Friday, June 5, 2026







বিবি পর্ব-৩৯+৪০

#বিবি
#রোকসানা_রাহমান
পর্ব (৩৯)

” ঘুমের ওষুধ খায়িয়ে শারীরিক সম্পর্ক করেছে! ”

দুলালের কণ্ঠে সমুদ্র মাপের বিস্ময়, চোখের চাহনিতে অবিশ্বাস্য। নিবিড় পরিমার্জনের জন্য দ্রুত উত্তর করল,
” করেনি, করার চেষ্টা করেছিল। ”
” এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে? ”

নিবিড় সরাসরি বলল,
” আমার সে’ক্সো’ মনিয়া নেই। ”

কিছু মানুষ আছে যারা ঘুমন্ত অবস্থায় হাঁটা-চলা করে, কথা বলে, খাওয়া-দাওয়া করে। এমনকি টয়লেটেও যায়। এগুলোও এক ধরনের সমস্যা বা রোগ। এই মানুষগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে যৌ’*’স*ম করতেও সক্ষম হয়। যাকে বিজ্ঞানী ভাষায় সে’ক্সো’মনিয়া বলা হয়। নিবিড়ের সাথে অনেকগুলো বছর রাতযাপন করেছেন দুলাল। সেই সুবাদে তার ভালো করেই জানা এই ধরনের একটি সমস্যাও নেই তার।

নিবিড় আরেকটু ভেঙে বলল,
” জোরাজুরি করলে আমার ঘুম ভেঙে যেত। ”
” ভাঙেনি? ”
” না। সেরকম কিছু মনেও পড়ছে না। ”
” হয়তো ঘুমের ওষুধের প্রভাব বেশি পড়েছিল, তাই ভাঙেনি। ” সেরকম হলে এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙার কথা না। বারো ঘণ্টার বদলে চব্বিশ ঘণ্টা ঘুমাতাম। ”
” তোর যুক্তি শুনে তো মনে হচ্ছে, শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টাও করেনি। ”
” হতেও পারে। ”

দুলাল একটু দ্বিধায় পড়ল। সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
” তাহলে তো বাচ্চা-টাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাচ্চা যদি না-ই হবে ওষুধ খাওয়াল কেন? শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে এমন মিথ্যেভাব ধরবে কেন? ”
” কোমলকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। হয়তো ভাবছে, কোমল কষ্ট পেয়ে আমার থেকে দূরে সরে যাবে। সেই সুযোগে অনড়া কাছে আসার সুযোগ পাবে। ”
” সুন্দর ভাবনা তো। তোর উচিত ও কে সাহায্য করা। ”
” দুলাল ভাই! ”

নিবিড়ের করুণ কণ্ঠের সম্বোধনে দুলাল হালকা হাসল। কাঁধ ধরে একটু চেপে বসলেন। বিজ্ঞদের মতো বললেন,
” এতে লাভ তোরও হবে। ”
” কী লাভ? ”
” কোমল তোর গুরুত্ব বুঝবে। তোকে ভাগ করার জন্য যেভাবে উঠে-পড়ে লেগেছে সেটা বন্ধ হবে। অন্য মেয়েকে ভালোবাসছিস, সাথে নিয়ে ঘুমাচ্ছিস, ঘুরে বেড়াচ্ছিস, উপহার দিচ্ছিস এসব দেখে নিশ্চয় খুব কষ্ট পাবে। কষ্ট, হিংসায় পরিণত হবে। তারপরেই উপলব্ধি করবে, এই পৃথিবীতে সব ভালোবাসার ভাগ হলেও স্বামীর ভালোবাসা ভাগ হয় না। তখন আর অনড়াকে বোনের নজরে না সতীনের চোখে দেখবে। দয়া-মায়া সব ভুলে স্বার্থপর হবে। ”
” আর যদি কষ্ট চিরতরে কষ্টেই থাকে? হিংসায় রূপ না নেয়? স্বার্থপর না হয়? আমাদের মধ্যে দূরত্বটা স্থায়ী হয়ে যায়? ”
” একটু তো ঝুঁকি নিতে-ই হবে, ছোট ভাই। ”
” ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নেই। যদি তেমনটাই ঘটে তাহলে সেই দূরত্ব কমিয়ে কোমলের কাছে ফিরে যাওয়ার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ”
” এতটা কঠিন হওয়া কারও পক্ষে সম্ভব? ”
” আমার কোমলের পক্ষে সম্ভব। আমার বেলায় ওর ভেতরটা যত নরম বাইরেটা ততটাই কঠিন। আমাকে বোনের দিকে ঠেলে দিলেও ফিরিয়ে দিচ্ছে না। প্রকাশে যতটা কষ্ট দিচ্ছে গোপনে দ্বিগুন ভালোবাসছে। এজন্যই তো শক্ত হতে গিয়ে দুর্বল হয়ে যাই। ধমক দিতে গিয়ে আদর করে ফেলি। ”
” সমস্যা প্রকাশ করতে এসে ভালোবাসার উপন্যাস লিখে ফেলিস। ভাবখানা এমন এই দুনিয়াই শুধু তোরা-ই ভালোবাসতে পারিস। আর কেউ পারে না। ”

দুলাল ভাইয়ের এমন কথায় নিবিড় থতমত খেল। বোকা চোখে চেয়ে থাকলে তিনি বললেন,
” কথা যেখান থেকে-ই শুরু হোক না কেন, নিয়ে যাস কোমলের কাছে। তারপর দুনিয়া ভুলে তার প্রশংসা আর গুণগান করতে থাকিস। সামান্য একটা দুল হাতে নিয়ে যে পরীক্ষার আগের রাতের গুরুত্ব ভুলে যেতে পারে তার ভবিষ্যৎ যে এমন হবে আগেই বুঝেছিলাম। ডাক্তার উপাধির আগে ‘ বউপাগল ‘ উপাধি অর্জন করে ফেলেছিস। ”

নিবিড় অবনত হয়ে বলল,
” সরি। ”

দুলাল ভাই হেসে ফেললেন। নিবিড়ের কাঁধ ঝাকি দিয়ে বললেন,
” হয়েছে, আর লজ্জা পেতে হবে না। ভালোবাসার দিক দিয়ে কেউ কারও চেয়ে কম না। পার্থক্য শুধু প্রকাশভঙ্গিতে। একজন ভালোবেসে স্বার্থপর হচ্ছে আরেকজন নিঃস্বার্থ। তুই কোমলকে নিয়ে দুনিয়া গড়তে চাচ্ছিস। আর ও গড়ে তোলা দুনিয়াসহ তোকে চাচ্ছে। দুটিতে মানিয়েছে বেশ। শুধু ঝামেলা করে বসল অনড়া নামের মেয়েটি। ”
” দূর করার উপায় বলে দেন এবার। ”
” মেয়েটা মারাত্মক সব কাণ্ড ঘটিয়ে যেভাবে ভয় পায়িয়ে দিচ্ছে, ডিভোর্স ছাড়া তো অন্য উপায় দেখছি না। ”
” আমার সিদ্ধান্ত তাহলে ঠিক? ”
” ঠিক বলব না। পরিস্থিতির স্বীকার। হয়তো এটা-ই ওর জন্য ভালো হবে। তোকে এমনভাবে পাওয়ার চেয়ে ত্যাগ করাই উত্তম। ”

একটু থেমে পুনরায় বললেন,
” একটা কথা মনে রাখিস, কোমলের কাছে তুই যেমন অনড়াও তেমন। দুই বোনের ভালোবাসায় কখনও বাঁধা হয়ে দাঁড়াস না। কোমল হাত ছেড়ে দিলে ও খুব অসহায় হয়ে পড়বে। ”
” যদি অনড়া নিজে হাত ছাড়িয়ে নেয়? ”
” মনে হয় না নিবে। তোর মতো অনড়াও বুবুকে পাগলের মতো ভালোবাসে। নাহলে তোর ঘুম হারাম করে দিত। সংসারটাকে জাহান্নামের মতো করে ছাড়ত। ”

___________

অনড়াকে পরবর্তী মাস ফুরাতে দ্বিতীয় চিঠি দিয়েছিল। এবার তৃতীয় ও শেষ চিঠি দিলেই আইনত ঝামেলা মিটে যাবে। নিবিড় ডিভোর্সের শেষ চিঠিটি পকেটে করে এক সন্ধ্যায় বাড়ি দিকে ফিরছিল ফূর্তিমনে। বাসায় এসে দেখল, মূল দ্বার হাট করা। ভেতর থেকে কুলসুম নাহারের চেঁচামেচি ভেসে আসছে। সে জুতাসহ ভেতরে ঢুকে পড়ল। উদ্বিগ্নের হালকা আঁচ পড়ছে মস্তিষ্কে, বদনে। মায়ের রাগের কারণ জানার কৌতূহলী হলেও দমিয়ে ফেলল। কারণ, চিৎকার-চেঁচামেচি চলছে অনড়ার রুমে। নিরুৎসাহিত ভাবে হেঁটে গেল নিজ কক্ষে। কোমল নেই। বুঝে ফেলল, অনড়ার রুমেই আছে। সে দরজার কাছে ফিরে এসে উঁচু স্বরে ডাকল স্ত্রীকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজির হতে দেখা গেল তাকে। মুখখানা ভীষণ চিন্তিত ও মনমরা। নিবিড় দরদভরা গলায় সুধাল,
” তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? ”

সে স্বামীর নিকট এসে অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলল,
” অনড়া চলে যাচ্ছে৷ ”

নিবিড় এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। পরক্ষণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উচ্চারণ করল,
” আলহামদুলিল্লাহ। ”

কোমল বোধ হয় শুনল না। তাড়া দিয়ে বলল,
” তুমি গিয়ে মানা করো। তাহলে যাবে না। ”
” আমি মানা করব কেন? ”
” তোমার স্ত্রী হয় না? ”

নিবিড় প্রশ্নটা এড়িয়ে বলল,
” গলাটা শুকিয়ে গেছে। একটু শরবত করো তো। ”

কোমল অবাক হয়ে অল্পক্ষণ চেয়ে থাকল স্বামীর দিকে। তারপরেই জিজ্ঞেস করল,
” তুমি আটকাবে না? ”

নিবিড় নিরুদ্বেগে উত্তর দিল,
” আটকানোর কোনো কারণ তো দেখছি না। ”
” পাগলের মতো কথা বলছ কেন? ও তোমার স্ত্রী। স্বামী-সংসার ফেলে হোস্টেলে থাকবে কেন? ”
” পড়াশোনা করার জন্য। ”
” সেটা তো এখানে থেকেও করা যায়। ”
” ওখানে থাকলে সুবিধা বেশি। যাতায়াতের ঝামেলা হবে না। সারাক্ষণ একদল মেধাবীদের সঙ্গে থাকলে মেধা বাড়বে। সৃজনশীলতা আসবে। পড়াশেনায় আগ্রহ পাবে। ”

কোমলের হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে আবারও বলল,
” তাছাড়া তুমিও তো চেয়েছিলে ও হোস্টেলে থেকে পড়ুক। সিট পাচ্ছিল না বিধায় এখানে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এখন যেহেতু সিট পেয়েছে সেহেতু চলে যাওয়ায় ভালো হবে। ”
” তখনও অবিবাহিত ছিল। এখন বিবাহিত। সংসারে থেকে পড়াশোনার সুযোগ থাকলে বাইরে থাকবে কেন? ”
” ও যদি বাইরে থেকে খুশি থাকে। আমরা কেন বাঁধা হব? ”
” বাঁধা হব কোথায়? ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে আটকাব। ”

নিবিড় স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে গেল। দেহভঙ্গি কঠিন করে দাঁড়িয়ে বলল,
” ভুল না একদম সঠিক সিদ্ধান্ত। ”

কোমলও উঠে দাঁড়াল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
” তুমি সত্যি আটকাবে না? ”
” না। আমি আটকাব না। তোমাকেও আটকাতে দেব না। ”

কোমলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল জোর করে। শাসানোর মতো করে বলল,
” আমি যতক্ষণ না বলব ততক্ষণ এখান থেকে নড়বে না। কোনো কথাও বলবে না। ”

সে করুণ চোখে চেয়ে থাকলেও জায়গা থেকে নড়ল না। মুখ দিয়ে টু শব্দটাও করল না। কয়েকটি মুহূর্ত এভাবে কাটার পর অনড়ার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সশরীরে দুজনের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেও কেউ তার দিকে তাকাল না। নিবিড় অন্যদিকে মুখ করে থাকল। কোমল মাথা নিচু করে শক্ত হয়ে বসে রইল। অনড়া দুজনের দিকে চোখ ঘুরিয়ে এনে বলল,
” বুবু, এটা রাখ। আমি চলে যাওয়ার পর মেলবে। ”

কোমল কাগজটা এমনভাবে মুঠোবন্দি করল যেন এটি কাগজ নয় তার ছোট বোনের আদুরে শরীরটা। অনড়া নিজ থেকেই কোমলকে হালকা করে জড়িয়ে ধরে নীঃশব্দে বেরিয়ে গেল দ্রুতপদে। কুলসুম নাহার সরাসরি ছেলেকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। তাই দূরে দাঁড়িয়ে একা একা বিলাপ করে নিজ কক্ষে ফিরে গেলেন। সেইসময় কাগজটা খুলল কোমল। তাতে লেখা, ‘ আমি প্রেগন্যান্ট। তোমার বরকে সংবাদটা দিয়ে দিও। ‘

চলবে

#বিবি
#রোকসানা_রাহমান
পর্ব (৪০)

‘ আমি প্রেগন্যান্ট। তোমার বরকে সংবাদটা দিয়ে দিও। ‘

বার্তাটুকু পড়েই কোমলের কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গেল। সুনামীর মতো এক ভয়াবহ কিছু উৎপন্ন হতে লাগল হৃদয়ের তলদেশে, বুকের সবটাজুড়ে। মস্তিষ্কে আঘাত হানতেই সন্ধ্যার ঝাপসা অন্ধকারের মতো মনে পড়ল, অনড়ার রুমে নিবিড়ের কাটানো একটি রাত, রুদ্ধ দ্বার, পিঠের উপর নখের আঁচড়। চেতন ভুলে ঝাপসা স্মৃতিটুকুতে মনোনিবেশ করায় কাগজটা পড়ে যাচ্ছিল। কোমল চট করে ধরে ফেলল। লেখাগুলোতে আরও কয়েকটা মুহূর্ত চেয়ে থাকল নির্নিমিখ দৃষ্টিতে। অতঃপর বিছানায় থেকে উঠে হেঁটে গেল নিবিড়ের দিকে। পিঠে মাথা ফেলে গাঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরেই চোখের পানি ছেড়ে দিল। নিবিড় টের পেয়ে বলল,
” স্বামীর দুঃখে জোর করেও কান্না আসে না। আর বোনের দুঃখে আপনাআপনি চলে আসে!

তার কণ্ঠে একইসাথে অভিযোগ, ঈর্ষা। কোমল সিক্ত কণ্ঠে বলল,
” দুঃখের না আনন্দের কান্না। ”

অনড়া চলে যাওয়ায় নিবিড়ের আনন্দ হতে পারে, কোমলের না। এই মুহূর্তে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাহলে কোন আনন্দের কথা বলছে? নিবিড় সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল,
” হঠাৎ এত আনন্দ কোথায় পেলে? ”

কোমল মুখে উত্তর দিল না। মুঠোতে চেপে রাখা কাগজটা স্বামীর চোখের সামনে মেলে ধরল। নিবিড় কাগজটা হাতে নিলে সে আপ্লুত স্বরে বলল,
” আমি আম্মাকে আনন্দের সংবাদটা দিয়ে আসি। ”

নিবিড়কে ছেড়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পারল না। হাতে টান অনুভব করল। পেছন ফিরে বলল,
” কী হলো? ”

স্ত্রীর হাত ধরে রেখে সংক্ষেপে উত্তর করল,
” মিথ্যে। ”
” কী মিথ্যে? ”

কোমলের কাছাকাছি এসে বলল,
” তোমার বোন সন্তান সম্ভাবনা না। ”
” কী করে জানলে? পরীক্ষা করেছ? ”
” পরীক্ষা করা পর্যন্ত যেতে হবে না। আমাদের মধ্যে সেরকম কিছু হয়নি। ”
” সেই রাতেও না? ”

তার কণ্ঠস্বরে সন্দেহ, কৌতূহল। নিবিড় দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,
” না। শারীরিক সম্পর্ক তো দূর। আজ পর্যন্ত তোমার বোনের হাতটাও স্পর্শ করিনি। ”

কোমলের চোখে, মুখে বিস্ময়ের আভা স্পষ্ট হয়ে হারিয়ে গেল। নীরব দৃষ্টিপাত করে দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়ালে নিবিড় চটজলদি সুধাল,
” আমাকে অবিশ্বাস করছ? ”

সে তাৎক্ষণিক ফিরে শান্ত স্বরে বলল,
” এখানে বিশ্বাস- অবিশ্বাস শব্দদুটো আসছে কেন? অনড়া কোনো পরনারী বা পরস্ত্রী নয়৷ তোমার বিবাহিত স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রী একই সাথে থাকবে, একে-অপরকে ভালোবাসবে। তার চিহ্ন হিসেবে কোলে সন্তান আসবে। এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার, প্রকৃতির নিয়ম। পুরো দুনিয়া এ নিয়ম মেনে নিয়েছে। তাহলে তুমি, আমি কেন মানতে পারব না? ”

নিবিড় অধৈর্য্য হয়ে পড়ল। খানিক উত্তেজিত হয়ে বলল,
” দুনিয়া ছেড়ে নিজের স্বামীর দিকে তাকাও। ভালো করে দেখে বলো, এই মানুষটা কি তার বিবিকে ছাড়া অন্য কাউকে স্পর্শ করতে পারে? ভালোবাসতে পারে? ”

কোমল গভীর দৃষ্টিতে তাকে অবলোকন করলেও নিরুত্তর থাকল। নিবিড় অবিচল হয়ে বলল,
” যে সন্তানের শরীরে আমার বিবির রক্ত-মাংস থাকবে না সে সন্তান আমি কখনই গ্রহণ করব না৷ আজীবন নিঃসন্তান থাকব। ”

স্বামীর এমন অটল সিদ্ধান্তে কোমলের দৃষ্টি কেঁপে উঠল। বিদ্রোহী সুরে বলল,
” তোমার দিকে তাকাতে গেলে অনড়ার দিকেও তাকাতে হয়। যদি সত্যি কিছু না হয়ে থাকে তাহলে এই বাচ্চার ব্যাপারটি আসল কেন? ”
” তোমার বোন ইচ্ছে করে এনেছে। মিথ্যা বলে সকলের নজরে আসতে চাচ্ছে। সহানুভূতি পেতে চাচ্ছে। ”
” নিজের প্রেগন্যান্সি নিয়ে কোনো মেয়ে মিথ্যা বলতে পারে? তাও আবার অনড়ার মতো শিক্ষিত, বুদ্ধমতি মেয়ে। ও ঠিক ভালো করেই জানে, এটা পুতুল খেলার মতো একবেলার বিষয় নয়। সারাজীবনের। ”
” ওর কাছে পুতুল খেলার মতোই। আর সেই পুতুলটি তুমি। যা বলছে, তাই বিশ্বাস করছ। ”

কোমলের দেহভঙ্গি ঢিলে হলো, চাহনি নরম হলো। নিরুত্তাপ গলায় বলল,
” ও আমাকে মিথ্যা বলতে পারে না। ”
” আর যদি সত্যি বলে থাকে তাহলে সেই বাচ্চার বাবা আমি না। ”
” এটা আবার কেমন কথা? তুমি নাহলে কে হবে? ”
” সেটা তোমার বোন জানে। হতে পারে ভার্সিটির কোনো বড় ভাই, সহপাঠি অথবা গ্রাম…”

নিবিড় কথাটা শেষ করতে পারল না। কোমলের চোখে চোখ পড়তে ভয় পেয়ে গেল। কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেল। এমন উত্তাপিত চাহনির দর্শন পাচ্ছে এই প্রথম।

” অনড়া আমার শিক্ষায় বড় হয়েছে। ওর চরিত্রে দাগ ফেললে আমার দিকেও ছিঁটে আসবে। কথাটা মনে রেখ। ”

কোমল চুপচাপ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। শাশুড়িকে সংবাদটা দেওয়ার জন্য তার রুমের দিকে পা বাড়াল। মাঝপথে থেমে গেল আচমকা। কী একটা ভাবনায় ডুবে গেল নিমিষেই। আনমনা হয়ে পা ঘুরিয়ে নিল রান্নাঘরের দিকে।

_________
” তোর সেই ‘ চেনা কেউ ‘ এর দেখা পেয়েছিস? ”

সুমনার দুষ্টু খোঁচায় বিরক্ত চোখে তাকাল অনড়া। কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
” যদি খুন হতে না চাস তাহলে এই ব্যাটার নাম ভুলেও মুখে আনবি না। ”

বান্ধুবীর এই ভয়ঙ্কর হুমকিতে সুমনা ভয় পাবে তো দূর মুখের দুষ্টুভাবটাও কাটল না। উল্টো সন্দেহি সুরে বলল,
” চিঠির কোথাও তো প্রেরকের নাম ছিল না। তুই বুঝলি কী করে ঐটা ব্যাটা মানুষ? মেয়ে মানুষও তো হতে পারে। ”

অনড়ার হালকা রাগ এবার ভারী হয়ে ওঠল। বই-খাতা ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল,
” মেয়ে মানুষ হলে সামনে মুখ দেখিয়ে নোট দিয়ে যেত। এত রঙঢং করে চিঠি লিখে দিত না। ”

বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে ফেলে হাঁটা ধরলে সুমনা পিছু নিয়ে বলল,
” চলে যাচ্ছিস যে? ক্লাস করবি না? এই শোন না। আচ্ছা, ঐ ব্যাটার কথা বলব না আর। এইটুকুতে এত রাগ করলে চলে? ”

অনড়ার পা থামল না। ছুটে বেরিয়ে এলো সিঁড়ির মুখে। ফড়িংয়ের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ির ধাপ পার হচ্ছিল। হঠাৎ নিবিড়কে দেখতে পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। অসাবধানতায় পা পিছলে গড়িয়ে পড়ল নিচে। সেই অবস্থায় তাকাল নিবিড়ের দিকে। চোখের ভুল নয় সত্যি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। জিজ্ঞেস করল,
” তুমি এখানে কী করছ? ”
” কোমলকে কী বলে এসেছ? ”

নিবিড়ের পাল্টা প্রশ্নে থতমত খেল। একটু ভয়ও টের পেল বুকের কোথাও। মাটি থেকে উঠে ময়লা পরিষ্কার করতে করতে নিচু স্বরে বলল,
” যা সত্যি তাই বলেছি। ”
” প্রমাণ দেও। ”
” ঠিক আছে। হাসপাতালে চলো। আমাকে টেস্ট করাও। রিপোর্ট দেখলেই বুঝতে পারবে আমি সত্যি বলছি নাকি মিথ্যা। ”

সে নিরুদ্বেগ। কণ্ঠে প্রবল আত্মবিশ্বাস। ময়লা পরিষ্কার করে ব্যাগটা ভালো করে কাঁধে বসাচ্ছিল তখনই বামহাতের কব্জি চেপে ধরল নিবিড়। জোর করে টেনে ধরে হাঁটা শুরু করলে সভয়ে জিজ্ঞেস করল,
” সত্যিই হাসপাতালে নিয়ে যাবে নাকি? ”
” না। ”
” তাহলে? ”

নিবিড় একটু থামল। অনড়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বলল,
” তোমার প্রেগন্যান্সি নিয়ে আমার কোনো মাথা-ব্যথা নেই। তাই ওটার প্রমাণও দরকার নেই। আমি শুধু চাই, তুমি কোমলকে বলবে, এই বাচ্চা আমার না। আমাদের সেইরকম কিছু হয়নি। ”
” আমাদের মধ্যে সব হয়েছে। তার প্রমাণ এই বাচ্চা। যার বাবা হবে তুমি। ”

কথাটা ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়তে নিবিড় সজোরে চড় মেরে বসল অনড়ার বামগালে। প্রচণ্ড রাগে চিৎকার করে বলল,
” কোমলের বোন না হয়ে যদি অন্য কেউ হতে তাহলে…”
” তাহলে কী? মেরে ফেলতে? ”

নিবিড় উত্তর দিল না। তার চোখ-মুখে রক্তিম আভা। চোয়াল শক্ত হয়ে মৃদু কাঁপছে। অনড়ার হাত ধরে সামনে এগুতে ধরলেই দেখল, বেশ কিছু ছেলেমেয়ে তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। অনড়া কুটিল হেসে কানের কাছে ফিসফিসে বলল,
” বুবুর স্বামী না হয়ে যদি অন্যকেউ হতে তাহলে আজ গণধোলাই খেয়ে অক্কা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।

নিজ হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে আবারও বলল,
” বুবুর ইচ্ছেতে তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম তাই চুপচাপ বেরিয়ে এসেছি। তোমার ইচ্ছেতে যদি যাই তাহলে লাশ হয়ে বেরুব। তাই সাবধান থেকো। ”

অনড়ার ঠাণ্ডা কণ্ঠের হুমকি নিবিড়ের ভেতরটাকে নাড়িয়ে ছাড়ল।

________

নিবিড় দুপুরে খেতে আসেনি। সন্ধ্যা পার হওয়ার পরও বাসায় ফিরেনি। সেকেন্ডের কাঁটা যত ঘুরছে কোমলের মনে তত উদ্বেগ বাড়ছে। কুলসুৃম নাহার একটু পর পর ছেলের খোঁজ চাচ্ছেন। ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা দশটায় পৌঁছাতে কোমল অস্থির হয়ে পড়ল। এক জায়গায় বসে থাকতে পারছে না। ঘর থেকে বের হয়ে দরজা মেলে বাইরে দৃষ্টি ফেলে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। নিবিড়ের আসার কোনো লক্ষণ না পেয়ে মোবাইল তুলে নিয়ে কল লাগাল দুলালের নাম্বারে। তিনি রিসিভ করতেই জিজ্ঞেস করল,
” ও কি আপনার বাসায়? ”
” না, আজ আসেনি। কেন বলো তো? ”
” এত রাত হয়ে গেল, এখনও বাসায় ফিরেনি। ”

দুলাল একটু চুপ থেকে বললেন,
” চিন্তা করো না। কোনো জরুরি কাজ আছে মনে হয়। আমি একবার হাসপাতাল থেকে খোঁজ নিয়ে আসছি। ”

চলবে

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ