Friday, June 5, 2026







ফুলকৌড়ি পর্ব-৪+৫

#ফুলকৌড়ি
(৪)
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম

নিভানের সাথে কথা বলার একপর্যায়ে জাহিদ সাহেব লক্ষ্য করলেন,নিভানের চোখজোড়ার রক্তিম আভা।ছেলেটা কি কোনো কারনে অসুস্থ!প্রশ্নটা মনেমনে আওড়াতেই সংগোপিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।এই ছেলে নিজের ভালোমন্দটা সহজে কখনো কারও সামনে বুঝতে দিতে চায়না আর বহিঃপ্রকাশ করা তো দূর।করে-ও না।এই যেমন এখন,ভিতর অসুস্থতাবোধ করছে অথচ বাহিরটা কতোটা স্বাভাবিক রেখে উনার সাথে কথা বলে চলেছে ছেলেটা।মনেহচ্ছে সুস্থ সবল একজন মানুষ।অথচ নিভানের প্রতি সন্তান হিসাবে স্নেহ ভালোবাসা ছাড়াও উনার আলাদা একটা টান,মায়া রয়েছে।মনের ভিতরে দৃঢ়ভাবে কাজ করে সেই মায়া,সেই তীক্ষ্ণ টান।সেই মায়ার টান থেকে তিনি নিভানকে কিকরে জেনো বুঝে নিতে পারেন।নীহারিকাকে নিজের জীবনে জড়ানোর সাথে সাথে নীহারিকার এই অতি মূল্যবান রত্নটাকে-ও তো তিনি নিজের ভেবে নিয়েছিলেন।সেই মায়া,টান থেকেই তো নিয়েছিলেন।যদিও উনার মা সেটা চাননি।
নিজের অবিবাহিত সুদর্শন ছেলের জন্য হাজার বুঝিয়ে কোনোমতে নীহারিকাকে ছেলের বউ মানতে চাইলেও,নিভানকে ছেলের বাচ্চা হিসাবে মানতে চাননি।তবে নিজের ছেলের জেদের কাছে হয়তো হার মেনে গিয়েছিলেন।

‘তোমার কি কোনো কারনে শরীর খারাপ?

মাথাতো যন্ত্রণায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম।তখন রানীসাহেবা কফিতো দিয়ে গিয়েছিলো কিন্তু তা আর
খাওয়া হয়ে উঠেনি,মান্যতার গলা ফাটিয়ে চিল্লানোর কারনে।রুম থেকে বের হয়ে চিল্লানোর কারনটা জানার আগেই নাফিমের সাথে দেখা হলো।ওর সাথে কথা বলে রুমে গিয়ে দেখলো কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে।রানীসাহেবা কে দিয়ে আবার কফি বানানোর আগেই জাহিদ সাহেব ডেকে পাঠালেন তাকে।তাই আসতেই হলো।অসহ্য মাথা যন্ত্রণা করছে।তবুও স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো নিভান।

‘তেমন কিছু না, আপনি কি বলছিলেন বলুন।

নিভানের এই অতি স্বাভাবিক থাকা জিনিসটা মাঝেমাঝে জাহিদ সাহেবের মেনে নিতে খারাপ লাগে।তবে ছেলেটার স্বভাবই যে এটা।দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।ফের বললেন—তুমি কোনো যন্ত্র নও নিভান।তুমি সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ।আর সেই মানুষের ভালো লাগা,খারাপ লাগা থাকবে।ভালোমন্দ সুস্থ অসুস্থতা সকল প্রকার অনুভূতি থাকা স্বাভাবিক।সেখানে নিজেকে এতো চেপে রাখা উচিত নয়। রাখলে চলে-না।নিজের ভালোমন্দ অনুভূতিগুলাো সবার কাছের প্রকাশ না করা গেলেও অর্থাৎ প্রকাশ করতে তুমি না চাইলেও, নিজের জীবন থেকে বন্ধুসুলভ কাওকে না কাওকে বেছে নিয়ে সেই ভালোমন্দ অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা উচিত।সেটা বাবা,মা ভাই, বোন অথবা তোমার জীবনের একান্ত কোনো ব্যক্তি যেকেউ হতে পারে।তবুও বলতে হয়।নিজের জীবন নিয়ে এতোটা বেখেয়ালি বা অনুভূতিশূন্য হলে চলে না।

থামলেন জাহিদ হাসান সাহেব।আজ নুতন নয়,নিভানের নিজের প্রতি এই আচারনের জন্য এরকম উপদেশ আদেশ প্রায়শই তিনি দিয়ে থাকেন।তবে ছেলেটা বরাবর চুপচাপ শোনে।অতঃপর যা তাই।নিভানের শিথিল হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ফের বললেন।–আমার মনেহচ্ছে তুমি মাথাব্যথার অসুস্থতা অনুভব করছো।যাও গিয়ে রেষ্ট নাও।এবিষয়ে আমি পরে তোমার সাথে কথা বলে নেবো।

হুমম”শব্দটা উচ্চরন করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে, টুল ছেড়ে উঠে দাড়ালো নিভান।ফের লম্বা কদম ফেলে কয়েক পা সামনে আগাতেই পিছন থেকে ফের জাহিদ সাহেব ডেকে উঠলেন তাকে।

‘নিভান।

হয়তো পিছে ডাকা মানুষটা তাকে পুনরায় ডেকে কি বলতে চাইছে এটা নিভানের জানা।চোখজোড়া বন্ধ করে শ্বাস ফেলে ততক্ষণাত আবার চোখজোড়া খুলে ফেললো সে।নিভান পিছে ফিরতেই জাহিদ সাহেব কিছুটা স্নেহশীল গলায় বললেন।

‘আমি তোমার বাবা।সেটা তুমি মানো কি না তা আমার বিশেষ জানা নেই,তবে আমি মানি।বাবা ছেলের সম্পর্কের জোরে বলছিনা,নিজেকে তোমার একজন বন্ধুসূলভ আপনজন ভেবে তোমার ভালোমন্দের অনুভূতিটা আমাকেও জানাতে পারো।নির্দ্বিধায় বলতে পারো তোমার ভালোমন্দটা আমাকে।

উত্তর সরূপ নিভান ফের মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো।সেদিকে নির্বাক নজরে তাকিয়ে রইলেন জাহিদ সাহেব।আপন রক্ত বলতে নিজের দুই সন্তান আছে উনার,মান্যতা আর ইভান।তবুও এই ছেলের মুখে বাবা ডাকটা শোনার জন্য কেনো এতো আকুল উনার হৃদয় গহ্বর।কেনো ব্যাকুলতাভাবে শুনতে চায় সেই ডাকটা মন।এটাই বুঝতে পারেন না তিনি।নীহারিকার সাথে সেই ছয় বছর বয়সে নিভান এবাড়িতে পা রেখেছিল, এসেছিলো।সেখান থেকে কতোগুলো বছর চলে গিয়েছে,অথচ কখনো নিভান তাকে ভুলেও বাবা ডাকেনি।শান্ত,গম্ভীরভাব অতটুকু ছেলে কি বুঝতো,না বুঝতো উনার জানা নেই।তবে কখনো ভুলেও বাবা বলে ডাকেনি।উনার প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান হয়তো যথাযথ দেখিয়ে গিয়েছে,কখনো তা ক্ষুন্ন করেনি।উনার আদেশ উপদেশ মেনেছে।কিন্তু সেই বাবা ডাকটা ডেকে নয়।কেনো ডাকেনা নিভান উনাকে বাবা?ভুলেও তো দু-একবার ডেকে ফেলা যায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে বেডের হেডে মাথা এলিয়ে দিলেন জাহিদ সাহেব।
তবে কি বাবা নামক আচার ব্যবহার কোনো ক্রুটি থেকে গেছে উনার?

‘এতো তাড়াতাড়ি কথা শেষ হয়ে গেলো আপনাদের?

মূহুর্তেই বিষন্নতা কাটিয়ে নীহারিকা বেগমের লাবণ্যময় মুখের দিকে তাকালেন জাহিদ সাহেব।মূহুর্তেই বিষন্নতা কেটে গেলো উনার।বয়স বেড়েছে,তিন ছেলেমেয়ের মা হয়ে গিয়েছে।একটা গোটা সংসারের খেয়ালধ্যান, নিয়ন্ত্রণ কর চলেছে।অসুস্থ একজন রুগ্ন ব্যক্তিকে টেনে চলেছে বছরের পর পর।অথচ রূপ লাবন্যে কোথাও সেই বয়স, পরিশ্রমের ঘাটতি নেই।এই লাবন্যময়ী নারীর সেই আঠারো পার হয়ে গিয়েছে আড়াই যুগ আগেই। অথচ সেই রূপ সেই লাবন্য।বেশী হয়েছে ছাড়া, ঘাটতি পড়েনি।এই মুখটা দেখলে,সব কষ্ট, বিষন্নতা কেটে গিয়ে শান্তি ভর করে মনে।

‘ওকে এককাপ আদা চা বানিয়ে দাও নীহারিকা।

‘কাকে?

‘নিভানকে।ছেলেটার মাথা ধরেছে মনেহয়।

শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নীহারিকা বেগম।এই ছেলেকে নিয়ে আর পারলেন না তিনি।কাওকে না বলা যায়,মাকে তো নিজের ভালোমন্দটা একটু জানানো যায়।তবুও জানাবে না।এই মানুষটাকেও,নিভান নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছে বলে-তো মনেই হয়-না নীহারিকা বেগমের।নিশ্চয় উনার মতো নিভানের চোখমুখের হাবভাব দেখে বুঝেছেন মানুষটা।নীহারিকা বেগম বাহিরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ফের জাহিদ সাহেবের দিকে ফিরলেন।জাহিদ সাহেবের কোলের মধ্য এলোমেলো কাগজের মেলা দেখে বললেন।

”কিসের কাগজপত্র ওগুলো?

এলোমেলো কাগজগুলো ফের ফাইলে গুছিয়ে রাখতে রাখতে জাহিদ সাহেব বললেন–আহসানের হাইস্কুলের বেতন বিষয়ক চেক,আরও অনন্য বিভিন্ন কাগজপত্র আর ওর নিজের সেভিংসের কিছু চেকবই, কাগজপত্র। ওর নামের জমির দলিলপত্রও আছে দেখছি।নিভানকে দিয়ে পাঠিয়েছেন চাচিমা।

কপাল কুঁচকে এলো নীহারিকা বেগমের।–কিন্তু এগুলো কেনো দিয়েছেন?

‘জানিনা।হয়তোবা নিজের অনন্য ছেলের লোভের হাত থেকে নিজের আদরের নাতনির হকটা বাঁচাতে।যাতে কৌড়ির হক নষ্ট না-হয়।তবে আমার মনেহয় চাচিমার এগুলো পাঠানো ঠিক হয়নি।প্রয়োজন ছিলো-না।

‘আপনার মনেহচ্ছে প্রয়োজন ছিলোনা তবে এবাড়িতে মেয়েটার বাঁচার জন্য আমার মনেহয় কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন।চাচিমা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন।

নীহারিকা বেগমের কিছুটা ক্ষোভান্বিত গলায় বলা কথাগুলো অর্থ হয়তো কিছুটা বুঝলেন জাহিদ সাহেব।তাই ওবিষয়ে আর কথা বাড়ালেন-না।নীরব ভুমিকা পালন করলেন।সেটা বুঝে নীহারিকা বেগমও চুপ হয়ে গেলেন।এবাড়িতে যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য স্বীকার নিভান অথবা তিনি হয়েছেন।তাতে তো এই মানুষটার কোনো দোষ নেই।তবে কেনো কথার ছল বুঝিয়ে তাকে দোষটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন।কথা ঘুরানোর জন্য তিনি জাহিদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

‘মেয়েটাকে এখানে পাঠানোর বিশেষ কারনটা কি বললেন না-তো?তখন চাচিমা কিসব বললেন আমি ওই ছেলেটার বিষয় ছাড়া ঠিক বুঝতে পারিনি?ব্যাপারটা ঠিক কি?

‘তুমি নিভানকে চা বানিয়ে দিয়ে এসো তারপর বলছি।

চমকে উঠার মতো করে নড়ে উঠলেন নীহারিকা বেগম।কথায় কথায় ছেলেটার কথা ভুলে বসেছেন তিনি।আর কথা না বাড়িয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।সেদিকে তাকিয়ে নির্বিশেষে রইলেন জাহিদ সাহেব।

.

রান্নাঘরে আসতেই রানীকে কফি বানাতে দেখলেন নীহারিকা বেগম।জিজ্ঞেস করতেই বুঝতে পারলেন কফিটা নিভান চেয়েছে।কফিটা বানানো শেষে তিনিই, নিভানের ঘরে সেটা নিয়ে গেলেন।ঠান্ডা পরিবেশের রুমটায় চারদিকের জানালা দরজায় ভারী ভারী পর্দা ছড়িয়ে থাকার কারনে,এই শেষ দুপুরের দিকেও ভর সন্ধ্যাবেলার মতো লাগছে।ভিতরে ঢুকতেই নীহারিকা বেগম মৃদুস্বরে নিভানকে ডাকলেন।

‘নিভান।

‘মা, আমি এখানে।

গলার স্বর পেয়ে নিভানের বেডের দিকে এগিয়ে গেলেন নীহারিকা বেগম।নিভানকে মাথা চেপে ধরে বসে থাকতে দেখে কফিটা দ্রুত বেড টেবিলের উপর রেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন।

‘ও বাবু, মাথা বেশি ব্যথা করছে?আমাকে বলিস নি কেনো?এতো ব্যথা করছে তবে ঔষধ খাসনি?

‘এই একটু ধরেছে মাথাটা, ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই।ঠিক হয়ে যাবে।

‘একটু কি কেমন সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি।হয়তো তোদেরকে সময়টা ঠিকঠাক আমার দেওয়া হয়ে উঠেনা, দিতে পারি-না আমি কিন্তু তোদের ভালোমন্দটা বোঝার ক্ষমতা তো এই মায়ের আছে।ঠিক বুঝতে পারি আমি।

কথা না বাড়িয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো নিভান।ছেলের কালো ঘনো চুলের ভারী শক্তপোক্ত মাথাটা কোলের মধ্যে অনুভব হতেই পরাণ চড়াৎ করে কেঁপে উঠলো নীহারিকা বেগমের।কতোদিন পর ছেলেটা উনার কোলে মাথা রেখে শুয়েছে।নিশ্চয় ছেলেটার শরীর বেশি খারাপ লাগছে?অতিরিক্ত শরীর খারাপ ছাড়াতো ছেলেটা সহজে মায়েদের সান্নিধ্যে চায় না।নিভানের ঘন-কালো চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে দিলেন।হালকা নড়াচড়া করতে করতে বেশ নমনীয় গলায় বললেন।

‘শুয়ে পড়লি যে,কফিটা খাবি-না?

‘লাগবেনা।তুমি যেভাবে মাথার চুলগুলো নড়াচড়া করছো ওভাবে কিছুক্ষণ নড়াচড়াকরতে থাকো।কফিটা আর লাগবেনা।

চাপা শ্বাস ফেলে নিভানের মাথার চুলগুলো আলতো হাতে নড়াচড়া করতে লাগলেন নীহারিকা বেগম।হালকা রূপে পর্দার ফাঁক ঘেঁষে আসা মৃদু আলোতে নিভানের মুখটা ঠিকঠাক দেখতে পেলেন না তিনি।তবুও সেই মায়ামায়া শ্যামবর্ণ মুখের দিকে নিটোল নজরে তাকিয়ে রইলেন।উনার আর দুই ছেলেমেয়ের গায়ের বর্ন বিদেশিনীদের মতো গৌররঙা অথচ নিভানের গায়ের রঙটা শ্যামবর্ণ হলেও তার চেহারায় আলাদা অদ্ভুত এক মায়া ছড়িয়ে আছে।শক্তপোক্ত চোয়ালের গম্ভীর চোখমুখের দিকে তাকালে আলাদা টান শান্তি অনুভব হয়।সেই মায়া টান অন্যদের গাৌররঙা মুখয়াবয়ে তিনি খুঁজে পাননা।যদিও সকল সন্তানদের প্রতি স্নেহ মমতা উনার সমান।তাদের সবাইকে তিনি সমানরূপেই ভসলোবাসেন।তবে নিভানের প্রতি মায়া টানটা জেনো অন্যরকম।হয়তো মা ডাকটা তিনি এই ছেলের মুখে প্রথম শুনেছিলেন তাই।নারীত্বের যে মা হওয়ার বড়সড় অনুভূতিটাও তো তিনি এই ছেলে জন্ম হওয়ার মধ্যেমেই লাভ করেছিলেন।তবে ছেলেটা এই মায়ামায়া চেহারাটা পেয়েছে,তার বাবার চেহারার মতো।সংগোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নীহারিকা বেগম।তবে নিষ্পলক নজর নিভিনের আবাছা মুখাবয়ব থেকে সরালেন না।
ডাকলেন তিনি।

‘ও বাবু।

ছোটো করে ডাক শুনলো নিভান।–হুমম।

‘তোর তো ঠিকঠাক খেয়াল,খোঁজখবর রাখতে পারিনা আমি।ও বাবু একটা বিয়ে করে ফেল-না।বয়স তো কম হলোনা।

নীহারিকা বেগমের কথায় নীরব থাকলো নিভান।সময় গড়াতেই ছেলেকে উত্তর দিতে না দেখে ফের নীহারিকা বেগম বললেন।–কি-রে আমি কি বলছি শুনছিস?

নিভান ফের ছোটো করে উত্তর দিলো–হুমম।

‘কি হুম হুম করছিস।বয়স কতো হয়েছে খেয়াল আছে?এবার একটা লাল টুকটুকে বউ এনে দেনা ঘরে।যে তোর খুব খেয়াল রাখবে।আর সেটা দেখে আমি একটু নিশ্চিতে থাকবো।যে আমার ছেলেটার ভালোমন্দের খেয়াল রাখার একটা সুনিশ্চিত মানুষ হয়েছে।

উত্তর দিলো না নিভান।সেটা দেখে নীহারিকা বেগম মিছেমিছি বিরক্ত দেখিয়ে বললেন—কি হলো?বল না, মেয়ে দেখবো?

ঠান্ডা অথচ গম্ভীর গলায় বললো নিভান।–আমি আমার ভালোমন্দের খেয়াল রাখতে জানি,মা।সেখানে তোমার ছেলের খেয়াল রাখার জন্য দ্বিতীয় কারও প্রয়োজনীতা তো দেখছি না আমি।যেদিন প্রয়োজনীতা অনুভব করবো,সেদিন না হয় ভেবে দেখবো।

‘বয়স কতো হয়েছে খেয়াল আছে তোর?প্রয়োজন নেই মানে কি?তুই কি এখনো দিবার বিষয়টা নিয়ে আপসেট আছিস?

যদিও উত্তর দিতে ইচ্ছে করলো না নিভানের।কিন্তু দিবাকে সে নয়, মা তারজন্য পছন্দ করেছিলো।বাড়ির খুব ভালো মেয়ে,বাড়িতেই থেকে যাবে।আর সে দীবাকে যাচাই বাছাই না করে মায়ের পছন্দ,সম্মতিকেই স্বকৃীতি দিয়েছিলো।এখন যদি মায়ের কথার উত্তর না দেয় নিভান।তবে মা যে তার আরও মন খারাপ করবেন।তাই সময় নিয়ে ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো—আপসেট থাকার মতো কি এমন হয়েছে!তোমার ছেলেকে এতোটা দূর্বল মনেহয়?সবার নিজস্ব একটা পছন্দ অপছন্দতা আছে। তুমি তাকে ছেলের বউ করতে চয়েছিলে,আর তার তোমার ছেলেকে পছন্দ হয়নি।তাই সে তোমার ছেলের বউ হতে চায়-নি।অন্য কাওকে পছন্দ হয়েছে, আর তারসাথেই সংসার পেতেছে।দ্যাটস সিম্পল সাবজেক্ট।
এখানে আমাকে আপসেট থাকার মতো কি হলো?পছন্দ অপছন্দতা তার-ও থাকতে পারে।তাই বলে সেই বিষয়টা ধরে আমি আপসেট থাকবো,এটা তোমারও মনে হলো কিকরে?

থামলো নিভান।সময় নিয়ে ফের বিরক্তমাখা দৃঢ় গলায় বললো—আর কখনো এবিষয়ে কথা বলতে বা শুনতে চাইনা আমি।ওই বিষয়টা নিয়ে আমাদের কথা এখানেই শেষ।বিষয়টা নিয়ে আর কখনো নড়াচড়া করবেনা।

নিভানের দৃঢ় গম্ভীর গলার কথাগুলো শুনে আর কথা বাড়ালেন না নীহারিকা বেগম।যে বিষয়টা নিভানের পছন্দ নয়,তা নিয়ে দ্বিতীয়বার কথা বলার আগ্রহ সে দেখায় না।পছন্দ নয় তার।তবে নিভানের মতো ছেলের বউ হতে কেউ অস্বীকৃতি জানাবে বা না করতে পারে এটা নীহারিকা বেগমও মানতে ঠিক নারাজ।নিজের ছেলে বলে নয়।তবে নিভানের মতো আলাদা ব্যক্তিত্বপূর্ন ছেলে খুবই কম দেখা যায়।সেই নিভানের প্রতি দীবার চালচলন,চাহুনি,বলা এগুলো দেখেই তো তিনি দীবাকে নিভানের বউ করার প্রস্তাব রেখেছিলেন।যেটা নিভানও ঠিকঠাক জানতোনা।তবে কি কারনে হঠাৎই মেয়েটা নিভানের বউ হতে অস্বীকৃতি জানালো।সিয়ামের সাথে মেয়েটার আগে থেকে সম্পর্ক ছিলো এমনটাও তো নয়।তবে কি কোনোকারনে ডালিয়া মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাহিরের সৌন্দর্য আর অর্থের চাকচিক্যের মোহে ডুবিয়ে দিয়েছে।যার পরিনতি এখন মেয়েটা হয়তো হাড়েহাড়ে অনুভব করছে।

.
সকালবেলা নিজেকে রেডি করে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে যখন বের হচ্ছিলো নিভান।অচেনা একটা নম্বর থেকে কল এলো ফোনে।ফোনটা রিসিভ করতেই বুঝতে পারলো,আহসান আঙ্কেলের আম্মা। বৃদ্ধা মহিলা তার নাতনির সাথে কথা বলতে চান।কালকে নিভান চলে আসার সময় ভদ্রমহিলা তার নম্বরটা নিয়েছিলেন।আর এবাড়ির কারও সাথে আগে সেভাবে উনার যোগাযোগ না থাকায়,নিভানেরই নম্বরে কল করেছেন।

‘দাদু,আমার আপামনিটার সাথে একটু কথা কইয়ে দাও না।ছেড়ি’ডা যে ভালো নেই এইডা আমি জানি।কাল সারাদিন ছেড়িডার সাথে কথা কওয়ার জন্য কলিজাডা আমার ছটফটায়ছে,তয় সুযোগই পাই নাই।এখন একটু কথা কইয়ে দাওনা।

বৃদ্ধা মহিলার আকুলতার কাছে নীরব থাকলো নিভান।তার জীবনে কঠিন ত্রুটিগুলোর মধ্যে একটি হলো,সে কখনো কাওকে স্বান্তনাসরূপ মিষ্টিমিষ্টি বানী আওড়াতে পারে না।এবিষয়ে শূন্য অনুভূতি তার।ভদ্রমহিলা আবার-ও আকুলিত কন্ঠে,নিজের নাতনির সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করলেন।

‘তোমাকে কি বিরক্ত করলাম, দাদু?একটু কি দেওয়া যায় না ছেড়িডার কাছে?

‘আপনি শান্ত হন,আমি দিচ্ছি।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলো নিভান।আশেপাশে নজর দিতেই দেখলো,ড্রয়িংরুমের আশেপাশে কেউ নেই।কি করবে ভাবতে সময় নিতেই দেখলো,মান্যতাকে ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে বের হতে।স্বভাব মতোই গম্ভীর গলায় ডাক দিলো নিভান।

‘মান্য।

দাঁড়িয়ে পড়লো মান্যতা। বরাবরই বড় দাদাভাইয়ের ডাকে কলিজা চমকিয়ে উঠে তার।কারন তার ডাকটা মানেই আতঙ্ক!

‘কিছু বলবে দাদাভাই?

বিনাবাক্যে নিজের ফোন মান্যতার দিকে এগিয়ে দিলো নিভান।ভরাট গলায় বললো—ওই মেয়েটার দাদু তারসাথে কথা বলতে চাইছে,ফোনটা দিয়ে এসো তার কাছে।

ফোনটা হাতে নিয়ে চঞ্চল পায়ে চলে গেলো মান্যতা।নিভান গিয়ে বসলো ডায়নিং টেবিলে।নীহারিকা বেগম সেখানে নেই।স্বান্তনা বেগম খাবার রেডি করছিলেন।নিভানকে ডায়নিং টেবিলে বসতে দেখে একটু আশ্চর্য হলেন।রাতের খাবার টেবিলে ছাড়া নিভানকে সহজে ডায়নিং টেবিলে দেখা যায় না।তবে স্বভাবসুলভ নিজের মৃদু হাসিটা একঝলক মুখে ফুটিয়ে খাবার দিতে ব্যস্ত হলেন।আজ আপতত সকালের ডায়নিং টেবিল ফাঁকা।
মৌনতা আর নাফিম হয়তো খেয়ে স্কুলে চলে গিয়েছে। সকাল সাড়ে আটটা থেকে তাদের স্কুল।মান্যতা হয়তো যাবার জন্য খেয়েদেয়ে বের হচ্ছিলো।আর ইভান?তার হয়তো কাল মাস্টার্সের এক্সাম শেষ হওয়ায়,রিলাক্সে নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে।আজ হয়তো তার সকাল হবে দুপুর দু’টো অথবা তারও পরে।জাহিদ সাহেবেরা চার ভাই।সম্পর্কের টানাপোড়েনে শুধু দু’ভাই এবাড়িতে থাকেন।জাহিদ হাসান আর উনার ছোটভাই শাহেদ হাসান।আপতত শাহেদ হাসান বাড়িতে নেই।অফিসের কাজে শহরের বাহিরে অবস্থান করছেন।নাহলে সকালের এই সময়টাতে তাকে-ও ডায়নিংয়ে পাওয়া যায়।

সকালে নিজের ইচ্ছাধীন নাস্তাটা,স্বান্তনা রহমান সামনে দিতেই খাবারে মনোযোগ দিলো নিভান।

.

মান্যতা গিয়ে কৌড়ির কাছে ফোনটা দিলো।কে ফোন দিয়েছে সেটাও বললো। ফোনটা কানে পাশে ধরতেই আচমকা একটা কড়া মিষ্টি সুবাস কৌড়ির নাক ছুঁয়ে মস্তিষ্কে গিয়ে বিধলো।সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠলো তার।এই সুগন্ধটার তীক্ষ্ণ সুবাসটা,সে আগেও অনুভব করেছে।কখন?কাল!হ্যা কাল সারাপথ এই সুবাসিত গন্ধটা তার নাকের চৌধারে ঘুরে বেড়িলছে।যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই মানুষটার পাশ থেকে দূরে গেছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই সুবাসটা ছড়িয়ে ছিলো তার আশপাশ।তবে ফোনটা কি সেই মানুষটার?

‘ও আপা।খুব রাগ হইছে এই দাদিআপার উপর?কথা কইবি না?ও আপা কেমন আছিস তুই?

চমকে উঠলো কৌড়ি!কোন খেয়ালে ডুবে ছিলো সে!ওপাশে যে দাদিআপা এক নাগাড়ে কথা বলে চলেছে তবুও সেদিকে খেয়াল নেই তার!খেয়াল হতেই ওপাশের মানুষের কথাতে মনোযোগী হলো।দাদিআপার আদূরী ডাকের কথাগুলোয় অভিমান হলো খুব।অভিমানী গলায় বললো।

‘তুমি একটুও ভালো না দাদিআপা।আমাকে কেনো এখানে পাঠিয়ে দিলে।আমার তোমাদের ছাড়া থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে।তুমিও ভালো নেই বলো,দাদিআপা?ও দাদিআপা আমাকে ছাড়া থাকতে পারছে তুমি?আমার যে তোমাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আমাকে নিয়ে যাওনা দাদিআপা।বাবা নেই তো কি হয়েছে আমি তোমার সাথে থাকতে পারবো।

কথাগুলো বলতে বলতে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো কৌড়ি।
মাজিদা খাতুন ওপাশে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।ফের নাতনিকে স্বান্তনা দেওয়ার কথায় লেগে পড়লেন।
মাাজিদা বেগমের বিভিন্ন বুঝদার কথায় একপর্যায়ে শান্ত হলো কৌড়ি।ওদিকের হালচাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও, তিনি সেভাবে উত্তর দিলেন না।তবে কথা শেষ করার আগে কৌড়িকে,ভালোভাবে চলাফেরা করার বেশ আদেশ উপদেশ দিলেন।সংযাত হয়ে ভেবেচিন্তে চলতে বললেন।যাতে পরের বাড়িতে কেউ খারাপ না বলে।যে উপদেশ নিষেধগুলো তিনি সবসময় কৌড়িকে দিয়ে থাকেন,সেগুলো দিয়ে একপর্যায়ে ফোন রাখলেন।

IPhone 15 PRO Max ফোনটার একের পর এক চেঞ্জ হওয়া স্কিন ফটো গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো কৌড়ি।
নজর ফোনের দিকে থাকলেও,ভাবনা তার দাদিআপার এড়িয়ে যাওয়া কথাগুলোয়।তাঁকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়য় ভালো রেখেছে কি,দাদিআপাকে ওই মানুষগুলো?যদি-ও নিজের আপনজন তারা?তবে তাদের স্বার্থপর কথাবার্তা,অতিলোভ,ব্যবহার নিজের আপনজন বলে তো পরিচয় দেয়না।সেখানে ওই বৃদ্ধা দাদিটা তার ভালো আছে কি?

‘মান্য, আমার অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে।ফোনটা দাও।

জলদগম্ভীর ভরাট গলায়,ভুত দেখে লাফিয়ে উঠার মতো চমকে উঠলো কৌড়ি।ফোনটা হাত থেকে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো।এরকম গম্ভীর গলা কারও হতে পারে জানা ছিলোনা কৌড়ির।তাকে থাকতে দেওয়া রুমের দরজায় সামনে থেকে গলার স্বরটা আসছে।তড়িৎ গতিতে রুমের আশেপাশে।কৈ মান্যতা আপুতো কোথাও নেই।কাল বিকাল থেকে সারারাত মান্যতা নামে আপুটা ছিলো তারকাছে।বিধায় আপুটা সম্পর্কে একটু জানাশোনা হয়েছে তার।কিন্তু মান্যতাকে কোথাও না দেখে,ফোনটা নিজে গিয়ে দেবে কি-না ভেবে পেলোনা।তারমধ্যে নিভান আবারও ডাকলো মান্যতাকে।তবে এবার গলা কিছুটা শান্ত তবে গম্ভীর।

‘মান্য।

নিশ্চয় মান্যতা ভিতরে নেই।নাহলে তার এক ডাকে সাড়া দেবে না।এটা হতেই পারেনা।তাই গলার স্বরটা নরম করে রুমে যে আছে,ফোনটা নেওয়ার জন্য তাকে উদ্দেশ্য করে মান্যতাকে ডাক দিলো সে।ফের মান্য ডাকটায় উঠে দাঁড়ালো কৌড়ি।চঞ্চল পায়ে এগিয়ে গেল ফোনটা দেওয়ার জন্য।পর্দার ফাঁক থেকে ফোনটা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কৌড়ি।অথচ ফোনটা ধরলো না কেউ।ক্ষীন সময় পার হওয়ার পর কথা বলতে উদ্যোক্ত হলো কৌড়ি।তার আগেই ছো মেরে তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ধপাধপ পা ফেলিয়ে কেউ চলে গেলো।আশ্চর্য হলো কৌড়ি।মনেহলো,ফোনটা নেওয়ার অপেক্ষার জন্য,তাকে অপেক্ষা করিয়ে শোধ নেওয়া হলো।অদ্ভুত মানুষ তো!

চলবে……

#ফুলকৌড়ি
পর্ব(৫)
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম

বিশাল বড়ো দোতলা বাড়িটা এখন ফাঁকা।কোথা-ও কোনো শব্দ নেই।বাড়ির ছেলেমেয়ে গুলো বাড়িতে না থাকলে,এই নীরব পরিবেশটা বিরাজ করে।তরকারির শেষ বাটিটা ডাইনিং টেবিলের উপর রেখেই,ধপ করে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন স্বান্তনা রহমান।সকাল বেলা থেকে একজন একজন করে খাওয়াতে খাওয়াতে তিনি প্রায়সই ক্লান্ত হয়ে পড়েন,ঠিক ক্লান্ত নয় হাঁপিয়ে উঠেন।বড় ভাইয়ের অসুস্থতার জন্য বড়ো ভাবী এই সময়টা রান্নাঘরে থাকতে পারেন না, দিতে পারেন না।
যদিও চেষ্টা করেন।তবে রানী সবকিছু গুছিয়ে দিলে-ও, এই সকালের সময়টায় বারবার উপর নিচ করে ছেলেমেয়েদের ডেকে তুলে রেডি করে একের পর একজনকে খাইয়ে বের করে দিতে দিতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেন।মেয়েটা উনার কথা মোটামুটি শুনতে মানতে চাইলেও,ছেলেটার যে বাহানাবাজির শেষ নেই।নিজ ইচ্ছায় কখনো ঘুম থেকে উঠবে-না,তাকে ডেকে ডেকে পাগলপ্রায় হয়ে যাওয়ার পর উঠবে।ক্লাস ফোরে পড়া ছেলে এখনো নিজে একা ব্রাশ করবে-না,নিজ হাতে খাবে না।সমস্ত কাজগুলো নিজে গো করবে না, তিনি করিয়ে দিতে গেলে-ও অযুহাত আর বাহানার শেষ নেই।
আর খাওয়ার বিষয়েতো বাহানাবাজিতে সুপার এক্সপার্ট একবারে ডিগ্রীধারী।ছেলের এই সকালবেলার রোজকার বাহানায় তিনি অতিষ্ট হয়ে হাঁপিয়ে যান।তারউপর একেক জনের স্কুল কলেজ, ভার্সিটি, অফিস টাইম আলাদা হওয়ায়, সকাল বেলা আর নিয়ম করে একসাথে খাওয়া হয়ে উঠেনা।যদিও জাহিদ সাহেব সুস্থ থাকাকালিন নিয়মটা বেশ জোরালো ভাবে চলতো।সে যার যখন অফিস আদালত,স্কুল কলেজ টাইম হোক না কেনো।নির্দিষ্ট একটা টাইমে সবাই একসাথে ডাইনিংয়ে হাজির হওয়া,এবং খাওয়া।স্বান্তনা রহমানের খুবকরে মনে হয়,ভাইজানের নিয়মের সিদ্ধান্তগুলো খুবই ভালো ছিলো।হাতাশার শ্বাস ফেলে মাথা কাত করে টেবিলে এলিয়ে দিলেন তিনি।

‘কি-রে, ওভাবে টেবিলে মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়েছিস কেনো?ক্ষুধা লাগছে খেয়ে নিবিতো।নাকি শরীর খারাপ লাগছে?

নীহারিকা বেগমের কথায় মাথা তুলে বসলেন স্বান্তনা রহমান।বললেন– শরীর খারাপ নয়,আর ক্ষুধার জন্যও শুয়ে পড়িনি।আমার ওই বাহানাবাজ ছেলেটা বাড়িতে নেই,তাই ভেবে একটু শান্তি করছি।

‘ওভাবে বলিস কেনো?ও একটু চঞ্চল তবে,আমাদের বাড়ির আশে-পাশের অন্যান্য ছেলেদের মতো অত-শত মাত্রাধিক দুষ্ট তো নয়।

‘তোমার মাত্রাধিক ধৈর্য্য তাই তোমার কাছে ওর দুষ্টিমিগুলা মাত্রাছাড়া মনে হয়না,বুবু।কিন্তু আমার অত ধৈর্য্যসহ্য নেই।তাই আমারও অতশত সহ্য হয়না।কি জ্বালানটা জ্বালায় সারাদিন দেখেছো।ছেলে না হয়ে যদি আরও একটা মেয়ে হতো,কিছুটা শান্তি থাকতে পারতাম।ওর জন্য মাঝে-মধ্যে আমার আর দুনিয়াদারি করার ইচ্ছে করে না।

জাহিদ সাহেবকে খাইয়ে,খাবারের এঁটো পাত্রগুলো নিয়ে আসতেই চলতি পথে কথা হলো দু’জায়ের।ছোটো জায়ের বিরক্তমাখা কথাগুলো শ্রবন করতে করতে রান্নাঘরে ঢুকলেন নীহারিকা বেগম।বললেন।

‘বাড়ির মধ্যে দুই একটা ওরকম না থাকলে চলেনা।তাই বলে তুই যা বলিস,ও অতোটাও না।

স্বান্তনা রহমান আবারও বকা শুরু করলেন।ছেলের চৌদ্দ গুষ্টির ষষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলেন।এবাড়ির কার কার জন্য এই ছেলে এতোটা বাহানাবাজ হয়েছে,বিগড়ে গেছে বলতে লাগলেন।তারমধ্য প্রথম সারিতে নীহারিকা বেগমকেও ছাড়তে ভুললেননা।তাকে দোষারোপ করেও কথা শোনালেন।কথার প্রেক্ষিতে নীহারিকা বেগম শুধু মৃদু হেসে গেলেন।এই দোষারোপের মধ্যে যেও শান্তি আছে।ভালো লাগা আছে।এবাড়ির সব ছেলেমেয়েগুলা যে উনার এক একটা শরীরের অংশ।সেই অংশ গুলো যতক্ষণ আঘাত,কষ্ট না পায় ততক্ষণ তিনি ভালো থাকেন।আর সেই অংশগুলোর মধ্যে থেকে একটা যদি ব্যথা পায়,সামন্য মুরছা যায় তিনিযে কিছুতেই ভালো থাকতে পারেন না।এটাই যে তার সংসার,এই সংসারের প্রানহীন জিনিসগুলোর ব্যথাও যে উনার প্রানে অনুভাবিত হয়।সেখানে এই বাড়ির ছেলেমেয়েগুলোতো উনার সেকেন্ডে সেকেন্ডে চলিত নিঃশ্বাস।স্বান্তনা রহমানকে শাান্ত করাতে প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন।

‘এই ছোটো, আম্মা খেয়েছেন?উনি তো আবার একটু বেলা না গড়ালে খেতে চান না।

ছেলেমেয়েদের বকা যেমন ভাবীর শুনতে ইচ্ছে করেনা।তেমন নিজেও সামন্য দু-একটা ধমক দিলেও,অতিরিক্ত বকেন না।ধৈর্য্য নিয়ে সবকিছু হ্যান্ডেল করেন।কিন্তু এত বছর সেই মানুষটার সান্নিধ্যে থেকে,সবকিছু মোটামুটি আয়ত্ত করতে পারলেও এই অতি ধৈর্য্য জিনিসটা তিনি আয়ত্ত করতে পারেননি।বললে আর চাইলেই কি সবটা হয়!তপ্ত শ্বাস ফেললেন স্বান্তনা রহমান।বাড়ির সবচেয়ে ছোটো সদস্য হওয়ায় নাফিমকে সবাই মাত্রাধিক আদর করে, ভালোবাসে।আর তার সম্পূর্ণ ফায়দা লুটে ওই বদমায়েশ ছেলেটা।ওই বাদর ছেলের বড়োমা বলতে, সব আবদার ওখানে।আর তেনার বড়োমাও তেমন।সেই ছেলের নামে উল্টো পাল্টা কথা ধৈর্য্য নিয়ে শুনবেন।নাহ,তেমনটা কখনো হওয়ার নয়।সে কারনেই যে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলা বেশ বুঝলেন স্বান্তনা রহমান।

‘কোথায় খুইয়ে গেলি?কি জিজ্ঞেস করেছি শুনতে পাস নি।আর রানিও বা কোথায় গেলো?

‘আম্মা এখনো খাননি।আমি জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলাম,উনার রুমে খাবার দিয়ে যাবো কি-না।উনি বললেন ডায়নিংয়ে এসে খাবেন।আর রানীতো কেবলমাত্র ওর রুমের দিকে গেলো।

স্বান্তনা রহমানের কথা শেষ করার আগেই রানী সেখানে হাজির হলো।বললো–কিছু দরকার ভাবীজান?

‘বেলা কতো হলো খেয়াল আছে।রোজরোজ আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে কেনো?তোমরা খেয়ে নিতে পারো না।যাও আম্মাকে ডেকে নিয়ে এসো।

আজ্ঞা পেতেই রানি চলে গেলো।নীহারিকা একটু বিরক্ত হয়ে ফের স্বান্তনা বেগমকে বললেন।–ক্ষুধা লাগলে যে যার মতো খেয়ে নিবি,আর কত বলবো তোদের।আমার জন্য অপেক্ষা করে বেলা গড়ানোর কোনো মানে আছে!

স্বান্তনা বেগম মাথা উঁচু করে এবার চেয়ারে সটান হয়ে বসলেন।বললেন–তোমার জন্য অপেক্ষা করি কে বললো!তুমিতো মানুষ নও, যন্ত্র।তোমার আবার ক্ষুধা, ঘুম,ব্যাথ,খারাপ লাগা ভালো লাগা আছে নাকি।এগুলো আমরা জেনেও তোমার জন্য অযথা অপেক্ষা করতে পারি?তোমার মতো যন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতে আছে নাকি?

রান্নাঘরের এঁটো জিনিসগুলো ধুইয়ে ডায়নিংয়ে এলেন নীহারিকা বেগম।স্বান্তনা বেগমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন।-রেগে যাস কেনো?আচ্ছা আমি অপেক্ষা করতে বলে ভুল করে ফেলেছি।ক্ষমা কর আমাকে।যাই হোক রাগারাগি পরে করিস,বেলা অনেক গড়িয়েছি এবার তো খেতে শুরু কর।

চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে হঠাৎই কৌড়ির কথা মনেহলো উনার।ফের ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন–মেয়েটা খেয়েছে?

হঠাৎ খেয়াল হলোনা স্বান্তনা বেগমের।বললেন–কোন মেয়েটা?

—কৌড়ি।

সকালের এতো ব্যস্ততায় মেয়েটার কথাতো ভুলেই বসেছিলেন স্বান্তনা বেগম।কাল একটা নতুন সদস্য যে তাদের বাড়িতে এসেছে,এটাতো মনেই ছিলো না উনার।মুখটা অসহায় ভঙ্গিমা করে নীহারিকা বেগমের দিকে তাকালেন তিনি।যাতে যা বোঝার বুঝে নিলেন নীহারিকা বেগম।তবুও কৈফিয়তের স্বরে স্বান্তনা’রহমান বললেন।

‘বিশ্বাস করো বুবু,আমার মেয়েটার কথা একটু বলতেও খেয়াল ছিলো না।নাহলে..

কথা শেষ করতে দিলেন না নীহারিকা বেগম।দু বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছে অথচ,স্বান্তনা সেই সদ্য এবাড়িতে আসা কিশোরীর মতোই অবুঝ রয়ে গেছে।অবুঝ থাকারই তো কথা, মেয়েটার মনে যে মারপ্যাঁচ নেই।এতো বছর সংসারে কতো ঝঞ্জাট,উত্থানপতন গেছে,তবুও মেয়েটা আগে যেমন সহজ সরল মনের ছিল।এখনো তেমনটাই আছে।তিনি বললেন।

‘এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের কি হলো?আমি তোকে চিনি না,নাকি জানি না!খেয়াল না থাকতেই পারে,আমারও তো মেয়েটার কথা খেয়াল ছিলো-না।তাই বলে কি সেটা অন্যায় হয়ে গেলো?

‘বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথদ নয়,তবে মেয়েটার কথা-তো খেয়াল রাখা উচিত ছিলো।সেটার জন্য বললাম।

স্বান্তনা রহমানের ছোটো মুখ করে বলা কথাটা শুনে নীহারিকা বেগম সংগোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।মেয়েটা এরকমই।তার ছোটো ভুল গুলোও তার অনেক বড়সড় ত্রুটি বলে মনেহয়।মাঝেমাঝে অন্যায় ভেবেও তো আফসোস করে।নীহারিকা বেগম হাজার বুঝিয়ে পারেন না।অথচ সেই স্বান্তনার সামনে দিয়ে আরও আরেক জা উনার কতো ত্রুটি করে চলে গেলো।সেটা থেকেও শিক্ষা নিলোনা মেয়েটা। বরাবরই উনারই আদর্শ, চালচলনকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করেছে স্বান্তনা। স্বান্তনা বেগমের কাঁধে হাত রাখলেেন তিনি।ফের স্বান্তনা সরূপ বললেন।

‘আচ্ছা ঠিক আছে।সামন্য বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে মুখ ছোটো করার মতো কিচ্ছু হয়নি।আমি দেখছি।

নীহারিকা বেগম কৌড়িকে ডাকতে ছুটলেন।সেদিকে তাকিয়ে রইলেন স্বান্তনা রহমান।কবে যে উনিও একটু সবদিক দিয়ে সবার খেয়াল ধ্যান রাখতে পারবেন।কে জানে?এক ছেলে নিয়েই যেখানে তিনি ধৈর্য্যহারা হয়ে পড়েন,ছেলে কাছে থাকলে তার বাহানায় নিজেকে ভুলতে বসেন।সেখানে সবার খেয়াল খোঁজ রাখা সত্যিই সম্ভব কি?তাহলে নীহারিকা নামক নারীটা পারে কি করে?অসুস্থ স্বামীকে সামলে,এবাড়ির সকল ছেলে-মেয়ের আবদার, চাওয়া, পাওয়া পূর্ণ করতে?যেখানে তিনি স্বান্তনা রহমান এক ছেলের বাহানাবাজিতে কাতর হয়ে পড়েন!পারেন কি করে গোটা সংসারের ভালোমন্দ সবকিছু একহাতে সামলিয়ে,ওই একটা নারীমস্তিস্কে সবার খোঁজ খেয়াল রাখতে?ভাবীর মতো তিনি হতে পারবেন কি-না, জানা নেই।তবে ওই গুনি নারীটির মতো হওয়ার সাংঘাতিক লোভ উনার।বরাবর ওই গুনি নারীটির মতো,উনার গুনে গুণান্বিত হতে চান তিনি।

জানালার গ্রিল ধরে নিজের জীবনের এলোমেলো হয়ে যাওয়া সমীকরণ গুলো নিয়ে ভাবনায় ডুবে আছে কৌড়ি।কাল সে কোথায় ছিলো আর আজ কোথায়?বাবাও তো!কাল তিনি এই সময়টাতে লাশ হয়ে রইলেও দুনিয়ায় বুকে ছিলেন।আর আজ তার মৃত্যুর একটাদিন পার হতে চলেছে।সময়টা কতো দ্রুত চলে যায়।স্রোতের চেয়েও জেনো তার গতিবিধি আরও দ্রুতগামী।কারও কষ্ট, ক্লেশ, যাতনার কাছে, সেই নিষ্ঠুর সময় নামক গতিবিধিটা থেমে নেই,তার জেনো কারও কোনো কষ্ট ক্লেশ, খারাপলাগা ভালোলাগাতে থেমে থাকলে চলেনা।সে তার রবের হুকুমে স্বাধীনচেতা হয়ে আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে।বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো কৌড়ির।সঙ্গে দুচোখ বেয়ে দুফোঁটা নোনা অশ্রু।কারও পায়ের এগিয়ে আসার শব্দ নিজের রুমের পানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বুঝতে পেরেই,সদর্পে দু’হাতে চোখের অশ্রুঝরা মুক্তগুলো মুছে নিলো সে।পায়ের শব্দটা তার পিছনে এসে থামতেই,পিছে ফিরলো।

‘কৌড়ি।তুমি আবার-ও কান্নাকাটি করছো?

ম্লান হাসলো কৌড়ি।নীহারিকা বেগমের কথার জবাব দিতে গিয়েও,দিতে পারলো না সে।মাথা নিচু করে নিল।
পরপর কয়েকটা ঢোক গিলে গলা স্বাভাবিক করে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো—আমি কাঁদছি না-তো।

‘মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে চাইছো?এতো সহজ?

এবার আর চেয়েও কথা বলতে পারলো না কৌড়ি।শুধু মাথা এদিকে ওদিকে নাড়িয়ে না বোঝালো।অর্থাৎ সে মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে চাইছেনা।আর তা যে সহজ কথা নয় সেটাও সে জানে।তবে সে কি করবে,বাবা যে তার পৃথিবীর একাংশ ছিলো।আর সেই অংশবিশেষ ডুবে যাওয়ায়,উনার স্মৃতি স্মরণে কান্নারা সময় অসময়ে এসে ভীড় করছে তার দু-নজরে।তবে সে কি করবে।কৌড়ির পরিস্থিতি বুঝে আর কথা বাড়ালেননা নীহারিকা বেগম। নরম স্পর্শে কৌড়ির হাতটা নিজের হাতের মুঠোই নিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বললেন।

‘এবার কাঁদলে আমি কিন্তু সত্যিই বকা দেবো তোকে।যে সৃষ্টিকর্তার ডাকে চলে যাওয়ার তাকে কি কেঁদেকেটে তুই কোনোমতেও আটকিয়ে রাখতে পারবি,নাকি কেঁদে কেটে ফিরিয়ে আনতে পারবি?তবুও কেনো এতো মন খারাপ করছিস।আমরা আছি তো।

কথাগুলো স্বান্তনা সরূপ বললেও নীহারিকা বেগমও জানেন,বাবা নামক বটবৃক্ষ নিজের জীবন থেকে একবারে মুছে গেলে কেমনটা লাগে,আর কি অন্তর্দাহ হয়।একটু থেমে তিনি ফের বললেন।—আর মন খারাপ করে সারাক্ষণ রুমে বসে থাকলে চলবে?তুইও এখন থেকে আমাদের বাড়ির আরেকটা মেয়ে।খাবিদাবি,সারা বাড়িময়,মান্য মৌনতার মতো ঘুরে বেড়াবি।আমি কি করছি,ছোটো চাচি কি করছে।সব দেখবি,শুনবি তা না।মন খারাপ করে ঘরে বসে আছে মেয়ে।আর সেই কাল এবাড়িতে এসেছিস,এখনো তোর আঙ্কেলের সাথে একবারও দেখা করেছিস?করিস নি।মানুষটা না-হয় চলতে ফিরতে পারেনা বলে তোর সাথে দেখা করতে আসতে পারছে-না।তাই বলে তুই যাবিনা?আমাকে কতোবার বললো,নীহারিকা মেয়েটাকে একবার আমার কাছে নিয়ে এসো।জানিস তুই?কিন্তু তুইতো কান্নাকাটি করতে মহাব্যস্ত, এই অবস্থায় তোর আঙ্কেলের কাছে নিয়ে যাই কিকরে বল? মানুষটা আমাদের বকবে না?যে তোমরা থাকতে মেয়েটা এতো মন খারাপ করার সুযোগ পায় কি করে?তার বকা শুনবে কে!এখন খেয়েদেয়ে তারসাথে গিয়ে গল্প জুড়বি।

নীহারিকা বেগমের মন ভোলানো কথাগুলো বুঝতে পেরেও,তুই সম্বোধনের মন ভোলানো কথাগুলোয় সত্যিই কৌড়ির মন ভুলিয়ে দিলো,জুড়িয়ে গেলো।যদিও সে বুঝতে পারলো,তাকে অবুঝ বাচ্চাদের মতো কথার ছলে মন ভুলানো হচ্ছে।তবুও,নীহারিকা বেগমের মমতাময়ী কন্ঠের কথাগুলো তাকে মোহগ্রস্ত করলো।নিজের আপন আপন কাওকে মনেহলো তার।

‘বোস।

চেয়ারে বসতে গিয়ে সামনের দিকে নজর পড়লো তার।এবাড়ির বয়োবৃদ্ধা ফাতেমা বেগম এদিকে এগিয়ে আসছেন।খেতে বসবেন হয়তো।উনাকে আসতে দেখে আর বসলোনা কৌড়ি।উনি এসে বসার পর কৌড়ি বসলো।বিষয়টা কেউ নজরবন্দী না করলে-ও ফাতেমা বেগম বেশ খেয়াল করলেন।মনে মনে উনাকে মান্য করার জন্য,কৌড়ির এই শিষ্টাচারে তিনি খুশী হলেন।
তবে মুখের গম্ভীর্য আদলে সেটা প্রকাশ পেতে দিলেন না।কৌড়ি-ও নিজের গায়ে মাথার ওড়না সংযাত করে নিয়ে খেতে বসলো।যেটা বরাবর দাদি আপা শিখিয়ে দিয়েছেন।যেভাবে সে নিজে-ও চলতে চায়।তবে একটু এদিকে সেদিক হলেই যে দাদিআপা রাগ করতেন।আজ তিনি কাছে নেই বলে,উনার নিয়মনীতিগুলো আরও বেশি বেশিভাবে স্মরণে পড়ছে।

‘দিবা দাদুমনি কোথায়?সে খেয়েছে?

ফাতেমা বেগমের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নীহারিকা বেগম।শ্বাশুড়ি মা’কে ঠিক কি বলবেন ভেবে পেলেন না।
স্বান্তনা রহমানের গালে চিবানো খাবার-ও ধীমে হয়ে এলো।একমাত্র মেয়ের মেয়েকে যে, তিনি এবাড়ির সব ছেলেমেয়েদের থেকে সামান্য হলেও একটু বেশি ভালোবাসেন।এটা এবাড়ির সবাই জানে।তাই বলে তার সব আহ্লাদ পূর্ণ করতে হবে, ন্যায় অন্যায় ভুল বিবেচনা না করে!একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশন মেয়েকে,এখনো ছোটো ভেবে তার ভুল চিন্তা ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়াটা, ঠিক ভালো লাগেনা স্বান্তনা রহমানের।এজন্য তো তিনি নানদের চোখের বালী।তিনি এখন বাড়িতে নেই,তাই কিছুটা হলেও স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।দীবা মেয়েটা খারাপ এটা তিনি বলছেন না,মেয়েটার মাথায় ভুলভাল চিন্তাগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে খারাপ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে।যা এখন ভোগ করছে মেয়েটা।না গিলতে পারছে আর না ভোগ করতে পারছে।সম্পর্ক নিয়ে এমন ঝুলন্ত অবস্থায় আছে মেয়েটা।আর স্বান্তনা রহমানের শ্বাশুড়ি সব জেনেশুনেও,নিজের মেয়েকে কিছুই বলেন না।সবাই যখন চুপচাপ রানী তখন কিছুটা বিব্রত হয়ে উত্তর দিলো।

‘আম্মা,দীবা আম্মা এখন খাবে-না বলছে।সে খেতে আসে নাই শুনে,বড় ভাবীজান আমারে ডাকতে পাঠিয়ে ছিলেন।তার দরজায় শব্দ করতেই বললো, বিরক্ত না করতে।তার সময় হলে সে ঘুম থেকে উঠে খেয়ে নেবে।

ফাতেমা বেগম,নাতনীর এহেন আচারনে মনেমনে একটু বিরক্ত হলেন।তবে ক্ষুনাক্ষরেও সেটা মুখাবয়বে প্রকাশ করলেন না।দীবার বিষয়টা সেখানেই সমাপ্ত হলো।যেটা নীহারিকা বেগম মানতে পারলেও স্বান্তনা রহমান মানতে পারলেন না।তবে মুখ ফুটেও কিছুই বললেন না।কারও ভয়ে নয়,শ্বাশুড়িকে সীমহ করার গুনটাও তিনি তার পাশে বসা ভদ্রমহিলার থেকে রপ্ত করেছেন।এবং মান্য-ও করেন।কিন্তু মাঝেমাঝে অসহ্য এসব কারবার দেখে মুখ খুলতে বাধ্য হন।পাশে বসা ভদ্রমহিলার সকল গুন রপ্ত করতে, চাইলেও তার মতো ধৈর্য্য সহ্য তিনি এখনো রপ্ত করতে পারিননি।বিধায় সবকিছু ধৈর্যের বেলায় এসে খামতি পড়ে যায়।শ্বাশুড়ির কথায় ভাবনায় ভাঁটা পড়ে যায় স্বান্তনা রহমানের।তিনিও শ্বাশুড়ির প্রশ্ন মোতাবেক কৌড়ির উত্তর শোনার জন্য তার মুখের দিকে তাকালেন।

‘তুমি কোন ক্লাসে পড়ছো,মেয়ে?

খেতে খেতে কৌড়িকে বেশ ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন ফাতেমা বেগম।মেয়েটার খাবারের শালীনতা শিষ্টাচারও উনার বেশ পছন্দ হলো।মনেহয়,মেয়েটা বেশ শান্তশিষ্ট প্রকৃতির।উনার নাতনীদের মতো উড়নচণ্ডী টাইপের নয়।কালকে মেয়েটাকে শাড়ী পরা অবস্থায় দেখে, মান্যতার বয়সী মনে হয়েছিলো উনার।কিন্তু আজ ড্রেস পরা অবস্থায় দেখে তো বেশ ছোটো ছোটো মনেহচ্ছে মেয়েটাকে।তাই তিনি আচমকা প্রশ্নটা করলেন।কৌড়িও গালের খাবারটা চিবানো বন্ধ রেখে নমনীয় গলায় উত্তর দিলো।

‘এবার ইন্টারমিডিয়েট পরিক্ষা দেবো।তিনমাস পর আমার পরিক্ষা।

কথাটা বলে মাথা নিচু করে নিলো কৌড়ি।বাবার ইচ্ছে ছিলো কৌড়ি ডাক্তার হবে।মানব সেবা করবে।সেই মোতাবেক পড়ালেখা করে আসছিলো।তবে জীবনের মধ্যে দুপুরে এসে থেমে গেছে সে।এবার কি আর বাবার স্বপ্ন পূর্ণ করতে পারবে।অন্যের আশ্রিতা এখন, কে পড়াবে তাকে আর।ইন্টার পরিক্ষাটা পর্যন্ত দিতে পারবে কি-না, তার ঠিক নেই।ডাক্তার হওয়া তো শুধুই ঘুমের ঘোরে থাকা বিলাসবহুল স্বপ্নের মতো ছাড়া কিছুই না।
সবাই চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগী হলেও আর খাবারে মনোযোগী হতে পারলোনা কৌড়ি।সেটা খেয়াল করলেন নীহারিকা বেগম।নিজ মনে ভাবলেন কিছু।ফের নিজের পাশে বসা কৌড়ির হাতখানার উপর নিজের হাতের মৃদু স্পর্শ রাখতেই, কৌড়ি উনার দিকে ফিরলো। সেটা দেখে মুখে মৃদু হাসি টেনে নীহারিকা বেগম চোখ দিয়ে ইশারা করলেন খাবার খেতে।ইশারা লক্ষ্য করে খাবার খেতে মনোযোগী হলো কৌড়ি।যদিও খেতে ইচ্ছে করলোনা তার।

‘কি-রে কাল এসেছিস,আর আজ একদিন পূর্ণ করেই তবে আমার সাথে দেখা করার সময় মিললো তোর।এত মন খারাপ ছিলো?আমি একবার যেতে চেয়েছিলাম। নীহারিকা বললো,তখন তুই ঘুমিয়ে গিয়েছিলি।

অমায়িক ব্যবহারের এই কাকু নামক মানুষটাকে কৌড়ি কয়েকবার দেখেছে।তবে উনি তখন সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন।বাবা আর কাকুর মধ্যে খুবই ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও,তাদের পরিবারের মধ্যে তেমন কোনো সম্পর্ক ছিলোনা।বাবা ঢাকাতে এলে কাকুর সাথে দেখা করতেন,এবাড়িতেও আসতেন।খেয়েদেয়ে যেতেন।যেটা কৌড়ি বাবার মুখে শুনেছে।কাকুও কোনো কাজে গ্রামে গেলে,বাবার সাথে যোগাযোগ করতেন,তাদের বাড়িতে থেকে আমোদ আহ্লাদ করে চলে আসতেন।সেই হিসাবে কাকু নামক মানুষটাকে চেনা কৌড়ির।তবে উনার
এক্সিডেন্টের কথা শুনে বাবা এসে দেখে গেলেও,কৌড়ির তারপর আর কাকুর সাথে দেখা হয়নি কখনো।

‘কি-রে এখনো মন খুব খারাপ?কিন্তু কি আর করার আছে আমাদের বল!সবাইকে তো একদিন যেতেই হবে সে পথে।কারও যে ছুটকারা নেই সে পথ থেকে।এইযে আমিও সময় গুনছি?কবে আমার ডাকটাও চলে আসে।

‘এসব কি কথা বলা শুরু করেছেন।মেয়েটাকে আপনার কাছে আনলাম মন ভালো করতে আর আপনি আরও মন খারাপ করে দিচ্ছেন।

নীহারিকা বেগমের মিষ্টি ধমকে মলিন হাসলেন জাহিদ সাহেব। এই পঙ্গুত্ব জীবন উনার আর ভালো লাগেনা।না মরে এরকম অন্যের দায়ভার হয়ে বেঁচে থাকার থেকে মনে হয় মরে যাওয়ায় ভালো। তবে নীহারিকার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,বিরক্তহীন সেবা।তাকে বাচিয়ে থাকতে সাহস জোগায়।তবে নিজেকে মাঝে মাঝে নীহারিকার বোঝা মনেহয় উনার।উনার জন্য নাহীরিকার একদন্ড ফুরসত নেই।কোথা-ও যাওয়ার শান্তি নেই।নিজেকে খেয়াল করারও যো-টুকু পর্যন্ত নেই।নীহারিকা বেগমের রাগান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন।

‘তোমরা সত্যি কিছুতেই মানতে চাওনা নীহারিকা।এরকম ধমক দিয়ে সত্যটাকে আড়ালে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করো।তাই বলে সত্য কি মিথ্যা হয়ে যায়?সত্য যে অনিবার্য।প্রভুর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতা।সেই সত্যকে আড়ালে ডাবিয়ে রাখলে সত্য কি কখনো মিথ্যা হয়ে যাবে?যাবে না।কখনোই যাবার নয়।

থামলেন জাহিদ সাহেব। পাশে বসা কৌড়ির মাথায় হাত রাখলেন।ফের নরম কন্ঠে বললেন।–চিরন্তন বাস্তব বলে
সত্যকে মেনে নেওয়া সেখ,মা।তবে দুঃখ কষ্ট কম ছোঁবে তোকে।দূর্গম পথ সহজ মনে হবে।এই কঠিন পৃথিবীতে চলতে গেলে দুঃখ কষ্টে পতিত হয়ে মুরছা গেলে চলবে না।সত্যকে মেনে নিয়ে নিজেকে শক্ত কর।সামনের দিন গুলো সহজ হবে।

অন্যকে উপদেশ মুলক বানী শোনানো সহজ বিষয়।কিন্তু সেটা অপরপক্ষের মানা ঠিক তার বিপরীত বিষয়।এটা জাহিদ সাহেব জানেন।ক্ষনিকের এই পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা মায়া,টান,ভালোবাসা তো এমনি এমনি সৃষ্টি করেনি।আর পিতামাতার মতো মহামূল্যবান সম্পর্কও।সেই পিতামাতা জীবন থেকে ডুবে গেলে,সূর্য অস্ত যাওয়ার মতো নিজের জীবনটাও অস্তমিত মনেহয়।নিজের বাবার মৃত্যুতে সেটা অনুভব করেছেন জাহিদ সাহেব।আর সামনে বসা এই মেয়েটার তো পিতামাতা দু’জনেই অস্তমিত।বাবা মা সমতুল্য চাচা চাচি থেকেও নেই।আর দাদি সে-ও যে ডুবুডুবু ভাব।আর সেই মেয়েটাকে এসব বানী শুনিয়ে কি সহজে শান্ত করা যায়?মেয়েটা যে কখনো বাচ্চা।সেই বাচ্চা মনে কতো আঘাত একটার পর একটা নির্মমভাবে হানা দিয়ে চলেছে।আর মেয়েটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।এটাও বা সত্য মানার থেকে কম কিসে?

প্রসঙ্গ পাল্টে জাহিদ সাহেব আরও বিভিন্ন কথা কৌড়ির সাথে বলতে থাকলেন।মেয়েটাও চুপচাপ শুনল সহজে উত্তর করলোনা।এবাড়ির এই মানুষটা বাদে সর্বত্র মানুষগুলো তার অপরিচিত।তবে এই মানুষটাও যে খুব পরিচিত এমনটাও নয়।বিধায় উনার সাথে সহজ হয়ে কথা কৌড়ির একটু সংকোচ হলো।তবে মানুষগুলো ভিষন ভালো। তার রক্তের সম্পর্কিত চাচা চাচির মতো অন্ততঃ নয়।

সারা সকাল দুপুরটা কৌড়ির একাকিত্ব কেটে গেলে-ও, বিকালের দিকে আবারও হৈচৈ পূর্ণ পরিবেশের মিলনমেলা শুরু হলো তার রুমে। মৌনতা চারটার পর স্কুল থেকে এসেই, কোনোমতে খাওয়া গোসল সেরে তারসাথে ওটাএটা নিয়ে বকবক শুরু করে দিলো।চিকনচাকন গড়নের ফর্সা মেয়েটা বেশ কৌতুহলী আর চঞ্চল।তবে প্রচন্ড মিশুকে স্বভাবের।তার অতি মিশুকতা সহজে মানুষ,তার কাছের মানুষ হয়ে যেতে বাধ্য।

‘কাল তোমার রুমে আসা নিষেধ ছিলো,এজন্য তোমার কাছে আসতে পারিনি আমি।সকালে স্কুল ছিলো,যদি-ও আমি যেতে চায়নি।আম্মুর বুকিনিতে যেতে হয়েছে।আর বাবা দাদাভাইরা জানলে বকবে,আমি স্কুল কেনো যায় নি।তাই,সকাল থেকে এই পর্যন্ত তোমার কাছে আসতে পারি নি।কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো,আমি স্কুলে থাকলেও মন আমার তোমার কাছে আসার জন্য,তোমার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করছিলো।তবে চেয়েছিলাম টিফিন পিরিয়ডে বাসায় চলে আসবো।কিন্তু তখন বাসায় আসলে আম্মু আমাকে খুব পিটানি দিতো।আর জানো আমার একটা ছাগলী বান্ধবী আছে,সে-ও আমাকে কিছুতেই আসতে দেয়নি।বাড়িতে আম্মু আর স্কুলে তিন্নি।আসলে ওর বা কি দোষ।ও স্কুলে না আসলে আমার ক্লাসে মন বসে না।সেখানে আমি না থাকলে, ওর ও তো ভালো না লাগার কথা।যাই হোক কাল যখন তোমাকে দাদাভাই এবাড়িতে নিয়ে এলো,আমি মনে করছিলাম।দাদাভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে।তবে সাদা শাড়ীর জায়গায় লাল একটা শাড়ী পরলে, দাদাভাইয়ের বউ হিসাবে তোমাকে কিন্তু দারুন মানাতো।একদম পারফেক্ট জুড়ি।তুমি কিন্তু খুব সুন্দর দেখতে।দাদাভাইয়ের পাশে কিন্তু তোমাকে দারুন মানায়।তবে…

এত কথার জের ধরে একটু থামলো মৌনতা।কৌড়ির ডগর ডগর নিষ্পলক নজরের পানে চেয়ে ফের দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললো–তবে যখন আমি শুনলাম তুমি দাদাভাইয়ের বউ না,আমার যে মন খারাপ হয়েছিলো।তোমাকে কি করে দেখাই!দেখানোর হলে সত্যিই তোমাকে দেখাতাম।আমি আরও ভেবেছিলাম,আজ স্কুলে গিয়ে আমার বান্ধবীদের তোমাকে দেখাতে নিয়ে আসবো।যে আমার দাদাভাই কি সুন্দর একটা বউ নিয়ে এসেছে দেখ তোরা।কিন্তু হলো না।

কৌড়ি আশ্চর্য হয়ে মৌনতার কথাগুলো শুধু নীরব শুনে গেলো।এই মেয়ে এসব বলছেটা কি!অজানা কারনে গায়ের নুইয়ে থাকা লোশম গুলো কাটা দিয়ে উঠলো।তবুও সেদিকে লক্ষ্যনেই তার,সে মৌনতার অনর্গল নড়ে যাওয়ার ঠোঁটের পানে তাকিয়ে আছে।কে এই দাদাভাই?তাকে কালকে নিয়ে আসা মানুষটা?সমস্ত গা ঝাঁকি দিয়ে শিহরে উঠলো কৌড়ির।

‘চলো ছাঁদে যাই?

আশ্চর্যতা দমন না হওয়ার কারনে,মৌনতার প্রস্তাব কর্নে বোধাহয় গেলোনা কৌড়ির।সেটা না বুঝেই কৌড়ের হাত শক্তপোক্ত করে ধরলো মৌনতা।ফের বললো—চলো ছাদে যাই।আমাদের ছাদটা খুব সুন্দর। আপু এখনো ভার্সিটি থেকে আসেনি। আপু আসলে তখন নাহয় রুমে বসে সবাই গল্প করবো।

কৌড়ি হ্যা না বলার সময় পেলো না।তার আগেই চঞ্চল পায়ে মৌনতা,তাকে নিয়ে ছাঁদে যাওয়ার উদ্দেশ্য চললো।অতি ছটফটি মেয়েটা সিঁড়িতে দ্রুত পা রাখতে যেয়ে,উপুড় হয়ে পড়ে নিতে গিলেই দু’হাতে সামলে নিলো তাকে কৌড়ি।ফের বললো—পড়ে যাবে তো মৌনতা।আস্তে চলো।

ব্যথা পেয়েও মিষ্টি হেসে দিলো মেয়েটা।মনহলো এরকম ব্যথা তার নিত্য পাওয়ার অভ্যাস আছে।বললোও তাই মেয়েটা।–দিনে এরকম দুই একবার অকারণে পড়ে যাই আমি।তাই ছোটো দাদাভাই আমাকে ডাকে আছাড়বিবি বলে।

আছাড়েবিবি!ভাবার আর সময় পেলোনা কৌড়ি।তার আগেই আবারও হাতে টান পড়ায় সিঁড়িতে ধপাধপ পা রাখতে হলো তাকে।

‘মৌনতা পড়ে যাবে।আস্তে।

শুনলো না মেয়েটার তার কথা।সোজা ছাঁদে নিয়ে গিয়ে তারপর কৌড়ির হাত ছাড়লো।

কাছে অথবা দূরে,আসরের আজানের সুমধুর ধ্বনিটা মুয়াজ্জিনের কন্ঠে হয়তো ভেসে একটু পরেই।ভাদ্রের আকাশে সূর্যের তপ্তের জৌলুশতা কমেনি।তব জ্বলজ্বলে সূর্যের দূরদূরান্ত আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কালো ছোটো ছোটো মেঘের ফালিগুলো।তবুও আকাশটা ঝলমলে।ছাঁদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে কৌড়ি।আকাশ থেকে নজরটা সরিয়ে, ছাদের পানে দিলো।নজর শীতল হয়ে এলো তার।হঠাৎই মন উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।বিগত দুদিনে হাসি না ফোঁটা ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো।

নাম জানা, অজানা ফুল গাছের সমাহারে পরিপূর্ণ ছাদটা।ফুলছাড়াও বিভিন্ন গাছ রেয়েছে।সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করে সাজিয়ে গুছিয়ে ছাঁদের এই গাছগুলো রোপন করা হয়েছে। এবং রোজ যে তাতে পরিচর্যা চলে তা প্রতিটি গাছের চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে।

‘এদিকে এসো।

মৌনতার ডাকে আস্তেআস্তে ছাঁদের মধ্যের দিকে পা বাড়ালো কৌড়ি।মৌনতা দক্ষিণ পাশের বড়বড় ড্রামে লাগানো গাছগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।সেদিকে যেতেই কৌড়ি দেখলো,বড়োবড়ো ড্রামে লাগানো বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন ফুল ফুটে আছে।কোনোটার ফুলের পাপড়ী, শুধু গাঢ় লাল।কোনাটার সাদা,গোলাপী পাতা একসাথে।কোনটার আবার গাঢ় মেজেন্টা।অথচ গাছের পাতা,গোড়ার শক্তপোক্ত মুলগুলো একই রকম দেখতে। মৌনতা, ড্রামে লাগানো গাছগুলো দেখিয়ে বললো।

‘জানো,বড়দাদাভাই আর আমার পছন্দ একইরকম।এই
বনসাই গাছগুলো বড় দাদাভাই লাগিয়েছে।আমারও ভিষণ পছন্দ।

কৌড়ি,মোটাতাজা গাছের ফুলের পাতাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে
দেখতে লাগলো।আল্লাহর কি অপরূপ সৃষ্টি।দুঃখী মনও সেই সৃষ্টিতে শান্ত হয়ে যায়।কি আশ্চর্য।

‘দাঁড়াও আমি আম্মুর ফোন নিয়ে আসছি।ফুলের পিক উঠাবো, সাথে তুমি আর আমিও তুলবো।

কথা বলতে সময়,ছুটতে সময় নেই মেয়েটার।ছুটে নিচে চলে গেলো মেয়েটা।কৌড়ি বিবাহিত হয়ে গেলো,বিভিন্ন
ফুলের সমাহারে।অসময়েও বেলী ফুটেছে। ঝাঁকড়া কামেনী ফুলগাছের সবুজ পাতগুলো দেখা যাচ্ছে না, সাদা ছোটোছোট ফুলের সমাহরে।অলকানন্দার হলুদ ফুলগুলোতে সূর্যের আলো পেয়ে,তার হলুদ রঙটা আরও জ্বলজ্বল করছে।রঙ্গনা,জুই,রজনীগন্ধা চামেলিও বাদ নেই।বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস জায়গা করে নিয়েছে ছাঁদের উত্তর ওয়াল ঘেঁষে।সাদা,কালো লাল খয়েরী হলুদের গোলাপ গাছের ও অভাব নেই।
আরও বিভিন্ন গাছ,ফুল হোক বা ফুলছাড়া।যা কৌড়ির নাম জানা নেই।আর কোনো গাছে কি লাগাতে বাকি আছে এই ছাঁদে।আছে হয়তো!

‘এই তোমার নাম কি ফুলকৌড়ি?

চমকে পিছনে তাকালো কৌড়ি।লম্বা চওড়া,ফর্সা একজন সুদর্শন যুবকে নজরে পড়ল তার।ছেলেটা,তার কালো ট্রাউজারের পকেটে দুহাত গুঁজে নিশ্চল নজরে তাকিয়ে আছে তারদিকে।ভীষন ভয় পেয়েছে কৌড়ি।পিছন থেকে এরকম ভুতের মতো কেউ কথা বলে!কি প্রশ্ন করেছে ছেলেটা সেটা জেনো মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছে।আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিলে কৌড়ি।মৌনতা এখনো আসেনি?হঠাৎই অস্বস্তি ঘিরে ধরলো তাকে।সেই অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিলো সামনের ছেলেটা,তার কথায়।

‘তবে নামের সাথে,তোমার সৌন্দর্যের নিদাারুন মিল আছে।ফুলকৌড়ি।

মৃদুস্বরে বেশ কয়েকবার ফুলকৌড়ি নামটা আওড়ালো ইভান ।ফের গভীরভাবে আশেপাশে নজর বুলিয়ে কৌড়ির মুখপানে নজর শান্ত রাখলো, কৌড়ির অস্বস্তি আরও শতগুণ বাড়িয়ে দিয়ে তার প্রশংসায় গীত গাইলো।

‘তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি জীবন্ত ফুলকৌড়ি।

চলবে….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ