Friday, June 5, 2026







রূপবানের শ্যামবতী পর্ব-১০

#রূপবানের_শ্যামবতী
#১০ম_পর্ব
#এম_এ_নিশী

অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধারে ছেয়ে আছে রাতটি। একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকারও নয়। গ্রামের পথঘাটে আবছা আলো দৃশ্যমান। সেই আলোতেই হেঁটে চলেছে দুই বোন। কিন্তু কিছুদূর যেতেই হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ে তারা। কারণ মনে হচ্ছে কেউ তাদের পিছুপিছু আসছে। নিজেদের গ্রামে রাতের আঁধারে চলাচল করা মোটেও কোনো বড় ব্যাপার নয়। তবে আজ তারা ভয় পাচ্ছে। আসলেই কেউ তাদের পিছু নিচ্ছে কি না তা বুঝতেই তারা দাঁড়িয়ে পড়েছিলো। আশ্চর্যজনক ভাবে পেছনে আসা পায়ের শব্দও থেমে যায়। পুনরায় হাঁটা শুরু করতেই পেছনের হাঁটার শব্দও শুরু হয়ে যায়। আদ্রিকা ভয় পাচ্ছে ভিষণ। বোনকে সাহস দিতে নিজেকে শক্ত রাখলেও অরুর নিজের ভেতরেও ভয়ের কম্পন সে অনুভব করছে। দ্রুত পা চালাতে থাকে তারা। সামনেই একটা আম বাগান। সেই বাগান পেরিয়ে ধানক্ষেত। আর তার পরপরই অরুদের বাড়ি। বাগানের পাশেই একটা খোলা মাঠ রয়েছে। সেই মাঠ দিয়ে গেলেই দ্রুত পৌঁছানো যাবে। তাই অরু মাঠের পথটাই ধরলো। ঝোঁকের বশে এই রাতের বেলা বেরোনোটা যে কতো বড় বোকামি হয়েছে তা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে অরু। কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই। মাঠ দিয়ে কিছুদূর যেতেই অরুর ভয়টা সত্যি হলো। কোথাথেকে হঠাৎ তিনজন লোক এসে পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায় অরু। আদ্রিকা কাঁদতে শুরু করে। অরু সাহস করে বেশ কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করে,

–কারা আপনারা? এভাবে রাস্তা আটকাচ্ছেন কেন? আমরা এই গ্রামেরই মেয়ে। সামনেই আমাদের বাড়ি। বেশি বারাবারি করলে…

–মেয়ে হয়ে এতো তেজ?

পেছন থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বর শুনে অরু আদ্রির দুজনেরই অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হবার জোগাড়। সেই গলার স্বরটি আর কারো নয়, শাহাদাতের। একেবারে অরুনিকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পুনরায় বলে ওঠে,

–এতো তেজ পাও কোথা থেকে? কোন শক্তিতে? কিসের ভিত্তিতে? এই তেজ নিয়ে টিকতে পারবে?

বলতে বলতে শাহাদাত বড্ড কাছে চলে এসেছে। তার নিঃশ্বাসের স্পর্শ অরুর মুখে লাগতেই ঘৃণায় সারা শরীর গুলিয়ে ওঠে তার। শাহাদাত আত্মগরিমা দেখিয়ে বলে,

–একবার, শুধু একবার গায়ে কলঙ্ক লাগিয়ে দিলে, গলায় দড়ি কলসি দিয়ে ম রা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। আর সেই মেয়ে কতো তেজ দেখায়…

–শাহাদাত ভাই সরে দাঁড়ান। যেতে দিন আমাদের।

–যেতে দিবো বলে তো রাস্তা আটকাইনি। তোর এত্তো বড় স্পর্ধা তুই আমার গায়ে হাত তুলেছিস। আজ তোকে বোঝাবো, আমি কি জিনিস। তুই আমার গালে আঘাত করেছিস আর আমি তোর সারা শরীরে আঘাত করবো।

–আমি..আমি কিন্তু চিৎকার করবো শাহাদাত ভাই।

–কর। কর চিৎকার। এই গভীর রাতে এমন খোলা মাঠ পেরিয়ে কারো কানে তোর আওয়াজ পৌঁছাবে না। কেউ আসবে না তোকে বাঁচাতে।

শাহাদাত অরুনিকার এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে। যতোটা না ব্যাথা পেয়েছে তার চেয়েও বেশি নিজের সম্ভ্রম হারানোর ভয় তার ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। ওদিকে আদ্রিকা থরথর করে কাঁপছে। কি করবে সে? তার বুবুকে কিভাবে বাঁচাবে? শাহাদাত অরুনিকাকে টানতে টানতে পাশের বাগানটার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। শাহাদাতের সঙ্গীদের মধ্যে একজন আদ্রিকাকে আটকে রাখে। আদ্রিকা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

–ছেড়ে দেন শাহাদাত ভাই। আমার বুবুকে ছেড়ে দেন। আমার বুবুর কোনো ক্ষতি করিয়েন না শাহাদাত ভাই।

অরুনিকা যেনো দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। কি করবে বা কি করা উচিত ঠিকমতো বুঝে উঠতেই পারছে না সে। শাহাদাত তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় একটা গাছের আড়ালে। ধাক্কা মেরে ফেলে দিতেই গাছের গোড়ায় লেগে হাত ছিলে যায় অরুর। ব্যাথায় আর্তনাদ করে ওঠে সে। শাহাদাত নিচু হয়ে বসে বিদ্রুপের স্বরে বলে,

–লেগেছে না? খুব লেগেছে? এটা তো কিছুই নয়। আসল যন্ত্রণা তো এবার শুরু হবে।

ওদিকে কুলকিনারা না পেয়ে আদ্রিকা তাকে আটকে রাখা লোকটার হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। লোকটা ছিটকে সরে যেতেই আদ্রিকা ছুটে পালায়। তার উদ্দেশ্য যে করেই আহরার ভাইকে জানাতে হবে। বুবুর বিপদ! খুব বিপদ। লোকটা চেঁচিয়ে বলে ওঠে,

–ভাই আদ্রিকা পালালো।

শাহাদাত আক্রোশের সাথে জবাব দেয়,

–ধরে নিয়ে আয় ওকে। বেশিদুর যেন যেতে না পারে।

আদ্রিকার পেছনে ছুটলেও লোকটা আদ্রিকাকে ধরতে পারেনা। প্রাণপণ ছুটতে ছুটতে দাইয়ানদের বাড়িতে এসে পৌঁছালো সে। বাড়ির দিকে ছুটতে গিয়ে আয়াজের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে যায়। আয়াজ খেয়াল না করায় আদ্রিকাকে ধরতে পারেনি। ওভাবে পড়ে যেতে দেখে সে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,

–সরি সরি৷ আই এম রিয়্যালি ভেরি সরি। তোমার লেগেছে?

হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাচ্ছে আদ্রিকা। তা দেখে ভড়কে যায় আয়াজ। আদ্রিকাকে দু হাতে ধরে উঠে দাঁড় করায়। অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন করে,

–কি হয়েছে আদ্রিকা? তুমি ঠিক আছো? হাঁপাচ্ছো কেন? কোথাথেকে ছুটে আসলে এভাবে?

আদ্রিকার কথা বলার মতো অবস্থাও নেই। কোনোরকমে টেনে টেনে বলতে থাকে,

–আহর.. আহর.. আহরার ভাই, আহরার ভাইকে ডাক.. ডাকুন দয়া.. করে।

–ঠিকাছে আমি ডাকছি। তার আগে তুমি একটু শান্ত হও। পানি খাবে? চলো একটু পানি খাবে।

আদ্রিকা হু হু করে কাঁদতে শুরু করে। কান্নার দমকে গলার স্বর আটকে গেছে তার। ভাঙা ভাঙা স্বরে জবাব দেয়,

–আমার বু..বুর ক্ষতি করে দি..বে ওই.. ওই শাহাদাত.. আম.. আম বাগানে.. বুবুকে..

বলতে বলতে আয়াজের গায়েই ঢলে পড়ে আদ্রিকা। আয়াজ দু হাতে আগলে নেয় আদ্রিকাকে। ওই অবস্থায় নিজের ফোন বের করে আহরারকে ফোন দিয়ে বাইরে আসতে বলে। আহরার বাইরে আসতেই আদ্রিকার এই অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে,

–কি রে আয়াজ? কি হয়েছে আদ্রিকার?

–জানিনা ভাইয়া। শুধু তোমাকে ডেকে দিতে বলেছিলো। আর বলছিলো ওর বুবুর ক্ষতি করে দিবে ওই শাহাদাত। কি জানি কোথাকার কোন আম বাগানের কথা বলছিলো..

টংটং করে আহরারের মাথায় বারি খেতে থাকে একটা কথা। ওর শ্যামবতীর ক্ষতি…

অস্থির স্বরে প্রশ্ন করে,

–আমার শ্যামবতীর ক্ষতি করবে? শাহাদাত? মানে সেই ডাক্তার ছেলেটা? কোথায়? কোথায় নিয়ে গিয়েছে ওকে? কোন আম বাগানে?

–তা তো জানি না ভাইয়া। বলার আগেই তো ও অজ্ঞান হয়ে গেলো।

আহরার আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করে না। ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করে সে। কখন কোন ফাঁকে অরু বেরিয়ে গেছে তা জানে না আহরার। সে তো খুঁজে চলেছিলো এতোক্ষণ। এদিকে তার শ্যামবতী না জানি কোন বিপদে ফেঁসে আছে…

এদিকে আয়াজ আদ্রিকার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছিলো। ততক্ষণে দাইয়ান, রাদিফ আর ঈশানকেও জানিয়ে দেয় সে। তার ভাই একা একাই ছুটেছে। বন্ধুদের সেখানে যাওয়া প্রয়োজন।

এই ভয়ংকর অন্ধকার রাতে অরুনিকার জীবনেও কি নেমে আসবে বিষাক্ত আঁধার।
নিজের নোংরা দুরভিসন্ধি পূরনের উদ্দেশ্যে শাহাদাত এগিয়ে আসে অরুনিকার দিকে। কি করবে অরু? এভাবে দূর্বল হয়ে থাকবে? নিজের সতীত্ব হরণ হতে দিবে এতো সহজে? নাহ! অরু দূর্বল নয়। অরু এতোটাও দূর্বল নয়।
শাহাদাত এগিয়ে আসতেই অরু নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তলপেট বরাবর লাথি মারে তার।
ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে ছিটকে দূরে সরে যায় শাহাদাত। এই সুযোগে উঠে দাঁড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করে অরু। দৌড়াতে গিয়ে বুঝতে পারে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে ভিষণ। দৌড়াতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও পালাতে হবে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না সে। শাহাদাত ধরে ফেলে তাকে।

–কোথায় পালাচ্ছিস? তোকে এতো সহজে ছেড়ে দিবো ভেবেছিস। আজ তোর মুক্তি নেই। চওওললল…

অরুকে টেনে এনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতেই মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় সে। অরু আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই শাহাদাত ঠেলে ফেলে দেয় তাকে। আঘাতের জায়গায় আঘাত পেয়ে আর্তনাদ করে ওঠে অরু। নিজের পরনের শার্টটা খুলতে খুলতে শাহাদাত বলে উঠে,

–আজ তোকে বোঝাবো তোর লিমিট ঠিক কতটুকু।

বলতে বলতে অরুর দিকে ঝুঁকে আসতেই শেষ চেষ্টা হিসেবে অরু দু হাতে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু শাহাদাতের শক্তির সাথে সে পেরে ওঠে না। শক্তহাতে অরুর দু হাত মাটিতে চেপে ধরে শাহাদাত। সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে অসাড় হয়ে আসে অরুনিকার সারা দেহ। আর যেন কিছুই করার নেই তার। দু চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়াতে থাকে। শব্দ করে কাঁদতেও পারেনা। শুধু মনে মনে চাইছে, “কেউ একজন আসুক। তাকে বাঁচাক।”

হয়তো তার মনের কথা শুনেই..
সত্যি সত্যিই কেউ একজন এলো। শাহাদাতের মুখের একপাশে শক্তিশালী মুষ্টির কড়াঘাত এসে পড়লো। ছিটকে গড়িয়ে পড়লো সে। অন্ধকারে অরু বুঝে উঠতে পারলো না, “কে এই দেবদূত।” দুহাত বাড়িয়ে পরম যত্নে অরুকে উঠে বসিয়ে দেয় আহরার। ততক্ষণে শাহাদাত বিচ্ছিরিভাবে গালাগাল করতে করতে এগিয়ে এলো। বিদ্যুৎ বেগে উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ওপরে থাকা আম গাছটা থেকে শক্ত এক ডাল ভেঙে নেয় আহরার। শিকারীকে সামনে পেয়ে বাঘ যেমন ক্ষীপ্রগতিতে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক সেভাবেই আহরার ঝাঁপিয়ে পড়লো শাহাদাতের ওপর। হাতের শক্ত ডালটা দিয়ে পরপর কয়েকঘা দিতেই মাটিতে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায় শাহাদাত। উঠে দাঁড়াতে গেলে আরো কয়েকঘা এসে লাগে। ঘাতক বাঘের ন্যায় যেন হুংকার ছাড়ছে আহরার। গর্জে উঠে বলতে থাকে,

–জা নো য়া র তোর এতো বড় সাহস তুই আমার অরুর দিকে নোংরা হাত বাড়িয়েছিস। তোর হাত আজ আমি ভেঙে গুড়িয়ে দিবো। শেষ করে দিবো তোকে, মাটির সাথে মিশিয়ে দিবো যেন তোর চিহ্নও কেউ খুঁজে না পায় কোনোদিন।

এই বলে ইচ্ছে মতো মে রে যাচ্ছে সে শাহাদাতকে। শাহাদাত গোঙাতে গোঙাতে ছটফট করছে কেবল। শাহাদাতের সঙ্গীগুলোও ভয়ে এদিকে আসতে পারছে না। তাদের মধ্যে একজন আগেই দৌড়ে পালিয়েছে। বাকি দুইজন কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতে আহরারকে আটকাতে এগিয়ে এলো। দুজন দুদিক থেকে আহরারকে চেপে ধরে সরিয়ে আনতে গেলে আহরার ছিটকে সরিয়ে দেয় দুজনকে। আহরারের মধ্যে যেন দানবীয় শক্তি এসে ভর করেছে। নিজের প্রিয় মানুষের ওপর আসা আঘাত তাকে ভয়ংকর মানুষে পরিণত করেছে। যেই মানুষ এই মুহূর্তে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে এক লহমায়। লোক দুটো আবার আহরারকে আটকাতে এলে এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ওই দুজনকেও কয়েকঘা লগিয়ে দেয় সে। প্রাণভয়ে দুজনেই দৌড়ে পালিয় যায়। এদিকে হুঁশ, জ্ঞানহীন হয়ে শাহাদাতকে মে রে ই যাচ্ছে আহরার। মাটিতে ফেলে সেই শক্ত ডালটি চালিয়ে যাচ্ছে শাহাদাতের শরীরের প্রতিটি অংশে। ভাগ্য ভালো যে দাইয়ানরা বেশ দ্রুতই চলে এসেছিলো। নইলে আজ আহরারের হাতে শাহাদাতের মৃ ত্যু হতো। দাইয়ান, রাদিফ, ঈশান তিনজনই আহরারকে আটকাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। আহরারের এমন ধ্বংসাত্মক রূপ দেখে তিন বন্ধুই দিশেহারা। দাইয়ান চেঁচিয়ে বলতে থাকে,

–ছেড়ে দে আহরার। ছাড় ওকে। মে রে ফেলবি নাকি?

ঈশান, রাদিফও আহরারকে টানতে টানতে বলে,

–ও ম রে যাবে রে। ছেড়ে দে। তুই বিপদে পড়ে যাবি আহরার। ছাড়..

এবার ছেড়ে দেয় আহরার। তবে ছাড়ার আগে শাহাদাতের পেটে পরপর কয়েকটা লা থি মেরে আসে। আর এতেই যেন শাহাদাতের দম ফুরিয়ে এলো। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। তিন বন্ধু মিলে আহরারকে শান্ত করার চেষ্টা করে। একটু দম নিয়ে শান্ত হতেই হুট করে অরুর কথা মাথায় আসে। ছুটে আসে আহরার অরুনিকার কাছে। অতিরিক্ত ভয়, কষ্টে বোবার মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে অরুনিকা।
অরুনিকার কাছে এসে হাঁটুমুড়ে বসে আহরার। দু’হাতে অরুনিকার মুখ তুলে ধরে। অপরাধী স্বরে বলতে থাকে,

–আমাকে ক্ষমা করো অরু। আমি তোমার খেয়াল রাখতে পারিনি। তুমি এভাবে বিপদে পড়েছিলে অথচ আমি.. আমি বুঝতেই পারলাম না আমার শ্যামবতীটা কতোটা অসহায় হয়ে সাহায্যের আশায় ছিলো.. আ’ম সরি।
অরু, অরু তাকাও আমার দিকে। দেখো, কিচ্ছু হয়নি। এভ্রিথিং ইজ ওকে। আর কোনো ভয় নেই অরু। আমি চলে এসেছি না। আমি আছি তো। আমি আছি তোমার সাথে। আর কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। অরু, এ্যাই অরু! কথা বলো। কথা বলো আমার সাথে। এভাবে চুপ করে আছো কেন? কথা বলবে না আমার সাথে?

এদিকে আদ্রিকার জ্ঞান ফিরিয়ে আয়াজ তাকে নিয়ে চলে এসেছে সেখানে। আদ্রিকা এসে অরুর কাছে বসে পড়ে। আহরারের উদ্দেশ্যে বলে,

–ভাইয়া, বুবু কথা বলবে না। ও ঠিক নেই। ওকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।

দাইয়ানও সম্মতি জানিয়ে বলে উঠে,

–আদ্রিকা ঠিক বলেছে আহরার। অরুনিকার বিশ্রাম প্রয়োজন। আমি এক কাজ করি, ওদেরকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

রাদিফ বলে,

–হ্যা তাই ভালো। মেয়েটাকে কেমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ওর একটু রিল্যাক্সেশনের প্রয়োজন। তবে সাবধান ওর বাড়ির লোকদের কিছু বুঝতে দিসনা। যা ওদের জলদি পৌঁছে দিয়ে আয়।

ঈশান বলে উঠে,

–সেসব না হয় ঠিক আছে কিন্তু এই অ মা নু ষটাকে কি করবি? এভাবে ফেলে রাখবি? যদি কিছু হয়ে যায়? ম রে টরে যায়?

দাইয়ান জবাব দেয়,

–কিচ্ছু হবে না। আমি ওদের পৌঁছে দিয়ে এর ব্যবস্থা করছি দাঁড়া। আর আয়াজ। তুই আহরারকে নিয়ে বাড়ি যা।

আয়াজ মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। অরু আর আদ্রিকে নিয়ে দাইয়ান ওদের বাড়ির দিকে আগায়। অাদ্রিকা তার বুবুকে দু’হাতে ধরে রেখেছে। কেমন টলমল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে অরুনিকা। ভাবলেশহীন হয়ে, নির্বিকার ভাবে। সেদিকে তাকিয়ে আহরারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কষ্টে বুক ভেঙে আসছে তার। সেই সাথে হচ্ছে নিজের প্রতি তীব্র রাগ। আর একটু ভালোভাবে খেয়াল রাখতে পারলো না কেন সে?

অরুনিকা আর আদ্রিকাকে পৌঁছে দিয়ে আসে দাইয়ান। ঈশান আর রাদিফের সাহায্যে শাহাদাতকে গ্রামের হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসে। তবে নিজেদের আড়ালে রেখেই। যেন ঘুনাক্ষরেও কেউ টের না পায় শাহাদাতের এই অবস্থার পেছনে কে বা কারা দায়ী।

—-
বাড়ির বাইরে বসে আছে চার বন্ধু। বেশ অনেকটা সময় নীরবতা পালন করে ক্ষোভের সাথে কথা বলে উঠে দাইয়ান,

–তুই এতো বেআক্কেল হলি কবে থেকে আহরার, বল তো? কি করতে যাচ্ছিলি? যদি ছেলেটা ম রে যেতো? কি হতো বল?

আহরারও কঠোর স্বরে জবাব দেয়,

–ম রে গেলে যেতো। ও যা করেছে..

–আহরার। মানলাম ও জঘন্য অন্যায় করেছে। কিন্তু তুই যা করেছিস যদি ধরা পড়ে যেতিস? জানিস তুই? ওর বাবা কতোটা ক্ষমতাধর? কতোটা দাপট আছে ওদের এই গ্রামে?

–এতোকিছু ভাববার মতো সিচুয়েশনে ছিলো না দাইয়ান। আমার মাথায় তখন কিচ্ছু ছিলোনা। শুধু মনে হচ্ছিলো ওই জা নো য়া রকে শেষ করে ফেলি।

রাদিফ কন্ঠে বিস্ময় ঢেলে বলে,

–স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার। আহরারকে কখনো এতোটা রেগে যেতে দেখিনি। কতো কতো কঠিন কঠিন পরিস্থিতি ঠান্ডাভাবে হ্যান্ডেল করা ছেলে আজ এমন ফায়ার মুডে।

ঈশানও তাল মিলিয়ে বলে,

–আমিতো অবাকের ঠেলায় অজ্ঞানই হয়ে যাচ্ছিলাম রে। এ কোন আহরারকে দেখছি। বাপরে বাপ! একটা মেয়ের প্রতি প্রেম তোকে কতোটা পাল্টে দিয়েছে।

দাইয়ান এবার শান্ত ভাবে বলে উঠে,

–আহরার। আমাদের কাল ফিরতে হবে। অনুষ্ঠান তো শেষ। দিয়াকে নিয়ে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ফিরে যাবে কাল। আমাদেরও একইসাথে ব্যাক করতে হবে।

আহরার কোনো জবাব দেয় না। শুধু অনুভব করতে থাকে তার মনের ওপর শতমন ওজনের ভার। তাকে চলে যেতে হবে। তার সুনয়না, শ্যামবতীকে ছেড়ে। তার অরুকে ছেড়ে।

চলবে…..

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ