#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৯
তুশি হাঁটু মুড়ে বসে গল্পর শাড়ির কুঁচি টা ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
‘শাড়িটা কিন্তু জোশ বেইব। মানতেই হবে শুভ্র ভাইয়ের পছন্দ আছে। অবশ্য পছন্দ আছে বলেই না আমার বেস্টুকে পছন্দ করেছে।’
গল্প কিছু বললো না চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো; ঠোঁটের কোনে খানিকটা হাসিও এলো। তুশি কুঁচি ঠিক করে উঠে দাঁড়াল। গল্পর চুলটা সুন্দর করে মাঝখানে সিঁতি তুলে খোঁপা করে দিয়ে দু-সাইডে কিছু চুল কপালের দিকে এনে ফেললো। ইশ কি মিষ্টি দেখাচ্ছে গল্প টাকে। তুশি এবার মেকআপ করত চাইলে গল্প বাঁধা দিয়ে বলে,
‘মেকআপ করব না তুশি। আমার ভীষণ অকওয়ার্ড লাগছে। যেমন আছি তেমনি যাই।’
তুশি শুনলো না। গল্পকে টেনে ওর সিঙ্গেল বেড- টায় বসিয়ে ওকে ভেঙিয়ে বলল,
‘আমি মেকআপ করব না তুশি! কেনো করবি না শুনি? তোকে কি আমি ব্রাইডাল লুক দিব যে তুই সাজবি না?’
গল্প ইনোসেন্ট ফেস করে তুশি কে বলে,
‘তুশি প্লিজ না! আম…’
তুশি গল্পর কথা দুআনা পাত্তা না দিয়ে ওর মুখের ভিতর একটা সেন্টারফ্লুট পুরে দিয়ে বলল,
‘চুপ একদম চুপ। আমি তোকে শুধু হালকা টাচআপ দিব বেইব প্রমিজ। তুই একটু চুপটি করে বসে থাক শুধু।’
অবশেষে তুশির জেদের কাছে হার মেনে গল্প চুপচাপ বসে রইলো। তুশিকে আর বাঁধা দিলো না। কেননা এই মেয়ে তার নিষেধ শুনবে না।
কাল রাতে জাহানারা ফোন দিয়ে জানালো তার মা অর্থাৎ শুভ্রর নানি হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বয়সের তোপে পড়লে যা হয় আরকি। তিনি আবার এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আবদার করেছেন— শুভ্রর বউকে তিনি একবার দেখতে চান। নিজের শরীরের প্রতি নাকি তার ভরসা হচ্ছে না; কখন কি হয়ে যায় বলা যায় না। এমতাবস্থায় তিনি তার একমাত্র মেয়ের পুত্র বধূকে একবার চোখের দেখা দেখতে চান। আর তাই জাহানারা কাল রাতে গল্পকে কল করে পুরান ঢাকায় যাওয়ার জন্য বলে; শুভ্রর নানির বাড়ি আবার পুরান ঢাকা। গল্পকে ফোন করার আগেই তিনি নিলুফার আর ইমতিয়াজ সাহেবের থেকে পারমিশন নিয়েছেন। যেহেতু গল্পকে এখনো উঠিয়ে আনা হয়নি সেজন্য তিনি গল্পকে সঙ্গে করে নেওয়ার জন্য পারমিশন টা দরকারি মনে করেছেন। নিলুফার এবং ইমতিয়াজ দুজনেই খুশি মনে অনুমতি দিয়েছেন। জাহানারা কথায় গল্প একবাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিল। একজন বৃদ্ধ অসুস্থ মানুষ খায়েশ করেছে, গল্প অবশ্যই যাবে।
জাহানারা গল্পকে শাড়ি পড়ে যেতে বলেছেন। যেহেতু এই প্রথম নানা শ্বশুর বাড়িতে যাবে তাই একটা শাড়ি পড়ুক। আরও বলেছে সকাল সকাল তাদের বাড়ির গাড়ি গল্পর হোস্টেলের সামনে আসবে তাকে শুভ্রদের বাড়িতে নিতে; তারপর সেখান থেকে তারা পুরান ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিবে।
গল্পর ধ্যন ভাঙলো তুশির গলার আওয়াজে,
‘উমম…একদম পারফেক্ট। আয়নায় একবার নিজেকে দেখ; নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যাবি বেইব! শুভ্র ভাই তো আজ আহত হবে রে তোকে দেখে।’
বলেই চোখ টিপল তুশি। গল্প লজ্জা পেয়ে তুশির বাহুতে আঘাত করলো। এর মধ্যেই তার সেলফোন টা বেজে উঠলো; ড্রাইভার চাচার নাম্বার। মানে উনি এসে গেছে। গল্প পার্সটা আস্তে করে বাহিরে পা দিলো।
_________________
গল্প গাড়ি থেকে নামতেই জাহানারা তাকে ভীষণ আদরে জড়িয়ে নিলো; কপালে চুমু খেলো। গল্প আপ্লূত হলো শ্বাশুড়ি মা থেকে এতোটা ভালোবাসা পেয়ে। তারপর একবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে দেখে মুখে হাসি নিয়ে বললো,
‘মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে মা তোমাকে। শাড়ি টা বুঝি শুভ্রর পছন্দ করা!’
গল্প হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। জাহানারা হেসে বলল,
‘আমার ছেলের পছন্দ কিন্তু সুন্দর তাই-ন! আচ্ছা এখন ভিতরে আসো।’
বলেই জাহানারা নিজ হাতে ধরে গল্পকে নিয়ে বাড়ির ভিতর ডুকলো। গল্প আসবে দেখে জাহানারা আজ নিজ হাতে ছানার মিষ্টি বানিয়েছে সকালে। মিষ্টি আরও বিভিন্ন ফলমূল কেটে তার সামনে দিল। গল্প মিষ্টি খুব একটা খেতে পারে না তবুও একটা মিষ্টি খেলো; তা দেখে জাহানারা নিজ হাতে আরেকটা মিষ্টি আর দুটো আঙুর দিতেই গল্প না না করতে থাকে। জাহানারাও আর জোড় করেনি। গল্পকে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালেন; তারপর নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। জাহানারা গল্প কে পেয়ে দারুন আড্ডার আসর জমিয়েছে। গল্পও অল্প সময়ই তার সাথে সহজ হয়ে গেছে।
কথার ফাঁকে হুট করেই গল্পর চোখ যায়; জাহানারার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা একটা বেশ বড় চুড়ির স্ট্যান্ডের দিকে। উৎসুক হয়ে বলল,
‘ওয়াও আন্টি এতো চুড়ির কালেকশন! আপনার বুঝি চুড়ি অনেক পছন্দ?’
জাহানারা গল্পর দৃষ্টি অনুসরণ করে আয়নার স্ট্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলে,
‘হ্যাঁ মা। কিন্তু আমার থেকেও শুভ্রর বাবার বেশি পছন্দ। আর এই সবগুলোই শুভ্রর বাবার দেয়া। উনার রেশমি চুড়ি অনেক পছন্দ। যখনই চুড়ি কিনে আনতো বলতো— জাহান এই চুড়ি গুলো আসার সময় চোখে পড়লো; ভাবলাম তোমার হাতে বেশ মানাবে তাই নিয়ে আসলাম।’
এটুকু বলেই জাহানারা থামলো। তার ঠোঁটের কোনে লাজুক হাসিটা স্পষ্ট। গল্প তা দেখে নিজেও মিটিমিটি হাসছে আর ভাবছে শুভ্র তার মার থেকেই জেনেটিকলি সৌন্দর্য টা পেয়েছে হয়তো। কারন তার সামনে বসে থাকা রমনীটি অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী; যা আজই গল্প লক্ষ্য করলো। জাহানারা আবারও বলে,
‘জানো দুদিন পরপর এতো এতো চুড়ি আনার জন্য শুভ্রর বাবাকে আমি মাঝে মধ্যে বকাও দিতাম। তারপরও উনি তার শখের চুড়ি আনা কমান নি।’
বলেই হাসলো। তারপর হুট করেই উঠে গিয়ে চুড়ির স্ট্যান্ডটা বিছানায় নিয়ে আসলো। গল্পর শাড়ির সাথে মিলিয়ে তার খালি হাতে চকচকে মেরুন কালারের কাচের চুড়ি স্বযত্নে পড়িয়ে দিলো। গল্প অবাক হয়ে তা দেখল। জাহানারা মিষ্টি হেসে বললো,
‘বাহ্! তোমার হাতে কিন্তু চমৎকার লাগছে গল্প।’
গল্প ভীষণ খুশি হয়ে গেলো এটুকু যত্নে। আদুরে গলায় বললো,
‘আপনি অনেক সুইট আন্টি। থ্যাঙ্ক ইউ চুড়ি গুলো আসলেই সুন্দর।’
‘ধন্যবাদ চাই না। অন্য কিছু চাই!’
গল্প অবাক হয়ে বলল,
‘অন্য কিছু? কি?’
জাহানারা আদুরে ভঙ্গিতে গল্পর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘আমাকে মা বলে ডেকো। আমার তো কোনো মেয়ে নেই; কিন্তু এখন তো তুমি আছো। তুমিই নাহয় আমার মেয়ে হলে। ডাকবে আমাকে মা?’
এতো মিষ্টি করে কেউ মা ডাকার আবদার করে বুঝি! গল্প তো মুগ্ধ হয়ে গলে গেলো। আপ্লূত হয়ে বলল,
‘অবশ্যই ডাকব মা; মা।’
জাহানারা খুশিতে গল্পকে জড়িয়ে ধরলো। তাদের কথোপকথনের মধ্যেই শুভ্রর গলার আওয়াজ এলো,
‘আম্মু আমার ঘরে একটা কফি পাঠাও তো। আর তুমি কি রেডি হয়েছো? আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোবে কিন্তু।’
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুভ্র কথাগুলো বললো। সে আধঘন্টার জন্য একটু জরুরি কাজে বের হয়েছিল। আজ আবার মাকে নিয়ে পুরান ঢাকায় মামার বাসায় যেতে হবে; তাই আজ আর অফিসে যায় নি।
জাহানারা ছেলের জন্য কফি বানিয়ে কৌশলে গল্পকে বলল,
‘গল্প মা শুভ্রর ঘরে একটু কফিটা দিয়ে আসো তো। আমি মাত্রই সিঁড়ি বেয়ে উঠানামা করলাম; এখন আবার উঠানামা করলে হাঁটুতে ব্যাথা এসে যাবে। ওইযে উপরে বাম পাশের প্রথম ঘরটাই শুভ্রর। যাওনা না মা।’
গল্প ইতস্তত ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে কাপটা নিলো। তীব্র অস্বস্তিতে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে। এদিকে জাহানারা বেশ আমোদিত। শুভ্র আজ ভালোই সারপ্রাইজড হবে; কেননা গল্পর এখানে আসার কথা শুভ্র জানে না। ইচ্ছে করেই তিনি পুরো ব্যাপারটা শুভ্রর থেকে চেপে গেছেন, এমন একটা সারপ্রাইজ দিবে বলে। জাহানারা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো তাকে এখনই তৈরি হতে হবে।
গল্প শুভ্রর ঘরের সামনে এসে জড়সড় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে ঘরে ডুকতে। কিন্তু যেতেও হবে এছাড়া তো উপায়ও নেই। কফিটা তো ক্রমশ ঠান্ডা হচ্ছে। সে বুকে হাত রেখে লম্বা শ্বাস নিয়ে দরজায় নক করলো। ওপাশ থেকে গমগমে গলায় উত্তর এলো,
‘কাম ইন।’
গল্প দরজাটা হালকা ফাঁক করে উঁকি দিতেই দেখে শুভ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আছড়াচ্ছে। সে ধীর পায়ে ঘরে ডুকল। শুভ্র তখনো আয়নায় ধ্যান দিয়ে চুল ঠিক করছে হুট করেই তার চোখ যায় আয়নার কোনে একটা প্রতিবিম্বতে। যেখানে শাড়ি পড়া একটি মেয়ে মাথা নিচু করে কাপ হাতে দাঁড়িয়ে। মাথাটা নামিয়ে রাখার কারনে মুখটা ঠিক বুঝা গেলো না। শুভ্র কৌতুহল নিয়ে পিছনে থাকায় কারন শাড়ি টা তার খুব চেনা চেনা লাগছে।
পিছনে ঘুরতেই শুভ্রর দৃষ্টি স্থির হয়ে এলো। গল্প! গল্প আজ তাদের বাসায় আসবে কই মা তো তাকে কিছু বলেনি! গল্প ততক্ষণে চোখ তুলে চাইলো। ওই এক দৃষ্টিতেই শুভ্রর হৃদয় থমকালো যেনো। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল— মাশাল্লাহ।
শুভ্রর বলা কথা গল্পর কান অব্দি যায় নি। সে শুভ্রর দিকে কফির মগ টা বাড়িয়ে দিয়ে ইতিউতি করে বলল,
‘আন… না মা পাঠিয়েছেন। নিন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
শুভ্র হাত বাড়িয়ে কফির মগ টা নিলো। বলল,
‘থ্যাঙ্কস। আপনি আসবেন আমাকে বলেননি তো?’
গল্প শাড়ির আঁচল কুটিয়ে কুটিয়ে বলে,
‘আমি জানতাম না আপনি যে জানেন না। মা আপনাকে বলেনি?’
‘না তো। বোধ হয় সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো। এন্ড আমি আসলেই মারাত্মক সারপ্রাইজড হয়েছি কিন্তু আপনাকে এখানে দেখে।’
গল্প ঘরটা দেখল ভালো করে। পুরো ঘরটাই শুভ্রতায় ঘেরা এমনকি মেঝেটাও সাদা। ঘরের আসবাব বেশির ভাগই সাদা। সাদা রাঙ টা বুঝি শুভ্রর খুব পছন্দ? তাই হবে হয়তো। নাহলে তো পুরো ঘর কেউ সাদা ডেকোরেট করে না। অবশ্য এটা অন্য রকম একটা শান্তি দিচ্ছে আর রুমটা বেশ বড়োও আছে। হুট করেই তার চোখ যায় শুভ্রর বেডসাইডে রাখা ছোট্ট টেবিলটার দিকে। সেখানে তার আর শুভ্রর বিয়ের দিনের একটা ছবি ছোট ফ্রেমে বাঁধানো। ছবিটা যখন আয়না দেখানো হচ্ছিল তখনকার; তাও আবার যখন তারা একে-অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলো। শুভ্রর ঠোঁটে হাসি গল্পর চোখ দুটোতে যেনো মুগ্ধতা। বাহ ছবিটা তো দারুণ। শুভ্র গল্পর দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল,
‘ছবিটা সুন্দর, তাই-না?’
গল্প তখনও মনোযোগ দিয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে। বেখেয়ালেই বলল,
‘একটু বেশিই সুন্দর।’
শুভ্র হেসে ফেললো। গল্পর ধ্যান ভাঙে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে লজ্জাও পেলো খানিকটা। শুভ্র আবারও বলল,
‘আসলেই একটু বেশিই সুন্দর। আর আমাদের ঘরটা? ঘরটা পছন্দ হয়েছে?’
“আমাদের ঘর” কথাটা গল্পর কানে বাজলো ভীষণ। এটা তার আর শুভ্রর ঘর? হ্যাঁ তাই তো। বিয়ের পর তো এটা তারও ঘর হবে। কিছুক্ষন চুপচাপ থেকে বলল,
‘ঘরটাও সুন্দর। আমি এবার যাই, মা ডাকবে হয়তো!’
বলেই গল্প উল্টো দিকে পা বাড়াতে নিলে শুভ্র তার হাতটা ধরে অনেকটা নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসে। গল্প বিস্ময় নিয়ে তাকালো শুভ্রর এমন কান্ডে। শুভ্র তা দেখে মুচকি হাসলো। গল্প এই প্রথম লক্ষ্য করলো শুভ্র হাসলে গালে একটা দারুণ গর্ত হয় যেটাকে বলা হয় ডিম্পল। এটা তো সে এতোদিন খেয়ালই করেনি। শুভ্র হুট করেই বলে উঠে,
‘আম্মু এখন কিছুতেই আপনাকে ডাকবে না তাহিয়াত। উনি জানেন তার পুত্র-বধূ ও পুত্র এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ আলাপে বিজি।’
গুরুত্বপূর্ণ আলাপ? কই তারা তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাই করছে না। তবে? শুভ্র তাকে পুরোপুরি পরখ করে দেখে বলল,
‘ইউ লুক সো প্রিটি তাহিয়াত। ইউ নো হোয়াট; শাড়িতে আপনাকে ভীষণ আবেদনময়ী লাগে!’
শুভ্রর এটুকু কথাতেই গল্পর নিশ্বাস আটকে আসছে। হার্টবিট বাড়ছে। শুভ্রর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হলো। বাহিরে আসতেই থামলো। বুকের বা পাশে হাত দিয়ে হার্টের গতিবিধি বুঝার ট্রাই করলো। নাহ! হার্টবিট এতো দ্রুত ফাস্ট হচ্ছে কেনো? উফফ… অসহ্য তো বিষয় টা। তার ধ্যান ধারনার মধ্যেই পিছন থেকে শুভ্রর গলায় আওয়াজ এলো,
‘আপনি কি সিক ফিল করছেন তাহিয়াত? আমি কি আপনাকে নিচ অব্দি যেতে হেল্প করবো?’
গল্প বিস্ময় নিয়ে তাকাল শুভ্রর দিকে। পরক্ষণেই যখন তার ঠোঁটের কোনে হাসিটা দেখলো বুঝে গেলো শুভ্র তার সাথে মজা করলো। ধুর…বলেই আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না সেখানে। ত্রস্ত পায়ে নিচে নামলো। পিছন থেকে ভেসে আসলো শুভ্রর হাসির আওয়াজ!!
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১০
পুরান ঢাকার পুষ্প কুঞ্জ ভিলা টিতে আজ উৎসব উৎসব আমেজে মুখরিত। শুভ্র রা তার মামার বাড়িতে এসেছে এই ঘন্টাখানেক হবে। আর এই কিছু সময়েই বাড়িতে যেনো একপ্রকার হুলস্থুল শুরু হয়ে গেছে; হবে না! বাড়িতে যে এই প্রথম তাদের আদরের ভাগ্নে বউ নিয়ে এলো! শুভ্রর দুজন মামা-মামি চারজন মামাতো ভাইবোন; এই নিয়েই তার নানার বাড়ি। জাহানারা তাদের একমাত্র বোন হওয়াতে আদর ভালোবাসা টা যেনো একটু বেশিই পায়।
শুভ্রর নানি জুলফা বেগম মেয়ে-নাতি আর নাতবউ কে দেখে যেনো অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেছেন। ছেলের বউদের একটু পরপর এটা ওটা খাবার দিতে বলছেন। শুভ্রর মামিরাও তাদের যত্ন আত্নীর কোনোরকম খামতি রাখছেন না। গল্প চুপচাপ বসে আছে জুলফা বেগমের কাছে, তাকে ঘিরে আবার শুভ্রর কাজিন গুলো বসে আছে; জাহানারা ওদিকে রান্নাঘরে ভাবিদের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল হয়েছেন। জুলফা বেগম তার এতো সুন্দর নাতির এমন পুতুল পুতুল বউ দেখে আনন্দে আটখান। গল্পকে তার ভারী মনে ধরেছে কি মিষ্টি মুখখানা! নানি শুভ্রকে উদ্দেশ্য করে মজার স্বরে বললো,
‘নানুভাই সুন্দরী বউ পেয়ে এখন তো দেখি এই বুড়ো আমি টার কথা ভুলেই গেলে? একটা কল ও তো দাও না! সারাদিন কি বউয়ের সঙ্গেই প্রেম আলাপ চলে নাকি, হুম?’
গল্প আশ্চর্য হলো ভীষণ। শুভ্র তার সাথে সারাদিন ফোনে প্রেমালাপ চালায় কথাটা নিতান্তই হাস্যকর। কারন জনাব এতো বিজি যে রাতে একবার ফোন দিয়ে শুধু হালচাল জিজ্ঞেস করে রেখে দেয়; প্রয়োজনের বাইরে দু-একটা কথা হয় শুধু এইযা! শুভ্র হেসে নানির হাত মুঠোয় নিয়ে বললো,
‘ইটস নট ফেয়ার নানিজান! আমি কিন্তু রোজ ফোন দিয়ে তোমার খবর নেই। গত দুদিন অসুস্থ ছিলে বলে তোমার সাথে আলাদা করে কথা বলতে পারিনি; কিন্তু মামাদের থেকে ঠিকই তোমার খুঁজ নিয়েছি।’
জুলফা বেগম হেসে ফেললেন। বললেন,
‘তোমার মামারা বলেছে আমাকে নানু ভাই। আমি মজা করছিলাম তোমার সাথে। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি তোমার উপর অভিমান করেছি নানু ভাই! ’
‘তাই? তা শুনি কি বিষয় নিয়ে আমার জান আমার উপর অভিমান করেছে? বলুন এই অধমকে!’
‘তুমি এতো দিনেও তোমার পুতুল পুতুল বউ টাকে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে না কেনো? এ- তো ভারী অন্যায়!’
কথাটা বলেই জুলফা বেগম গাল ফুলাল। শুভ্র নানির বাচ্চামো দেখে হেসে ফেললো। তবে মুখটা সিরিয়াস ভঙ্গি করে বলল,
‘আসলেই অন্যায় করেছি নানি জান। কিন্তু তুমি তো জানোই আমার কাজের কতো চাপ! আর তাছাড়া তাহিয়াতেরও পরীক্ষা ছিলো এই কয়দিন। তাহিয়াত বলুন আমি ঠিক বলছি তো?’
গল্প মাথা দুলিয়ে বুঝায় হ্যাঁ। কিন্তু তার আগেই জুলফা বেগম আশ্চর্য হয়ে বলে উঠে,
‘একি নানু ভাই; তোমরা একে অপরকে আপনি- আজ্ঞে করো?’
গল্প লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। ইস! লোকটাকে সবার সামনেই কেনো এমন সম্বোধন করতে হবে? সবাই কি ভাবছে কে জানে! তবে তার চিন্তা ভাবনাকে দূরে ঠেলে দিয়ে জুলফা বেগম বলে উঠলো,
‘তোমার নানা ভাইও কিন্তু বিয়ের পরপর আমাকে বেশ অনেকদিন আপনি আজ্ঞে করতো। আমার চেয়ে বয়সে কতো বড়ো হয়েও আপনি আপনি করাতে আমার কি যে লজ্জা লাগতো! শেষমেশ আমি অনেক বলে কয়ে উনাকে তুমিতে আনালাম। কিন্তু তোমাদের আপনি-আজ্ঞে শুনে তোমার নানা ভাইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো।’
তাদের মধ্যে থেকে ইশিতা বলে উঠলো,
‘হিস্ট্রি রিপিট দাদিমা। আগের আমলে তুমি আর দাদা একে-অপরকে আপনি-আজ্ঞে করতে আর এই আমলে শুভ্র ভাই আর ভাবি! ব্যাপারটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং সঙ্গে সুইটও ভীষণ।’
বেশ অনেকক্ষণ নানি নাতনিদের এমন আড্ডা চলার পর সবাই ঠিক করলো ছাদে যাবে। হলোও তাই। গল্পকে ইশিতা আর ইমামা দুজন বগলদাবা করে ছাদে নিয়ে চললো। ইশান এর জোরাজুরিতে শুভ্রও ছাদে গেলো তাদের সাথে।
বিশাল বড়ো ছাদ টা গল্প ঘুরে ঘুরে দেখছে। ছাদটা বেশ, চারিদিকে গাছগাছালি ভরপুর এক অন্যরকম স্নিগ্ধতা দিচ্ছে। ভাবি হিসেবে গল্পকে ইশিতা আর ইমামার দুজনেরই দারুণ পছন্দ হয়েছে। কি মিষ্টি শুভ্র ভাইয়ের বউটা! তারা গল্পর সাথে নানান আলাপ জুড়েছে দুজনেই এবার সবে কলেজে উঠেছে। শুভ্র ছাদের এক কার্নিশে হেলানে দাঁড়িয়ে আছে; দৃষ্টি আড্ডায় মশগুল গল্পর দিকে নিবদ্ধ। মেয়েটা একদম সহজেই মিশে যেতে পারে সবার সাথে; শুধু শুভ্রর সাথেই চোখে চোখ মিলাতেই যেনো তার যতো সমস্যা। তবে শুভ্র ধৈর্যবান সে তার বউকে একটু সময় দিলো বৈকি নিজের প্রতি সহজ হতে; বলাবাহুল্য গল্প এখন শুভ্রর প্রতি অনেকটাই ঝুঁকেছে সেটা গল্প না বললেও শুভ্র বুঝতে পারে।
__________________
ছাদ থেকে নামার সময় গল্প একটা বিপত্তি বাঁধাল বৈকি। জাহানারা যখন নিচ থেকে খবর পাঠাল ভিতরে যাওয়ার জন্য, খাবার রেডি তাই। সবাই দ্রুতই নিচে নামলো। গল্প শাড়ি পড়ে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো নিচের দিকে তার পিছনে আবার শুভ্র। কিন্তু তখনই বাঁধল বিপত্তি টা গল্প হুট করেই শাড়িতে পা বাজিয়ে পড়ে যেতে নিলে রেলিঙ ধরে নিজেকে সামলাতে চেয়েও পারলো না। চোখ খিঁচে ফেললো কিন্তু তার আগেই একটা বলিষ্ঠ হাত গল্পকে আঁকড়ে ধরে। গল্প ভয়ে তখনও চোখ খিঁচে রেখেছে। তার হুঁশ আসে শুভ্রর গলার আওয়াজে,
‘উফফ… এতো বেখেয়ালি তাড়াহুড়ো করার কি দরকার ছিলো তাহিয়াত? এখনই তো একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতো!’
গল্প যখন বুঝতে পারলো সে সেইভড আছে তখন আস্তে ধীরে চোখ খুলল। দেখলো তার পেট ডিঙিয়ে মেদহীন উম্মুক্ত কোমর আগলে রেখেছে শুভ্রর একটা হাত। বিষয়টি গল্পর বুঝে আসতেই সে নড়েচড়ে উঠলো। শুভ্রও তখন গল্পকে ঠিক ভাবে দাঁড় করিয়ে সরে দাঁড়ালো। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় দুজনেই অপ্রস্তুত হলো। তবে শুভ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘একটু সামলে চলবেন তাহিয়াত। এতো তাড়াহুড়ো করার মতো কিছু নেই, এবার চলুন। ’
গল্প মাথা দুলিয়ে সামন পা বাড়াতেই বুঝতে পারলো ইতিমধ্যে আরেকটি অঘটন ঘটে গেছে। তার শাড়ির কুঁচি গুলো ঢিলে হয়ে অনেক টা নিচের দিকে নেমে গেছে; যা দু’কদম আগাতেই হয়তো পুরোপুরি খুলে যেতে পারে। বিষয়টা নিয়ে গল্পর এতো মেজাজ খারাপ হলো! গল্পকে এভাবে হুট করেই থেমে যেতে দেখে শুভ্র তার দিকে ফিরে জানতে চাইল,
‘কি হয়েছে? থামলেন যে; কোনো সমস্যা আবার?’
গল্প ইতস্তত করল তবে না বলেও কোনো উপায় দেখলো না। কারন কুঁচি টা যদি পুরোপুরি খুলে যায় তবে তো আরও বিপদ।
‘আসলে শাড়ির কুঁচি টা এলোমেলো হয়ে গেছে আর কিছু টা ঢিলেও হয়ে গেছে। এখন ঠিক না করলে হয়তো…’
বাকিটা আর বলল না গল্প। শুভ্র বুঝে নিলো বলল,
‘ঠিক আছে, আমি দাঁড়াচ্ছি আপনি ঠিক করুন।’
গল্প শাড়ি সামলাতে খুব একটা পটু নয়। সে আনাড়ি হাতেই নিচের দিকে ঝুঁকে কুঁচি গুলো ঠিক করতে লাগলো কিন্তু এতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে। কেউ একটা থাকলে ভালো হতো; তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই দেখলো শুভ্র হাঁটু মুড়ে তার সামনে বসেছে। গল্প অবাক হয়ে থাকাতেই শুভ্র সহজ গলায় বলল,
‘আমি হেল্প করছি। এভাবে ঠিক করলে সারাদিন সিঁড়িতেই থাকতে হবে।’
গল্প কেনো জানি একটু খুশিই হলো ব্যাপারটাতে। শুভ্র ঠোঁট চেপে একটার পর একটা শাড়ির কুঁচি খুব সুন্দর ভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে আর গল্প কুঁচির উপরের দিকটায় ধরে আছে। সে মনোযোগ দিয়ে শুভ্রকে তার শাড়ির কুঁচি ধরার দৃশ্য টা দেখছে। গল্পর হুট করেই মনে হলো; এই মুহূর্তে সে তার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য গুলোর একটি দেখছে!
‘নিন এবার কুঁচি টা এবার ভালো করে গুঁজে নিন।’
শুভ্রর কথায় গল্পর সম্বিত ফিরে। দ্রুত চোখ সরিয়ে কুঁচি টা ভালো করে সামলে নিলো। তারপর নিচের দিকে পা বাড়াতেই বুঝতে পারলো তার হাতটা কারও হাতের মুঠোয় বন্দী। শুভ্রর দিকে তাকাতেই সে বলে,
‘আপনাকে আমার ভরসা হচ্ছে না তাহিয়াত। আবারও শাড়ি বেজে পরে যেতে পারেন। তাই এবার আর রিস্ক নিচ্ছি না একদম আমার হাত ছাড়বেন না। পায়ে পা মিলিয়ে চলুন।’
গল্প মুগ্ধ হলো শুভ্রর এটুকু খেয়ালে। অতঃপর শুভ্রর হাতেই হাত রেখে আর পায়ে পা মিলিয়ে নিচে এগুলো।
ডাইনিং টেবিলে এতো এতো খাবার দেখে গল্পর চোখ চড়কগাছ। টেবিলে রয়েছে পুরান ঢাকার ঐতহ্যবাহী সব বিখ্যাত বিখ্যাত খাবার। শুভ্রর মামিরা গল্পর পাতে একের পর এক খাবার তুলেই দিচ্ছে। গল্প মানা করছে কিন্তু তারা শুনছেই না; এমতাবস্থায় সে শুভ্রর দিকে অসহায় চোখে তাকাল। কিন্তু শুভ্রও তা পাত্তা দিলো না সে নিজের মতো খেয়ে যাচ্ছে। গল্পর রাগ হলো শুভ্রর প্রতি। উপায় না পেয়ে আস্তে ধীরে খেতে লাগলো। তবে জাহানারা ভাবিদের মানা করে বলল,
‘ওকে আর এতো দিয়েন না ভাবি। বেশি খেতে পারবে না।’
গল্প তৃপ্তির হাসি হাসলো শ্বাশুড়ি মার উপর।
শুভ্ররা সন্ধ্যা নামার আগে বেড়িয়ে পড়ার তোড়জোড় করলো। সবাই এতো সেধেও কোনো লাভ হলো না; কারন শুভ্রর কাল সকালেই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে আজ বসায় গিয়ে তার ফাইল রেডি করতে হবে। তাছাড়া গল্পরও কাল ভার্সিটি আছে। তাই পরে আর কেউ জোড়াজুড়ি করেনি। তবে গল্প তার মামা শ্বশুর বাড়ি থেকে এতো এতো গিফট পেয়েছে। জুলফা বেগম গল্পর হাতে এক জোড়া স্বর্নের বালা পড়িয়ে দিয়েছেন যা তিনি শুভ্রর বউয়ের জন্য আলাদা করে রেখেছিলেন। শুভ্রর মামা-মামীরাও অনেক গিফট দিয়েছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে তারা বেড়িয়ে পড়ে।
________________________
ভার্সিটি শেষে গল্প তার এক ফ্রেন্ডের ফোন কল পেয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসে সাথে অবশ্য তুশিও আছে। তাদেরকে ভিতরে আসতে দেখেই সূর্য দৌড়ে গেলো তাদের কাছে। গল্প আগেই তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বললো,
‘তুই ক্লাস মিস দিয়ে এই রেস্টুরেন্টে কি করছিস? জানিস আজ স্যার কতো ইম্পর্ট্যান্ট টপিক পড়িয়েছে!’
সূর্য ওসবের দ্বার ধারল না বলল,
‘ওটা তদের থেকে নোট করে নিব পরে। কিন্তু এখন এক জটিল সমস্যায় আছি দোস্ত, হেল্প কর।’
তুশি ভ্রু কুচকে বললো,
‘তা তর সেই জটিল সমস্যা টা কি ভাই বল শুনি। যার জন্য তুই ক্লাস মিস দিয়ে রেস্টুরেন্টে এসির হাওয়া খাচ্ছিস!’
গল্প ওড়নার কোনা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল,
‘সব পরে শুনব আগে আমাকে ঠান্ডা কিছু খাওয়া ভাই। যে কাঠফটা রোদের মধ্যে এলাম; পরে দেখা যাবে তর জটিল সমস্যা শুনার আগেই হয়ত আমিই জটিল রোগী সেজে চিৎপটাং হয়ে যাবো।’
গল্প আর তুশি আইসক্রিম খেতে খেতে সূর্যর কথা শুনল। ওর কথা শুনে দুজনেই হাসছে। তুশি হাসতে হাসতে বলল,
‘সিরিয়াসলি ভাই! তুই পূজাকে ফাইনালি প্রপোজ করবি আজ? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।’
সূর্য মুখ বেজার করে বলল,
‘তুশির বাচ্চা এমন ভ্যা ভ্যা করে হাসবি না তো! আমার এমনেতেই টেনশন হচ্ছে। ও এক্সপেক্ট করবে তো?’
গল্প জোর গলায় বলে,
‘আলবাত করবে। আমি দেখেছি, পূজা মেয়েটা সুযোগ পেলেই তর কথা ইনিয়ে বিনিয়ে জিজ্ঞেস করে। আজও তো করল। তাই-না তুশি?’
তুশি সেসব কথায় না গিয়ে বলল,
‘কিন্তু কথা হলো তুই এখন আমাদের এখানে কেনো ডেকেছিস? তুই প্রপোজ করবি আর পূজা তোকে রিজেক্ট করবে সেটার ভিডিও করার জন্য?’
সূর্য তীর্যক গলায় বলল,
‘এ্যাই তর মুখে কি ভালো কথা আসে না? সারাক্ষণ চট্যাং চট্যাং কথা বলিস! আন্টি নিশ্চয় তোকে জন্মের সময় মুখে মধু দেয়নি।’
তুশি আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই গল্প দুজনকে ধমক দিয়ে বললো,
‘তদের টম এন্ড জেরির সিরিজটা এখন স্টপ করবি? নাহলে তরা দুটো ঝগড়া কর আমি চলে যাই।’
গল্পর ধমক কাজে এলো। দুজনেই চুপ হলো। এর মধ্যে তুশি হুট করেই বলে,
‘এ্যাই সূর্য তুই যে পূজাকে প্রপোজ করবি তার একটা ডেমো দেখা তো!’
সূর্য অবাক হয়ে বলল,
‘ডেমো দেখাব মানে? এট কি মুভি যে তোকে ছোট্ট একটা ডেমো বা ট্রেলার দেখাব?’
‘আহা তুই বুঝতে পারছিস না আমার কথা। ধর তুই পূজার সামনে গেলি কিন্তু হুট করেই সব গুগলেট করে ঘেটে দিলি। মানে নার্ভাসনেসে আসল কথাটাই বলতে পারলি না। এটা যেনো না হয় তার জন্য আগে থেকে তুই একটু প্রেকটিস করলি আরকি হে হে….!’
‘আচ্ছা আমি তবে তোকে এই ডেমো টা দেখাব কাকে দিয়ে? মানে এ্যাজ এ্যা পূজা হিসেবে কে দাঁড়াবে আমার সামনে? তুই? তাহলে শুন, তোকে আমি জীবনেও পূজা মনে করে কিছু বলতে পারব না। তুই যা…. ’
সূর্যর কথা শেষ হওয়ার আগেই তুশি চেতে উঠে বলে,
‘আহারে আসছে আমার সালমান খান! তর সামনে আমি দাঁড়ালে তো? গল্পকে কর।’
গল্প যেনো বিষম খেলো। বিস্ময় নিয়ে বললো,
‘সিরিয়াসলি আমাকে?’
‘প্লিজ বেইব না করিস না। আমি দেখতে চাই এই গবেট টা কীভাবে পূজাকে ইমপ্রেস করে! তুই শুধু তার সামনে দাঁড়া, ব্যাস।’
তুশির গলায় অনুনয়। গল্পও আর মানা করলো না। চেয়ার ছেড়ে উঠে সামনে দাঁড়াল। সূর্য গোলাপের তোড়া টা হাতে নিয়ে গল্পর সামনে দাঁড়িয়ে তা বাড়িয়ে দিয়ে কিছু বলার আগেই তুশি আবারও চেঁচাল,
‘সূর্য তোকে কি আর আমি এমনে গবেট বলি! এভাবে কেনো? মনে হচ্ছে ঝালমুড়ি সাধছিস। হাঁটু মুড়ে বস গাদা।’
সূর্য তাই করল। হাঁটু মুড়ে বসে গল্পর দিকে লাল গোলাপ গুলো এগিয়ে দিয়ে বড় একটা দম নিয়ে বললো,
‘অ্যাই লাভ ইউ পূজা। উইল ইউ ম্যারি মি?’
তার কথা শেষ হতেই গল্প আর তুশি একে-অপরের দিকে তাকিয়ে পরপর হু হা করে হেসে ফেললো। গল্প হাসতে হাসতেই সূর্যের থেকে ফুল গুলো নিলো। ওদের হাসি দেখে সূর্য বিরক্ত হলো। বলল,
‘থামবি তরা এখানে হাসার কি হলো? আশ্চর্য! ’
তুশি হাসি থামিয়ে কোনোমতে বললো,
‘তুই এতো ফাস্ট? এখনই বিয়ের প্রপোজাল দিয়ে দিবি? গুডড!’
বলেই আবার হাসল। তাদের হাসি ঠাট্টার মধ্যেই গল্পর সেলফোনটা স্ব শব্দে বেজে উঠলো। গল্প ফোন হাতে নিতেই দেখে স্কিনে শুভ্রর নাম ভাসছে। এই সময়ে শুভ্রর কল দেখে গল্প কিঞ্চিত অবাকও হলো। ফোন কানে নিতেই ওপাশ থেকে গমগমে গলা ভেসে আসলো,
‘আপনি যে রেস্টুরেন্টে আছেন তার ঠিক সামনে রাস্তার অপজিটেই আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দু’মিনিটে আসুন। ’
গল্পকে কোনোরূপ কথা বলার সুযোগ না দিয়েই শুভ্র কল টা ডিসকানেকট করে। গল্প বেশ অবাকই হয়েছে এতে। হঠাৎ এতো জরুরি তলব-ই বা কেনো? তবে বেশি না ভেবে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তুশি আর সূর্যকে কিছু একটা বলেই বেড়িয়ে যেতে নিলে; সূর্য পিছন থেকে হাঁক ছাড়ে,
‘আরে তুই ফুল গুলো তো রেখে যা! এ্যাই গল্প?’
গল্প সামনে এগুতে এগুতেই পিছন ফিরে বলল,
‘এগুলো বাসি হয়ে গেছে সূর্য। তুই কি বাসি ফুল দিয়ে পূজাকে প্রপোজ করবি নাকি? তাহলে কিন্তু ও আর পটবে না। যা ফ্রেশ ফুল কিনে আন, এগুলো এখন আমার।’
কথাটা বলেই গল্প রেস্টুরেন্টের কাচের দরজা টা টেলে বেড়িয়ে গেলো। সূর্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকে এখন আবারও ফুল আনতে যেতে হবে! সকাল সকাল এই লাল টকটকে গোলাপ গুলো জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাকে। এখন আবার আনতে হবে? ধুরর…এমন জানলে ও গল্পর হাতে ফুল গুলো দিতই না।
#চলবে
