নামহীন গল্প
মিতু
আমি স্বামীর অজান্তে আমার প্যারালাইজড শ্বশুরকে গোসল করাতাম—একদিন তার শরীরে দেখা সেই দাগ আমার পুরো জীবন বদলে দিল 😰😱
মিতু কখনো ভাবেনি, জীবনে এমন একটা দিন আসবে—যেদিন সে নিজের অতীতকে সামনে বসে নিঃশব্দে শ্বাস নিতে দেখবে।
মিতুর স্বামী রাহিব হোসেন। ঢাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সমাজে পরিচিত নাম। আত্মীয়স্বজনের কাছে ভীষণ সম্মানিত। তারা থাকত ধানমন্ডির একটি বড় পুরোনো বাড়িতে। সঙ্গে থাকতেন রাহিবের বাবা—হাজী আবদুল করিম।
হাজী সাহেব একসময় ছিলেন শক্তপোক্ত মানুষ। এলাকার সালিশে কথা বলতেন। সবাই তাকে ভয়ও পেত, সম্মানও করত। কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাৎ স্ট্রোক।
সেই স্ট্রোক যেন মানুষটাকে একেবারে থামিয়ে দিয়েছে।
তিনি কথা বলতে পারেন না। হাত-পা নড়াতে পারেন না। শুধু চোখ দিয়ে তাকান। আর ধীরে ধীরে শ্বাস নেন।
বিয়ের আগে রাহিব একদিন মিতুকে খুব গম্ভীরভাবে ডেকে বসিয়েছিল।
— মিতু, একটা কথা পরিষ্কার করে বলি। আব্বার ব্যাপারে একটা নিয়ম আছে।
— কী নিয়ম?
মিতু ভেবেছিল, হয়তো কোনো পারিবারিক ব্যাপার।
— আমি বাসায় না থাকলে তুমি কখনোই আব্বার ঘরে ঢুকবে না।
— কেন?
— ওনার দেখাশোনা করার জন্য লোক আছে। নার্স আছে। তুমি হাত দেবে না। গোসল করানো, কাপড় বদল—কিছুই না।
মিতু একটু অবাক হয়েছিল।
— আমি তো তার বউমা… সাহায্য করলেও তো দোষের কিছু নেই…
রাহিবের গলা হঠাৎ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
— না। আব্বা চান না কেউ তাকে এই অবস্থায় দেখুক। বিশেষ করে পরিবারের কেউ না। একটা কথা মনে রেখো—এই নিয়ম ভাঙলে সংসারে আগুন লাগবে।
ভালোবাসার খাতিরে মিতু চুপ করে গিয়েছিল।
দুই বছর। দুইটা পুরো বছর।
মিতু কখনো সেই ঘরের দরজায় পা রাখেনি।
দিনে দিনে হাজী সাহেবের দেখাশোনা করত একজন নার্স—শফিক। নির্ভরযোগ্য লোক। সকাল-বিকাল সব সামলাত।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।
একদিন রাহিব তিন দিনের জন্য চট্টগ্রাম গেল কাজের কারণে।
দ্বিতীয় দিন দুপুরে মিতু একটা ফোন পেল।
— ভাবি… আমি শফিক বলছি… একটা বিপদ হয়ে গেছে।
— কী হয়েছে?
— সকালে বাইক থেকে পড়ে গেছি। এখন হাসপাতালে। আজ আর কাল আসতে পারব না।
মিতুর বুকটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল।
— তাহলে আব্বা?
— পাশের এক লোককে বলে রেখেছি… কিন্তু সে ঠিকমতো পারবে কিনা জানি না।
ফোন রেখে মিতু অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সে হাজী সাহেবের ঘরের দিকে গেল।
দরজা খুলতেই একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল। এমন গন্ধ, যেটা বোঝাতে শব্দ লাগে না। চোখে পানি চলে এলো।
হাজী আবদুল করিম বিছানায় পড়ে আছেন। কাপড় নোংরা। শরীর ঘেমে ভেজা। চোখ দুটো তাকিয়ে আছে দরজার দিকে—ভীষণ অসহায়।
মিতুর বুকটা ফেটে গেল।
— আল্লাহ… আমি কীভাবে আপনাকে এভাবে ফেলে রাখি…
সে জানত, রাহিব জানলে রাগে আগুন হয়ে যাবে।
তবু মিতু থামেনি।
সে পানি গরম করল। তোয়ালে আনল। পরিষ্কার কাপড়।
ধীরে ধীরে হাজী সাহেবের পাশে বসে বলল—
— ভয় পাবেন না আব্বা… আমি আছি। কেউ একা এমন কষ্ট পাবে না।
হাত কাঁপছিল তার।
কাপড় খুলিয়ে যখন সে পরিষ্কার করতে শুরু করল, তখন হঠাৎ—
মিতুর চোখ আটকে গেল।
হাজী সাহেবের বুকের পাশে, ডানদিকে—একটা পুরোনো দাগ।
খুব পুরোনো। গভীর। একটা অদ্ভুত আকৃতির।
মিতুর মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল।
কারণ সেই দাগটা সে চেনে।
ভীষণ ভালো করে চেনে।
ঠিক একই দাগ… তার নিজের শরীরেও আছে।
ছোটবেলার একটা রাত। আগুন। চিৎকার। হাসপাতাল। আর সেই দাগ।
মিতু মেঝেতে বসে পড়ল।
— না… এটা হতে পারে না…
হাজী সাহেবের চোখে জল চলে এলো।
অনেক কষ্টে, ভাঙা শক্তিতে—
তিনি মিতুর হাতটা চেপে ধরলেন।
একটুও কথা নেই।
কিন্তু সেই চাপে সব বলা ছিল।
“তুমিই সেই মেয়েটা।”
মিতু তখন বুঝে গেল—
যে মানুষটাকে সে এতদিন শুধু শ্বশুর ভেবে এসেছে, তিনি তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
আর রাহিব যখন বাসায় ফিরবে—
—চলবে…..
নামহীন গল্প
মিতু
দ্বিতীয় পর্ব
যেখানে অতীত কথা বলতে শেখে, কিন্তু মুখ খুলে না
মিতু ঠিক জানে না, সে কতক্ষণ মেঝেতে বসে ছিল।
সময় থেমে গিয়েছিল।ঘড়ির কাঁটা চলছিল, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা হঠাৎ থেমে গেছে।
হাজী আবদুল করিম এখনো তার হাত ধরে আছেন।
চাপটা খুব শক্ত না।কিন্তু অদ্ভুতভাবে দৃঢ়।
যেন কেউ অনেক বছর ধরে একটা কথা চেপে ধরে রেখেছে—এখন হঠাৎ সেটা হাত দিয়ে বলে দিচ্ছে।
মিতু ধীরে মাথা তোলে।হাজী সাহেবের চোখ দুটো লাল। ভেজা। কিন্তু অদ্ভুত শান্ত।এই চোখ সে আগে দেখেনি।
এই চোখে ভয় নেই। লজ্জাও নেই।এই চোখে আছে… স্বীকৃতি।
মিতুর গলা শুকিয়ে আসে।
— আ… আপনি…?কথাটা শেষ করতে পারে না সে।
হাজী সাহেব কথা বলতে পারেন না।কিন্তু তিনি চোখ বন্ধ করেন।আবার খোলেন।
একবার।তারপর ধীরে ধীরে।
এই ভঙ্গিটা মিতু চেনে।
এই ভঙ্গিটা সে জীবনে একবারই দেখেছে।
সেই রাতে।
পনেরো বছর আগেতখন মিতুর বয়স দশ।
ময়মনসিংহের একটা আধা-পাকা বাড়ি।
বিদ্যুৎ ছিল না সেদিন।হারিকেন জ্বলছিল।
মা রান্নাঘরে।বাবা উঠানে।
হঠাৎ গন্ধটা আসে।ধোঁয়ার গন্ধ।
আগুনের শব্দ প্রথমে কেউ বোঝে না।আগুন শব্দ করে না।আগুন আসে নিঃশব্দে।
তারপর চিৎকার।মা’র চিৎকার।বাবার গলা।
ছাদে আগুন ধরে গেছে।মিতু তখন দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু কোথায় যাবে, জানে না।
ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠিক তখনই কেউ তাকে তুলে নেয়।একজন লোক।
মুখ দেখা যায় না।শুধু গলার স্বর—
— চোখ বন্ধ কর মা… চোখ বন্ধ কর।
লোকটার শরীর গরম।ভীষণ গরম।
মিতু অনুভব করে—লোকটার বুকের পাশে একটা শক্ত দাগ।পোড়া দাগ।তারপর আর কিছু মনে নেই।
হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে।
মা নেই।বাবা নেই।
শুধু এক নার্স বলেছিল—
— কেউ একজন আগুনের ভেতর ঢুকে তোমাকে বের করেছে। নিজে পুড়ে গেছে। তারপর চলে গেছে।
লোকটার নাম কেউ জানে না।
মিতু শুধু জানে—
তার শরীরের এই দাগটা সেই রাতের।
আর এখন…একই দাগ,হুবহু একই!
হাজী আবদুল করিমের শরীরে।মিতু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট মনে হচ্ছে।
— আপনি… আপনি কেন…?
কথা আসে না।
হাজী সাহেব তাকিয়ে থাকেন।তারপর চোখ নামিয়ে নেন।
লজ্জা?না।এই চোখে লজ্জা নেই।
এই চোখে আছে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি।
মিতু হঠাৎ বুঝতে পারে—
এই মানুষটা কথা বলতে না পারলেও,
তার ভেতরে জমে আছে পুরো একটা ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসে সে নিজেই জড়িয়ে আছে।
বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ।
মিতুর বুক ধক করে ওঠে।
রাহিব!
এত তাড়াতাড়ি?
সে তো বলেছিল কাল রাতে ফিরবে!
মিতু জানে—এই মুহূর্তে যদি রাহিব ঘরে ঢোকে,
এই দৃশ্য দেখলে…সবকিছু ভেঙে পড়বে।
সে তাড়াতাড়ি হাজী সাহেবের গায়ে চাদর টেনে দেয়।
হাত ছাড়াতে গিয়ে দেখে—
হাজী সাহেব তার হাত ছাড়ছেন না।
মিতু নিচু গলায় বলে—
— আব্বা… ছাড়ুন… ও চলে এসেছে…
হাজী সাহেব ধীরে চোখ বন্ধ করেন।
তারপর খুব কষ্টে, প্রায় অদৃশ্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ান।
না!
মানে—
“এখন না।”
মিতুর মাথা ঘুরে যায়।
— এখন না মানে কী?
দরজায় পায়ের শব্দ।
রাহিবের গলা—
— মিতু? তুমি কোথায়?
মিতু তাড়াতাড়ি দরজার দিকে যায়।
— আমি… আমি রান্নাঘরে ছিলাম।গলা কাঁপছে।
রাহিব ঘরে ঢোকে।চোখ বুলিয়ে নেয় চারপাশ।
পরিষ্কার বিছানা,পরিচ্ছন্ন ঘর।
এক মুহূর্ত থামে।
— আজ শফিক আসেনি, তাই না?
মিতু মাথা নাড়ে।
— আমি পাশের লোকটাকে ডেকেছিলাম।
রাহিব তাকিয়ে থাকে।খুব গভীরভাবে।
এই তাকানোটা মিতু চেনে।
এই তাকানো মানে—
রাহিব বুঝে ফেলেছে, কিছু একটা হয়েছে।
— তুমি কি… আব্বার ঘরে ঢুকেছিলে?
মিতু চুপ।
চুপ থাকাই এখন সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি।
রাহিবের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
— মিতু, আমি একটা কথা বলেছিলাম।
— জানি।
— তাহলে?
মিতু চোখ তোলে,সরাসরি তাকায়।
— যদি আমি না ঢুকতাম… উনি আজ সারাদিন নোংরা অবস্থায় থাকতেন।
রাহিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে বলে—
— তুমি জানো না, তুমি কী খুলে ফেলেছ।
এই কথাটার ভেতরে হুমকি নেই।ভয় আছে।
মিতুর গলা শুকিয়ে আসে।
— আমি দাগ দেখেছি।
এক সেকেন্ড,দুই সেকেন্ড নিরাবতা
রাহিবের চোখ বড় হয়ে যায়।
— কোন দাগ?
-বাবার শরীরে আগুনের পোড়া দাগ।
রাহিব চেয়ারে বসে পড়ে।হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।
অনেকক্ষণ কিছু বলে না।
তারপর খুব আস্তে বলে—
— বাবা বলেছিল… এই দিনটা আসবে।
মিতু অবাক।
— মানে?
রাহিব উঠে দাঁড়ায়। অস্থিরতায় কিছুক্ষন হাঁটে।
জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
— তুমি জানো না মিতু… আব্বা কী ছিলেন।
মিতু কিছু বলে না।
— উনি শুধু আমার বাবা না।
এক সময় উনি ছিলেন… অন্য মানুষ।
রাহিব ঘুরে তাকায়।
— তুমি যে আগুনের রাতটার কথা বলছ…
সেই রাতে বাবা পুলিশে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
মিতুর শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
— কী?
— ওই আগুনটা দুর্ঘটনা ছিল না।
মিতুর মাথার ভেতর যেনো সব কিছু শূন্য হয়ে গেছে।
— তাহলে?
রাহিব চোখ নামিয়ে বলে—
— ওই বাড়িতে… লুকিয়ে রাখা ছিল কিছু মানুষ,কিছু নাম,কিছু টাকা।
— কী টাকা,কিসের টাকা?
— কালো টাকা।
মিতু বসে পড়ে, যেনো রহস্যময় কোন সিনেমার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে!
— আগুনটা লাগানো হয়েছিল প্রমাণ নষ্ট করার জন্য।
মিতুর মাথা ঝিমঝিম করে।
— তাহলে আমি…?
রাহিব খুব ধীরে বলে—
— তুমি ভুল জায়গায় ছিলে, ভুল সময়ে।
নীরবতা।
ভয়ানক নীরবতা।
— বাবা ঢুকেছিল শুধু তোমার জন্য না।
— তাহলে?
— উনি ঢুকেছিল… নিজের পাপের মধ্যে থেকে একজনকে অন্তত বাঁচাতে।
মিতুর চোখে জল আসে।
— উনি আমাকে বাঁচিয়েছেন… আর আমার পরিবার?
রাহিব কিছু বলে না।
এই না বলাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
ঠিক তখনই—
হাজী আবদুল করিমের ঘর থেকে একটা শব্দ আসে।
একটা খুব ছোট শব্দ,কিন্তু পরিষ্কার।
একটা অক্ষর।
ভাঙা-ভাঙা…
কষ্টে বের হওয়া।
— মি…তু…
রাহিব আর মিতু দুজনেই জমে যায়।
কারণ—পাঁচ বছরে এই প্রথম,
হাজী আবদুল করিম, কথা বললেন।
আর দরজার ওপাশে,কারা যেন ফিসফিস করে উঠল—
কারণ ওই বাড়িতে,এই মুহূর্তে
শুধু তারা তিনজন ই ছিলো তাহলে কাদের কথার ফিসফিস শব্দ শোনা যাচ্ছে…..! 🥺
⏭️চলবে……….
