#অধিকার (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
আমার কথাগুলো কারো পছন্দ নাহলেও কেউ তেমন কথা বাড়ায়নি। কারণটা অবশ্য আমি জানি। তারা আমার কথায় স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে আমি সম্পত্তি নিয়ে আইনি ঝামেলা করবো, তাই একটু ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করেছে। তারা আমাকে সব বুঝিয়ে দিবে এটা আশ্বাস দেয়। আমিও চুপচাপ সেটা মেনে নেই। অতঃপর রাতে আমাকে ছোট চাচার ঘরে থাকতে দেওয়া হয়। মেঝ চাচার ঘরে নাকি আলাদা জায়গা হবে না। একটা রুম আমার জন্য ছাড়তে পারবে না, আমিও রুম শেয়ার করে হয়তো থাকতে পারবো না। এটা বলে তারা ছোট চাচার ঘরে পাঠালো। আমিও ছোট চাচার ঘরটা ভালোভাবে দেখলাম। এটা বেশ খানিকটা দূরে। আমাদের বাড়ির সামনে যে বড় পুকুর আছে তার উল্টো পাশে। যেখানে মাঝ রাতে কিছু হলে বাড়ির ভেতরে কারোরই শব্দ পাওয়ার কথা নয়। এটা বুঝেও আমি তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। কোনরকম রাতে খেয়ে ছোট চাচার দেওয়া রুমে ঘুমাতে গেলাম। তখন রাত বারোটা ছাড়িয়ে গিয়েছে, সেই মূহুর্তে মেঝ চাচা আমার ঘরে কড়া নাড়লো। সে বাহির থেকে বললো,“বাবা সুজন ঘুমিয়েছো?”
“না।”
এটা বলে আমি দরজা খুলে দিলাম। মেঝ চাচা এবং ছোট চাচা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। ছোট চাচা হাসতে হাসতে বলে,“তোমরা আজকালকার ছেলে মেয়ে এত তাড়াতাড়ি যে ঘুমাবে না সেটা বুঝতে পেরেছি।দেখো না আমাদের দুই ভাইয়েরও ঘুম আসছে না তাই তোমার সঙ্গে গল্প করতে চলে আসলাম।”
“আচ্ছা।”
প্রথমে তারা দুজন টুকিটাকি কথা বললো। তাদের কথার মাঝে মেঝ চাচার বড় ছেলে চলে আসে। আমরা গল্প করছিলাম। গল্পের এক পর্যায়ে মেঝ চাচা বলে,“আমার বড় ছেলেটা তোমার বাবার ভিটে এবং একটা জমি নিয়ে নিয়েছে। সে তত পড়ালেখা জানে না। চাষবাস করেই সংসার কাটে। তাই আমি বলছিলাম কি বাবা ঐ জমিটার দাবি তুমি ছেড়ে দাও। আমরা বাকি সব জমি তোমাকে বুঝিয়ে দিবো।”
“আমিও একটা জমি পাশের বাড়ির কাছে বিক্রি করেছি। এখন ওটা তুমি চাইলে আমার ম রা ছাড়া উপায় নাই বাজান। তুমি ঐ জমিটার বদলে আমার জমানো কিছু টাকা আছে সেটা নিয়ে নাও।”
ছোট চাচা এই কথা বলে উঠলেন। একে একে তারা আমার অর্ধেক জমিই নাই করে দিলেন। খুব হাতেপায়ে ধরলো। মেঝ চাচার বড় ছেলেটাও অনুরোধ করছিলো তবে তার চোখেমুখে রাগ ছিলো। তাদের অবাক করে দিয়ে আমি বলি,“অন্যের জমি আপনারা ব্যবহার করছেন, বিক্রি করেছেন। বাহ্ কি মজার বিষয়। আপনাদের তো লজ্জা হওয়া উচিত আমার বাবার জমি কোন অধিকারে আপনারা বিক্রি করেছেন। এখন আবার চাইছেন আমি সবটা মেনে নেই। এত সহজ।
দেখুন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার সব জমি বুঝে চাই। তা আপনারা আপোষে না দিলে…।”
“আপোষে না দিলে তুমি কী করবে?”
মেঝ চাচার বড় ছেলে কথাটি বললো। আমি মুখে হাসি নিয়ে বলে,“জেল অব্দি ঘুরিয়ে আসবো সবাইকে।”
“কী!”
সবাই চমকে গেল। মেঝ চাচা রাগ নিয়ে বলে,“তুই আমাদের জেলের ভাত খাওয়ানোর হুমকি দিচ্ছিস?”
“আমার অধিকার আমি বুঝে নিতে আসছি। আমার সেই অধিকারের পথে যে বাঁধা হবে তাকে তো সরতেই হবে।”
“যতবড় মুখ নয় তত বড় কথা?”
ছোট চাচা বলে উঠলো। আমি ম্লান হেসে বললাম,“তোমাদের আজ আমার কাছে অনুরোধ করতে হতো না। তোমাদের আমি আপোষেই সব জমি দিয়ে দিতাম। কিন্তু ঐ যে তোমরা এই জমির লোভে আমার পবিত্র মায়ের গায়ে দাগ লাগিয়েছো। আমার মাথা থেকে এটা বের হয় না। আমি চাইলেও কখনো এই স্মৃতি ভুলতে পারবো না। তাই কখনো আমার হকও ছাড়তে পারবো না।”
“বাহ্। মায়ের মতোই তো কথা বলছিস। তোর মায়ের সম্মানহানি করলাম তবুও তো বজ্জাত বেডী ভিটে ছেড়ে লড়লো না। সেই দাঁত কামড়ে পড়েছিলো। আসলেই তোর মা একটা জিনিসই। এত অপমান করার পরও যায়নি। আর তুইও একটা জিনিস। তোর মায়ের পেট থেকেই তো বের হয়েছিস।”
মেঝ চাচা এই কথাটি বললো। তার সঙ্গে তাল দিয়ে ছোট চাচা বললো,“হ্যাঁ তাই। তবে আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে। মস্তবড় ভুল।”
“মানে?”
আমার প্রশ্ন শুনে মেঝ চাচা এবং ছোট চাচা দুজনেই হাসি দিলো। অতঃপর বলে,“সেদিন তোকে যদি তোর মায়ের সঙ্গে এক কবরে মাটি দিতাম তাহলে আজকের দিন দেখতো হতো না। ভাবছিলাম বাচ্চা মানুষ, নানা বাড়ি যাবি আর কখনো আসবি না। আঠারো বছর ভালোই ছিলাম৷ তোর কোন খোঁজখবর ছিলো না। বেশ তো ছিলো সব। কিন্তু না তুই সেটা বেশ হতে দিসনি। কোথা থেকে চলে আসলি। আসলি তো আসলি সম্পত্তির জন্য আসলি। সেই সম্পত্তি যার জন্য আমরা আমাদের হাত র ক্তাক্ত করতে দুবার ভাবেনি।”
“ভুলটা তোমরাই করেছো। সেদিন মায়ের সাথে সন্তানকে মে রে ফেললে আজ আবার ঝামেলা পোহাতে হতো না।”
মেঝ চাচার ছেলে কথাটি বলে। আমি তাদের কথা শুনে মোটেও হতবাক হই না। তবে না বোঝার ভান ধরে বলি,“আপনার কী বলছেন? আপনারা মাকে মে রে ফেলেছেন? আমার মা না আত্ম হত্যা করেছে?”
“আত্ম হত্যা তাও ঐ মহিলা। যে ঝাউড়া ঐ মহিলা। ও করবে আত্ম হত্যা। এটা স্বপ্ন দেখা যাক।”
এখানে চাচারা অতীতের ঘটনা খুলে বলে৷ তাদের খুলে বলার উদ্দেশ্য একটাই, একটুপর আমারও সেই পরিনতি হবে যেটা আমার মায়ের হয়েছে। তারা এই সময়ে এসে সম্পত্তি নিয়ে আর ঝামেলা চায় না। তাই আঠারো বছর আগে আমাকে ছেড়ে দিয়ে যে ভুলটা করেছে সেটা আর করতে চায় না। সেই সাথে মৃ ত্যুর আগে আমার জানার অধিকার রয়েছে আমার মায়ের মৃ ত্যুর আসল রহস্য। তাই তারা বলে।
সেদিন শনিবার ছিলো। মা বাগানে শাক নিয়ে আসতে গিয়েছিলো। বাগানটা দূরে এবং গাছপালা দিয়ে ঘেরা ছিলো বলে কিছুটা অন্ধকার ছিলো। হঠাৎ মা সেখানে চাচাদের দেখে। তাদের দেখে অবাক হয়ে যায়। তারা যে মাকে সারাক্ষণ নজরে নজরে রেখেছে সেটা বুঝতে পেরে মা অবাক হয়। তবে সেখানে চাচারা প্রথমে ঝামেলা করেনি। তারা আপোষে মায়ের কাছে বাবার ঘর ছাড়া সব জমি চায়। কিন্তু মা রাজি হয় না। পৃথিবীর কোন মায়ই তার সন্তানের হক মে রে কাউকে দিবে না। আমার মায়ও তাই। তার সন্তান আছে তাই সম্পদ কাউকে দিবে না। এসবই চাচারা নিতে পারেনি। তাদের ভাই নাই সেখানে তার সম্পদ তারা না পেয়ে মা বাহিরের মহিলা পাবে কেন? আর এখানেই চাচারা রাগ নিয়ন্ত্রণ না করে মায়ের গলা চেপে ধরে। মাকে অসম্মানিত করেও যখন কাজ হয়নি তখন তাকে মে রে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেদিন মা বাঁচার জন্য ছটফট করছিলো তবে দু’জনার শক্তির কাছে পেরে উঠে না। অতঃপর মা রা যায়। তবে মায়ের সেই মৃ ত্যুর একজন সাক্ষী ছিলো। পাশের বাড়ির এক লোক সেখান দিয়ে যাবার সময় পুরোটা দেখে। চাচারা তাকে দেখে সাময়িক ভয় পেলেও সামলে নিয়ে তাকে একটা জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।
চাচাদের মুখে এই কথা শুনে আমি রাগে ফেটে পড়ি। তবে কিছু করার আগেই দুই চাচা আমাকে চেপে ধরে। আর মেঝ চাচার ছেলে আমার বুকের উপর বসে পড়ে। আকষ্মিক ঘটনা ঘটে যাওয়ায় আমি প্রতিরোধ করতে পারিনি। আমি ছটফট করতে থাকি তবে তাদের শক্তির কাছে হার মানতে হয়। আমি চিৎকার দিয়ে বলি,“আপনারা ভুল করছেন। এত পাপ সইবে না।”
“কুত্তার বাচ্চা ভুল তো আমরা না, ভুল তুই করেছিস। আমাদের রাস্তায় এসে।”
এটা বলে মেঝ চাচার ছেলে আমার গলা চেপে ধরে। আর দুই চাচা আমার হাত এবং পা ধরে রাখে। তারা আমাকে প্রায়ই মে রেই ফেলছিলো সেই সময়ে দরজা ধাক্কানোর শব্দে তারা থমকে যায়। তাদের দরজা খোলার সুযোগ না দিয়ে বাহিরের দরজা ভেঙে প্রবেশ করে আমার মামা, মামাতো ভাই এবং পুলিশ। তারা হুড়মুড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। তাদের দেখে সবাই হতবাক হয়ে যায়। সেই সময়ে আমার অবস্থাও তেমন ভালো ছিলো না। মামা আমাকে ধরে মামাতো ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,“সুজনকে ধর। ওকে এখনোই হাসপাতাল নিতে হবে।”
চাচারা পুলিশ দেখে অবাক হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। অতঃপর পুলিশ তাদের পুরো ঘটনা বলে। আমি এখানে আসার আগেই জানতাম, আমার সাহসী মা কিছুতেই আত্ম হত্যা করতে পারে না। তাকে সম্পদের জন্যই ম রতে হয়েছে। যেই সম্পদে হাত বাড়ালে আমার পরিনতিও একই হবে। তাই তো একা আসিনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছি মামা, মামাতো ভাইকে। আজ রাতেই তারা আমাকে মে রে ফেলতে পারে এটা আমি অনুমান করছিলাম। তাই তো মামা আগে থেকেই পুলিশ নিয়ে হাজির ছিলো। সেই সঙ্গে চাচা যখন ঘরে ঢোকার জন্য নক করে তখন আমি আমার ফেসবুক থেকে লাইভে গিয়ে ফোনটা একটা ভালো স্থানে রাখি যেখান থেকে সব ক্লিয়ার দেখা এবং শোনা যাবে। তাই এতক্ষণ তারা যা করেছে এবং বলেছে সবটাই লাইভে অনেকে দেখেছে। মামাও যখন দেখলো অবস্থা বেগতিক তখনই পুলিশ নিয়ে ছুটে আসে। মামা পাশেই তার এক পরিচিতর বাসায় উঠছিলো। সেখান থেকেই এলো। চাচারা হতভম্ব হয়ে যায়। এতক্ষণ সবটা সবাই দেখেছে বুঝতে পেরে তারা পুরো নির্বাক হয়ে যায়। তারা পুলিশের হাতে পায়ে ধরে, মাফ চায়। কিন্তু এতই সহজ। এত সহজে পাপ ধোঁয়া যায়। এতগুলো বছর এতবড় পাপ নিয়ে তারা যে সুখে কাটিয়েছে এটাই যে অনেক বড় কিছু ছিলো। এখন আর নয়। এখন সময় এসেছে পাপের শা স্তি পাওয়ার।
পরিশেষে,
আমি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলাম। ইতিমধ্যে আমার দুই চাচা এবং চাচী এবং মেঝ চাচার বড় ছেলেকে পুলিশ ধরে নেয়। সেই সঙ্গে বাকিদেরও নিতে চাচ্ছিলো। তবে তারা প্রত্যাক্ষভাবে কোন দোষ করেনি। তাই মামাই তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করেনি। খুব শীঘ্রই মামলা আদালাতে উঠবে। এত বছর পর আমার মায়ের খু নিরা শা স্তি পাবে। এটা ভাবতেই আমার শান্তি অনুভব হলো। সেই সঙ্গে আমি আমার অধিকারও বুঝে নেই। যেই সম্পদের অধিকার ছাড়েনি বলে আমার মাকে খু ন হতে হলো সেটা আমিও ছাড়তে পারবো না। তাই তো আমি আমার মায়ের খু নের বিচার সেই সঙ্গে সব সম্পত্তি বুঝে পাওয়ার লড়াই একসঙ্গে করছি। আশা করি দুটোতেই সফল হবো। আমার মায়ের আত্মাও হয়তো শান্তি পাবে। যেই শান্তির সঙ্গে আমার জীবনটাও খুব সুন্দর কাটবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আগামীর পথচলায় এগিয়ে যাচ্ছি।
(সমাপ্ত)
