#পরী
পর্বঃ০৩
মীরা সারহানের দিকে তাকালো।দেখলো,সারহানের চোখ ভাবলেশহীন। দরজার ওপাশে থাকা মেয়েটা বললো, দাঁড়িয়ে আছো কেন?এসো ভাবী, ভাইয়া।
মীরা হেসে ভিতরে ঢুকলো।সারহানকে জিজ্ঞেস করলো,এই কি তোমার নয়নতারা?
-উফ,মীরা।বাজে বকো কেন? আমার হতে যাবে কেন?
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।এক বিভার যন্ত্রনাতেই সে অতিষ্ঠ আবার এসে জুটলো নয়নতারা।
মীরা নিজের ঘরে এসে ফ্রেশ হলো। খানিকটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।এমন সময় বিভা তার ঘরে এলো।আদুরে গলায় বললো,ভাবী…এই ভাবী…
মীরা চমকে উঠলো।এই মেয়ে তাহলে মিষ্টি করেও কথা বলতে জানে?
-ভাবী আমি আর নয়না ঘুরতে যাবো। তুমিও প্লিজ আমাদের সাথে চলো।
– না বিভা। আমার অনেক টায়ার্ড লাগছে।তোমরা যাও…
-তাহলে ভাইয়াকে বলো আমাদের সাথে যেতে।
মীরা হাসলো।বললো, আমি বলতে হবে কেন? তোমরাই বলো।সে মন চাইলে যাবে।
-কি যে বলো না… তোমার পারমিশন ছাড়া কি আর ভাইয়া কিছু করে…
বিভা একপ্রকার খোঁচা মেরেই কথাটা বললো।
মীরার রাগে চোখ লাল হয়ে গেলো। তবুও,সে কিছু বললো না।
একটু পর সারহান এসে বললো,মীরা আসো ঘুরে আসি। মীরা রাজি হলো না।
সারহান তখন বললো, তুমি না গেলে আমিও যাবো না।
মীরা জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা সারহান নয়না এখানে কেন এসেছে?
-তোমাকেই দেখতে এসেছে। আবার বিভার সাথেও দেখা করে গেলো।
মীরা বললো,”ওহ”
নয়না আর বিভা মোটামুটি রেডি হয়ে সারহানদের রুমে এলো।এসেই শুনলো,সারহান যাবে না।
ওদের দুজনের মুখেই রাগের ছাপ পরলো। মীরা বুঝতে পেরে বললো,সারহান তুমি ওদের সাথে যাও। আমি তো জার্নি করলে নাজেহাল হয়ে পরি। আবার কালই চলে যেতে হবে।তাই, আমি যেতে পারবো না।
বিভা বললো,থাক ভাবী এখন আর আমাদের সামনে যেতে বলতে হবে না। তুমিই যে মানা করেছো আমরা তা জানি।
সারহান কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই নয়না বললো, চুপ থাক বিভা। এভাবে কেন বলছিস? আমাদেরই তো ভুল।ভাইয়ারা মাত্র জার্নি করে এসেছে।
চল।উনারা রেস্ট নিক।
ওরা চলে যেতেই সারহান বললো,বিভাটা বড্ড অবুঝ। সেই তুলনায় নয়না অনেক বুঝদার।তাই না মীরা?
মীরা হাসলো।বললো,হলে তো ভালোই!
-এই মীরা তুমি কি কালকেই চলে যাবে?
-জ্বি জনাব।
-কিভাবে যাবে?
-গাড়িতে করে।
-ধুরর…আমাকে ছেড়ে কিভাবে যাবে?মায়া লাগবে না?
মীরা সারহানের হাত ধরলো।”এভাবে বলছো কেনো?”
.
বিভা বললো, কেমন রাগ লাগছে আমার জানিস?২ দিন হয়নাই বিয়ে হইছে এখনই ছড়ি ঘুরাচ্ছে।মন চায়… আচ্ছা তোর কি রাগ হলো না?
নয়না হেসে বললো,বাদ দে।
যদিও মনে মনে তারও খুব রাগ হয়েছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নয়না আবার নতুন উদ্যমে হৈচৈ করা শুরু করলো। কিচেনে গিয়ে বললো,আন্টি আপনার কষ্ট করে রান্না করতে হবে না।আমি করবো আজকে।
সারহানের মা মানা করলো। কিন্তু, নয়না নাছোড়বান্দা।
সে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো ,কে কি খাবে?যে যা বলবে সবই আজ রাঁধবে সে।
একসময়, নয়না সারহানদের রুমে এলো জিজ্ঞেস করতে,যে তারা কি খাবে ডিনারে।
দরজা নক না করেই হুট করে ভিতরে ঢুকে পরলো সে।সারহান আর মীরাকে খুব কাছাকাছি দেখে কেন জানি তার চোখে পানি চলে আসলো।সে এই দৃশ্য দেখতে চায়না। কিন্তু, তবু সরতেও পারছে না, শুধুই রাগ বাড়ছে তার।
হঠাৎ, মীরা নয়নাকে দেখে ফেললো।বললো, নয়না।কারো রুমে ঢোকার আগে নক করতে হয়।এটা সাধারণ জ্ঞান।
নয়না স্যরি বলে সেখান থেকে চলে গেলো।
মীরা সারহানের বুকে একটা কিল মারলো।বললো,দরজা খোলা মনে থাকে না বিড়াল কোথাকার?
সারহান খুব দুঃখ পাওয়ার ভঙ্গী করে আবার হেসে ফেললো।
বললো,ওয়েট। দরজা লাগিয়ে আসি।
-মানে? লজ্জা নেই তোমার?কি মনে করবে সবাই?ছিঃ
.
রান্নাঘরে এসে নয়না চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।বিভা বললো,কিরে কি হয়েছে?
নয়না বিষন্ন গলায় বললো, তোর ভাবী কি আমার চেয়েও সুন্দরী? আমার চেয়েও বেশি সাংসারিক?
-কি বলছিস তুই? তুই কই আর ঐ নুডুলস কই…ও তো তোর নখের যোগ্যও না।
-তাহলে তোর বাবা কেন রাজি হলো না বলতো…..
নয়নার চোখে পানি চলে আসে।
সে কৈশোর থেকেই সারহানকে পছন্দ করতো।বিভার মা-ও খালি বলতো, নয়না কে আমার ছেলের বউ বানাবো।সে কত লজ্জা পেতো শুনে। লজ্জার পাশাপাশি খুশিও হতো প্রচুর…কত ভাবনা এঁকেছিলো মনে মনে সারহানকে নিয়ে। কিন্তু, কিছুই হলো না।
বিভা বললো,এই তুই কাঁদছিস?ঐ নুডুলস তোরে কিছু বলছে?
নয়না হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
বিভা বললো,দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি।
-প্লিজ ঝগড়া করে আমাকে কালার করিস না।
-না করবো না। তুই শুধু মাছের আইটেম রান্না করে বসে থাক। আমাদের ভাবীজান মাছ খায়না। বড়লোক তো বেশি তাই!আজ বুঝবে মজা।
নয়না ইলিশ মাছ রাঁধলো। রূপচাঁদা মাছ রাঁধলো।কুঁচো চিংড়ির বরা বানালো।
বিভা ফ্রিজে যেই দুইটা ডিম ছিল সেগুলো সরিয়ে রাখলো।
খাবার টেবিলে বসে মীরা দেখলো মাছের বাইরে কিছুই নেই।একটা ভর্তা,ডাল কিছুই না।
সবাই ঘ্রান শুঁকেই রান্নার বেশ প্রশংসা করছিলো। কিন্তু,সারহান থমথমে গলায় বললো, মীরা তো মাছ খায়না।
তখন সবার খেয়াল হলো।বাবা বললেন, আসলেই।বিভা তুই না রান্নাঘরে ছিলি।
বিভা বললো, আমার মনে নেই।
মীরা বললো, সমস্যা নেই।আমি ডিম ভেজে নিয়ে আসি একটা। কিন্তু,সে কিচেনে গিয়ে দেখলো ডিম নেই।
মাথা নিচু করে পুনরায় ফিরে এলো।
বিভা বললো,দেখলি কত নেকামি?কোন দেশের প্রেসিডেন্ট উনি মাছ খায়না।নাটক…..
মা বললেন, মীরা একদিন মাছ নাহয় খেলে একটু।
মীরা বললো, সমস্যা নেই। আপনারা খান। আমার ক্ষিধা নেই তেমন।
সারহান বললো, আমিও খাবো না।
-সেকি কথা ভাইয়া?না খেয়ে থাকবে কিভাবে?আর এতো কষ্ট করে রান্না করলো নয়না।
বিরক্ত হয়ে মা বললেন, মীরা তোমার সবকিছুতেই ঝামেলা না করলে শান্তি লাগে না?কি হয় মাছ খেলে?মাছে-ভাতে বাঙালি জানো না? এখুনি বসো….
মীরা বললো,প্লীজ মা। আমার বমি আসে। আমি বিস্কুট-টিস্কুট খেয়ে নিবো।আপনারা খান।
-ভাবী আসলে নয়না রান্না করেছে দেখে ইচ্ছা করেই খাচ্ছে না।
মীরা হেসে বললো,বিভা আমিও তো বলতে পারি নয়না ইচ্ছা করেই মাছ রেঁধেছে যেন আমি না খেতে পারি।
মা ধমক দিলেন মীরাকে। বললেন,মেহমানের নামে কি বলছো এইসব?ছিঃ….
মীরা নিজের ঘরে চলে এলো। তার দোষটাই সবার চোখে পরে।
সারহানও এলো পিছু পিছু।বললো,চলো আমরা রেস্টুরেন্টে যাই।
মীরা বললো, কেন এতো ঝামেলা পাকাতে চাচ্ছো? এখন রেস্টুরেন্টে গেলে কত কথা শুনতে হবে তুমি কি বুঝো না?
-তাহলে যা রান্না হইছে তাই দিয়েই খাবে, চলো।
সারহান মীরার হাত ধরে টান দিলো।
-উফ!যাও তো সারহান।এতো বিরক্ত করছো কেন?
– আমি তোমাকে বিরক্ত করছি?
-নয়তো কি?
-মোটেই না মীরা।উল্টা তুমি বাড়িশুদ্ধু লোককে বিরক্ত করছো।সারা দুনিয়ার মানুষ যেটা খেতে পারে তুমি পারো না কেন?
মীরার প্রচন্ড রাগ উঠে গেলো।
-এই তুই কি অন্ধ?চোখে দেখিস না কিছু?নয়না যে ইচ্ছা করে মাছ রেঁধেছে তুই কি বুঝিস না?
-তুই-তুকারি করছো কাকে?আমি তোমার স্বামী।
-ছাই।
-মীরা ও এমন করবে কেন?
-কারণ ও আমাকে হিংসা করে বুদ্ধু।
-হুম তোমাকে তো সারা দুনিয়ার মানুষই হিংসা করে। তুমি যে নিজেকে কোন ক্লিওপেট্রা মনে করো আল্লাহই জানে। নিজেকে আয়নায় দেখো আগে।
সারহান তাচ্ছিল্য করে হাসলো।মীরাও হাসলো।সে কি বুঝাতে চাইলো আর সারহান কি বুঝলো।
ওদের কথা কাটাকাটির শব্দ শুনেই নয়না আর বিভা ওদের ঘরে এসে হাজির।
নয়না বললো,কি হয়েছে ভাবী? কেন সারহান ভাইয়ের মতো লক্ষ্মী বরটার সঙ্গে তুমি ঝগড়া করছো? কোনো মেয়ে এমন স্বামী পেলে ঝগড়াও করতে পারে বুঝি?
মীরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,চড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো।বের হ আমার ঘর থেকে।
নয়নার চোখে পানি চলে এলো। দৌড়ে চলে গেলো সে।বিভা বললো,ইয়া আল্লাহ এ কোন ডাইনী আমার ভাইয়ের বউ হয়ে এসেছে।২ দিন হয়নি বিয়ে হইছে এখনই আসল রূপ বের হয়ে গেছে।
মীরা আরো রেগে বললো,তোকে এখন জুতার বারি দিবো।বের হ।
বিভা এক রাশ অবাক ভাব নিয়ে প্রস্থান করলো।
সারহান মীরার উপর রেগে গেলো।
বললো, মীরা তোমার ব্যবহার ঠিক করো,নাহলে আমার ব্যবহার খারাপ হয়ে যাবে ।
মীরা জোরে জোরে হাসতে লাগলো।রাগ আর কষ্টের একটা মিশ্র অনুভূতি তার মধ্যে।
সারহান বললো, আমি সিরিয়াসলি বলছি মীরা। আমি কেমন তুমি বুঝতে পারো নি এখনো।
-তুমি কেমন আমার বুঝা হয়ে গেছে।
মীরা বালিশ নিয়ে শুয়ে পরলো।
সবাই এমন কেন করে তার সাথে?সে তো খুব ভালো একটা মনোভাব নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলো। নিজের মা-বাবা ছাড়া অন্য দের মা-বাবা ডাকতে তার মুখে আটকাতো কতো। তবুও সে ডেকেছে মন থেকেই।বিভাকেও শুরুতে কত বার ক্ষমা করেছে।আর কতো?একটা মানুষ কতটাই বা মানিয়ে নিতে পারে।রাগ না করে থাকতে পারে।
সারহানও মন খারাপ করে ভাবছে মীরার আচরণের কথা। তার তো কষ্ট হচ্ছিলো মীরা না খেয়ে থাকবে বলে।তাই তো সে মীরাকে জোর করলো। মীরা তার ভালোবাসাটা বুঝতেও পারলো না।উল্টা বিরক্ত হলো।রাগ দেখালো!
.
সেবার মীরা ঢাকায় আসার পর সারহান বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলো। কিন্তু,মীরা উঠায় নি। তার খুব রাগ সারহানের উপর। কিন্তু,কতক্ষন আর কল না ধরে পারা যায়। আবার,কল ধরলেও ঝগড়া হয়ে যায়। এদিকে মীরার মা-ও মীরাকে খুব বকাবকি করেছে। কেন সে সবার সাথে মিলেমিশে চলতে পারে না।
মীরা তার মাকে নয়নার কথা বলে।মা তখন সবটা শুনে বলে,তাহলে তো তোর আরো বেশি ও বাড়িতেই থাকা উচিৎ।নয়তো দেখবি ২ দিন পর তোর বর আর তোর নেই।
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,না থাকলে নাই।এতো কাউকে জোর করে রাখতে পারবো না।যে থাকার সে এমনিই থাকবে।
“সিনেমার ডায়লগ বন্ধ করতো মীরা।জীবনটা সিনেমা না।”
মীরা চুপ করে থাকে। কিছুই বলে না।পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরলে দেখে সারহানের মা কেমন যেন মুখ অন্ধকার করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মীরা জিজ্ঞেস করলো,মা আপনি কি অসুস্থ?
মা বললেন, সেই খবর তুমি রাখবা কেন? ঘরের মানুষ হয়ে তুমি থাকো বাইরে বাইরে।আর,পরের মেয়ে আমার সেবা-যত্ন করে!
-নয়না এখনো যায় নি?
মা চেঁচিয়ে ওঠে,ও থাকবে না কি যাবে সেটা দিয়ে তুমি কি করবে?
মীরা নিজের ঘরে আসে।শুরুতে ভাবে,চুপচাপ বসে থাকবে। কিন্তু,সে তা পারে না।
নয়নাকে ডাকে নিজের ঘরে। এরপর দরজা লাগিয়ে দেয়।বাইরে থেকে বিভা চেঁচামেচি করতে থাকে…কি কথা তোমার নয়নার সাথে যেটা আমার সামনে বলা যাবে না?
কিন্তু,মীরা দরজা খোলেনা।
নয়না অস্বস্তি নিয়ে হাসে।”কি বলবে ভাবী?”
মীরাও হেসে বলে, তেমন কিছু না। কয়েকটা প্রশ্ন করবো আর কিছু এডভাইস দিবো বড় আপা হিসেবে যদি কিছু মনে না করো।
-জ্বি ভাবী….
-তুমি সারহানকে পছন্দ করো তাই না?
নয়না মাথা নিচু করে বসে থাকে। উত্তর দেয় না কোনো।
মীরা বলে, নয়না তুমি কি চাও বলো তো…. তুমি কি চাও আমার আর সারহানের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক? এরপর, তুমি সারহানকে বিয়ে করবে?
-ছিঃ ভাবী এসব কি বলছো?আমি সারহান ভাইকে আগে পছন্দ করতাম তাই বলে আমি কি এতোই খারাপ যে এসব চাইবো?
-শোনো নয়না। তুমি চাইলেও সেটা ভুল। তোমার বাবা-মাও কোনো দিন চাইবে না একটা বিবাহিত ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হোক।সমাজেও তোমাকে ছোট হতে হবে।লোকে বলবে, আরেক মেয়ের সংসার ভেঙে তুমি এসেছো।
-ভাবী আমি এসব কিছুই চাই না ট্রাস্ট মি।
-চাও না?তাহলে এ বাড়িতে পরে আছো কেন? তোমার বাবা যথেষ্ট ধনী।এমন না যে থাকার জায়গা নেই বলে এসেছো।আর,যদি বান্ধবীর সাথেই দেখা করতে এসেছিলে তাহলে তো ১-২ দিন থেকেই চলে যেতে। কিন্তু, তুমি এসে এমন ভাব করছো যেন তুমি এই সংসারের বউ।রান্না-বান্না থেকে শুরু করে বাবা মায়ের যত্ন নেয়া।এসব কেন করছো? তুমি এমন ভাবেই মায়ের মন জয় করছো যে উনি মনে করছে আমাকে বউ করে আনাই ভুল হয়েছে। এভাবে কেন আমাদের মধ্যে অশান্তি করছো বলো? তুমি যদি চাও সারহানকে বিয়ে করবে তাহলে আমাকে বলো। আমি চলে যাই।এতো ধোঁয়াশা আমার ভাল্লাগে না।এতো যুদ্ধ করে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
নয়নার চোখে পানি চলে এসেছে।সে বললো,ভাবী আমি এমন নই।
-তুমি কেমন তাহলে?
নয়না আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
-তুমি দেখতে সুন্দর। পড়াশোনা জানা মেয়ে। ঘরের কাজও অনেক ভালো পারো।সব দিক থেকেই পারফেক্ট। তোমার অনেক ভালো জায়গায় বিয়ে হবে।বুঝেছো মেয়ে?তাই,এ বাড়িতে না থেকে নিজেদের বাড়ি ফিরে যাও।অন্যের সংসার ভেঙে মানুষ সুখী হয় না।অন্য কারো চোখে পানি ঝরিয়ে নিজে হাসা যায় না। সৃষ্টিকর্তা হাসতে দেন না। তুমি ভালো জায়গায় বিয়ে করো। এরপর,স্বামীকে নিয়ে বেড়াতে এসো। আমরাও যাবো তোমাদের বাড়িতে….
নয়না চুপচাপ উঠে চলে যায় মীরার সামনে থেকে।
পরদিন সকালেই সে ব্যাগ গুছিয়ে বিদায় নেয় সারহানদের বাড়ি থেকে।
…
নয়না চলে যাওয়ার পর থেকেই বিভার সে কি চিৎকার- চেঁচামেচি। তার ধারণা, মীরা নয়নাকে অপমান করেছে এর জন্যই নয়না চলে গেছে।সে যা তা বলে মীরা কে গালি দিতে থাকে।
মীরা সহ্য করতে পারে না। কিভাবে সে বড় ভাবীকে এভাবে গালি দিতে পারে?
মীরা বলে,বিভা আমি তো এই বাড়ির লোক।আর, নয়না বাইরের। কেন তুমি বাইরের কারো জন্য নিজের ভাবীকে অপমান করছো?সে কয়দিন আর থাকবে এখানে?কেউ কি নিজের বান্ধবীর বাসায় এতো দিন থাকে?
-চুপ থাকো ফাল তু কোথাকার। ও কি তোমার টাকায় খেতো? তোমার বাড়িতে থাকতো?
-এটা আমারও বাড়ি।
-তোমার বাড়ি এইটা?আজকে তালাক দিলে আজকেই চলে যাইতে হবে আসছে উনি উনার বাড়ি।
– এমনি এমনি তালাক দিলে তোমার ভাইকে জেলের ঘানি টানাবো না বুঝি? তার আগে তো বাড়ি ছাড়বো না।বুঝো নি?
বিভা চোখ পাকিয়ে তাকায়। এরপর বিলাপ করতে থাকে।
-কি ডাইনী আনছো ঘরে গো আম্মা।কত কইছি এরে আইনো না।এরে দেখতেই দেখা যায় ডাইনী। মাথা ভর্তি ডাইনীর মতো চুল। তখন তো শোনো নি। এখন নিজের ছেলেরে জেলে যাইতে দেখবা আর কি….
.
সন্ধ্যায় সারহান অফিস থেকে ফিরে ঘরে পা রাখতেই বিভা কাঁদতে কাঁদতে বলে,ভাই তোমার বউ নয়নারে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিছে।আমি প্রতিবাদ করায় বলছে তোমাকে নাকি জেলে দিবে…….
বিভা বলতেই থাকে।সারহান শুনতে পায়না কিছুই তেমন ভালো করে। তার প্রচন্ড বিরক্ত লাগে। মাত্র এতো কাজ করে বাড়ি ফিরেছে!
মা-ও এসে মীরার নামে বিচার দেয়।
সারহান বিরক্তি নিয়ে রুমে ঢুকে।বলে, মীরা তুমি যদি ঝামেলা করার মোটিভ নিয়েই এবাড়িতে এসে থাকো তাহলে প্লিজ ফিরে যাও।
মীরা আর সারহানের মধ্যে আবার ঝগড়া হয়।মা সবসময় মীরাকে বলে, তুই চুপ থাকবি।
কিন্তু চুপ কতক্ষন থাকা যায়?বিনা দোষেই সারাক্ষন অপদস্থ কতক্ষন হওয়া যায়?
সারহান আর মীরার কথা কাটাকাটি দেখে একসময় বাবা আসেন।তিনি ধমকে দুজনকে থামান।এরপর,সারহানকে নিজের ঘরে ডাকেন।
সারহান বাবার রুমে এসে মাথা নিচু করে বসে থাকে।
বাবা বলেন, তোর মীরার সাথে এতো ঝগড়া হয় কেন বলতো?
সারহান বলে,ও ই তো করে।
– ও এমনি এমনি করে আমি সেটা বিশ্বাস করি না।ও বড্ড ভালো মেয়ে।বুঝলি,ওর কাছে আমি অনেক বার গিয়েছি রোগ-শোক নিয়ে।যখন,ব্যবসার কাজে ঢাকা থাকতাম।ওকে সবসময়ই খেয়াল করতাম একটুও সাজে না। কানের দুলও পরে না।অথচ, অন্য ডাক্তার-রা কত সাজগোজ করে আসে। সেই কারণেই মূলত চোখ পরে আমার।একদিন ওকে কারণ জিজ্ঞাসা করলাম।ও বললো, হাসপাতালে রোজ কত রোগী মারা যায়।কত আপনজনের আহাজারি।এতো কষ্টের মধ্যে কি সাজগোজ করা যায়? আমার সামনে একটা মানুষ কাঁদছে প্রিয়জন হারিয়ে আর আমি সেই জায়গায় পটের বিবি সেজে বসে থাকবো কিভাবে?
সেদিনই আমার ওকে খুব পছন্দ হয়েছিল।মনে হয়েছিলো,এই মেয়েটা সবার চেয়ে আলাদা। এরপর ওকে ফলো করেছি। ওদের বাসায় কত বার গিয়েছি। ওদের প্রতিবেশীদের থেকে খোঁজ নিয়েছি ওর ব্যাপারে।ওর পরিচিত সবাই ওর সুনাম করেছে, একজনও বলেনি মেয়েটা খারাপ।সব মিলিয়ে আমি বুঝেছি ও পারফেক্ট।তাই, আমার মনে হয় তোর দোষই বেশি।
সারহান মাথা নিচু করে বাবার ঘরে আরো কিছুক্ষণ বসে থাকে। এরপর নিজের ঘরে চলে আসে।
লেখিকা- লিলি
