Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রিয়দর্শিনীপ্রিয়দর্শিনী পর্ব-৩৬+৩৭

প্রিয়দর্শিনী পর্ব-৩৬+৩৭

#প্রিয়দর্শিনী
#সুমাইয়া_যোহা

পর্ব-৩৬

দরজা ঠেলে মেহু তরুনিমার ঘরে প্রবেশ করে যেন হা করে তাকিয়ে আছে। তরুনিমা ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে টানা টানা কাজল। হলদে কাঠগোলাপের দ্বারা তৈরি গহনা যেন তরুনিমার সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে চলেছে। পান্থ তরুনিমাকে নিজের মনের মতো যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই সাজিয়েছে।

কিছুক্ষণ আগে,,,,

তরুনিমা ড্রেসিং টেবিলের টুলে স্ট্যাচু হয়ে বসে আছে। এক বিন্দু পরিমাণও যেন নড়াচড়া করতে দিচ্ছে না পান্থ। পান্থ ঠোঁটের মাঝ থেকে ব্রাশটা নামিয়ে তরুনিমাকে পুরো পর্যবেক্ষণ করে বলল-

: পারফেক্ট। বাট…

পান্থ খানিকটা ভাবুক হয়ে এদিক সেদিক হাতড়াতে শুরু করল। তরুনিমা খানিকটা ভ্রু কুচকে পান্থর কর্মকান্ড দেখছিল এবং নিজেকেও আয়নায় দেখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এই সুঠাম দেহের মানুষটাকে ভেদ করে আয়নায় তাকানো সম্ভব নয়। পান্থ অবশেষে উঠে গিয়ে দরজার পাশে থাকা কাবার্ডের উপর থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে আসললো। তরুনিমা এইবার আয়নায় নিজেকে দেখার সুযোগ পেতেই পুরো হতভম্ব হয়ে যায়। এতো সুন্দর করে কেউ সাজাতে পারে তাও উনার থেকে এমনকিছু পাবে সে আশা করেনি। পান্থ তরুনিমার পিছনে দাঁড়িয়ে প্যাকেট থেকে হলদে কাঠগোলাপের তৈরি মালা গলায় পরাতে নিলে তরুনিমা অকপটে বলে উঠল-

: অলরেডি তো আর্টফিশিয়াল অরনামেন্টস আছেই। আপনি আবার..

: আমি কোনো আর্টিফিশিয়াল মেয়েকে বিয়ে করছি না। আমি আমার হবু বউকে সবসময় সতেজ রাখতে চাই। আর তাই তাকে এই সতেজ ফুলের গহনা পরিয়ে দিচ্ছি। নো মোর ওয়ার্ডস। ডান।

পান্থ ওকে পুরোপুরি তৈরি করে ওর কাধে হাত রেখে আয়নায় তাকিয়ে কথাটা বলল। কথাটা শেষ করে সে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল। তরুনিমাকে কোনোকিছু বলার আর সুযোগ দিল না।

তরুনিমাকে আজকে অন্যরকম লাগারই কথা। কারন তাকে যে তার খুব কাছে একজন মানুষ সাজিয়ে দিয়েছে। মেহু ওর কাছে গিয়ে ওর হাতজোড়া নিজের হাত জোড়ায় নিয়ে অবাক মিশ্রিত কন্ঠে বলল-

: এতো সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে কে তরু? পান্থ তো আজ তোমায় দেখলে দৃষ্টিই সরাতে পারবে না। পান্থর কথা কেন বলছি আমি নিজেও তো সরাতে পারছি না। মাশাল্লাহ অনেক অনেক সুন্দর লাগছে।

: ধন্যবাদ ভাবি। এখন চলো নিচে দেরি হয়ে যাচ্ছে।

মেহু পুরো ঘরটার এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে তরুনিমাকে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে-

: হুমম যাবো। কিন্তু পান্থ কোথায়?

: পান্থ কোথায় মানে? উনাকে তো আমি দেখি নি। নিশ্চয়ই নিচেই আছেন।

তরুনিমা হকচকিয়ে কথাটা বলল। মেহু কিছু ভাবুক সুরে বলে উঠে-

: হয়তোবা। আচ্ছা চলো এখন। সবাই অপেক্ষা করছে।

হলুদ উৎসব…..

পর্দার একপাশে তরুনিমা আর তিথি এবং অন্যপাশে পান্থ আর মাহিম। মাহিম কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়ে বসে আছে। তার হবু বউকে সবাই হলুদ ছোঁয়াবে সে দিবে না। এদিকে পান্থ মনের সুখে বসে বসে ফোন গুতোচ্ছে। মাহিম পান্থকে একটা ঠেলা মেরে বলল-

: এই ব্যাটা! তোর কি একটুও খারাপ লাগছে না?

: কোন বিষয়ে?

: কোন বিষয়ে আবার? এই যে আমাদের হলুদের ফাংশন একসাথে হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কেউ কারোটা দেখতে পারছি না। মাঝে এই দেয়াল দিয়ে রেখেছে।

: ওহ… এইটা বলো।

পান্থ ভাবলেশহীন হয়ে কথাটা বলল। মাহিম অসহায়ের মতো ওর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ও ওর ভাইয়ের মতো চুপ করে বসে থাকবে না। সে তো হলুদ লাগাবেই। সবাই একে একে তরুনিমা তিথি পান্থ আর মাহিমকে হলুদ লাগাচ্ছে। হলুদের প্রায় শেষ পর্যায় আসতেই মাহিম জোরে চেচিয়ে উঠে। সবাই একটু ঘাবড়ে যায়। পর্দার ওই পাশে তিথি আর তরুনিমাও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খায়। মিসেস রুবিনা হন্তদন্ত হয়ে বলেন-

: কি হয়েছে মাহিম? এইভাবে চেচিয়ে উঠলে কেন?

: ওয়েট আ মিনিট মামনি। সবাই তো খুব বলেছিলে হলুদের ফাংশন একসাথে করবে। কিন্তু এখন কি করলে হলুদের ফাংশন প্রায় শেষের দিকে তবে এই পর্দা দিয়ে দেয়াল তৈরি করেছো।

মাহিমে এমন কথাশুনে সবাই হেসে উঠে। কিন্তু মাহিম তো দমবার পাত্র নয়। মাহিম ওর সামনে থাকা হলুদের বাটি থেকে হাতে হলুদ নিয়ে উঠে দাড়ায়। তারপর? তারপর মাহিম ফুল দিয়ে সজ্জিত শিফনের হলেদের কাপড়টা সরিয়ে ওপাশ গিয়ে তিথি দুই গালে হলুদ ছুঁইয়ে দেয়। মাহিম হঠাৎ এমন কান্ডে সবাই হা করে তাকিয়ে থাকার পাশাপাশি তিথি যেন পুরো থম মেরে যায়। ওর নিজের চোখদুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেছে। আর তরুনিমা বেচারি পান্থর কাছ থেকেও এমন কিছু আশা করেছিল কিন্তু তার আশায় পান্থ জল ঢেলে দিয়ে নির্বিকার ভাবে বসে আছে। যেন ওর কাছে সবকিছু একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি মনে হচ্ছে। মাহিম নিজের কোমরে হাত গুঁজে দিয়ে বলল-

: এখন ঠিক আছে। এইবার হলো হলুদ উৎসব সম্পন্ন হলো। যাই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই। লাভ ইউ তিথি।

শেষের কথাটুকু বলে তিথি কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মাহিম চলে যায়। আর তিথি পুরোই ফ্রিজ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর যখন সে বুঝতে পারে তার সাথে কি ঘটে গেছে। সে যেন কোনোমতে সেখান থেকে পালায়। আর যেতে যেতে ওকে এইভাবে সবার সামনে লজ্জায় লাল নালী বেগুনি সবুজ যা ছিল সব ফেলে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে যাওয়াতে মনে মপে বকা দিতে লাগলো।

—————————————————————

সন্ধ্যার সময় সবাই মেহেদী উৎসবের জন্য তৈরি হচ্ছে। তিথি আর তরুনিমাও তৈরি হয়ে নিয়েছে। দুজনেই লাইট গ্রীণ রঙের স্কার্ট প্লাজো এবং উপরে হাটুর নিচ অবদি লং ব্লাউজ হাতার কামিজ পরেছে। চুলগুলো রিবডিং করা। সাজ বলতে খুবই সামান্য চোখটা হাইলাইট করেছে। তারই সাথে কানে লম্বা চিকন চারটা চেইনের শেপের সমন্বিত হোয়াইট স্টোনের এয়ারিং এবং কপালে টিকলি। ঠোঁটে ম্যাট লিপস্টিক লাগানো। তিথি মাহিমের সাথে দেখা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সৃষ্টির তরুনিমার ঘরে প্রবেশ ঘটে।

: বাহ! খুব সুন্দর লাগছে তোকে। তা আমার ভাইকে যে বিয়ে করছিস আদৌ কি তার ব্যাপারে সবকিছু জানিস তুই?

তরুনিমা চোখ মুখ কুচকে সৃষ্টির দিকে তাকালে সৃষ্টি নিজের থুতনিতে হাত রেখে ন্যাকামি করে বলে-

: এহ.. যাহ। তুই জানিস না? তাহলে তো বলবো তুই একটা গাধা। যাকে বিয়ে করছিস তার চরত্রের ব্যাপারে চরিত্রের জানা উচিত ছিল তোর। সে যে কতো বড় একটা ক্রিমিনাল। এর আগেও সে অনেকের মেয়ের সাথে চিট করেছে। বিয়ে করবে বলেও সে বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙেছে। আমার তো ভয় হচ্ছে তরু তোর সাথে যদি এমন করে। তখন কি হবে তোর? তাই বলছি এই বিয়ে ভেঙে দে তুই তরু। আমি তোর বেস্টফ্রেন্ড তোর ভালোর জন্যই আমার সব বলা।

তরুনিমা নির্বাক হয়ে সৃষ্টির কথাগুলো শুনছে। ওর কি সৃষ্টিকে বিশ্বাস করা উচিত নাকি পান্থকে? নিজের ভাই সম্পর্কে কেউ তো আর বানিয়ে বলবে না সৃষ্টি সেটাই ওর ধারনা।

সৃষ্টি তরুনিমার হাত ধরে নরম সুরে বলল-

: দেখ দোস্ত আমি জানি, আমি তোর কখনো খারাপ চাই না। তোর হয়তো আমার প্রতি রাগ থাকতে পারে। কিন্তু তোর ভালোর জন্যই তোকে আমি সব বলেছি। যাতে পুনরায় আবার তুই যাতে কষ্ট না পাস।

তরুনিমা চুপচাপ সৃষ্টির সব কথা শুনলো। স্মিত হেসে সৃষ্টির থেকে হাত ছাড়িয়ে বলল-

: সত্যিই কি আমি কখনো তোর বেস্টফ্রেন্ড ছিলাম সৃষ্টি? সত্যিই কি?

সৃষ্টি তরুনিমার প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হলো। তরুনিমা একটা তাচ্ছিল্যে হেসে বলে-

: এই কথায় কথায় বেস্টফ্রেন্ড নামক যেই শব্দটা তুই বারবার প্রয়োগ করছিস তুই আগে বলতো তুই জানিস এর মর্ম? নুহাশকে তুই আমর থেকে কেড়ে নিলি। যেই মানুষটার সীমানা জুড়ে একটা সময় আমি বিরাজমান ছিলাম তাকে তুই এমনভাবে বুঝালি যে আমি ওর মোহ ছিলাম। সেও তোর কথায় আমাকে ছেড়ে দিল। হয়তো আমাদের ভালোবাসাতে কোনো ঘাটতি ছিল যার জন্য সেইটা ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে কি কোনো লাভ হলো। কি পেলি বল? নুহাশ তোকে ওর খুশির কারন ভেবেছিল আর তুই ওর আজ মন খারাপের কারন। আজ সে আফসোস করে আমাকে হারিয়ে। তোর আর নুহাশের যে ডিভোর্স হতে যাচ্ছে সেইটা আমি জানি। তুই এখানে এসে মিথ্যে বলেছিলি সবার সামনে। নুহাশের মা অসুস্থ নয় তিনি চারমাস হলো মারা গেছে। এতোকিছু হয়ে যাবার পরও তুই এতোটা স্বার্থপরতা… কেন?

তরুনিমা খানিকটা ভারাক্রান্ত হয়ে কথাগুলো বলল। সৃষ্টি চোখ মুখ শক্ত করে বলে-

: আমি স্বার্থপর? স্বার্থপর তো তুই! তোর জন্য আজ আমাদের ডিভোর্স হতে যাচ্ছে। তোর জন্য আমি পুহাশকে একদিনও নিজের জন্য পায়নি। বিয়ের এক সপ্তাহ যেতে না যেতে ও কেমন যেন পাল্টে গিয়েছিল।

: পাল্টে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। ও যাকে ভালোবাসা ভেবে ফিরে গিয়েছিল সে ছিল ওর মোহ। আর যাকে সে মোহ ভেবেছিল সে ছিল ওর ভালোবাসা। কিন্তু আফসোস নুহাশ সেটা বুঝতে দেরি করেছে। একটা কথা মনে রাখিস সৃষ্টি কাউকে ঠকিয়ে কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ কখনো ভালো থাকে না। ভালোবাসা আর মোহ এই দুটো জিনিস খুবই জঘন্য এই দুটোর সংমিশ্রন যখন কেউ ঘটিয়ে দেয় তখনই সে বুঝতে পারে না যে তার জন্য কোনটা ঠিক। আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল কি ছিল জানিস? তোকে আমার লাইফে বেস্টফ্রেন্ড বলে স্বীকৃতি দেয়া। আর নুহাশের মতো একজন ভুল মানুষকে ভালোবাসা। তুই পান্থর কথা বলছিলি না। যে ও আমাকে বিয়ে নাও করতে পারে। সে আমাকে বিয়ে করবে নাকি করবে না সেইটা তোর না ভাবলেও চলবে। শুধু এতোটুকুই বলবো অন্তত এবার একটু এই জেদ হিংসা এগুলো ছাড়। আর নিজের সংসারটুকু পারলে বাচানোর চেষ্টা কর। নুহাশের সাথে সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা কর। এতে তোদের দুজনের জন্যই মঙ্গল হবে।

তরুনিমা আর কিছু বলল না। সৃষ্টি হনহন করে তরুনিমার ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যায়। তরুনিমা সৃষ্টির চলে যাওয়ার পর ছোট একপা নিঃশ্বাস।

#চলবে____

#প্রিয়দর্শিনী
#সুমাইয়া_যোহা

পর্ব-৩৭

মেহেদীর অনুষ্ঠানে সবাই বসে মেহেদী লাগাচ্ছে। এক পাশে মিউজিক হচ্ছে। সবাই নাচানাচি করছে। একদিকে আমাদের মেহেদী লাগানো হচ্ছে। হুট করে তিথির গলা জড়িয়ে ধরে ওর সাথে আলিঙ্গন করা শুরু করে এক নারী। আমি প্রথমে খানিকটা চমকে উঠলেও পরে সেই নারীকে দেখে আমি যেন স্থির থাকতে না পেরে আমিও তাকে আলিঙ্গন করি কারন সে আমার ফ্রেন্ড রিতা। রিতা তিথির বড় বোন। রিতার সাথে যদি তেমন সখ্য না থাকায় ওর পরিবারের ব্যাপারে তেমন কিছুই আমার জানা ছিল না। রিতা আমাকে দেখে ওর চোখে স্পষ্ট জলগুলো চিকচিক করছে। ও আমার দিকে গালে হাত রেখে অশ্রু ভেজা কন্ঠে বলল-

: আমি অনেক অনেক খুশি তরু। ফাইনালি তুই তোর লাইফ পার্টনার পেলি।

রিতাকে দেখে মনে হলো ও প্রেগনেন্ট। আমি স্মিত হেসে বললাম-

: সবই বুঝলাম। কিন্তু তোর এই অবস্থা? বিয়ে কবে করেছিস?

: বিয়ে হয়েছে এক বছর হবে আর কয়েকমাস পর। আর ছয়মাস হলো আমি প্রেগনেন্ট। কথা ছিল আসবো না কজ কিছু ইস্যু ছিল আর রাফিন তো আমাকে নিয়ে আসতেই চায় নি। কিন্তু তিথি যখন আমাকে ওদের আর তোদের ছবি দেখালো আমি সকালের ফ্লাইট নিয়ে লন্ডন থেকে ব্যাক করেছি। জানি রাফিন একটু ক্ষেপে আছে তবে সমস্যা নেই ওকে আমি ম্যানেজ করে নিব। দেখ এখনো একটু মুখ ফুলিয়ে আছে।

: শুধু শুধু কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল?

: এইটা কোনো কষ্টই না। একদিকে আমার বোনের বিয়ে আর একদিকে আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে আসতেই হতো। আমি তো নাচবো!

রিতা শেষের কথাটা বলেই হাত উঠিয়ে নাচতে নিলেই রাফিন ভাইয়া এসে হাত ভাঁজ করে চোখ মুখ শক্ত করে রিতার সামনে দাঁড়ায়। রিতা হাতটা নামিয়ে একটা অমায়িক হাসি দিয়ে বলে-

: আমি তো এমনেই হাত তুলছিলাম। তুমি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?

: তিথি তোমার বোনকে বলে দাও কম লাফাতে। নইলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।

রাফিন ভাইয়া একটু রাগান্বিত সুরেই কথাটা বলল। আমি তিথি খানিকটা মিটমিটিয়ে হাসলাম। রাফিন ভাইয়া আমার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই সন্তোষজনক আচরন করেন।

মেহেদীর অনুষ্ঠানে এখনো আগের মতোই চলছে। মাহিম ভাইয়া তিথির পাশে বসে ওর মেহেদী দেখছে আর একটু পর পর তিথিকে বিভিন্ন বাহানায় রাগানো চেষ্টা করেই যাচ্ছে। সবার ছবি হচ্ছে। সেই সাথে কাপল পিকও তোলা হচ্ছে। কিন্তু আমার চোখ জোড়া যে একজনকে চাতক পাখির মতো মতো খুঁজে বেরাচ্ছে। সবার সাথে হেসে হসে কথা বললেও ভিতরে কেন জানি না বড্ড খারাপ লাগা শুরু করল। কালকে আমাদের বিয়ে জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু মানুষটা বিন্দুমাত্রও আমার সাথে কথা বলেনি আজ দুদিন হলো। কোনো কারনও বলেনি। হাতের দুই পিঠে মেহেদী লাগানো শেষ হয়ে গেলে আমি উঠে দাড়াতেই তিথি বলে উঠে-

: কোথায় যাচ্ছো তরু আপু?

: আমার ভালো লাগছে না। আমি ঘরে একটু রেস্ট নিয়ে আসি।

: আর ইউ ওকে? মামনিকে ডাকবো?

: আরে না না। মামনিকে ডাকার দরকার নেই।

কথাটা শেষ করেই সেখান থেকে চলে আসি। সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে নিজের ঘরে অনেকটাই অভিমান করে যেতে লাগলাম। হঠাৎ গিটারের কিছু পরিচিত টুং টাং শব্দ কানে ভেসে আসলো। নিজের কানকে খাড়া করে শুনার চেষ্টা করলাম সেই শব্দটুকু। টেরেসের দিকে থেকেই যে আওয়াজটা ভেসে আসছে সেটা আর বুঝতে বাকি রইল না আমার।

———————————————————–

ছাদের একপাশে চেয়ারে বসে লাইট গ্রীণ কালারের পাঞ্জাবী পরিহিত এক সুপুরুষ হাতে গিটার নিয়ে তাতে সুর তুলছে। পাঞ্জাবী হাতাটাও বরাবরের মতোই ফোল্ড করে রেখেছে সে। চোখ জোড়া বন্ধ করে গিটারে সুর তুলতে তুলতে গেয়ে উঠে-

“অলির কথা শুনে বকুল হাসে
কই তাহার মত তুমি আমার কথা শুনে
হাসো না তো।।
ধরার ধুলিতে যে ফাগুন আসে
কই তাহার মত তুমি আমার কাছে কভু
আসো না তো।।”

তরুনিমার নিকট এই চিরপরিচিত কন্ঠটা যেন ওকে ছাদে নিয়ে আসতে করে। সে ছাদের একপাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে পান্থর গানটা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ছাদে শীতের দমকা হাওয়ায় তার হালকা কাপুনি ধরছে তবুও সে যেন নিশ্চুপ হয়ে পান্থর গলায় গানটা শুনছে।

“আকাশ পারে ঐ অনেক দূরে
যেমন করে মেঘ যায় গো উড়ে।
আকাশ পারে ঐ অনেক দূরে
যেমন করে মেঘ যায় গো উড়ে।
যেমন করে সে হাওয়ায় ভাসে
কই তাহার মত তুমি আমার স্বপ্নে কভু
ভাসো না তো।।

অলির কথা শুনে বকুল হাসে
কই তাহার মত তুমি আমার কথা শুনে
হাসো না তো।।

পান্থ ওর অর্ধেক গানটা শেষ করতে হুট করেই ওর সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে থেমে যায়। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখে সৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে।

: কি হলো ভাইয়া? গানটা বন্ধ করে দিলে কেন? গাও.. তরুনিমা যে তোমাকে এতোটা কষ্ট দিবে সেটা আমি ভাবতেও পারিনি। কাল তোমার বিয়্র আজ তুমি এখানে মনমরা হয়ে বসে আছো এখানে ছাদে। কোথায় তোমার সেই হবু বধু যে তোমার জন্য বিন্দু পরিমাণ চিন্তা করছে না। নিচে তো দেখে এলাম দিব্যি নাচছে সবার সাথে। আর এখানে যে ওর বর আড়ালে বসে কষ্ট তা দেখছে না। কেমন ভালোবাসে ও তোমাকে?

: সৃষ্টি কেন এসেছিস এখানে? যদি এমনেই আসিস তাহলে যাহ এখান থেকে। আই নিড সাম স্পেস।

পান্থ নিজেকে সংযত রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল। সৃষ্টি পান্থর সামনে গিয়ে ওর কাধে হাত রেখে নরম এবং চিকন সুরে বলল-

: ভাইয়া তুমি এতো অভিমান জমে রাখছো কেন? তরুনিমা তো আগের থেকেই এমন ছিল। কখনো কারো কথা ভাবেনি সে। ভাবেও না। সবসময় নিজের হ্যাপিনেসটাই দেখে গেছে। অন্যকারা ভালো মন্দ কিছু সে দেখেনি সে। ভাইয়া আমি চাই না তুমি এভাবে কষ্ট পাও। আমি মামী আর মামাকে এখুনি সব বলছি। আমার তো লজ্জা লাগছে যে আমার বেস্টফ্রেন্ড..

সৃষ্টি ওর পুরো কথা শেষ করার আগেই পান্থ এবার আর চুপ করে থাকলো না। সে গিটারটা চেয়ারের উপর রেখে রাগান্বিত হয়ে বলে-

: এনাফ সৃষ্টি! অনেকক্ষণ তোর অনেক কথা শুনেছি! খুব তো বড় বড় কথা বলছিস যে তরুনিমা এমন না অমন। তুই যে কেমন যা আমাকে চিনাতে আসিস না। তোর লজ্জা করছে ওকে তোর বেস্টফ্রেন্ড বলতে? আমি তো মাঝে মাঝে ভাবি তোর মতো একটা কালসাপ তরুনিমার বেস্টফ্রেন্ড হলো কিভাবে? অবশ্য তরুনিমা তো একটা ইডিয়ট যার জন্য এখনো ও তোকে সহ্য করছে। ভাবিস না যে আমি কিছুই জানি না। আর এটাও ভাবিস না যে তরুনিমা সব বলেছে আমায়। আমি পান্থ শাহরিয়ার, সো আমাকে কারোর কিছু বলতে হয় না। তুই যা করেছিস তরুনিমার জায়গায় আমি হলে তোকে দুইগালে ঠাস ঠাস দুইটা চড় বসিয়ে দিতাম। তাই বলছি এসব আলতু ফালতু কথা না বলে চুপচাপ বিয়ে খেতে এসেছিস খেয়ে চলে যাহ! আমার আর তরুনিমা বিয়ে ভাঙারও চেষ্টা করবি না! তার চেয়ে বেটার হয় নিজেকে শুধরে নেয়ার চেষ্টা কর একটু ভালো হওয়ার চেষ্টা কর।

: ভাইয়া এসব তুমি কি বলছো? আমি তোমার বোন। তোমার ভালো জন্য..

: আমার ভালো? হাহ..! যে নিজের বেস্টফ্রেন্ডেরই ভালো চাইতে পারেনি সে আবার আমার ভালো চাবে। ব্যাড জোকস! এখন যাহ এখানে থেকে। আদারওয়াইজ…

: আদারওয়াইজ কি ভাইয়া?

: আদারওয়াইজ তোমার ভাইয়া তোমাকে এই শীতের সময় পানিতে চুবানি দিবে।

তরুনিমা হাতে একটা শাল নিয়ে পান্থর গায়ে জড়িয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথাটা বলল। সৃষ্টি দাঁত কিড়মিড় করে বলল-

: দেখ তরু!

: কল মি ভাবি! আমি তোমার ভাইয়ের ওয়াইফ এন্ড সম্পর্কে ভাবি হই। জাস্ট কল মি ভাবি! এর বাইরে আর কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের মাঝে। ইউ মে লিভ নাও।

সৃষ্টি রাগে গজগজ করতে করতে ছাদ থেকে নেমে গেল। ওর যে কোনোভাবেই কোনোকিছু সম্ভব না করা সেটা ওর আর বুঝতে বাকি রইল না।

#চলবে____

(বাস্তবিকতা ও কাল্পনিকতার সংমিশ্রনে গল্পটি সাজানো। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গুড লাক।)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ