Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"এক মুঠো প্রণয়এক মুঠো প্রণয় পর্ব-২৫+২৬

এক মুঠো প্রণয় পর্ব-২৫+২৬

#এক_মুঠো_প্রণয়
#পর্ব_২৫
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ

” জ্যোতি?দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে তোর মতামত কি?দ্বিতীয় বার বিয়েটা কিন্তু আগের বারের মতো আমার অনিচ্ছাতে কিংবা হুটহাট জোরজবরদস্তিতে হবে না।এবার আরামে বিয়ে করে সুন্দর একটা সংসার করব। তোর কিছু বলার থাকলে বলতে পারিস।”

টংয়র দোকানে কাঠের বেঞ্চে ধোঁয়া উঠা এক কাপ চা হাতে নিয়ে বসে ছিল জ্যোতি। পাশাপাশি বসে আছে মেহেরাজও।নির্লিপ্ত চাহনীতে চেয়ে ছিল পাশে থাকা রমণীর দিকে।ডাগর চোখজোড়ায় , শ্যামলা মুখে আজ ভিন্ন মায়া, ভিন্ন তৃপ্তি।মুখে সাঁজ নেই তবুও এই মুখে তাকিয়েই হৃদয় ক্রমশ শীতল হয়ে জমে উঠল তার।বুকের ভেতর সে জমাটবাঁধা হিম অনুভূতিরা জানান দিল পাশে থাকা নারীর গভীর মায়ায় ডুবে মরার যন্ত্রনা৷ নিজের করেও নিজের করে না পাওয়ার যাতনা। অনুুভূতির তীব্র অস্থিরতা সহ্য করেও অনুভূতিদের কথা সেই রমণীর সামনে জানান দিতে না পারার কষ্ট। মুহুর্তেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শ্বাস ফেলল মেহেরাজ।তারপর কি মনে করেই ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই আয়েশ করে কথাগুলো বলে ফেলল সে।অন্যদিকে জ্যোতি সবেমাত্র চায়ের কাপে চুমুক দিতেই কানে পৌঁছাল মেহেরাজের আকস্মিক বলা কথাগুলো। মুহুর্তেই থমকে গেল তার চাহনী।চোখের সামনে ভেসে উঠল সমান্তার প্রতিচ্ছবি। মেহেরাজদের বাসা ছেড়ে আসার আগে মেহেরাজের সাথে সামান্তার হাত ধরার সেই দৃশ্য।বুক ভার হয়ে উঠল তৎক্ষনাৎ। মস্তিষ্কে গিয়ে সর্বপ্রথম গেঁথে গেল যে কথাটা তা হলো, মেহেরাজ দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে চাইছে।দ্বিতীয়বার কারো সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইছে।কোন নারীর পক্ষেই বোধ হয় এমন একটা মুহুর্তকে আনন্দমুখর মুহুর্ত হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। জ্যোতিও পারল না। মুখভঙ্গি বদলে গেল।তপ্তশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল মেহেরাজের এভাবে আকস্মিক ভোরে ভোরে এতদূর এসে হাজির হওয়ার পেছনে তাহলে এই কারণটাই লুকায়িত ছিল।অবশ্য মেহেরাজ যে তার কারণে কোনদিন দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না এমনও তো প্রতিজ্ঞা বদ্ধ ছিল না। তবুও সে মানতে পারল না।চাপা যন্ত্রনা ভেতরটা নড়বড়ে করে দিচ্ছে।জ্বলন্ত আগুনের শিখায় যেন ঝলসে গেল তার হৃদয়। ঠোঁট চেপে কিছুক্ষন নিশ্চুপ থম মেরে বসে থেকেই পরমুহুর্তে ভাবল, যে মানুষটা তার নয় কিংবা যে মানুষটা তার ছিলই না কোনদিন সে মানুষটা দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে তার কি? সে তো অনেক আগেই মেহেরাজকে বলে এসেছিল সামান্তাকে বিয়ে করে সংসার গুঁছিয়ে নিতে। তখন কেন দ্বিতীয়বার বিয়ে করল না?আজ এতগুলো দিন, এতগুলো মাস পরই দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথা মাথায় আসল?জ্যোতি শ্বাসরুদ্ধকর সে মুহুর্তটায় নিশ্চুপে পাশ ফিরে তাকাল মেহেরাজের দিকে৷ এই প্রথম তার মধ্যে জ্বলন্ত স্ত্রী স্বত্ত্বা টের পেল। বুঝতে পারল কোন স্ত্রীই তার স্বামীকে ভাগ করতে পারে না। স্বামীকে অন্যের সাথে ভাগ করার অনুমতি ও দিতে পারে না।কোনকালেই পারে না। তবুও জ্যোতি বুকে পাথর চেপে অনুমতি দিল। উপরে উপরে নিজেকে একদম স্বাভাবিক দেখিয়ে বলল,

” আমার কিছু বলার থাকবে কেন মেহেরাজ ভাই? আপনি নির্দ্বিধায় বিয়ে করতে পারেন দ্বিতীয়বার। আমি তো আগেই বলেছিলাম কোন অধিকার নিয়ে আপনার সামনে যাব না।হ্যাঁ, আপনি যদি আমার আর আপনার বিয়েটা নিয়ে ইনসিকিউরড ফিল করেন তাহলে বরং খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে পারেন। আমি ডিভোর্সে অমত করব না।তাহলেই বোধহয় স্বাধীনভাবে,দ্বিধাহীনভাবে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারবেন। এটাই তো চাইছেন রাইট?”

জ্যোতির স্পষ্ট ভাবে বলা কথা গুলোতে মুহুর্তেই মেজাজ বিগড়ে গেল মেহেরাজের। চোয়াল ও শক্ত হয়ে উঠল। রাগে, জেদে চোখমুখ টানটান করল মুহুর্তেই।তাদের বিয়েটা আর পাঁচটা বিয়ের মতো স্বাভাবিকভাবে হয়নি।কারণবশত সুন্দরভাবে সংসারও করা হয়ে উঠেনি তাদের। তাই মনে মনে ভেবে রেখেছিল সংসার শুরুর আগে আনুষ্ঠানিক ভাবে সবার উপস্থিতিতে আরো একবার বিয়ে নামক বিষয়টা সম্পন্ন করবে।দ্বিতীয়বার বিয়েটা সে অন্যকাউকে নয় বরং জ্যোতির সাথে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়েটা হবে ভেবেই বলেছিল।কিন্তু মেয়েটা বুঝল না। উল্টো “ডিভোর্স” নামক শব্দটা তুলে আনল যা আকস্মিক তার মেজাজ খারাপ করতে বাধ্য করল।লালাভ দৃষ্টিতে জ্যোতির দিকে তাকিয়েই শীতল গলায় বলে উঠল সে,

“ডিভোর্সের কথা আসছে কেন?তিনবছর আগে না আমাকে বলেছিলি, আমি সামান্তাকে বিয়ে করে নিতে পারি৷কিন্তু তোর সাথে যেন বিয়েটা ভেঙ্গে না দিই। সেসব এখন কোথায় গেল?”

মেহেরাজের মুখে সামান্তা নামটা আবারও শুনে জ্যোতি মনে মনে নিশ্চিত হলো বিয়েটা সামান্তার সাথেই হচ্ছে।মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে এক সমুদ্র যন্ত্রনা নিজের ভেতর চেপে রেখে স্থির ভাবে তাকাল মেহেরাজের চোখের দিকে। কি অমায়িক সুন্দর সেই চোখজোড়া। শুধু চোখজোড়া নয়, তার সামনে বসে থাকা আস্ত পুরুষটাই অমায়িক সুন্দর। এই অমায়িক সুদর্শন পুরুষটাই ভাগ্যক্রমে তার স্বামী হলেও বরাবরই এই পুরুষটা আর তার মাঝে ছিল বিস্তর দূরত্ব, অধিকারহীনতা আর দায়িত্বের সমীকরণ। জ্যোতি ঠোঁট এলিয়ে বলল,

” সত্যি বলতে কি, নিজেকে কারোর জীবনে এইটুকু সমস্যার কারণ হওয়া দেখাটাও অপমানজনক মেহেরাজ ভাই। বিশেষ করে বিয়ের মতো এমন একটা সাংঘাতিক সম্পর্কে। এটা ঠিক, আমি আপনাকে ভালোবেসেছি কিংবা ভালোবাসি। আপনার দায়িত্ব, আচার আচরণ, ব্যাক্তিত্ব সবকিছুতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। সত্যি বলতে আমি এখনও আপনার দায়িত্ব পালন, আচার আচরণ, ব্যাক্তিত্ব এসবকে সম্মান করি। আপনার সাথে বিয়েটা অনিচ্ছায় হলেও একটা সময় পর বোধহয় আমি তা মেনে নিয়েছিলাম নির্দ্বিধায়। এমনকি আজও আমি মানি যে আমি বিবাহিত। কিন্তু তাই বলে আপনার সুখে বাঁধা হবো কেন? আমার আর আপনার বিয়ে নামক সত্যটা যদি আপনাকে সুন্দর-সাবলীল জীবন শুরু করতে ভয় দেখায় তাহলে সত্যটা মুুঁছে ফেলাই বোধ হয় উচিত। তাই না মেহেরাজ ভাই?”

মেহেরাজের চোখজোড়ার রক্তিমতা গাঢ় হলো। হাতের চায়ের কাপটা আওয়াজ করেই টেবিলের উপর রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

” না, উচিত না।”

কথাটা শুনে জ্যোতির মুখে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যতা।বছর তিনেক আগে তার দাদীর আর আব্বার প্রশ্নের বিনিময়ে মেহেরাজের বলা উত্তরগুলো আবারও মনে করিয়ে দিল মস্তিষ্ক। সে উত্তরগুলোতে স্পষ্ট ছিল যে মেহেরাজ বাধ্য হয়েই বিয়েটা মেনেছিল। বাধ্য হয়েই জ্যোতির প্রতি দায়িত্ব পালনে রাজি হয়েছিল। সেসময়ে এত এত যত্ন, পাশে থেকে আগলে রাখা সবকিছুই যদি দায়িত্ব হয়ে থাকে তবে আজ বোধহয় সেই দায়িত্বটুকুও অবশিষ্ট নেই। তাই তো দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা সুন্দর সাবলীল ভাবেই বলে নিয়েছে তার সম্মুখে।এসব ভেবে মেহেরাজের দিকে আগের মতোই স্থির তাকিয়ে থেকে বলল,

” উচিত না হলে তো এই ভোর ভোর আপনি অতোদূর থেকে এখানে ছুটে আসতেন না মেহেরাজ ভাই। আপনার যে দ্বিতীয় বিয়ের এত তাড়া এটা জানলে বিশ্বাস করুন, এত কষ্ট করে আপনার এতদূর আসারও প্রয়োজন ছিল না। আমি ডিভোর্সে একবারও অমত করতাম না। আমি সত্যিই চাই আপনি আর সামান্তা আপু সুখে সংসার করুন। সুন্দর ভাবে বাঁচুন।সুন্দর একটা জীবন উপভোগ করুন।সত্যিই চাই। ”

মেহেরাজ ক্ষ্রিপ্ত চাহনীতে তাকাল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে তপ্ত মেজাজে বলে উঠল,

“সামান্তা আসছে কেন এখানে?”

জ্যোতি নরম গলায় উত্তর দিল,

” সামান্তা আপুকেই তো বিয়ে করবেন।তাই না?ভালোবেসেছেন যখন নিজের ইচ্ছায় বিয়ে তো অবশ্যই তাকেই করবেন।এই বিষয়ে তো দ্বিধা নেই কোন। ”

উত্তর শুনে ভ্রু উঁচাল মেহেরাজ। প্রশ্ন ছুড়ল,

” যদি দ্বিধা থেকেও থাকে? ”

ফের নরম গলায় উত্তর দিল জ্যোতি,

” ভালোবাসায় অতো দ্বিধা কাজ করে না। দ্বিধা থাকলেও একটা সময় পর তা মুঁছে যায়। আপনাদের ক্ষেত্রেও তাই।আমি নামক দ্বিধাটা বোধহয় এতদিন আপনাদের মাঝে উপস্থিত ছিলাম। তবে আশা করি এই দ্বিধাটা খুব শীঘ্রই কেটে যাবে। আপনাদের নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল মেহেরাজ ভাই।”

মেহেরাজের মেজাজ তুলনামূলক খারাপ হলো। তবুও নিজেকে স্থির, শান্ত রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,

” ধন্যবাদ।”

সৌজন্যতামূলক হাসল জ্যোতি। হাতে থাকা চায়ের কাপটা রেখে দিয়ে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েই বলল,

” তবে আসি?যে প্রয়োজনে এসেছিলেন তা নিশ্চয় শেষ।”

মেহেরাজ শীতল চাহনীতে তাকাল একনজর।উঠে দাঁড়িয়ে চা ওয়ালার দেওনা মিটিয়ে বুক টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়াল জ্যোতির সামনে। কপাল কুঁচকে নিয়ে ঠোঁটজোড়া গোল করে তপ্তশ্বাস ফেলল।তারপর শান্ত গলায়ে বলল,

” না শেষ হয় নি।”

জ্যোতি চোখ তুলে তাকাল। চোখজোড়া দিয়ে প্রশ্নময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধাল,

” আর কি প্রয়োজন?”

মেহেরাজ উত্তর দিল না। তপ্ত মেজাজে মুখ থমথমে রেখে হেঁটে গেল সামনের দিকে। জ্যোতি এগিয়ে গেল না। ঠাঁই সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে রইল মেহেরাজের যাওয়ার পানে।দেখতে পেল মেহেরাজ কিছুটা দূর গিয়েই থেমে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় বাকিয়ে তার দিকে তাকিয়েই কপাল কুঁচকাল বিরক্তিতে। ভ্রু উঁচিয়ে ছুড়ে দিল প্রশ্নময় দৃষ্টি।জ্যোতি সেই দৃষ্টির প্রশ্ন বুঝতে পেরেই পা বাড়াল। এগিয়ে গেল অল্প দূরে দাঁড়ানো পুরুষটির দিকে।

.

সামান্তার পরনে লাল রাঙ্গা শাড়ি।চুলগুলো খুলে রাখা৷ কপালে ছোট্ট লাল টিপ।দুধে আলতা গায়ের রংয়ে এরূপ সাঁজে যে কোন পুরুষই প্রেমে পড়তে বাধ্য।অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিও সে বাধ্যবাধকতায় নাম লিখাতে ভুলল না। অপলক তাকিয়ে থেকেই মুচকি হাসল। পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেল সামনে থাকা সুন্দরী রমণীর দিকে। সামান্তা হাসল। এই ছেলেটার সাথে পরিচয় আরো বছর ছয় আগে থেকেই৷ সে কলেজ জীবনে প্রথম পরিচয়।প্রথমে তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে শুরু হলেও এখনকার সম্পর্কটা কেবলই বন্ধুত্বে থেমে নেই৷ তা রূপ নিয়েছে প্রণয়ে৷ দ্বিতীয়বার দ্বিতীয় পুরুষের প্রণয়ে মেতে উঠা যাকে বলে৷ দ্বিতীয়বার বার দ্বিতীয় পুরুষের হাতে হাত রাখা, একসাথে পথচলার স্বপ্নদেখা যাকে বুঝায়৷ সামান্তা মুখে চঞ্চলতা ফুঁটিয়ে হাসল। দু পা এগিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়েই বলল,

” গোলাপ এনেছিস আরাব? ”

আরাব মুচকি হাসল এবারও। চোখের সামনে অসম্ভব রূপবতী মেয়েটাকে দুচোখে পরখ করে নিয়েই সেই হাসির উজ্জ্বলতা দ্বিগুণ হলো। প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা গোলাপটা বের করে এনেই সামনে ধরল৷ বলল,

” আরাব কখনো আপনার আদেশ ভুলে নাকি?”

সামান্তা চমৎকার হাসল। হাত বাড়িয়ে গোলাপটা নিয়েই আরাবের হাতের ভাজে নিজের নরম হাতটা ডুবিয়ে দিল। চঞ্চল গলায় বলল,

” বাহ! একেবারে পার্ফেক্ট প্রেমিক! ”

আরাব এবারেও ঠোঁট চওড়া করে হাসল। নিজের ডান হাত দিয়ে সামান্তার নাকটা আলতো ছুঁয়ে দিয়ে বলল,

” এমন একটা সুন্দরী, রূপবতী প্রেমিকা থাকলে পার্ফেক্ট প্রেমিক না হয়ে উপায় কি শুনি?”

সামান্তা ভ্রু নাচিয়ে বলল,

” সুন্দরী না হলে পার্ফেক্ট প্রেমিকের রোল প্লে করতি না? ”

আরাব এবারও হাস্যোজ্জ্বল চাহনীতে জিজ্ঞেস করল,

” কি মনে হয় তোর?”

সামান্তার চাহনী হঠাৎ নিভে এল। কিয়ৎক্ষন নিরব থেকে নরম গলায় বলল,

” জানি না। শুধু জানি বছর দুয়েক আগে আমি দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়েছি কারোর। দ্বিতীয়বার কাউকে সারাজীবনের জন্য চাইছি আমার করে। এইবার আর নিজের ভুলে হারাতে পারব না ভালোবাসার মানুষকে। পার্ফেক্ট না হলেও হারাতে পারব না। ”

আরাব হেসে উঠল। সামান্তার হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরেই অপলক তাকিয়ে থাকল মেয়েটার দিকে। এই মেয়েটা যে তাকে হারাতে চায় না তা তার চোখের চাহনীতে স্পষ্ট৷ মেয়েটাকে সে কলেজ জীবন থেকে ভালোবেসে আসলেও কখনোই ভাবেনি মেয়েটা একটা সময় তার হবে। কখনো তার দিকে প্রণয়ী হাত বাড়াবে। কখনো তার প্রেমে পড়বে এমনটা ভাবনার বাইরেই ছিল। ভাবনার বাইরে থাকার পেছনে অবশ্য কারণ ছিল। কারণটা হলো সামান্তার থেকে প্রত্যাখান।প্রথমবার নিজের ভালোবাসার অনুভূতি সামান্তাকে জানানো মাত্রই সামান্তা মেহেরাজের সাথে নিজের প্রেমের কথা নির্দ্বিধায় বলে দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিল আরাবকে।তারপর থেকে অবশ্য সামান্তার পাশে শুধু মাত্র বন্ধু হিসেবেই ছিল সে। এমনকি মেহেরাজের সাথে বিচ্ছেদের পরেও সর্বক্ষন বন্ধু হয়েই আগলে নিয়েছে এই মেয়েটাকে।অবশেষে সামান্তার পাগলামো, অস্থিরতা, যন্ত্রনা সবকিছুকেই লাঘব করতে সক্ষম হয়েছিল। বিনিময়ে পেয়েছিল মেয়েটার আস্থা, ভালোবাসা আর স্বচ্ছল প্রেম।

.

বিল্ডিংয়ের দোতালায় তিনরুম বিশিষ্ট ফাঁকা বাসাটা জ্যোতি ঘুরে ঘুরে দেখল। বসার ঘর,রান্না ঘর সহ বাসাটা ভালোই বোধ হলো৷ টুলেট দেখে দেখে এই নিয়ে চারটা বাসা দেখেছে দুইজনে।তার মধ্যে এই বাসাটাই উত্তম মনে হলো।তাই মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

” এই বাসাটা ঠিক আছে মেহেরাজ ভাই।আপনার বন্ধুকে ডিটেইলস বলে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন পছন্দ হবে কিনা।”

মেহেরাজ ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ল।এখনও রাগ রাগ ভাব বর্তমান তার মুখে। পকেটে হাত গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“জিজ্ঞেস করতে হবে না, এই বাসাটা ঠিকই আছে।”

জ্যোতি ভ্রু কুঁচকে বলল,

” আপনার বন্ধুর যদি অপছন্দ হয়?”

শান্ত গলায় উত্তর আসল,

” হবে না। ”

” তাহলে ঠিকাছে। ”

মেহেরাজ বিনিময়ে কিছু বলল না। চুপচাপ হেঁটে গিয়ে দরজার দ্বারে দাঁড়ানো বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলল। তারপর পা বাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল জ্যোতিও। এরপর অবশ্য মেহেরাজ আর জ্যোতির মাঝে তেমন একটা কথা হলো না। চুপচাপ পাশাপাশি চলল কেবল দুইজনে। মেহেরাজের মুখচোখ কঠিন। চাহনী থমথমে। তাই আর আগ বাড়িয়ে জ্যোতিও কথা বাড়াল না।মনে মনে মেহেরাজের আকস্মিক রাগের কারণ খুুঁজলেও ব্যর্থ হলো। এভাবেই নিশ্চুপতায় কাঁটল পুরোটা সময়। তারপর একটা সময় পর রিক্সায় উঠল দুইজনে। পাশাপাশি বসেও একে অপরের মাঝে একটা শব্দও বিনিময় হলো না।অবশেষে তার বাসার সামনেই রিক্সা থামিয়ে মেহেরাজ তাকাল তার দিকে। শান্ত গলায় বলল,

” নেমে যা। ”

জ্যোতি অবাক হলো। গলাটা শান্ত হলেও সে শব্দ দুটো যেন সহস্র রোষের প্রকাশ ঘটাল। চোখের সামনে তুলে ধরল যেন শীতল রাগ। নরম গলায় সে বলল,

” হ্ হু?”

মেহেরাজ ফের থমথমে গলায় বলল,

” কানে শুনিস না?”

জ্যোতি এবার আর বসে থাকল না। দ্রুত রিক্সা ছেড়ে নেমে পড়ল। একপাশে দাঁড়িয়ে অপমানে জর্জরিত হওয়া মুখখানা নিয়ে মেহেরাজের দিকে তাকাতেই দেখল মেহেরাজও নেমে পড়েছে। তারপর পকেট থেকে কি যেন বের করে হঠাৎই ঝুকে বসল। হাতজোড়া জ্যোতির পায়ের দিকে এগিয়ে নিতেই জ্যোতি সরে গেল। অবাক হয়ে বলল,

” কি করছেন মেহেরাজ ভাই?”

মেহেরাজ চোখ তুলে গরম চাহনীতে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

” তোর পায়ে ধরে বসে থাকব না নিশ্চয়?”

মেহেরাজের ত্যাড়া কথা শুনে আবারও অপমানে জর্জরিত হয়ে থমথমে মুখে দাঁড়াল জ্যোতি। মেহেরাজ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে আলতো হাতে তার পায়ে পরিয়ে দিল নুপূর।তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবারও আর জ্যোতির দিকে তাকাল না। রিক্সায় উঠে বসেই রিক্সাওয়ালার উদ্দেশ্যে বলে উঠল দ্রুত,

” চলেন মামা।”

মুহুর্তেই রিক্সাটা এগিয়ে গেল। চোখের সামনে থেকে কয়েক সেকেন্ডে বিলীন হয়ে গেল সে রিক্সা।তবুও জ্যোতি সেদিক পানেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল।মনে মনে আওড়াল,”একবারও ফিরে চাইল না? একবারও না। তাহলে এই নুপূরজোড় পরিয়ে কি বুঝাতে চাইল? এটাও দায়িত্ব? শুধুই দায়িত্ব?পরমুহুর্তেই আবার মস্তিষ্ক জানা দিল,দায়িত্ব না হয়ে অন্যকিছু হলে তো সে এতগুলো দিনে একবার হলেও ভালোবাসার কথা বলত। এতগুলো দিনে একবার হলেও কাছে টানত। শুধু দায়িত্ব না হলে তো সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে চাইত না। কখনোই চাইত না।

#চলবে….

#এক_মুঠো_প্রণয়
#পর্ব_২৬
লেখনীতেঃ একান্তিকা নাথ

জ্যোতি কথায় কথায় মেহুর কাছেই শুনেছে মেহেরাজরা যে চট্টগ্রামে বাসা নিয়েছে।সপ্তাহখানেক হলো চট্টগ্রামে শিফট করেছে।জ্যোতি সে খবরটা তিনদিন আগে শুনতে পেলেও এখন ও মেহুর সাথে দেখা করা হয়ে উঠেনি একবারও। মেহুই ব্যস্ত বাসা গোঁছাতে তাই আর দেখা করা হয়নি। জ্যোতি ও আর জোর করে নি। কিন্তু মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল মেহুর জম্মদিনে অবশ্যই দেখা করবে।অবশেষে জম্মদিনের তারিখ এগিয়েই এল।আজ দিন শেষ হয়ে রাত বারোটা বাঁজলেই মেহুর জম্মদিন। তার কারণেই মেহুর জম্মদিনের উপহার দেওয়ার জন্য কিছু কিনতেি বের হয়েছিল জ্যোতি। কিন্তু পথেই বাঁধল বিপত্তি। রিক্সাটা সামনের গাড়িটার সাথে ধাক্কা খেয়েই সাংঘাতিকভাবে উল্টে পড়তে নিতেই জ্যোতি খসখসে রাস্তার জমিনে মুখ থুবড়ে পড়ল।মুহুর্তেই কপালের ডানপাশটায় কেঁটে জ্বালা ধরল। ঠোঁটের এককোণে রাস্তার খসখসে জমিতে কেঁটে রক্ত জমাট বাঁধল। গালের ডানপাশটাও ছিলে আছে। ডান পা টা কেঁটে গিয়ে বিচ্ছিরি রকম অবস্থা হলো।টের পেল ব্যাথায় টনটন করছে তার পা। এমনকি পা নাড়ানোতেও যন্ত্রনায় মুখ নীল হয়ে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে। যন্ত্রনা তীব্র। ব্যাথায় জ্যোতির চোখ টলমল হলো। শুধু যে কাঁটার যন্ত্রনাই নয় এটা তা ঢের বুঝতে পারল।মুহুর্তেই লোকজন ঝড়ো হলো। তাদের সহায়তাতেই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। সেখানেই এক্সরে করার পর জানতে পারল ডান পায়ের পাতায় হাড় ভাঙ্গার ফলস্বরূপই এই অসহনীয় ব্যাথা। অসহ্যকর যন্ত্রনা।পায়ের পাতা ফুলে বিচ্ছিরি হয়ে উঠছে ক্রমশ। ততক্ষনে অবশ্য তার রুমমেট এসে পৌঁছেছে।মেয়েটার নাম রিতু। দেখতে অসম্ভব সুন্দরী হলেও মনটা খুব নরম। বলা যায় সরল মনের মেয়ে। জ্যোতিকে এমন অবস্থায় দেখেই যেন কেঁদে ফেলবে সে।জ্যোতি তাকে ফোন করে যতটুকু জানিয়েছিল তাতে তার মনে হয়েছিল খুবই সামান্য একটা এক্সিডেন্ট।খুবই সামান্য আঘাত পেয়েছে । কিন্তু এখানে এসেই সে ধারণা বদলে গেল। ডান পায়ের সাংঘাতিকভাবে জখম হওয়া,ফুলে যাওয়া, হাড় ভাঙ্গা, মুখের একপাশে ঘষে যাওয়া অংশ আর ফোলা ঠোঁটের কোণে জমাট রক্ত আর কপালের একপাশটায় কাঁটা দাগ সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত দশা! রিতু ফুুঁপিয়ে কেঁদে দিল এবার ।দ্রুত এগিয়ে গিয়েই আবেগ আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরল জ্যোতিকে। বলে উঠল,

” কি করলি এসব জ্যোতি? কতটা কেঁটেছে৷কতটা আঘাত পেয়েছিস। কি করে হলো এসব ? এতক্ষন হয়ে গেল অথচ কোন চিকিৎস করেনি কেন? ”

জ্যোতি অল্প হাসল। এই মেয়েটা খুবই নরম মনের মেয়ে। তার এভাবে কেঁদে ফেলাটা অস্বাভাবিক নয়৷ তবুও বলল,

” কাঁদছিস কেন? খুবই সামান্য তো। এক্সরে করে রিপোর্ট নিতে টাইম লেগেছে তাই। ”

রিতু ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,

” তুই বললে হলো?আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি কি সাংঘাতিক অবস্থা আর তুই বলছিস সামান্য?”

জ্যোতি এবারেও হাসল৷ ইতস্থত করে বলল,

” তোকে কিছু টাকা আনতে বলেছিলাম।আসলে সাথে করে অতো টাকা নিয়ে বের হইনি আর এমনটা হবে তাও জানা ছিল না রে। ”

” চুপ কর তো। এখন টাকা নিয়ে ভাবার সময়? ”

জ্যোতি বিনিময়ে কিছু না বলে চুপ করে থাকল। তারপর অনেকক্ষন পর ডক্টর দেখিয়ে,পর্যাপ্ত চিকিৎসা করিয়ে, ঔষুধপত্র নিয়েই রিতুর সাহায্য নিয়ে বাসায় পৌঁছাল। কিন্তু বাসার সামনে এসেই গাড়ি থেকে নেমে বাকি পথটা যাওয়া নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়ল। পায়ের যন্ত্রনাটা ক্রমশ বাড়ছে। কাঁটাছেড়ার যন্ত্রনাকে তেমন একটা পাত্তা না দিলেও হাঁড় ভাঙ্গার ব্যাথায় যেন কুঁকড়ে উঠছে সে। পা নাড়ানো নিষেধ। এদিকে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় নিজের বাসায় পৌঁছানোটাও জরুরী। অবশেষে নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েই রিতুর সাহায্য নিয়ে ভাঙ্গা পা উঁচু করে রেখেই দাঁতে দাঁতে চেপে এগিয়ে গেল। একেকটা পদক্ষেপে যন্ত্রনায় চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।ব্যাথায় নীল হয়ে উঠল মুখ। এবার আর চোখের জল আড়াল করা গেল না। আড়াল করা হলো না ব্যাথায় নীল হয়ে উঠা মুখটা। আড়াল করা গেল না প্রতি পদক্ষেপে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠা, ব্যাথায় কুঁকড়ে মরা।

.

মেহেরাজদের নতুন বাসায় দুপুরের দিকেই এসে উপস্থিত হলো নাবিলা, নাফিসা। মূলত মেহুকে সরাসরি জম্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্যই প্লেন করে এতদূর ছুটে আসা।সামান্তা না আসলেও নাবিলার মধ্য দিয় পাঠাল উপহারস্বরূপ একটা ছোট বক্স। মেহু খুশি হলো। একে একে সবাই জম্মদিনের উইশ জানানোতে আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বসার ঘরে সোফায় বসেই সবাই আড্ডা দিচ্ছিল তখন। এমন সময়ই হঠাৎ মনে পড়ল জ্যোতির কথা। মেয়েটা নিয়ম করে রাতের বেলা তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ঠিক কিন্তু এত কাছে, একই শহরে থেকেও একবার দেখা করতে আসল না? অথচ বাকিসবাই অন্য শহর থেকে এই শহরে এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছে। মেহু ছোট শ্বাস টেনে মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিল জ্যোতিকে। ওপাশ থেকে জ্যোতি প্রথমবার কল না তুললেও কিয়ৎক্ষন পর নিজেই কল করল।মেহু কল তুলেই বলল,

” কোথায় তুই? ”

জ্যোতির গলা নিস্তেজ শোনাল। উত্তরে বলল,

” রুমেই আপু। কেন? ”

মেহু তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,

” আসতে পারবি? দেখা করবি বলছিলি না? আজ দেখা কর।বাসায় আয়।”

মেহুর কথা শুনে জ্যোতি বুঝে উঠল না কি বলবে। এতগুলো দিন যখন দেখা করার কথা বলেছিল মেহুই ব্যস্ত আছে বলেছিল। আর একদিনে পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে থাকার মধ্যেই বলছে দেখা করতে। মুখটা চুপসে গেল মুহুর্তে। নরম গলায় বলল,

” আপু? আজ টিউশনি আছে। কিছুদিন পর দেখা করি?”

মেহু অভিমানী কন্ঠে বলল,

” আমার থেকে টিউশনি বেশি তোর কাছে?”

জ্যোতি বুঝল অভিমানটা।ঢোক গিলে বলল,

” না মানে, এখন তো রাত হয়ে গেছে আপু।একা একা তোমাদের বাসা কোথায় খুঁজব আমি?”

জ্যোতি ভেবেছিল এ অযুহাতে বেঁচে যাবে।কিন্তু পরমুহুর্তেই মেহুর চমৎকার কথাটা শুনেই মুখটা পুনরায় চুপসে গেল। মেহু বলল দ্রুত গলায়,

” সমস্যা নেই। ভাইয়া বাইরে থেকে ফিরলে ভাইয়াকে পাঠাব।ভাইয়ার সাথে আসতে পারবি না? এতে তো সমস্যা নেই।”

জ্যোতি দ্রুত গলায় বলে উঠল,

” না,উনাকে পাঠাতে হবে না। ”

” তাহলে? ”

” আসলেই আসতে পারব না আপু। একটু সমস্যায় পড়ে গিয়েছি।”

মেহু মানল না।বলল,

” জানি না আমি, ভাইয়া গেলে ভাইয়ার সাথে চলে আসবি। রাতে আমরা খুব আড্ডা দিব। আমি, তুই, নাবিলা, নাফিসা সবাই।”

তারপর আর কোন কথা না বলেই কল কাঁটল। ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ল মুহুর্তেই। অপর পাশে থাকা জ্যোতির মুখটা শুকনো হয়ে উঠল। ব্যাথায়, যন্ত্রনায় কুঁকড়ে উঠার সাথে সাথে জড়ো হলো নতুন চিন্তা। মেহেরাজকে যদি পাঠায় ও এ পা নিয়ে কি যাওয়া সম্ভব? নিজের এই অবস্থার কথা জানানোটাও কি উচিত হবে?

.

বোনের আবদারে অবশেষে মেহেরাজকে আসতেই হলো জ্যোতিকে নিয়ে যেতে।শুধু যে বোনের আবদার তা বলা যায় না, মনে মন সেও অপেক্ষায় ছিল মেহুর জম্মদিনে জ্যোতির দেখা পাওয়ার। জ্যোতিদের বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়েই লাগাতার কল দিল জ্যোতিকে৷ ওদিকে জ্যোতির কল তুলার কোন কথা নেই। এক পর্যায়ে বিরক্ত হলো মেহেরাজ। শেষবারের মতো কল দিতেই ওপাশ থেকে জ্যোতির ঘুমঘুম গলায় কথা আসল,

” মাত্রই ঘুমিয়েছিলাম, খেয়াল করিনি এতগুলো কল। দুঃখিত মেহেরাজ ভাই।”

মেহেরাজ কপাল কুঁচকাল। মাত্র নয়টা বাঁজে। এত তাড়াতাড়ি তো এই মেয়ে ঘুমানোর কথা নয়।এই নিয়ে কৌতুহল জাগলেও বিপরীতে প্রশ্ন করল না। বলল,

” বাসায় আছিস, রাইট?”

” হ্যাঁ।”

” পাঁচ মিনিটে নিচে আয়। আমি অপেক্ষা করছি।”

জ্যোতি ঘুমঘুম ভাব কেঁটে গেল মুহুর্তেই। গতরাতে ব্যাথায় ঘুম হয়নি, সারাদিনও তেমন একটা ঘুম হয়নি।অবশেষে এখন ঘুম পেলেও তা নিমিষেই মেহেরাজের কথা শুনে পালিয়ে গেল। তার মানে সত্যি সত্যিই তাকে বাসায় নিয়ে যেতে এসেছে? কিন্তু সে এই পা নিয়ে নিচে নামবে কি করে? বিনিময়ে কিই বা বলবে?ইতস্থত গলায় বলল,

” মেহেরাজ ভাই আমার আসলে…”

কথাটুকু বলেই থামল সে। একবার ভাবল কথাটা বলা উচিক হবে কিনা৷ অপরপাশে মেহেরাজ অপেক্ষা করল পুরো বাক্যটা শোনার জন্য। না শুনতে পেয়েই ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে বলল,।

” কি?

জ্যোতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।গলা ঝেড়ে উত্তর দিল,

” পাঁচ মিনিট নয়, আমি বোধহয় পাঁচদিনেও নিচে যেতে পারব না। আপনি দয়া করে ফিরে যান। ”

মেহেরাজের রাগ লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,

” নাটক করছিস? দেরি হচ্ছে জ্যোতি। কথা না বাড়িয়ে নিচে আয় ”

জ্যোতি নত গলায় অপরাধীর মতো করে বলল,

” আমি সত্যিই দুঃখিত মেহেরাজ ভাই।যদি সমস্যা না থাকত আমি নিজেই চলে যেতাম মেহু আপুর সাথে দেখা করতে।”

মেহেরাজ ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,

” তো কি সমস্যা? ”

জ্যোতি এবারও বলল না। মৃদু স্বরে বলল,

” কিছু নয়।”

” তো ? ”

জ্যোতি হঠাৎই বলল,

” আপনি চলে যান। ”

মেহেরাজের রাগ এবার দ্বিগুণ হলো। শীতল গলায় রাগ মিশিয়ে বলে উঠল,

” নামবি কি নামবি না? ”

ওপাশ থেকে উত্তর আসল না। মেহেরাজ আর কিছু না বলেই কল কাঁটল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সামনের বিল্ডিংটার দিকে। তারপর গেইট পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় গিয়েই কলিং বেল চাপল। বাসাটা চেনে কারণ গতবারও মেহুর জম্মদিনে জ্যোতিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেই এসেছিল।তাই চিনতে আর অসুবিধা হলো না৷ বারকয়েক কলিংবেল বাঁজাতেই দরজা খুলল একটা মেয়ে।মেয়েটাকে সে না চিনলেও একবার তাকিয়েই বলল,

” জ্যোতি বাসায় আছে না? ওকে একটু তাড়াতাড়ি বের হতে বলবেন? আমার হাতে বেশি সময় নেই। ”

মেয়েটা হতবাক হয়ে তাকাল মেহেরাজের দিকে। পরমুহুর্তেই মনে পড়ল বেলকনি থেকে এই ছেলেটাকেই সেদিন বাসার সামনে জ্যোতির পায়ে নুপূর পরাতে দেখেছিল সে।তাছাড়া একবছর আগেও একবার দেখেছিল এই ছেলেকে যখন ছেলেটা নিজেই জ্যোতির স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। মেয়েটক হাসল কিঞ্চিৎ। বলল,

” জ্যোতির এক্সিডেন্ট হয়েছে কাল আর আপনি আসলেন আজ? ওয়াইফের অসুস্থতায় এত ব্যস্ততা দেখালে কি করে হবে ভাইয়া?হাতে সময় না থাকলে সময় করে নিতে হবে না? ”

মেহেরাজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল মুহুর্তেই। বলল,

“মানে? ”

মেয়েটা আবারও বলল,

” কি আশ্চর্য!আপনি জানেন না?আমি তো ভাবলাম আপনি এই কারণেই আসলেন দেখা করতে। ”

মেহেরাজ কিছুই বুঝল না। ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে নিয়ে শুধাল,

” জ্যোতি কোথায়? কি হয়েছে?”

মেয়েটা অবাক হলো। মেহেরাজ যে এই সম্বন্ধে কিছুই জানে না সে আসলেই ভাবেনি। তারপর পুরো ঘটনা খুলে বলল।মেহেরাজের মুখচোখ ততক্ষনে রাগে টানটান হলো।তবুও মেজাজ শান্ত রেখে বলল,

” বাসায় ডুকা যাবে? জ্যোতিকে নিয়ে যেতে চাইছি। ”

মেয়েটা মাথা নাড়িয়েই বলল,

” হ্যাঁ, অবশ্যই। জ্যোতি তো এমনিতেও হেঁটে এখানে আসতে পারবে না।”

মেহেরাজ আর অপেক্ষা করল না।সামনের মেয়েটার পিঁছু পিছু গিয়ে দাঁড়াল জ্যোতি যে রুমে থাকে সে রুমের সামনে। পাশাপাশি দুটো বেড রুমের ভেতর। টেবিলে বইয়ের স্তূপ। পাশাপাশি একটা চেয়ারে বসে আছে একটা মেয়ে আর তার পাশের বিছানাটায় চাদর মুড়িয়ে শুঁয়ে আছে জ্যোতি।কপালের দিকটায় ব্যান্ডেজ, ফোলা ঠোঁট আর ডান গালের ছিলে যাওয়া অংশটা মুহুর্তেই চোখে পড়ল মেহেরাজের।অপরদিকে জ্যোতি তখনও নিরস মুখে ফোনের দিকেই তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভেবেছে মেহেরাজ কল কেঁটে দিয়ে ফিরে গেছে। সে ভাবনা মিথ্যে প্রমাণিত হলো যখন কানে আসল শীতল অথচ রাগী পুরুষালি গলা,

” নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারবি, নিজের যত্ন নিজে করতে পারবি।যাদের খেয়াল রাখার কেউ থাকে না তাদের খেয়াল তারা নিজেরাই রাখে, যাদের যত্ন করার কেউ থাকে না তারা নিজেরাই নিজেদের যত্ন করে। এখন তোর সেসব বিখ্যাত বাণী কোথায় গেল?এই নমুনা নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারার?”

জ্যোতি অবাক হয়ে তাকাল। চোখের সামনে অপ্রত্যাশিত মুখটা ভেসে উঠতেই মুহুর্তেই শোয়া ছেড়ে লাফিয়ে বসল। ওড়নাটা ঠিকঠাক করে মাথায় টেনে চাইল ভালো করে। চোখের সামনে ভেসে উঠল মেহেরাজের লালাভ চোখ, শক্ত চোয়াল আর বুকে গুঁজা হাতজোড়া। বলল,

” আপনি?”

মেহেরাজ ভ্রু উঁচিয়েই বলল,

” হ্যাঁ, আমি।তো?”

জ্যোতি স্পষ্টভাবে বলল,

” কিছু নয়।”

মেহেরাজ তেঁতে উঠল।জোরে জোরে শ্বাস টেনে রাগ নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে বলে উঠল,

” এই তোর সমস্যা? ”

জ্যোতি স্থির চাহনীতে তাকিয়ে উত্তর দিল,

” এটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল মেহেরাজ ভাই। ”

“তুই তো নাকি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারতি? ”

” আমার কোন দোষ ছিল না। ”

মেহেরাজ চুপ থাকল কিয়ৎক্ষন। তারপর দম ফেলে শক্ত গলায় বলল,

” মেহু অপেক্ষা করছে, জামাকাপড় কিছু গুঁছিয়ে নে। বাসায় ফিরছি। ”

” হ্ হু?”

দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

” বাসায় যাব।শুনিস না কানে? ”

” আমার পায়ের অবস্থা খারাপ মেহেরাজ ভাই।যেতে পারব না।”

মেহেরাজ শীতল চাহনীতে তাকাল। দৃঢ় গলায় বলল,

” সমস্যা নেই, তুই না যেতে পারলেও আমি নিয়ে যেতে পারব।”

” মিথ্যে বলছি না, সত্যিই পায়ের হাড় ভেঙ্গেছে। ”

মেহেরাজ বুক টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতজোড়া পকেটে গুঁজল। তারপর ডান ভ্রুটা উঁচু করেই দৃঢ় গলায় বলল,

” হ্যাঁ জানি তো আমি।কোলে করে নিয়ে যাব।তোকে পা নাড়াতেও হবে না ”

আকস্মিক বলা কথাটা শুনে জ্যোতি অবাক হলো।কুঁচকে গেল ভ্রু জোড়া।চোখেমুখে খেলে গেল বিস্ময়। এমন একটা উত্তর সে মোটেও আশা করেনি। মোটেই ভাবেনি।স্থির চাহনীতে ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখে তাকিয়ে থাকল কেবল মেহেরাজের দিকে।

#চলবে…

[কেমন হয়েছে জানাবেন। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ