#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [অন্তিম পর্ব]
~আফিয়া আফরিন
হাইডেলবার্গ; নেকার নদীর ধারে ছোট, নীরব শহর। জানুয়ারির সূর্যের নরম আলো ঢুকে পড়ছে লাল ইটের বাড়িগুলোর গায়ে। রাস্তার ধারে সোনালি পাতায় মোড়া পথটা চিকচিক করছে। স্কুলের ঘণ্টা বেজে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা হাসতে হাসতে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এদিকের রাস্তাটা ধরে তখন দৌড়ে আসছে মেহুল। আজও দেরি হয়ে গেল। অথচ সকালেই ছেলেকে বলেছিল, মা ওকে আজ তাড়াতাড়ি নিতে আসবে। মেহুলের বা কি দোষ? ওকে তো ছোট্ট মেয়েটাকেও সামলাতে হয়। দেরি হলেও অবশ্য সমস্যা নেই। ও খুব শান্ত ছেলে। সবাই বাড়ি ফিরে যায় তাড়াহুড়ো করে, কিন্তু ও যায় না। জানে, মা একটু দেরি করেই। তাই অভ্যাস হয়ে গেছে, নিচের ছোট্ট পার্কে গিয়ে কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা। পাশে ছোট্ট একটা কবুতরের দল, ওদের দিকে বিস্কুটের টুকরো ছুঁড়ে দেয়।
মেহুল আজকে আশেপাশে কোথাও ছেলেকে দেখতে পেল না। উদ্বেগ চেপে বিরক্তি নিয়ে ইরশানকে ফোন করল। এক রিং, দুই রিং, তারপর অপর প্রান্তে ভেসে এল পরিচিত গলা,
— “বলো, মিসেস ইরশান?”
মেহুলের গলায় বিরক্তি মেশানো তাড়া,
— “তুমি আজও স্বচ্ছকে নিয়ে গেছো, তাইনা? আমার কাছে না বলে ওকে কেন নিয়ে যাও? আর গেছো তো গেছো, একবার জানালে কী হতো?”
ফোনের ওদিক থেকে শান্ত স্বর,
— “স্বচ্ছ তো আমার কাছে নেই।”
— “আবার মিথ্যে কথা! তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। তুমি জানো, কোনো ধারণা আছে তোমার আমি কীভাবে দৌড়ে এসেছি? প্রাঞ্জলকে ঘুম পাড়িয়ে আপার কাছে রেখে এখানে ছুটে এসেছি। এসব তো তোমার কাছে কিছুই না, না?”
ওদিক থেকে ইরশানের স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি,
— “রাগ করে কেন? এক কাজ করো, তুমিও চলে আসো। ফ্রাঙ্কফুর্টে, নদীর ধারে আছি।”
মেহুল রাগে গজগজ করে বলল,
— “ঠিক আছে, আসছি তোমার মুন্ডুচ্ছেদ করতে।”
ফ্রাঙ্কফুর্ট এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মেহুল হেঁটে হেঁটেই দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল। সামনেই ইরশান আর স্বচ্ছকে দেখল। মেহুল সহসা ওদের মাঝে ঢুকল না। কিছুটা দূরে বেঞ্চে বসে নিঃশব্দে পর্যবেক্ষণ করল বাবা-ছেলের দুষ্টুমি। একা বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ অতীতের ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠল। ৫ বছর আগে… ইরশান যখন চলে এসেছিল, পরপরই মেহুলকেও নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে। ইরশানের বিদায়ের মুহূর্তে ও যেভাবে কান্নাকাটি করেছে তারপর আর সাহস হয় নাই, ওকে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে ফেলে রাখতে। এখানে আসার পর তাকেই একাকীত্ব গ্রাস করেছিল। অনেকগুলো বছর একা থেকেছে, তারপর কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরে এমন আত্মিক বন্ধনের ছোঁয়া পেয়েছে যে যখন তখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে সেই মুহূর্তগুলো। আর আলাদাভাবে ব্যক্তিগত দুঃখের জায়গা হিসেবে মেহুল তো ছিলই; যার চোখে অনিন্দ্যসুন্দর বেদনা আর অসহায়তা মিলেমিশে সর্বদা একাকার হয়ে।। মেহুল মনেও সেই দিনগুলোর প্রতিটি ছায়া স্পর্শ করে; কতটা কষ্ট, কতটা অপেক্ষা, আর কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল সেসব কান্নার আড়ালে। সব পেরিয়ে যখন এখানে এলো তখনই স্বচ্ছর আসার খবর পেল। তারপর তো এখানে ওখানে আসা-যাওয়া লেগেই আছে। স্বচ্ছ হওয়ারই পরই মেহুল শ্বশুরকন্যা থেকে মিসেসে ইরশান পদে প্রমোশন পেল। এরপর তো আরেকজন নতুন অতিথির আগমন ঘটল। বছর দুয়েক হলো সেই মিষ্টি মেয়েটা এসে জীবনে আরও রঙ যোগ করেছে। প্রাঞ্জলকে নিয়ে এখনো দেশে ফেরা হয় নাই। দেশের মাটির স্পর্শ ও পায় নাই। তবে এইবার যাচ্ছে… সবকিছু ঠিকঠাক, ঈদটা নিজেদের বাড়িতেই কাটাবে।
বাড়ির কথা মনে পড়তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। তখনই ডানপাশে চোখ পড়ল ইরশানের দিকে। সে ছুটে আসছে! একদম হাওয়ার মতো হঠাৎ, শনশন করে মেহুলের পাশের বেঞ্চে এসে বসল।
— “আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে না?” ইরশান বলল।
— “তো আর কারো জন্য অপেক্ষা করব?”
ইরশান হেলান দিয়ে বসে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে লাগল,
— “রাগ কমেছে? ভাবছিলাম স্বচ্ছকে নিয়ে ছুটির আগেই ফিরে যাব। পথে এমন জ্যাম পড়ল যে এখানে চলে এলাম। তুমি তো ইদানীং সহজে বের হও না। ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে খিটখিটে হয়ে গেছ। তাই তোমাকে বাইরে আনলাম।”
মেহুল একটু ভদ্র হাসি হেসে বলল,
— “অতি উত্তম কাজ করেছ। স্বচ্ছ কোথায়?”
ইরশান হাত ইশারা করে দেখাল,
— “খেলছে।”
— “অনেক হয়েছে, চলো বাড়ি ফিরি।”
— “কিছুক্ষণ থাকো, মন-মেজাজ ভালো লাগবে।”
মেহুল বলল,
— “ভালো লাগবে না ইরশান। এখন দেশে ফিরলে, দেশের বাতাস গায়ে লাগলেই যাবে আমার ভালো লাগা। কতদিন বাবা-মাকে দেখি না!”
ইরশান একটু দুষ্টুমির ছলে বলল,
— “আমিও কতদিন আমার অসুর মশাইকে দেখি না।”
এই শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মেহুল হেসে ফেলল। বলল,
— “তুমি বাবাকে এখনও তাই বলবে?”
ইরশান মৃদু চাহনিতে মেহুলের দিকে তাকাল,
— “তো? উনি জীবনেও আমার তরফ থেকে মুক্তি পাবে না। ভুলে গেছি নাকি, তোমাকে আনার সময় কী কী করেছিলেন! কী কী বলেছিলেন! এতকাল আমার বাপের পিছে লেগে কাজ হয় নাই, এখন শুরু হয়েছে আমার সাথে। সেদিন ওত ইমোশনাল কথা বলেছিল বলে ভেবেছিলাম আগাগোড়া ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু না, উনি জীবনেও সোজা হবে না।”
— “হুমম, তুমি তার মেয়েকে নিয়ে উড়াল দিয়েছ তাতে দোষ নাই? আমার বাবা কিছু বললেই দোষ?”
ইরশান বলল,
— “তুমি তো তোমার বাবার পক্ষে বলবেই। আমি কে?”
মেহুল কপাল চাপড়ে হেসে বলল,
— “আশ্চর্য! তোমাদের কারো পক্ষেই কোনো কথা বলছি না। ভবিষ্যতেও বলল না। তোমরা দুজনই একধরনের মানুষ। জাতেও মাতাল, তালেও মাতাল! এরপর বাবা আর তুমি একসাথে থাকলে কী যে লঙ্কাকান্ড হবে, কল্পনা করতে পারো?”
— “আমি আমার অসুরের সঙ্গে বসে রাজনীতি করব, দেখে নিও।”
মেহুল উঠে দাঁড়াল। রোদটা পড়ে যাচ্ছে, গাছের পাতায় পাতায় ছায়ার খেলা। দূরে স্বচ্ছ হাসতে হাসতে দৌড়ে এলো, আর মেহুল দু’হাত বাড়িয়ে ওকে কোলে তুলে নিল। ও মায়ের গলায় মুখ গুঁজে বলল,
— “মা, বাড়ি যাব?”
— “হ্যাঁ সোনা, বাড়ি যাব।”
ইরশানও নিঃশব্দে এগিয়ে এলো। একটা মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো ওদের। দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল, ধীর পায়ে। পথের দু’ধারে বাতাসে দুলছে ঘাসফুল। মেহুলের কোলে স্বচ্ছ, পাশে ইরশান; তিনটি ছায়া এগিয়ে চলছে পাশাপাশি।
.
তুতুলের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র ক’দিন হলো। বাড়িতে ওর বিয়ের কথোপকথন চলছে। মতিউর রহমান তার পছন্দের পাত্রের কথা জানালেন তুতুলকে। তুতুল হেসেই বিনাবাক্যে রাজি। তিনি বললেন,
— “তুই এত সহজে রাজি? ভালোই করেছিস মা, ঈদের পরই ওদের সাথে কথা বলব। ওরা যদি রাজি হয়, তাহলে তোর আপারা থাকতে থাকতে তখনই বিয়েটাও সেরে ফেলব।” তুতুলের মুখে হাসি থাকলেও চোখে কোথাও একটা অস্পষ্ট চাপা অস্থিরতা খেলা করছে। ও নিজেই ফোন করে শাওনকে খবরটা দিল। শাওন যেন মুহূর্তেই সবকিছু হারিয়ে ফেলল। খবরটা শুনে একটুও দেরি করল না, ঝড়ের মতো ছুটে এলো মামাবাড়ি। চোখে অবিশ্বাস আর ক্ষোভে। তুতুলের, বিয়ে? মানে কি? তাহলে সে কে? সে যে ভালোবাসলো? দাম নেই? এত স্বার্থপর নিষ্ঠুর মানুষ হয়?
শাওনকে দেখে তুতুল কিছু না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে শাওনের বুকের ভেতর হু-হু করে সবকিছু ভেঙে পড়ছে।
— “এত বছর আমি কার জন্য অপেক্ষা করলাম। তুমি তো জানো, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও তো, মানে মুখে কখনো বলো নাই কিন্তু বোঝা যেত… কিন্তু এখন এইভাবে? একবারও ভাবলে না?”
তুতুল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, “আসছে ঢং করতে? পুরো কথা না শুনেই হারানোর আঘাতে স্থবির হয়ে যাচ্ছে। থাকো তুমি… বলব না কিছু তোমাকে।”
শাওন আরও অনেককিছুই বলল। তুতুল কোনো শব্দ করল না। উঠোনে একটা দোলনা টাঙ্গিয়েছে, সেটায় বসে গালে হাত দিয়ে তার কথাগুলো শুনতে লাগল। বেচারা এদিক-ওদিক পায়চারি করছে, একবার রেগে যাচ্ছে, একবার অনুরোধ করছে তো আরেকবার মুষড়ে পড়ছে। অতঃপর কোনোকিছুতে তুতুলকে টলাতে না পেরে বলল,
— “তুমি কিছু বলছো না কেন? আমি কি অযথা কথা বলছি? ওই ছেলেটা কিন্তু ভালো না। আমি চিনি।”
তুতুল মুখ তুলল। ভুরু কুঁচকে বলল,
— “তাই নাকি? অনেক খারাপ বুঝি? আচ্ছা বলেন, কী কী খারাপ কাজ করেছে সে?”
শাওন যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল! গলার স্বর হঠাৎই জোরালো হয়ে উঠল,
— “বউ পিটানি ব্যাটাচ্ছেলে! আগেও চার-পাঁচটা বিয়ে করেছে। এখনো মদ খায়, রাত করে বাড়ি ফেরে। কোনো কাজ নেই, একেবারে বেকার!”
তুতুল এবার দোলনাটা থামাল। চোখ তুলে একদৃষ্টিতে শাওনের দিকে তাকাল,
— “আল্লাহ! তাই? আমার তো বোধহয় কপাল পুড়বে এইবার। আচ্ছা আচ্ছা, আর কোনো খারাপ গুণ আছে?”
প্রশ্নটা শাওনের বুকের ভেতরটা আরও জ্বালিয়ে দিল। সে হাত নেড়ে, চোখ বড় বড় করে বলল,
— “খারাপ গুণ? বললেও শেষ হবে না। এতকিছু একসাথে শুনতে পারবে?”
তুতুল মাথা নাড়ল মজা নিয়ে,
— “হ্যাঁ, শুনি দেখি।”
শাওন হাঁফ ছেড়ে শুরু করল। যেন একখানা চার্জশিট তাকে পড়তে দেওয়া হয়েছে,
— “প্রথমত, সে নাকি খুব বড় চালবাজ। নিজের কথায় মানুষকে বশ করতে ওস্তাদ। দ্বিতীয়ত, চেহারায় ভদ্রতার মুখোশ থাকলেও আসলে ভিতরে পুরো শয়তান। দেখতে গুন্ডাদের মতই, মানুষ ভয় পায়। ঘরের লাইট অফ করলে তাকে আর দেখা যায় না। তৃতীয়ত, রেগে গেলে সামনে যা পায় তাই ছুড়ে মারে। প্লেট, গ্লাস… কারো দিকে তাকায় না। চতুর্থত, নিজের প্রশংসা ছাড়া কোনো কথায় কান দেয় না। নিজেকে সিনেমার হিরো ভাবে। আর শেষত…” শাওন একটু থামল, নিঃশ্বাস টানল, “শেষত, সবচেয়ে খারাপ গুণটা হচ্ছে সে মেয়েদের ধোঁকা দিতে ভালোবাসে। আগে হাসিমুখে নিজে কাছে আসবে, তারপর যখন মন পায়; তখন গিরগিটির মত রং বদলাবে নাহয় হঠাৎ উধাও!”
তুতুল হো হো করে হেসে উঠল। গলায় নিশ্চিন্ত নির্লজ্জতার হাসি,
— “ওমা! আপনি তো পুরো গোয়েন্দা হয়ে গেছেন দেখি!” হাসতে হাসতে বলল ও, “ছেলেটা কে বলুন তো দেখি? আমি তো তার ছবি দেখেছি। ওর চেয়ে সুন্দর আমার জীবনে কাউকে দেখেছি বলে মনে হয় না!”
— “মানে… তুমি কি বললে?”
তুতুল নির্ভীক কণ্ঠে বলল,
— “আমি তো ওকেই বিয়ে করব, শাওন ভাইয়া।”
শাওনের চোয়াল বোয়াল মাছের মত ঝুলে পড়ল। মনে হলো, কেউ হঠাৎ ওর ভেতর থেকে আত্মা বের করে নিয়েছে।
— “ভাইয়া?” শব্দটা মুখ থেকে বেরোল কর্কশভাবে, কষ্টের সাথে।
তুতুল একদম শিশুসম সরলতায় হেসে ফেলল,
— “হ্যাঁ, ভাই না আপনি? শুনেন, আমার বিয়ের সব দায়িত্ব আপনার। আমার বাসরঘর সাজাবেন, বাচ্চা হলে ওদের লালন-পালন করবেন।”
শাওনের মুখের ভাব পাল্টে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
— “এখনই এত দূরে যেও না… ও কখনো বাবা হতে পারবে না।”
একটু থেমে কটাক্ষের সুরে যোগ করল, “অনেক সিগারেট খায়, ভেতরের সব নষ্ট হয়ে গেছে।”
তুতুল হেসে ফেলল,
— “আচ্ছা, দত্তক নিব। কোনো সমস্যা নাই।”
রাগে, কষ্টে, আর ঈর্ষায় শাওনের চোখ তখন কেমন জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁট কামড়ে নিচু গলায় বলল,
— “তুমি ভাবছ আমি মজা করছি? বিয়ে করবে ঠিক আছে, করো। দেখি কীভাবে করো? বিয়ের দিনই এসে বিয়ে ভেঙে দেব। বসে থাকব নাকি? আমি বিয়ে না করতে পারলে কাউকে করতে দিব না।”
তুতুল দোলনায় হেলান দিয়ে আরও হেসে ফেলল,
— “আচ্ছা! আপনি কি এখন সিনেমার হিরো হতে চাইছেন? বিয়ের মঞ্চে এসে বাবাকে বলবেন, নাআআআআআ এই বিয়ে হতে পারে না। আমি এই বিয়ে হতে দিব নাআআ, চৌধুরী সাহেববব!”
শাওন চোখ রাঙাল… সাপের মত হিসহিস করে ওখান থেকে চলে এলো। দোলনাটা দুলছে হাওয়ায়, হো হো করে হাসতে হাসতে তুতুলের মুখের হাসিটা এবার একটু নিস্তেজ হয়ে এলো। উঠে ভেতরে গেল, ইফতারের সময় হয়ে আসছে…
ঈদের ঠিক এক সপ্তাহ আগে দেশে ফিরল ওরা। দু’দিন চট্টগ্রামে থেকে সপরিবারে রওনা হলো কুমিল্লার পথে। বাবা-ছেলে অর্থাৎ সাজ্জাদুল আলম এবং ইরশানের ইচ্ছে এই ঈদটা শ্বশুরবাড়িতেই কাটাবে। স্বচ্ছ তো আগেই চলে এসেছে দাদা-দাদির সঙ্গে, পিছিয়ে পড়েছে ওরা। রাস্তায় মৃদু বাতাস বইছে, গাড়ির জানালা দিয়ে ধানক্ষেতের সবুজ দেখতে দেখতে ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল। মেহুল ইরশানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি তোমার মেয়েকে সামলাবে, আমি কিন্তু আমার বাবার সাথেই থাকব।”
ইরশান গম্ভীর মুখে জবাব দিল,
— “উফফ, শ্বশুরকন্যা… এত জ্বালিও না তো। ভুলে যেও না, তোমার বাবা কিন্তু আমার অসুর, আবার মামাও বটে।”
মেহুল চোখ পাকিয়ে বলল,
— “আবার শুরু করলে? অভদ্রের মতো ‘অসুর অসুর’ করছো কেন? ওখানে গিয়ে যদি এমন করো না, আমি কিন্তু সোজা চলে আসব বলে দিলাম। ভাল্লাগে না আমার।”
এই বলে মুখ ফিরিয়ে নিল, জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ইরশান অবশ্য পাত্তা দিল না, বরং পাশের সিট থেকে প্রাঞ্জলকে কোলে তুলে নিল। ইরশান প্রায় আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, “আমার বাচ্চারা একদম আমার মতো হয়েছে জানো? শান্তশিষ্ট, বুদ্ধিমান, একদমই কান্নাকাটি করে না, দুষ্টুমি করে না।” মেহুল কিচ্ছু বলল না। চুপচাপ শুনে যায়। মুখে শব্দ নেই, কিন্তু মনে মনে ভাবল, “পাগলের সুখ মনে মনে। ওই যদি শান্ত হয়, তাহলে তো সূর্যও একদিন রাতের চাঁদ হতে চাইবে।”
অনেকগুলো বছর পর এই বাড়িতে পা রাখছে মেহমুদ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবকিছু আগের মতোই আছে। জানালা, উঠোনের পুরনো কাঁঠালের গাছ, সেই ছাদের টালি, আর রাস্তার পাশের পাকা বেঞ্চ… প্রত্যেকটি কোণ, প্রত্যেকটি দেয়াল আগের মতোই পরিচিত। অথচ সবকিছু নতুন মনে হচ্ছে, কারণ এবার সে এখানে শুধু এই বাড়ির মেয়ে হিসেবে নয়; স্বচ্ছ, প্রাঞ্জলের মা আর নিজের সুখের সঙ্গে এসেছে।
মেহুল-ইরশান এসে বাড়িতে পা রাখতেই ছুটাছুটি আর আনন্দে পুরো বাড়িটাই নিজের প্রাণ ফিরে পেল। ইরশান সবসময়ই ফাজলামি করে বলে, অসুর মশাই কিপ্টেমি করে। তাই এইবার তিনি সন্ধ্যার পরপরই বাড়ির উঠোনে বড় একটা ছাগল জ-বাই করালেন। তবুও ইরশান খোঁচাতে ছাড়ল না। ঘাড় একটু কাত করে ভুরু কুঁচকে হেসে বলল,
— “আরে অসুর মশাই, আপনি কি জামাইদের খুশি করার এক্সট্রা নাটক চালাচ্ছেন নাকি? নাটক খুব একটা জমতেছে না কিন্তু।”
মতিউর রহমান মুখ বাঁকিয়ে হাসি মেশানো কণ্ঠে বললেন,
— “জামাইদের জন্য কে করতেছে? আমি আমার নাতি-নাতনির জন্য করতেছি। তুমি সবসময় এত কথা বলো কেনো?”
— “ঠিক আছে, ঠিক আছে। নাতি-নাতনির জন্যই হলেও, তা তো ঘুরেফিরে আমাদের মাধ্যমেই তাইনা?”
মেহুল পাশে দাঁড়িয়ে তার কনুইয়ে চিমটি কেটে চুপ করাল। দূর থেকে ইশারায় বোঝাল, আর একটা কথা বললে ভালো হবে না কিন্তু! তাই ইরশান আপাতত মুখ বন্ধ করল। মশা কামড়াচ্ছে, শাওন-ও জ্বালাচ্ছে। বাচ্চাদের মত কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতেছে। এত ডিঙি একটা ছেলে যদি এমন করে, তবে কার ওকে কানের নিচে থাপড়াতে ইচ্ছে করবে না? ইরশানের তো করছেই পাশাপাশি যারা শাওনের কর্মকান্ড দেখছে সবারই তাই ইচ্ছে করছে। তার কথার মুলভাব হচ্ছে, “এটা কী রকম ব্যাপার? তুতুলের বিয়ে! আর আমি এখানে কি মাছি মারছি? নাকি মজা করছি? তোমরা একটু প্রতিবাদ করো, বিদ্রোহ করো আমার জন্য। ভাই, আমার তাজমহলের মত গড়া ভালোবাসা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ও কি ভেবেছে? আমার জীবন নিয়ে এমন ছেলেখেলা? জীবনটা বিনোদন মনে করছে? ভালোবেসে, আশা জাগিয়ে অর্ধেক পথে আমায় ছেড়ে দিল আর আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম। এই ভোঁতা মুখে এখন কে আমাকে বিয়ে করবে? আমি কি বিয়েশাদী করব না? যৌবনটা এইভাবে ক্ষয়ে যাবে? ছিঃ ছিঃ, মানতে পারছি না। নিজের জন্য নিজেরই কষ্টে কচু গাছের সাথে ফাঁস দিতে ইচ্ছে করছে।”
শাওনের কথা কেউ সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছেই না। উল্টো এমনভাবে গল্প শুনতে বসেছে যেন এখানে কী না কী হয়ে যাচ্ছে। তুতুলও ওষ্ঠ্যকোণে ছলনাময়ী হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। শাওন সবার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কাল বাদে পরশু ঈদ না! ঠিক আছে, এই ঈদ পেরিয়ে গেলে সে সোজা বনবাসে যাবে। দরকার নাই কাউকে। তুতুল নামের তেঁতুল প্রয়োজন নেই। তেঁতুল তো অহরহ পাওয়া যায়। বনে-বাদাড়ে, জঙ্গলে; তুতুলের কথা মনে পড়লে সে নাহয় টুপটাপ করে গাছ থেকে তেঁতুল পেরেই খেয়ে নিবে।
.
চাঁদ রাতের সেই শান্ত, জাদুকরী মুহূর্ত। উঠোনে আলো আর ছায়ার খেলা, ধীরে হাওয়া বইছে। মেয়েরা সবাই চাঁদ দেখা শেষ করে ঘরে গেল মেহেদী দিতে।
মতিউর রহমান উঠোনের কোণে হিসাব কষছেন। ঠিক সেসময় ইরশান এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে আয়েশ করে দাঁড়াল। উনি তাকালেন। ইরশান হেসে বলল,
— “দেখেছেন চাঁদ উঠেছে?”
মতিউর রহমানের চোখ চাঁদের দিকে, আবার একটু ইরশানের দিকে ঘুরল। বললেন,
— “দেখব না কেন? চোখ কি তোমার মত হাতে নিয়ে ঘুরি?”
— “ওইতো নিজেই বলে দিলেন। আপনার চোখ হাতে বলেই ভালো করে দেখতে পাচ্ছেন না। ওটা আসলে চাঁদ না, আপনার মেয়ে। আমার বউ। আমার বাচ্চাদের মা।”
— “তুমি কি আমার সাথে ফাজলামি করো?”
— “অবশ্যই… না।” ইরশান সুর টেনে বলল।
উনি হতাশ ভঙ্গিতে তাকালেন। মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
— “আমার নাতি-নাতনিও কি তোমার মত হবে? আহারে! কোন বাপের কপাল পুড়ল। কার মেয়ে নিয়ে আবার চম্পট মারে, কে জানে? আগে জানলে ওই বাবাকে সাবধান করে দিতাম। এদের তো আবার বংশের রাশি ঠিক নাই। আল্লাহ হেদায়েত দান করুক, আমিন।”
ইরশানের মাথায় হাত! এত্ত বড় অপমান? কিছু বলবে ঠিক সেই মুহূর্তে শাওন উঠোনে এলো। সেই একই বুলি আওড়ে যাচ্ছে। তা দেখে মতিউর রহমান বললেন,
— “তোমার কি হয়েছে? এমন করছো কেন? তুমি যেন পাগলামি করো না। পাগল জামাই আর চাই না।”
শাওনের চোখেমুখে কৌতূহল মিশে গেল,
— “জামাই মানে?”
মতিউর রহমান ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিলেন,
— “মানে আবার কী? ভেবেছি, তুতুলের সাথে তোমার বিয়ে দিব। আপত্তি আছে?”
শাওন মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে রইল, তারপর আনন্দে আটখানা হয়ে হেসে একবার ইরশানকে জাপটে ধরল। তারপর খুশিতে হবু শ্বশুরকে জড়িয়ে ধরে, কদমবুচি করে ছুটতে লাগল। শাওন দৌড়ে দৌড়ে তুতুলের ঘরের সামনে এসে থেমে দাঁড়াল। কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, হাত উঁচু করে বলল,
— “এই পুতুল সরি, তেঁতুল… ওহ নো, তুতুল! বিয়ে তো আমি তোমাকেই করছি! ইয়েএএএএ! অসুর মশাই ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে।”
তুতুল রেগে গিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ল, শাওনের মুখের ওপর দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল। তুতুল আর দেখা মিলল না। ঈদের সকালে ঘুম ভাঙার পরেও না। ঘরের আঙ্গিনায়, উঠোনে, এমনকি রান্নাঘরে; কোথাও নেই। ইশশশ, কোথায় চলে গেল তার পুতুলের মতো হবু বউ?
ঈদের দিনটা তুমুল আনন্দে কাটল। ঈদ উপলক্ষ্যে ইরশান শ্বশুরকে ছাড় দিয়েছে। এখন সকলের সামনে আব্বাজান সম্বোধন করছে। বিকালের দিকে আলফাজ খন্দকার, মতিউর রহমান, সাজ্জাদুল আলম, ফরহাদ হোসেন, তন্ময়, শাওন আর ইরশান একসাথে দোকানের এখানে আড্ডা জমিয়েছিল। ইরশান বাবা আর খালুকে দিয়ে স্লোগান দেওয়ালো, “জিন্দাবাদ শ্বশুরবাড়ি!”
আর নিজেরাও স্লোগানে গলা তুলল, “জিন্দাবাদ শ্বশুরবাড়ি, শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি!”
আলফাজ খন্দকার আর মতিউর রহমান চুপিচুপি হাসলেন। তাদের জামাইয়েরা হয়েছে সব আজিব কিসিমের। একেকটাকে চারশো বিশ বললেও ভুল হবে না।
.
বাড়িতে এসে ইরশান সিদ্ধান্ত নিল এবার ফেরার সময় শ্বশুর-শাশুড়িকে সাথে করে নিয়ে যাবে। তা শুনে মেহুল ক্ষেপল। কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,
— “তুমি কি শুরু করেছো? তুমি বললেই আমি আমার মা-বাবাকে যেতে দিব? এখানে তো বাবাকে কথা শোনাতে ছাড়ো না, ওখানে ছাড়বে? এত সহজ? আমি কাউকে যেতে দিব না। তুমি আমাকে কি পেয়েছো বলতো?
ইরশান মেহুলের গাল টিপে দিয়ে আদুরে গলায় বলল
— “কুমিল্লার রসমালাই… একবার খেলে মনে হয় শুধু মুখে নয়, মনেও মধুর একটা ঝর্ণা বইছে। একদম নরম, গরম; রসে টইটম্বুর ভালোলাগা মিশে আছে এই রসমালাইয়ে।”
মেহুল বিরক্তি দেখাল, মুখ ফিরিয়ে রাখল ঠিকই কিন্তু সেই দৃঢ়তা বেশি দিন টিকল না। অল্প সময়ের মধ্যেই চোখের কোণটা হাসির ঝলকে পরিপূর্ণ হলো। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল,
— “সবসময় প্রেম প্রেম কথা বলাটা অভ্যাস হয়ে গেছে তাইনা?”
ইরশান কিছুক্ষণ চুপ রইল। চোখে সেই পুরনো চেনা দৃষ্টিটা ভেসে উঠল,
— “ওটা অভ্যাস নয়, মেহুল… ওটা আমার অস্তিত্ব।”
মেহুল হাসল। শত অভিমান, অভিযোগ, অনুরাগের শেষ প্রান্তের তৃপ্তির হাসি! ইরশান গুনগুন করে দুই লাইন গেয়ে উঠল,
“তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দিব না। এই বক্ষ মাঝে রাখব, ছেড়ে দিব না। ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আর তো পাব নাআআআ; না, না, ছেড়ে দিব না…”
.
রাতের আকাশে চাঁদটা তখন পূর্ণতার কাছাকাছি, মৃদু বাতাসে ছাদের লতাগুল্ম নড়ছে। তুতুল দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অভিমান, চোখে ঝিলিক। শাওন দরজার পাশে এসে থামতেই তুতুল একদম কোন প্রস্তাব না দিয়েই হড়হড় করে বলে উঠল,
— “আপনাকে কিভাবে বিয়ে করি বলেন তো? এত দোষ আপনার! নিজের মুখেই তো সব স্বীকার করেছেন!”
শাওন থতমত খেয়ে চুপ। চোখে অসহায় দৃষ্টি। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার জন্য নিজেকেই হাজারবার গালাগাল করল। তুতুল কাঁধের চুল সরিয়ে গম্ভীরভাবে বলল,
— “আপনি তো বলেছিলেন, আপনি নাকি বাবাও হতে পারবেন না। অথচ আমার মা হওয়ার কত শখ ছিল!”
শাওনের মুখের ভাব একনিমিষে পাল্টে গেল। গলাটা একটু ভারী হয়ে উঠল। মৃদু হেসে বলল,
— “দত্তক আনব না? সমস্যা কোথায়?”
তুতুল ঠোঁট চেপে হাসিটা লুকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে বলল,
— “আপনি সত্যিই এক নম্বর পাগল। তবুও…”
শাওন আগবাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “তবুও?”
তুতুল মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— “তবুও এই পাগলটাকেই বোধহয় ভালো লাগে। কিন্তু আমি ভালোলাগা প্রশ্রয় দিব না। বিয়ে আপনাকেই করব তবে বিয়ের পর আপনি আমার ধারেকাছে ঘেঁষবেন না। ব্যাটা মানুষের গদগদ আহ্লাদ আমার পছন্দ না। সিনেমা হলে গিয়ে চিপায়-চাপায় হাত ধরার চেষ্টা করবেন তাও মানব না। যদি সব মেনে নিতে পারেন তো আমি রাজী!”
শাওন কোনোকিছু না ভেবে বলল,
— “যথার্থ! তবুও তুমি আমাকেই বিয়ে করো প্লিজ।”
— “ঠিক আছে।”
শাওন বিশ্ব জয়ের হাসি হাসল। এই হাসি হচ্ছে, হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার!
.
.
.
সমাপ্ত।
