Friday, June 5, 2026







প্রিয়_প্রাণ পর্ব-২৬+২৭

#প্রিয়_প্রাণ
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ২৬

হাত চুয়ে চুয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পরছে তোঁষা’র। সুন্দর মুখটাতে সাজ লেপ্টে একাকার। আরহামে’র পা জোড়া রুমে এসেই থমকে গেলো। তোঁষা’র বা হাতে সিরিঞ্জের নিডলটা ঢুকে আছে সেখান থেকেই র*ক্ত পড়ছে। শাড়ীটা না কত সুন্দর করে পরলো অথচ এখন আঁচলটা ও জায়গা মতো নেই। কেন নেই? কি হয়েছে তা বুঝে না আরহাম। শুধু ধপ করে বসে পরে ফ্লোরে। তোঁষা’র চোখের পাপড়িগুলো নড়ছে অল্পসল্প। পাতলা লাল রঙে রঙ্গিন ঠোঁট’টা কাঁপছে অনবরত। মনে হচ্ছে কিছু বলছে। হাঁটুতে ভর দিয়েই এগিয়ে এলো আরহাম। তাকালো ওর তুঁষে’র পানে। একহাত রাখলো তোঁষা’র গালে। তোঁষা এলিয়ে দিলো নিজের মুখটা। সম্পূর্ণ ভর এখন আরহামে’র হাতের তালুতে। এক হাতে খুবই ধীরে তোঁষা’র হাতে গাঁথা সুই’টা টেনে নিলো। এখনও কিছুটা লিকুয়িড বাকি এটাতে। টান দিয়ে বের করতেই র’ক্ত গড়ালো আবারও। আরহাম খুব অল্প স্বরে ডাকলো,

— তুঁষ?

— হুউ।

মৃদু শব্দে উত্তর করে তোঁষা। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো আরহাম। ক্লান্ত অবশান্ত চোখ দুটো দেখেই যাচ্ছে তোঁষা’কে। বারবার আরহামে’র ভেতরটা চিৎকার করে বলছে, “কেন এইসব?”

তোঁষা’কে বুকে টেনে নিলো আরহাম। সামনে তিনটা এম্পুল খালি দেখে যা বুঝার বুঝলো। ভয়ে এবার তোঁষা’কে বুকে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেললো আরহাম। তোঁষা ম’রার মতো পরে রইলো আরহামে’র বুকে। আরহাম গুমড়ে কাঁদতে কাঁদতেই অভিযোগ জানায়,

— তুই না সাজলি? তুই না কেক বানালি? কোথায় সব? এই তুঁষ, কথা বল! এসব কি করলি তুই প্রাণ? তুই এটা কি করলি? এভাবে…..

কথা বের হলো না আরহামে’র গলা দিয়ে। শব্দ করে কেঁদে যাচ্ছে ও। খেয়াল রইলো না তোঁষা’র দিকে। তোঁষা’র নেতানো শরীরটা নিজের বুকে নিয়ে বহু কষ্টে আরহাম উঠে। বিছানায় যত্ন করে রাখে। ড্রয়ার খুলে তুলা দিয়ে তোঁষা’র হাতটা পরিষ্কার করে। একটু ঢোক গিলে তোঁষা’র আঁচলটা বুকে টেনে দিলো। দুই হাতে তোঁষা’র মুখটা ধরে কপালে দীর্ঘ সময় নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো আরহাম৷ ধীরে ধীরে নামলো নাকে অতঃপর ঠোঁটে। আলতো আদর দিতে দিতে বুকে নামলো আরহাম। মাথা রাখলো তোঁষা’র বক্ষে। ছোট্ট শিশুর ন্যায় জায়গা করে নিলো তোঁষা’র বুকে।
আরহামে’র কম্পিত শরীরটা মিশে গেলো ওর তোঁষা’র সাথে। ঠিক অবুঝের ন্যায় সে কাঁদলো তার তোঁষা’র বুকে।
অবহেলায় ফ্রিজে পরে রইলো অপরিপক্ক হাতে বানানো চকলেট কেকটা।
__________________

এত রাতে বেজায় মেজাজ খারাপ হলো তুষা’রের। ওর হাতে তথ্য’র রিজাইন লেটার। যদিও এটা সরাসরি দায়িত্বরত অফিসারের নিকট পাঠানো হয় তবে তথ্য’র এই লেটার পাওয়া মাত্র পাঠানো হয়েছে তুষা’রের কাছে। তুষারের দায়িত্ব না এসব হ্যান্ডেল করা। তবুও না চাইতে ডাক পাঠালো তথ্য’কে। এদিকে ঘন্টা পার হয়ে গেলেও তথ্য’র আসার নাম নেই। বিরক্তিতে দুই আঙুল কপালে ঘঁষলো তুষার। এমনিতেই তোঁষা নিয়ে চিন্তায় আছে ও। বাসা খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে না। আদনানে’র সাথে কথা হলো কিছুক্ষণ আগে। মায়ের শরীর খারাপ যাচ্ছে। বাবা বৃদ্ধ বয়সে এসে অতি আদরের মেয়েকে হারিয়ে পাগল প্রায় অবস্থা। এদিকে তুষা’র ডিউটি করে বোনের খবর যোগাতে ব্যাস্ত অথচ নতুন করে নাটক শুরু করেছে তথ্য। আজ একে উচিত শিক্ষা দিয়েই ছাড়বে তুষার৷ এই মেয়ের সাহসের তারিফ করতে হয়।

উঠে দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে বাইরে এলো তুষার৷ হাটা দিলো তথ্য’র রুমের দিকে। এই প্রথম নক না করেই তুষার ঢুকে পরলো। ঢুকতেই কিছুটা অবাক হয়ে গেল। রুম জুড়ে কাপড় ছড়িয়ে তা লাগেজ ভরছে তথ্য সেই সাথে সমান তালে কেঁদে যাচ্ছে। এই প্রথম বুঝি এই মেয়েকে কাঁদতে দেখলো ও। সবসময় যথেষ্ট সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছে তথ্য। যথেষ্ট স্ট্রং একজন অফিসার অথচ এই মেয়ে এখন ছেঁকা খেয়ে ব্যাকা টাইপ কান্না করছে। তুষার গলা খেঁকানি দিতেই তথ্য তাকালো। তুষারকে দেখে চমকালো না বরং লাগেজের চেইন লাগানো। হাতে ফোন তুলে সোজা বাবা’কে কল লাগিয়ে একদমে বলে উঠলো,

— ঐ পাইলট’কে বিয়ে করব৷ সকালেই বাসায় পৌঁছে যাব বাবা।

তথ্য’র হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে কল কাটলো তুষার। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো,

— এসব কি?

বলেই লেটারটা ছুঁড়ে মারলো তথ্য’র সামনে। তথ্য সেটা উঠিয়ে শান্ত স্বরে বললো,

— রিজাইন লেটার।

— ফর হোয়াট?

— আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু কন্টিনিউ।

— তার জন্য যথেষ্ট কারণ সহ রিজাইন লেটার দরকার। এই ফালতু লেটার কোন সাহসে পাঠাও? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?

— প্রাথমিক ভাবে পাঠিয়েছি স্যার। এন্ড খুব শিঘ্রই বিয়ের জন্য ছুটি নিব অতঃপর পারমানেন্ট বিরতি।

— তথ্য।

— বলুন।

চোখে চোখ রেখে বললো তথ্য। কিছুটা অবাক হয় তুষার। এই পর্যায়ে কিছুটা কাতর শুনালো তুষা’রের গলা,

— সময় দাও কিছুটা।

— পাইলট এন্ড আর্মি ভালো মানাবে। এটাই তো বলেছিলেন স্যার।

— সময় দেয়া যাবে না?

— আর কত?

— আর কিছুটা।

— বিয়ে করবেন আমাকে?

……………

— বিয়ের নাম শুনতেই শেষ? এখন নিন সময়? আপনি কোনদিন কাউকে ভালোবাসতে পারবেন না তুষার। কোনদিন আমাকে বিয়ে ও করতে পারবেন না। জাস্ট এমনিই এতদিন আমাকে ঘুরালেন আপনার পিছনে। ওহ সরি আপনি ঘুরান নি বরং আমি ঘুরেছি। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি দুঃখীত স্যার। আপনাকে আর জ্বালাবে না তথ্য। থাকবেই না এখানে। আপনি বিয়ে করুন কার্নেল তাহেরের মেয়েকে। এই জন্যই আমাকে পাত্তা দেন না? আগে বললেই হতো……

তথ্য’কে কথা সম্পূর্ণ করতে দেয়া হলো না। তুষার তাকে আটকে দিলো। তথ্য’র দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো। শ্বাস আটকে এলো। হাত পা ছুড়লেও লাভ হলো না। দুই হাত পিছন দিকে মুচড়ে ধরা তুষার নিজের বা হাত দিয়ে। ডান হাতটা তথ্য’র চুলের ভাজে। শক্ত করে তথ্য’র চুল খামচে ধরা তুষার। এই প্রথম নিজের এতটা সন্নিকটে কোন পুরুষের অস্তিত্ব কাঁপিয়ে তুললো তথ্য’কে। হাল ছেড়ে দিলো সে। তথ্য’র মনে হচ্ছে ওর শরীরটা ভাসছে বাতাসে। কখন যে তুষার ওকে উঁচু করলো টের ই পেলো না ও।
দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পর ছাড়া পেলো তথ্য। সাথে সাথেই জোরে শ্বাস টানতে চাইলো। লাভ হলো না এতে তুষার পুণরায় একই কাজে মত্ত হলো।

দুই মিনিট যেতেই ছাড়লো তুষার। তথ্য’র অবস্থা যেন বেগতিক। তুষার তথ্য’র কাঁধের দিকে নিজের মুখ ঘঁষে ঠোঁট মুছে নিলো। তথ্য’র মুখের সামনে মুখ নিয়ে বললো,

— পাঁচ মিনিট টিকতে পারো না সারাজীবন কিভাবে টিকবে?

তথ্য শ্বাস টানার কারণে কথা বলতে পারলো না। তুষার পুণরায় বললো,

— দশ মিনিট পানির নিচে কিভাবে ছিলে ট্রেনিং এর সময়? এখন তো দুই মিনিট ও ঠিকঠাক ভাবে পারলে না কিছু।

তথ্য হঠাৎ কেঁদে উঠলো। দুই হাতে তুষা’রের গলা জড়িয়ে ধরে ধরতেই তুষার আলগা হাতে তথ্য’কে জড়িয়ে ধরলো। কানে চুমু খেয়ে বললো,

— এখন করবে বিয়ে?

— করব।

#চলবে…..

#প্রিয়_প্রাণ
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ২৭

সময় গুলো খুবই দ্রুততার সাথে অতিক্রম করে চলে গেল। দেখতে দেখতে চোখের পলকে কিভাবে যেন সাতটা মাস অতিক্রম হলো। কেউ টের পেলো না আবার কেউ বা কারা টের পেলো অতি গভীর ভাবে। নিগূঢ়তার সাথে। কারো জীবন ছন্নছাড়া হলো তো কেউ হারালো জীবনের লক্ষণ। কেউ বা গা ভাসালো স্রোতের সাথে। কেউ আছড়ে পরলো তাল মিলাতে না পেরে।

কপালে জমা ঘাম টুকু হাত দিয়ে মুছলো তথ্য। ক্লান্ত লাগছে আজ। সোজা হেটে সামনে গিয়ে ঠান্ডা পানি পান করলো কিছুটা। সস্তি শরীর পেলেও মন পেলো না। মন টা আদৌ কি আছে তার সাথে? নিজেকে প্রশ্ন করেও উত্তর পেলো না তথ্য। তুষার, খারাপ লোকটা যাওয়ার সময় তার মন সহ সবটা নিয়ে গিয়েছে। রেখে গিয়েছে শূন্য এই দেহটাকে। যেটা টেনে বেড়াচ্ছে তথ্য একা। একা থাকলেই মনে হয় এই বুঝি তুষার এলো। অপেক্ষাটা দীর্ঘ হচ্ছে। তথ্য শ্বাস ফেললো ক্ষুদ্র একটা। সকল মন খারাপ তো তখনই মিটে যায় যখন সেদিন রাতের কথা ভাবে তথ্য। তুষার’কে ক্ষেপাতে গিয়ে নিজেই আহত নিহত হয়েছিলো তথ্য। তথ্য’কে নিয়ে ঐ দিন ই বিয়ে করলো। ঐ অচেনা রাজশাহী শহরে দুটো আর্মির বিয়ে হলো। সাক্ষী রইলো চারজন বড় আর্মি অফিসার আর মেহমান হলো ট্রেনিং এ থাকা জুনিয়র সকলে। কি এক আজব কান্ড ই না ঘটলো। কর্নেল তাহেরের আচরণ ছিলো সবচেয়ে অবাক করা। তুষারের কান্ডে তার উচিত ছিলো রেগে যাওয়া অথচ তিনি রাগ করলেন না বরং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে পড়ালেন।
জুনিয়র গুলো আবার এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ মিনিটের ব্যাবধানে তাদের বাসর সাজালো। কিভাবে? কখন? জানা নেই তথ্য’র। কিচ্ছু জানা নেই। ভিডিও কলে তার বাবা মা দেখেছে তাদের বিয়ে।
সেদিনের রাতটা ছিলো স্বপ্নের। তুষারের মতো এত বড় একজন পুরুষ’কে বাগে আনতে পেরে তথ্য’র খুশি যখন বাঁধভাঙা তখনই তুষার রুমে ঢুকে সর্বপ্রথম যা বললো তা ছিলো তার তোঁষা নিয়ে। তার পরিবার নিয়ে। তুষার মনে কিছু রাখে নি বরং তথ্য’কে সবটা জানায়। এটাও জানায় তার জীবনে তোঁষা’র গুরুত্ব ঠিক কতটুকু। তথ্য আগেই জানতো। তবে বোনের প্রতি ভাইয়ের এহেন ভালোবাসা আর পিতা সুলভ আচরন দেখে মুগ্ধ বৈ কিছু হলো না।
তুষার’কে হতাশ করে নি তথ্য। বরং সেদিন রাতটাকে তারা রাঙিয়েছিলো নিজ রঙ তুলির আচড়ে। তথ্য সেখানে ছিলো এক অবলা ক্যানভাস। আর সেই ক্যানভাস জুড়ে তুষা’র এঁকেছে। মন প্রাণ উজার করে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষটা আচড় কেটেছে নিজের তুলির। রাঙিয়েছে তথ্য’কে নিজ রঙে। পূর্ণতা পেয়েছে তাদের ভালোবাসা।
এত এত সুখানুভূতিতে লুটোপুটি খাওয়া ক্লান্ত তথ্য সময় পেলো না অনুভূতিগুলো গোছাতে। তার আগেই এক কল এলো। তুষার ভোর রাতে শুধু তথ্য’র কপালে গভীর চুমু খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। মানুষটা সেই যে গেলো এখনও এলো না।

ভালেবেসে নিজের প্রাণে’র অপেক্ষা করতে জানে তথ্য। যেখানেই যাক না কেন সে প্রাণে’র টানে ফিরে আসবেই।

___________________

আরহাম দাঁড়িয়ে আছে বিছানা বরাবর। বিছানায় এলেমেলো তোঁষা ঘুমোচ্ছে। সেদিন যখন আরহাম পাগল প্রায় অবস্থা তখন তোঁষা ছিলো জ্ঞানহীন। টানা তিনদিন পর সম্পূর্ণ হুসে ফিরে তোঁষা। তবে মাঝখানে যতবার সে চোখ খুলেছিলো ততবার আতঙ্কিত চোখে দেখেছিলো আরহাম’কে। সেই দৃষ্টি আজও ভুলতে পারে না আরহাম। বিগত সাতটা মাস ধরে সেই দৃষ্টিগুলো ভুলতে পারছে না ও। তোঁষা আরহাম’কে চিনতে পারে নি। কেন পারে নি এর উত্তর জানা নেই। আরহাম যখন কাছে এসে ধরতে চাইলো তখন ই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে তোঁষা। ভরকে যায় আরহাম। কিছুতেই তোঁষা ওকে চিনলো না। এক সময় তড়পাতে তড়পাতে জ্ঞান হারালো। টানা দুই দিন এমন করে তৃতীয় দিন থেকে তোঁষা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। প্রায় সপ্তাহ খানিক পর তার মনে পরে সেদিন সে কেক বানিয়েছিলো। এক সপ্তাহ পর তোঁষা আরহামে’র কেক কাটলো। আরহাম আতঙ্কে আতঙ্কে কেক কেটেছে। সে নিজেই তোঁষা’কে দেখে টানা এক সপ্তাহ ঘোরের মাঝে ছিলো।

তবে এরপর থেকে মেডিসিনগুলোর এফেক্ট উল্টো পরলো। চারমাস চলা কালীন সময় থেকে তোঁষা ধীরে ধীরে ভুলতে শুরু করলো। আরহাম তো এটাই চেয়েছিলো। ও চেয়েছিলো ওর তোঁষা সব ভুলে যাক। ভুলে যাক প্রতারকদের। ধোঁকাবাজদের। শেখ বাড়ীর সকলকে। আরহামে’র চাওড়া ধীরে ধীরে পূরণের পথে ছিলো। তোঁষা ভাবশালীন ভাবে থাকা শুরু করলো। সারাদিন একা একা থেকে এর এফেক্ট পরলো ভিন্ন ভাবে। কিছুটা উগ্র আচরণের দেখা মিললো সারে চার মাসের সময়। বিয়ের তাদের বছর পূর্তি হলো। আরহামের স্বপ্ন গুলো পূরণের পথে অথচ আরহাম খুশি থাকতে পারছে না। কোথায় যেন খটকা বেঁধেই যাচ্ছে তার। তোঁষা ধীরে ধীরে সকলকে ভুলতে চলেছে। দিনের আলো ভুলতে চলেছে। এই একটা ফ্ল্যাট জুড়েই তার আনাগোনা। বারান্দায় যেতে দেয় না আরহাম এখন। এর অবশ্য কারণ রয়েছে।
গতমাসে তোঁষা পালাতে চেয়েছিলো। ভাবা যায়? আরহাম থেকে পালাতে চায়? ডোজ কেটে যেতেই তোঁষা মেইন দরজা খুলে ফেলেছিলো। ভাগ্যিস আরহাম ঐদিন তারাতাড়ি বাড়ী ফিরলো নাহলে কি হতো? হারিয়ে যেতো না আরহামে’র তোঁষা। তখন কি করত আরহাম? রাগান্বিত আরহাম সেদিন থেকে বাসা বন্দী না বরং রুম বন্দী করে তোঁষা’কে। তোঁষা প্রথম প্রথম কাঁদলেও গত দুই দিন ধরে কাঁদছে না। আরহাম এতেও খুশি হতে পারলো না। পারছে না। হাজার চেয়েও ও খুশি হতে পারছে না। এর কারণ জানা নেই ওর। ও তো এটাই চেয়েছিলো ওর তুঁষ ওর থাকুক। আরহামে’র বুকে ওর প্রাণ থাকছে। যেভাবে চেয়েছিলো ঠিক সেভাবে তবে আরহাম এখনও সন্তুষ্ট নয়। তার বুকে যেন এখন ছটফটানি বেড়েছে। তুঁষটা আগের মতো নেই? কেন নেই? আগের মতো কেন আদর করে না আরহামকে? কেন সে আরহামে’র সাথে আগের মতো কথা বলে না? সেবার টানা একদিন কথা ছাড়া ছিলো। কি ভয়টাই না পেলো আরহাম। পরদিন যখন কথা বললো তখন ই না আটকে রাখা শ্বাস ছাড়লো।
.
চুলগুলো নিয়ে বিপত্তি বেঁধেছে ইদানীং। আরহাম গোছাতে পারে না। তাই আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তোঁষা’র এই হাঁটু সমান চুলগুলো ছোট করে দিবে। তোঁষা নিজেই কেমন কেমন করে চুল নিয়ে। ঘুমন্ত তোঁষা’কে সযত্নে বুকে তুললো আরহাম। তোঁষা বেভুর ঘুম। খানিকক্ষণ আগে তাকে ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। আরহাম এক হাতে ফোন তুলে কল দিতেই দরজা ঠেলে এক মেয়ে ঢুকলো। মেয়েটা যে কতটা ভীতু হয়ে আছে তা তার চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আরহাম ইশারা করতেই মেয়েটা তোঁষা’র হাঁটু সমান চুলগুলো কেটে দিলো। মনে হলো কেউ আরহামে’র বুকে চালান করলো কেঁচি’টা। মেয়েটার ও আফসোস হলো। কত সুন্দর বড় বড় চুল। এভাবে কেউ কাটে? একদম ঘাড়ের ওপর সমান গোল করে কাটা হলো।
আরহাম এমনটাই বলেছিলো। মেয়েটা যেতেই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো আরহাম। তার বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। অসম্ভব এক যন্ত্রণা।
এই চুলগুলো তো ওর ভীষণ প্রিয়। ছোট্ট থেকেই তুঁষটার ইয়া বড় বড় চুল ছিলো। চোখ মুখ যখন ঢেকে যেতো তখন চাচি চাপ ব্যান্ড পরিয়ে রাখতো। একটু চুল কাটালেই সেই কি কান্নাটাই না করতো। একবার তো আরহাম পিঠে করে বাজার ঘুরালো পরেই না শান্ত হলো।

তোঁষা’কে রেখে কিচেনে গেলো আরহাম৷ কিছু বানাবে এখন৷ তুঁষটা ঘন্টা যেতেই উঠে যাবে।
হঠাৎ তীব্র কান্নার শব্দে ভরকে যায় আরহাম। দৌড়ে আসে রুমে। ফ্লোরে বসেই চুল খামচে ধরে কেঁদে যাচ্ছে তোঁষা। আরহামের চোখের পাপড়িগুলো নড়লো। ভীত হলো কিছুটা। তোঁষা’র পাশে বসে ভীত স্বরে ই ডাকলো,

— তুঁ…তুঁষ? প্রাণ আমার কথাটা শু….

— আমার চুল? আমার চুল কেন কাটলেন? কেন কাটলেন? বলুন কেন কাটলেন? কেন?

বলেই গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলো তোঁষা৷ আরহাম কাছে আসতে নিলেই তোঁষা হাত পা দাপড়ে শুরু করলো। ওর একেকটা চিৎকার আরহামে’র হৃদয় যেন এফার ওফার করে দিচ্ছে। তোঁষা দুই হাতে বারান্দায় থাইতে থাপ্পড় মা’রতে মা’রতে ডাকলো লাগলো,

— আম্মু!!!! আম্মু তুমি কোথায়? আব্বু আমাকে নিয়ে যাও। আমি এখানে থাকব না৷ আমাকে নিয়ে যাও। ভাইয়া!!!!

কতক্ষণ দেয়ালে দুই হাত দিয়ে আঘাত করলো তোঁষা। পরণে থাকা ঢোকা টিশার্ট’টা কাঁধ বেয়ে পরে গেলো। আরহাম এক পা করে করে পিছু হটলো। বিরবির করে বলতে লাগলো,

— এটা তুই ঠিক করলি না তুঁষ। আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? কোথায় যাবি? আমি দিব যেতে? আমার প্রাণ না তুই? তোর প্রাণ’কে রেখে কোথায় যাবি? আ…আমার কাছে থাকবি তুই।

কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেল তোঁষা। নাক মুখ ফুলে লাল হয়ে গেলো। হঠাৎ ওর শ্বাস কষ্ট শুরু হতেই হাসফাস করতে লাগে ও। বদ্ধ জায়গায় থাকতে পারে না চঞ্চল এই হরিণী অথচ আজ এক মাস এই রুম থেকে বের হওয়ার অনুমতি ও তার নেই। আচমকা আরহামের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে কেউ। এতক্ষণ যাবৎ ধ্যানে থাকা আরহাম হুশ ফিরে পেলো। তোঁষা ওর কাঁতরাতে কাঁতরাতে বললো,

— আ…আরহাম ভাই, শ্…শ্বাস নিতে পারি না। প..পারি ন..না তো….

আরহাম তড়িৎ বেগে তোঁষাকে বুকে শক্ত করে চাপলো। লাভ হলো না। সাফোকেশনে তোঁষা ছটফট করেই যাচ্ছে। তবুও আরহাম ওকে রুম থেকে বের করলো না। কিছুতেই বের করবে না। যদি আবারও পালায় তুঁষ? পাশ থেকে তোঁষাকে কিছু দিতেই তোঁষা শান্ত হয়ে গেলো। চোখ বুজলো খানিক বাদে।
শান্ত তোঁষাকে কোলে তুলে বারান্দায় গেলো আরহাম। আস্তে করে বসে পরলো। বাইশ তলার উপর থেকে অপরুপ সুন্দর দেখায় প্রকৃতি। রাতের এই দৃশ্য টুকু একটু বেশিই সুন্দর।
আর তার প্রাণে’র কপালে চুমু খায়। টুপ করে এক ফোটা পানি পরলো তোঁষা’র চোখে। অল্প কাঁপলো তোঁষা। ঘুমের মাঝেই বললো,

— প্রাণ যাবে না তুুমি। কাঁদব আমি। বলো যাবে না।

আরহাম আরেকটু বুকে চেপে ধরে তোঁষা’র দেহটা। ঘুমন্ত তোঁষা’র ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে,

— কোথাও যাব না প্রাণ।

— প্রমিস।

— প্রমিস।

#চলবে…..

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ