Friday, June 5, 2026







মেঘ বলেছে যাব যাব পর্ব-০৪

🔴মেঘ বলেছে যাব যাব (পর্ব :৪)🔴
– হুমায়ূন আহমেদ

মে মাসের কড়া ঝাঁঝালো রোদ এসে পড়েছে হাসানের মুখের ওপর।

রোদ ঠেকাবার জন্যে হাসানকে উঠে জানালা বন্ধ করতে হবে। সেটা সম্ভব হচ্ছে না। হাসানের বিছানায় উঠে বসার ক্ষমতা নেই, জানালা বন্ধ করা তো অনেক পরের ব্যাপার। তার গায়ে এক শ তিন পয়েন্ট পাঁচ জ্বর। রীনা কিছুক্ষণ আগে জ্বর মেপেছে। জ্বর থার্মেমিটারে মাপা হয় নি, বাসায় থার্মেমিটার নেই। রীনা কপালে হাত রেখে গভীর গলায় বলেছে, এক শ তিন পয়েন্ট পাঁচ। জ্বরের ক্ষেত্রে রীনার অনুমান ভালো। জ্বর মনে হয় বাড়ছে। গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছে। মুখের ওপর রোদটা আগেও ছিল। তখন এতটা খারাপ লাগছিল না। এখন অসহ্য বোধ হচ্ছে। রোদটা মনে হচ্ছে তরল আকার নিয়েছে। মুখ থেকে গড়িয়ে চোখের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। চোখ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে।

হাসান কয়েকবার ডাকল, এদিকে কে আছে? এই এই! ডাক তেমন জোরালো হলো না কিংবা জোরালো হলেও কেউ শুনল না। সকালবেলার কয়েকটা ঘণ্টা বাড়ির লোকজন সীমাহীন ব্যস্ততায় থাকে। সকাল আটটা থেকে সাড়ে ন’টা এই দেড় ঘণ্টা সময়ের ভেতর তারেক অফিসের দিকে রওনা হন। অফিসে যাবার প্রস্তুতি পর্ব শেষ হতে তার পুরো এক ঘণ্টা লাগে। তিনি কোনো জিনিসই খুঁজে পান না। তার হাঁকডাক ক্ৰমাগত শোনা যেতে থাকে-আমার জুতার ভেতর মোজাজোড়া রাখলাম, একটা আছে আরেকটা গেল কোথায়? পরিষ্কার একটা রুমাল দিতে বললাম।—কথাটা কারো কানে যাচ্ছে না? এটা বলার জন্যে কি আমি মাইক ভাড়া করব? টেবিলের ওপর বড় একটা হলুদ খাম ছিল–খামের ওপর লাল কালি দিয়ে ‘Important’ লেখা। খামটা গেল কোথায়? একটু আগেও তো দেখেছি। খামের তো আর পা নেই যে হেঁটে হেঁটে মালিবাগ চলে যাবে?

তারেক সাহেবের দুই ছেলে রকেট ও বুলেটের স্কুল সাড়ে আটটায়। (আসল নাম মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং মোহাম্মদ আশরাফউদ্দিন। রকেট এবং বুলেট হাসানের ছোট ভাই রকিবের দেয়া নাম— এই নামেই তারা স্কুলে এবং বাসায় পরিচিত। তাদের সুন্দর ডাকনামও আছে টগর ও পলাশ। এই দুই নামে তাদের মা ছাড়া এখন আর কেউ ডাকে না।) তারা দু’জন এক বছরের ছোট বড় হলেও একই ক্লাসে পড়ে। যমজ ভাইদের মতো প্রতিটি কর্মকাণ্ড তারা একসঙ্গে করে। সকাল সাড়ে সাতটায় স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে দুজনেই বলে, ‘আজ স্কুলে যাব না।’ সাড়ে সাতটা থেকে আটটা এই আধঘণ্টা তাদের ওপর স্কুল যাত্রায় রাজি করানোর নানা প্রক্রিয়া চালানো হয়। কোনোটিই কাজ করে না। শেষ ওষুধ হিসেবে রীনা দু’জনের গালেই কষে চড় বসায়। দু’জন একই সঙ্গে গলা ছেড়ে কাদে। ক্ৰন্দনরত অবস্থাতেই তাদের প্রায় টেনেহেঁচড়ে রিকশায় তুলে দেয়া হয়। এদের স্কুলে পৌঁছে দেয়া এবং স্কুল থেকে আনার দায়িত্ব পালন করেন তাদের দাদুভাই আশরাফুজ্জামান সাহেব। কাজটা তিনি যে খুব আগ্রহের সঙ্গে করেন তা না। রিটায়ার্ড বাবা যদি ছেলের সংসারে বাস করতে আসেন তাহলে তাকেও কিছু কাজকর্ম করতে হয়। জগতে ফ্রি লাঞ্চ বলে কিছু নেই।

হাসানের ছোট বোন লায়লা জগন্নাথ কলেজে বি.এ. পড়ে। সে লাঞ্চবক্সে করে দুপুরের টিফিন নিয়ে যায়। তাকে এই সময় অত্যন্ত ব্যস্ত দেখা যায়। সে খুব সাজগোজ পছন্দ করে। তার ব্যস্ততা একই সঙ্গে সাজগোজের দিকে এবং টিফিন তৈরি হলো কি না। সেই দিকে। নিজের সাজগোজের ওপর লায়লার আস্থা খুবই কম। সাজের প্রতিটি পর্যায়ে সে তার ভাবির কাছে ছুটে যায়–ভাবির মতামত নিয়ে নিয়ে সাজের পরবতী ধাপের দিকে এগোয়, ভাবি টিপটা কি মাঝখানে হয়েছে? লাল টিপটাই পরব নাকি টিপ হাতে আঁকিব? ঠোঁটের লিপস্টিক কি বেশি কড়া হয়ে গেছে?

রীনা বিরক্ত হয় না। সাজসজ্জার ব্যাপারে অন্যকে পরামর্শ দেবার ব্যাপারে কোনো মেয়েরই বিরক্তি থাকে না। মেয়েরা এই কাজটা খুব আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে করে।

ঠিক ন’টার সময় ঠিকা কাজের মেয়ে ফুলির মা আসে। প্রতিদিনই তার সঙ্গে এ বাড়ির স্থায়ী কাজের মেয়ে কমলার মা’র একটা ঝগড়া শুরু হয়। কমলার মা নিচু গলায় ঝগড়া করলেও ফুলির মার গলা–কাকতাডুয়া গলা। সে চিৎকার শুরু করলেই আশপাশের কাক উড়তে থাকে। প্রতিদিনই একবার ঠিক করা হয় ফুলির মাকে আর রাখা হবে না। পাওনা গণ্ডী মিটিয়ে বিদায় করা হবে। বিদায় করা হয় না। কারণ ফুলির মার কর্মক্ষমতা অসাধারণ। ঝগড়া করতে করতেই সে অতি দ্রুত বাসনকোসন মেজে ঝকঝকে করে ফেলবে। পুরো বাড়ি ঝাঁট দেবে, কলঘরে রাখা দু বালতি কাপড় ধুয়ে চিপে দড়িতে শুকোতে দেবে। তার দায়িত্ব এই পর্যন্তই। দায়িত্ব পালনের পরেও সে যাবার আগে রীনাকে জিজ্ঞেস করবে, আর কোনো কাম আছে আফা। থাকলে তুরন্ত কন। এক বাড়িত কাম করলেই আমার শেষ না, আরো বাড়ি আছে। নিজের ঘর-সংসার আছে।

এমন একজন কাজের মানুষকে শুধুমাত্র ঝগড়া করার স্বভাবের জন্যে কেউ বিদায় করে না। মানুষ এত বোকা না!

সকালের এই ব্যস্ততা, হট্টগোল হাসান তেমন টের পায় না। কারণ তার ঘুম ভাঙে নটার পরে। ততক্ষণে হইচই থিতিয়ে আসে। চারদিকে ঝড়ের পরের শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। আজ জ্বরের কারণে সকাল ছটা থেকে সে জেগে। বাড়ির প্রতিটি শব্দ তার কানে আসছে। প্রবল জ্বরের সময় মানুষের কান তীক্ষ্ণ হয়। নিচু শব্দও অনেক বড় হয়ে কানে বাজে। হাসান বিড় বিড় করে নিজের মনেই বলল, হইহল্লাটা একটু কমানো যায় না? গড অলমাইটি বাড়িটা একটু শান্ত করে দিন। আমার ওপর একটু দয়া করুন। প্লিজ।

হইহল্লা কমল না, বরং বাড়তে থাকল। ঝনঝনি শব্দে থালা বা কাচের জগ ভাঙল। কাচের জিনিস ভাঙার শব্দ একবার হয়েই থেমে যাবার কথা–এই শব্দ থামছে নাঝন ঝন করে বেজেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে থালাবাসনও টের পেয়েছে। এ বাড়িতে একজন অসুস্থ মানুষ আছে। তাকে বিরক্ত করা তার পবিত্র কর্তব্য। এর মধ্যে লায়লা ঘরে ঢুকে বলল, দাদা তোর নাকি আকাশ-পাতাল জ্বর–ভাবি বলল।

হাসান জবাব দিল না। লায়লা সেন্ট মেখেছে, সেন্টের গন্ধে হাসানের গা গোলাচ্ছে। হাসান নিশ্চিত লায়লা আর কিছুক্ষণ তার ঘরে থাকলে সে বমি করে দেবে। যে কোম্পানি এই সেন্ট বানিয়েছে। সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে দেয়া দরকার।

দাদা দেখতে এই হলুদ শাড়িটা কি বেশি কটকট লাগছে?

হাসান ধমকের গলায় বলল, তুই ঘর থেকে যা তো। জাস্ট ক্লিয়ার আউট।

লায়লা হাসানের ধমকে বিস্মিত হলো না বা রাগও করল না। যেভাবে ঘরে ঢুকে ছিল, সেভাবেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। তখন হাসানের মনে হলো একটা ভুল হয়েছে লায়লাকে দিয়ে জানালাটা বন্ধ করালে কাজ হতো। রোদটা আর চোখের ভেতর ঢুকে যেত না। কী বিশ্ৰী কী ভয়ংকর রোদই না। আজ উঠেছে! তরল রোদ। রোদের ভিসকেসিটি অনেক–গড়াতে গড়াতে কী সুন্দর চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মাথাটা ভারি করে ফেলছে!

কলঘর থেকে কাপড় কাচার শব্দ এবং ফুলির মার গলাবাজি একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে–উচিত কথা আমারে শিখায়। আরো ধুমসী কাইলা মাগী–উচিত কথার ধার ফুলির মা ধারে না। তোর উচিত কথাত ফুলির মা খুক দেয়। থু থু থু।

রীনার গলা শোনা গেল— ফুলির মা চুপ কর তো।

ফুলির মার গলা আরো এক ধাপ উঠে গেল, আফা আমারে না–ধুমসী কাইলা মুঘীচুপ করতে কম। হের গলা পাও দিয়া চাইশ ধরেন। মালী আমারে উচিত কথা শিখায়।

ফুলির মা মাগী ফাগী বলবে না খবরদার!

মাগীরে মাগী বলব না তো কী বলব আফিা? ছাগী বলব? মাগীরে ছাগী বললে ছাগীরে কী বলব— বোতল বলব? আপনেই বলেন, আপনের বিচারটা কী হুনি।

চুপ কর।

আপনে চুপ করেন। অত গরম ভালো না। ফুলির মা গরমের ধার ধারে না।

হাসানের ইচ্ছা করছে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে–তোমরা দয়া করে চুপ করবে? দয়া করে কেউ একজন এসে আমার জানালা বন্ধ করবে? তোমরা কেউ বুঝতে পারছি না। আমার মাথার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।

হাসানের মনে হলো হঠাৎসব শব্দ কমে গেল। মাথার ভেতর জমে থাকা তরল রোগ হঠাৎ জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে গেল। হাসানের ঘুম ঘুম পেতে লাগল।

তার সত্যি ঘুম পাচ্ছে, না সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে? প্ৰচণ্ড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে যাবার কথা সে অন্যের কাছে শুনেছে। তার বেলায় এই প্রথম ঘটছে। খুব খারাপ তো লাগছে। অজ্ঞানটা আরো আগে হতে পারলে ভালো হতো। হাসান জীণ গলায় ডাকাল–ভাবি, ভাবি।

মাথায় ঠাণ্ডা পানির ধারা। কেউ একজন চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। কে পানি ঢালছে? চোখ মেললেই দেখা যায়–চোখ মেলতে ইচ্ছা করছে না। বাসায় পানি ঢালার মানুষ নেই। কমলার মা কি পানি ঢালছে? মনে হচ্ছে কমলার মা। তবে কমলার মা মাথায় পানি ঢাললেও চুলে বিলি কাটবে না। তাহলে কে? চোখ মেলে কি দেখবে? না, দেখতে ইচ্ছা করছে না। যার ইচ্ছা পানি ঢালুক কিছু যায় আসে না।

হাসান!

জ্বি ভাবি।

একটু কি ভালে লাগছে?

হুঁ।

তোমার জ্বর কত উঠেছে জান?

না।

এক শ পাঁচ। আমি বাড়িওয়ালাদের বাসা থেকে থার্মেমিটার। এনে জ্বর মেপে হতভম্ব! তুমি অচেতনের মতো হয়ে ছিলে। মুখ দিয়ে ফেনা টেনা বের হয়ে বিশ্ৰী কাণ্ড। উঠে বসতে পারবে?

উঠে বসতে হবে কেন?

দুটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিতাম। জ্বরটা কমত।

শুয়ে শুয়ে খেতে পারব। দাও ট্যাবলেট দুটা দাও।

গলায় আটকাবে তো?

আটকাবে না।

হাসান শোন, পুরো এক ঘণ্টা তোমার মাথায় পানি ঢালা হয়েছে, গা স্পঞ্জ করা হয়েছে। আমার ধারণা জ্বর অনেকটা কমেছে। আমি দেয়ালে ঠেস দিয়ে তোমাকে বসিয়ে দিচ্ছি। তুমি বসে প্যারাসিটামল খাও। ঘণ্টাখানিকের মধ্যে জ্বরটা আরো কমবে তখন নাশতা নিয়ে আসব। দাঁড়াও মাথাটা আগে মুছে দি।

হাসানকে ধরে উঠাতে হলো না, সে নিজেই উঠে বসল। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। রীনা তার কোলে একটা বালিশ দিয়ে দিল। জ্বর কতটা কমেছে দেখতে পারলে হতো। সম্ভব না–কারণ থার্মোমিটার কিছুক্ষণ আগে টেবিল থেকে পড়ে ভেঙেছে। বাড়িওয়ালাকে এই জাতীয় আরেকটা থার্মোমিটার কিনে দিতে হবে। আজ দিনের মধ্যেই কিনতে হবে। সন্ধ্যার মধ্যে থার্মোমিটার পাঠানো না হলে লোক চলে আসবে। তাদের বাড়িওয়ালা কঠিন বস্তু।

এখন কি একটু ভালো লাগছে?

হুঁ।

রাত দুপুরে বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বরাজ্বরি তো হবেই।

মাঝে মাঝে অসুখ-বিসুখ হওয়া ভালো, সেবা পাওয়া যায়।

অসুখ-বিসুখ ছাড়াই সেবা পাওয়ার লোক নিয়ে এসো–চোখ বন্ধ করে বসে আছ কেন? তাকাও।

আলো চোখে লাগছে ভাবি।

লাগুক। চোখ বন্ধ করে বসে থাকবে না। বিশ্ৰী লাগে। তোমার ভাইয়েরও একই অভ্যাস। খাটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা আর পা নাচানো। মনে হয় তার একটা পা স্প্রিঙের। বাতাস পেলেই দোলে।

হাসান চোখ মেলল। আলোটা এখন আর তেমন চোখে লাগছে না। শরীর ঘামছে, জ্বর মনে হয়। সত্যি সত্যি কমছে। তবে সিগারেট খাবার ইচ্ছা এখনো হচ্ছে না। যখন হবে তখন বুঝতে হবে। জ্বর পুরোপুরি কমে গেছে। হাসান রীনার দিকে তাকিয়ে হাসল। একবার ভাবল বলে–ভাবি আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। শেষ পর্যন্ত বলল না। রীনা ভাবির মুখ খুব আলগা–ফট করে এমন এক কথা বলবে যে অস্বস্তিতে মুখটুক শুকিয়ে যাবে। ভাবি সেটা নিয়ে দিনের পর দিন ঠাট্টা করে বেড়াবে। একদিন রীনা হালকা সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরেছিল, চুলগুলো ছিল ছাড়া। হাসান তাকে দেখে মুগ্ধ গলায় বলেছিল–তোমাকে এত সুন্দর লাগছে কেন ভাবি? রীনা গভীর গলায় বলল, তুমি কি রবীন্দ্ৰনাথ?

তার মানে?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বউদির প্রেমে পড়েছিলেন। তোমারও মনে হয় সেই অবস্থা।

হাসান দারুণ অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল। রীনা সহজ ভঙ্গিতে বলল, চোখমুখ এমন করে ফেলেছ কেন? বউদিদের প্রেমে পড়া এমন কোনো ভয়াবহ অপরাধ না। এ দেশের সমাজ ব্যাপারটা সহজভাবেই দেখে। প্রেম খুব বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছলে দেবরকে বিয়ে দিয়ে দেয়। বউয়ের সঙ্গে এক রাত কাটাবার পর সব প্ৰেম শেষ। প্রেমের সলির সমাধি হয় না–হয় বিছানা সমাধি।

রীনার রসিকতা এখানে শেষ হলেও হতো। শেষ হয় নি। সেদিনই রীনা হাসানের সামনে তার বড় ভাইকে বলল, ঘটনা শুনেছ? তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা তো আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ভাইকে এক্ষুনি বিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর। আর দেরি করলে সে আমাকে প্ৰেমপত্র-টত্র লিখে ফেলবে। তখন যন্ত্রণা হবে। ইট ইজ হাই টাইম।

হাসানের লজ্জায় মরে যাবার মতো অবস্থা। এ জাতীয় বিপজ্জনক মহিলার সঙ্গে কথাবার্তা খুব সাবধানে বলতে হয়। হাসান খুবই সাবধানে কথা বলে। তারপরেও মাঝে মাঝে বিশ্ৰী ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়।

রীনাকে আজ আসলেই খুব সুন্দর লাগছে। কে বলবে এই মহিলা ত্রিশ বছর পার করে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে হালকা পাতলা গড়নের এক কিশোরী–আজ মজা করে শাড়ি পরে বড় সেজেছে।

আজ কী বার ভাবি?

সোমবার।

সর্বনাশ!

সর্বনাশ কেন?

সোমবার আমার জন্যে খুব খারাপ। ভয়াবহ সব সমস্যা হয় সোমবারে।

তোমার তো শুধু সোমবার খারাপ। আমার সব বারই খারাপ।

ভাবি চা খাব৷

শুধু চা?

চায়ের সঙ্গে একটা টেস্ট খেতে পারি। জ্বর মনে হয় কমে যাচ্ছে ভাবি। ঘাম দিচ্ছে।

ভেরি গুড–শোন তোমার টাকাটা ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি। তুমি এত অসাবধান কেন?

হাসান বিস্মিত হয় বলল, তোমার কথা বুঝতে পারছি না ভাবি কীসের টাকা?

কাল রাতে যে ভেজা প্যান্ট কলঘরে ছেড়ে এলে তার হিপ পকেটে তিন হাজার টাকা। রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাধা। কাপড় ধুতে গিয়ে ফুলির মা পেয়েছে–আমাকে দিয়ে গেছে।

বল কী?

বল কী মানে? টাকার কথা জানতে না? অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর হয়, অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড বেকার হয় বলে তো জানতাম না। কোথায় পেয়েছ এত টাকা?

টিউশ্যানির টাকা ভাবি। সুমি বলে একটা বাচ্চা মেয়েকে পড়াতাম। তিন মাসের টাকা এক মাসে দিয়ে চাকরি নটি করে দিয়েছে।

কেন?

পড়াতে পারি না। এই জন্যে বোধহয়।

পড়াতে পার না?

নাহ্–পড়াতে গিয়ে শুধু গল্প করি।

বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এত কীসের গল্প?

বাচ্চাদের সঙ্গে গল্পই সবচে’ ইন্টারেস্টিং ভাবি। যা ইচ্ছা বলতে পারেন। ওরা মন দিয়ে শুনবে। বড়দের সঙ্গে গল্প করা খুব সমস্যা। প্রতিটি কথা ভেবেচিন্তে বলতে হয়।

আমার সঙ্গে গল্প করার সময়ও কি তুমি প্রতিটি কথা ভেবে চিন্তে বল?

রীনা ঠোঁট টিপে হাসছে। হাসান সাবধান হয়ে গেল। ভাবির মতলব ভাল নাকোনো একটা প্যাচে ফেলে দেবে।

চা খাব ভাবি।

চা, টেষ্ট, সিদ্ধ ডিম?

হ্যাঁ।

মাথাটা এগিয়ে আন তো জ্বরের অবস্থা দেখি। এ কী! লজ্জায় এমন লাল হয়ে যাচ্ছে–তুমি কি সত্যি সত্যি আমার প্রেমে পড়েছ নাকি? আশ্চর্য কাণ্ড!

রীনা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বারটা প্ৰায় বাজে, আজ হাফকুল, বাচ্চাদের এগারটার মধ্যে চলে আসার কথা–এখনো আসছে না কেন? অস্পষ্ট কুয়াশার মতো দুশ্চিন্তা হচ্ছে। যদিও রীনা জানে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। বাবা সঙ্গে আছেন। ট্রাফিক জ্যামট্যামে রিকশা নিশ্চয়ই আটকা পড়েছে।

আজ দুপুরে কী রান্না হবে সেটাও দেখতে হবে। বাজার হয় নি। রোজকার বাজার হাসান করে দেয়; আগে সপ্তাহের বাজার করে ফ্রিজে রাখা হতো। ফ্রিজ কাজ করছে না। নতুন গ্যাস ভরতে হবে। দোকান থেকে ডিম আনিয়ে ডিমের তরকারি করা ছাড়া উপায় নেই। ডিম আনানোর লোক নেই। কমলার মাকে পাঠানো যাবে না। তার বাড়ি থেকে বের হওয়া মানেই অ্যাকসিডেন্ট। রিকশার নিচে পড়ে যাওয়া, ড্রেনে পড়ে যাওয়াএকবার মাইক্রোবাসের ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে দুদিন ছিল হাসপাতালে। আরেকবার পান। কিনতে গিয়ে কুকুরের কামড় খেয়ে এল। মহাখালিতে নিয়ে নাভিতে ইনজেকশন–শতেক যন্ত্রণা।

রীনা রান্নাঘরে ঢুকল। গ্যাসের চুলা দুটিই জ্বলছে। চুলায় কিছু নেই। কমলার মা নির্বিকার ভঙ্গিতে সুপারি কাটছে। কমলার মা ঘণ্টায় ঘণ্টায় পান খায়। পানের খরচ তাকে আলাদা দিতে হয়।

কমলার মা?

জ্বি।

একটা ডিম সিদ্ধ করা তো।

ডিম নাই আফা।

একটাও নেই?

জ্বি না। আমার পানও ফুরাইছি। সকাল থাইক্যা সুপারি চাবাইতাছি। অখন একটা পান না খাইলে দমফুটা লাইগ্যা মিত্যু হবে।

হবার দরকার নেই–যাও পান নিয়ে আসো। দু হালি ডিম আনবে। আজ ডিমের রকারি করবে। ঘরে বেগুন আছে না? বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি। এস টাকা নিয়ে যাও। রাস্তা সাবধানে পার হবে কমলার মা। গ্যাসের চুলা নিভিয়ে দিয়ে যাও–শুধু শুধু জ্বলছে কেন?

রীনার সংসারের টাকা ষ্টিলের আলমারিতে চকলেটের খালি টিনে আলাদা করে থাকে। আজ মাসের ২৫ তারিখ, সেই টিন খালি। রীনা তা জানে তারপরেও টিন খুলল। টিন আসলেই খালি–একটা চকচকে দশ টাকার নোট পড়ে আছে। টাকার বাক্স পুরোপুরি খালি রাখতে নেই বলেই দশ টাকার নোটটা আছে।

আরেকটা চিনের কৌটা আছে তার শোবার ঘরে টেবিলের ড্রয়ারে। ইমার্জেন্সি ফান্ড। সেটাও খালি। টাকা-পয়সার এই শোচনীয় অবস্থার কথা তারেককে সে দুদিন আগেই বলেছে। তারেক বলেছে ব্যবস্থা করছি। আজ তার কিছু টাকা আনার কথা। আজ না আনলে আগামীকাল বাচ্চাদের স্কুলেও পাঠানো যাবে না। এই মাসটা তাও কোনোক্রমে পার হয়ে গেলা-সামনের মাসটায় কী হবে কে জানে! এ মাসে বাড়ি ভাড়া পুরোটা দেয়া হয় নি। এক হাজার টাকা কম দেয়া হয়েছে। সামনের মাসে বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে এক হাজার টাকা বেশি দিতে হবে। বাড়তি এক হাজার টাকাটা আসবে কোথেকে?

এই বাড়িওয়ালা এমন না যে তাকে বাচ্চাদের মতো ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখা যাবে। সে ঠিকই সামনের মাসে দু তারিখে সস্তা কিছু লিজেঞ্জ নিয়ে উপস্থিত হবে। হাসিমুখে ডাকবে রীনা বউমা কোথায়? রকেট-বুলেট কোথায়? এই দুজনকে দিনে একবার না দেখলে ভালো লাগে না।

টাকা-পয়সার এই অশান্তি রীনার অসহ্য বোধ হচ্ছে। কোনোখান থেকে একবার হাজার পঞ্চাশেক টাকা পাওয়া গেলে খুচরা ঋণগুলো দিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা যেত। সেই সম্ভাবনা নেই। হার্ডওয়ারের দোকানে আলাদীনের চেরাগ কিনতে পাওয়া যায় না। আলাদীনের চেরাগ ছাড়া এই সমস্যার কোনো দিন সমাধান নেই।

রীনার একটা ভারি নেকলেস আছে। তার দাদিজান বিয়ের সময় দিয়েছিলেন। পাঁচ ভরি সোনার পদ্মহার। দাদির স্মৃতিচিহ্ন। স্মৃতিচিহ্ন-ফিহী আবার কী? বেঁচে থাকাটাই সবচে’ বড় স্মৃতিচিহ্ন। হারটা বিক্রি করে দিতে হবে।

রীনা আবার হাসানের ঘরে ঢুকল। হাসান হাসিমুখে বলল, ভাবি জ্বরটা মনে হয় পুরোপুরি সেরে গেছে। একটু আগে একটা সিগারেট খেলাম।

ভালো। তোমার চা-টেস্ট এবং ডিম। চলে আসবে। শোন হাসান, তোমার তিন হাজার টাকা থেকে আমাকে কিছু ধার দিতে পারবে–শ পাঁচেক?

ভাবি তুমি পুরোটাই নিয়ে যাও। টাকাটার আশা আমি ছেড়েই দিয়েছিলাম পাওয়া যখন গেছে এটা তোমার।

আমি পাঁচ শ টাকাই নিচ্ছি বাকি টাকাগুলো দিয়ে তুমি দয়া করে কিছু ভালো কাপড়চোপড় বানাও। ইন্টারভু্যর সময় এলেই তোমার ভাইয়ের শার্ট-প্যান্ট নিয়ে তুমি দৌড়াদৌড়ি কর-আমার খারাপ লাগে। তোমার বয়েসী একটা ছেলের এক সেট ভালো কাপড়চোপড় থাকবে না, এটা কেমন কথা! আর শোন, ভালো একজোড়া জুতা তুমি অবশ্যই কিনবে। শার্ট ইন করে প্যান্ট পরবে, জুতা পরবে, চকচকে নতুন টাকার মতো স্মার্ট ভঙ্গিতে ইন্টারভু্য দিতে যাবে। তবেই না চাকরি হবে। লেবেন্ডিসের মতো ইন্টারভু্যু দিতে যাও বলেই তোমার কিছু হয় না। তুমি আমাকে দোকানে নিয়ে যেও। আমি দেখে শুনে তোমার জামাকাপড় কিনে দেব।

হাসান লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা।

রীনা টাকা হাতে বের হয়ে এল। তার লজ্জা লাগছে। টিউশ্যানি করে হাসান অল্প কিছু টাকাই পায় সেই টাকায় রীনাকে প্রায়ই ভাগ বসাতে হয়। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে!! রীনা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে ঠিক করে ফেলল পদ্মহারটা সে অবশ্যই বিক্রি করবে। সেই টাকায় একটা সেট পোশাক সে হাসানকে বানিয়ে দেবে। এটা হবে হাসানকে দেয়া তার উপহার। বাংলাদেশের দশটা ভালো ছেলের তালিকা তৈরি হলে হাসানের নাম সেখানে অবশ্যই থাকবে। এমন একটি ছেলেকে সামান্য উপহার দিতে না পারাটা খুব কষ্টের।

রীনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বারটা একুশ বাজে। বাচ্চা দুটি এখনো ফিরছে না। কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয় নি তো! এত দেরি হবার তো কথা না। রীনার বুক ধড়ফড় করছে। কাল রাতে সে বাজে একটা স্বপ্নও দেখেছে—ঘরের ভেতর একটা হাতি ঘুরছে-ওঁড় দিয়ে আলনা থেকে টেনে কাপড় জামা নামাচ্ছে। স্বপ্নে হাতি দেখা খুব খারাপ। হাতির পিঠ কবরের মতো বলে হাতি দেখলে অতি প্রিয় কারো মৃত্যু হয়। রীনার হাতপা কাঁপছে। বারান্দার রেলিঙে একটা কাক বসে আছে। কী বিশ্ৰী ভঙ্গিতেই না সে তাকাচ্ছে! রীনা জানে এইসব কিছুই না, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যাবে বাবা রিকশা করে ওদের নিয়ে আসছেন। সেই কিছুক্ষণটাই অনন্তকালের মতো দীর্ঘ মনে হবে। কোনোরকম দুশ্চিন্তা ছাড়া মনের আনন্দে মানুষের বাঁচাটা কি এতই কঠিন?

বারান্দা থেকে সামনের রাস্তার অনেকটা দেখা যায়। কমলার মারি এর মধ্যে চলে আসার কথা। দু হালি ডিম আর পাঁচ টাকার পান। কিনতে এত সময় লাগবে কেন? আবার কি কুকুরে কামড়েছে? চিঠির ব্যাগ হাতে পোস্টম্যান আসছে। রীনার বুক ধক করে উঠল। যদিও ধক করে ওঠার কারণ নেই। পোস্টম্যান নিশ্চয়ই তাদের বাসার দিকে আসছে না। আর আসলেই বা কী?

রীনা অস্বস্তি নিয়ে পোস্টম্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। না সে তাদের বাড়িতে আসছে না। ওই তো রাস্তা পার হয়ে চলে গেল। রীনা প্ৰায় এক মাস আগে রেজিস্ট্রি করা একটা চিঠি পেয়েছিল। পত্র প্রেরকের কোনো নাম নেই। আধপৃষ্ঠায় একটি চিঠিতে লেখা–
ম্যাডাম,
আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনার স্বামীর অফিসে চাকরি করি। একটি বিশেষ কারণে আপনাকে এই পত্ৰ লিখছি। আমাদের অফিসে লাবণী নামে একজন অল্পবয়স্ক টাইপিষ্ট আছেন। আপনার স্বামী তারেক সাহেবের সঙ্গে তার গভীর প্রণয়। তাদের শারীরিক সম্পর্ক আছে ইহা নিশ্চিত। আমি ভেতরের খবর জানি। আপনি ঘর সামলান। বিলম্বে পাস্তাবেন।
ইতি
আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী জনৈক অচেনা বন্ধু

এই চিঠির কথা রীনা কাউকে বলে নি। উড়ো চিঠিকে কখনো গুরুত্ব দিতে নেই। রীনার হিতাকাঙ্ক্ষী অচেনা বন্ধু তাকে নামহীন চিঠি পাঠাবে না। সবচে’ বড় কথা তারেককে সে চেনে। অতি সরল ধরনের একজন মানুষ। একজন সরল মানুষের জীবন যাপনের পদ্ধতিও সরল হয়।

চিঠি পাবার পর রীনা একবার ভাত খেতে খেতে তারেককে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা! তোমাদের অফিসে লাবণী নামের কোনো মেয়ে আছে?

তারেক বিস্মিত হলো না, চমকাল না। রীনার দিকে তাকালও না–ভাত মাখতে মাখতে বলল, আছে। টাইপিস্ট। আমাদের দুজন মহিলা আছেন। ক্যাশ সেকশনে নতুন একটা মেয়েকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে। নাম সুস্মিতা।

মেয়েদের সঙ্গে তোমাদের কথা হয় না?

হ্যাঁ হয়। হবে না কেন? সুস্মিতা মেয়েটা পাগলা ধরনের–সারাক্ষণ কথা বলে।

লাবণী কম কথা বলে? ওর কথা বলার সুযোগ কোথায়! বড় সাহেবের চিঠি টাইপ করতে করতে হালুয়া টাইট।

লাবণীদের গ্রামের বাড়ি কোথায়?

জানি না তো কোথায়? আচ্ছা জিজ্ঞেস করে দেখব।

থাক তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না।

লাবণী দেখতে কেমন?

দেখতে ভালো। গোল মুখ। সুস্মিতা দেখতে ভালো না; মিকি মাউসের মতো দুটা বড় বড় দাঁত।

কথা এই পৰ্যন্তই। তারেক না হয়ে অন্য যে কেউ হলে জিজ্ঞেস করত–লাবণীর কথা জানতে চাচ্ছ কেন?

তারেক সেই প্রশ্ন করবে না। একজন সরল মানুষ পৃথিবীর সমস্ত প্রশ্নই সরলভাবে গ্ৰহণ করে।

রীনার মনে কোনো শঙ্কা নেই তারপরেও চিঠিটা কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করে। হাসানকে দেখালে কেমন হয়? না, তা সম্ভব না। হাসান তাকে নিয়েই হাসাহসি করবে। অলীক এক গল্পের পেছনে সময় নষ্ট করার বা দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। দুশ্চিন্তার অনেক ব্যাপার। আমাদের চারপাশেই আছে।

বাচ্চাদের আসতে দেখা যাচ্ছে। রীনা দেখল টগর ঘুমোচ্ছে। রীনার শ্বশুর ছেলেকে বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে আছে। তবে জড়িয়ে ধরে রাখতে তার কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটার পা অনেকখানি বের হয়ে আছে। যে-কোনো সময় অ্যাকসিডেন্ট হতে পারত। একটা ট্রাক কিংবা মাইক্রোবাস এসে ঘষা দিয়ে চলে গেল। ভাগ্যিস হয় নি! কমলার মাকেও আসতে দেখা গেল। ঘুমন্ত টগরকে রীনার শ্বশুর কমলার মার কোলে দেবার চেষ্টা করছেন। কমলার মা অতি সেয়ানা–সে ভুলেও নেবে না। বেচারা বুড়ো মানুষকেই নাতি কোলে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে হবে।

রানার শ্বাশুড়ি আছেন কল্যাণপুরে তাঁর মেয়ের বাসায়। স্বামীর সঙ্গে রাগ করে চলে গেছেন। রাগ ভাঙিয়ে তাকেও কল্যাণপুর থেকে আনতে হবে। রীনার শ্বশুর রাগ ভাঙানোর প্রচুর চেষ্টা করছেন–প্রতিদিন একবার করে কল্যাণপুরে যাচ্ছেন। লাভ কিছু হচ্ছে না–রোজ রিকশা ভাড়া দিতে হচ্ছে। টগরের বাবা ফিরলে তাকে দিয়ে মাকে আনিয়ে নিতে হবে। ছেলে গেলে মা সুড়সুড়ি করে চলে আসবেন। এ রকম ছেলেভক্ত মা খুব কম আছে।

টগরের ঘুম ভেঙেছে। দাদার কোল থেকে নেমে সে এখন ছুটতে ছুটতে আসছে। মাথাটা সামনের দিকে বাকী করা। এটা তার মহিষ মহিষ খেলা। মহিষের মতো শিং দিয়ে সে মাকে গুতো দেবে। মহিষের বয়স পাঁচ বছর হলে কী হবে গায়ে জোর আছে। রীনা হাসিমুখে মহিষের ধাক্কা সামলানোর জন্যে রেলিং ধরে দাঁড়াল। তার এত ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আলাদীনের চেরাগ ছাড়াও বেঁচে থাকাটা এমন অসহনীয় নয়।

বাড়িওয়ালাদের কাজের মেয়েটি আসছে। মেয়েটার নাম হালিমা। খুব ভালো নাম। নরম স্বভাব। হাসিখুশি। এ রকম একটা কাজের মেয়ে থাকলে খুব ভালো হতো। রীনা হালিমাকে বলে দিয়েছে দেশে গেলে সে যেন তার মতো একটা মেয়ে নিয়ে আসে।

রীনা বলল, কী খবর হালিমা।

হালিমা হাসিমুখে বলল, আফনের টেলিফোন আইছে গো আফা। জরুরি ফোন।

বাড়িওয়ালার বাসার টেলিফোন নাম্বারে ভাড়াটেদের ফোন এলে তাদের ডাকা হয় না। কোনো দুঃসংবাদের ফোন কি এসেছে? মৃত্যু সংবাদ? রীনার বুক আবারো ধক করে উঠল। আজকের দিনটা তার জন্যে খারাপভাবে শুরু হয়েছে। বারবার শুধু মৃত্যু সংবাদের কথা মনে আসছে। মানুষের মনে যা আসে তাই শেষ পর্যন্ত হয়। রীনার মুখ শুকিয়ে গেল।

হ্যালো।

কে ভাবি? আমি রকিব।

ও আচ্ছা।

ভাইজান কি অফিস থেকে ফিরেছেন?

না। কেন বল তো?

আমি একটা সিরিয়াস বিপদে পড়েছি ভাবি।

কী বিপদ?

সেটা তোমাকে বলতে পারব না। তবে ভালো বিপদ। ভাবি আমি আসলে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

কেন?

আছে, ব্যাপার আছে। স্টুডেন্ট পলিটিক্সের অনেক ঝামেলা আছে। তুমি বুঝবে না। ভাবি আমার কিছু টাকা লাগবে।

কত টাকা?

পাঁচ হাজার টাকা।

এত টাকা আমি পাব কোথায়?

যেভাবে হোক যোগাড় কর ভাবি।

রবিক শোন–তুমি খুবই অসম্ভব কথা বলছি। সংসারের অবস্থা তো তুমি জান।

আমি সবই জানি। কিন্তু আমার কোনো উপায় নেই। ভাবি শোন আমি সন্ধ্যাবেলা একটা লোক পাঠাব, তার হাতে টাকাটা দিয়ে দিও।

রকিব কাউকে পাঠিও না। তুমি নিজে আস–তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যবস্থা কর।

রকিব টেলিফোন রেখে দিল। রীনা বোকার মতো খানিকক্ষণ হ্যালো হ্যালো করল।

পাঁচ হাজার টাকা সে কিছুতেই যোগাড় করতে পারবে না। হাসানের কাছ থেকে নিয়ে হাজার দুয়েক টাকা সে দিতে পারবে–এর বেশি না। এতে কি রকিবের বিপদ কাটবে? বিপদটা কী তাও সে স্পষ্ট করে নি। এমন কী বিপদ যে বাসায় এসেও টাকা নেয়ে যাবে না!

বাড়িওয়ালার স্ত্রী জাহেদা বললেন, মা বোস শরবত খেয়ে যাও।

রীনা বলল, জ্বি না চাচি–টগর-পলাশ এরা মাত্র স্কুল থেকে এসেছে। এদের গোসল করাব-খাওয়াব।

শরবত খেতে কয় মিনিট লাগে? তিন মিনিট। গরমে তেঁতুলের শরবত খেয়ে দেখ–শরীরটা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে যায়। বোস খাটের ওপর বোস।

রীনা খাটে বসল। নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে বসল। জাহেদা গল্প করতে ভালবাসেন। তার হাতে ধরা খেলে সহজে মুক্তি পাওয়া মুশকিল। তার সব গল্পই ভাড়াটেদের কর্মকাণ্ডের ওপর। ভদ্রমহিলা কখনো কোনো ভাড়াটের ঘরে যান না। কিন্তু তাদের সব খবর জানেন।

কেমন আছ মা তুমি?

জ্বি ভালো।

তোমার দেওর যে হাসান সে চাকরি বাকরি কিছু পায় নি?

তেমন কিছু পায় নি, তবে বেকার না। হিশামুদ্দিন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করছে।

কী কাজ?

হিশামুদ্দিন সাহেবের পার্সেনাল কিছু কাজ করে দিচ্ছে। পরে ওই ফার্মেই চাকরি দেবে।

ওর বিয়ে-টিয়ের কথা ভাবছি। ভাবলে বলবে–আমার হাতে ভালো মেয়ে আছে। খরচপাতি করে বিয়ে দেবে। দানসামগ্ৰী ছাড়া ক্যাশ টাকাও দেবে।

জ্বি আচ্ছা বলব।

ভাগ্য ফেরাবার জন্যে হলেও পুরুষমানুষের বিয়ে দিতে হয়। কথায় আছে না। স্ত্রীভাগ্যে ধন।

জ্বি।

শরবতটা কেমন লাগল। মা?

খুব ভালো লেগেছে চাচি। এখন উঠি?

দুটা মিনিট বোস মা। একটা ঘটনা বলি। এ রকম ঘটনা যে ঘটতে পারে বাপের জন্মে শুনি নাই। আমাদের চারতলায় ভাড়া থাকে যে ইয়াছিন সাহেব, উনাকে চেন?

জ্বি না।

ওই যে রোগা-চিমসা মুখ, মাথায় টাক, এজি অফিসে কাজ করে–তার ঘটনা।

চাচি আরেকদিন এসে শুনব?

এসেছ যখন শুনে যাও। ইয়াছিন সাহেবের ফ্যামিলি গিয়েছে দেশে। ভদ্রলোক ছুটি পায় নাই, যেতে পারে নাই। একদিন দেখি কী একটা মেয়ে নিয়ে ঘরে যাচ্ছে। সুন্দর মতো চেহারা। সতের-আঠার বছর বয়স। আমার হলো সন্দেহ–ব্যাপারটা কী? এই সময় তো তার অফিসে থাকার কথা। মেয়ে নিয়ে ঘরে কেন? বিষয় জানার জন্যে আমি নিজেই গেলাম।

কী জানলেন?

সে বিরাট ইতিহাস। ইয়াছিন সাহেব কেঁদে আমার পায়ে পড়ে গেল…

চাচি আরেক দিন এসে পুরো গল্প শুনব। মনে হচ্ছে খুব ইন্টারেষ্টিং।

রীনা উঠে দাঁড়াল। হাসান চলে যাবার আগেই তাকে ধরতে হবে। রকিবের জন্যে হাসানের টাকা রেখে দিতে হবে। ইয়াসিন সাহেব যা ইচ্ছা করুক। তার সংসার ঠিক থাকলেই হলো।

৪ পর্ব শেষ 📌

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ