Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়িশ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-১৩+১৪

শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-১৩+১৪

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-১৩]
~আফিয়া আফরিন

ইরশান যখন বলল, “সবাই তৈরি হয়ে নাও, আমরা এখনই রওনা দেব।” তখন বিনা বাক্য কেউ মেনে নিল, কেউ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেহুলের বুকের ভেতর একটা ঝাঁকুনি লাগল, বোধহয় কেউ ভিতরটা মুচড়ে ধরেছে।
ও তাকাল ইরশানের দিকে। তার কোনো নড়চড় নেই, নেই কোনো ভাবান্তর, রাগে দপদপ হয়ে যাওয়া মুখের আড়ালে সূক্ষ্ম যন্ত্রণার রেখা। সবাই এসে উপস্থিত হলো। ইরশানকে কেউ সিদ্ধান্ত থেকে একটুও টলাতে পারল না। কেউ কিছু বলতেও পারছিল না। তখনই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন খন্দকার আলফাজ উদ্দিন। সকলের দিকে তাকালেন,
— “এতদিন আমি চুপ ছিলাম।” তিনি শুরু করলেন, “ভেবেছিলাম সময়ের সাথে সাথে সব মিটে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, কিছুই ঠিক হয়নি। বরং আগের চেয়ে সবকিছু আরও জটিল হয়েছে। আজ দেখছি, সম্পর্কের চেয়ে সম্পত্তির দাম বেশি হয়ে গেছে। এই বাড়িতে শুধু দেয়াল, ইট, পাথর, সিমেন্ট আছে, মনের উষ্ণতা নেই। সম্পর্কগুলো সব কেমন শুকনো পাতার মত খসখসে হয়ে গেছে। আজ শুধু আগত অতিথিরা নয়, আমি নিজেও এই বাড়ি থেকে চলে যাব। যেই বাড়িতে আমার মেয়েদের অপমান করা হয়েছে, সেই বাড়িতে আমি বাবা কি করে থাকব? সে থাকুক তার অর্থসম্পদ নিয়ে… আমি যাচ্ছি আমার মেয়েদের সাথে। ওরা নিশ্চয়ই আমাকে ফেলে দিবে না।”

আমিনাও এগিয়ে এলেন, মুখটা শক্ত হয়ে গেছে। এতক্ষণ, এতদিন চুপ ছিলেন কিন্তু আর পারলেন না। অনেকদিন স্বামীর তালে তাল মিলিয়ে আদর্শ স্ত্রী হয়েছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, আদর্শ স্ত্রী হয়ে গিয়ে তিনি মানবতা বিসর্জন দিচ্ছেন। তাই আজ ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা এক ঝটকায় বেরিয়ে এলো,
— “এই লোকটা সবসময় নিজেরটাই দেখেছে। কখনো কারও কথা ভাবেনি, কারও কষ্ট বুঝতে চায়নি। নিজের জেদ, নিজের অহংকার নিয়েই বেঁচে থেকেছে সারাটা জীবন। ভেবেছে, সবসময় সেই ঠিক আর বাকিরা ভুল।” তিনি একপা এগিয়ে গেলেন। দৃষ্টি স্থির মতিউর রহমানের দিকে, “একবারও ভেবেছো, তোমার এই জেদের কারণে কতগুলো সম্পর্ক ভেঙে গেছে? সকলের চোখে ছোটো হচ্ছো, বোনদের হারিয়েছো, আজ প্রায় সবাই তোমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তোমার মেয়েরা কি শিখছে? ওরা বাবা সম্পর্কে কি ভাবছে? তবুও তোমার মধ্যে অনুতাপের ছায়া নেই! তুমি সব পেয়েছো, কিন্তু সব পেতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কাউকে রাখোনি।”

সবাই নিজেদের কথা বলছে। মতিউর রহমান শুধু শুনছেন, কিছু বলছেন না। তাকে এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। মিতুল বলল,
— “আমাদের দোষটা কোথায়, আব্বা? আমরা কি অন্যায় করেছি?
তোমার সম্মানও তোমার রাগের সাথে মিশে গিয়ে পাথর হয়ে গেছে। তাতে আমাদের সাফার করতে হচ্ছে। আমাদের কি দোষ? আমরা কোনদিকে যাব?”

মেহুল বলল,
— “বাবা, বিগত কিছুদিন আমি সত্যি তোমার অবাধ্য হয়েছি। অথচ তুমি ভেবেছ আমি তোমার বিরুদ্ধে গেছি। কিন্তু না… আমি যদি ভালোবাসার মানুষ বেছে নিই, তাতে কি মর্যাদা কমে যায়? ভালোবাসা জিনিসটা তো প্রথম তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।”

তুতুলও থেমে থাকল না,
— “তোমার জেদে সবাই ভয় পায় বাবা, কিন্তু আমি কখনোই পাইনি। আমরা তিন বোন, তোমার শেখানো আত্মসম্মান নিয়ে বড় হয়েছি। আজ তুমি আমাদের সবার চোখে চোখ রেখে কথা বলো, সব ঠিক করো। তোমার একটা কথা অনেককিছুই বদলে ফেলতে পারে। আমাদেরও আর মাথা নত করতে হবে না।”

এইবার মা হিসেবে সালেহা বেগম এগিয়ে এলেন। তার চোখেমুখে কঠোরতা,
— “জীবনের এইসময়ে কিংবা এই বয়সে এসে কারো উপদেশ শুনতে ভালো লাগে না, আমি জানি। তবে শোনার মত কাজ করলে তো শুনতেই হবে। আমি আমার সংসারটা ভালোবাসায় গড়তে চেয়েছি। কতটুকু পেরেছি আজ তো দেখলাম। মেয়েগুলোকে দেখেছিস? তোর মত শক্ত হয়েছে কিন্তু মনুষ্যত্ব আছে। আজ ওরা যেই কথাগুলো বলল এটা তোর পরাজয় না, এটা তোর অর্জন। সর্বক্ষেত্রে যদি একটু কোমল হতিস, আজ এই ভাঙনের কবলে পড়তে হতো না। আজ যদি এই বাড়ি থেকে সবাইকে চলে যেতে হয় তবে আমাকেও গুনে রাখ। আমি থাকব আমার সন্তানদের সঙ্গে। মায়ের ঘর সেখানেই, যেখানে তার সন্তানেরা থাকে; তোর অহংকারের দেয়ালের ভেতর নয়।”

মতিউর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন মাঝখানে, চারপাশে তার পরিবার। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কেউ চোখ মুছছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার দিকে। বুকের ভেতরটা হঠাৎই কেমন ভারী হয়ে গেল।
এই মানুষগুলো; যাদের ওপর এত বছর নিজের ক্ষমতা, নিজের মতামত, নিজের জেদ চাপিয়ে রেখেছেন, তারা সবাই আজ একসাথে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে? তিনি একা। ভীষণ একা… চোখের সামনে মিতুলের মুখে কষ্টের রেখা, মেহুলের কান্না মিশ্র দৃষ্টি, তুতুলের ঠোঁট কামড়ে চেপে রাখা অভিমান… সব একসাথে তার বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এরা কেউ তার বিরুদ্ধে নয়; তার জেদের বিরুদ্ধে, তার অহংকারের বিরুদ্ধে। ধীরে ধীরে মুখ তুললেন। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। গলাটা শুকিয়ে গেছে, তবুও কথা বললেন,
— “হয়তো আমি সত্যিই ভুল করেছি। না, হয়তো নয়… নিশ্চয়ই করেছি। আমি ভেবেছিলাম আমার কথাতেই সবাই ঠিক থাকবে।
আমার সিদ্ধান্তই হবে শেষ কথা। কিন্তু বুঝিনি, তাতে আমি নিজেই সবাইকে হারাচ্ছি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, ভালোবাসা কোনো সম্পত্তি নয়। ওটা অনুভব, ওটা স্বাধীনতা। আমার মেয়েরা আমার উপর অভিমান করবে, আমার থেকে দূরে চলে যাবে তা কখনো হতে পারে না। তোমরা সকলে আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছো ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতার নয়, শক্তির লক্ষণ। তোমরা যদি পারো, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি নতুন করে শুরু করতে চাই। আমার পরিবারকে ফিরে পেতে চাই।”

সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। তিনবোন দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। ওরা মুখ গুঁজে কাঁদছে, কিন্তু সেই কান্না দুঃখের নয়;
বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মমতার উষ্ণতায় ভেজা। এরপর তিনি মেহুলকে নিয়ে ইরশানের কাছে এগিয়ে গেলেন। মেহুলের হাতটা ইরশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— “নাও, দিলাম স্বইচ্ছায়। মেয়ে হুট করে বিয়ে করেছে বলেই বাবা হিসেবে তোমাকে একটু বাজিয়ে দেখলাম। পরীক্ষায় তুমি পাশ করেছ। মেহুল তো সবসময় তোমার মতো কাউকেই চেয়েছিল। যে উপরে শক্ত হবে, কিন্তু হৃদয়ে নরম। যে ভালোবাসবে, আবার সামলাতেও জানবে।”

ইরশান স্তব্ধ হয়ে রইল। কিছু বলতে পারল না। অবশেষে অবসান ঘটলো? আসলেই ঘটলো… সবার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। তিনি ফের বললেন,
— “আমি জানি, আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি। একটা যুগ কেটে গেছে অহংকারে, ভুল বোঝাবুঝিতে। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, মানুষ যত বড়ই হোক, পরিবারের কাছে সে একমুহূর্তেই ছোট হয়ে যায়। পেছনের সেই বছরগুলো আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু সামনের বছরগুলো… যতদিন বাঁচব ততদিন তোমাদের সবার সঙ্গে থাকতে চাই।”

যে বাড়িটা এতদিন বিভেদের গল্প বলত, আজ সেখানে মিলনের সুর বাজছে। সেই সুরে বাজছে “ক্ষমা” শব্দটা… যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে শান্তি, ভালোবাসা আর নতুনত্বের শুরু!
যাই যাই করে শেষ পর্যন্ত ওদের যাওয়া আর হলো না। কে যেতে দিচ্ছে? আর এতদিনের দূরত্বের পর সবাই একত্রিত হওয়ার পর তাদেরও আর যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল, চা-বিস্কুট নিয়ে সকলে বসে পরল টিভির সামনে।

মেহুল নিঃশব্দে বারান্দা পেরিয়ে এল। ইরশান ঘরে; টেবিলের উপর ছড়ানো কাগজপত্র, টিকিট, পাসপোর্ট। মেহুল ভেতরে এসে সেসবের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “থ্যাংক ইউ।”

ইরশানের চোখে শান্ত ম্লান হাসি,
— “আমাকে থ্যাংকস দিতে হবে না, মেহুল। তোমার বাবা নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, সেটাই তো বড় ব্যাপার।”
— “তবুও সব তো আপনার জন্যই হয়েছে।”

— “হয়তো…” তারপর আবার কণ্ঠে আশঙ্কার ছোঁয়া রেখেই বলল, “আমাদের সাথে যাবে? আমাদের বাড়িতে?” ইরশান যথেষ্ট চিন্তায়। সব মিটমাট মানে কি এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী ওদের সম্পর্কটাও শেষ হতে চলল…
মেহুল বিচলিত দৃষ্টিতে তাকাল,
— “আপনি তো চলে যাচ্ছেন, তাইনা? টিকিট কেটেছেন, একবারও বললেন না।”

ইরশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— “বলা উচিত ছিল, কিন্তু…”

মেহুল ঠোঁটে একচিলতে ব্যথা মেশানো হাসি টেনে বলল,
— “থাক, কৈফিয়ত দিতে হবে না।”

ইরশান কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল মেহুলের দিকে। তারপর নিচু গলায় বলল,
— “কৈফিয়ত না দিলে হয়না, মেহুল। তোমার কাছে আমার সব কথাই অসম্পূর্ণ মনে হয়। আমি ভেবেছিলাম, এইসব ঝামেলা মিটে গেলে তুমি আবার তোমার নিজের পৃথিবীতে ফিরে যাবে। আমি হবো তোমার অতীতের একটা অধ্যায় মাত্র। তোমার কিছু কিছু কথায় আমি ভেবেছিলাম হয়তো ভুলে গেছো… আমি নিজেও ভুলে গিয়েছিলাম।”
— “কী?”
— “ভুলে গিয়েছিলাম যে সম্পর্কের কাগজে স্বাক্ষর থাকলেও, অনুভূতির থাকে না। আর আমি সেই অনুভূতির কাছেই হেরে গেছি। প্রতিবার ভাবি তোমাকে ছেড়ে দূরে যাব, আর প্রতিবারই অনুভব করি তোমায় ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। আমার অস্তিত্বের অর্ধেক অংশ তুমি। তোমাকে ভুলতে চেয়ে প্রতিবারই আরও গভীরে ডুবে গেছি তোমার মধ্যেই।”

মেহুল চুপ করে শুনছিল। ওর ঠোঁট মৃদু কাঁপছিল, চোখে ঝিলিক আর অভিমান মেশানো জল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
— “আমি ভীষণ রাগ করেছি আপনার উপর। আপনি আমায় অনেক কষ্ট দিয়েছেন… এমন কষ্ট, যা আপনি বুঝবেনও না। আপনার কোনো ক্ষমা নাই। একদমই না।” এটুকু বলেই মেহুল দৌড়ে বেরিয়ে গেল। চারিধার আবার নীরব হয়ে গেল কেবল দরজার দপাস শব্দটা প্রতিধ্বনির মতো বেজে উঠল। তারপর থেকে আর তাদের কোনো কথা হলো না। দু’দিন কেটে গেল এমনই নীরবতায়। দু’দিন পর মা-বাবা চট্টগ্রাম ফিরে গেলেন। ইরশান যেতে চাইলেও পারল না, মেহুলের সাথে কথা না বলা পর্যন্ত সে কোথাও যেতে পারবে না। শাওন-ও থেকে গেল। সে তো থাকবেই কারণ এই বাড়িতেই আছে তার প্রিয়দর্শিনী। চুপিচুপি, নিঃশব্দেই শুরু হয়েছে ওদের প্রেম। কেউ খোলাসা করে কিছু বলতে চায় না। কিন্তু দিনশেষে ঠিকই নিজের কাছে স্বীকার করে নেয়। হয়ত ওরা মনে করছে, শব্দে প্রকাশ করলে এই নিঃশব্দ মায়া ভেঙে যেতে পারে!
সেদিন মেহুল তুতুলকে জিজ্ঞেস করেছিল,
— “শাওনকে তোর কেমন লাগে?”

তুতুল নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— “কেমন আবার? ভালোই তো।”
— “আরে ভালোই তো কিন্তু অন্যরকম কিছু না?”
— “কি আবার? ভালোই আছে, খারাপও। বেশি বকবক করে। আমাকে তেঁতুল গাছের পেত্নী বলে জানো? আপা, তেঁতুল গাছে পেত্নী আছে?”
— “কি জানি? ওকে জিজ্ঞেস করিস। তবে ভালোই তো ভাব তোর সাথে।”

তুতুল মৃদু হেসে বলল,
— “তা আছে। মোটামুটি…”
ব্যস এইটুকুই, তুতুল শাওনের বিষয়ে কথাবার্তা বেশি টানতে চায় না। হয়ত নিজের অনুভূতি সম্পর্কে নিজেই আগে পরিষ্কার হতে চায়, তাই কাউকে এখনই কিছু জানাতে চায় না।
.
ইরশান সময়টা থেমে আছে, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা তখনও অচেতনভাবে ঘুরছে। সে জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষ করেছে। দেশে আসার আগে কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছিল। কিছুদিন আগে জার্মানি থেকে চাকরির লেটার এসেছে। সব ফর্মালিটি সম্পন্ন, চাকরি নিশ্চিত। মুহূর্তটা ইরশানের জন্য মিশ্র অনুভূতির। ওইদিকে জার্মানি অপেক্ষা করছে। এইদিকে মন পড়ে আছে এখানেই।

মেহুলকে সে ভালোবেসেছে আরোও তিন বছর আগে। শুরুটা হয়েছিল মিতুলের মাধ্যমে। তিন বছর আগে মিতুলের হাতে থাকা পারিবারিক অ্যালবামে যখন সেই ছবিটি দেখেছিল, তখনই তার হৃদয়ে টান ধরা পড়েছিল। শুরুটা নিখুঁতভাবে সাধারণ, অথচ গভীর… মিতুল জানতো সবই। তাই বলেছিল, “দাদুর অসুস্থতা কথা বলে ফুপুকে বাড়ি অব্দি নিয়ে যা, বাবার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোল, মেহুলের প্রতি নিজের অনুভূতিকে স্বীকার কর।” এই পরিকল্পনা ঠিকই ইরশানের মনের খেয়ালকে কাজে লাগিয়েছিল। নিজের অন্তরশক্তির কণ্ঠ শুনেছে সে। যে কণ্ঠ বলেছিল, “এটা ঝুঁকি, কিন্তু মেহুল ছাড়া তুমি অসম্পূর্ণ।” তাই তো সে বিয়েটা করেছে, বর্তমানে যা পুরোপুরি মেহুলের এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে সংবদ্ধ হয়েছে।
তিন বছরের অপেক্ষার পর, সেই টান এবং সেই ঝুঁকির ফল; বাংলাদেশে এসে, মেহুলকে কাছ থেকে দেখার এই মুহূর্ত। ইরশান জানে, সবকিছু যতোই পরিকল্পিত হোক, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মেহুলের দিকে তাকিয়ে অনুভব করা সেই ভালোবাসা, যা তিন বছর ধরে তার ভেতর জমে আছে।

আজ মঙ্গলবার। শনিবার ফ্লাইট, ফিরতে হবে কিন্তু সে একেবারেই প্রস্তুত নয়। মেহুল এখনও ইরশানের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে কোনো কথা বলেনি। সকালে কয়েকবার দরজায় কড়া নেড়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি; ফলাফল শূন্য।
মনটা ভীষণ কষ্টে অস্থির। অবশেষে পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সন্ধ্যার সময় রওনা হয়েছে। হৃদয়ে ব্যথার তেজ সুস্পষ্ট… শাওন তখন বাড়িতে নেই, তাই তাকে সঙ্গে নিতে পারেনি। রাস্তার আলোও কেমন বিষন্ন, মনে দাগ কাটছে অব্যক্ত ভালোবাসার।

মিতুল এসে মেহুলকে বলল,
— “মেহুল, ইরশান চলে গেছে। বলেছে, উঠোনের লাল ফুল গাছের নিচে তোর জন্য কিছু রেখে গেছে। নেমে দেখ, কি হতো শেষ সময়ে ছেলেটার সাথে একটু দেখা করলে?”
মেহুল মিতুলের কথা শুনে স্তব্ধ। লাল ফুলের গাছ? সেই প্রিয় গাছ? হন্যে হয়ে ও সিঁড়ি বেয়ে নামল। ইরশান কেন ওই ফুল গাছের নিচেই কিছু রেখে যাবে?
আর রইল রাগের কথা? ও রাগ কি সাধে করেছে? এই রাগের উৎস ভালোবাসা। যাকে ভালোবাসে, তার প্রতি ষোলআনা অধিকার নিজের মন দাবি করে। লাল ফুলের গাছের ছায়ায় আসতেই দেখল, একটা ছোট্ট নোট; অপরিচিত মানুষের দেওয়া নোটের মতই। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা খুলল,
“তোমার অপরিচিত মানুষটা কে জানো? জানো না তো? ঠিক আছে…”

মেহুল হঠাৎ থেমে গেল। বাকিটুকু আর পড়তে পারল না। যা বোঝার বুঝে গেছে ও। শুধু খামের নিচে নামটা চোখে পড়ল; বড় অক্ষরে, স্পষ্টভাবে লেখা, ইরশান তৈমুর। হৃদয় জড়িয়ে ওঠা উত্তেজনা আর অচেনা উষ্ণতায় ওর চোখ ঝলমল করল, কোনোদিকে তাকাল না। খাম হাতে রেখে ছুটল, এক নতুন দিগন্তের দিকে। পা দ্রুত চালাল, যত দ্রুত সম্ভব; একটাই লক্ষ্য, একটাই গন্তব্য: ইরশান। তাকে আটকাতে হবে।
মেহুলের বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত দৌড়াতে হলো না। অর্ধেক পথেই থেমে গেল। চোখে পড়ল ইরশানের পরিচিত ভঙ্গি। হঠাৎ সব বাঁধা আর সময়ের দূরত্ব মুছে গেল। ছুটে গিয়ে, পেছন থেকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বুকের প্রতিটি স্পন্দন মিলল তার সঙ্গে…
.
.
.
চলবে…..

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-১৪]
~আফিয়া আফরিন

ইরশান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, হঠাৎ পেছন থেকে কে এসে জড়িয়ে ধরল? প্রথমে ভাবল, হয়তো কোনো ভুল হয়েছে। তারপরেই পরিচিত সেই গন্ধটা নাকে এলো। স্পর্শে অচেনা হলেও টিকে থাকা শ্যাম্পুর ঘ্রাণ, হাতের উষ্ণতা, আর বুকের ভেতর ধাক্কা খাওয়া নিঃশ্বাসের কম্পনে চিনতে অসুবিধা হলো না। পেছন থেকে মেহুলের কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস কাঁধ ছুঁয়ে গেল। ইরশান ঘুরে দাঁড়াল। মেহুলকে দেখল মুখে ক্লান্তির ছায়া, চোখদুটো ভেজা, সেই চোখে লুকিয়ে আছে হাজার অনুচ্চারিত কথা; অভিমান, ভালোবাসা, আকুলতা, ব্যাকুলতা, প্রত্যাশা, একাকিত্ব, তৃষ্ণা, হারানোর ভয়, সংশয়, দহন, ক্ষোভ, মোহ, অপরাধবোধ… সব একসাথে নীরবে, নিভৃতে, নিঃশব্দে।
ইরশান কিছু বলতে চেয়েও পারল না, শুধু তাকিয়ে থাকল। মেহুল চোখ নামিয়ে বলল,
— “চলে যাচ্ছিলেন কেন?”

ইরশান মৃদু স্বরে বলল,
— “এলে?” একটা শব্দ মাত্র! কিন্তু সেই একটিমাত্র শব্দেই জমে থাকা সব অপেক্ষা, সব আকুলতা, সব অভিমান ভেসে উঠল। মেহুল একটুখানি থেমে রইল। বুকের ভেতর নিঃশব্দ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারপর ধীরে, খুব শান্ত গলায় বলল,
— “এসেছি… হঠকারিতা করে আসিনি। অনেক ভেবেচিন্তে, বুঝে এসেছি। আপনি যেভাবে আমার জীবনে এসেছিলেন, সেটা হঠাৎ ছিল… কিন্তু আপনি আমার ভেতরে যেভাবে রয়ে গেছেন, সেটা একদমই হঠাৎ নয়। জানেন, আমি বুঝে গেছি আমার মধ্যে তৈরি হওয়া এই অনুভূতিটা কোনো ক্ষণস্থায়ী মোহ না; এটা গভীর, স্থায়ী। আপনি আমার জীবনের সেই অংশ, যেটা বাদ দিলে আমি অসম্পূর্ণ হয়ে যাব।”

ইরশান বুকে হাত দিয়ে বলল,
— “আয়হায়, শ্বশুরকন্যা অবশেষে বুঝল আমায়। ভাবছিলাম, এই জন্মে হয়তো আর ওই মুখের হাসি দেখতে পাব না। তোমার রাগের মধ্যেও যে এত ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা যদি আগে জানতাম তবে রোজই তোমায় রাগাতাম; সত্যি!”

মেহুল হাসল। নিজেই অবাক, কীরকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ও! পারল কীভাবে? এটা কি ভালোবাসার স্বাধীনতা? যা নিজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে! হ্যাঁ, সম্ভবত তাই। স্বপ্নের মানুষটা যখন কাছে আসে, যখন তার ছোঁয়া লাগে, তখন মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত বাঁধা ভেঙেচুরে নিঃশেষ হয়ে যায়। ও কি কখনো ভেবেছিল, বাড়ির পথ পেরিয়ে, ধুলোমাখা রাস্তায়, কারো জন্য এমন দৌড়াতে হবে? মনের সমস্ত আবেগ ঝরিয়ে, পাগলের মতো, শুধু একবার তাকে কাছে পাওয়ার জন্য ছুটতে হবে? ভেবেছিল কি, নিজের অন্তরের প্রলাপ এইভাবে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করে কারো কাছে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাকে জড়িয়ে ধরবে; এমনই নির্ভীকভাবে, এমনই উচ্ছ্বাসে? ও বলল,
— “অনেক মানুষ এসেছিল… কেউ আমাকে খুঁজে দিতে চায়নি। ভালোবাসা মানে আমি কখনোই বুঝিনি। বোঝার চেষ্টাও করি নাই। এটা বোধহয় অধ্যাবসায়ের মত, সাধনার মত! কী জানি, জানি না তো। ভালোবাসা নিয়ে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না। শুধু চেয়েছিলাম ভালো একটা মানুষ… যে ভালোবেসে ভালোবাসা শেখাবে। সেদিন আমাকে ওইভাবে আমাকে খুঁজে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন না! বিশ্বাস করুন, ঠিক ওইমুহুর্তে আমি ভালোবাসা বুঝে গেছি। এগ্রিমেন্টের কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়েছি। আমি নিজেকে চিনতে পারছিলাম না, ইরশান। এতটা ভালোবাসা আমার মধ্যে আছে, তাও বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনি আমাকে হারিয়েছেন, আবার আপনিই খুঁজে দিয়েছেন। সত্যিই পেরেছেন নিজের প্রতিশ্রুতি রাখতে। তুতুল সবসময় বলত, আমার জন্য নাকি রাজপুত্র আসবে। ঘোড়ায় চড়ে, হাতভর্তি ফুল নিয়ে, পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চেপে। আমি হাসতাম। ভাবতাম, এসব শুধু গল্পেই হয়। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে বলছি গল্প তো জীবনের একটা অংশ, জীবন থেকে ধার নেওয়া সামান্য পান্ডুলিপি মাত্র!”

ইরশানের ভেতর কী হচ্ছে সেটা শুধু সে নিজেই বুঝতে পারছে। তাও বোধহয় পারছে না… সব এলোমেলো লাগছে। এই সন্ধ্যা, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়তমা, সে এবং তার অনুভূতি; এসব কি ভ্রম? ভ্রম হবে কিভাবে? স্বয়ং ইরশান তৈমুর নিজেই এখানে, এই সময়ে, এই মুহূর্তে উপস্থিত… সব সত্যি, সব স্পর্শযোগ্য। সে নিজেকে সামলে নিল। এই ভরা সন্ধ্যায় মেহুলের দিকে আরেকবার তাকাল,
— “ভেবেছিলাম তোমার থেকে দূরে থাকতে পারব। কিন্তু যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, ততই বুঝেছি; তোমার অভিমান, তোমার হাসি, তোমার রাগ এবং আপাদমস্তক তুমিটাই আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। তুমি বলেছিলে না, কোনো ক্ষমা নাই? ঠিক আছে, আমি ক্ষমা চাইছি না। শুধু আবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি… তোমার প্রতিটি অভ্যাস নিয়ে তোমার পাশে থাকব। তুমি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই তোমাকে চাই। বদলাতে বলব না কখনও… এই আলো-আঁধারীর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—তুমি ক্লান্ত হলে আমি তোমার বিশ্রাম হবো। তুমি হারিয়ে গেলে আমি পথচিহ্ন হবো। তোমার হাসির আড়ালে লুকানো কান্নাও আমি বুঝব। তোমার ভয়গুলো ভালোবেসে আগলে রাখব, তোমার স্বপ্নগুলোকে আমার নিজের যত্নে লালন করব। তোমার প্রতিটি নীরবতার উত্তর আমি খুঁজে নেব ভালোবাসায়। ঝড় হোক বা নীরব রাত, একাকীত্ব কখনোই তোমায় আগলাতে পারবেনা। আমি থাকব তোমার প্রতিটি মুহূর্তে; হয় উপস্থিত থেকে, নয়ত প্রার্থনা হয়ে। রাজী?”

মেহুলকে কিছু বলতে হলো না। হাওয়ায় মেহুলের চুল উড়ে এসে ইরশানের গালে ছুঁয়ে গেল; তারপর যা বোঝার দু’জনেই বুঝে গেল। এই বোঝাপড়ায় সংলাপ নেই, শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রতিধ্বনি; যেখানে বলা হয় না, শুধু অনুভব করা হয়।
.
ইরশান মেহুলকে আলতো করে হাতে ধরে নিজের পাশে টেনে নিল। ভোরের আলোয় বাতাসে মৃদু ভেজা গন্ধ ভেসে আসছে এবং দূরে চট্টগ্রামের রোদের লালাভ আলো দু’জনের পায়ের তলে নীরবে নড়াচড়া করছে। রাতের ওই অন্ধকারে দু’জন প্রিয় মানুষ কোন আগাম প্রস্তুতি ছাড়াই অনিশ্চিত পথে বেরিয়ে পড়েছিল। মেহুল তো এক কাপড়ে, চুপচাপ, বিক্ষিপ্ত হৃদয়ে, সব বাঁধা ডিঙিয়ে, সব সীমাবদ্ধতা ভেঙে, কোনো প্রকার প্রতিরোধ ছাড়াই ইরশানের হাত ধরে এই পর্যন্ত চলে এসেছে। ওর পক্ষে আর কোনোভাবেই নিজেকে শক্ত খোলসে আটকে রাখা সম্ভব নয়। ওহ হায়! এই খোলসটা এতদিন ধরে ওর নিরাপদ আশ্রয় ছিল, আর আজ ইরশান এসে হাতে ধরলেই সব খুলে গেল…

মেহুল আর ইরশান দু’জনই পতেঙ্গার দিকে রওনা হলো। শহরের হট্টগোল থেকে কিছুটা দূরে, সমুদ্রের মৃদু ঢেউয়ে নিজেদের জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ করতে চায়। তখন প্রায় বিকেল হয়ে গেছে, সমুদ্রের ধূসর-নীল জলরাশি সোনালি সূর্যের আলোকে ছুঁয়ে চকচক করছে। ওরা ছোট্ট একটা রিসোর্টে উঠল। এরকম টানা ভ্রমনের অভিজ্ঞতা কিংবা অভ্যাস নেই মেহুলের, তাই স্বভাবতই ও ক্লান্ত হয়ে গেল। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে ইরশানকে জিজ্ঞেস করল,
— “বাসায় জানিয়েছেন তো?”
— “না, এখনও তো জানাইনি।”

মেহুল চোখ বড় করে অবাক হয়ে বলল,
— “আল্লাহ! তাহলে চিন্তা করবে তো।”
— “দূরত্বের দুঃসাহসিক ভ্রমণও যদি রোমাঞ্চ ছাড়া হয়, তাহলে কী লাভ?”

উত্তরে মেহুল ফিসফিস করল, “ভ্রমণে আমি রোমাঞ্চ দিয়ে কি করব? আমার রোমাঞ্চ তো অন্যকিছুতে সংরক্ষিত!” কিন্তু মুখে বলল,
— “আচ্ছা, ওটা আপনার ব্যাপার। আমাকে কেউ কিছু বললে সোজা আপনাকে দেখিয়ে দিব। এইবার আর দায় নয়, দায়হীন একটা জীবন দরকার।”

ইরশান হেসে মেহুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “দায়হীন জীবন চাই? কিন্তু মেহুল, দায় না থাকলে জীবনের মানে থাকে? আমি দায় থেকে আর পালাতে চাইব না… কারণ আমার দায়টা তোমাকে ঘিরে, তোমাদেরকে ঘিরে। যে দায় হাসায়, বাঁচায়, নিজের মতো করে বেঁধে রাখে।”

মেহুল চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
— “আপনি যেন কোথায় যাবেন? যান, আমি একটু ঘুমাই। ক্লান্ত লাগছে।”

ইরশান একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে যোগ করল,
— “সত্যি বলছি তুমি যদি আমার দায় হও, তাহলে আমি সারাজীবন আনন্দে দায়বদ্ধ থাকতে রাজি।” ইরশানের কথার সাথে সাথে জানালা দিয়ে সমুদ্রের বাতাস এসে গা ছুঁয়ে গেল নিঃশব্দে।

ইরশানকে সারাদিন ধরেই সবাই ফোনে ট্রাই করেছে। কিন্তু বারবার একই যান্ত্রিক সুর, “দুঃখিত, আপনি যে নম্বরে কল করেছেন সেটি বর্তমানে বন্ধ আছে…”
মেহুল তো নিজের ফোনটাই বাড়িতে ফেলে এসেছে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, বাড়ির কেউই খুব চিন্তিত নয়। ওরা ইরশানের পাগলামির সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মিতুল অবশ্য মুচকি মুচকি হাসছে। হাসির পেছনে কারণও আছে। ও তো নিজ চোখেই দেখেছে; মেহুলের সেই দৌড়, সেই তাড়াহুড়ো, সেই পাগলামি। ও জানে, মেহুলের সেই ছুটে যাওয়া আর ইরশানের ফোন না ধরার রহস্যটা একই সুতোর দুই প্রান্ত। যেখানে এক প্রান্তে আছে অভিমান, আরেক প্রান্তে ভালোবাসা। তাই মিতুল নিশ্চিন্ত গলায় বলেছিল, ওরা দু’জন একসাথেই আছে।
ইরশানকে তো হারে হারে চেনা আছে। মেহুল পাশে আছে বলেই দুনিয়ার কোনোদিকে খবর নেই। ফোনও এই কারণেই অফ। এখন বউ পেয়েছে না? বউ পাশে থাকলে তো মুখ দিয়ে ‘টু’ শব্দও বেরোয় না। জার্মানিতে থাকাকালীন ইরশান প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের মতো একগুঁয়ে ভঙ্গিতে মিতুলের কাছে বলেছে, “আমি মেহুলকেই চাই, মেহুল মানে শুধুই মেহুল! ও ছাড়া আর কাউকে না।”
মিতুলের মাথায় হাত। সে নিজের বাচ্চা সামলাবে নাকি এই বুড়ো বাচ্চা সামলাবে? মিতুল সেদিন অফিসে, জরুরী কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ ইরশানের ভিডিও কল। বেশ গম্ভীর মুখে বলছে,
— “আপু, আমি ডিসিশন নিয়ে ফেলেছি।”
— “কী ডিসিশন?”
— “আমি দেশে ফিরব তারপর বিয়ে করব।”
— “ওয়াও! কার সাথে?”

ইরশান একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে হাসল। তারপর বলল,
— “মামার মেজো মেয়েকে।”

মিতুল হো হো করে হেসে উঠল,
— “পাগল যে হয়ে গেছিস, বাসায় জানে? তোর মা এই কাহিনী শুনলে হার্টফেল করবে ফর শিওর। মেহুল তোকে চেনে না, তুইও ভালোভাবে চিনিস না। আগে জানাশোনা হোক। তারপর…”

ইরশান একদম বাচ্চাদের মতো মুখ ভার করে বলল,
— “চিনি না বলেই তো চিনতে চাইছি! অনেকগুলো বছর তোমার বোনকে ছাড়া কাটিয়েছি, আর পারব না। এখন তাকে আমার প্রয়োজন।”
ওপাশ থেকে মিতুল হাসতে হাসতে দেখছে ইরশানের চোখেমুখের অন্যরকম ভাব। সেই ভাবে স্পষ্ট লেখা; একেবারে নিখাদ, একগুঁয়ে নির্মল ভালোবাসা। এই ভরসাই তো করেছে, এখনও করে, বাড়ির সবাইকে করতেও বলে।
.
ইরশান কাপড়চোপড় কিনতে গিয়ে মেহুলের জন্য কতকগুলো শাড়ি কিনে এনেছে। শাড়ির সাথে যাবতীয় প্রয়োজনীয় সবকিছু। মেহুলের ভ্রু স্বাভাবিকভাবেই কুঁচকে গেল। ও বলল,
— “এসব আমি কি করব? একটা মানুষ সারাদিন শাড়ি পড়ে থাকতে পারে নাকি? আশ্চর্য।”

ইরশান হেসে মাথা হেলিয়ে বলল,
— “পারবে না কেনো? চাইলেই পারে। কারও জন্য যদি এতটুকু সুখের মুহূর্ত সৃষ্টি করা যায়, তাহলে ক্ষতি কোথায়?”

ইরশানের কথার সারমর্ম বুঝল মেহুল। সত্যি ও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একটা বিশেষ কিছুতে জর্জরিত হয়ে পড়ছে। বিচ্ছিন্নভাবে বলল,
— “উফফফ, কী যে করেন না আপনি!” বলেই মনে হলো এই কথাটা বলা উচিত হয় নাই। ভুল বলে ফেলেছে। সুখের মুহূর্ত যেখানে সৃষ্টি হবে সেখানে সুখ বিচ্ছিন্ন কথা বলা দন্ডনীয় অপরাধ। যে মানুষটা ভালোবাসা নিয়ে এত সরল চিন্তা করতে পারে, তাকে আসলে ভালোবাসাতেই রাখতে হয়। মেহুল আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কী হচ্ছে ওর সাথে? তড়িঘড়ি করে শাড়িগুলো আবার নেড়েচেড়ে দেখল। একটা শাড়ি হাতে নিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
— “আচ্ছা, ঠিক আছে… যেহেতু এখানে কয়েকদিন আছি তাই শাড়িই পড়ি বরং। শাড়ি তো ভালোই, তাইনা? সবদিন তো শাড়ি পড়া হয়না, এই কয়েকদিন শাড়িতেই থাকি।”

তারপর ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় কয়েকটা গাট্টা মারল। কাউকে ভালোবাসলে যে এরকম দূকুল হারা অবস্থা হয়, তা তো আগে জানত না। এতক্ষণ তো ও লজ্জায় লাল হয়েছিল, এখন নীল আর বেগুনিও হতে হলো। কারণ শাড়ি পড়ে আসার পর ইরশানের সামনে যেতেই সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এইমুহূর্তে তাকে কি ভ্যাবলাকান্ত উপাধি দেওয়া যায়? মেহুল ভেবে পেল না। এমন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে একটু খেকিয়ে উঠল,
— “এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? জীবনে কোনোদিন মেয়ে মানুষ দেখেননি?”

ইরশান কি বলবে? সে তো সামনে থাকা ললনাকে দেখে সব ছলনা ভুলে গেছে। কাকে দেখেছে কিংবা দেখে নাই অত মনে আছে? সে একচুলও চোখ সরালো না,
— “মেয়ে মানুষ দেখেছি তো আগেও, তবে আজ তোমাকে প্রথম দেখছি।”

মেহুল ভুরু কুঁচকে তাকাল,
— “প্রথম? মানে কী?”
— “শাড়ি পরে তো তোমাকে প্রথম দেখছি।”

মেহুল মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “তাই বলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে হবে?”

ইরশান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— “হাঁ করে কোথায়? মুখ তো বন্ধই আছে। কিন্তু তোমাকে অপ্সরার মতো লাগছে কেন?”
মুহূর্তের মধ্যে মেহুলের গাল লাল হয়ে উঠল। হাবিজাবি কথার আড়ালেও প্রশংসার তীব্রতা টের পেল ও। চোখ নামিয়ে নিল। ইশশশ, এত সোজাসাপ্টা বলার দরকার আছে? চুপ থাকতে পারে না? অপ্সরার মত লাগছে তো চুপচাপ বসে দেখো, কথা বলতে কে বলেছে?

মেহুলের মনের কথাও বোধহয় বুঝল ইরশান। সে আর কিছুতেই চোখ সরালো না। দৃষ্টি আটকে আছে, ওর অনুভূতি, নিঃশ্বাস; সবই চোখে ধরা পড়ছে। মেহুল বারবার চোখ নামাচ্ছে, আর হঠাৎ তাকাচ্ছে…
কিন্তু তা ইরশানের তাতে কিছু যায় আসে না; সে বুঝতে পারছে, মেহুলকে লাজ বা সংকোচ নয়, বরং আনন্দ এবং চরম নির্লজ্জ উচ্ছ্বাস ঘিরে রেখেছে। ওর ভ্রুর ভাঁজ, স্বীকারের অঙ্গভঙ্গি, সঙ্কোচ থেকে যতই চোখ সরানোর চেষ্টা করুক, ততই সব মনের মধ্যে বিদ্রোহ করছে। মেহুলের লজ্জা আর আনন্দের দ্বন্দ্ব মনে মনে বলছে, “এই চোখ, এই দৃষ্টি… কী যেন মনে কষে যাচ্ছে।”
ইরশানের দৃষ্টি মেহুলের গায়ে গায়ে বুনে দিচ্ছিল নিঃশব্দ রঙ। অদ্ভুত ব্যপার, ওর একটুও অস্বস্তি হচ্ছিল না। উল্টো মনে হচ্ছিল, এই দৃষ্টির ভেতরেই কোথাও একটা নরম কারুকাজ খচিত নকশা তৈরি হচ্ছে। মনের গভীরে একটা প্রশান্তি বাসা বাঁধছে, যার নাম হয়তো ভালোলাগা, হয়তো নিঃশব্দ মুগ্ধতা।
“স্বামী” শব্দটা নিয়ে কখনো ভাবেনি মেহুল। জানতো কেউ ভালো হয়, কেউ খারাপ। কেউ মানবিক, কেউ অমানবিক। কিন্তু ইরশান? সে কোন দলে পড়ে? এই বর্তমানের উষ্ণ, মায়ামাখা ভালোলাগা কি ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে? নাকি সময়ের ঢেউ একে ধুয়ে নিয়ে যাবে নিঃশব্দে?
ভাবনার ঠিক সেই মুহূর্তে ইরশান চোখ ফিরিয়ে নিল। বোধহয় ওর আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ শেষ হলো!
মেহুল জিজ্ঞেস করল,
— “দেখা শেষ?”

ইরশান মৃদু হেসে বলল,
— “শেষ নয়, চোখটা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।”
— “চোখেরও আবার বিশ্রাম লাগে নাকি?”
— “যখন কাউকে এত সুন্দর লাগে, তখন দেখতে দেখতে চোখও হাপিয়ে যায়। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে তো রূপের ছটায় পুড়তেই হবে।”

মেহুল তৎক্ষণাৎ ভুরু তুলে তাকাল। ঠোঁটে খেলে গেল একটুখানি হাসি,
— “পুড়লে পুড়বেন। তাকিয়েই থাকুন। তাকান দেখি।”

ইরশানও চোখ না সরিয়ে জবাব দিল,
— “ঝলসে যাব।”
— “তাতে আমার কি?” মেহুল বলল নরম গলায় অথচ তির্যক ভঙ্গিতে।

ইরশান গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,
— “তোমারই তো সব।”
— “সব কোথায় পেলাম?”

ইরশান ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা রেখে এক ইঞ্চি এগিয়ে এলো, বলল,
— “যা পেতে চাও তা মুখে বললেই…”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মেহুল সোফা থেকে কুশন তুলে ছুঁড়ে মারল,
— “আপনার ঝলসে যাওয়াই উচিত!”

ইরশান নিরীহ মুখে তাকাল,
— “আমি কি করলাম? তবে এখন একটা কাজ করব… যেটার জন্য তোমার অনুমতি লাগবে।”
— “কীসের অনুমতি?”

ইরশান চোখে চোখ রেখে তাকাল,
— “তোমার কাছে আরও এক ধাপ কাছে যাওয়ার। ক্যান আই বি প্রোমোটেড ফ্রম আ পার্ট-টাইম হাজব্যান্ড টু আ ফুল-টাইম ওয়ান?”

মেহুলের মুখে হাসিটা থেমে গেল না। চোখ নামিয়ে দিল মাটির দিকে। কণ্ঠের ভেতর কাঁপন লুকিয়ে বলল,
— “এমন কথা বলতে হয় নাকি?”
— “আই নিড ইউর আন্সার।”

মেহুল এবার মুখ তুলে তাকাল। শাড়ির আঁচলটা হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
— “ফুল-টাইম হাজব্যান্ড হলে তো ফুল-টাইম আমারই হবেন, তাইনা। যদি তাই হন, তাহলে ওকে।”

ইরশান হেসে মাথা নাড়ল,
— “এই তো, এই জবাবটাই শুনতে চাচ্ছিলাম।”
ওদের মধ্যে থাকা দূরত্ব তখন এত ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল যে, নিঃশ্বাসের শব্দও পার্থক্য তৈরি করতে পারছিল না। বাইরে ঢেউ ভাঙছে, ভিতরে নীরবতা গড়ে উঠছে; এই নীরবতাই তখন সবচেয়ে গভীর সংলাপ। আজ এই মানুষটার সামনে লজ্জাও নিজের সাজপোশাক হয়ে শরীরে আবৃত হয়ে যাচ্ছে। মেহুল কম্পিত চিত্তে ইরশানের বুকে মুখ লুকালো। ইরশানও ধীরে মাথা নত করে ওর কপালে কোমলভাবে ঠোঁট রাখল। সাথে সাথে গোটা মহাবিশ্ব দুইজন মানুষকে ঘিরে থমকে গেল।
.
দুদিন পর পতেঙ্গার সমুদ্রের বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দ পেছনে ফেলে, তারা বাড়ির দিকে রওনা হলো। ওদের আগমনে বাড়ির সমস্ত মানুষ নির্বিকার রইল, যেন প্রত্যেকেই জানত এই মুহূর্তটা আসবেই। ইরশান দেখল তার একমাত্র শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই, শ্বাশুড়ি, আর অন্যান্য আত্মীয়স্বজন সকলেই সেখানে উপস্থিত। কালই ফ্লাইট, আর তাই সকলে বিদায় দিতে এসেছে। কুমিল্লায় প্রথম দেখার অভিজ্ঞতাটা ভালো ছিল না। আর এখন? গলায় গলায় পিরিতি। শুধু পারছে না একজন আরেকজনকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে। তা দেখে ইরশান মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “আরে দুদিনের দুনিয়ায় চারদিনই যায় অসুরের নাটক দেখতে দেখতে।”

শনিবার এলো। যাওয়ার সময় ইরশান আর যেতে পারল না। এয়ারপোর্টে গিয়েও ফিরে আসতে হলো। কারণ মেহুল… ও এয়ারপোর্ট এসেও কাঁদতে কাঁদতেই ফিরে গেল। ও যদি এইভাবে কান্নাকাটি করে তবে ইরশান যেতে পারবে?
মেহুলের কাছে এই অনুভূতিটা প্রথম। কলিজা ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। চোখে অজান্তেই জল জমেছে, গলা ভেঙে গেছে, মুখ ভিজে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে দমাতে পারে নাই। অবশেষে ইরশানকেই ফিরতে হয়েছে। অনেক বুঝিয়ে মেহুলকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। ও যে বাচ্চাদের মত এমন হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে কাঁদতে পারে, তা কেউ চিন্তাই করতে পারে নাই। অবশেষে সবকিছু ঠিক করে সবদিক সামলিয়ে পরের সপ্তাহে ইরশান রওনা হলো জার্মানি…
.
.
.
চলবে…..
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২৩৩০

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ