Friday, June 5, 2026







শাপমোচন পর্ব-০১

🔴শাপমোচন (পর্ব:১)🔴
– ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

শারদীয়া পূজা।

বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ। এত মম্বন্তর, মহামারী ছাপিয়ে এ আনন্দের স্রোত বাংলার গ্রামে গ্রামে প্লাবন এনেছে, চিরদিনই আনে। খাদ্যে রেশন; কাগজ কনট্রোল, কর্মে ছাটাই, তবুও বাঙালি মহা পূজার আয়োজনে ব্যস্ত।

মহেন্দ্র কিন্তু কিছুই করতে পারলো না। বাড়িতে অন্ধ দাদা, অসুস্থ বৌদি আর একমাত্র ভ্রাতুষ্পুত্র খোকন, এই তিনটিমাত্র প্রাণীর জীবনে নিতান্ত তুচ্ছ একটা মাটির প্রদীপের আলোও সে জ্বালাতে পারলো না, নিরাশ হয়ে ফিরে এলো, মহেন্দ্র শুধু খোকনের জন্য একটা পাঁচ সিকের সূতীর জামা কিনে।

ওতেই আনন্দ হয়তো উথলে উঠতো বাড়িতে, কিন্তু খোকার শরীর ভালো নেই, ওদের নয়নের জ্যোতিটুকু মলিন হয়ে উঠলো। সপ্তমীর দিন একটু ভালো থাকলে খোকন, অস্টমীর দিন কাকার গলা জড়িয়ে বললো :

কলকাতা যাবে না কাকু? কলকাতা!

কেন রে মানিক?

সেই যে তুমি বলেছিলে, কলকাতায় কে তোমার কাকা আছে তার ঘরে হাতী থাকে।

‘ও হ্যাঁ যাব, কাল যাব।’ বলে কবেকার বলা বিস্মৃত কথাটা একবার মনে করল মহেন্দ্র। যেতে হবে, শেষ চেষ্টা একবার করবে সে।

নবমীর সকালেই রওনা হয়ে গেল মহেন্দ্র কলকাতায়। খোকন ভাল আছে, অতএব চিন্তার কারণ নেই। পূজার আনন্দ তো তার নেই কিছু। রাত্রে পৌঁছাল হাওড়া স্টেশনে, রাতটা কাটিয়ে দিল গঙ্গার উপর, পূলের ফুটপাতে শুয়ে বসে। পুলিশে ধরতে পারতো, কিন্তু কি জানি কেন, ওকে কেউ ধরলো না, এমনকি কেউ কোন প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না। গামছা বাধা কাগজের পুটলীটা মাথায় দিয়ে মহেন্দ্র নিরাপদে কাটিয়ে দিল, কিন্তু দশমীর সকাল, সে এখন যায় কোথায়? যেখানে যাবে লক্ষ্য করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, সেখানে যেতেও ভয় করে, কে জানে ওকে ওরা চিনবে কিনা? যদি না চেনে, যদি তাড়িয়ে দেয় অপমান করে?

না, যেতে হবে খোকন বলেছে, যাবে কাকু? খোকন তার শিশু দেবতা, খোকন তার তপ–জপ আরাধনা, যাবে মহেন্দ্র শ্যামবাজারে ওর পিতৃবন্ধু উমেশ ভট্টাচার্যের বাড়ি, ওর অনেক আশা রয়েছে সেখানে।

মহেন্দ্র উঠে পড়ে, স্নানাদি করা দরকার, বেশটা যা হয়েছে, যেন পথের হন্যে কুকুর। মহেন্দ্র কাছের ঘাটে নামলো গঙ্গাস্নান করতে। ও হরি স্নান করবে কি করে? ওর আর কাপড় নেই, গামছা আছে আর আছে একখানা লুঙ্গি, অতএব মহেন্দ্র স্নান করে লুঙ্গি পরে কাপড়খানা ওখানেই শুকিয়ে নিল। এখন কিছু খেতে হবে। আনা আষ্টেক পয়সা ওর কাছে এখনো। কিন্তু কলকাতা শহরে কি অত কম পয়সায় খাওয়া হয়? সাহস করে মহেন্দ্র কোন দোকানে ঢুকতে পারছে না, যদি বেশি পয়সা খেয়ে ফেলে? কিন্তু দূরন্ত ক্ষুধা পেয়েছে, আর বেলাও তো হয়েছে অনেকটা! মহেন্দ্র ভাবতে ভাবতে হাঁটে অনেক দূর। একটা পার্কে সার্বজনীন দুর্গোৎসব চলছে, কি বিরাট প্যান্ডেল, কী চমৎকার সাজসজ্জা, কী অপরূপ প্রতীমা, মহেন্দ্র দেখতে লাগলো। কত টাকা খরচ করে এতবড় ব্যাপার করা হয়েছে। দশ হাজার, পনের হাজার, বিশ হাজার? হয়তো আরো বেশি। কত কাঙ্গালি ভোজন হবে, চিড়ে কলা, দুই লাইন করে বসেছে সব, মহেন্দ্রকে একজন কর্তৃপক্ষগোছের লোক ঠেলে বললো, বসে যাও, বসে যাও সব—

বসে গেল মহেন্দ্র লাইনের এক জায়গায়। নিজেকে দেখলো, হ্যাঁ ভিক্ষুকের চেয়ে ভালো চেহারা ওর নয় এখন আর, যদিও ওর চেহারা সত্যি ভালো। একমুখ দাড়ি, চুল রুক্ষ, তারপর গঙ্গার মেটে জলে আলুথালু গায়ের রং খড়ি মাখা হয়ে গেছে, ধুতী অত্যন্ত ময়লা, কামিজের পিঠখানা ছেঁড়া। এ অবস্থায় কে তাকে ভদ্র বলবে? কিন্তু ভদ্রলোক নিজে ঠেলে বসিয়ে না দিলে কিছুতেই ও লাইনে বসতে পারতো না। বসে কিন্তু ভালোই হলো খাবার পয়সা বেঁচে গেল। এ বেশ খেল মহেন্দ্র, পুরো পেট খেল, কাঙালীদের সঙ্গে খেতে খেতে ও ভুলেই গেল যে ও মহেন্দ্র মুখুয্যে, ভদ্র পরিবারের সন্তান আর এখানে এসেছে রোজগারের চেষ্টায়, বরং মনে হচ্ছিল, ও এদেরই সমগোত্রীয়, এই অন্ধ, কুষ্ট ব্যাধিগ্রস্থ অশ্লীলভাষী কথক ভিখারীদের একজন। খাওয়া শেষ হলে কিন্তু মহেন্দ্রের মানসপটে জেগে উঠলো। আত্মগ্লানি, এতোটা দীনতা স্বীকার করার কোন দরকার ছিল না, একবারে ভিকারী হলেও পারতো। ওর গামছার সঙ্গে লুঙ্গিটা আর দু’খানা পুঁথি উপন্যাস নয়, ঠিক দর্শন শাস্ত্র। ওদের প্রাচীন পরিবারের কে কবে টোল খুলেছিলেন, অন্ন এবং বিদ্যাদান একসঙ্গে করতেন।

পুঁথি এখনও জমা আছে। এই দুইখান মহেন্দ্র তার মধ্যে থেকে বেঁছে এনেছে, যদি কেউ কেনে তো বিক্রি করবে। ও শুনেছে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়াম তৈরি করেছে স্যার আশুতোষের নামে। সেখানে পুঁথি দু’টো বিক্রি করার চেষ্টা করবে মহেন্দ্র, অতএব ও এখনও নিঃস্ব নয়। কিন্তু কে জানে, পুঁথি ওরা কেনে কি না।

কয়েক বছর আগের কথা, গ্রামের স্কুলে ম্যাট্রিক পাস করেছে মহেন্দ্র, দাদা তখনও রোজগার করতেন এবং কিছু জমিজমাও ছিল ওদের। তিনি মহেন্দ্রকে পাঁচক্রোশ দূরের হোতমপুর কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এলেন, মহেন্দ্র আই. এ. পড়বে। কিন্তু বিধাতা যদি বিরূপ হন তো, মানুষ কতটুকু কি করতে পারেন। অকস্মাৎ দাদার হলো বসন্ত। সেই অসুখে চোখ দুটি তার নষ্ট হয়ে গেল, এবং তারপরই হলো আরও কি কঠিন ব্যাধি চিকিৎসা করতে যা কিছু ছিল সব বেরিয়ে গেল, রইল যা তা অতি সামান্য। বই কেনা হয় না, কলেজের মাইনে দেওয়া হয় না, বোডিং–এর খরচ জোটে না। নিরুপায় হয়ে মহেন্দ একদিন সন্ধ্যাবেলা কলেজ হোষ্টেল ত্যাগ করে বাড়ি ফিরলো। খোকন তখন মাত্র এক বছরের। তারপর এই ক’বছর ধরে রোজগারের চেষ্টায় ফিরছে মহেন্দ্র, নানা কাজের সন্ধান কিন্তু বিধি প্রতিকুল। মহেন্দ্র কিছুই করে উঠতে পারল না। ওদের পিতৃদেব ক্ষেত্ৰনাথ ছিলেন পশ্চিমের এক রাজসভায় সুর শিল্পী এবং কুমারদের সঙ্গীত শিক্ষক? দেশীয় রাজা এবং রাজার স্নেহ ভাজন ছিলেন বলে রোজগার তিনি ভালোই করতেন এবং পৈতৃক বিষয় আর পূজা উৎসব ভালোই চালাতেন। তারই বন্ধু এই উমেশবাবু কলকাতায়, মহেন্দ্র যাবে বলে বেরিয়েছে, ওর। রাজ্যের বনবিভাগ থেকেই কাঠের কারবার করে উমেশবাবু নাকি একজন মস্ত ধনী, দাদা দেবেন্দ্র তাকে দেখেছেন, মহেন্দ্র কখনো দেখেনি। মহেন্দ্রর ছোট বেলাতেই পিতৃ বিয়োগ হয়, দেবেন্দ্রের বয়স তখন আঠারো তিনিই মহেন্দ্রকে মানুষ করেছেন কিন্তু বাইরে আয় না থাকায় বিষয় সম্পত্তি ক্রমে ক্রমে কমতে কমতে দেবেন্দ্রের অসুখে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেল।

দাদা দেবেন্দ্র–উমেশবাবুকে চেনেন, কিন্তু তিনি এখন অন্ধ, তাই মহেন্দ্র একদিন বলতে শুনেছে উমেশ কাকা বাবার কাছে অনেক সাহায্য পেয়েছিলেন। এখন তিনি মস্ত ধনী, তাঁর কাছে একবার গেলে হয় না। যদি কোনো চাকরির ব্যবস্থা হয়।

ধনীদের কি অত মনে থাকে মহীন। দাদা বলেছিলেন উত্তরে।

–তবু একবার দেখা উচিত।

–বেশ, যাবি! খুব আগ্রহের সঙ্গে তিনি কথাটা বলেননি।

অতঃপর মহীন বলেছিল খোকনকে, মহীন যেমন তার কাকা, তেমনি তারও এক কাকা আছেন কলকাতায়, সেখানে মহীন যাবে আর সেই উপলক্ষ করেই মহীন বেরিয়েছে। কিন্তু এখন যেন আর উৎসাহ পাচ্ছে না মহীন। বড় লোকের বাড়ি, কে জানে কি বলেন তারা। হয়তো ঢুকতেই পারবে না মহেন্দ্র। কিন্তু খোকনকে যে মানুষ করতেই হবে। না, থামলে চলবে না, মহেন্দ্র যাবেই। উঠে পড়লো। শ্যামবাজারের পথ, ট্রাম চলেছে, কিন্তু অনর্থক পয়সা খরচ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পূজার–বাজার সাজানো দোকান আর নানান পোষাকের মানুষ দেখতে দেখতে চলেছে মহেন্দ্র। পথে একটা বাচ্চা ছেলে, খোকন নাকি। চমকে উঠেছিল মহেন্দ্র। কিন্তু না খোকন এত পোষাক পাবে কোথায়। মহেন্দ্র ছেলেটাকে আর দেখলো না ভালো করে। ঠনঠনের কালীতলায় প্রণাম করল, চাকরি যেন একটা জোটে। তার খোকনের জুতো, জামা, কাপড় যেন সে আসছে বছর কিনতে পারে। মহেন্দ্র জোরে হাঁটতে লাগলো।

অনেকখানি রাস্তা, অপরাহ্ন বেলা, পথের ভিড় কিন্তু মহেন্দ্র আর কোথাও থামলো না। একেবারে বাগবাজারের মোড়ে এসে দাঁড়ালো, হ্যাঁ এইখানে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে ২৪ নম্বর কাঁঠালপুর লেনটা কোথায়। এক দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলো মহেন্দ্র। “আগে যান” বলে দোকানী নিজের কাজে মন দিল কলকাতার দপ্তর এই রকম, বলবেনা যে, জানি না মশাই। মহেন্দ্র অন্য একজনকে জিজ্ঞাসা করলো। লোকটি ভদ্র–তিনি পরিস্কার বুঝিয়ে দিলেন সোজা গিয়ে বাঁ দিকে মোড় ফিরবেন–তারপর প্রথম গলিটাই কাঁঠালপুর লেন। এই মোড়ের প্রকান্ড বাড়িটাই বোধ হয় চব্বিশ নম্বর। মহেন্দ্র নমস্কার করে চলতে লাগলো।

চেহারাটা যা হয়েছে, চেনা যায় না, কিন্তু কিছুই করবার নাই। না আছে কাপড় বা আয়না চিরুনী। মোটা ধুতিটা হাঁটুর উপর কুঁকড়ে উঠেছে। মহেন্দ্র টেনে নামালো। মাথার চুল যথাসাধ্য বাগিয়ে নিল একটা রাস্তার কলের জল ছিটিয়ে গামছা পুঁটলিটাও একটু চৌকস করে বেঁধে নিল। তবুও ভদ্র বললো না মহেন্দ্র। দুর চাই। চলো যা হয় হবে। মহেন্দ্র অনাসক্তবৎ চলতে লাগলো, যেন দারওয়ান গলাধাক্কা দিলেও সে অপমান বোধ করবে না, নিঃশব্দে ফিরে আসবে।

কাঁঠালপুর লেন মোড়েই মস্ত বাড়িটা চব্বিশ নম্বর। গেটে তিনজন দারওয়ান। তারপর বাগান, তার ওপারে তিনতলা বাড়ি, যেন ছবি একখানা। বাড়ির দক্ষিণ দিকে খোলা লেন–সেখানে জাল খাঁটিয়ে কয়েকজন যুবক যুবতী টেনিস খেলছে। দেখতে পাচ্ছে মহেন্দ্র।

এই বাড়িটাই তো। মহেন্দ্র নিজের মনেই প্রশ্ন করলো, হ্যাঁ নেমপ্লেট রয়েছে ইউ সি, ভট্টাচার্য টিম্বার মার্চেন্ট এন্ড কন্ট্রাক্টর। ঢুকবে না, মহেন্দ্র এক মিনিট ভাবলো। কিন্তু ফিরলে চলবে না। মহেন্দ্র সটান গেটের মধ্যে ঢুকে পড়লো। দারওয়ানরা ওকে আটকাবে না তো? না কেউ কিছু বলবো না–হয়তো বহু লোক এমন যায় আসে বলে কেউ ওকে বাধা দিল না বাগান পার হয়ে মহেন্দ্র বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ভেতরে হলঘর দেখা যাচ্ছে, সেখানে চারজন লোক, একজন ইজিচেয়ারে। ইনিই বোধ হয় উমেশবাবু। মহেন্দ্র আন্দাজ করছে বাইরে দাঁড়িয়ে। একটা চাকর ওকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে গেল। গাড়ি বারান্দায় দাঁড়ানো মোটর থেকে এজন ড্রাইভার উঁকি দিয়ে দেখলো। একটা মস্তবড় কুকুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ওর কাপড় শুকছে, এইবার হয়তো ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করবে।

কিন্তু কুকুরটা তাড়া করবার পূর্বেই ইজি চেয়ারস্থ বৃদ্ধের নজর পড়লো দরজার দিকে। মাথাটা তুলে তিনি বললেন–

–কে? কি চান?

–আজ্ঞে, আমি–বলতে বলতে সেই দামী কার্পেট পাতা মেঝেতে ধুলো মলিন পায়ই ঢুকে পড়লো মহেন্দ্র এবং ভুমিষ্ঠ হয়ে তার পদ প্রণাম করলো গিয়ে, তারপর বললো–আমি চন্ডীপুর থেকে আসছি–ক্ষেত্ৰনাথ মুখুর্যের ছেলে আমি।

অ্যাঁ। বলে বৃদ্ধ যেন চমকে চেয়ার ছেড়ে খাড়া হয়ে গেলেন, তারপর মহেন্দ্রের চিবুক ধরে বললেন এসো বাবা, এসো, মা ভাল আছেন।

মা গঙ্গালাভ করেছেন বছর দশেক হলো।

–ওহো–দাদা, দেবেন্দ্র।

–হ্যাঁ দাদা–বসন্ত হয়ে দাদা অন্ধ হয়ে গেছেন।

–অন্ধ। বলে বৃদ্ধ গভীর বেদনার্তভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মহেন্দ্রের মুখ পানে!

মহেন্দ্র আশা করেনি, এতোটা স্নেহ এই ধনীর প্রাসাদে, একটু পরে বৃদ্ধ আবার বললেন–সবই ভগবানের ইচ্ছা। বাড়িতে আর কে আছে তাহলে?

দাদা, বৌদি–আর একটা খোকন, বছর সাতেকের। বস, বস, এই চেয়ারটায় এইযে এইখানে বলে একবার নিজের ডান দিকে বড় চেয়ারখানা নির্দেশ করে দিলেন তিনি। অন্য বন্ধুগণ এতক্ষণ উদ্ৰবটাকে ঘৃণার চোখে দেখছিলেন, ভেবেছিলেন চাকর বাকর বা বড় জোর চাকুরির উমেদার হবে, কিন্তু এখন বুঝলেন এ ছোঁকরা এখন যাবে না।

কাজেই ওদের একজন গাত্রোত্থান করে বললেন আমার একটু কাজ রয়েছে স্যার আজ তবে উঠি।

–ও উঠবে। আচ্ছা। এই ছেলেটি আমার বাল্যবন্ধু ক্ষেত্রের ছেলে। অনেক বার আমি ক্ষেত্রনাথের কথা আপনাদের বলেছি, সেই ক্ষেত্ৰনাথ।

তিনজন উঠে গেলেন। শেষের লোকটার হয়তো কিছু কথা ছিল, তখনো রইলেন। বাইরে টেনিস লনে যারা খেলা করছিল, তারা অকস্মাৎ হৈ চৈ করে বারান্দায় উঠে এলো মহেন্দ্র দেখলো তাদের। দুটি মেয়ে, চারজন পুরুষ। ওরা এবার বারান্দায় বেতের চেয়াগুলোতে বসে চা খাবে, তার আয়োজন চলছে। আকাশে মেঘ ছিল, বৃষ্টি পড়ছে তাই ওরা বারান্দায় এলো।

যে ভদ্রলোকটি এতক্ষণ বসেছিলেন তিনি এবার ধীরে ধীরে বললেন লাখ খানেক টাকাতেই হয়ে যেতে পারে ওটা। আপনি নিজে বার দেখুন, প্রকাণ্ড বাগান বাড়ি প্রায়। দেড়শ বিঘে জমি তবে একটু দূরে নইলে ওর দাম তিন লাখের কম হতো না।

–আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো, আজ আপনি যান, আজ আর সময় হবে না, বলে উমেশবাবু মহেন্দ্রের দিকে চেয়ে বললেন,–হাত মুখ ধোও বাবা, চা খাবে। ওরে কে আছিস, এদিকে আয়।

একটা চাকর এসে দাঁড়ালো। এই চাকরটাই কিছুক্ষণ আগে মহেন্দ্রকে দরজায় দেখে গিয়েছিল? উমেশবাবু বললেন–একে পাশের বাথরুমটা দেখিয়ে দে আর তোয়ালে সাবান এনে দে।

চাকরটা এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মহেন্দ্রের দিকে চেয়ে চলে গেল। সে চাহনি এমনি অবজ্ঞাসূচক যে মহেন্দ্রের মনে হলো এখনি উঠে যাবে এখান থেকে। কিন্তু বাড়ির মালিকের সেই কোমল দৃষ্টি ওর সর্বাঙ্গে আপতিত রয়েছে। মহেন্দ্র স্থির হলো। ঠিক সেই সময় ঢুকল এক যুবক।

–এই যে অতীন, বৃদ্ধ বললেন–এই আমার বন্ধু ক্ষেত্রের ছোট ছেলে। এই মাত্র এলো দেশ থেকে।

মহেন্দ্র উঠে প্রণাম করতে যাবে, কিন্তু অতীন্দ্র নামধারী যুবকটির দৃষ্টি তার দিকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহেন্দ্র বুঝতে পারলো উনি প্রণামটা পছন্দ করবেন না। সে হাত তুললো কিন্তু অতীন তার পানে এক নিমেষ দৃষ্টিপাত করেই বললো, ও আচ্ছা–বাণ কোম্পানীর কাজটা তাহলে ধরছি বাবা। এক লক্ষ বিশ হাজার টাকায় রফা হলো বলেই বগলের ফাঁইলটা বৃদ্ধের সামনে ফেলে এক মিনিট কি একটা কাগজ দেখলো, তারপর সটান গিয়ে ঢুকলো হল ঘরের পাশের একটি ঘরে যার খোলা দরজার ফাঁকে মহেন্দ্র দেখতে পাচ্ছিল এক বব করা মেমসাহেব খটখট টাইপ করে চলেছে। ওটা হয়তো অফিস ঘর। মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো। এই নিদারুণ ধনলোভী মানুষগুলোর কাছে সে কেন এসেছে, কি সে এখানে পাবে। আপনার দীন বেশ তাকে ক্রমাগত কুণ্ঠিত করতে করতে প্রায় চেয়ারের সাথে মিলিয়ে এনছে কিন্তু উমেশবাবুর স্নেহদৃষ্টি তেমনি উজ্জ্বল তার সর্বাঙ্গ যেন প্লাবিত করে বয়ে যাচ্ছে।

–যতীন, বৃদ্ধ ডাকলেন জোরে। বারান্দায় চা পানরত একজন সুন্দর বলিষ্ঠকায় যুবক উঠে আসতে বললো–

ডাকছেন বাবা।

হ্যাঁ শোন, এই আমার বন্ধুর ছেলে চন্ডীপুর থেকে এসেছে, এইমাত্র এল। ও হ্যাঁ, যতীন তাকিয়ে দেখলো মহেন্দ্রকে একবার, তারপর আস্তে বললো, বেশ তো, বসুক। কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণ এসেছেন বাবা, আমি তাকে চা টা খাইয়ে নিই। তারপর ওর সঙ্গে আলাপ করবো। নাম কি তোমার? শেষের প্রশ্নটা মহেন্দ্রকে।

–মহেন্দ্র অতি ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল মহেন্দ্র।

আচ্ছা বস বলেই যতীন চলে গেল ব্যস্ত ভাবে।

তোয়ালে আর সাবান আনতে গেছে যে চাকরটা সে এখনও ফিরলো না, হয়তো ভুলেই গেছে মহেন্দ্রের কথা। বড় লোকের বাড়ির চাকর, কে আর মহেন্দ্রের মত অতিথিকে পছন্দ করে।

ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজলো ঢং করে। ঠিক সেই সময় সুন্দর টেডি পরিহিত জনৈক যুবক আর তার সঙ্গে দুটি মেয়ে এসে ঢুকলো বারান্দা থেকে ঘরে। যুবক বললো–

শরীর ভালো আছে তো জ্যাঠামশায়? তখন লোক ছিল তাই দেখা করতে পারি নি।

–হ্যাঁ ভালো আছি। রাজবাহাদুর দার্জিলিং থেকে ফিরছেন নাকি?

–না–বাবা নভেম্বরে ফিরবেন আমি তাড়াতাড়ি চলে এলাম।

–বেশ, চা–টা খেলে বাবা? খেলা হলো তোমাদের?

–আজ্ঞে হ্যাঁ এবার যাব। বলে কুমার একচোখে মহেন্দ্রকে দেখলো।

বৃদ্ধ বললেন, ও আমার বন্ধুর ছেলে কাজকর্মের সন্ধানে এসেছে!

ও, তাই নাকি? পড়াশুনা করেছে কিছু? কুমার প্রশ্ন করলো, যেন কাজ সে দিতে পারে এক্ষুনি। বৃদ্ধ তাকালেন মহেন্দ্রের পানে। মহেন্দ্র দুর্বল কণ্ঠে ধীরে ধীরে বললো–

পড়াশুনা বিশেষ কিছু করতে পারিনি, ম্যাট্রিক পাশ করার পরই দাদার অসুখ তারপর দুঃখে দৈন্যে এই কটা বছর কাটছে।

ম্যাট্রিক! বলে কুমার যেন আতকে উঠলো, ওতে কি চাকুরী জুটবে?

আচ্ছা দেখা যাবে, বলে তিনি যেমন কিছুটা বিদ্রূপ মাখা মৃদু হেসে চলে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় বৃদ্ধের পিছনের ঘরটায় মৃদু গুঞ্জন ধ্বনিত হয়ে উঠল মধুর কণ্ঠে।

কে যেন সন্ধ্যাদ্বীপ জ্বালছে।

এ ঘরের সবকটি প্রাণী নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে, কুমার বাহাদুরও দাঁড়িয়ে গেল, বৃদ্ধের যেন যৌবন ফিরে এসেছে অকস্মাৎ সোজা হয়ে ডাকলেন–মাধু মা। যাই বাবা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল এক অষ্টাদশী তরুণী, ডান হাতে ধুপদানী, বাঁ হাতে প্রদীপ। গৈরিক বর্ণের তনুদেহ দিয়ে জ্যোতিরেখা যেন উদ্ভাসিত হচ্ছে। দীর্ঘায়িত চোখে অবর্ণনীয় এক কোমলাভ। বৃদ্ধ বললেন, তোর বাবাকে টাইফয়েডের সময় বাঁচিয়ে ছিল যে ক্ষেত্র, তারই ছেলে। দীপ হাতে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটি, আধ মিনিট দেখলো মহেন্দ্রকে, তারপর বলল পায়ে জুতো নেই কেন?

কিনবার পয়সা নেই। মহেন্দ্র মাথা নীচু করে জবাব দিল।

–জামাকাপড় অত নোংরা।

–ওই একই কারণে।

–তা অত হেটমুণ্ড হবার কি হয়েছে। দুনিয়ার সবাই বড়লোক হয় না। উঠুন আসুন আমার সঙ্গে বলে ধুপদানী আর দীপ নিয়ে সে এগুলো।

–যাও বাবা। বললেন বৃদ্ধ, তারপর মেয়েকে বললেন ও পাড়াগাঁয়ের ছেলে মা, দেখিস কেউ যেন কিছু না বলে।

-–তোমার কিছু ভাবনা নাই বাবা–আমি এক্ষুণি ওকে ঘষে মেজে হীরের মতো ধারালো করে দেব, বলে সঞ্চায়িনী লতার মত সে এগিয়ে যাচ্ছে, মহেন্দ্রও উঠলো, পিছনে চললো। মেয়েটিও কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেছে। সে গামছার পুটলীটা পড়ে রইল ওখানেই। ভুলে গেছে নিয়ে যেতে। বৃদ্ধ সেটা সযত্নে তুলে নিজের চেয়ারের মাথায় রাখলেন, বললেন ওরে রামু, এইটা দিয়ে আয় তো–

কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণের চোখ দুটো অকস্মাৎ জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য পরক্ষণেই শান্ত সহাস্য কন্ঠে বললেন–

একেবারে হীরকের মতো ধারালো হয়ে যাবে ওই পাড়াগাঁয়ের ভুত।

ওর কথা ওই রকম বললো। ওখানে দাঁড়ানো একটি মেয়ে সম্ভবত কুমারের বোন। বৃদ্ধের মেঝ ছেলে যতীন এতক্ষণে বললো, বড়দার অফিসেই একটা কাজে ওকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে বাবা, আপনি ভাববেন না।

আমারই তো একটা লোকের দরকার। কুমার বললো, অবিশ্যি কাজটা তেমন ভাল কিছু নয় বাজার সরকার।

বৃদ্ধ মুখ তুলে চাইলেন, বললেন, এসেছে দু’দিন থাক, পরে দেখা যাবে। অন্য কেউ আর কিছু বলবার পূর্বেই বৃদ্ধ বেরিয়ে গেলেন বাগানের দিকে।

মাধুরীর পেছনে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলো মহেন্দ্র। সাদা মার্বেলের মেঝে ওর খালি পা পিছলে যাচ্ছে। চকচক করছে দেয়াল, তাতে উজ্জ্বল ইলেকট্টিক আলো গলে চোখ ধাধিয়ে দেয়–মহেন্দ্রের আয়ত চোখ জলভরা হয়ে গেল ঘরের আত্যুজ্জ্বল আলোধার দিকে তাকিয়ে। কামরা সাজানো, গোছানো যেন ইন্দ্রভবন’ কত আসন, কুশন আসবাব, চেনে না, মহেন্দ্র।

ওইটা বাথরুম ওখানে গিয়ে সাবান দিয়ে গা ধোন তেল মাখুন,

আয়না চিরুণী সব আছে আমি আসছি বলে চলে যাচ্ছে কিন্তু মহেন্দ্র ওই কোনায় মেহগিনি কাঠের একটা চকচকে দরজা ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না কোথায় বাথরুম কেমনে কি করতে হয় সেখানে জানে না। মাধুরী মুখ দেখেই বুঝতে পারলো।

এই আসুন, দেখিয়ে দিই বলে কোণের দরজায় হ্যাঁন্ডেল ঘুরিয়ে টেনে খুললে ভিতরের কামোড ঝাজরী জল খুলবার প্লগ সব এক এক করে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল ওকে, তারপর বললো–

এই দরজাটা আপনি বন্ধ করে স্নান করুন, আমি এসে ডাকলে খুলবেন। স্নানাগারে সে দেখেনি কল্পনাতেও না আর এমন মেয়েও কি দেখেছে? কি পছন্দ সাবলীল অথচ কি সংযত। কিন্তু সংযমটা যেন একটু কম ওর, মহেন্দ্রের পল্লী কন্যা দেখা অভ্যস্ত চোখে কেমন যেন একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো। কিন্তু এটা তো পল্লী নয় শহর।

স্নান করছে আর ভাবছে মহেন্দ্র ক’দিন থাকা যাবে। বৃদ্ধ এবং এই মেয়েটি ছাড়া আর কারও ব্যবহার তো প্রসন্ন মনে হলো না। এ বাড়িতে কি মহেন্দ্র কিছু আশা করতে পারে? কিন্তু মহেন্দ্ৰ ভাগ্যবাদী, ভাগ্যকেই সে জীবন নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়ে স্নান শেষ করলো।

–হোল আপনার। বাইরে থেকে ডাক দিল মাধুরী।

হ্যাঁ সাদা তোয়ালেটা পরে মহেন্দ্র বেরিয়ে এল। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ গায়ের চামড়ায় সদ্যস্নাত গা বেয়ে জলবিন্দুর নিম্ন গতি আলোকোজ্জ্বল কক্ষের মৌনতা সব মিলিয়ে কেমন একটা মোহকারী পরিবেশ, মাধুরী এক নিমেষ দেখলো। মুখে একটু হাসি ফুটলো, তারপর হেট হয়ে এক জোড়া চটি নামিয়ে দিয়ে বললো–

চটিটা পায়ে দিন, তারপর কাপড় ছাড়ুন এই কাপড় আন্ডারওয়াড়, গেঞ্জী আর চাদর।

এত দামী কাপড়। মহেন্দ্র জরী পাড় ধুতীখানা হাতে নিতে নিতে বললো।

হ্যাঁ–এখানকার আসবাব সব দামী হয়–মাধুরীর উত্তর খুব গম্ভীর।

কিন্তু আমি আসবাব নই।

না আপনি একজিবিট। হাসলো না মেয়েটা একটুও–তেমনি গম্ভীর ওর মুখ।

কাপড় নিয়ে মহেন্দ্র আবার বাথরুমে ঢুকে আন্ডাওয়ার, ধুতী আর গেঞ্জী পরে এল, এসে দেখলো মাধুরী নাই। ও যেন কিছুটা স্বস্তিবোধ করছে মাধুরীকে না দেখে, ওকে একজিবিট বলে বিদ্রূপ করলে নাকি মেয়েটা। এ বাড়ির সবাই কি সমান অহঙ্কারী, শুধু বৃদ্ধ ছাড়া। মহেন্দ্র চুল আঁচড়াবার ফাঁকে ভাবতে লাগলো, এই বিরাট বাড়িখানা সত্যি একজিবিশন আর সে সেখানে একজিবিট, জু, বললে আরও ভালো হতো, সেখানে সে একটা জানোয়ার বনে যেত। কিন্তু এবারে সে কি করবে। দীর্ঘ দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখে অবাক হয়ে ভাবছে মহেন্দ্র। সে দেখতে তো মন্দ নয়। চেহারাটা ভালোই, একটা একজিবিট হবে ও এখানে কিন্তু বিদ্যা। সেটা যে ওর কিছু মাত্র নেই। বুদ্ধি ওর খুবই ছিল, ক্লাসে প্রথম দ্বিতীয়ই হোত বরাবর, বিধি বাম, নইলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙ্গিয়ে যাবার যোগ্যতা ওর কম ছিল না।

পড়ার কথা মনে হলো, যাঃ ফেলে এসেছে পুটলীটা নিচের ঘরেই ফেলেছে। এমন ভোলা মন মহেন্দ্রের। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে মহেন্দ্র ঘরের বাইরে বারান্দায় এল, শুনতে পেল রেডিওতে গান চলছে মালকোশ।

দাঁড়িয়ে গেল মহেন্দ্র ওখানেই। চমৎকার আলাপ করছেন গায়ক। বহুদিন শোনে নাই, বাজনা শেখার সখ আর মিটল না মহেন্দ্রের অথচ ওদের বাড়িতে গানের বিশেষ চর্চা ছিল। আজও তার সাক্ষীস্বরূপ মৃদংগ, সেতার তানপুরা ভাঙ্গা অবস্থায় একটা ঘরে পড়ে আছে।

খাঁটি রাগ–রাগিনী আজকাল প্রায় শোনা যায় না–ইনি গাইছেন কে ইনি নমস্যা শিল্পী। মহেন্দ্র দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলো, যন্ত্রটা কোথায় আছে জানা যাচ্ছে না শুধু সুর ভেসে আসছে, আঃ চমৎকার।

–কি চমৎকার। ঐ আলাপটা?

–হ্যাঁ। মহেন্দ্র জবাব দিল।

–একদম বাজে। আসুন এ দিকে।

–কেন। মহেন্দ্র যেতে যেতে বললো। বাজে কেন? মালকোশ রাগ–

–থাক। ও শুনলে আমার মাথা ধরে–ওটা খাঁটি নয়, নকল রেকর্ড গলা রেকর্ড, তার থেকে রেডিওতে, সেখান থেকে আপনার কানে। তিন নকলে আসল আর থাকে কোথায় মশাই। এই যে এই দিকে মার কাছে চলুন।

–আমার বেশ ভাল লাগলো আলাপটা মহেন্দ্র অতি আস্তে বললো।

আপনার পছন্দটা অত্যন্ত দীন বলতে বলতে ফিরে দাঁড়ালো মাধুরী। বললো, দেখুন, আপনি নিজে দরিদ্র হতে পারেন, আপনার পছন্দকে দরিদ্র করবেন না, চৌরাস্তার মোড়ের গান ওটা, রেকর্ড আর রেডিওর আমি ভালো ওস্তাদ আনিয়ে আপনাকে মালকোশ শুনিয়ে দেব আসুন।

মহেন্দ্র যেন এতটুকু হয়ে গেল, কোথায় নিয়ে যাবে, কি আবার বলবে। কে জানে। ভাল জামা–কাপড় পরায় মহেন্দ্রের কুণ্ঠা কিছুটা কমেছে এখন তবু বিদ্যার স্বল্পতা তাকে যেন আড়ষ্ট করেছিল। তারপর এই তীক্ষ্ণাধী তরুণী যার প্রতি কথায় বিদ্যুতের কণা, মহেন্দ্র। নিরুপায়ের মত চলল। খানিকটা সিঁড়ি নেমে একটা বড় ঘরে তার লাগাও একটা ছোট কুঠরী। আগাগোড়া মার্বেল বাধানো–দেওয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি, মেঝেতে সুন্দর আসনের উপর একজন স্থলাঙ্গী বৃদ্ধা তার পাশেই একজন অবগুণ্ঠীতা বধু। বধুটি অত্যন্ত সুন্দরী বয়স ত্রিশের কম। বোধ হয় বড় বৌ। মাধুরীর পিছনে মহেন্দ্র এল।

–মাঃ এই মহীনদা বলে পরিচয়টা সংক্ষেপে সারলো মাধুরী, আর ঐ বড়বৌদি,

-–এসো বাবা, বলে হাত বাড়ালেন বৃদ্ধা। মহেন্দ্র ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রমাণ করলো তাঁকে তারপর বড়বৌদি ঘোমটা কমিয়ে দিয়ে বললো। খুব ছেলেমানুষ। আমি ভেবেছিলাম কতই বা না বড় হবে।

–ইনি বড়দা নন মাধুরী বললো বড়দা বাড়িতে আছেন তিনি দাদার থেকে বড় বুঝলে বৌদি? বড়দার নাম দেবেন্দ্রনাথ মা তুমি তো জানো।

–হ্যাঁ মা জানি। এসো মহীন বলে বৃদ্ধা তাকে কাছেই বসালেন, তারপর বধুকে আদেশ করলেন জল খাবার আনতে।

মহীন এই ছোট সুন্দর ঘরখানি আর তার দেওয়ালের ফটো দেখবে কিংবা সম্মুখের মাতৃস্বরূপিণী ঐ মহিলাকে দেখবে বুঝতে পারছে না।

–এতদুঃখ পেলে বাবা, মহীন, আমাদের একটা খবরত দিতে হয়। –ভুল হয়েছিল কাকিমা, কষ্টভোগ মহেন্দ্র বললো।

–না মা, গরীবের অভিজত্যেবোধ–মাধুরী বললো ব্যঙ্গ করে যেন। বড় বৌ খাবার নিয়ে এল।

বসে খাওয়ালেন মহেন্দ্রকে বৃদ্ধা ছেলের মত যত্ন করে। ওর মধ্যেই সংসারের খবর জেনে নিলেন। মাধুরী কোথায় গেছে কে জানে। মহেন্দ্র অনেক স্বস্তিবোধ করছিল ওর অনুপস্থিতিতে, যেন জলন্ত অগ্নিকুণ্ডটা কাছে নাই। তার স্নিগ্ধ উত্তাপটুকু রয়েছে।

তোমার বাবাকে আমি দেখেছি মহীন, তুমি তেমন হয়েছ। চেহারায় এত মিল।

বাবাকে আমার ভালো মনে পড়ে না–মহেন্দ্র বললো।

হ্যাঁ তুমি তখন খুবই ছোঠ। তিনি যে উপকার আমাদের করেছেন বাবা। মুঙ্গেরে ওর টাইফয়েড হলো, তোমার বাবা দিন রাত্রি জেগে ওকে বাঁচালেন। সেই সময় তাকে দেখেছিলাম রুগী যায় যায় হলো, তোমার বাবা বললেন, কেঁদো না বৌমা–যমের সাধ্য নাই যে তোমার সিঁথির সিঁদুর মুছবে। আমার পরমায়ু দিয়ে আমি ওকে বাঁচাব–ঝরঝর করে জল গড়ালো বৃদ্ধার চোখে।

তাই তো তোমার কূল উজ্জ্বল করা সন্তানেরা পায়ে জুতো নাই, আর কাপড় ময়লা দেখে নাক সিটকে পালাল–আর ঐ কুমার না কুমাণ্ডা। মাধুরী অকস্মাৎ অভিভুত হয়ে বললো কথাগুলো! কণ্ঠের দৃঢ়ম্বর ভাষার ঝলকে যে অগ্নিবৃষ্টি ঝরছে বড়দার অন্তত এটা উচিত হয়নি মা। কি বলবি? আমি বলবো বড়দাকে।

বলবো যে, এই অকৃতজ্ঞতা উমেশ ভট্টাচার্জির বড় ছেলের উচিত হয়নি আর মেজদা ঐ কুমারটাকে এনে খারাপ অবস্থা করেছিল, ভাগ্যিস আমি সে সময় গিয়ে পড়েছিলাম। যাকগে মেজদাকে কিছু বলবো না, বড়লোকের জামাই, বিলেতে যাবে, তার কথা বাদ দাও। দেখি ছোট দা এসে কি বলে।

নারে, কেউ কিছু বলবে না ওরা ঠিকমত বুঝতে পারে নি, মহীন কত আপনার। ওর আবার বুঝবার কি আছে মা। ক্ষেত্র জ্যাঠার ছেলে এই–ই যথেষ্ট পরিচয় ওর। আবার কি বুঝবে হাতী ঘোড়া। এতকাল খবর নাও নি তার জন্যে অনুতাপ কর।

কেউ কিছু বললো না। একটু পরে মাধুরীই বলল বড় বৌদি–দক্ষিণ দিকের কোণের ঘরটায় মহীনদার থাকবার ব্যবস্থা করলেন বড়বৌদি, তুমি একবার দেখিয়ে দিয়ে। সব ঠিক আছে কিনা, আমি ওকে নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যাচ্ছি। মহীনদা গাড়ি তৈরি?

কোথায় যেতে হবে? মহীন ভয়ে ভয়ে তাকালো।

অত খবরে কাজ কি। যা বলছি চটপট এগোন। মহীন উঠে, চললো ওর পিছনে নামতে নামতে বললো–আমার গামছার পুটলীটা–

যা, আছে তো একখানা ছেঁড়া লুঙ্গি আর খানকতক হিজিবিজি কেতাব কি ওগুলো?

পঁথি সেকেলের হাতে লেখা পুঁথি।

কি হবে ও দিয়ে। পড়াই তো যায় না।

পন্ডিতরা পড়বেন। বিক্রি করার জন্যে এনেছি।

আচ্ছা আমিই কিনে নিবো, দুটোর দাম চার টাকা হয়ে রইলো।

আপনি ও দিয়ে কি করবেন? মহেন্দ্র অকস্মাৎ নির্বোধের মত প্রশ্ন করল।

আমি এই বাড়ির সবার থেকে ছোট, আমাকে আপনি বললে পর হয়ে যাবে, তুমি বলতে হয় বুঝলেন?

তাহলে আমাকেও আপনি বললে তো পর হয়ে যেতে পারি। মহেন্দ্র সাহস করে বলে ফেলল, এবার কিন্তু জবাব এল।

হ্যাঁ আপনি তো পরই, দায়ে পড়ে আত্মীয়তা করতে এসেছেন, ঠেলায় পড়ে অভাবে পড়ে, পর না হলে এমন কেউ করে নাকি?

মহেন্দ্র আর জবাব খুঁজে পাচ্ছে না, অসম্মান বোধ হচ্ছে ওর। অকস্মাৎ হাসির যেন ঝরণা বইছে। সুমিষ্ট হাসিটা থামাতেই চায় না। এক মিনিট পরে বললো মাধুরী–আমি এই বাড়ির কাউকে আপনি বলি না, সবাইকে তুমি বলি সবাই আমার আপনার। তোমাকে এই অপমানজনক কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমায় ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম যে, এখানে। তুমি অত্যন্ত আপনার। সবাই তোমাকে তুমি বলবে। এ বাড়ির মালিক তোমার বাবার কাছে। দেনা হয়ে আছেন। নিজেকে এত কুণ্ঠিত ভাববার কারণ নেই, এসো তোমাকে কলকাতায় প্রতিমা বিসর্জন দেখাবো বলে গাড়ির দরজা নিজের হাতে খুলে দিল মাধুরী। মহেন্দ্র জীবনে চড়েচি এত বড় মোটরে।

বুইক গাড়ি নিঃশব্দ সঙ্করণশীল। কখন যে মাধুরী আর মহেন্দ্রকে নিয়ে বাগবাজারে পাঁচ রাস্তার মোড়ে এসে পড়লো। বোঝাই গেল না, দাঁড়ালো গাড়ি। রাজপথ আলোকাকীর্ণ শোভাযাত্রা করে প্রতিমা বিসর্জন করতে চলেছে কলকাতার বারো মারা পুজকেরদল। কী চমৎকার প্রতিমা, কী তার সাজ–সজ্জা। কী অপরূপ ছন্দায়িত যেন দেখার বস্তু সত্যিই। মহেন্দ্র মুগ্ধ বিস্ময়ে এই মহোৎসব দেখছিল অকস্মাৎ মাধুরী বললো—

বিশ্বের মা শ্বশুর বাড়ি চলেছে তুমি আজ এলে, মহীনদা।

হ্যাঁ কেন? মহীন চমকে প্রশ্ন করলো।

আজ দিনটা ভালো কিনা, তাই বলছি। বিজয়াদশমী। হাসলো মাধুরী। মহেন্দ্র কিছু বললো না, মহেন্দ্রের গ্রাম্য মস্তিস্কে মাধুরীর সুক্ষ ব্যঞ্জন কোন রস সৃষ্টি করতে সমর্থ হল না।

ওর তখন খোকনের কথা মনে পড়েছে তাকে এই উৎসব সমারোহ করে দেখাতে পারবে। মহেন্দ্র কবে? এমনি বুইক গাড়িতে বসিয়ে না হোক পায়ে হেঁটে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ও কি সে তার শিশু দেবতাকে এই উৎসব দেখাতে পারবে না? অবশ্য দেখাবে।

কি ভাবছো, মহীনদা?

খোকনটাকে মনে পড়ে গেল—বাড়িতে থাকলে কাঁধে চড়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যেত। কে জানে কে এবার তাকে নিয়ে যাবে?

যেই হোক নিয়ে যাবে তার জন্য ভাবনা কি? আসছে বছর খোকনকে এখানে এনে আমিই নিয়ে যাব কোলে চড়িয়ে। খোকন দেখতে কেমন?

আমাদের বংশের চেহারা সব প্রায় এক রকম রং ঢং আকৃতি।

ও বুদ্ধিটাও যেন তোমার মত না হয় বলে মৃদু হাসলো মাধুরী।

না, না ওর বুদ্ধি সত্যি খুব ভালো। যদি পড়াতে পারি—

দিগগজ হয়ে উঠবে, এই তো, বেশ, পড়ানো যাবে। তার জন্যে আজ থেকে ভাবনা কেন?

আমি অভাবের জন্য পড়তে পারলাম না, ওকে পড়াতে হবেই। আমাদের বংশে ছাড়া মুখ কেউ নেই, দাদাও কাব্য ব্যাকরণতীর্থ চোখের অসুখ হলে–

থাক্ থাক্ ওসব আমার জানা হয়ে গেছে মাধুরী বাধা দিল–তোমার বিদ্যাদিগগজ হবে হবেই। আপাতত চল বাড়ুজ্যেদের প্রতিমা দেখবে খুব প্রাচীন চণ্ডীমন্ডপ ভাঙা অবস্থা, তবু দেখতে কত সুন্দর এসো। মাধুরী দরজা খুলে নামলো, মহীনও নামলো দুজনে ঠাকুর বাড়িতে ঢুকল গিয়ে।

নবমীর দিন রওয়ানা হয়েছে মহেন্দ্র বাড়ি থেকে, খোকনই তাকে পাঠিয়েছে বলা চলে, কিন্তু কাকার যাওয়ার পর থেকে ছেলেটা আর কারও সঙ্গে কথা কয়নি রাতটা ঘুমিয়েছিল, বিজয়াদশমীর সকালেই শিউলী ফুল কুড়িয়ে রেখে খিড়কীর পুকুরটা একবার ঘুরে এলো–দু পয়সার বেলুনটা ফুঁ দিয়ে যতদুর সম্ভব ফুলিয়ে ফাটিয়ে দিল, অপরাজিতা ফুলগুলো তুলে দু’হাতে চটকে তাল পাকালো, তারপর আর কীকরা যায়?

অন্ধ বাবার কাছে বড় একটা যায় না সে না ডাকলে প্রায় যায় না! আবার পুকুরঘাটে এসে দেখতে লাগলো। পোনামাছের বাচ্চাগুলো অল্পজলে খেলা করছে এখনি ও দু’চারটে ধরতে পারে কিন্তু ধরে কি হবে? কাকু বাড়িতে নেই, ভাজা মাছের কাটা বেছে কে ওকে খাওয়াবে? থাক্ গে। একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলো ঘাটের জলে মাছগুলো ত্বরিতে সরে গেল, ঠিক সেই সময় ডাকে–খোকন। বাবা নয়, মা ডাকছে। উঠে এলো খোকন, মা ওর পানে চেয়ে বললো—-

আয় জামাটা পরিয়ে দিই? পূজা দেখতে যাবি না?

না বলে খোকন সরে পড়তে চায়।

কাকু তো চার পাঁচদিন পরেই আসছে অত মন খারাপ করছিস কেন? তুই তো পাঠালি। যা ঠাকুর দেখে আয়।

না বলে উঠোনের এক কোণে শিউলী গাছটার কাছে দাঁড়ালো গিয়ে। ফুলগুলো সকালেই কুড়িয়ে রেখেছে, তার হলদে বোটাগুলি ছিঁড়তে লাগলো শুকিয়ে রাখবে। সরস্বতী পূজোর সময় বাসন্তিরঙ্গের কাপড় পড়বে। মা জানে খোকনের মনের অবস্থা, আর কিছু বললো না। একটু পরে ডাক দিল আয়, মুড়ি আর নারিকেল কোরা খাবি? না বলে খোকন নিজের কাজ করতে লাগলো। অন্ধ দেবেন্দ্র ও ঘর থেকে বললো ওকে কেন মিথ্যা ডাকাডাকি করছ, যা খুশি করে কাটাক। মহীন না ফেরা পর্যন্ত অমনি তো করবে। ওকে বল যে; কাকু লক্ষ্মী পূজার দিন ফিরবে।

ও জানে। খোকনের মা তাকে আর কিছুই বললো না? অভাবের সংসার। আজ বিজয়াদশমী বাড়িতে বহু ব্যক্তি প্রণাম করতে আসবে। তাদের মিষ্টি মুখ করাতে হয়। অন্য মিষ্টি কিছু জোগাড় করা যাবে না, গুড় আর নারিকেল দিয়ে নাড় তৈরি করছে। আর যৎসামান্য মিঠাই কিনে আনা যাবে। আজকের দিনে বাড়িতে তো খালি মুখে কাউকে ফেরানো যাবে না, নিজে না খেয়েও অতিথির জন্য আয়োজন করে রাখতে হয়, খৈ কিছু ভাজা আছে, তাই দিয়ে মুড়কি তৈরি করবে। অন্য বছর খোকনের কত উৎসাহ থাকে এসব ব্যাপারে। উনুনের কাছ ছাড়া হয় না বকুনী খায় তবু। এবার কিন্তু কাছ দিয়ে ও এল না। আচ্ছা কাকাভক্ত ছেলে যাহোক? মা নিজেই একটু হাসলো?

বাইরের ঘরটায় দেবেন্দ্র বসে থাকেন। চোখ নাই, চোখ নাই তাই পড়াশুনা বন্ধ কিন্তু বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি কাব্য ব্যাকরণ স্মৃতি কণ্ঠ স্বর তাই বহু লোক আসেন তার কাছে বিধান নিতে, ভগবত্ব আলোচনা করতে, সকথা শুনতে। বংশের একটা ছেলে পণ্ডিত হোক, এই ইচ্ছায় ওর বাবা ক্ষেত্ৰনাথ ওকে কাশীতে পড়িয়েছিলেন সংস্কৃত। অভাব ছিল না তাই সখ

হয়েছিল। অন্ধ না হলে অর্থ ভালোই উপার্জন করতে পারতেন দেবেন্দ্র।

ইংরেজীও ভালো জানেন কিন্তু চোখ আর নাই, বিশ্ব তার কাছে অন্ধকার। এখন সম্বল ঈশ্বরের অনুধ্যান তাহার তপস্যা। ইচ্ছে আছে ঈশ্বরীর কথা কিছু লিখবেন। কিন্তু নিজে লিখতে অক্ষম তাই হয়ে ওঠে না? ভগবান শ্রী কৃষ্ণের মতামত শোনাবার একটা লোকও নাই, যারা আসেন বাড়িতে, তাদের কাউকেও ধরে কখনো পড়িয়ে শোনেন।

নিত্যকর্ম শেষ করে উনি বসেছিলেন তক্তপোষে, কেউ আজ আসেনি। সকলেরই তো বিজয়াদশৰ্মী, প্রতি বাড়িতে উৎসব। বড় ইচ্ছে করতে লাগলো। জগ্যমাতার সপ্তশতী স্তোত কিছু শোনেন কিন্তু কে ওকে চণ্ডীমণ্ডপে নিয়ে যাবে অনেকটা দূরে বাবুদের চণ্ডীমণ্ডপ সেখানেই যেতে হবে। বর্ষার গ্রাম্য পথ পঙ্কিল এবং পিচ্ছিল হয়। লাঠি ধরে তিনি একা যেতে পারবেন না কিন্তু আজ একটু চণ্ডীপাঠ শুনতে হয়। বিশেষ করে মহেন্দ্রের কল্যাণ কামনা করবার জন্যে চণ্ডীমণ্ডপে যেতে হবে ওকে। ডাকলেন–

খোকন?

উঁ যাই–

খোকন নিতান্ত নিরুপায় ভাবে খেলা ছেড়ে এসে দাঁড়ালো, বললো—

কি?

জামাটা পরে আয় তো বাবা, আমাকে একবার ঠাকুর দেখিয়ে আনবি।

আচ্ছা বলে খোকন চলে গেল। ঠাকুর দেখিয়ে আনবে, কথাটা উনি যেন বিদ্রূপ করেই বললেন অভিমান করে। অনন্ত জগতে বিধাত্রী যিনি, তাঁরই বিধানে ঐ দশভুজা রূপ দেখবার শক্তি আর নাই দেবেন্দ্রের। অন্তরে চিন্ময় মুর্তির ধ্যান ছাড়া কিছুই তিনি আর করতে পারেন না কথাটা তাই বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। খোকন জামাটা গায়ে দিয়ে এসে বললো—

কৈ লাঠিটা কোথায় বলেই কোন থেকে বাঁশের লাঠিগাছ নিয়ে বললো–এসো বাবা।

লাঠি অন্যপ্রান্ত ধরে দেবেন্দ্র উঠলেন? খোকনের অভ্যাস আছে ওকে এভাবে নিয়ে যাওয়া–অতি সাবধানে নিয়ে যায় ঈশ্বরের কৃপার দান খোকন।

বাবুদের চণ্ডীমণ্ডপের বহু ভাগীদার, এই উৎসব তেমন হয় না, শুধু প্রতি অংশীদার সগর্বে প্রচার করতে চায়, সেই যেন মালিক প্রজার। দশ পনের বছর আগে পূজার দিনে গ্রামস্থ সকলকে আহ্ববান করা হতো, কেউ অনাহুত গেলে প্রচুর আদর আপ্যায়ন পেতো। কিন্তু এখন কেউ গেলে মালিকেরা কৃপার দৃষ্টি তাকান যেন ওরা পূজা করেছেন বলেই নিতান্ত হতভাগা গ্রামবাসীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারলো। কাছাকাছি দুতিনখানা গ্রামে প্রতিমা পূজা নাই, তাই বিসর্জন দেখবার জন্য চারপাশের গ্রাম থেকে সন্ধ্যাবেলা বহু লোক আসে ছেলে মেয়ে পর্যন্ত। কিন্তু বাবুদের খোশখেয়াল এমনি তারা প্রতিমা বের করতে রাত বারোটা বাজান, নিরাশ হয়ে দূরের লোক ফিরে যায়। গ্রামের ছোট ছেলে মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়ে। বাবুরা বিজয় গর্বে বিসর্জন করে এসে খাটে শুয়ে ভাবতে থাকেন ভাগ্যি তাদের বাড়ি পূজা হয়েছিল। তাই এত লোক বিসর্জন দেখলো।

গ্রামে যার দু’পয়সা আছে সে গেলে বাবুরা খাতির করেন ভালোই, কিন্তু দেবেন্দ্রর মত নিঃস্ব ব্যক্তির সেখানে কোন সম্মান নাই, কৃপার দৃষ্টিপাতও কম হয় তার প্রতি কারণ ধন না থাকলেও বিদ্যা তার আছে এবং মাথা তিনি কোথায়ও নিচু করেন না। ছেলের সামনে দেবেন্দ্র। গিয়ে দাঁড়ালেন। চণ্ডীমণ্ডপের বহু লোক প্রায় সকলেই অংশীদারদের পরিবার কেউ কেউ একবার তাকালেন ওর মুখের পানে। কিন্তু দেবেন্দ্র ওদের কাছ থেকে সম্মানলাভের প্রত্যাশায় যান নাই। মন্ডপের দাওয়ায় না উঠেই তিনি খোকনকে বললেন মার মূর্তির সামনেই আমাকে দাঁড় করা? খোকন ঠিক তাই করলো। ভেতরে চণ্ডীপাঠ চলছে। দু’একজন বললেন এখানে আসুন মুখুৰ্য্যেমশাই, আসুন দেবুদা।

থাক ভাই এখান থেকেই শুনছি। পুরোহিত তখন পড়ছিলেন–

প্রশতানাং প্রসীদ তং দেবী বিশ্ববিত্তিহারিণি।
ত্রৈলোক্যধাসিনামীড্যে লোকাং বরদাভব।

দেবেন্দ্র ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। সুন্দর পালঙ্কে পুরু বিছানায় শুয়ে মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো স্বপ্ন রূপকথার শোনা ব্যাপারটাই সে স্বপ্নে দেখছে। হাওড়া ব্রীজের উপর রাত যাপন, ভিক্ষুক হয়ে ভোজন স্বর্গ ছাড়া কি আর। তারপর এই বিশাল পালঙ্কে শয়ন এমন আজগুবি স্বপ্ন কম লোকেই দেখে, কিন্তু এটা কি সত্যি স্বপ্ন? নিজের হাতের আঙ্গুল কামড়ে মহেন্দ্র পরীক্ষা করলে ব্যথা বোধ হয়। বেডসুইচটা পিটে আলো জ্বালালো, ঠিক জ্বলছে। উঠে কয়েক পা পায়চারী করলো, হ্যাঁ ঠিক বলা যায় তাহলে স্বপ্ন নয়, সত্যিই সে তার পিতৃবন্ধুর বাড়ীতে রয়েছে কলকাতার প্রাসাদে।

দেওয়াল ঘড়িতে সাড়ে বারো। বাইরের রাস্তায় এখনও বিসর্জনের বাদ্য কোলাহল জানালাপথে আকাশচারী ফানুশ দু’একটি দেখা যাচ্ছে। হাউই ছুটছে, পটকার আওয়াজ আর নীচে বাগান থেকে উঠে আসছে হাসনাহেনা ফুলের মদির গন্দ। অপূর্ব আবেষ্টনী অদ্ভুত পরিবেশ।

মহেন্দ্র আবার শুলো–সুইচ টিপে আলোটা নিভিয়ে দিল, চোখ বুজলো ঘুমুবে এবার। খোকনকে মনে করবার চেষ্টা করতে লাগলো। তার শিশু দেবতার আশ্রয় নিতে চাইল, কিন্তু আশ্চর্য কিছুতেই খোকনের মুখোনা মনে পড়ছে না। হোল কি তার আজ? খোকনকে মনে পড়ে না। এমন অসম্ভব ব্যাপার তার জীবনে আর কোনদিন ঘটেছে কি? না তো। কিন্তু খোকনকে এভাবে মনে করবার চেষ্টা সে করেনি কোনদিন। হয়তো খুব বেশী প্রিয়জনকে ধ্যান করা যায় না, অনেক সময় মহেন্দ্র চিন্তা করতে লাগলো গলা জড়িয়ে বলছে একটা গল্প বল না, কাকু?

শোন এক ছিল–চমকে উঠলো মহেন্দ্র। কান গল্প শোনাচ্ছে সে বালিশকে ছিঃ। খোকনের অকল্যাণ হবে যে। মহেন্দ্র বালিশটা ঠেলে সরিয়ে দিল। পাশ ফিরলো তারপর অকস্মাৎ উঠে পা তলে রাখা ব্যাগখানা তুলে মেঝেতে ফেলল। মহেন্দ্র নিজের মনেই বললো–

খোকনকে ছেড়ে এত ভালো বিছানায় শোয়া যাবে না–

একটা ছোট বালিশ টেনে নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়লো, মহেন্দ্র ঘুমিয়ে গেল নিটোল নিবিড় একটি ঘুম স্বপ্নহীন সুষুপ্তি। মহেন্দ্র যেন জীবিত ছিল না, অকস্মাৎ খিলখিল হাসির সোনার কাঠি উজ্জ্বল জলকল্লোল হাসির ঝরণা। বালিশ থেকে মাথা তুলে মহেন্দ্র দেখলো বারান্দার পাশের একটা দরজা ঈষৎ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে মাধুরী।

হাসিটা ওরই কিন্তু এতে হাসবার কি হয়েছে? মহেন্দ্র উঠে বসবার পূর্বেই মাধুরী বললো, যোগাভ্যাস চলছে সন্ন্যাসী ঠাকুর?

যোগাভ্যাস? না দাদা ওসব করেন। মহেন্দ্র বোকার মত জবাব দিল উঠতে উঠতে।

তুমিও করবে, দণ্ড কমণ্ডলু আমি কিনে দেব। বলে ভেতরে এল মাধুরী।

ঠাট্টা? বলে মহেন্দ্র এতক্ষণে যেন পিটা অনুধাবন করল।

ঠাট্টা কি? ওসব আমি করি না। যোগাভ্যাস কিছু খারাপ ব্যাপার নয়। আজ থেকে খাট পালং বিছানা তুলে কম্বল পেত দেব নাও উঠে পড়, সকাল অনেকক্ষণ হয়েছে। যোগের লক্ষণ ব্রহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ।

যোগের অনেক কিছু শিখে ফেলেছ দেখছি মহেন্দ্র এতো পরে বললো কথাটা সাহস করে। কাল থেকে এ পর্যন্ত মহেন্দ্র একতরফা শুনছে। আজ সাহস পেলে। হ্যাঁ যেটুকু শিখতে বাকী আছে, তোমার কাছে শিখে নেব। হাতমুখ ধুবে এসো দাদাদের চা হয়ে গেল।

তোমার? মহেন্দ্র যেতে যেতে প্রশ্ন করলো।

তোমার মত মেষ শাবকের ভার আমার ওপর, তখন তোমাকে খোয়াড় মুক্ত না করে আমি খাব কেমন করে? বলেই মাধুরী কম্বলখানা আর বালিশটা তুলে দিল। বাথরুমে ঢুকে মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো স্নান হয়ে গেছে মাধুরীর ভিজে চুলগুলো পিঠ জুড়ে রয়েছে। মহেন্দ্র স্নানটা সেরে নেবে নাকি? কাপড় কোথায় আছে, কে জানে? আর থাকলেও এ বাড়ীতে মানাবেনা। কাজেই মুখ ধুয়ে মহেন্দ্র বাহিরে এল নিজেকে যথাসাধ্য ন্দ্র করে নিয়েছে সে এর মধ্যেই। চুলটাও আচড়ে নিয়েছে। বেরিয়ে দেখলো একটা চাকর দাঁড়িয়ে। বললো ছোটদা ডাকছেন স্যার আসুন।

মহেন্দ্র চটি পায়ে, তার পিছনে বেরিয়ে এল? বৃদ্ধ উমেশবাবু গিন্নি আর বড়বৌ বসে আছেন চেয়ারে মাধুরীকে কোথাও দেখতে পেলেন না। বৃদ্ধ বললেন এস বাবা, কাল বেশ ঘুম হয়েছিল তো।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মহেন্দ্র বললো চেয়ারে বসতে বসতে।

কম্বলে না শুলে ওর ভাল ঘুম হয় না বাবা–বলে মাধুরী কোত্থেকে এসে দাঁড়ালো–খাটে না শুয়ে মেঝেতে কম্বল পেতে শুয়েছিল আজ ওকে একটা মৃগচর্ম কিনে দিতে হবে।

সে কিরে মা। বলে বৃদ্ধা বিস্মিত হাসিমুখে তাকালেন মহেন্দ্রের পানে? সলজ্জ মহেন্দ্র বললো–

আজ্ঞে না অত ভালো বিছানায় শোয়া তো, অভ্যাস নেই। অভ্যাস করাটাও ঠিক হবে না তাই–

কৃচ্ছ সাধন করেছিলেন বললো মাধুরী বেশ তো, ঐ অশ্বথ গাছটার তলায় মৃগচর্ম পেতে দেবো।

বসলো মাধুরীও রুটিতে মাখন লাগিয়ে গিন্নী মা প্লেটখানা এগিয়ে দিলেন। বললেন ওসব করো না। বাবা, ব্যাটাছেলে রোজগার করবে, চিরদিন কি কেউ গরীব থাকে। তোমার এই কাকাই তখন সি, পিতে যান সামান্য সম্বল নিয়ে, তখন আমাদের অবস্থাও খুব খাটো। ছিল। তোমার বাবার অবস্থা তখন আমাদের চেয়ে ভালো।

মহেন্দ্র কিছু বললো না, চুপ করে খেতে লাগলো। মাধুরী ওর চা ঠিক করে দিতে দিতে বললো ভালো করে দিনকতক খাও, শরীরটাও অল্প সারুক তারপর কম্বলে না হয় শোবে কোপীন পরবে কচুপেড়া খাবে যা খুশী করবে। মহেন্দ্র এবারেও কথা কইল না, একটু হাসলে মাত্র। উমেশবাবু বললেন কিছু টাকা আজই পাঠিয়ে দাও তোমার দাদার নামে লিখে দাও তুমি এখানেই রয়েছে ওরা যেন না ভাবে।

চাকরী বাকরি একটা কি জুটবে? অতি ক্ষীণ কন্টে বললো মহেন্দ্র।

অত ব্যস্ত কেন, বাবা? এখানে তুমি নিজের বাড়ীতেই আছ মনে করবে। চাকরির কথা এবার আমি ভাববো এতোকাল বন্ধুর ছেলেদের খবর নিইনি এ যে আমার কতবড় অপরাধ, তা আমি বুঝেছি। মাধুমা, টাকাটা তুই নিজেই মানি অর্ডার করিয়ে দিস আর জুতোজামা কাপড় সব কিনে দিবে যা।

শীত আসছে, বাবা গরম কোর্ট শার্ট দরকার।

না, ওসব না। আমার খোকনের সুতার গেঞ্জী রয়েছে।

মহেন্দ্র এমন আকস্মিক আর্তকণ্ঠে কথাটা বলে উঠলো যে উপস্থিত তিন জনেই ওরা করুণ এই আবহাওয়াটাকে শীত পড়তে দেরী রয়েছে, তার আগেই তোমার খোকনের জামা কাপড় তৈরী হয়ে যাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অবধি কতবার খোকনের কথা ভেবেছ। মহীনদা?

ও ছাড়া কিছুই আর ভাবী না, মাধুরী। অন্ধ দাদা খোকনের মতই বয়স থেকে আমায় মানুষ করেছেন তার কথাও ভাবি না। যোগী পুরুষ অদ্ভুত অসাধারণ মনঃশক্তি–অভাবকে তিনি অবহেলায় অগ্রাহ্য করেন বৌদি তার যোগ্য সহধর্মিণী কিন্তু আমি বড় দুর্বল–

তাই সবল হওয়ার জন্যে কাল কম্বল পেতে ছিলে? বড় বৌ বললো এতক্ষণে।

না বৌদি খোকনকে কখনো ভাল বিছানায় শোয়াতে পারিনি, ফুলের মত ছেলে, ঘুটিং বেরুনো শানে পড়ে থাকে–

ব্যাটাছেলের ঐ রকম ভাবেই মানুষ করতে হয় বললো মাধুরী। নইলে ঐ দেখো না আমার ছোড়দা ললিতা লবঙ্গলতা, একটা পালং এ আটখানা বালিশ দেড় হাত মোটা গদী আর সিল্কের চাদর না হলে ঘুমুতে পারে না।

ঠিক সেই সময় একজন সুন্দর যুবক প্রায় মহীনের সমবয়সী, এসে দাঁড়ালো কবি কবি চেহারা। লম্বা চুল, গায়ে দামী সিল্কের গেঞ্জী তবে স্বাস্থ্য খুব ভাল বলা চলে না। একখানা চেয়ারে বসতে বসতে বললো দে তোর মহীনদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে, আর এক কাপ চাও যদি দিস।

চা দিচ্ছি কিন্তু আলাপ করিয়ে দিবে হবে কেন, তুমি কি বিলেতী না আমেরিকান? কি এমন বয়স হয়েছে যে পরের লোকের সঙ্গে ইনট্টোডিউস না করলে কথা বলতে পারবে না? লক্ষ্ণৌ ঠুংরী হয়ে যাচ্ছো ছোড়দা।

তার মানে? লক্ষ্ণৌ ঠুংরী কিরে?

সবাই হেসে উঠলো কথাটা শুনে। মাধুরী একটু গম্ভীর গলায় বললো–

নয় তো কি। তোমার লক্ষ্ণৌ এ বিয়ে বন্ধ করতে হবে, সঙ্গে ইনট্টোডিউস করিয়ে দেব তাকে চা খাওয়াতে হবে। ওস্তাদ গান শোনবার একজন সমঝদার স্রোতা তুমি পেলে ছোড়দা, এর জন্যে।

তোমাকে ধন্যবান দেওয়া উচিত। তোমাকে কেন ধন্যাবদ দেব।

কারণ আমিই আবিস্কার করেছি? এসো ইনট্টোডিউস করিয়ে দিই–মাল–কোশ শোনাতে হবে, তোমাদের খা সাহেবকে আজ ডেকে আনবে।

ছোড়দা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ এতক্ষণ কথা বলেনি মহেন্দ্রের সঙ্গে, ইংরেজী কায়দায় পরিচয় করিয়ে দেয়নি কেউ বলে নয়। নিতান্ত একজন গ্রাম্য যুবক।

কি কথা বলবে এই ভেবে সময়ক্ষেপন করেছিল। মহেন্দ্র গানের সমঝদার শুনে সাগ্রহে বললো–

গান বাজনার সাধনা করা হয় তাহলে?

আজ্ঞে না সাধন করবার সময় কোথায়? পেটের ধান্দায় ঘুরছি সব আছে সময় সুযোগ পেলে বসি এক আধবার মহেন্দ্র অলকা ক্লাবে।

না! অতি তীক্ত কণ্ঠে বললো মাধুরী। ওখানে ও যাবে না। ওখানে তোমাদের রাজাবাদশার মজলিসে আমাদের গরীবের মানায় না ওকে। আমি নিজেই গান শুনিয়ে আনবো কোথাও, নইলে বাড়ীতেই উস্তাদ ডাকবো।

কেন? ওখানে যেতে আপত্তি কি? আমার সঙ্গে যাবে রতীন শুধালো।

আপত্তি অনেক। ওরা সবে মহীনদাকে কৃপার চক্ষে দেখবে, বলবে পাড়া গাইয়া অশিক্ষিত গরীব। ওসব হতে দেব না আমি। চল মহীনদা, বাজারে যেতে হবে বলে মাধুরী উঠে পড়ল।

ভালো গায়কের সম্মান ওখানে খুব বেশী, জানিস ওকে সবাই লুফে নেবে।

ও তোমাদের মতো ভালো গায়ক নয়, নাকী সুরে প্যানপ্যানে গানও গাইতে পারে না। মাধুরী এগিয়ে বললো এসো দেরী হয়ে যাচ্ছে।

মহেন্দ্র উঠতে উঠতে ভাবতে লাগলো_প্যানপ্যানে নাকি সুরের গান সে যে পছন্দ করে না এ খবর মাধুরী জানলো কেমন করে? আশ্চর্য তো কথাটা কিন্তু খুবই সত্যি। ওদের বংশটা ওস্তাদের বংশ, বাবা ভাল গাইতে পারতেন। সম্ভবতঃ উমেশ কাকার মুখে মাধুরী সে কথা শুনে থাকবে। এখানে এসে মহেন্দ্র তো একবার তাতানা শব্দও করেনি অবশ্য রেডিওর গানটা শুনেছিল কিন্তু এতেই কি মাধুরী তার সংগীত প্রিয়তা সম্বন্ধে এত খবর জানতে পারলো। এই পরমাশ্চার্যের কথাটা চিন্তা করতে সে যাচ্ছে। ছোড়দা রতীন বললো–

আচ্ছা বাজার করে আসুন পরে আলাপ হবে।

হু বলে মহেন্দ্র মাধুরীর সঙ্গে গিয়ে গাড়ীতে উঠলো। বললো—

একটা অনুরোধ রাখবে মাধুরী।

অনুরোধ যখন, তখন শুনে বলা যাবে রাখবো কিনা। আদেশ হলে নিশ্চয়ই রাখতাম।

বেশ, আদেশই বললো মহেন্দ্র। খুব বেশী দামী জামা কাপড় আমার জন্যে কিনো না। আমি তো সত্যি গরীব আর অশিক্ষিতও। ভদ্রভাবে চলতে যতটুকু যা দরকার, তাই আমার জন্যে কিনে দাও। বড় মানুষী করবার আমার সখ নেই লক্ষী।

ও বাড়ীটাকে আবুহোসেনী রাজত্ব বলে মনে হচ্ছে–কেমন? আচ্ছা বোঝা যাবে।

হাসলো মাধুরী নিটোল মধুর হাসি–তারপর বললো গম্ভীর স্বরে–

আমাদের বাড়ীতে তুমি শুধু একটা গায়ে পড়া আত্মীয়ও নও। বাবা এটা সকলকে ভালো। করে বুঝিয়ে দিতে চান আর আমিও চাই। এখানে যেভাবে থাকলে বাবার সম্মান বজায় থাকে, তাই তোমাকে করতে হবে। হা, কিন্তু তার জন্যে কি মানুষ দরকার?

অবশ্য দরকার, কারণ তিনি বড় মানুষ সেলফম্যান এবং ম র‍্যাদায় অভিজাত। কলকাতায় আমাদের চার পুরুষের বসতি বনেদী বংশ আর তুমি সে বাবার পরম বন্ধুর ছেলে। তোমাকে কোনো ছুটকে রাজকুমারের বাড়ীতে বাজার সরকারী করতে বাবা নিশ্চয়ই। পাঠাবেন না। তুমি কেন অত কুণ্ঠিত হোচ্ছ মহীনদা?

না কুণ্ঠ নয় মাধুরী, অনভ্যাস। নিজেকে বড় মানুষ ভাবতে আমার ভয় করে। বড় মানুষ। মানে ধনী মানুষ–

হ্যাঁ, তা বুঝেছি। বেশ অন্যদিকে বড় মানুষ হও–বিদ্যায়, জ্ঞানে মানুষত্বেও সেটাই আমি হতে চাই, বলে মহেন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললো। আমাকে অতবড় ঘরে পালঙ্কে না রেখে নীচের তলায় একটা ছোট ঘরে তুমি একখানা তক্তপোষে রাখলে আমি খুশিই হই মাধুরী।

না, আমি খুশী হব না। তার থেকে বরং একটা কাজকর্ম যোগাড় করে তুমি এ বাড়ী : থেকে চলে যাবে। যেখানে ইচ্ছে থাকবে গিয়ে, কিন্তু এখানে যতক্ষণ ততক্ষণ বড় লোকের ছেলের মতই থাকতে হবে অন্ততঃ আমাদের সাধারণ ভদ্রলোকের ছেলের মতো। দীনভাব আমি ভালবাসি না।

কিন্তু আমি দীন—

না। মাধুরী তীব্র প্রতিবাদ জানালো–নিজেকে দীন মনে করা অপরাধ। মানুষ অমৃতের পুত্র। দীন কেন হবে?

গাড়ীটা চৌরঙ্গীর একটা বড় দোকানের সামনে দাঁড়ালো, মাধুরী নামলো মহীনকে নিয়ে, দারোয়ানরা সেলাম জানাচ্ছে। উমেশবাবুর তিন ছেলে এক মেয়ে মাত্র যথাক্রমে অতীন যতীন, রতীন আর মাধুরী। মাধুরী সবার ছোট। তাই সকলের আদরের। বাবা মার কথা তো না বলাই ভালো, দাদারাও ওকে অত্যন্ত স্নেহ করে। কেহ কখনো ওকে এতোটুকু কড়া কথা বলে না। বড়দার থেকে ও অনেক চোট তাই বড়দার স্নেহটা আরো বেশী ওর উপর। বৌদিও।

পর্ব ১ শেষ 📌

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ