#পরী
পর্ব:০২
মীরা এমনিতেই খুব ভোরে ওঠে। একদম অন্ধকার থাকতেই তার ঘুম ভেঙে যায়।আজও তাই হয়েছে। সারহানকে ডিঙিয়ে আস্তে আস্তে নিচে নামে সে।সাদার মধ্যে কালো ফুল তোলা নকশার একটা শাড়ি পরে নেয়; কান,গলা সব খালি।বারান্দায় পা রাখতেই দেখা হয় সারহানের মায়ের সাথে।উনি বিষ্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রয়।
বলেন, তুমি এটা কি শাড়ি পরেছো মীরা? নতুন বউ-রা পরবে লাল-কমলা শাড়ি।আর, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি বিধবা। আল্লাহ মাফ করুক।
মীরা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মা বললেন,যাও শাড়ি বদলে আসো।
মীরা চলে আসলো নিজের রুমে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।এতো ভারী শাড়ি-গয়না পরতে একদমই ভালো লাগে না তার।সে সারহানকে ডাকে।বলে,সারহান আমার শাড়ি পরারই অভ্যাস নেই আর এতো ভারী ভারী নতুন শাড়ি পরলে হাঁসফাঁস লাগে।
সারহান ঘুমচোখে বলে,তাহলে পরো ক্যান?
মীরা বলে, তোমার মা যে পরতে বলে খালি।
সারহান শোয়া থেকে উঠে বসে।”তোমাকে কতবার না বলেছি মীরা, তোমার মা…. তোমার মা করবে না।শুনতে কেমন শোনায়? আমার মা মানে তোমারও মা।
মীরা হেসে বলে,তাহলে কি তুমি আমার ভাই?
-প্লিজ মীরা সব বিষয়ে হাসাহাসি ভাল্লাগে না।
মীরা বলে,ওকে স্যরি…স্যরি।এখন শাড়ি কি চেঞ্জ করবো?
-কি দরকার?
-মা বলেছেন নতুন শাড়ি পরতে। তুমি একটু মাকে বলবে আমার ভালো লাগে না।আর তোমার বাড়ি তো আমারও বাড়ি। নিজের বাড়িতে এতো সেজে থাকতে হবে কেন?
সারহান কিছুটা হেসে বলে, তোমাকে না সাজলেও পরীর মতোই লাগে…
-আমি জানি….
.
ব্রেকফাস্টের সময় মা বললেন,মীরা। তোমাকে আমি শাড়িটা চেঞ্জ করতে বলেছিলাম না?
মীরা সারহানের দিকে তাকায়।
“ওর দিকে তাকাচ্ছো কেন?”
সারহান বলে,মা…ও যেটাতে কমফোর্টেবল সেটাই পরুক না।ও তো ঘরের মানুষই।আর, তাছাড়া…….
হঠাৎ করে মা ভীষণ রেগে যান।
-“তোকে জিজ্ঞেস করেছি আমি? তোর বউয়ের কি মুখ নেই?সে নিজের টা নিজে বলবে। তুই কেন বলছিস?”
মীরা ঝামেলার আভাস পেয়ে বললো, আচ্ছা মা এখনই চেঞ্জ করে আসছি।
-কেন ভাবী? এখন কেন চেঞ্জ করতে যাওয়ার নাটক করে ভালো সাজছো? তুমি যদি আসলেই ভালো মেয়ে মানুষ হতে তাহলে শ্বাশুড়ির কথা ডিনাই করতে না। তোমার অন্য শাড়ি পরতে মন না চাইলে তুমি মাকেই বলতে। কিন্তু,না। তুমি ভাইয়া কে বলে একটা ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টা করলে।
মীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।এই মেয়ের কি মাথা খারাপ নাকি?সে ঝগড়া লাগাবে কেন?
মা বলেন, চুপ থাক বিভা।ওর বিধবা সেজে ঘুরতে মন চাইলে ও তাই করুক।আমি কিছুই বলবো না।
মা আর বিভা নিজেদের ঘরে চলে যায়।
মীরা পুরোই বোকা বনে গেছে।সে অসহায়ের মতো সারহানের দিকে তাকালো।সারহান বললো, কেন এতো ঝামেলা করো?একটা শাড়ি পরা নিয়ে…
এরপর,সারহান অফিসে চলে যায়।মীরা ডাইনিং টেবিলের প্লেট-বাটি গুলো গুছাচ্ছিলো।
পাশের ঘর থেকে বিভার গলা শোনা যাচ্ছে।
-দেখেছো মা?দুই দিন হয় নাই বিয়ে হইছে এখনই ছড়ি ঘোরানো শুরু করে দিছে। আমার কথা তো শুনো নাই তখন…এই নুডুলসের মধ্যে কি সৌন্দর্য তোমরা দেখছো কে জানে…..২ দিন পরে তোমারে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে।
মা জবাবে কিছুই বললেন না।
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।তার মন চাইছে বিভাকে ঠাঁটিয়ে দুটো চড় মারতে।এতো প্যাঁচ কেন এই মেয়ের মধ্যে?
রাতের খাবার একা মীরা-ই বানিয়েছে।
খাবার টেবিলে বসে বিভা আবারো ভুল ধরলো।
-কি রাঁধছো এইগুলো ভাবী?
মীরা বললো, কেন বুঝতে পারছো না?
– লবণের পরিমাণ ঠিক নাই।মরিচ তো দেওই নাই।মিষ্টি তরকারি।এই গুণ নিয়ে আবার সংসার করতে চলে আসছো বাব্বাহ…
মীরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,বিভা তোমার বয়স কত? বড়জোর বিশ? তুমি জানো আমি তোমার থেকে বয়সে কত বড়? বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তুমি কি তা শিখো নি?
বিভা সারহানের দিকে তাকালো,”দেখছো ভাইয়া?”
মীরা বললো,ও কি দেখবে? আমার সাথে তোমার কি শত্রুতা সেটা আগে বলো?তোমরা আমাকে না আনলে কি আমি এ বাড়িতে আসতে পারতাম? তোমাদের যদি আমাকে পছন্দই হয়নি তাহলে তোমার ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিছো কেন?আর,দিয়েছোই যখন তাহলে এখন এতো দোষ ধরছো কেন? আমার মাথার চুল তোমার ভালো না লাগলে নাই।সেটা মনে মনে রাখো। সারাক্ষন ঢোল পিটিয়ে বলো কেন? তোমার পছন্দে তো আমার কিছু যায় আসে না।
আর বেশি ঝাল খাওয়া লিভারের জন্য ক্ষতিকর, বেশি লবণ খাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর।বুঝেছো? এরপর থেকে আমি কোনো কিছু ভুল করলে আমাকে ভদ্র ভাবে এসে বলবে,ভাবী তোমার এই কাজটা ঠিক হয় নি।আমি সেটা শুধরে নিবো।কিন্তু, যদি এভাবে খোঁচা মেরে আমাকে কথা বলো তাহলে এক চড় মেরে তোমার সব দাঁত ফেলে দিবো।
বিভা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছু ক্ষন।এরপর ভাতের প্লেট ঢিল মেরে নিচে ফেলে। চোখের পানি মুছে বলে, তোমরা কেউ কিছু বলছো না?পরের বাড়ির মেয়ে আমাকে অপমান করছে। আমি আর এখানে থাকবো না। ভাইয়ের কাছে তো এখন বউই সব।একশো বার বলবো। তোমার মাথার চুল ভূতের মতো,পেত্নীর মতো। তোমাকে দেখায়ও পেত্নীর মতোই।
মীরা নিজের ঘরে এসে পরে।সারহান অবশ্য অনেক ক্ষন পরে আসে।বলে,কেন তুমি বিভার সাথে এমন করলে?ও এখন খাচ্ছে না কিছুই।
মীরা বললো, তুমি চুপ থাকো সারহান।আমারও ভাই আছে,ভাবী আছে। ভাইকে যতোটা সম্মান করি ভাবীকেও ততোটাই করেছি।তর্ক করার কথা মাথায়ই আসে নি কোনোদিন।আর, তোমার বোন বিয়ের দিন থেকে কি শুরু করেছে তুমি দেখো না?
– যাই হোক।ওকে স্যরি বলে আসো যাও।
-ননসেন্স। ভুল করেছি নাকি যে স্যরি বলবো?
রাগ নিয়ে মীরা পাশ ফিরে শুয়ে পরলো।
সারহানেরও খুব রাগ হলো।
সে ঠিক করে, মীরার সাথে আর কথা বলবে না নিজে থেকে।মীরাকে শুরুতে যতটা নম্র মনে হয়েছে ও আসলে ততোটাও না।
শেষ রাতে মীরা সারহানকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলো।কিন্তু,সারহান হাত সরিয়ে দিলো।
মীরার কান্না চলে আসলো একদম।কালকে এমনিতেই সে ঢাকা চলে যাবে।সারহান তো অফিস রেখে যেতে পারবে না। তার তো একাই থাকতে হবে।আর,আজ রাতটাও সারহান এমন রাগ দেখাচ্ছে।চোখের পানি মুছে মীরা আবার সারহানকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে।সারহান আবারও একই কাজ করে। মুখে বলে,কি সমস্যা তোমার?
-ঘুম আসছে না।
-তো?আমি কি করব?
-আমাকে জড়িয়ে ধরো…..
বলতে গিয়ে মীরার চোখে আবার পানি আসে।
সারহানেরও এবার মায়া লাগে।
“জড়িয়ে ধরেছি বলে ভেবো না যে তোমার উপর আমার রাগ নেই।আমি কিন্তু যথেষ্ট রেগে আছি বুঝলে? তোমার জন্য বিভা খাওয়াটাও শেষ করতে পারলো না।
মীরা মনে মনে বলে, আমিও তো খাইনি।অথচ,আমারটা তুমি খেয়াল করলাই না…..
…..
সকালে মীরা মাকে বললো, আমি একটু বাইরে যাবো। দরকার ছিলো।
মা বললেন, দরকার থাকলে যাবে।আমি কে তোমাকে ধরে রাখার?
মীরা চলে এলো শপিং মলে।মায়ের জন্য শাড়ি, বাবার আর সারহানের জন্য পাঞ্জাবী, বিভার জন্য একটা থ্রি-পিস আর একটা শাড়ি কিনলো।বিভার ড্রেস গুলোই সে সবচেয়ে দাম দিয়ে কিনেছে।যেন বিভা কোনো ক্ষুত ধরতে না পারে।
বাড়িতে এসে সবাইকে সে ড্রেসগুলো দিলো।সারহানের মায়ের মনটা এবার একটু নরম হলো।বললো,মীরা তুমি কেন টাকা নষ্ট করতে গেলে?
মীরা কিছু বলার আগেই বিভা বললো,টাকা নষ্টের কি আছে মা? নিজের বাড়ির লোকের জন্যই তো কিনেছে।
মীরা হাসলো।টাকা খরচ করার বেলায় নিজের বাড়ির লোক ভাবতে হবে। কিন্তু,কাল রাতে বিভাকে কিছু সত্যি কথা বলাতে সে হয়ে গেছিলো পরের বাড়ির মেয়ে।বাহ!
মীরা বিভার দিকে ড্রেস বাড়িয়ে দিলো।বললো,নাও বিভা।
-তোমার ড্রেসে প্রস্রাব করি আমি। আমার স্বামীর টাকা-পয়সা কম নাই যে তোমার থেকে নিবো।আর নিতেই হলে আমার ভাইয়ের থেকে নিবো।
মীরার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে যায়। তবুও নিজেকে সামলায় সে।বলে,বিভা তোমার ভাইয়ের থেকে নেওয়া মানে তো আমার থেকেই নেয়া, আবার আমার থেকে কিছু নেয়া মানেও তোমার ভাইয়ের থেকে নেয়া।আমরা দুজন তো একই।ধরো।দেখো তোমার পছন্দ হলো কিনা।
বিভা তবুও ড্রেসগুলো নেয়না।মা ধমক দিয়ে বলে, তোর ভাবী কত কষ্ট করে এনেছে।নিচ্ছিস না কেন? নে…
বিভা ছোঁ মেরে নিয়ে নেয়। এরপর অন্য রুমে চলে যায়।
মীরা ব্যাগপত্র নিয়ে বাইরে আসে।সাথে মা-ও আসে।বলে,মীরা…সংসারে বেশি প্রায়োরিটি দিতে হয় মেয়েদের।স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়।যাচ্ছো বাঁধা দিবো না। কিন্তু, শীঘ্রই চলে আসবে।এখানেও তো কতো হাসপাতাল-ক্লিনিক।
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।বললো, আচ্ছা মা।
সারহান অফিসে চলে গেছে সেই সকালেই।মীরা জানে সে মীরার উপর রেগে আছে।
তাই বলে সকালে একটু ভালো করে কথা বলতে পারতো। একটু বলতে পারতো, তুমি যেও না। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।
থাকতে নিশ্চই পারবে। তবুও, একটু মিথ্যা করে বলতো।তাতে, মীরার মনটা খুশি হতো। ছেলেদের মন এতো পাথর হয় কিভাবে?আর মেয়েদের মনই বা এতো মোমের মতো বানানোর কি দরকার ছিল স্রষ্টার।খালি মায়া লাগে,কান্না পায়।
মীরা চোখের পানি মুছতে মুছতে ষ্টেশনে আসে।বাসে উঠে জানালার পাশে বসে সে।তার পাশে এক বয়স্ক ভদ্রলোক। হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মীরা দেখে, সারহান।মীরা হাত নাড়ায়,এই সারহান।
সারহান মীরাকে দেখে দৌড়ে বাসের দিকে আসতে থাকে। ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে।সারহান তবুও দৌড়াচ্ছে। মীরার কেমন অস্থির লাগছে।মন চাইছে বাস থেকে নেমে যেতে।সে পাশে বসা বয়স্ক মানুষটাকে বললো,একটু জায়গা দিবেন?
তিনি বললেন,মা…বাস তো ছাইড়া দিছে। এখন কি করতে বাইর হইতে চাইতাছো?আসলে, আমি বুড়া মানুষ তো নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়।
মীরা কেবল বললো,ওহ।
এরপর,বাইরে তাকিয়ে দেখলো সারহান অনেক পিছনে পরে গেছে।অতো দূর থেকেও সে স্পষ্ট দেখতে পেলো সারহানের চোখে পানি টলমল করছে।সে শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছছে।
খুব বিশেষ একটা দৃশ্য নয়। কিন্তু, মীরার এত্তো মায়া লাগছে সারহানের জন্য!কি মায়াবী লাগছে সারহানকে।মীরা ডুকরে কেঁদে উঠলো।
বয়স্ক লোকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,কি হয়েছে মা?
মীরা কাঁদতেই থাকলো।
উনি আবার জিজ্ঞেস করলো, কোনো সমস্যা তোমার?
মীরা চোখ মুছে বললো, আমার কোনো সমস্যা নেই চাচা।আমি খুব খুব সুখী মানুষ।
এরপর ফোন বের করে সে সারহানকে ম্যাসেজ লিখলো, তুমি একটা পাগল।
.
মীরা ঢাকা পৌঁছেছে বিকালে। বাসায় এসেই তার মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে সে।মা কতো কিছু আয়োজন করে রেখেছে।খেতে বসে মীরার মা জিজ্ঞেস করলো, তোর শ্বশুরবাড়ির সবাই কেমন রে?
মীরা মুখ বাঁকা করে বললো,সবাই খারাপ। সবচেয়ে খারাপ বিভা।
-কেন কি করেছে সে?
– উফ মা কি করেনি বলো।এতো হিংসা এই মেয়ের পেটে।খালি হিন্দি সিরিয়াল দেখে আর আমার সাথে ভিলেনগীরি করে। আমার মন চায় ওকে এক থাপ্পর মেরে তক্তা বানিয়ে দিই।কলেজে সব জুনিয়র আমার ভয়ে কাঁপতো।আর,এই মেয়ে আমাকে আজে বাজে কথা বলে।
– এটাই তো সংসার মীরা।তোকে মানিয়ে চলতে হবে।
– আমি নতুন ও বাড়িতে গেলাম, আমি মানিয়ে চলবো কিভাবে? উল্টো,ওরা আমার সাথে মানিয়ে চলবে।একা বাবা-মা,ভাই-বোন ছেড়ে ওদের বাড়ি গিয়েছি।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,শোন মীরা ভাইয়ের বউকে ননদদের প্রথমে একটু হিংসা লাগেই।
– কই মা আমার তো লাগেনি।
মা বললেন, তোর আর তোর ভাইয়ের মধ্যে অনেক দূরত্ব। তোর ভাই হোস্টেলে থাকতো ,তুইও থাকতি। দুইজনের দেখাই হতো না। কিন্তু,সব ভাই-বোনের সম্পর্ক তো এমন না।ছোটো বেলা থেকে কত আদর করে বোনকে বড় করে ভাইয়েরা।ভাইয়ের চোখের মণি হয়ে থাকা বোন যখন দেখে বিয়ের পর ভাই আর তাকে আগের মতো প্রায়োরিটি দিচ্ছে না তখন তো একটু হিংসা লাগবেই।
-এতো হিংসা লাগলে ভাইয়ের কোলে উঠে বসে থাকুক।ভাইকে বিয়ে দেয় কেন?
– ছিঃ মীরা।তুইও তো বিভার মতোই আমি দেখছি। তোর বড় মামার যখন বিয়ে হলো তখন কাজ থেকে ফিরে আগে সে তোর মামিকে ডাকতো।তোর মামির হাতে বাজার-সদাই দিতো।এর জন্য আমার এতো কষ্ট লাগতো।হিংসাও লাগতো প্রচুর।পরে অবশ্য আস্তে আস্তে বুঝ-জ্ঞান হলো। এখন তুই বল তোর মা-কি খারাপ?
মীরা না সূচক মাথা নাড়লো।আহ্লাদী কন্ঠে বললো, তুমি আমার সেরা মা।
.
সারহান সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলো একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। নিজের ঘরে এসে কেমন একলা লাগতে লাগলো। এতো বছর ধরে এই ঘরে তো একাই থাকতো সে।অথচ, মীরাকে ছাড়া কি খালি খালি লাগছে ঘরটা।
সে মীরাকে কল করলো।মীরা রিসিভ করে বললো, সারহান আমি এখন হাসপাতালে যাচ্ছি। আজকে নাইট ডিউটি। তোমার সাথে পরে কথা বলবো।
মীরা কল কেটে দেয়।
সারহান ডিনার করতে বসে খুব চুপচাপ থাকে,কিছুটা যেন মনমরা।তখন তার বাবা বলে উঠলেন,,সারহান তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে আয়।বিয়ের পরতো একবারও গেলি না।
সারহানের মুখটা ঝলমল করে উঠলো মুহুর্তেই।বাবা কিভাবে যে তার মনের কথা বুঝতে পারে……
একদিন পরেই সে মীরাদের বাসায় এলো।
সারহান না বলেই চলে এসেছে মীরাকে সারপ্রাইজড করবে বলে।এসে দেখে মীরা হাসপাতালে।
মীরার মা অনেক ব্যস্ত হয়ে পরলেন।বললেন, তুমি একটু বলে আসবা না বাবা?
সারহান মা’কে মানা করলো তার আসার কথা মীরাকে জানাতে।
এরপর, হাসপাতালে চলে গেলো।সারহানকে দেখেই নার্সরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। সারহান মীরার কেবিনে ঢুকতে চাইলো। কিন্তু, একজন তাকে আটকালো।বললো, সিরিয়াল ভাঙা যাবে না…
তখন, আরেকজন নার্স এসে বললো উনি ইমার্জেন্সি পেশেন্ট।উনাকে ঢুকতে দিন।
বলেই হাসলো শব্দ করে। আশ্চর্য!এরা জানে কিভাবে সে মীরার স্বামী?
অবশেষে,সারহান কেবিনে ঢুকলো।মীরা নিচের দিকে তাকিয়ে কি যেন লিখছে।তাকে খেয়ালই করেনি।না তাকিয়েই বললো,বসুন।কি সমস্যা বলুন….
মীরার মাথার চুল টানটান করে বাঁধা।চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।কেমন রাগী রাগী লাগছে…সারহান ছোট বেলায় ডাক্তারদের খুব ভয় পেতো। একবার ডাক্তারের ভয়ে প্যান্টে হিসু করে দিয়েছিলো। আচ্ছা,এই ঘটনা কি মীরাকে বলা যাবে?নাহ,মীরা ক্ষেপাবে সারাক্ষন।
-কি ব্যাপার কি সমস্যা?
-আমার বউ বলেছে আমি নাকি পাগল….
সারহান খুবই স্যাডনেসের সঙ্গে কথা টা বললো।
মীরা চমকে তাকালো।হেসে ফেললো সাথে সাথেই।
-এইই ডাক্তার!
-হুম বলুন।
-এতো সুন্দর করে হাসেন কেন? আমার রোগ তো এমনিতেই সেরে গেলো। ওষুধ কোম্পানির তো বিরাট লস হওয়ার আশঙ্কা।
মীরা এবার জোরে হেসে ফেললো। বললো, তুমি যে এতো নেকামি জানো আগে তো বুঝতেই পারিনি।
.
মীরা আর সারহান হাসপাতালের ক্যান্টিনে বসে আছে।সারহান খুব উশখুশ করছে।এতো স্যাভলনের গন্ধ কেন হাসপাতালে?নাকি শুধু সে-ই পায়….
-জানো মীরা আমার হাসপাতাল একদম ভাল্লাগে না।কেমন ভয়ভয় লাগে।মনে হয় চারপাশে মৃত্যুর দূত ঘুরা ঘুরি করছে।
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,কালকেও একজন মারা গেলো।
-তোমার খারাপ লাগে না মীরা ?
-যতক্ষন অ্যাপ্রোন পরে থাকি কেন জানি মায়া লাগে না। বাসায় গিয়ে ড.মীরা থেকে যখন শুধু মীরা হয়ে যাই তখন খুব মায়া লাগে।কান্না পায়।
সারহান কথা ঘুরানোর জন্য বললো,চলো আমরা বাইরে কোথাও যাই।
-চলো।
করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় একজন বলে উঠলো,কি ড. মীরা কি অবস্থা?
মীরা হেসে সারহানকে দেখিয়ে বললো,ইনি আমার হাসব্যান্ড। তুমি না দেখতে চেয়েছিলে?আর,সারহান ইনি ড. মেহেদী। আমার কলিগ।
সারহান মেহেদীর সাথে হ্যান্ডশেক করলো। কিছু ক্ষন কথাও বললো।
বাইরে এসে মীরা বললো, তোমার খুব ভাব হলো মেহেদীর সাথে?
-হু। চমৎকার মানুষ।
-তা ঠিক।এনিওয়ে, তুমি কি জানো ও আমার এক্স?
সারহান দাঁড়িয়ে পরলো।”এক্স মানে?”
-এক্স মানে এক্সরে।হা..হা…
-সব সময় হাসি তামাশা ভাল্লাগে না মীরা।
-ওর সাথে আমার ৪ বছর রিলেশন ছিল।কি নেকা নেকা চিন্তা-ভাবনা করতাম আমরা দুইজন। এমনকি বাচ্চা-কাচ্চার নাম ও ঠিক করে ফেলেছিলাম।হা…হা…ফানি না?
সারহান খুব রাগী রাগী মুখ করে তাকিয়ে আছে।
সারহানকে রাগলে এতো কিউট লাগে কেন? মীরার মন চায় ওর গালে ধরতে।নাহ,এমন করলে আরো রাগবে।
-কি হলো সারহান দাঁড়িয়ে আছো কেন?চলো।
-ঐ গরুরে দেখতেই আবা*লের মতো লাগে।আমি তো মনে করছি ৬৫ বছর বয়স।কথা বলে কেমন কাকলাশের মতো।
মীরা হাসলো।”একটু আগে না বললা চমৎকার মানুষ..”
-বা** বলছি।
-ছিঃ সারহান তুমি এতো গালি দাও… তুমি বাসর রাতেও গালি দিছো।বলছো,বা***র ছিটকিনি লাগে না কেনো?আমি জীবনে ভুলবো না।বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনিদের কাছে এই গল্প করবো।
-চুপ থাকো।কথা ঘুরানোর চেষ্টা করে লাভ নেই।
-এই সারহান!রাগ করলে?
-না গো…রাগ হইনি। খুউব খুশি হয়েছি।এতো খুশির খবর আগে দেও নি কেন?
-তুমিও তো মেঘবতীর সাথে কত রংঢং করেছো, আমি কিছু বলেছি?
-কিসের সাথে কি মিলাও?আমি তখন ছোট ছিলাম। জীবনে ঐ মেয়ের হাতটাও ধরিনি। আচ্ছা,মীরা তুমি কি এই মেন্দি পাতার হাত ধরছো?
-সারহান,কি যে বলো তুমি?
সারহান একটু খুশি হলো। তখন মীরা আবার বললো,চার বছরের প্রেম। শুধু কি হাত ধরবে নাকি?আরো কত কিছুই তো হয়েছে।
সারহান হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেলো।
এরপর বললো, আমার কাজ আছে।আল-বিদা।
বলেই সে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে যেতে লাগলো।
মীরা হাসতে লাগলো।ইশ!কি হিংসা এই ছেলের….
বাসায় গিয়ে মীরা দেখে তার ছোট বোন ইরা এসেছে হোস্টেল থেকে। আর, সারহান ইরার সাথে বসে বসে টিভি দেখছে।
ইরা দৌড়ে এসে মীরাকে জড়িয়ে ধরলো।আস্তে আস্তে বললো,আপু মেহেদী কে? দুলাভাই তার নামে খুব দূর্নাম করলো।
মীরা কিছুই বললো না। রাতে মীরা সারহানের রুমে এসে বললো,সারহান না বলে এসে খুব অন্যায় করেছো।আমি ইরাকে রিকোয়েস্ট করে বাসায় এনেছি একদিনের জন্য।ওর সামনে পরিক্ষা।আমি বলেছি, তুই একরাতের জন্য আয়।২ বোন একসাথে শোবো। গল্প করবো।
-তো ? গিয়ে শোও।আমি কি বারণ করেছি?
-সত্যিই?
-হুম।
মীরা আবার একটু পর এসে বললো,ইরা পড়বে। আমাকে বের করে দিলো। সারহান তুমি এমন বাচ্চাদের মতো করছো কেন?একটা মানুষের প্রাক্তন থাকতে পারে না?
– তো ওকেই বিয়ে করতে…
– উঃ বিয়ের মতো সিরিয়াস রিলেশন হয়ে ওঠে নি।
-৪ বছর কি তাহলে ঘোড়ার ঘাস কেটেছো?
মীরা হাসলো।
-কথায় কথায় দাঁত বের করবে না।
একটু পর সারহান বললো,মীরা এখানে একটু দূরেই আমাদের এক পরিচিতের বাসা।ইনভাইট করেছে।যাবা?
-তুমি না বলছো তোমাদের ঢাকায় কোনো রিলেটিভ নেই।
-উনারা রিলেটিভ না। আমার বাবা আর ঐ আংকেল একসাথে চাকরি করতো। আংকেলের মেয়ে নয়না বিভার খুব ভালো বান্ধবী ছিলো।
-এই নয়নার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো তাই না?
-তুমি কিভাবে জানলে?
-বিভাকে বলতে শুনেছি।
-ওহ।জানো মীরা।ও যেমন সুন্দরী ওর নামটাও তেমন সুন্দর। নয়নতারা।কি সুন্দর তাই না?
-হু। এতোই সুন্দর যে শুনে বমি আসলো।
-কি ডাক্তার সাহেবা?এখন কি হিংসা হচ্ছে? একটু আগে বাচ্চা বললে আমায় এর জন্য। আমার কেমন লাগছিল তবে বোঝো।
মীরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।বললো, আমি মিথ্যা করে বলেছি ৪ বছর। তোমাকে রাগানোর জন্য।আসলে ৪ মাস ছিলো,তেমন কিছুই না।তাই বলে, তুমি কি যেন নয়নতারা না আঁখিতারা তাকে সুন্দরী বলবে?
সারহান অবাক হয়ে দেখলো মীরার চোখে পানি চলে এসেছে।
-এই মীরা! তুমি কি পাগল? আমি মজা করেছি।ও তো পেত্নীর মতো দেখতে।
-থাক…আমি জানি ও আমার চেয়ে অনেক সুন্দর।আর, মিথ্যা বলতে হবে না।
-উঁহু। তুমি বেশি। তুমি আমার পরী।
-ছাই… পরীদের চুল কি নুডুলসের মতো?
-আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হচ্ছে নুডুলস।এর মতো সুন্দর জিনিস পৃথিবীতে নাই।
মীরার হাসি চলে আসে।
সারহান মীরাকে জড়িয়ে ধরে।”আচ্ছা মীরা তুমি যে কথায় কথায় কাঁদো তোমার পেশেন্টরা জানে?”
-মোটেই আমি কাঁদি না। তোমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে এই রোগ হয়েছে।ঐ নয়নার সাথে আমি দেখা করবো না।
-করো না।চাইলেও পারবে না।আমি তোমাকে রাগানোর জন্যই বলেছি। ওদের বাড়ি এখানে না, অনেক দূরে।
-বাহ… আমার টেকনিক আমার উপরই ইউজ করলে।স্মার্ট…..
.
সারহান আর মীরা বৃহস্পতিবারে নিজেদের বাড়িতে ফিরার জন্য বের হলো।অবশ্য, শুক্রবার বিকালে মীরা আবার চলে আসবে।তার ডিউটি আছে।
বাড়ি পৌঁছে দরজায় নক করলে মীরা দেখলো,একটা পরীর মতো মেয়ে দরজা খুলেছে।
মীরা অবাক হলো বেশ।একে তো আগে দেখেনি সে।সারহানের ভাবীও তো না…..
মেয়েটা তখুনি বললো, আসসালামুআলাইকুম ভাবী…. আমি বিভার বান্ধবী……
.
লেখিকা-লিলি
