Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"অনুভূতি পর্ব ২৬

অনুভূতি পর্ব ২৬

অনুভূতি
পর্ব ২৬
মিশু মনি
.
৩৯.
আট টার দিকে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো ওরা।
বাইরে এসে রেস্টুরেন্ট এ নাস্তা করে প্রথমেই গেলো হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজারে। ভেতরে ঢুকে মিশুকে নিচে দাড় করিয়ে রেখে ওরা উপরে মাজার দেখতে চলে গেলো। মাজারে মহিলাদের ঢোকা নিষেধ। মিশু নিচে ঘুরেঘুরে কবুতর, পুকুর, নামাজের জায়গা, আর নিচে শুয়ে থাকা লোকজন দের দেখছিলো। একজন গার্ড টাইপের কেউ এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লাঠি দিয়ে মেরে ঘুমিয়ে থাকা লোকজন দের তুলে দিচ্ছে।
মেঘালয় পিছনে দাঁড়িয়ে বললো, “ম্যাম।”
মিশু পিছন ফিরতেই মেঘালয় হাসলো। বললো, “আসুন।”
বাইরে বের হয়ে রাস্তার দুপাশে অনেক দোকান দেখতে পেলো মিশু। একটা দোকান থেকে মেঘালয় হালুয়া কিনে দিলো ওর হাতে। দুপাশের দোকান গুলো দেখতে দেখতে মিশু হালুয়া খাচ্ছিলো আর রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো। গাড়িতে উঠে মিশু সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসার জন্য অনুনয় করতে লাগলো। মেঘালয় ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে লাগল। একমাত্র মেঘালয় ই এদিকের রাস্তা চেনে। বাকিরা চেনেনা।
মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
– “রাতারগুল।”
– “রাতারগুল আবার কি? কি আছে সেখানে?”
– “রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট।”
– “সোয়াম্প ফরেস্ট আবার কি?”
– “বাংলাদেশে দুটো বিখ্যাত বন আছে শোনোনি? ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আর সোয়াম্প ফরেস্ট?”
মিশু লাফিয়ে উঠে বললো, “ওহ বুঝতে পেরেছি। আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি? খুব মজা হবে।”
– “হুম, অনেক মজা হবে।”
মিশু একটু কি যেন ভেবে বললো, “আচ্ছা শুনেছি ওই ফরেস্ট টা পুরোটাই জলের উপর? আমরা যখন ভেতরে ঢুকবো আমার পায়জামা ভিজে যাবে না?”
সবাই হেসে ফেললো মিশুর কথা শুনে। একদম বাচ্চাদের মতন কথাবার্তা। মেঘালয় হেসে জবাব দিলো, “আমরা তো পায়ে হাঁটবো না রে পাগলী। আমরা নৌকায় পুরো বনটা ঘুরবো।”
– “ইস! কত্ত মজা হবে তাহলে।”
ওর এমন শিশুসুলভ কথাবার্তা শুনে বাকিরা হাসছিলো। মজা লাগছে শুনতে। পূর্ব বললো, “ভাবি ওখানে কিন্তু গাছে সাপ ঝুলে ঝুলে থাকে। আমরা যখন নৌকা নিয়ে জংগলের ভেতর ঢুকবো, টুপ করেই একটা সাপ আপনার কোলের উপর পড়বে।”
মিশু অবাক হয়ে মেঘালয়কে জিজ্ঞেস করলো, “সত্যি! তাহলে তো আরো মজা হবে। আমি সাপ কোলে নিয়ে বসে থাকবো আর তুমি সায়ান ভাইয়ার ক্যামেরা দিয়ে আমার একটা ছবি তুলে দিবা আচ্ছা?”
সবাই আবারো হেসে উঠলো। পূর্ব ভেবেছিলো সাপের কথা বললে মিশু হয়ত আঁৎকে উঠবে। কিন্তু মিশুর আরো মজা লাগছে সেটা শুনে। সত্যিই মেয়েটা এখনো বড্ড ইনোসেন্ট।
মেঘালয় একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাড় করালো। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর। মিশু একবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে সেদিকে তাকালো। তারপর মেঘালয় কে জিজ্ঞেস করলো, “আমরা এই বাড়ির ভেতর দিয়ে জংগলে ঢুকবো?”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “না রে পাগলী। বাড়ির ভেতর দিয়ে কখনো জংগলে ঢোকা যায় বুঝি? তোমার কি মনেহয় এর ভেতরে নদী আর বন আছে?”
মিশু লজ্জা পেয়ে গেলো। সত্যিই তো! বাড়ির ভেতরে কিভাবে বন থাকতে পারে। কি যে বোকার মত প্রশ্ন করে সে! নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো। মেঘালয় একজনকে কল দিয়ে কথা বললো। তারপর মিশুকে বললো, “এটা নায়ক সালমান শাহ এর বাড়ি।”
– “কোন সালমান শাহ?”
– “বাংলাদেশে একজন ই জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ ছিলেন।”
– “তুমি আমার এমন ই একজন, যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন,সেই সালমান শাহ?”
– “হ্যা, সেই সালমান।”
মিশুর চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেলো। আর ওকে দেখে বাকি চারজন হেসেই খুন। বেশি আনন্দে মেয়েটা একেবারেই ছোট বাচ্চাদের মতন হয়ে যায়। কি বলে না বলে কোনো বোধ থাকেনা। মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বের হলো। বাকিরাও নেমে দাঁড়ালো।
একজন লোক এসে মেঘালয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, “আরে মেঘালয় যে! অনেক দিন পর।”
– “ফ্রেন্ডস দের নিয়ে ঘুরতে চলে এলাম। কেমন আছেন?”
লোকটি হাসিমুখে কথা বলতে লাগলেন। উনি বোধহয় শুধু পূর্বকেই চেনেন। পূর্ব’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছো?
ওরা বেশিক্ষণ দেড়ি করলো না। এমনিতেই বেলা দশটা বেজে গেছে। রাতারগুল পৌছাতে দুপুর প্রায় হয়েই যাবে। বিকেলে আবার চা বাগানে মিটিং আছে। তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দিতে হলো। মিশু অবাক হয়ে সবকিছু দেখছে আর মুগ্ধ হচ্ছে। গাড়ি থেকে চা বাগান দেখতে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে। মেঘালয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “এত্ত সুন্দর কেন!”
মেঘালয়ের খুবই ভালো লাগছে মিশুকে দেখে। যে মানুষ টার মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নেই, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে যে অভিভূত হয়না, তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গিয়ে আনন্দ নেই। মিশুর উচ্ছ্বসিত মুখ, আনন্দে বারবার লাফিয়ে উঠা, উত্তেজনায় হাত তালি দেয়া সবই মেঘালয়কে মুগ্ধ করছে প্রতি মুহুর্তে। ইচ্ছে করছে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য যদি মিশুকে দেখিয়ে আনতে পারতাম!
মিশু বললো, “আমার কি ইচ্ছে করে জানো? ওই যে গামছার মত ড্রেসগুলো পড়ে, পিঠে একটা বালতির মত ঝুড়ি ঝুলিয়ে চা বাগানে চা পাতা তুলি। আমাদের একটা ছোট্ট সুন্দর সোনামণি হবে, তাকে গামছায় বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে আমি চা বাগানে চা পাতা তুলবো। কেমন মজা হবে বলোতো?”
মেঘালয় হেসে ফেললো। সায়ান বললো, “কোনোকালে কোনো মেয়ের এরকম ইচ্ছে হয় আমার জানা ছিলোনা।”
মিশু বললো, “আমার খুব হয়। আমার ইচ্ছে হয় পাহাড়ের উপর গিয়ে জুম চাষ করি, কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে কুপিয়ে জমি চাষ করবো। অনেক কষ্ট করবো, অনেক পরিশ্রমী হবো। তারপর অনেক দিন বাঁচবো।”
পূর্ব চোখ দুটো বড়বড় করে বললো, “কেয়া বাত হ্যায়! দারুণ দারুণ ইচ্ছে তো তোমার মিশু। আর কি কি ইচ্ছে আছে বলোতো শুনি?”
মিশু আগ্রহী হয়ে বলতে লাগলো, “আমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের উপর গিয়ে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। আমাদের অনেক অভাব থাকবে, আমি আর মেঘ কষ্ট করে রোজগার করে আনবো। তারপর মজা করে খাবো। মেঘ অনেক দূর থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে আনবে, আমি জুম চাষ নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। আবার ইচ্ছে করে মেঘের দেশে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। ঘুম থেকে উঠে যখনি বাইরে এসে দাঁড়াবো, মেঘ উড়ে এসে আমাদের ছুঁয়ে যাবে।”
মেঘালয় বললো, “বাড়ি বানিয়ে থাকাটা হয়ত সম্ভব না। তবে সাজেকে মেঘের দেশে নিয়ে যাবো তোমায় একদিন। ঘুম থেকে উঠে যখন বাইরে এসে দাঁড়াবে, তুলোর মত মেঘ এসে তোমাকে শীতল স্পর্শ দিয়ে যাবে।”
– “আচ্ছা। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবা হ্যা?”
– “হুম তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো।”
পূর্ব জিজ্ঞেস করলো, “ভাবি আর কি কি ইচ্ছে আছে বলেন না শুনি। আপনার ইচ্ছেগুলো একদম ইউনিক। লাখ টাকায় ও কেনা যাবেনা। বলেন শুনি?”
মিশু একটু নড়েচড়ে বসলো। পিছন ফিরে ওদের দিকে তাকিয়ে পা দুটো সিটের উপর তুলে বসলো। মেঘালয় মিশুর বসার স্টাইল দেখে মুখ টিপে হাসলো। অন্যকেউ ওর সামনে এভাবে বসার সাহস হয়ত পাবেনা। আর ওর চারপাশের সবাই খুব বেশি ভদ্র সবসময়। মিশু কোনোকিছু না ভেবেই পা উপরে তুলে বসলো সেটা মেঘালয়ের কাছে অন্যরকম লাগাটাই স্বাভাবিক। নিঃসংকোচ আচরণ বরাবর ই ওকে মুগ্ধ করে।
মিশু বললো, “আমার না পাহাড়ের প্রতি খুব টান। পাহাড়ের উপর একটা পিঠার দোকান দিতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা মেঘ,পাহাড়ে পিঠা বিক্রি হবে?”
মেঘালয় বললো, “কেন হবেনা? পাহাড়ের উপর হাজার হাজার ট্রাভেলার্স ঘুরতে আসে। তারা পিঠা কিনে কিনে খাবে।”
– “বিদেশি রাও আসে? বিদেশিরা তো দুই টাকার পিঠা খেয়ে আমাদের দশ টাকা দিয়ে যাবে। তখন আমাদের অনেক গুলা টাকা হবে।”
সায়ান বললো, “তোমার বরের এমনিতেই অনেক গুলা টাকা আছে মিশু। সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে খেতে পারবা।”
মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তারপর সায়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমার রেডিমেড কিছু ভালো লাগেনা। কিছু প্রস্তুত আছে,সেটা ভোগ করতে একটুও আরাম পাইনা আমি। বরং নিজে প্রস্তুত করে সেটা ভোগ করার মাঝে অন্যরকম আনন্দ। বাপের টাকায় ফুটানি মারার চেয়ে নিজে দু টাকা ইনকাম করে কষ্ট করে চলাটাও শান্তি।”
সবাই লজ্জা পেয়ে গেলো। মেঘালয় মুচকি হাসলো মিশুর জীবন দর্শন দেখে। মেয়েটা যেমন সরল,তেমনি তেজীও। কোনোকিছুর জন্য কারো উপর নির্ভর করতে রাজি নয়। আমার যা আছে, আমি তাই নিয়েই সুখী। অন্যের কাছে ফ্রিতে কিছু নিয়ে আলগা সুখের কোনো মানেই হয়না। এসব ভেবে ভেবে মেঘালয় হাসছিলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এই আমার না খুব আচার খেতে ইচ্ছে করছে।”
মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এখন সে আচার কোথায় পাবে? পূর্ব ফাজলামি করে বললো, “ভাবির কি বমি বমি পাচ্ছে?”
– “না, আমার জার্নিতে বমি আসেনা।”
– “মাথা ঘুরাচ্ছে?”
– “না, আমার কখনো মাথা ঘুরায় না।”
– “ওহ শিট, কোথায় ভাবলাম আমরা আংকেল হবো।”
বলেই সবাই হেসে উঠলো। মিশু এই ইয়ার্কির আগাগোড়া কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। ইহকালে কেউ কখনো ওর সাথে এরকম ফাজলামি করেনি। আচার খাওয়ার সাথে আংকেল হওয়ার কি সম্পর্ক মাথাতেই ঢুকলো না। সবাই হাসছে আর মিশু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেঘালয় ও ফ্রেন্ড দের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মিশু যে এই সাধারণ ফাজলামিটা ধরতে পারেনি সেটা দেখে আরো মজা লাগছে সবার।
মিশু মেঘালয়ের দিকে ফিরে বললো, “এখানে কোথাও আচার পাওয়া যাবে না?”
ওরা আবারো হেসে উঠলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন তোমরা?”
মেঘালয় বললো, “তুমি বাংলা সিনেমা দেখো না? সিনেমায় বাড়ির বউরা আচার খেলে স্বামী আর শ্বাশুরিরা কি বলে জানো না?”
মিশু মুখ বাঁকা করে বললো, “সিনেমা দেখার সময় কখনো পাইনি। ছোটবেলা থেকেই প্রত্যেকটা সেকেন্ডকে আমি কাজে লাগাতাম। যেটুকু অবসর পেয়েছি, বিদেশি উপন্যাস পড়েই কাটিয়েছি।”
সবাই চুপ হয়ে গেলো। আনন্দময় শৈশব হয়ত মিশুর ছিলোনা। নিজে যদিও বাচ্চা স্বভাবের,তবুও সময়ের ব্যাপারে সবসময় ই খুব সিরিয়াস ও। ইচ্ছে পূরণের বেলায় যেকোনো উদ্ভট কাজ করা যেতে পারে, কিন্তু সময়কে সবসময় কাজে লাগানো চাই।
সায়ান বললো, “মিশুর একটা জিনিস দেখে আমি খুব অবাক হই। আমরা সচরাচর যেসব বলাবলি করি,ও সেসব জানেনা। আবার আমরা যেসব কল্পনাও করিনা, ও সেসব নিয়ে ভাবে।”
মেঘালয় বললো, “এটা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার। আল্লাহ মেয়েটাকে যে কি দিয়ে বানাইছে! জগতের সব উদ্ভট চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খায়।”
মিশু বললো, “আমি আবার কি উদ্ভট চিন্তা করলাম?”
– “পাহাড়ের উপর পিঠার দোকান দেয়ার চিন্তাটা কি উদ্ভট নয়?”
– “আহা! আমি তো অল্প কয়দিন ব্যবসা করবো। পনেরো দিন পিঠা বেচবো। তারপর আবার অন্য ব্যবসা।”
পূর্ব বললো, “এরা দুটোই সবসময় ব্যবসার চিন্তা ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘোরে।”
বলেই হেসে উঠলো। সবাই মিলে হাসাহাসি করতে করতে রাতারগুলের কাছাকাছি পৌছে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে দোকান থেকে একগাদা চাটনি কিনে মেঘালয় মিশুর হাতে ধরিয়ে দিলো। মিশু চাটনি গুলো গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে বললো, “আমরা জংগলের ভেতরে গিয়ে চাটনি বেচবো। যারা আমাদের মত ঘুরতে এসে আচার খেতে চাইবে, তারা আমার কাছে চাটনি কিনে কিনে খাবে। এক পিছ তিন টাকা।”
পূর্ব সবাইকে দাড় করিয়ে কোমরে হাত রেখে বললো, “সাধে কি বললাম এরা সবসময় ব্যবসার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরে? রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের ভেতরে গিয়ে সে নাকি আচার বেচবে?”
সবাই আরেক দফা হেসে নিলো এসব নিয়ে। মিশুও খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
৪০.
ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো দুপুরের। নিখিল!
ও রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নিখিলের কর্কশ গলা ভেসে আসলো, “রিসিভ করতে এত সময় লাগে?”
ভয় পেয়ে গেলো দুপুর। নিখিল কখনো এভাবে রাগ দেখায়নি ওকে।আর এখন তো ও অন্য কারো স্ত্রী। গত দুদিন নিখিলের সাথে কোনোরকম কথাও হয়নি। আজকে হঠাৎ কি হলো ওর?
নিখিল বললো, “বরের সাথে প্রেম নিয়ে ব্যস্ত ছিলে বুঝি?”
– “নিখিল, তুমি এভাবে কেন কথা বলছ?”
– “তোমার সাথে আর কিভাবে কথা বলা উচিৎ?”
– “এরকম বিহ্যাভ দেখানোর জন্য কল দিয়ে থাকলে ফোন রাখো।”
– “রাখবো। তার আগে শুনি মহারাণীর নতুন জীবনটা কিভাবে শুরু হচ্ছে?”
নিখিলের কথা বলার স্টাইল দেখে রাগ হলো দুপুরের। ও বললো, “খুব ভালো ভাবেই শুরু হচ্ছে। আমার বর আমার অনেক কেয়ার করে।”
– “তা তো করবেই। সুন্দরী বউ পেয়েছে না? তার তো আর রৌদ্রময়ীর দরকার ছিলো না, তার দরকার ছিলো তোমাকে। সে তো কেয়ার করবেই।”
– “নিখিল, ভাষা এমন করছো কেন?”
– “তাছাড়া? তোমার শ্বশুরঘরের লোকরাও তো অনেক কেয়ার করে তাইনা? করবেই তো। তাদের তো একজন পুত্রবধূ দরকার ছিলো, স্পেশালি রৌদ্রময়ীর কোনো দরকার ছিলোনা।”
দুপুরের মেজাজ রীতিমত খারাপ হতে শুরু করেছে। ও সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু বিনা কারণে খারাপ আচরণ একদম ই সহ্য করতে পারেনা। বললো, “নিখিল তুমি দয়া করে ফোনটা রাখো। আর রাগ ঝাড়ার জন্য ফোন দিওনা প্লিজ।”
– “আমি রাগ গুলো কাকে দেখাবো তাহলে? তোমার কি কিছুই করার ছিলোনা? আমি তোমার বাবাকে ভালো করেই চিনি। তুমি যদি তাকে একবার বলতে বিয়েতে তোমার মত নেই তবে উনি কখনোই তোমাকে জোর করে অরণ্য’র সাথে বিয়ে দিতো না।”
দুপুর রেগে বললো, “এই জন্য রেগে আছো? দেখো, হয়ত আমি চাইলেই বিয়েটা ভাংতে পারতাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার কাছে আমার বাবার সম্মান টাই সবচেয়ে বড় ছিলো। বাবার মুখের উপর না বলে দেয়ার মত শক্তিটা পাইনি আমি।”
– “আমি কি তোমার অযোগ্য ছিলাম? আমাকে বিয়ে করলে তোমার বাবার সম্মান নষ্ট হয়ে যেত? আমি তো চেয়েছিলাম গিয়ে তোমার বাবার হাতে পায়ে ধরে তোমাকে চাইতে। আমাকে বারণ করেছিলে কেন?”
– “নিখিল,আমার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে একবার ভাবো। আশাকরি উত্তর পেয়ে যাবা। গত দুদিন যাবত পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুমি ফোন দিয়ে আমাকেই রাগ ঝারছো?”
কণ্ঠটা হঠাৎ নরম হয়ে গেলো নিখিলের। ও বললো, “আমি তোমার সাথে চরম খারাপ আচরণ করতে চাই দুপুর। যাতে করে খুব সহজেই আমার প্রতি তোমার বিতৃঞ্চা চলে আসে আর আমাকে ভূলে যেতে পারো।”
দুপুর হাসার চেষ্টা করে বললো, “তোমার ধারণা ভূল। যত খারাপ কাজ করেই আমার সামনে আসোনা কেন, দুপুর কখনো তোমাকে ভূলতে পারবে না। তোমার জায়গাটা আজীবন তোমার। সেখানে খারাপ আচরণ করে অযথা আমাকে কষ্ট দিওনা নিখিল।”
নিখিলের কান্না পেয়ে গেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “হুম। ভালো থেকো।”
– “আর আগামী তিনদিন আমাকে কল দিওনা। এই তিনদিন অরণ্য হয়ত প্রত্যেকটা সেকেন্ড আমার সাথে থাকবে।”
– “হানিমুনে যাচ্ছো?”
প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো দুপুরের। হানিমুন নিয়ে কত্ত প্লান ছিলো নিখিলের সাথে। নিখিল বলেছিলো ওকে দার্জিলিং নিয়ে যাবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়ে আনবে। রিসোর্টের বিছানায় শুয়ে নিখিলের বুকে মাথা রেখে দূরের হিমালয় দেখবে ও। সব স্বপ্ন নিমেষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
নিখিল বললো, “আচ্ছা রাখছি দুপুর। নিজের খেয়াল রেখো।”
– “তুমিও। আর প্লিজ সিগারেট খেও না।”
– “আমার জন্য চিন্তা করাটা বাদ দিও দুপুর। আমি চেষ্টা করবো যাতে কখনো তোমাকে ফোন না দেই।”
– “ফোন দিও। আগামী তিনটা দিন দিওনা।”
– “কোথায় যাচ্ছো?”
– “সিলেটে যাচ্ছি। নূরজাহান গ্রান্ডে উঠবো। একদিন ট্যুরে গিয়ে ওই হোটেলে শুয়ে শুয়ে আমাকে ভিডিও কল দিয়েছিলে। কি পরিমাণ কষ্ট হবে আমার ভাবতে পারো নিখিল?”
– “আচ্ছা যাও। সাবধানে থেকো।”
শেষ মুহুর্তে গলাটা ভিজে উঠলো দুপুরের। ফোন রেখে আয়নার দিকে তাকালো ও। চোখ মুছলো শাড়ির আঁচলে। এই চোখের জল কাউকে দেখাতে চায়না ও। একটু বাদেই অরণ্য এসে বেড়িয়ে পড়ার জন্য তাগাদা দিলো। লাগেজ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে দুপুরের সামনে দাঁড়ালো। টিস্যু পেপার নিয়ে দুপুরের কাজল ঠিক করে দিতে দিতে বললো, “একটু নিজের কেয়ার করতে পারো না? বড্ড অগোছালো তুমি।”
দুপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বেড়িয়ে পড়লো ওরা সিলেটের উদ্দেশ্যে।
চলবে..

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ