Friday, June 5, 2026







রূপবানের শ্যামবতী পর্ব-১৯

#রূপবানের_শ্যামবতী
#১৯তম_পর্ব
#এম_এ_নিশী

আহিয়া কোনোরকমে কান্না থামিয়ে বলতে থাকে, “ভাইয়া, ফারহাপু হাত কে টে ছে। ও সু ই সা ইড করার চেষ্টা করছিলো।”

আহরার হতভম্ব হয়ে যায় আহিয়ার কথা শুনে। সে আহিয়াকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত ছুটে গেলো ফারহার ঘরের দিকে। আহিয়াও পেছন পেছন গেলো। এদিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অরুনিকা চিন্তা করছে সে যাবে কি যাবেনা। প্রচন্ড ভয়ে হাত-পা কাঁপছে তার। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছে না কোন মেয়েটা এমন কাজ করলো? আর কেনই বা করলো?

আহরার ফারহার ঘরে এসে দেখে ফারজানা মেয়েকে ধরে হাওমাও করে কাঁদছেন। আয়াজ কা টা জায়গাটা চেপে রেখেছে। গুলবাহার ও পাশে বসে বিলাপ করছেন। আহরার দ্রুত এগিয়ে এসে ক্ষতস্থানটা পরীক্ষা করে দেখে। আয়াজ বলে,

–ভাই, ডক্টর আনবো নাকি হসপিটাল নিয়ে যাবো?

আহরার জবাব দেয়,

–রিস্ক নেয়া ঠিক হবেনা আয়াজ। বেশ ভালো রকমের রক্ত ঝরেছে, সেন্সলেস হয়ে আছে। হসপিটাল নিয়ে চল।

আফতাব সাহেবও এসে পড়েছেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বলতে থাকেন,

–ভাইজান তো অফিসিয়াল কাজে বাইরে আছেন, চাইলেও খবর দেওয়া সম্ভব নয় এখন। চল আমি যাই তোদের সাথে।

সঙ্গে সঙ্গে আহরার ব্যস্তস্বরে বলে ওঠে,

–না বাবা, বাড়িতে একজন পুরুষ মানুষ থাকা দরকার। মা অসুস্থ। তাই তুমি বাড়িতেই থাকো। আমরা সামলে নেবো চিন্তা কোরো না। আয়াজ ফারহাকে নিয়ে আয়, আমি গাড়ি বের করছি।

আহরার বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার আগে আহিয়াকে বলে অরুনিকার খেয়াল রাখতে। আয়াজ ফারহাকে পাঁজাকোলে নিয়ে বের হওয়ার সময় ফারজানা এসে পাগলামি জুড়ে দেন,

–আয়াজ, আমিও যাবো। আমাকেও নিয়ে চল বাবা।

মায়ের কান্না দেখে আয়াজ আর বারণ করে না।

–এসো মা, জলদি।

ওরা বেরিয়ে যেতেই গুলবাহার বিছানায় বসে বসে পুনরায় বিলাপ জুড়ে দেন। আফতাব সাহেব মাকে শান্তনা দিয়ে বলেন,

–চিন্তা করবেন না আম্মাজান। সব ঠিক হয়ে যাবে। আহিয়া তুই তোর মায়ের কাছে গিয়ে একটু থাক। আমি জরুরি কিছু ফোনকল সেরে আসছি। ভাইজানের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

আহিয়া চলে গেলো তার মায়ের কাছে। আফতাবও বেরিয়ে যান। গুলবাহার চোখের পানি মুছে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ান। যাওয়ার পথে আহরারের ঘরের দরজার কাছে অরুনিকাকে চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। মেয়েটা কেমন ইতিউতি করছে। গুলবাহার ক্রোধানলে জ্বলে ওঠেন। ছুটে আসেন অরুনিকার কাছে। চাপা ক্ষোভে চিৎকার করে বলে ওঠেন,

–এ্যাই..অভিশপ্ত মেয়ে, তোর জন্য আজ আমার নাতনির এই হাল। তোকে তো আমি কিছুতেই ছাড়বোনা। তুই এই বাড়িতে থাকতে পারবিনা। বেরিয়ে যা। এক্ষুনি বেরিয়ে যা।

এই বলে অরুনিকার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকেন সদর দরজার দিকে। আচমকা আক্রমনে ভড়কে গেলো অরুনিকা। বাঁধা দেওয়ার কিংবা কিছু বলার সুযোগ পেলো না সে। গুলবাহার টানতে টানতে দরজার কাছে এনে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন অরুনিকাকে। পুনরায় তেজিস্বরে বলে ওঠেন,

–চলে যা.. এই খান ভিলার ত্রিসীমানায় যেন তোকে না দেখি।

এই বলে দরজাটা লাগিয়ে দিতে গেলেই অরুনিকা আটকে দেয়। দুহাতে শক্ত করে দরজাটা দুদিকে ধরে রাখে সে। গুলবাহার বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে আছেন অরুনিকার দিকে। অরুনিকা দরজাটা আরো একটু ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। তার মুখভঙ্গিমা শান্ত। নেই কোনো ভীতির ছাপ। গুলবাহারের দিকে তাকিয়ে নম্রস্বরে জবাব দিলো,

–মাফ করবেন দাদীজান। আমার স্বামীর অনুমতি ব্যাতীত এই বাড়ি থেকে এক পা ও নড়বো না আমি।

দাঁতে দাঁত চেপে গুলবাহার তেড়ে আসেন অরুনিকাকে চড় মারতে। অরুনিকা সরে যায়। গুলবাহার তাল হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় কিন্তু পড়েন না। অরুনিকা ধরে নেয়। আরো একবার শান্তসুরে বলে ওঠে,

–আপনি গুরুজন, সম্মানীয়। তাই এর সুযোগ নিয়ে কোনো অন্যায় করার চেষ্টা করবেন না দাদীজান।

এই বলে গুলবাহারকে সোজা করে দাঁড় করায় অরুনিকা। অতঃপর স্মিত হেসে ঘুরে দাঁড়ায়। দৃঢ় পায়ে হেঁটে চলে গেলো নিজের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকেই দরজা আটকে দেয় সে।
গুলবাহার হতবাক হলেও পরক্ষণেই রাগে কাঁপতে থাকে তার সারা শরীর। মনে মনে বলেন, “মেয়েটার এতো বড় স্পর্ধা। একে তো কিছুতেই ছাড়া যাবেনা।”

ঘরে ঢুকেই অরুনিকা জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলো। ছুটে এসে জগ থেকে পানি ঢেলে ঢকঢক করে গিলে নিলো এক নিঃশ্বাসে। ঠাস করে বসে পড়ে বিছানায়। এখনো বুক কাঁপছে তার। গুলবাহারকে সে ভিষণ ভয় পায়। এ বাড়িতে ঢুকতেই তার যে রূপ সে দেখেছে তাতে একধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। কিন্তু সেই মানুষটার সামনে এমন সাহসিকতা কিভাবে দেখালো সে? জানা নেই। শুধু জানে ওই মুহুর্তে তার চোখের সামনে আহরারের মুখটা ভেসে ওঠে। আর কোথাথেকে যেন সাহসীকতার পাহাড় এসে ভর করলো তার মধ্যে। এখন ঘরে এসে তার ভয়টা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। মনে মনে দোয়া করতে থাকে, আহরার যেন জলদি ফেরে।

হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন। আহরার, আয়াজ, ফারজানা। ফারহার ট্রিটমেন্ট চলছে। কিছুসময় পর ডক্টর এসে জানায়, সবকিছু ঠিকঠাক। ব্লাড দেওয়া হয়েছে। এখন আশংকামুক্ত।
তবে জ্ঞান ফিরতে একটু সময় লাগবে।

আহরার ফোন দিয়ে বাড়িতে খবর জানানোর উদ্দেশ্যে অন্যদিকে চলে যায়। আয়াজ তার মাকে বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে সেও চলে গেলো কিছু ওষুধপত্র কিনতে।
অনেকটা সময় কেটে যায়। যেই কেবিনে ফারহাকে রাখা হয়েছে সেই জায়গাটা অনেকটা ফাঁকা। কিছুক্ষণ আগে একজন নার্স এসে দেখে গেছে। এখন আর তেমন কোনো মানুষের আনাগোনা নেই। ফারজানা একবার মেয়ের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখে নেন। তারপর নিজের জায়গায় এসে বসে পড়েন। ক্লান্ত শরীরে ঘুমে যেন চোখ বুজে আসলো তার। বসে বসে ঝিমাতে থাকেন।

সকলের অগোচরে ফারহার কেবিনে এসে ঢোকে কেউ একজন। মাস্ক পরিহিত এক আগন্তুক। টকটকে লাল চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার কাছে। দেখে মনে হবে তার ভেতরটা ক্রোধের দাবানলে ফেটে পড়ছে। চোখ বুজে নিজেকে সামলে নিলো লোকটা। ধীরপায়ে ফারহার বেডের কাছে এসে দাঁড়ায়। মাথার কাছে দাঁড়িয়ে মায়াভরা দৃষ্টিতে দেখতে থাকে ফারহাকে। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিচু হয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,

“বোন আমার, চিন্তা করিস না। যার জন্য আজ তোর এই অবস্থা তার অবস্থা এর চেয়েও করুণ হবে।”

কথাগুলো ফারহা শুনতে পেলোনা। কারণ তার তো জ্ঞানই নেই। ব্যক্তিটি ফারহার ব্যান্ডেজ করা জায়গাটায় আদুরে স্পর্শ বোলায়। চোখের কোণে জমা অশ্রু আঙুল দিয়ে মুছে নেয়। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ফারহার কপালে আলতো চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। কালবিলম্ব না করে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে পড়ে। ঝিমাতে ঝিমাতেই হুট করে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়েন ফারজানা। ফারহা! ফারহা ঠিক আছে তো? মেয়েকে দেখার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ান তিনি। এদিকে আগন্তুকটও ব্যস্ত পায়ো এগিয়ে আসছে। কিন্তু যাওয়ার পথেই অসাবধানতা বশত ফারজানার সাথে ধাক্কা লেগে যায় তার। মুখ না ফিরিয়েই দুহাত উঁচু করে “সরি” বলে চলে যায় সে। ফারজানা বেগম কিছু বলতে চাইছিলেন। ছেলেটা ঝড়ের বেগে চলে গেলো তাই আর কিছু বলতে পারলেন না। ভালোভাবে গুরুত্ব না দিয়ে সামনে ফিরতে গেলেই হুট করে যেন কি মনে হয় তার। আবারো পিছু ফিরে ছেলেটিকে দেখতে চান। কিন্তু ততক্ষণে সে বেরিয়ে গেছে। তাকে আর দেখতে পেলেন না তিনি। মায়ের মন কেমন হু হু করে উঠলো। তিনি ছুটে যেতে লাগলেন সেদিকে যে পথে সেই ছেলেটি গিয়েছে। তার পাগলের মতো ছুটে যাওয়া দেখে মাঝপথে তাকে থামিয়ে দেয় আয়াজ। মাকে দুহাতে টেনে নিয়ে বলতে থাকে,

–কি হয়েছে মা? কোথায় যাচ্ছো?

ছটফটিয়ে বলে ওঠেন ফারজানা,

–আয়াজ, আয়াজ আমার আয়মান। আমার আয়মান এসেছিলো। আমার স্পষ্ট মনে হলো ছেলেটা আমার আয়ু ছিলো। আমার আয়ু। ও চলে গেলো।

–মা, কিসব বলছো? ভাইয়া এখানে কিভাবে আসবে? তুমি ভুল দেখেছো।

–নাআআ.. আমি কোনো ভুল দেখিনি। মা তার সন্তানকে চিনতে ভুল করবেনা কখনো। আমি আমার আয়ুকেই দেখেছি। আমাকে যেতে দে বাবা। নইলে ওকে আবার হারিয়ে ফেলবো।

আয়াজ দুহাতে মাকে বুকে আগলে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতে থাকে,

–মা, মা, শান্ত হও তুমি। একটু বোঝার চেষ্টা করো। ভাইয়া তোমাকে কতোটা ভালোবাসে জানোনা তুমি? সে যদি এখানে এসেও থাকে, একটিবার তোমার সাথে কথা না বলেই চলে যাবে? তা কি কখনো হতে পারে? তুমিই ভেবে দেখো মা।

ফারজানা শান্ত হলেন। আয়াজের বলা কথাগুলো ভাবতে থাকেন। সত্যিই তো। আয়মান তার মায়ের সাথে কথা না বলে চলে যাবেনা। তাহলে কি এটা তার মনের ভুল ছিলো। ওটা আয়মান নয়?

গাড়িতে এসে বসতেই লোকটা ড্রাইভারকে ঈশারা দিলো। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়তেই পেছনে গা এলিয়ে চোখ বুজে রাখে লোকটা। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়াতেই পাশে বসা আসিফ তা লক্ষ করে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে,

–বস, আপনি কাঁদছেন?

চোখ খুলে তাকায় লোকটি। দৃষ্টি ওপরে নিবদ্ধ। জড়বস্তুর ন্যায় ওভাবেই স্থির থাকে। আসিফের কথার কোনো জবাব দেয়না। আসিফ পুনরায় বলে ওঠে,

–আপনার মতো মানুষের চোখে পানি, ব্যপারটা ভালো লাগছেনা বস। একবার শুধু আদেশ করুন কে এর জন্য দায়ী। তার কাটা মু ন্ডু এনে আপনার পায়ের কাছে ফেলবো। কথা দিচ্ছি।

লোকটি হালকা হেসে উঠে বসেন। আসিফের কাঁধ চাপড়ে বলে ওঠেন,

–অস্থির হসনা। আমি ঠিক আছি।

চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পরা পানিটুকু অযত্নে মুছে নিলো। তারপর নিজের বাহুর দিকে তাকিয়ে পরম যত্নে সেখানে হাত বুলাতে থাকে। ব্যথিত সুরে বলে ওঠে,

–আজ কতগুলো দিন পর মায়ের ছোঁয়া পেলাম।

বুক চিঁড়ে আসা দীর্ঘশ্বাস ছেরে পুনরায় গা এলিয়ে চোখ বুজে নেয়। আসিফের উদ্দেশ্যে বলে,

–মা কে দেখতে পেয়েও তাকে “মা” বলে ডাকতে না পারার যন্ত্রণা বোঝো আসিফ?

আসিফ জবাব দেয়না। তার বসের মনের অবস্থা সে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে। তার বসও উত্তরের অপেক্ষা করেনা, নিজেও আর কিছু বলেনা। শুধু বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকে। শক্ত করে চোখ বুজে রেখেছে সে। চোখটা বড্ড জ্বালা করছে।


ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঘরে বসে যখন আহরারের আসার প্রার্থনা করছিলো অরুনিকা তখনই দরজায় ঠকঠক আওয়াজে চমকে গেলো সে। ভয় পেয়ে কেঁপে উঠলো। দাদীজান এলেন না তো আবার? বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় অরুনিকা। কি করবে না করবে ভাবতে থাকে। দরজা খুললে যদি তিনি আবার হামলা করেন। যদি সত্যি সত্যি এবার অরুনিকাকে বের করে দেন। আবারো ঠকঠক আওয়াজ পড়লো। পরপর কয়েকবার ঢোক গিলে অরুনিকা ধীরপায়ে দরজার দিকে এগোতে লাগলো। তখনই বাইরে থেকে ঠকঠক আওয়াজের সাথে সাথে একটি কন্ঠস্বরও ভেসে এলো। কন্ঠস্বরটি আহিয়ার।

–ভাবি, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছো?

অরুনিকা এবার দ্রুত ছুটে এসে দরজা খুলে দেয়। আহিয়া অরুনিকাকে ভয় পাওয়া অবস্থায় দেখে উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করে,

–কি হয়েছে ভাবি? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি কোনো কারণে ভয় পেয়েছো?

অরুনিকা কি বলবে ভেবে পায়না। আমতাআমতা করে বলে,

–না.. মানে.. ওই একা একা..

–ওহহ! বুঝতে পেরেছি। ভয় নেই। আমি আছি তোমার সাথে।

আহিয়া অরুনিকার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এসে বসিয়ে দেয়। নিজেও তার পাশে বসে পড়ে।

–ভাইয়া বোধহয় আজ রাতে আর ফিরতে পারবেনা। একটু আগে ফোন দিয়েছিলো। বললো ফারহাপু এখন ঠিকআছে। আপুটা কেন যে এমন পাগলামো করতে গেলো?

–উনি তোমার কেমন আপু আহিয়া? আর কেনই বা সে এমন একটা কাজ করলো?

আহিয়া পাশ ফিরে অরুনিকার মুখের দিকে তাকায়। সে বুঝতে পারলো অরুনিকা কিছু জানেনা। তাই সে সবটা জানানোর উদ্দেশ্যেই বলে ওঠে,

–ফারহাপু হচ্ছে আমার চাচাতো বোন। বড় আব্বুর ছোটো মেয়ে। ভিষণ আদরের। আট বছর অস্ট্রেলিয়াতে ছিলো সে। কিছুদিন আগেই ফিরেছে। আপু যেদিন ফিরেছে তার পরদিন তার ফিরে আসার খুশিতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। আর সেই অনুষ্ঠানে দাদীজান ফারহাপু আর আহরার ভাইয়ের বিয়ের ঘোষনা দেন।

চমকে ওঠে অরুনিকা। আহিয়ার কথা শুনে বিস্মিত নয়নে চেয়ে থাকে তার দিকে। আহিয়া বলতে থাকে,

–সবাই খুশি ছিলো। আমরা ভেবেছিলাম ওরা দুজনেই হয়তো রাজি। কিন্তু মায়ের কাছে পরে শুনলাম। ভাইয়া অন্য কাওকে পছন্দ করে। আজ জানলাম সেই মেয়েটা তুমি। কিন্তু ফারহাপু হয়তো তার চিন্তাভাবনা অনেক দুর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলো তাই আজ এটা মেনে নিতে পারেনি।

ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে অরুনিকার দিকে ফিরে বসে আহিয়া। অরুনিকার কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলে,

–এসব নিয়ে তুমি একদম মন খারাপ করিও না ভাবি। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমার ভাইয়া সব সমাধান করে ফেলবে দেখো। তুমি অনেক ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ো ভাবি। আমি তোমার সাথেই আছি আজকে।

অরুনিকার মন ভার হয়ে যায়। সে আসতে না আসতেই এই বাড়িতে যেন কালবৈশাখী ঝড় নেমে এলো। সত্যিই কি সব ঠিক হবে? সে কি পারবে এমন পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে? পারবে কি ওই মানুষটাকে সুখী করতে? লড়াইটা যে বেশ কঠিন তা বুঝতে পারে অরুনিকা। তারওপর আজ গুলবাহারের সাথে সে যা করলো না জানি এর ফলাফল কি হয়।
~
নিজের ঘরে বসে প্রচন্ড রাগে ফোঁসফোঁস করছেন গুলবাহার। স্থির হয়ে দুদন্ড বসতে পারছেন না তিনি। একটা গ্রাম্য মেয়ে হুট করে তার বাড়িতে এসে আসন গেড়ে বসলো। যাকে সে পছন্দ করেনা সেই মেয়েটা তার পরিবারের সদস্য হয়ে গেলো। তার হুকুম ব্যতীত কেউ এক ধাপ চলতো না সেখানে আজ যেন তার হুকুম তো দূর মতামতেরও তোয়াক্কা করলো না তার নিজের ছেলে আর নাতি। ক্ষিপ্ত কন্ঠে গুলবাহার বিরবির করছেন,
“নিজের ছেলের কথা আর কি বলবো। সে তো আমার কথার পরোয়া না করেই ওই তাসফিয়াকে বিয়ে করে নিয়েছিলো। ছেলেকেও বানিয়েছে ওই পথের পথিক। তবে তাসফিয়াকে যেভাবে দমিয়ে রাখা গিয়েছিলো এই মেয়েকে সেভাবে দমানো যাবেনা। চেহারাসুরতে আলাভোলা সেজে থাকা এই অরুনিকা বড্ড চালাক। তাই চালাকের সাথে খেলাটা চালাকি করেই খেলতে হবে।”

ধপ করে নিজের ইজি চেয়ারে বসে পড়েন গুলবাহার। জোরে জোরে চেয়ারটা দোলাতে থাকেন আর মাথার ভিতরে সাজাতে থাকেন নিজের শ য় তা নি পরিকল্পনা।

—-
ফারহার জ্ঞান ফিরেছে ভোরের দিকে। শরীরটা একটু দূর্বল। তবে আজই বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে বলেছেন ডক্টর। আয়াজ তার মাকে নিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছে রাতেই। কারণ এখানে থাকলে তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তাই আয়াজ একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গিয়েছে। আহরার থেকে গিয়েছে। মাঝে একবার ফোন করে আহিয়ার কাছ থেকে অরুনিকার আর তার মায়ের খবর জেনে নেয় সে। ফারহার জ্ঞান ফিরেছে শুনেছে তার কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলো আহরার। ভেতরে ঢুকে দেখতে পায় ফারহা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। একরাতেই যেন মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। আহরার আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবে, ফারহা এমন একটা কাজ করলো কিভাবে? আর কেনই বা করলো? নিঃশব্দে ফারহার বেডের কাছে এসে দাঁড়িয়ে হালকা স্বরে ডেকে ওঠে,

–ফারহা।

ফারহা চোখ খুলে তাকায়। আহরারকে দেখে অভিমান চোখে জল জমে তার। মুখটা ঘুরিয়ে নেয় সে। আহরার টুল টেনে বসে পড়ে সেখানে। তারপর ধীরকন্ঠে বলে ওঠে,

–তোর মতো এতো লক্ষী একটা মেয়ে এমন আহাম্মকের মতো কাজ কিভাবে করলি বল তো? এতো কিসের দুঃখ এসে জমলো তোর মনে যে এতো বড় স্টেপ নিলি?

ফারহা ফিরে তাকায়। কন্ঠে রাগ, ক্ষোভ, অভিমান মিশিয়ে বলে,

–তুমি তো এখন এসবই বলবে আহরার ভাই। কিন্তু নিজের দায়টা স্বীকার করবেনা।

–নিজের দায়?

–কেন? বুঝতে পারছোনা তুমি? নাকি না বোঝার ভান করছো?

আহরার খানিকটা কড়াসুরে বলে ওঠে,

–ফারহা, যা বলার সোজাসুজি বল। পরিষ্কার ভাবে বল।

ফারহা কেঁদে ফেলে। কান্নামাখা স্বরে বলতে থাকে,

–কেন আমার সাথে এমন করলে আহরার ভাই? যদি অন্য কাওকেই বিয়ে করবে তবে আমায় বিয়ে করতে রাজি হলে কেন? আমি তোমাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতাম। হয়তো ভালোও বেসে ফেলেছি। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে বা আশা রাখতে ভয় পেতাম। যদি তোমার দিক থেকে সাড়া না পাই সেই ভয়ে। যখন বিয়ে ঠিক হলো আর তুমি রাজি হলে আমি তখন সাহস করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কিন্তু সেই ভয়টাই সত্যি হয়ে আমার স্বপ্নটা ভেঙে গেলো। তুমি এক ঝটকায় আমার আশা, আমার সব স্বপ্ন, আমার মন ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিলে আহরার ভাই।

বলতে বলতে ফারহা কান্নায় ভেঙে পড়ে। আহরার হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে ফারহার দিকে। বিস্ময়ের রেশ কাটিয়ে সে ফারহাকে বলে,

–তোকে কে বলেছে ফারহা, আমি বিয়েতে রাজি ছিলাম?

হুট করে থেমে যায় ফারহার কান্না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে। আহরার পুনরায় বলে ওঠে,

–আমি তো নিজে মুখে দাদীজানকে জানিয়েছিলাম আমি তোকে বিয়ে করতে পারবোনা। কারণ আমি অন্য কাওকে পছন্দ করি আর তাকেই বিয়ে করতে চাই। বিয়ের এনাউন্সমেন্ট করার পরদিনই আমি দাদীজানের সাথে কথা বলেছিলাম। দাদীজান নিজেও তখন মেনে নিয়েছিলেন বিষয়টা। এরপরও তুই আশা রাখিস কি করে? দাদীজান কি তোকে কিছুই জানায়নি?

–তুমি কি বলছো আহরার ভাই আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। দাদীজানই তো আমায় বলেছেন তুমি রাজি ছিলে।

আহরার নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ফারহার মুকের দিকে। কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাতে পারেনা সে। মস্তিষ্ক বিকল হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে যেন। দাদীজান কেন এমনটা করলেন? কেন?

চলবে….

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ