Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"অনুভূতি পর্ব ৩৩

অনুভূতি পর্ব ৩৩

অনুভূতি
পর্ব ৩৩
মিশু মনি
.
৫১.
রাত্রিবেলা সবাই মিলে আড্ডায় বসেছে। বাংলোর সামনে কাঠখড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে চারিদিকে বসে সবাই মিলে আগুন পোহাচ্ছে আর গল্প করছে। মৃদু কুয়াশা পড়েছে চারিদিকে, আজ আবার পূর্ণিমা। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়েছে। চাঁদের আলোয় চা বাগানের পাতাগুলো চকচক করছে। পুরো বাগান একদম নিস্তব্ধ। সুবিশাল চা বাগানের পাশে আবার ঘন ঝোপ জংগল। রাতের নির্জনতা আরো বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। ঝিঝির ডাক কানে আসছে। এরকম পরিবেশে কাঠখড়িতে আগুন লাগিয়ে আগুন পোহানো আর আড্ডা দেয়ার মাঝে অন্যরকম একটা আনন্দময় উত্তেজনা কাজ করছে সবার মধ্যে।
মিশু ও মেঘালয় পাশাপাশি বসেছে। মিশুর পাশে রৌদ্রময়ী ও সায়ান। পূর্ব ঠিক রোদের সামনে মুখোমুখি হয়ে বসেছে। এভাবে বসার কারণে সরাসরি চোখ চলে যাচ্ছে রোদের দিকে। পূর্ব অজান্তেই বারবার ওর দিকে তাকাচ্ছে। নিজেও জানেনা এতবার তাকাচ্ছে ও। কিন্তু রৌদ্রময়ী বুঝতে পারছে পূর্ব বারবার ওকে খেয়াল করছে। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।
সায়ান গিটারে টুংটাং সুর তোলার চেষ্টা করছে। মিশু ও রোদ দুজনে গল্প করছিলো এতক্ষণ। গিটারে মিউজিক ওঠার পর ও থামলো। মেঘালয় ই প্রথমে গান শুরু করলো,
“সর্বত মঙ্গল রাধে বিনোদিনী রাই
বৃন্দাবনের বংশীধারী ঠাকুর কানাই
একলা রাধে জল ভরিতে যমুনাতে যায়,
পিছন থেকে কৃঞ্চ তখন আড়ে আড়ে চায়..
জল ভর, জল ভর রাধে ও গয়ালের ঝি
কলস আমার পূর্ণ করো রাধে বিনতি..
কালো মানিক হাত পেতেছে চাঁদ ধরিতে যায়,
বামন কি আর হাত বাড়ালেই চাঁদের দেখা পায়?
কালো কালো করিস না লো ও গয়ালের ঝি,
আমায় বিধাতা করেছে কালো আমি করবো কি?”
এই লাইনটা গাওয়ার সময় মেঘালয়ের গলায় অন্যরকম কম্পন হলো। কণ্ঠের ওঠানামার সাথে গানের লিরিকটা মিশে একদম অন্যরকম লাগছিলো। গানের কথাগুলো যেন রোদকে উদ্দেশ্য করেই গাওয়া হচ্ছে। রোদ মাথা নিচু করে আগুনের দিকে চেয়ে আছে। ওর চোখে পানি এসে যাচ্ছে। পূর্ব খেয়াল করলো রোদের চোখের পানি। ইশারায় মেঘালয়কে থামতে বলল ও। মেঘালয় থামলো না। গাইতে গাইতে হুট করেই এক গান থেকে অন্য গানে চলে গেলো। পূর্ব হাসলো মেঘালয়ের গান বদলানো দেখে। আর কেউ কিছু বুঝুক না বুঝুক মেঘালয় সবকিছু বুঝে ফেলে। ও অন্য একটা গান শুরু করে দিলো,
“আমি ভাবতে পারিনি তুমি বুকের ভেতর ফাটছো আমার শরীর জুড়ে তোমার প্রেমের বীজ…”
“আমি থামতে পারিনি তোমার গালে নরম দুঃখ আমায় দুহাত দিয়ে মুছতে দিও প্লিজ..”
পূর্ব মুচকি হাসলো। রোদ চোখ তুলতেই ওর সাথে চোখাচোখি হলো। এবার গানটা একদম ঠিক আছে। মেঘালয় গেয়েই যেতে লাগলো। মিশু নিষ্পলক ভাবে চেয়ে আছে মেঘালয়ের পানে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে। আস্তে আস্তে কি ও মেঘালয়ের প্রেমে পড়ে যাচ্ছে? প্রেমে পড়ার অনুভূতি কি এমন হয়? বুকের বামপাশে চিনচিন ব্যথা অনুভূত হয়। কেমন কেমন যেন লাগতে থাকে সবসময়। বারবার দেখতে ইচ্ছে করে,ছুতে ইচ্ছে করে। এত কাছে থেকেও এক ধরণের বিষণ্ণতা ছেয়ে যায় সবসময়।
মেঘালয় গান শেষ করতেই সায়ান মিশুকে বললো, “ম্যাশ ভাবি এবার আপনি গান গেয়ে শোনাবেন।”
মিশু লাফিয়ে উঠলো, “আমি! না না না।”
– “বারে, সেদিন ডান্স দিলে আর আজকে গান শোনাতে পারবা না? গান গাইতেই হবে। শুরু করো তো।”
সব বন্ধুরাই মিশুর গান শোনার জন্য জোড় করতে লাগলো। এমনকি রোদ ও মিশুকে অনুরোধ করছে একটা গান শোনানোর জন্য। মিশু করুণ চোখে মেঘালয়ের দিকে চাইলো। মেঘালয় তো ডান্স দেয়াতে রেগে গিয়েছিলো, আজকেও কি রেগে যাবে নাকি? থাক, গাওয়া যাবেনা।
মেঘালয় নিজেই ওকে বললো, “সবাই এত করে বলছে একটা গান শুনাচ্ছো না কেন মিশু? শোনাও”
মেঘালয় ও দুবার বললো। মিশুর আর ভয় হচ্ছেনা। রাত বেড়ে যাচ্ছে, মাথার উপর কুয়াশা পড়ে ভিজে যাচ্ছে চুল। সামনে আগুন, গোল হয়ে বসে আছে বন্ধুরা। সবাই নিশ্চুপ,রাতের নির্জনতা বিরাজ করছে সবার মনে। কেউ কোনো কথা বলছে না। ঝিঝি ডাকছে,চা বাগানের অন্যরকম একটা শব্দ আছে। কেমন যেন ভৌতিকতা বিরাজ করছে। রাতের পোকারা ডাকছে, নির্জনতা কানে এসে বাজছে। সবমিলিয়ে অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়িয়েছে সবখানে। মিশু চোখ বন্ধ করে গান গাইতে আরম্ভ করলো,
“কার্নিশে ভূল,অবেলা বকুল
থাকো ছুঁয়ে একুল ওকুল..
থাকো ছুঁয়ে শহুরে বাতাস,
ছুঁয়ে থাকো নিয়ন আকাশ..
আবছায়া চলে যায় হিজলের দিন,
অভিমান জমে জমে আমি ব্যথাহীন..
আহারে জীবন, আহা জীবন..
জলে ভাসা পদ্ম যেমন…”
মিশুর কণ্ঠে অদ্ভুত মায়া। খুব অনুভূতি নিয়ে গাইছে গানটা। ওর গলার স্বরের সাথে রাতের নির্জনতা মিশে গিয়ে বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে সবার। গানের প্রত্যেকটা শব্দ ও এমনভাবে উচ্চারণ করছে যে সবাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লো। যার যত সুপ্ত ব্যথা আছে,সব ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। রোদের চোখ ছলছল করছে। বাকিরা একদম স্তব্ধ।
মিশু গেয়েই চলেছে,
“আহা পারতাম,যদি পারতাম..
আঙুল গুলো ছুঁয়ে থাকতাম..
বিষাদেরই জাল টালমাটাল,
এ কোন দেয়াল, এ কোন আড়াল
ছাই হয় গোধূলি কারে যে বলি..
এ কোন শ্রাবণ আজ বয়ে চলি…
আহারে জীবন, আহা জীবন..
জলে ভাসা পদ্ম যেমন…”
মিশুর চোখ বন্ধ। কিন্তু গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কাঠখড়ির আগুনের আলোয় চিকচিক করছে ওর গাল। ওর মায়াবী মুখের দিকে চেয়ে থেকে মেঘালয়ের বুকের চিনচিন ব্যথাটা আরো বেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই সবাই নস্টালজিক হয়ে পড়েছে। মিশু গানটা গেয়েই যাচ্ছে। ওর গাল বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে। বাকিরাও সবাই হঠাৎ ই কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়েছে। এই গানটা তো ওরা অনেক বার শুনেছে,কিন্তু আজকে মিশুর গলায় শুনেছে কেমন যেন বুকটা ব্যথা করছে। পুরনো লুকানো কষ্টগুলো জেগে উঠছে সব।
সবার আগে আরাফ উঠে দাঁড়ালো। ওর ও খারাপ লাগছে এভাবে বসে থাকতে। আরাফ উঠে হেঁটে চলে গেলো। মিশু চোখ বন্ধ করে গেয়েই যাচ্ছে। রোদ ও আর বসে থাকতে পারলো না। ওর এখন কাঁদতে হবে, যেকোনো কোথাও গিয়ে সবার আড়ালে বসে কাঁদতে হবে ওকে। কিছুতেই কান্না চেপে রাখতে পারছে না ও। রোদ উঠে যাওয়ার পর পূর্ব ও চিন্তিত মুখে রোদকে অনুসরণ করলো। মেঘালয় অবাক হয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলো। সায়ান একাই বসে থাকবে কিভাবে তাই সেও উঠে এলো। ওর গায়ে থাকা চাদর টা মেঘালয়কে দিয়ে ইশারায় মিশুকে পড়িয়ে দেয়ার কথা বলে সায়ান ও চলে গেলো। এখন খোলা আকাশের নিচে আগুনের পাশে শুধু মিশু আর মেঘালয় ই বসে রইলো।
“মেঘে মেঘে জমে আজ বেদনার বাঁধ,
ঢেউয়ে ঢেউয়ে থেকে থেকে জলের নিনাদ…”
মেঘালয় মিশুর কাঁধে হাত রাখলো। মিশু চোখ মেলে তাকালো। মেঘালয় ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো, “মিশু, ভালোবাসি তোমাকে।”
মিশু আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো। মেঘালয় ওকে বাঁধা দিলো না। কোনো অচেনা ব্যথা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরেছে ও। তাই আর কোনো শব্দও করলো না। মিশু অনেক্ষণ ধরে কান্না করার পর চোখ মেলে তাকালো। অবাক হয়ে বললো, “সবাই গেলো কোথায়?”
– “তুমি সবাইকে ইমোশনাল করে দিয়েছো। কেউ কারো চোখের জল কাউকে দেখাতে চায়না।”
– “কি বলো? আমার না হয় কষ্ট হচ্ছে,সবার কেন হবে? সবার ই কি কষ্ট আছে?”
– “সবার ই নিজস্ব কিছু বেদনা আছে মিশু। কারো কম,কারো বেশি। কিন্তু কষ্ট সবার ই ভেতরে চাপা আছে।”
মেঘালয় মিশুকে বুকে আলতো করে চেপে ধরে চাদর টা দুজনের গায়েই দিলো। একটা চাদরের ভেতরে দুজনে গুটিসুটি মেরে বসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রইলো। মাথার উপর টুপটুপ করে কুয়াশা পড়ছে। রাত বেড়ে অনেক হয়েছে। কিন্তু এই নির্জনে এভাবে জড়াজড়ি করে বসে থাকতেও সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছে। সাথে একটা নীল বেদনাও ছেয়ে আছে।
মিশু মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে বললো, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মেঘমনি।”
– “হুম বলো। আমি তোমার সব কষ্ট দূর করে দিবো মিশু।”
মিশু একটু সময় নিলো। চোখ মুছে ওর বুকে আরো একটু মুখ গুঁজে দিলো। হাতের বাঁধন আলগা করে দিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে বলে যেতে লাগলো।
“আমার সাথে সবসময় এমন কেন হয়? আমি সেই কৈশোর থেকেই বারবার এই জিনিস টার সম্মুখীন হই। আমাকে তো ছোটবেলা থেকেই রোজগার করে করে খেতে হয়। জানো,যখন আমি কারো কাছে কাজের জন্য যাই। কতজন আমাকে কত রকম বাজে প্রস্তাব দেয়? একদিন এক কর্মকর্তার কাছে দেড় ঘন্টার মত বসে ছিলাম যেন ওই প্রজেক্টের কাজে আমাকে কর্মী হিসেবে নেয়। কিন্তু দেড় ঘন্টা পর সবাই চলে গেলে আমাকে একা পেয়ে উনি বললেন, ‘এত সুন্দর শরীর থাকতে এভাবে কাজের জন্য বসে থাকা লাগে? সন্তুষ্টির বিনিময়ে সন্তুষ্টি। খুব বাজে উক্তি করেছিলো। এরকম প্রায় ই হয় আমার সাথে। শুধু আমার সাথেই সবাই কেন এমন করে মেঘালয়?”
মেঘালয় নিশ্চুপ। মুখে কথা আসছে না। মিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “আমি আছি তো। আর কেউ কখনো এভাবে বলার সাহস পাবেনা মিশু।”
মিশু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, “আর হয়ত পাবেনা। কিন্তু আমার ভেতরে যেগুলো চাপা পড়ে আছে এসব তো কখনো মুছবে না আমার মাথা থেকে। লোকাল বাসে উঠলে দু একটা ছেলে পিছনে হাত বুলিয়ে চলে যায়, বুকে পেটে হাত দিয়ে চলে যায়। ট্রেনে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবা, সেখানেও এরকম লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। একবার বাড়িতে কেউ ছিলোনা, এক কাজিন এসে সুযোগ নিলো। আমার সাথেই কেন এমন হয়? আর কারো সাথে তো এমন হয়না। আমার সাথে কেন সবসময় এমন হয়?”
মিশু অঝোর ধারায় কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে মেঘালয়ের শার্ট খামচে ধরে বললো, “আমি আর কিছু বুঝি বা না বুঝি ধর্ষিতা কিভাবে হয় সেটা ঠিকই বুঝি। আর শরীরের দিকে সবাই কিভাবে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।আমার যে আর কোনো উপায় ও নেই। আমার বাবা নেই, মা অসুস্থ। আমি যদি নিজে রোজগার না করি, আমার মা বোন না খেয়ে মরবে। আর যদি রোজগারের জন্য বাইরে বের হই, অফিসেও জামার নিচ দিয়ে কেউ শরীরে হাত দেবে। এসবের হাত থেকে বাঁচার জন্য ভাবি, আমি বাইরে বের হবোনা, সারাদিন ঘরে বসে থাকবো। তাহলে না খেয়ে মরতে হবে আমাদের।”
মেঘালয়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মিশুর ভেতরে এত চাপা কষ্ট জমে ছিলো ওর জানা ছিলোনা। এতটুকু বয়সেই এরকম যন্ত্রণা গুলো নিয়ে মেয়েটা বেঁচে আছে কিভাবে? আর কোনোদিনো এক বিন্দু কষ্টকেও মিশুর ধারেকাছে পৌছাতে দেবেনা মেঘালয়। এতে নিজের জীবন চলে যায় যাক।
মেঘালয় মিশুকে শক্ত করে ধরে বললো, “আমি এখন তোমার সব। আমাকে নিয়ে বাঁচবা, আর কক্ষনো এরকম কিছু তোমার সাথে ঘটবে না।”
মিশু মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি না হয় একটা মিশুর দায়িত্ব নিলে। সারাদেশে এমন হাজার হাজার মিশু আছে যাদেরকে পেটের দায়ে রোজগার করতে নামতে হয়েছে। কিন্তু মানুষ তাকে সুযোগ পেয়ে সিচুয়েশনে ফেলে ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে। এরকম মিশুদের কান্না দেখার মত কেউ নেই।”
মেঘালয় বললো, “আমি জানি। আমার ইচ্ছে করতো সব দুঃখী মেয়ের জন্য কিছু করি। কিন্তু সেটা তো হয়ে ওঠেনা। সবার জন্য কিছু করতে না পারি, একটা মানুষের মুখে তো হাসি ফোটাতে পারি। পারিনা?”
– “তুমি খুব ভালো মেঘালয়, খুব ভালো।”
– “আমি খারাপ। আমিও ট্রেনের ভেতর কন্ট্রোল হারিয়ে তোমাকে চুমু খেয়ে ফেলেছিলাম।”
মিশু বললো, “সে জন্যই তো তুমি ভালো। এই ছোট্ট একটা ভূলের জন্য তুমি আর কোনোকিছু না ভেবেই সেদিন ই আমাকে বিয়ে করে ফেললে। শুধুমাত্র এই ছোট্ট পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে, আমার কান্নার মূল্য দিতে। আর কোন ছেলে ই বা এটা করবে?”
মেঘালয় মিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। চোখ মুছে দিলো। একই চাদরে দুজনে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো অনেক্ষণ। রাত বেড়ে যাচ্ছে, মেঘালয় উঠে দাঁড়িয়ে মিশুকে কোলে তুলে নিলো। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিলো ভালোমতো। মিশু ওর গলা ধরে রইল দুহাতে। মেঘালয় ওকে নিয়ে রুমের দিকে পা বাঁড়ালো। দূর থেকে ওদেরকে এভাবে দেখলো রোদ ও পূর্ব। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মিশু মেঘালয়ের দিকে চেয়ে ছিলো নিশ্চুপ হয়ে। মেঘালয় ওর চোখ মুছে দিয়ে বুকে চেপে ধরে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল,মিশু অঝোর ধারায় কাঁদছিল। এসব দেখে রোদের ও ইচ্ছে করছিলো এভাবে কারো বুকে মাথা রেখে কাঁদতে পারতো যদি!
এতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর পূর্বই প্রথম কথা বললো, “রোদ।”
রোদ চমকে উঠে বললো, “হুম, আপনি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন?”
– “তোমাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। তুমি একা থাকলেই তোমার আপসেট লাগবে।”
– “আমার মনটা আপনারা অনেক ভালো করে দিয়েছেন। সবসময় মন ভালো করে দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকলে তো সারাক্ষণ আমাকে পাহারা দিতে হবে।”
– “তা হোক। সারাক্ষণ পাহারা দিলেও যদি একটা মানুষের মন ভালো রাখা যায় সেটাই বা কম কিসে বলো? মেঘালয় নিজের সবটুকু দিয়ে ওই মেয়েটার সমস্ত কষ্ট দূর করে দিতে পারলে আমি কেনই বা শুধু মনটা ভালো রাখতে পারবো না বলো?”
রোদ হাসার চেষ্টা করে বললো “আপনারা অনেক ভালো। আমার লাইফে আমি কক্ষনো এরকম মানুষ দেখিনি।”
পূর্ব বললো,”আমি ছোটবেলা থেকেই মেঘালয়ের সাথে বড় হয়েছি। আমরা চার বন্ধু একসাথে আছি প্রায় ছ বছর হলো। কেউ কাউকে ছাড়িনি মুহুর্তের জন্যও। আর অন্য কারো সাথে এত ভালো বন্ধুত্বও করিনি। কারণ কারো সাথে আমাদের এরকম মনের মিল হতোনা। সবাই শুধু নিজের স্বার্থ খোঁজে। একমাত্র মেঘালয়, সায়ান আর আরাফ কেই দেখেছি যারা কক্ষনো নিজের স্বার্থের কথা ভাবেনা।”
রোদ বললো, “সত্যিই আপনারা অনেক ভালো।”
পূর্ব আকাশের দিকে তাকালো। কুয়াশার মাঝেও চাঁদের সৌন্দর্য মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছে। দেখতে খুবই ভালো লাগছে। ও বললো, “রোদ তোমার জোৎস্না ভালো লাগে?”
– “হুম খুব ভালো লাগে। আমার অমাবস্যা এখন বেশি ভালো লাগে। সারাবছর যদি অমাবস্যা লেগে থাকতো তাহলে খুবই ভালো হতো।”
রোদের কথায় অভিমান মেশানো। পূর্ব বুঝতে পেরে বললো কথা ঘুরানোর জন্য বললো, “আচ্ছা আজকে বিছানাকান্দিতে গোসল করতে কেমন লেগেছে বলো?”
– “খুবই ভালো। শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে যা আনন্দ হচ্ছিলো!”
এমন সময় আরাফের গলা শোনা গেলো। পূর্ব ও রোদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো। আরাফ বারান্দায় এসে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। আরাফের রাগ মিশ্রিত গলা শুনে রোদ ভয় পেয়ে বললো, “ওনার এত রাগ কেন?”
পূর্ব বললো, “ওই ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে। একটা মেয়েকে খুবই ভালোবাসতো ও। একদিন কোনো কথাবার্তা ছাড়াই মেয়েটি রাতে ফোন দিয়ে বললো, আজকে আমাকে দেখতে এসে একেবারে ম্যারেজ রেজিস্ট্রি করে ফেলেছে। আমি অনেক কান্নাকাটি করেও, অনেক কিছু বলেও কিছুতেই বিয়েটা আটকাতে পারিনি। তারপর থেকে মেয়েটির সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় ওর। মাঝেমাঝে মেয়েটি ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে বলতো আরাফ আমি তোমাকে খুব মিস করি। আরাফ অনেক কষ্ট পেয়েছিলো। মেয়েটি একদিন ফোন দিয়ে জানালো ওর বিয়েও হয়ে গেছে। এখন স্বামীর বাসায় থাকে। আরাফের সাথে টোটালি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় ওর। কষ্ট সহ্য করতে করতে ছেলেটা যখন সামলে উঠেছে, তখন একদিন হঠাৎ প্রকাশ পেলো মেয়েটির আসলে বিয়ে বা রেজিস্ট্রি এসব কিছুই হয়নি। মেয়েটি একটা ছেলের সাথে নতুন রিলেশনে জড়িয়েছে আর আরাফের সাথে ব্রেকাপ করার জন্য বিয়ে নামক মিথ্যে কথাটা বলেছে।”
রোদ অবাক হয়ে বললো, “এরকম মেয়েও জগতে আছে! অদ্ভুত। আপনারা খোজ নিতে পারেন নি?”
– “মেয়েটির বাসা দূরে ছিলো। তাছাড়া আলাদা করে যাচাই করার তো দরকার নেই,কারণ গার্ল ফ্রেন্ডকে আরাফ খুবই বিশ্বাস করতো। কে জানতো এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এভাবে ধোঁকা দেবে।”
রোদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। পূর্ব বললো, “এরপর থেকেই আরাফ কেমন যেন বদমেজাজি হয়ে গেছে। মেয়েদেরকে সহ্যই করতে পারতো না। অনেক দিন পর এখন মিশুকে দেখে একটু একটু করে ওর রাগটা কমে যাচ্ছে। মিশুকে দেখে ওর নাকি মেয়েদের প্রতি ধারণাটা একটু বদলেছে।”
– “জীবন টা এত বিচিত্র কেন?”
পূর্ব বললো, “বিচিত্র বলেই তো এটা জীবন। বিচিত্র না হলে তো এটাকে জীবন বলা যায়না। বিচিত্রতা আছে বলেই জীবনে সুখের স্বাদ টুকু উপলব্ধি করতে পারি।”
চলবে..

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ