট আর সে- তো সাথেই ছিল। তাই-না গল্পওও!’
শেষ কথাটায় গল্পর দিকে চেয়ে কেয়া চোখ টিপল। গল্প লজ্জায় হাসফাস করে উঠলো। ইশশ কেয়া আপুটাও তার মজা নিচ্ছে এইভাবে। শুভ্র অসম্ভব ভ্রু কুচকে বললো,
‘সিরিয়াসলি তোরা জাস্ট আনবিলিভ্যাল। সবকটা ফাজিলের দল এবার বের হ ট্রেন থেকে।’
আর কেউ কিছু বলার আগে আরাফ হুড়মুড়িয়ে বলল,
‘হ্য ভাই বের হ তো; আমার খুব চা’ র তেষ্টা পেয়েছে। চায়ের রাজধানীতে এসে প্রথমে চা খাবো না, তা হয় নাকি!’
টানা কয়েক ঘন্টার জার্নিতে সবাই একটু কাহিল বটে। তাই তো ট্রেন ছেড়েই সবাই শরীর চাঙ্গা করতে চা খাওয়ার তোড়জোড় করলো। চা খাওয়ার পর এখন সবাই একটু সতেজ ফিল করছে। এরিমধ্যে একটি গাড়ি এসে থামলো শুভ্র জানে এই গাড়ি কে পাঠিয়েছে। মি. এরিক যার সাথে বিজনেস ঢিল করতে তারা ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলে এসেছে। সবাই গাড়িতে উঠলো গন্তব্য রিসোর্ট।
_____________________________
শুভ্ররা যে রিসোর্টে এসে উঠেছে সেটা একটা টিলার উপর। পড়ন্ত বিকেলে গল্প চারপাশ টা ঘুরে ঘুরে দেখছে; চারদিকে যেদিকেই তাকাচ্ছে শুধু সবুজের স্নিগ্ধতা। এমন সময় হঠাৎ করেই পিছন থেকে ‘ভৌ’ করে উঠাতে সে মৃদু চিৎকার করে করে দুকদম সামনে এগিয়ে যায়। বুকে হাত দিয়ে পিছন ঘুরতেই দেখে কেয়া খিলখিলিয়ে হাসছে। গল্পর বুকটা তখনও ধুকপুক করছিল বিধায় সে বুকে হাত দিয়ে থুথু ছিটাল। বলল,
‘ওহ কেয়া আপু আমি সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম। তোমরা তো দেখি সবাই অনেক দুষ্ট।’
কেয়া হাসলো একচোট। পরপরই বলল,
‘তুমি একা একা কেনো ঘুরছো? আমাকে ডাক দিতে!’
‘ভাবলাম তোমরা রেস্ট করছ। তাই আর ডাকিনি।এবার চলো একসাথে হাঁটি। রিসোর্টের চারপাশটা কি সুন্দর!’
গল্প কেয়ার সাথে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলো,
‘আরাফ ভাইয়া কোথায় আপু?’
‘ওরা তিনজনই তো প্রজেক্টের কাজ নিয়ে বসেছে। কাল আবার মিটিং কিনা তা-ই।’
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করবো আপু?’
কেয়া চোখ ছোট ছোট করে বলল,
‘এটা আবার পারমিশন নিতে হয়! একটা কেনো যতগুলো মন চায় জিজ্ঞেস করে ফেলো।’
গল্প একটু হাসলো। তারপর ইতস্তত করে বলল,
‘আরাফ ভাই আর তোমার বুঝি অনেক দিনের রিলেশনশীপ ছিলো? না মানে ট্রেনে বলছিল যে তোমাকে বারো বছর ধরে ভালোবাসে তা-ই একটু জানতে কৌতূহল হচ্ছিল।’
কেয়া হাসোজ্জল উত্তর দিলো,
‘এটা এতো হেজিটেট করে বলার কি আছে? আরাফ আমাকে বারো বছর ধরে ভালোবাসলেও আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল সবে তিন মাসের। এরপরই বিয়ে করে ফেলি।’
গল্প আবারও বললো,
‘আরাফ ভাই যদি বারো বছর ধরে তোমায় ভালোবেসে থাকে, তবে তোমাদের তিন মাসের প্রেম কিভাবে হয়! ’
কেয়া হাসতে হাসতে বলল,
‘আরাফ আমাকে স্কুল লাইফ থেকেই পছন্দ করতো। কিন্তু আমি ওকে পাত্তা দিতাম না; কারন স্বভাবে ছিল ও দারুণ দুষ্ট। ও এতো পরিমাণ দুষ্ট ছিলো যে বাসায় ওর নামে রেগুলার বিচার আসতো। পাশাপাশি বাসা হওয়াতে আমি সবটাই দেখেছি এর জন্য আঙ্কেলের কাছে মারও খেতো বেদম!’
এটুকু বলেই কেয়া শ্বাস ফেললো। গল্প অবাক হয়ে বলল,
‘ভাইয়া তোমাকে এতোদিন ধরে পছন্দ করতো আর তুমি পাত্তাই দিতে না!’
কেয়া আবারও হাসলো। বলল,
‘হ্য, কিন্তু কালক্রমে কিভাবে যেনো ওই বাঁদরটারই প্রেমে পড়ে গেলাম নিজেও জানি না। অবশ্য যেভাবে আটার মতো লেগে ছিলো প্রেমে না পড়ে উপায়ও ছিলো না।’
কেয়ার শেষ কথাটায় গল্প হেসে ফেললো। বলল,
‘আরাফ ভাই কিন্তু তোমাকে সত্যিই চোখে হারায় আপু। ট্রেনে দেখছিলাম যখন তুমি কথা বলছিলে ভাইয়া তখন এক ধ্যানে তোমাকে দেখছিল।’
কেয়া লাজুক হাসলো। তারপর কথা এড়াতে বলল,
‘হু হু জানি পাকা মেয়ে। এবার চলো ভিতরে যাই সন্ধ্যা নেমে আসছে এখন।’
গল্প মাথা দুলিয়ে ভিতরের দিকে পা বাড়ালো। আসলেই সন্ধ্যা হয়ে আসছে এখন।
_________________________
রাত বাজে সারে বারোটা। শ্রীমঙ্গলের আকাশে তখন মেঘেদের ঘনঘটা। গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজে আকাশ হাঁক ডাক করছে সাথে দু-একটা বজ্রপাতও হচ্ছে। বজ্রপাত গুলো সম্ভবত আশেপাশেই কোথাও একটা পড়ছে। বজ্রপাতের আওয়াজে গল্পর ঘুমটা ভেঙে গেলো। হকচকিয়ে উঠে বসলো। বরাবরই সে বজ্রপাতে মারাত্মক ভয় পায়; বিজলী চমকাতে দেখলেই মনে হয় এই বুঝি বজ্রপাতের একটা অগ্নিশিখা তার উপর পড়লো। শুভ্র তখনও তার পাশেই ল্যাপটপে বসে কাজ করছিল গল্পকে এভাবে আকস্মিক ঘুম ছেড়ে উঠতে দেখে ভ্রু কুচকাল। গল্প তখন শুভ্রর অনেক পাশ ঘেঁষে বসে আছে।
‘ভয় পেয়েছো? বজ্রপাতে ভয় হয়?’
গল্প উপরনিচ মাথা ঝাঁকাল। শুভ্র বুঝল –আচমকা গল্পর হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল,
‘ভয় নেই আমি পাশেই আছি। এইযে তোমার হাতটা আমার মুঠোয়– এইবার ঘুমাও সারাদিন অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছো। না ঘুমালে শরীর খারাপ করবে।’
গল্পর মন পুলকিত হলো শুভ্রর ছোট্ট একটা কথা, ছোট্ট একটা আশ্বাসে –আমি আছি। গল্পর ভীষণ সংকোচ হচ্ছিল শুভ্রর সাথে আজই প্রথম সে রুম শেয়ার করছে; শুধু রুম-ই না বেডও। তারপরও সংকোচতা দূরে টেলে শুভ্রর দিকে চেয়ে জানতে চাইল,
‘আর আপনি? আপনি ঘুমাবেন না? জার্নি তো আপনিও করেছেন।’
শুভ্র গল্পর চুল গুলো এক হাতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
‘আমি এসবে অভ্যস্ত গল্প। আমার কোনো প্রবলেম হয় না হাতের কাজটা শেষ করেই ঘুমাব। তুমি শুয়ে পড়ো।’
গল্প মাথা হেলিয়ে শুয়ে পড়লো। দৃষ্টি নিবদ্ধ শুভ্রর হাতে বন্দি তার হাতটার দিকে। যে হাতটা শুভ্র ধরে রেখেছে আস্থা হিসেবে যে বুঝাতে –এই বর্ষন মুখর রাতে বাহিরে যখন বজ্রপাতের আন্দোলন তখন গল্প একা নেই; তাকে অভয় দিয়ে হাতটা আগলে রাখার মতো তার একটা শুভ্র আছে।
এই চমৎকার বিষয় টা মাথায় নিয়েই সে নিশ্চিন্তে পাড়ি দিলো ঘুমের দেশে।
ঘুমের ঘোরে গল্পর শরীর থেকে কমফোর্টার টা সরে গেলে শুভ্রর চোখে পড়ে তা; কাজ থামিয়ে কমফোর্টার টেনে দেয় ভালো করে।
গল্পর ঘুম ভাঙে ভোরে। ভোর বেলাতে উঠে ফজরের নামাজ করা তার অভ্যাস –তাই সে যত রাতেই ঘুমাক না কেনো চোখ তার ভোরেই খোলে।
কিন্তু আজকের সকাল টা আর পাঁচ টা সকালের মতো না। ঘুম হালকা হতেই কারও ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ তার কানে আসে। চট করে চোখ মেলতেই দেখে শুভ্র, ইতিমধ্যে যে তার অনেকটা কাছাকাছি শুয়ে আছে। সরতে গিয়ে টের পেলো তার একটা হাত এখনো শুভ্রর হাতের মুঠোয়।
গল্প আজকাল শুভ্রর সবকিছুতেই মুগ্ধ হচ্ছে। এইযে শুভ্র ঘুমচ্ছে বাতাসে তার সিল্কি চুলগুলো কপালের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে –তাতে কি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। গল্প মুগ্ধ দৃষ্টিতে থাকিয়ে রইলো শুভ্রর ঘুমন্ত মুখের দিকে। শুভ্রর হাসিটা গল্পর সবচেয়ে প্রিয়। হাসলে কি সুন্দর তার গালে টোল পড়ে। তবে গল্প গতকাল ট্রেনে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করছে সেটা হলো –শুভ্র শুধু হাসলেই না বরং কথা বললেও তার তালে তালে গালের বা পাশটায় মৃদু ডেবে যায়। ইশশ কি কিউট লাগে তখন তার বর টাকে। ভেবেই গল্প লাজুক হাসলো।
আস্তে করে শুভ্রর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো।
হুট করেই সমস্ত সংকোচতা দূরে টেলে টুপ করে শুভ্রর গালে প্রথম বারের মতো চুমু খেলো। পরপরই ছুটে গেলো ওয়াশরুমে। দরজা টেলে বুকে হাত দিয়ে হাপড়ের মতো শ্বাস নিতে লাগলো। তার জীবনের প্রথম সে কোনো পুরুষকে চুমু খেলো সেই পুরুষটি তার তিন কবুল বলা বর। এর থেকে চমৎকার বিষয় আর কি-ই হতে পারে। গল্প ওয়াশরুমের আয়নায় তাকাতেই দেখে তার গাল গুলো লাল হয়ে গেছে –গালে হাত দিতেই বুঝল তা থেকে উত্তাপও বের হচ্ছে। গল্প বুঝতে পারছে ও শুভ্রর প্রতি দিন দিন মারাত্মক ভাবে ফল করছে।
এদিকে গল্প ওয়াশরুমে ডুকতেই শুভ্র চোখ মেলে চাইল। গল্পর ঠোঁট ছুঁয়ানো গালে হাত দিয়ে হেসে ফেললো। বিরবিরিয়ে বলল,
‘ইউ হ্যাভ অলরেডি মেইড মি গো ক্রেজি ফর ইউ। এখন কি এসব করে পুরোপুরি পাগল করার পায়তারা করা হচ্ছে আমাকে –মাই সুইট ওয়াইফি!’
#চলবে
