Friday, June 5, 2026







কাঙাল – আসরিফা মেহনাজ চিত্রা

#গল্পপোকা_ছোটগল্প_প্রতিযোগিতা_আগস্ট_২০২০
কাঙাল
আসরিফা মেহনাজ চিত্রা

-“আপনার কাছে এক্সট্রা খাবার হবে মিস্টার? আমি আপনাকে খাবারের টাকা দিয়ে দিবো। বিনিময়ে খাওয়ার কিছু দিতে পারবেন?”

রাতের আঁধারে ট্রেনের ঝকঝক শব্দ ভেদ করে ফায়াজের কানে মধুর মতো মিষ্টি একটা আকুতি ভরা কন্ঠ ঠেকলো। শব্দের উৎস খুঁজে বের করতে হাতে থাকা টিফিন ক্যারিয়ার থেকে মুখ উঠিয়ে সামনের দিকে তাকালো। ছোট্ট বগির হলদে ম্লান আলোয় একটি মেয়ের মুখশ্রী ভেসে উঠছে। মেয়েটাকে দেখেই খানিকটা চমকালো ফায়াজ।

আরেহ! এটা তো সেই মেয়েটা যার সাথে সে একই বাসে করে রেলস্টেশনে আসলো। যাকে দেখে ফায়াজ একমুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলো। বাসের জানালার ফাঁক গলে রোদের তেজে লাল হওয়া মেয়েটির মিষ্টি চেহারা, কপালের সাথে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুল, নাকে জমে থাকা হীরের টুকরোর মতো ঘাম, সব যেন ফায়াজকে খুব টানছিলো। মেয়েটির পরনে ছিলো ছেলেদের মতো শার্ট প্যান্ট আর মাথায় ছাই রঙা ক্যাপ। কিছুক্ষণ পরপরই আকাশী রঙা শার্টের হাতা দিয়ে নাকের ঘাম মুছছিলো যার কারনে পুরো নাকটাই লাল হয়ে গেছে। উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের আদুরে চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট। সেই মুহুর্তে ফায়াজের মনে হয়েছিলো এর চেয়ে সুন্দর মেয়ে দুনিয়াতে আর একটাও নেই। একটাও না। বাস থেকে নেমে কতই না খুঁজে ছিলো মেয়েটিকে! আর সেই মেয়েটি এখন তার সামনের আসনে? তার চোখের সামনে!

-“হ্যালো মিস্টার! শুনছেন? আরে কি দেখছেন এভাবে? আমার কথা বুঝতে পারছেন? কালা নাকি! এই যে, এই! ও ভাই?”

ভাই ডাকায় মুহুর্তেই ফায়াজের ফর্সা বদনখানায় ব্ল্যাকহোলের মতো কালো ছায়া নামলো যেন। কি সুন্দর করে এতক্ষণ মিষ্টি মেয়েটার মিষ্টি কন্ঠ উপভোগ করছিলো সে। আর সেই উপভোগটাতে পানি ফেলে নিমিষেই নষ্ট করে দিলো মেয়েটি। ইশ্…
ফায়াজ আপনমনে বিড়বিড় করে বললো,

-“তোমার মুখে পৃথিবীর সকল শব্দ মানায় একমাত্র ভাই ছাড়া। দিলে তো হার্টে হাতুড়ি চালিয়ে?”

পরক্ষণেই বিড়বিড় বন্ধ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,

-“জি বলুন। কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”

-“শুনেননি কি বললাম এতক্ষণ?”

ফায়াজ না শোনার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। যদিও সে শুনেছে তবুও তার ইচ্ছা জাগলো মেয়েটির সেই মিষ্টি কন্ঠ আবার শোনা।

-“আপনার কাছে কোনো এক্সট্রা খাবার থাকলে দিন প্লিজ। যেকোনো খাবার হলেই চলবে। আমি আপনাকে খাবারের বিল দিয়ে দিবো। আই এ্যাম ভেরি হাংরি নাও।”

ফায়াজের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা করতে লাগলো। শরীর যেন এক্ষুনি অবশ হয়ে পড়বে এমন অবস্থা। মেয়েটার কন্ঠটা এতো মিষ্টি কেন? ইচ্ছে করে কন্ঠটাকে ধরে টুপ করে গিলে ফেলতে। এই মিষ্টিটা খেলে পেট ব্যাথা করবে নাতো? ডায়বেটিস হবে নাতো? কথা বলার সময় গোলাপী ঠোঁটযুগল একবার উপর-নিচ করে, আরেকবার দুটো ঠোঁট একসাথে চেপে ধরে। এতো সুন্দর দৃশ্য দেখে ফায়াজের মাথা সিক্সটি ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে ঘুরান্টি দিতে লাগলো। বুকের বাঁ পাশটা ধুপধাপ শব্দে বলে উঠলো যেন ‘ফায়াজ, এই মিষ্টিটা কিন্তু একমাত্র তোরই। অন্য কেউ এই মিষ্টিটাকে নিয়ে যাওয়ার আগে তুই একে নিজের করে নে।’

-“আশ্চর্য! আপনি কিছুক্ষণ বাদে বাদে কোথায় হারিয়ে যান বলুন তো?”

-“জি..জি..না মানে, আপনি কেমন খাবার খেতে চান এখন।”

-“বললাম তো, যেকোনো খাবার হলেই চলবে। আপাতত পেটের ইঁদুরগুলোকে থামাতে চাই।”

ফায়াজ তার নিজের টিফিন বাক্সটি খুলে কেক খেতে দিলো মেয়েটিকে। টিফিন বক্সটি মেয়েটির দিকে এগিয়ে দেওয়ার সময় তার হাত থরথর করে কাঁপছিলো। বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরেও হাতের কাঁপুনি বন্ধ করতে পারছিলো না। টিফিন বক্সটি পড়ে যাবে সেই সময় মেয়েটি খপ করে ধরে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচালো। কপাল কুঁচকে বললো,

-“আপনি কি মৃগী রোগী? এমন কাঁপছেন কেন?”

ফায়াজ দ্রুত মাথা এদিক ওদিক নাড়ালো। যার মানে না। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার। মেয়েটি তার বাম হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে ফায়াজের কপালে হাত রাখলো। মুহুর্তেই যেন শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল ফায়াজের। মেয়েটার নরম হাতের গরম স্পর্শ ফায়াজের সারা শরীর কাঁপিয়ে দিলো। এখন শুধু হাত না, পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। হাত সরিয়ে মেয়েটি কপালে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুললো।

-“আপনার তো জ্বরও নেই, তাহলে এতো কাঁপছেন কেন? এনিথিং রং?”

-“ই-ইয়েস। আ-আই মিন নো, নো। এভ্রিথিং ই-ইজ ওকে। ওকে।”

ফায়াজ দ্রুত ব্যাগ থেকে পানির বোতল নিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করতে লাগলো। পানি খেতে গিয়ে শার্ট ভিজিয়ে ফেলল। পকেট থেকে টিস্যু বের করে কপাল আর গলার ঘাম মুছে ফেললো। অস্থির চোখদুটো স্থির করতে জানালার পাশ ঘেঁষে বসে বাহিরে তাকালো।

-“আপনি কিছু খাবেন না? মানে আমাকে তো সব দিয়ে দিলেন? আপনার জন্য কিছুই তো নেই?”

জানালার থেকে চোখ না সরিয়েই ফায়াজ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জবাব দিলো,

-“আপনি খেয়ে নিন আমার খিদে নেই।”

-“ওকে। বাই দ্যা ওয়ে, আমি মুন। ইপ্সিতা আকসার মুন। আপনি?”

হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো মেয়েটি তার কোমল হাত বাড়িয়ে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ফায়াজের দিকে। ‘মুন, চাঁদ, আমার চাঁদ’ বিড়বিড় করতে করতে হাত বাড়িয়ে দিলো ফায়াজ। এই নামটি, ডাগর ডাগর চোখের অধিকারিণী মেয়েটি তো তার খুব চেনা। খুউউব। বাসে তো প্রথমে চিনতে পারেনি সে। কিছুক্ষণ আগেই চিনতে পেরেছে। সেই চিনতে পারার পর থেকেই ফায়াজের মনের দরজায় অস্থির ভাবনা-চিন্তা কড়া নাড়ছিলো। মুন কি তাকে চিনতে পেরেছে?

-“আমি ফ-ফায়াজ। ফায়াজ আহসান।”

-“কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”

-“বাড়িতে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে যাচ্ছি। ছোট বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে তাই আর কি। আপনি?”

-“চাচ্চুর ননদের বাসায় যাবো। বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছি আজকে। কেউ জানেনা একমাত্র ছোট চাচ্চু ছাড়া। ছোট চাচ্চুই আমাকে বাসে উঠিয়ে দিয়েছিলো। আর বলেছে বাস থেকে নেমে ট্রেনে করে চলে যেতে চাচ্চুর ননদের বাসায়। সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আমার।”

বোয়াল মাছের মতো মুখ হা হয়ে গেল ফায়াজের। এই মেয়েকে দেখে কেউ ঠাওর করতে পারবে না এই মেয়ে বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে। তাও আবার বিয়ের পোশাক ছাড়া। মেয়েরা তো বিয়ের আসর থেকে শাড়ি গয়না পরেই বিয়ে থেকে পালায়। আর এই মেয়েটি কিনা কালো জিন্স, ছেলেদের মতো হাতা ভাঁজ করে শার্ট পরা, মাথায় ক্যাপ, পায়ে কেডস, হাতে সিলভার কালারের চমৎকার একটি ঘড়ি, পিঠে একটি বড় ব্যাগ ক্যারি করে বিয়ে থেকে পালিয়েছে। যে কেউ দেখলে বলবে মেয়েটি ভ্রমণে বেড়িয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে মুখ স্বাভাবিক করে বলে উঠলো,

-“তো মিস মুন। আমি কি জানতে পারি আপনি কেন বিয়ে থেকে পালিয়েছেন? ব্যক্তিগত হলে বলার দরকার নেই। ইটস ওকে।”

-“ততোটাও ব্যক্তিগত না। বাবাকে বলেছিলাম পড়াশোনা শেষ করবো তারপর বিয়ে কিন্তু বাবা সাফ সাফ মানা করে দিয়েছে, বিয়ে ঠিক হয়েছিলো খালাতো ভাইয়ের সাথে। এই ছেলেটাকে প্রথম থেকেই আমার পছন্দ না। শেষে না পেরে বলেছিলাম আমি একজনকে ভালোবাসি। তাকে ছাড়া কাউকেই বিয়ে করতে পারবো না। সেটা শুনে বাবা বিয়ে আজকেই ঠিক করে দিলেন। তাই ছোট চাচ্চুর সাহায্যে পালিয়ে এসেছি।”

অন্যকাউকে ভালোবাসার কথা শুনতেই ফায়াজের মুখ অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধারের মতো ছেয়ে যায়। মুন ফায়াজের দিকে তাকালো। খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি ফর্সা চেহারার ছেলেটার মুখে শোকের ছায়া, তার মধ্যে বাদামী রঙের চোখের মনি দুটি কেমন চঞ্চল। কালো টিশার্টের গলার কাছ দিয়ে ঘামে ভিজে একাকার, জিভ দিয়ে নিচের ঠোঁটটাকে বারবার ভিজিয়ে নিচ্ছে, হাত একটির সাথে অপরটি বারবার ঘষে নিচ্ছে। মুন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন
-“জানেন? যাকে আমি ভালোবাসি সে আমাকে ভালোবাসে কিনা সেটা আমি আজও সিউর নই। তার কাছ থেকে কতবার ভালোবাসা চাইলাম। বলেছিলাম পুরোটা চাই না, একটু…শুধু একটুখানি ভালোবাসা দিলেই যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু সে আমাকে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছিলো। আমি নাকি তার মনের মতো ছিলাম না। কলেজের সামনে একবার দেখেছিলাম, তারপর থেকেই তাকে প্রায় এক বছর ফলো করি। তার অজান্তে। শেষে একবার বান্ধবী দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম, না করে দিয়েছিল। কাঠফাটা রোদে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম ‌শুধুমাত্র তাকে একপলক দেখার জন্য। সে ফিরেও তাকাতো না। বহু কষ্টে ফোন নাম্বার যোগার করে কথা বলতে চেয়েছিলাম, ব্লক করেছিল। বিভিন্ন মোবাইল থেকে ফোন দিতাম সে বিরক্ত হয়ে বোধহয় সিমটাই বন্ধ করে দিয়েছে কারণ অচেনা নাম্বার থেকেও ফোন করলেও নাম্বার বন্ধ দেখাতো। ততক্ষণে আমি পাগলপ্রায়। তাকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম তার বাড়ি। সেখানে গিয়ে জানতে পারি সে বাড়ি ছেড়েছে প্রায় সপ্তাহ খানেক। মাঝে একবার আমার বান্ধবী তার খোঁজ দিয়েছিল। সে নাকি কোনো রিলেশনে গেছে। আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, সবসময় অস্থিরতা কাজ করত। সারাক্ষণ তার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতাম। টেস্টে ফেল করেছিলাম, বাবা তার জন্য মেরেও ছিল। তার অপেক্ষায় থেকে থেকে নিজেকে তৈরি করলাম। আমি জানি না কেন সে আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিল। আজ পাঁচ বছর পরও জানতে পারলাম না। হতে পারে তখন আমি সুন্দর ছিলাম না তাই…”

ম্লান হাসলো মুন। ফায়াজ এতক্ষণ ধরে মাথা নিচু করেছিল। কী বলবে সে? বলার মতো আর কিছু আছে কি? মুনকে এতবছর পর দেখে সে প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে চিনেছে। সেই ছেলেটা তো ফায়াজ-ই ছিল। একটা মেয়ে তার পেছনে কুকুরের মতো ঘুরেছিল তাও সে পাত্তা দেয়নি। মুনকে যখন দেখেছে তখন মুন মাত্র ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ত। তাকে দেখে ফায়াজের একদমই পছন্দ হয়নি। তখন মুন দেখতে কিছুটা শ্যামলা ছিল, ব্যাকডেটেড, আর একটু বেশিই স্বাস্থ্যবতী ছিল। আর মেয়েটি নাকি মধ্যবিত্ত। এমন একটা মেয়ের সাথে রিলেশনে গেলে তো কলেজে তার প্রেস্টিজের পাংচার হয়ে যাবে। কলেজের ক্রাশ বয়ের গার্লফ্রেন্ড কিনা শ্যামলা থাকবে? মোটা থাকবে? ক্ষ্যাত থাকবে? অসম্ভব! অথচ মেয়েটা কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। ফোন করে করে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদত। তার বড্ড বিরক্ত লাগছিল এসব। মেয়েটির জ্বালায় সে সিম ভেঙে ফেলেছিল, শহর ছেড়েছিল। নতুন শহরে গিয়ে নতুন কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। প্রেম চলাকালীন সময়ে তার মনে হয়েছিল কিছু একটা নেই। কিন্তু কী সেটা? মুহুর্তেই তার মনে হয়েছে ভালোবাসা নেই। সুন্দরী গার্লফ্রেন্ডকে রোজ গিফট দিতে হয়, এই ডে, সেই ডে, করে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হয়, মেকআপ, মোবাইল ইত্যাদি কিনে দিতে হয়। প্রথম প্রথম এসব তার কাছে ভালো লাগলেও পরে মনে হয়েছে এই প্রেমে শুধুমাত্র চাহিদা ছাড়া কিছুই নেই। সে নিজেও তখন একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত সেই প্রেমটাতো ভালোবাসা না। প্রেম চলল ছয় মাস। সুন্দরী মেয়েটি নিজেই ছেড়ে দিয়েছে তাকে। সে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল। একটু ভালোবাসার জন্য। মুনের কথা মনে পড়লেও তখন ইগোর কারণে ফিরে যেতে পারেনি। রাস্তায় তাকে একটিবার দেখার জন্য রোদে দাঁড়িয়ে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা, ফোনে বারবার ভালোবাসি বলা, মুনের ক্রন্দনরত ভেজা আওয়াজ সবকিছুই ফায়াজকে একটুর জন্য হলেও টানছিল। তবে পরক্ষণেই মনে হয়েছিল, মেয়েটি মোটা, ব্যাকডেটেড। তার ভালোবাসা চাই তবে এই মেয়েটির থেকে না। এভাবেই সে ভালোবাসার কাঙাল হয়েছিল সেই থেকে আজ পর্যন্ত। আর যেই মেয়েটিকে কিনা ব্যাকডেটেড, মোটা থাকায় রিজেক্ট করে দিয়েছিল সেই মেয়েটি অপরূপ রুপের অধিকারীণি আজ, আধুনিক চলাফেরা তার। যাকে দেখে চোখ ফেরানো দায়।

ট্রেন হুইসেল দিয়ে থেমে গিয়েছে। ভোরের আলো তখন ফুটবে প্রায়। এখন আর সেই ম্লান অন্ধকার নেই। হালকা শীত শীত করছে। বাহিরটা ঘন কুয়াশার চাদরে আবৃত। আর কিছুদিন পরেই তো শীত নামবে। মুন নিজের ব্যাগ গোছাচ্ছে। তার এই স্টেশনেই নামতে হবে। ফায়াজ কিছুক্ষণ ইতস্তত করতে লাগল। ততক্ষণে মুন হাঁটা ধরেছে ট্রেন থেকে নামতে। ফায়াজ দৌড়ে গেল। এখন যদি তাকে না আটকায় তাহলে তো সারাজীবনের জন্য মুনকে হারাবে সে। সে হারাতে চায় না। একটু ভালোবাসা চায় যেটা একমাত্র মুন দিতে পারবে।

-“শেষবারের মতো সুযোগ দেয়া যায় না? ফিরে আসা যায় না আমার কাছে।”

থমকে দাঁড়ালো মুন। বুকের মাঝখানটা এখনো দ্রিমদ্রিম শব্দে বাজছে। ফায়াজের দিকে ফিরলো সে। মুখটা মলিন। চোখে মুখে তাকে পাওয়ার আকুতি। চোখ দুটি এখনো চঞ্চল।
হঠাৎই কেউ একজন পেছন থেকে মুনের ব্যাগ নিজের কাছে নিয়ে নিলো। ফায়াজ আর মুন দুজনেই দেখলো একটা সুদর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়াজের সমবয়সী। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। যেন এতক্ষণ বহু অপেক্ষা করে তার কাঙ্খিত জিনিস পেয়েছে সে। চোখে মুখে ক্লান্তির ভাব থাকলেও এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খুশির কণা। মুন তাকে দেখে মিষ্টি হাসলো। এটা দেখে ফায়াজের যেন খানিকটা রাগ হলো। বিনিময়ে ছেলেটিও হাসলো, তবে ছেলেটির ঠোঁট কাঁপছিল প্রচুর। মুন ঠোঁটে হাসি বজায় রেখেই ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলল,

-“কেমন আছো আরাভ?”

ছেলেটি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুমি?”

-“আমিও। তুমি ব্যাগ নিয়ে সামনে আগাও আমি আসছি।”

আরাভ তড়িঘড়ি করে ব্যাগ নামাতে লাগল। মুন ফায়াজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

-“বড্ড দেরী করে ফেলেছেন আপনি। আপনাকে সুযোগ দেওয়ার আর কোনো সুযোগই নেই। ওই যে, ওই ছেলেটিকে দেখছেন না? আরাভ। আমার হবু বর। পালিয়ে এসে এখন ওকেই বিয়ে করবো। সকলের সম্মতি আছে তবে বাবা এখনো এই ব্যাপারে জানেন না। আরাভ আমাকে ভালোবাসে, কলেজে থাকাকালীন সময় থেকেই। তখন আমার চেহারা এসব কিছুই সুন্দর ছিলো না। কিন্তু সে ভালোবেসেছে। আরাভ আপনার মতো সৌন্দর্যের পূজারী নয়। মন থেকেই ভালোবেসেছে আমায়। যখন জানতে পারল আমি কাউকে ভালোবাসি তখন সে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কারণ তার ভালোবাসা অন্য একজনকে ভালোবাসে এটা সে সহ্য করতে পারছিল না। পরে যখন জানলো আমি কোনো কারণে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম তখন আরাভ বিদেশে না গিয়ে ফিরে এলো আমার কাছে। বন্ধুর মতো মিশে সব বোঝাতো। তবে জানেন, আমার কষ্ট হবে ভেবে আমাকে কখনো বলেনি সে ভালোবাসে। কিছুদিন আগে বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা শুনে সে বলে ফেলেছিল কথাটা। ভালোবাসার কথা শুনে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই। আমার সাথে বহুবার দেখা করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। তার দুইদিন পর আপনার সাথে করা কাজগুলো মনে পড়ে গেল। আমিও তো এমন পাগল ছিলাম। আপনার জন্য। তেমনটা আমার জন্য ছিলো আরাভ। তখন মনে হলো আমি যদি আরাভের ভালোবাসায় সাড়া না দেই তাহলে আপনার আর আমার মধ্যে পার্থক্য কি? আমার মতোই তো ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে আরাভকে। কিন্তু আমি চাই না আরাভ আমার মতো ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হোক। ভালোবাসা না পাওয়ার বেদনা আমি বুঝি। তাহলে তো আরাভও সেই বেদনায় ভুগবে। প্রত্যেকেই চায় তাকে কেউ একজন পাগলের মতো ভালোবাসুক। আমিও চাই। আরাভ সেই পাগল। যে আমাকে সবসময় ভালোবাসবে। যাই হোক মিস্টার ফায়াজ। আপনার আগামী জীবনের জন্য বেস্ট অফ লাক। আশা করি সৌন্দর্যের পূজারী না হয়ে কাউকে মন থেকে ভালোবাসবেন।”

মুন চলে যেতে লাগল। আরাভ তাকে বলল,
-“ছেলেটিকে চিনো? এমন অসহায় মুখ করে আছে কেন?”

মুন ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাল ফায়াজের দিকে।
-“ছেলেটি কাউকে চিরজীবনের জন্য হারিয়েছে।”

ফায়াজের চোখ ছলছল করে উঠল। মুন ছাড়া যে আর কেউ তাকে ভালোবাসতে পারবে না। তার যে এখন অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আজীবন হয়তো কাঙাল হয়ে বেঁচে থাকতে হবে, ভালোবাসার কাঙাল। সে দেখল পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ছেলেটির এক হাতে ব্যাগ আর অপর হাতটি মেয়েটির সাথে বারবার বারি খাচ্ছিল। ছেলেটি যেন মেয়েটির হাত একটিবারের জন্য ধরতে চাইছে। তবে পারছে না। অসম্ভব রকমের হাত কাঁপছে তার। হঠাৎই মেয়েটি ছেলেটির হাত নিজের মুঠোয় পুরে নিল। ছেলেটিও শক্ত করে ধরল। যেন কোনোদিন ছাড়বে না এই পণ নিয়েছে। তারপর ছেলেটি নিজের গায়ের চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে। যেন শীত না লাগে। একই চাদর জড়িয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে একজোড়া কপোত কপোতী।

সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে দিগ্বিদিক। ঘাসে জমে আছে শিশির। কুয়াশা চুইয়ে চুইয়ে মাটিতে পড়ছে। সেই সাথে কারো ভালোবাসা না পাওয়ার ব্যর্থতায় চোখের কার্ণিশ বেয়ে একফোটা স্বচ্ছ নোনাজল বুঝি পড়ল!

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ