Friday, June 5, 2026







ফুলকৌড়ি পর্ব-১৪+১৫

#ফুলকৌড়ি
(১৪)
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম

আগুনের একটুকরো ফুলকি জেনো ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ছুঁড়ে দিলো মুখের উপরে।ঠিক এমনটা অনুভব করলেন ডালিয়া বেগম।আর-ও ব্যথিত হলেন,নিজের প্রিয় ভাইপো ইভানকে কথাটা বলতে দেখে।নিভান হলে নাহয় মানতে পারতেন কিন্তু ইভান!যদি-ও ইভান গালকাটা স্বভাবের।তাই বলে উনাকে এমন ধারার কথা বলতে পারলো?একটু-ও মুখে বাঁধলো না!আর কার সাথেই বা কার তুলনা করলো!নিজের আপন ফুপুর সাথে বাহিরের মানুষের তুলনা!অঙ্গারের ন্যায় শরীর জ্বলে উঠলো উনার।আলস্য ভঙ্গিতে এগিয়ে আসা ইভানের দিকে মূহুর্তেই কর্কশ কন্ঠে শব্দ ছুড়লেন।

‘তুই কার সাথে কার তুলনা করছিস ইভান?

সহসা উত্তর দিলো ইভান।—কেনো?মানুষের সাথে মানুষের তুলনা করছি।আপনি মনেহয় আপনার লেভেলের মানুষকে ছাড়া আর কাউকে মানুষ ভাবতে পারেন না।নাকি ইদানীং আপনার লেভেলের নিচের মানুষগুলোকে মানুষ ভাবা বন্ধই করে দিয়েছেন?যেখানে একই সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ) সৃষ্টি আপনি,আমি, তারা সবাই।

মুখাবয়ব কঠিন্য করে ফেললেন ডালিয়া বেগম।ইভান এভাবে তারসাথে কথা বলতে পারেনা!মূহুর্তেই অগ্নিশর্মা ধূর্ত নজর ঘুরিয়ে আনলেন নিজের চারপাশটাজুড়ে। রান্নাঘরে চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে উনার দুই ভাবি।বুঝলেন উপস্থিত ব্যক্তিগুলো কেউ উনার পক্ষ নিয়ে কথা বলবেন না।তাই নিজের হয়ে নিজেই কঠিন গলায় প্রতিবাদ জানালেন।

‘আমি কিন্তু এবাড়ির হকদার।একমাত্র মেয়ে।বাহিরের মানুষের সাথে কিন্তু এভাবে আমার তুলনা চলেনা।আর তুলনা দিতে পারিসও না তুই!

ফুপুমনির সামনে সটান এসে দাড়ালো ইভান।নিস্প্রভ চোখে উনার দিকে চেয়ে বললো।-পারিনা বলছেন!কিন্তু কেনো? আপনি যদি এবাড়ির হকদার হয়ে থাকেন,তবে যাদের উদ্দেশ্য করে বিষাক্ত বানী গুলো বললেন,তারাও কোনো না কোনোভাবে এবাড়ির হকদার।রক্ত সম্পর্কিত না-হলেও,এবাড়ির আপনজন।তা না-হলে আপনার শ্রদ্ধেয় মৃত বাবা,ভাইজান,এবাড়িতে তাদেরকে থাকতে দিতেন না। রাখতেন না অযথা।

‘তুই এভাবে আমার সাথে কথা বলতে পারিসনা ইভান।

ফুপিমণির সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো ইভান।ধপ করে গিয়ে বসলো নাফিমের পাশের চেয়ারটায়।নাফিম খাওয়া বাদ দিয়ে মুখ ভার করে বসে আছে।নজর পড়লো সামনে বসা কৌড়ির পানে।মেয়েটা খাচ্ছেনা।শুধু হাত দিয়ে ভাত নেড়ে যাচ্ছে নীরবে।টুপ করে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি প্লেটে পড়তেই,চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।চেয়ার সমেত ফুপুমনির দিকে ঘুরে বসলো সে।শক্ত গলায় বললো।

‘আমি যেমন পারিনা,আপনার সাথে এভাবে কথা বলতে।তেমন আপনিও পারেন না এভাবে কাউকে ছোট করে কথা বলতে।সম্মান দিতে শিখুন,তবে সম্মাননা এমনিতেই পেয়ে যাবেন।এভাবে রাগ দেখিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে চেয়ে পেতে হবেনা সম্মান।

কথাগুলো বলে ফুপুমনিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মা’কে উদ্দেশ্য করে বললো—মা খেতে দাও আমাকে।

সুক্ষ অপমানে শুভ্র মুখখানা রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল ডালিয়া বেগমের।আগুন ঝরা নজর দিয়ে আশপাশটা একবার দেখে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে গটগট করে চলে গেলেন তিনি।

দোতলার খোলা বারান্দার দাঁড়িয়ে আছে নিভান।সুগভীর,স্থির নজরটা তার ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডায়নিং স্পেসটায়।ফুফুমনির বলা তীর্যক বাক্য সে না শুনলেও,মেয়েটার হয়ে ইভানের বলা প্রতিটি বাক্য সে শুনেছে।অচেনা মেয়েটাকে যে ফুপুমনি তার চরিত্র বোঝাতে নিজের জবানের কটুবাক্য গুলো শুনাতে দ্বিধাবোধ করেন নি এটাও বেশ বুঝলো।তবে ফুপুমনিকে তার নখদর্পে।তাই সেসব বাদ দিয়ে আবার-ও ইভানকে বোঝার চেষ্টা করলো সে।মেয়েটার হয়ে ফুপুমনির বিরুদ্ধে গিয়ে,উনাকে কথা শোনানো!ইভান কি মেয়েটার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছে?তবে কি মেয়েটাকে তার সত্যিই পছন্দ?নাহলে ফুপুমনিকে এতো কথা শোনালো কেনো?একটা সময় এই ফুপুমনির কুটনৈতিক বাক্যগুলো ঘিরে তাদের দু-ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল তৈরী হয়।দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের এই জড়তা,এই দুরত্ব সবকিছু ঘিরে ওই ফুপুমনি।যদিও ইভানের তখন অপরিপক্ক বয়স ছিলো।আর সেই বয়সে ফুপুমনি ব্রেনওয়াশ করার জন্য যে ছলাবলা কথাগুলো বলতো,ছেলেটার ব্রেন তা ভয়ঙ্করভাবে জড়িয়ে নিতো।তারপর শুরু হতে থাকলো,সম্পর্কের টানাপোড়েন।দুই ভাইয়ের মধ্যে কতো মধুর একটা সম্পর্ক,একটা নৈকট্য বন্ধন ছিলো।সেটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়।যখন নিজ থেকে ইভান বুঝতে শুরু করলো,তখন সম্পর্কে এতো অবনতি এতো দুরত্ব চলে এসেছে,চেয়েও আর ইগোর খাতিরে কেউ আর সেই আগের মধুর বন্ধটাতে এগোতে পারিনি।সেই ইভান এখন নিজের সাথে সাথে,নিজের আপনজনদের ভালোমন্দটা-ও বুঝতে শিখেছে।তাদের হয়ে ভালোমন্দ স্ট্রেইট স্টেপ নেয় এবং নিচ্ছেও।

হঠাৎ নিভানের মস্তিষ্ক খেয়ালী হলো।তখন যে ইভান বললো,মেয়েটা তার আপনজনদের মধ্যে-ও একজন।তবে কি,তার মন ইভান আর ওই মেয়েটাকে ঘিরে যেটা ভাবছে।সেটারই ইঙ্গিত দিলো ইভান তার কথা-কাজে।
হঠাৎ আবার মনেহলো,এসব কি ভাবছে সে!যদি তাই হয়ে থাকে তবে তারও বা সমস্যা কোথায়?যদি সমস্যাই বা না থেকে থাকে তবে এমন আবোলতাবোল ভাবনা বারবার মন মস্তিষ্কে ঘুরছে,ভাবছেই বা কেনো?আর সেই ভাবনাতে ডুবে আছেই বা কেনো সে?কি হলো তার মনের,এমন অদ্ভুত অহেতুক ভাবনাতো কখনো ভাবনাতে আসিনি তার!এমন ভাবনা কখনো ভাবিওনি তার মন মস্তিষ্ক।তবে আজ কেনো?শুধু আজ তো নয়, ইদানীং মস্তিষ্কে ভাবনাগুলো কিলবিল করছে।সে তো প্রশ্রয় দিতে চাইছেনা,তবুও জবরদস্তি করে ভাবনাগুলো যেনো সেখানে নিজের জায়গা পোক্ত করে নিয়েছে।কি এক জ্বালা!কি এক যন্ত্রণায় নিভৃতে ভুগছে সে !কি নাম এ-জ্বালার, এই নিভৃতে পাওয়া যন্ত্রণার!

নজর আরও দৃঢ় হলো নিভানের।সেই দৃঢ় নজর পড়লো কৌড়ির মাথা নিচু করে খাওয়ার পানে।মেয়েটার মাথায় ওড়না টানা।বিধায় মুখ দেখাচ্ছে না।আর ওখানে যে তাকে ঘিরে,অতশত কতা হলো তবু্ও মেয়েটা মাথা উঁচু করে তাকায়নি।মেয়েটার কি খুব মন খারাপ?হঠাৎ মস্তিষ্ক সজাগ হলো,বললো।তুই আবারও মেয়েটার কথা ভাবছিস!উফফ!মস্তিষ্কের উপহাসের বানীতে ভাবনা সেখানেই ক্ষান্ত রাখল নিভান।মৃদুস্বরে মুখে আওড়ালো।

‘কেনো এলো এই যাদুময়ী তার জীবনে।

খাবার টেবিলে বসা মানুষগুলো চুপচাপ।মায়ের কাছে খাবার চাইলেও তিনি এখনো এখানে আসেননি। গুমোট পরিবেশ চনমনে করতে ইভাননাফিমকে উদ্দেশ্য করে বললো—এই পিচ্চু তুই এরকম না খেয়ে হুতুম পেঁচার মতো মুখ করে বসে আছিস কেনো?নাকি ছোটো-মা আজ খাইয়ে দিচ্ছে না বলে এরকম মুখ বানিয়ে বসে আছিস?

কোনো অভিব্যক্তি দিলো”না নাফিম।সে যতোই দুষ্ট থাকুক,কারও মন খারাপ দেখতে পারেনা।এমনি সময় মা বোনকে মহাবিরক্ত করলে বা জ্বালালেও,মা যখন মন খারাপ করে কোনো কিছু বলে,তখন সে কতো ভালো বাচ্চা হয়েযায়।তখন বিনাবাক্যবয়ে মায়ের সমস্ত কথা মানে।সেখান ফুপুমনির কথায় তার সামনে বসা মেয়েটাকে মন খারাপ করতে দেখে।তার মোটেও ভালো লাগিনি।এমনকি ফুলকৌড়িকে নীরবে কাঁদতে দেখে তার আরও বেশি খারাপ লেগেছে।তাই খাবার না খেয়ে চুপ হয়ে বসে আছে।এখন কারও কথা তার ভালো লাগছেনা।বাচ্চা ছেলেটার মনে বেশ ইফেক্ট পড়েছে কৌড়ির কান্না দেখে এটা বুঝতে পারলো ইভান।তার নিজেরই খাবাপ লেগেছে, খাবারের প্লেটে মেয়েটার চোখের পানি পড়তে দেখে,সেখানে নাফিমতো বাচ্চা ছেলে।মন তো খারাপ হওয়ারই কথা।নাফিম আর কৌড়ির মন থেকে ফুপুমনির কদর্য ব্যবহারটা দূরীভূত করতে সে বললো।

‘আমার কি মনে হয় জানিস!ভাবছি আজ ছোটোমাকেও বলবো আমার ভাবনার কথা?যে আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে সিরিয়ালে আগে দাদাভাইকে বিয়ে না দিয়ে তোকে আগে বিয়ে দেওয়া হোক।আমার মনেহয় তোর আগে বিয়ে প্রয়োজন।ভেবে দেখ দাদাভাই আর আমাকেতো কাওকে খাইয়ে দেওয়া লাগেনা,গোসল করিয়ে দেওয়া লাগেনা,ড্রেস পরিয়ে দেওয়া লাগেনা,ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া লাগেনা।অথচ এতো বড় দেড়ি ছেলে হয়ে তোকে সব করিয়ে দেওয়া লাগে।এখন বল কার বউয়ের প্রয়োজন?বিয়ে করার পর তো সেই ছোটোমাকে ভুলে বউয়ের উকালতি করবি।সেই বউ এসে পারলে,কষ্টসাধ্য করে এখন থেকে তোকে মানুষ বানিয়ে নিক।তোর পিছনে ছোটোমার এই অক্লান্ত পরিশ্রমের সুরাহাটা,আমি কতো ভেবেচিন্তে তারপর বের করেছি।দারুন আইডিনা না বলো ছোটোমা।

গলা চড়াও করে শেষের কথাটা স্বান্তনা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো ইভান।এতোসময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও,ইভানের গলা পেতেই নড়েচড়ে দাঁড়ালেন তিনি।নীহারিকা বেগমকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনিও চাইলেন ইভানের মতো পরিবেশ চনমনে হোক।যদিও জানেন,এই ঘটনা নিয়ে আরও ঘটনা ঘটবে তারপর ঝামেলা মিটবে।আদৌও মিটবে কিনা উনার জানা নেই।যা একখান ননদ উনার।তপ্ত শ্বাস ফেলে তিনিও গলা চড়াও করে বললেন।–তা যা বলেছিস?

এবার মুখ খুললো নাফিম।চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো নীহারিকা বেগমকে উদ্দেশ্য করে-বড়মা।ছোট দাদাভাই কিন্তু জ্বালাচ্ছে আমাকে।

‘ইভান চুপচাপ খেতে বোস।আমার মেজাজ কিন্তু বহুত খারাপ আছে! আর একটুও খারাপ করিস না?

ভদ্র ছেলে হয়ে গেলো ইভান।তবে সামনে বসা কৌড়িকে চুপচাপ দেখতেই মুখটা আর স্থির রাখতে পারলো-না। মায়ের তীক্ষ্ণ মেজাজের বানী ভুলে গিয়ে ফিসফিসানি গলায় বললো—এই ফুলকৌড়ি, তুমি খাবার না মুখে তুলে শুধু ঘেঁটে যাচ্ছো কেনো?তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।তোমার জন্য দাদাভাইও খেতে আসতে পারছে-না,যদি সে আসাতে তুমি আবার বিষম খেয়ে বসো।

তড়িৎ বিস্ময় নিয়ে মুখ তুলে চাইলো কৌড়ি।নিজেকে অনেক আগেই স্বাভাবিক করে নিয়েছে সে।তারজন্য সেই মানুষটা খেতে আসতে পারছেনা।মানেটা কি?আশেপাশে নজর দিলো কৌড়ি।কৈ,কোথাও তো কেউ নেই।তবে কি তারসাথেও ফাজলামো করছে ছেলেটা।নাফিমকে ক্ষেপিয়ে এবার তারপিছনে লেগেছে মানুষটা।কৌড়ির আশেপাশে চাওয়াচাওয়ি করতে দেখে বিষয়টা বুঝে ইভান ফের ফিসফিসিয়ে বললো।

‘দোতলার দিকে তাকাও,তোমার চাওয়াচাওয়ির উত্তর সেখানে মিলে যাবে।

সেকেন্ড দেরী করলোনা কৌড়ি।মূহুর্তেই ঘাড় উঁচিয়ে দোতলার দিকে তাকালো।সুগভীর,তীক্ষ্ণ নজরজোড়ায় আঁটকে গেলো নজর।লম্বা চওড়া মানুষটাকে সটান হয়ে স্থির নজরে তারদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুকের মধ্যে থাকা যন্ত্রটা মূহুর্তেই ছলকে উঠলো,শিরশিরানি দিয়ে গায়ের সমস্ত লোমকূপ কাটা দিয়ে সজাগ হলো।এদিকেই তাকিয়ে ছিলো মানুষটা!কৌড়িকে তাকাতে দেখেও নজর কিঞ্চিত সরালোনা নিভান।সেভাবেই ত্রিশূল নজরে তারদিকে তাকিয়ে রইলো।নজর নামিয়ে নিলো কৌড়ি।খেতে মোটেই ইচ্ছে করছেনা তার।তবে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর খাবার ফেলে চলে যাওয়া শোভনীয় দেখাবেনা।তাই না চাইতেও প্লেটে থাকা অল্প খাবারগুলো টপাটপ গালে তুললো।সেটা দেখে মৃদু হাসলো ইভান।এই মেয়েকে যে সে দাদাভাইয়ের বউ করবে বলে ভাবছে।এতো ভয় পেলে এই মেয়ে দাদাভাইয়ের সাথে সংসার করবে কি-করে?তবে আর যাই হোক,বউকে ভালোবাসবে দাদাভাই ভিষন।আর সেই ভালোবাসায় এই ভয়,এই দ্বিধাবোধ কোথায় পালিয়ে যাবে।কৌড়িকে নিয়ে দাদাভাইকে সে ভাবতো না।তবে দু-ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক মধুর না হলেও, দাদাভাইয়ের নজর পড়তে যে তার ভুল হয়নি।আর এখন পিছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে,ওই দোতলার বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষটার ভিতরে চলছেটা কি?চলুক একটু।সারাজীবন নিজেকে আর নিজের অনুভূতিগুলোকে, আপনজনদের থেকে আড়াল করে এসেছে।এবার দেখা যাক কতোসময় আড়ালে রাখতে পারে নিজের অনুভূতি।সব সম্পর্কের অনুভূতি একই রকম হয়না।কিছু সম্পর্কের অনুভূতি নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।ইভান,দেখতে চায় সেই জ্বালানো পোড়ানো অনুভূতি কতক্ষণ দমিয়ে, চাপিয়ে রাখতে পারে তার ওই সহনশীল ধৈয্যধারী দাদাভাই।সাবজেক্ট ফর ফুলকৌড়ি।

তাড়াহুড়ো করে খেয়ে,কোনোরূপ এদিক ওদিক না তাকিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেছে কৌড়ি।ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সেটা নীরবে অবলোকন করলো নিভান।মা ডাকা সত্ত্বেও খেতে যায়নি সে।ক্ষুধা লাগা সত্ত্বেও ডায়নিং টেবিলে গিয়ে কেনো বসতে ইচ্ছে করেনি,জানা থাকলে-ও মানতে রাজী নয় সে।তাই ড্রয়িংরুমে বসে মায়ের কাছে চাওয়া কফির অপেক্ষা করছিলো।তন্মধ্যে কৌড়িকে মাথানিচু করে শব্দহীন পায়ে চলে যেতে দেখলো।সোফায় হেলান দিয়ে বসে নজর হাতের নিউজপেপারে হলেও মনোযোগ তার সেই শব্দহীন চলে যাওয়া রমনীর পানে ছিলো।এখনো নজর নিউজপেপারে হলেও,মনোযোগ পড়ে আছে অন্যকোথাও।সেখান থেকে কিছু সময় পরে ইভানের খাওয়া শেষ হলো।খাওয়া শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালো সে।
দুষ্ট হেসে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতে এগোতে,গলাছেড়ে গান ধরলো।

‘তোমাকেই চাই শুধু তোমাকেই চাই।আর কিছু জীবনে পাই বা না পাই।

গানের কলিটা আওড়াতে আওড়াতে ড্রয়িংরুমের মধ্যে দিয়ে ধীরপায়ে এগোচ্ছিলো ইভান।সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত যেতে পারলোনা,জলদগম্ভীর গলায় পিছে থেকে ডাক এলো তার।মূহুর্তেই গলার স্বর ধীর হয়ে এলো।দাঁড়িয়ে পড়লো সে।মুখে ফুটলো দুষ্টমিষ্টি হাসি।সেই গলার ফের ডাকে পিছে ফিরলো সে।

‘তোমার সাথে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ন কথা আছে আমার,ইভান।

চলবে….

#ফুলকৌড়ি
(১৫)
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম

ইভানের হাসিখুশি সুদর্শন মুখখানা দেখতেই,যে কথাগুলো বলবে বলে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছিলো,সেই সাজানো গোছানো কথাগুলো ভিতরের গিলে ফেললো নিভান।কন্ঠস্বর ভেদ করে ঠোঁট অব্দি নিয়ে আসলো না।হঠাৎই মন বলে উঠলো,তবে কি সে ইভানকে হিংসা করছে?সঙ্গেসঙ্গে মস্তিষ্ক বলে উঠলো,কখনোইনা।বাবার রক্ত আলাদা হলেও,ইভান মান্যতা তার জীবনের ভালো থাকার একেকটা অংশবিশেষ।তাদেরকে কোনোকিছুর বিনিময়ে কখনোই সে হিংসা করতে পারেনা।যে যতো প্রিয় জিনিসের বিনিময়ে হোক না কেনো,তাদের ভালো থাকার কাছে সেই প্রিয় জিনিস কিছুই না।হঠাৎই বুকের বা-পাশের যন্ত্রটায় ব্যথার টান অনুভব করলো।নতুনত্ব অনুভূতি।এই ব্যথার অনুভূতিটা জানা থাকলেও,নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করেনি।সম্পর্কের কতো টানাপোড়েন চললো।নিজের কাছের মানুষগুলো থেকে কতো ব্যথার অনুভূতি পেলো।আপন মানুষ বিদায় নিলো।সেসবে ভীষন কষ্ট পেয়েছে সে কিন্তু এমন ব্যথার অনুুভব অনুভূতি হয়নি বুকের এই যন্ত্রটায়!তাহলে আজ কেনো এই ব্যথার উৎপত্তি!তবে কি?অদৃশ্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে নিজের মস্তিষ্কে যা ভাবতে চাইলো,সেই ভাবনাটা দূরীভূত করার চেষ্টা করলো নিভান।যেটা তার মন মস্তিষ্কজুড়ে শক্তপোক্তভাবে বাসা বাঁধতে চাইছে,তা হওয়ার নয়!এ কি টানাপোড়ন শুরু করলো তার মন মস্তিষ্ক!না চাইতেও তার সব ভাবনার শেষটা গিয়ে,সেই তাকেই জুড়ে ভাবতে বসে মন।যাকে সে ভাবতেই চাইছে না।তবুও কেনো তাঁকেই ঘিরে এই অনুভব, অনুভূতি, ভাবনা?

‘কিছু বলবে কি দাদাভাই?

ইভানের কথায় মূহুর্তেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো নিভান।মুখের আদলে সেই দৃঢ়তার ছাপ বজায় রেখেই বললো।

‘বিভিন্ন দেশের ভার্সিটিগুলোতে স্কলারশিপের আবেদন পত্র ছেড়েছে।তুমি এপ্লিকেশন করোনি?সময়তো আর বেশি নেই আবেদন করে ফেলা উচিত নয়-কি?

‘আমি তো দেশের বাহিরে পড়তে যেতে চাই-না।যেটা নিজের যোগ্যতায় হয়নি,সেখানে বাবা ভাইয়ের শত পরিশ্রমের টাকা নষ্ট করে নামীদামী ডিগ্রী নিতে চাইওনা আমি।আর এমনিতেও দেশের বাহিরে যেতে চাই-না আমি।সামনে বি-সি-এস পরিক্ষার জন্য প্রিপ্রারেশন নিচ্ছি।সেটাতেই সমস্ত মনোযোগ দেওয়ার ট্রাই করছি।

‘বাবার টাকা তোমার টাকা নয়-কি?তবে এরকম হেঁয়ালিপনা কথা কেনো বলছো?

দুর্বোধ্য হাসলো ইভান।বাবার টাকা!যেখানে সে নিজে উল্লেখ করলো,বাবা ভাইয়ের পরিশ্রমের অর্থ। সেখানে শুধু বাবার টাকা উল্লেখ করলো!দাদাভাই নিজেকে এখনো এতোটা পর ভাবে।হয়তো এবাড়ির কিছু মানুষের খোঁটা তার কঠিন মনকে আরও কঠিন করে দিয়েছে।মলিন হেসে সে বললো।

‘তবে কি সেই বাবার টাকা তোমার ছিলোনা?তুমি কেনো নাওনি।স্কার্লারশিপ পেয়েও,সুযোগ পায়ে ঠেলে দিলে।নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করলে যারজন্য?সেই ব্যবসাটা নিজে শ্রম দিয়ে পুনারায় দাঁড় করালে,সেই শ্রমের টাকা যদি তোমার নিজের না মনে হয়!তবে ভাইয়ের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের অর্থ কিকরে আমার অর্থ মনেহয়?সেই অর্থ কি শুধু আমার বাবার ভাবা উচিত?আর উচিত হলে-ও,আমি চাইনা সেই অর্থের ভাগিদার হতে।

শক্তপোক্ত চোয়াল আরও কঠিন্য রূপ নিলো নিভানের।
ইভানের যুক্তিসঙ্গত কথা তার মোটেও ভালো লাগিনি।দৃঢ় গলায় বললো।

‘নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ছেলেখেলা করোনা ইভান।সুযোগ বারবার আসেনা।আর সুযোগ হাতছাড়া করলে, সেটার জন্য আফসোস সারাজীবন আওড়াতে হয়।ফালতু ভিত্তিহীন লজিক দেখিয়ে নিজের ক্যারিয়ার বরবাদ করারা চেষ্টা করো-না।এটা আমার নয়,সেটা ওর।এসব বাচ্চামি খেয়ালীপনা ছেড়ে নিজের ক্যারিয়ার কিভাবে ঠিকঠাক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়,কিভাবে সফলতার চূড়ায় উঠা যায়,সেটা নিয়ে ভাবো।সেদিকেই ধ্যান দাও।তুমি এখন আর সেই অবুঝ বাচ্চা ছেলেটা নও।

‘আমার ক্যারিয়ার নিয়ে মোটেই ছেলেখেলা করছিনা আমি।যেটা তুমি করেছো!আর দ্বিতীয় কথা হলো,আমি দেশের বাহিরে যেতে চাইনা।এটাই ফাইনাল।সেটাতে যদি সামনে আমার দ্বারা কিছু না-হয় না-হলো।আমার আফসোস থাকবেনা।বাবা ভাইয়ের পরিশ্রমের অংশ না নিলেও,বসেবসে নাহয় সারাজীবন খেয়েই ধ্বংস করলাম।সারাজীবন খাবারটুকু দিয়ে এই ভাইকে পুষতে পারবেনা?

নিভানের কঠিন মুখাবয়ব দেখে শেষের বাক্যগুলো মজার ছলে বললো ইভান।মূহুর্তেই কপাল কুঁচকে গেল নিভানের।এই ছেলে কি তারসাথে ফাজলামো করছে?
সিরিয়াস কথার মধ্যে ফাজলামো শুরু করলো?যদিও এটা ইভান,কখন কোন মুডে থাকে বলাবাহুল্য।সেটা শুধু সেইই জানে আর তার মর্জির উপর ডিপেন্ড করে।নিভানকে কপাল কুঁচকে শান্ত নজরে তারদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনেমনে দুর্বোধ্য হাসলো ইভান।তার চিন্তা মাথা থেকে দূরীভূত করে ভাইয়ের মাথায় অন্য চিন্তা ঢোকাতে মুখে মৃদু হাসি টেনে ফের বললো।

‘আমার ক্যারিয়ার নিয়ে কি আর বাচ্চামো করবো বলো?আমার ইচ্ছে অনুযায়ী ক্যারিয়ারে যদি সাফল্য না আসে।সাফল্য অর্জনে যদি আমি দূর্ভাগা হই,আমার বাপ ভাইয়ের কি আর কম আছে নাকি?যেটুকু আছে তাতেই আমার আর ফুলকৌড়ির খেয়ে-পরে দিব্যি চলে যাবে।আমরা দু’জনেই কিন্তু খুব একটা বেশি চাহিদার মানুষ নই।যে আমার বাপের আর ভাইয়ের আমাদের দুজনকে পুষতে খুব একটা কষ্ট হবে।সো আমার ক্যারিয়ার নিয়ে অযথা টেনশন নিও-না,যেটা নিয়ে টেনশন করার,সেটা নিয়ে খুব ভাবো।আর ভেবেচিন্তে সমাধানের ব্যবস্থা করো।বলা যায় না এটা হারিয়ে গেলে,তোমার জীবনে নিজের চাওয়া পাওয়া বলে আর কিছুই না থাকলো।

মুড়ে দাঁড়িয়ে দুষ্ট হেসে আবারও গলা ছেড়ে গান ধরলো ইভান।সিঁড়ির ধাপে ধাপে পা ফেলে নিজের গন্তব্যে চলে গেলো।তবে পিছনের মানুষটাকে তার বলা বাক্যে বিমূঢ় করে রেখে গেলো।এগুলো কি বলে গেলো ইভান?ইভান এক কথার ছেলে।বলেছে যখন এপ্লিকেশন সে করবে না।সেটা নিয়ে না ভাবলেও,ইভানের শেষের কথাগুলো ভাবালো নিভানকে।বিমূঢ় করে দিলো একটা কথায়,তার আর ফুলকৌড়ির দিব্যি চলে যাবে মানে?
মানেটা কি তবে আজ খোলাসা করে বুঝিয়ে দিয়ে গেল ইভান!বুঝিয়েই দিয়ে গেলো তবে?খোলা হাত মুঠো হয়ে এলো নিভানের।হাতের তালুতে শক্ত আঙুলের চাপে মূহুর্তেই চামড়ার রগগুলো ফুলেফেঁপে টনটনে হয়ে উঠলো।নিজের অনুভূতি গুলোকে ভিতরে মাটি চাপা দেওয়ার প্রয়াসে শক্ত হয়ে এলো লম্বা চওড়া দেহ।তবে মন,তাকে মানাবে কিকরে?তবে সত্যিই কি তার নিজের চাওয়া পাওয়া বলে আর কিছুই থাকলো না।হঠাৎই মস্তিষ্ক বলে উঠলো,একেমন অদ্ভুত অবুঝ ভাবনা তোর!


মেয়ের নালিশ শুনেও চুপচাপ বসে আছেন ফাতেমা বেগম।এবাড়ির ছেলে বলতে উনার দূর্বলতার জায়গা।বিশেষ করে নাতীদের ক্ষেত্রে।সেখানে সেই নাতীর বিরুদ্ধে অভিযোগ।তিনি আমলে নিলেন না। একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুধাবে,মেয়েকে প্রচন্ড ভালোবাসেন।মেয়ের ভালোমন্দ কথা কাজে সঙ্গে দিতে বাধ্য হন।তাই
বলে নাতী আর মেয়ের মধ্যে হওয়া মলিন্যতার পক্ষ-বিপক্ষ করে কথা বলতে পারলেন না।বরংচ মেয়ের প্রতিই মনেমনে একটু অসন্তুষ্ট হলেন।কেনো ওই মেয়েটাকে সে এরকম খোঁটা দিয়ে কথা বলতে গেলো?এই একমাস যাবত মেয়েটা এবাড়িতে।কখনো তার অশোভন আচারন দেখেননি,চলাবলায় অশালীনতা পান-নি।নিজের নাতনিদের মতো হৈহৈ রৈরৈ করে কথাবার্তা বলতে শোনেননি।সবসময় শান্ত পদচারণে চলতে ফিরতে দেখেছেন।গায়ে মাথায় কি সুন্দর করে ওড়না দিয়ে ঢেকে ঢুকে চলাফেরা করে মেয়েটা।দেখলেই উনার কেমন ভালো লাগে।সেই মেয়েটার বিরুদ্ধে কথা বলতে যাওয়ার মানে হয়!দরকার ছিলো কি!আর-ও একটা সময় নিজের ছেলের দুরবস্থায় ওই মেয়েটার বাবা পরমআত্মীয়ের মতো সাহায্য করেছে।সেখানে সেই মেয়েটার সাথে কটু আচরন!এটা উনিও কাম্য করেন না।মেয়ের এই আচারন একটু-ও ভালো লাগলোনা উনার।যেকোনো কথাকাজে মেয়ের হয়ে সবসময় কথা বলেন তিনি।তবে এক্ষেত্রে কেনো জেনো মেয়ের সঙ্গ দিতে পারলেন না। বরং মেয়ের আচারনেই রুষ্ট হলেন তিনি।

‘তোমার কাজটা করা একদম ঠিক হয়নি।তোমার বড়ভাই জানলে কতোটা অসন্তুষ্ট হবেন বুঝতে পারছো?

আগুনের ঝলকানির ন্যায় ফুসে উঠলেন ডালিয়া বেগম।মা-ও এ-কথা বলছে।–আমি ভুল কি বলেছি?হ্যাঁ বলো?প্রথম রানী,তারপর নিভা….

ডালিয়া বেগমের কথা শেষ করতে দিলেন না ফাতেমা বেগম।কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললেন।

‘ভুলে-ও নিভানের নাম মুখে নিও-না।অন্তত ওর বেলায় লাগাম টানো মুখে।নাহলে পরবর্তীতে কেউ ছোটো বড়ো কথা শুনালে,আমাকে বলতে পারবেনা।যার অগাধ পরিশ্রমের টাকায় এতো বিলাস-বহুল জীবনযাপন করছো,অন্তত তার বিরুদ্ধে কোনো কথাবলা অভিযোগ সাঝে না,না তোমার আর না এবাড়ির কার-ও।বিবেক বুদ্ধি জাগ্রত করো ডালিয়া।আর কতোকাল অবুঝপনা করে চলবে,মেয়ে বিয়ে দিয়ে শ্বাশুড়ি হয়ে গেছো।এমন বিবেচনাহীন কথাকাজ আর তোমায় মানায় না।এবার একটু ভেবেচিন্তে কথাবার্তা বলা শেখো।

রাগ তো হলেন বিরক্ত হয়েও কথাগুলো মেয়ের বিরুদ্ধে বলতে বাধ্য হলেন ফাতেমা বেগম।ভিতরে ভিতরে জ্বললেও,আর কথা বাড়ালেন না ডালিয়া বেগম।আজ মা-ও উনাকে ছোটোবড় কথা শোনাচ্ছেন,বিষয়টাতে মনেমনে তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হলেন।

নিজের রুমে চুপচাপ বসে আছে কৌড়ি।হঠাৎই একটু আগের ঘটনা ঘিরে মন খারাপ তার।সব সহ্য হলেও কারও খোঁটা সে সহ্য করতে পারেনা।সহ্য হয়-না তার।অথচ তার জীবটা এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে ঠেকেছে সেখানে হয়তো খোঁটা ছাড়া সামনের দিনগুলো পার হবেনা তার।হঠাৎ মনেহলো, সে বাড়িতে থাকলে তো আর এসব শুনতে হতোনা,হবেওনা।আর না অন্যের ঝামেলা বা বাড়তি বোঝা হয়ে থাকতে হবে।নড়েচড়ে বসলো কৌড়ি।দাদীআপার সাথে কথা বলতে হবে।কথা বলার জন্য উদ্যোক্ত হতেই,মনে পড়লো।তার তো নিজস্ব কোনো ফোন নেই,তবে কার ফোন দিয়ে কথা বলবে সে?মান্যতা আপুতো তার রুমে এখনো ঘুমে।
আর মান্যতা আপু ছাড়া সহজে কার-ও ফোনে হাত দেয় না সে।দেওয়া হয়-না তার।দাদিআপার সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয়,সেটা বড়মার ফোন থেকে।আর এখন যদি বড়মার কাছে ফোন চায়,দাদিআপার সাথে কথা বলার জন্য। নিশ্চয় তিনি বুঝে যাবেন।সে নিজ থেকে কেনো দাদিআপার সাথে কেনো কথা বলতে চাইছে।আর দাদিআপারও বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আছে,যখন তখন ফোন দেওয়া।

ভাগ্য সুসম্পন্ন হওয়ায়,কৌড়ির ভাবনার মাঝে হঠাৎই ফোন হাতে প্রবেশ করলেন নীহারিকা বেগম।ব্যস্ত হাতে কৌড়ির দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন।

‘কথা বল দাদিআপা ফোন দিয়েছে।

কৌড়ি হাতে ফোন নিতেই,নীহারিকা বেগম ব্যস্ত পায়ে সামনে এগোতেই থেমে গেলেন।কৌড়ি কানে ফোন চেপে ধরেছে দেখে চোখের দ্বারা কিছু ঈশারা করলেন।কৌড়ি বুঝে ফেললো সেই ঈশারা।অর্থাৎ তিনি নিষেধ করছেন একটু আগে ঘটা ঘটনাটা দাদিআপাকে না জানাতে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌড়িও মাথা নাড়িয়ে আশ্বস্ত করলো,সে জানাবে বা।এমনিতেই সে কখনো জানাতো না।চলে গেলেন নীহারিকা বেগম।ফোনে মনোযোগ দিলো কৌ্ড়ি।

‘ও আপা কথা কইস না ক্যান?ভালো আছিস তুই?

নড়েচড়ে বসলো কৌড়ি।মনোযোগ দিল ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটার কথায়।–‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।তুমি কেমন আছো দাদিআপা?

কৌড়ির আলাপনের জবাব দিয়ে আরও ভালোমন্দ কথা বলতে,জানতে থাকলেন তিনি।যা প্রায়সই ফোন দিলে তিনি জেনে থাকেন কৌড়ির থেকে। মা বাবা হারা এতিম নাতনী উনার।সব থাকতেও যে কারনে অন্যের আশ্রয়ে পাঠালেন।অন্যের আশ্রয়ে আশ্রিত হলো নাতনীটা।সেখানে মেয়েটা ভালো আছে কিনা সেটার বিষয়ে তো খেয়ালী থাকতেই হবে উনার।শুনেছেন ওবাড়িতেও নাকি উপযুক্ত দু’দুটো ছেলে আছে।যে ভয়ে মেয়েটাকে ওখানে পাঠালেন।সেখানে সেই জাতীয় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কিনা নাতনীটা।তাদের চালচলন স্বভাব ব্যবহার কেমন?সেখানে উনার নাতনীটা ঠিকঠাক ভালো আছে কি-না,জানাটা যে দ্বায় উনার।না-হলে পরকালে ছেলের কাছে গিয়ে জবাব দিবেন কি-করে!আর এমনিতেই কৌড়ি উনার পরাণ।যে পরাণটাকে একটু স্বস্তি শান্তিতে বাঁচতে দেওয়ার জন্য, নিজের কাছ থেকে দূরে পাঠানো।পাঠাতে বাধ্য হলেন তিনি।তবে দূরে পাঠানোটা উনার মনেহয় স্বার্থক হয়েছে।ওবাড়ির মানুষগুলোর সম্পর্কে কৌড়ির থেকে তো সেই ধারণা হয়েছে উনার।মেয়েটা বরাবর ওবাড়ির মানুষগুলো সম্পর্কে ভালো ছাড়া খারাপ বলেনি।আর কৌড়ি যে সহজে উনাকে মিথ্যা বলবেনা,এটা উনি জানেন।আর নাতনী মিথ্যা বললে তিনি ধরতে পারেন।সেই শূন্য বয়স থেকে যে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন কি-না।

‘ও দাদিআপা,আমার না তোমার কাছে যেতে খুব মনে চাইছে।নিয়ে যাওনা আমারে।এমনিতেই তো সামনে পরিক্ষা তখন তো যেতেই হবে।আমাকে নিয়ে যাওনা তোমার কাছে,আমার না এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগেনা।সবকিছু কেমন পরপর মনেহয়।এমনিতেই তো এখানে আমার কিছু বলে নেই।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাজেদা খাতুন।বললেন–আমার কাছে রাখার সুযোগ,নিরাপত্তা থাকলে,আমার ছেলেডা মরতে না মরতে তোরে কি আর আমি অন্যের আশ্রয়ে পাঠাইতামরে আপা।কেনো বুঝোস না,আমার ছেলেহীন তুই এখানে থাকলে ওই অমানুষটা তোর মতো ফুলকে ছিড়েখুঁড়ে নষ্ট কইরা দিতো।তোর বাপ মরছে তা কি আর মানতো,ওই রাতেই তোরে জোরজবরদস্তি করে বিয়া করতো।আমি পারতাম ওদের ঠেকাইতে?আর না ও মানুষ হইলে আমি তোরে আমার থাইকা দূরে রাখতাম?অন্যের আশ্রিতা হতে দিতাম কখনো?তুই চলে যাওয়ার পর ওই অমানুষটা আরও ক্ষেপেছে,বলেছে যেভাবে হোক ও তোরে তুলে নিয়ে আসবে।তারপর নিজের স্বাদ পূর্ণ করবে।কতোবড় জানোয়ার হইলে আমার সামনে দাড়াইয়ে চোখ রাঙিয়ে এসব কথা বলে।তারপরও তোরে আমার কাছে রাখার সাহস করি কিকরে আপা?আমি পারতাম ওই অমানুষটা থেকে তোরে আগলে রাখতে?হয়তো পারতাম,যদি তাের চাচা আমার ছেলেডা মানুষ হইতো।কি যে পেটে ধরছিলাম, অমানুষের ঘরে আরেকখান অমানুষ হইছে।এবার বল,
আমি কি আর ইচ্ছে করে আমার থাইকা দূরে পাঠাইছি তোরে আপা?ইচ্ছে করে পাঠাইনি।

শেষের বাক্যগুলোয় হাহুতাশ করে আওড়াতে থাকলেন মাজেদা খাতুন।কথাগুলো নীরবে শুনলো কৌড়ি।সে চলে আসার পর কি হয়েছে তার জানা নেই।তবে কি হতে পারে, কিছুটা হলেও আন্দাজ আছে।আর দাদিআপা যে তাঁকে সব খুলে বলবেনা,এটা-ও তার জানা।সে আদরের নাতনি হওয়ার সাথে সাথে ওই অমানুষটাও যে তার নাতী।কৌড়িকে চুপ থাকতে দেখে হঠাৎই মাজেদা খাতুন শুধালেন।

‘ও আপা,তুই হঠাৎ আমার কাছে আসবার জন্য পাগল হইলি ক্যান? ওবাড়িতে কেউ তোরে কিছু কইসে?

নিজের ভবিতব্যের উপর আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেললো কৌড়ি।জবাব দিলো–না দাদিআপা।কে কি বলবে আমাকে।এবাড়ির সবাই খুব ভালো।আর আমাকে-ও সবাই খুব ভালোবাসে।আমার এমনিতেই তোমার কাছে যেতে মন চাইছিলো,তাই বলছিলাম।তোমাকে কতোদিন দেখিনা বলোতো?যে তুমি আমার মাথায় হাত না বুলিয়ে দিলে রাতে ঘুম আসতো না।গালে তুলে না খাওয়ালে আমার খাওয়া হতোনা।চুল না আঁচড়িয়ে দিলে ওভাবেই এলোমেলো জটবেধে পড়ে থাকতো সব।সেই তোমাকে ছাড়া কতোদিন পেরিয়ে গেলো বলো তো?এখন আমাকে একা সব করতে হয়।তখন তোমাকে খুব মনে পড়ে,তোমার কাছে চলে যেতে ইচ্ছে হয়।

কৌড়ির ভাঙা ভাঙা গলার কথাগুলো শুনে মাজদা খাতুন মন খারাপ করলেন।বৃদ্ধ মন কেঁদে উঠলো।তবে মেয়েটার কথায় ভেঙে পড়লে, দূর্বল হলে চলবে না।না হলেও মেয়েটা আর-ও দূর্বল হয়ে পড়বে।কৌড়ি ফের বললো।—ও দাদিআপা,আমাকে যেতে নিষেধ করছো।তবে তুমি আমার কাছে চলে এসো।আমরা দু’জন ছোটো একটা বাসা নিয়ে সেখানে দুজনে সংসার পাতবো।তবে আর কোনো সমস্যা থাকবেনা, ঝামেলা হবেনা।

এটা তিনি-ও ভেবেছিলেন মেয়েটার কাছাকাছি থাকার জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে নিজের অমানুষ নাতীর কথা ভেবেচিন্তে দমে রয়েছেন।কৌড়িকে আশ্বস্ত সরূপ বললেন।—আমারে আরও একটু সময় দে আপা।আমি নিশ্চয় তোর কাছে আইসা থাকবো।এখন একটু মানাইয়া গোছাইয়া থাক।যদিও পরের বাড়ী, নিজের বাড়ির মতোন থাকোন যায় না।তবুও।তুই আমার শান্তশিষ্ট খুব ভালো ফুলকৌড়ি না। মন খারাপ করে না আপা।সব ভালো হইবো দেখিস।

কৌড়ি আর কিছু বললোনা।নিঃশব্দে চোখের পানি পড়ে গেলো শুধু,তবে গলা স্বাভাবিক রেখে কথা বলার চেষ্টা করলো।নাহলে,তাকে ভালো রাখতে চাওয়া ফোনের ওপাশের বৃদ্ধা মানুষটা যে আরও মন খারাপ করবে।দুজনের মধ্যে আরও কিছুসময় কথা চললো।একটা সময় গিয়ে কথা শেষ হলো দু’জনের।ফোন রেখে এবার হুহু করে কেদে ফেললো কৌড়ি।তার একটা সুষ্ঠু সুন্দর পূর্ণ পরিবার থাকলে কি ক্ষতি হতো?কেনো এমন অভাগা হলো সে?আর এমনও কেনো হলো তার ভবিতব্য?কেনো?


সকাল থেকে নীহারিকা বেগমের মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে।হাতে দুরন্তপনায় কাজ চললেও,কথা পরিমানের তুলনায় কম বলছেন তিনি।বিষয়টা লক্ষ্য করলেন জাহিদ সাহেব।বুঝতে পারলেন,বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে স্ত্রীর মুড খারাপ হয়ে আছে।সারাদিনে কিছু না বললেও,রাতে খাবারের সময় তিনি জিজ্ঞেস করেই ফেললেন।—কি হয়েছে নীহারিকা?শরীর খারাপ নাকি অন্যকিছু হয়েছে তোমার?মুড এতোটা বিগড়ে আছে কেনো?

সারাদিনের ধৈর্যের বাঁধ বুঝি মূহুর্তেই চূর্ণ হলে উনার।গলায় ক্ষোভ নিয়ে বললেন– আপনার বোনকে আচার ব্যবহারে সাবধান হতে বলুন।মুখে লাগাম টেনে কথা বলতে বলবেন।সারাটাজীবন তার কটুবাক্য সবাই শুধু শুনে যাবে,আর তার এলেবেলে আচরণ সহ্য করবে!এমনটা কিন্তু আর চলবে না।এতোকাল সব মেনে নিয়ে চলতে দিয়ে আসলেও এবার কিন্তু তা আর আমি চলতে দেবো-না।মেনে নেবো না।আমার সংসারে এসব কিন্তু আমি আর সহ্য করবোনা।বহুত হয়েছে আর নয়।
আমাকে-সহ আমার ছেলেকে কম বলেনি।নীরবে সব সহ্য করেছি,কখনো ওর মতো হয়ে খারাপ কথা শোনাতে পারিনি।নীরবে সহ্য করতে হয়েছে আমাকে।এখন আবার ওই মেয়েটার পিছে লেগেছে।বয়স হয়েছে অথচ জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।লোপ পেয়েছে ছাড়া বৃদ্ধি পায়নি।সবকিছুর একটা সীমা থাকা উচিত।সীমা লঙ্ঘন হয়ে গেলে,পাপ কিন্তু বাপকেও ছাড়েনা।অন্যের পিছে লাগা বাদ দিয়ে নিজের মেয়ের কথা ভাবতে বলুন।

খাবার মুখে তুলতে ভুলে গেলেন জাহিদ সাহেব।নীহারিকা বেগমের তেজস্বী মুখের দিকে নির্বাক নজরে তাকিয়ে রইলেন।ডালিয়া এসেই শুরু করে দিয়েছে।এই মেয়ের স্বভাব ব্যবহার কি আর কখনো ভালো হবেনা।মনেমনে খুবই বিরক্ত হলেন বোনের আচারনে।নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে ঠান্ডা গলায় শুধালেন।—ডালিয়া কি বলেছে কৌড়িকে।

যদিও আন্দাজ করতে পারলেন,ডালিয়া কটুবাক্য হিসাবে কৌড়িকে কি বলেছে।তবুও শুধালেন।নীহারিকা বেগমও ক্ষুব্ধ হয়ে একে একে বর্ননা করলেন সকালের ঘটনা।তিনি বলতেন না,তবে সবকিছুর একটা সীমাবদ্ধ বলে জিনিস আছে তাইনা?সারাটাজীবন একটা মানুষ একই আচারন স্বভাবে কি-করে অটল থাকতে পারে!
সহ্য তিনিও কম করেননি।তবে সংসারে অশান্তির ভয়ে আর নিভানের মুখ চেয়ে সয়ে গেছেন সব।বিয়ের পর যে মেয়েদের বাপের বাড়িও পর হয়ে যায়,সেখানে তিনি ছিলেন বিধবা! আবার এক ছেলের মা।বাধ্য হয়ে সইতে হয়েছে উনাকে।তবে আর কতো!মুখ তো একটা সময় গিয়ে খুলতেই হতো।যদিও তিনি সেই স্বভাবের নন।বরং ছোটোজাকে আরও বেফাঁস বলা থেকে আঁটকে রাখেন, রাখার চেষ্টা করেন বরাবর।সেই উনারও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

‘তুমি শান্ত হও।অযথা প্রেশার বাড়িও না,আমি দেখছি।এখন আর নয় কাল ওরসাথে কথা বলে নিচ্ছি আমি।

‘কথা বলার সাথে সাথে,ওই মেয়েটার দাদি আপার পাঠানো কাগজপত্রগুলোও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিয়ে দেবেন।আর বলবেন সবাই তোমার মতো মন মানসিকতার হয়না।বিবেচনাবোধও তোমার মতো নয় সবার।মেয়েটাকে এখানে শুধু শুধু অন্যের অন্ন,অর্থ ধ্বংস করার জন্য আশ্রিতা সরূপ পাঠানো হয়নি।ওই মেয়েটাকে দ্বায়ে পড়ে এখানে থাকলেও,অনাথ নয়।

মনের মধ্যে জন্মানো এতোদিনের কিছু ক্ষোভ ক্রোধ মিশিয়ে আরও কিছু কথা বললেন নীহারিকা বেগম।তা নীরবে শুনে গেলেন জাহিদ সাহেব।কি বলবেন তিনি, বোনের স্বভাব সম্পর্কে তিনি অবগত।আর এই নারীটা, এই সংসারে এসে তো কম সহ্য করেনি।সহজে কখনো মুখ খোলেনি,উনার কাছে নালিশ জানায়নি,কোনোকিছু প্রকাশ করেনি।নীরবে সয়ে গেছেন। তবে তিনিতো জানেন বোনের সম্পর্কে।কিছু কিছু সময় সেসব কথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, কিছু কিছু সময় নীহারিকার কথা শুনে চুপ থেকেছেন।আজ সেই নারীটা ক্ষুব্ধ হয়েছে।নিশ্চয় বিষয়টা অধৈর্য্যর পর্যায়ে চলে গিয়েছে ব্যাপারটা।নাহলে এতোটা ক্ষুব্ধ তো কখনো হয়না এই ধৈর্য্যশীল শান্ত নারীটা।

রোজকার মতো সকালের এই সময়টা বাড়িটা ফাঁকা।খাবার খাচ্ছিলো কৌড়ি।মৌনতার স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে তাকে কলেজে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।বিগত সপ্তাহ ধরে কলেজ যাওয়া আসা করছে সে,কলেজে কিছু চেনা পরিচিত সল্প সংখ্যক মুখ হয়েছে।তবে মৌনতার সাথে কলেজে যাওয়ার আসার সুযোগ সুবিধা থাকলেও, যাওয়া আসা হয়না তার।কেননা,মৌনতার ক্লাস হয় দুই শিফটে।সকাল সাড়ে আটটা থেকে বারোটা অব্দি একটা শিফট।তারপর থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটা শিফট।মৌনতা সকালের শিফটে ক্লাস করে।বিধায় তাকে স্কুলে বের হতে হয় সাড়ে সাতটার দিকে।আর কৌড়ির কলেজ শুরু হয় দশটায়।বিধায় অত সকালে মৌনতার সাথে যাবার কোনো মানেই হয়না।তাই সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মৌনতার সাথে যাওয়া আসা কোনোটাই হয় না।এই নিয়ে মেয়েটার মন খারাপের শেষ নেই।মন খারাপ তারও হয়,তবে কি আর করার।

প্রথম কয়েকদিন কলেজে যাওয়া আসায় একটু অসুবিধা হলেও এখন আর সমস্যা হয়-না।রাস্তাটা খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করে নিতে পেরেছে সে।সোজা রাস্তা।কলেজের সামনে থেকে সিএনজিতে উঠলে সোজা মোড়ের মাথায় এসে নামিয়ে দেয়।আর সেখান থেকে বাড়ি দু’মিনিটের রাস্তা।বিগত সপ্তাহে যাবার সময়টা মান্যতা আপুর সাথে গেলেও,আসার সময়টা প্রায় ইভান ভাইয়া নিয়ে এসেছে তাকে।আবার ছুটির আগের দিন সে একা এসেছে।আজ মান্যতা আপুর সকালের দিকে একটা ক্লাস থাকায়, আজ সকাল সকাল চলে গিয়েছে সে।যাবার আগে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে গিয়েছে,কৌড়ি একা-একা যেতে পারবে কি-না? কৌড়ি বলেছে পারবে।আর না পারলে নীহারিকা বেগম বলেছে, বাড়ির গাড়িতো আছে।কৌড়িকে পৌঁছে দেবে।
তাই আজ কলেজে যাবার জন্য সবার শেষে পড়ে গিয়েছে সে।

‘মা,আমাকে খেতে দাও।

ভারিক্কী পরিচিত গলার স্বরটা শুনতেই প্লেটে হাত থেমে গেলো কৌড়ির।মূহুর্তেই জড়তা অস্বস্তি ঘিরে ধরলো তাকে।সেদিনের পর থেকে মানুষটাকে সেভাবে আর ভয় পায়না সে।তবে সংকোচ দ্বিধা রয়েই গেছে।মানুষটা আশেপাশে থাকলে সেটা খুবই গাঢ়ভাবে কাজ করে।হয়তো ইভান ভাইয়ার মতো মানুষটা খোলামেলা মনের হলে,এই জড়তা-সংকোচ কাজ করতোনা।দেখা সাক্ষাৎ বা কথা হয়না বললেই চলে।আর এই ধরনের গম্ভীর মানুষের সামনে সত্যি বলতে,কৌড়ির চলতে ফিরতে, কথা বলতে ভিষণ দ্বিধা হয়।এবাড়িতে আসার
প্রথম প্রথম তো ইভান ভাইয়ার সামনেও আড়ষ্টতা কাজ করতো,কিন্তু তার যেচে যেচে কথা বলা, চাঞ্চল্যে স্বভাব সেই আড়ষ্টতা দূর করে দিয়েছে।

‘কি হলো!থেমে আছো কেনো,খাচ্ছো না কেনো?

ভারিক্কী গলার বাক্যগুলো তাকে ঘিরে বুঝতেই চোখ বন্ধ করে মাথা আরও নুইয়ে ফেললো কৌড়ি।হা পায়ের নড়নচড়ন থেমে গলো মূহুর্তেই,পুরো শরীর জেনো অবশ অবশ লাগলো।হৃৎস্পন্দন জেনো তার গতিধারা ছেড়ে আরও দ্বিগুণ হারে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে থাকলো।নিজের বেহালদশা অনুধাবন করে নিভানকে মনেমনে প্রবোধন করতে লাগলো,কৌড়ি।জিজ্ঞেস করার কি দরকার ছিলো?তিনি এখানে এসেছেন এটা কি কম পড়েছিলো!

কৌড়ির নীরবতা,তাকে দেখে অকারণে এই নুইয়ে পড়া হঠাৎই নিভানকে রাগিয়ে দিলো।বুঝে আসেনা,তাকে দেখলে মেয়েটা এরকম অদ্ভুত আচারন করে কেনো?অথচ নাফিম আর ইভানের সাথে কি চমৎকার বন্ডিং তার।ইভানের নামটা মস্তিষ্কে ধরা দিতেই,কৌড়ির উপর অকারণে রাগ জেনো দ্বিগুণ চড়াও হলো নিভানের।কারণ ছাড়া ধমকে উঠে বললো।

‘এই সমস্যা কি তোমার,আমি সামনে এলেই তোমার কি হয়?সবার সামনে তো ঠিকঠাকই থাকো।আমি কি অদ্ভুত প্রানী,যে আমি দেখা দিলেই তোমার শুরু হয়ে যায়।হয়তো নুইয়ে পড়ো না-হলে লুকোচুরি খেলা শুরু করো।হোয়াই?টেল মি?হোয়াট ইজ ইয়োর প্রবলেম?

আচমকা ঘাড় উঁচু করে নিভানের মুখের দিকে তাকালো কৌড়ি।কাটকাট আদলের পরিপাটি শ্যামবর্ণ গম্ভীর মুখখানা দেখতেই বুক ধুকপুক করে উঠলো তার।হঠাৎ মানুষটা তার উপর রেখে গেলো কেনো বুঁজে আসলো না।বিধায় সব অনুভূতির উর্ধ্বে গিয়ে আচমকা মাথা উঁচু করে তাকিয়ে পড়েছে সে।ভারা দিঘির টলটলে সচ্চ জলের ন্যায়,ডগর ডগর নয়নজোড়া,নিজের নয়নে বাঁধা পড়তেই ক্ষোভিত গলার স্বর থেমে গেলো তার।ক্রোধিত নজর হয়ে গেলো শীতল।হৃদস্পন্দন থেমে গেলো নিভানের।জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়ার মতো নেশাধরানো দু’টো নজর।

‘কি হলো,হঠাৎ ওর উপর রেগে গেলি কি কারনে?কি করেছে ও?এভাবে বকছিস কেনো?

নিভানের চড়াও গলা শুনতেই রান্নাঘর থেকে ছুটে একপ্রকার ছুটে এসে কথাগুলো বলবেন নীহারিকা বেগম।হঠাৎ ছেলে কৌড়ির উপর রেগে গেলো কেনো?মেয়েটা তো চুপচাপ খাচ্ছিলো,তবে নিভানের কি হলো?কৌড়ি আগেই মাথা নিচু করে নিয়েছিলো।মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে বড়বড় কদম ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো নিভান।খোলা চোখে-ও ভেসে বেড়াতে থাকলো একটু আগের ডাগরডাগর সচ্চ টলটলে আঁখি যুগল।রাগমিশ্রিত মৃদুস্বরে মুখে বিড়বিড়ালো সে।

‘উফ,এই মেয়ে তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে।

অথচ নীহারিকা বেগম পিছে থেকে ডাকতেই থাকলেন কিন্তু কানে তুললো না নিভান।বড়বড় পা ফেলে চলে গেলো সে।ড্রয়িংরুম পার করতেই ইভানের সাথে দেখা হলো তার।মিটমিটিয়ে হাসছে ছেলেটা।হাসিটা জেনো কোনো ক্রমেই সহ্য হলোনা।দিল, কলিজা,সব জ্বালিয়ে দিলো।মনেহলো তাকে কেউ উত্তাপ্ত আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তার সবকিছু ছারখার করে দিচ্ছে।নিঃশেষ করে দিচ্ছে তাকে।

চলবে….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ