Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"দ্বিতীয় ফাগুনদ্বিতীয় ফাগুন পর্ব-২৭ এবং শেষ পর্ব

দ্বিতীয় ফাগুন পর্ব-২৭ এবং শেষ পর্ব

#দ্বিতীয়_ফাগুন
#পর্বসংখ্যা_২৭ (অন্তিম পর্ব)
#লেখিকা_Esrat_Ety

আদিল কাঁদছে। ছেলে মানুষের কান্না বরাবর অদ্ভুত লাগে রোদেলার কাছে। দেখলেই বিরক্ত হয়ে যায় রোদেলা। তবে এখন তার বিরক্ত লাগছে না,তার খারাপ লাগছে। আদিলকে দুটো শান্তনার কথা বলতে চেয়ে সে টের পেলো তার গলায় কোনো কথা আসছে না। কন্ঠনালীর ভেতরে কিছু একটা দলা পাকিয়ে উঠছে। আদিল কাঁদতে কাঁদতে ফোনে তার মায়ের কাছে তাশরিফের কথা জানাচ্ছে। রোদেলা টের পেলো কোনো এক অজানা কারনে তার চোখ দুটো ভিজে উঠছে। কি সর্বনেশে কথা! একটা বাইরের ছেলের জন্য তার চোখে পানি,লোকজনকে কি কৈফিয়ত দেবে সে? সবাই যে হাসবে! কি অযুহাত দেখিয়ে ধামাচাপা দেবে সে!
ঢাকা মেডিকেলের সামনে দু’টো সিএনজি এসে থামে। রোদেলা আদিলের কাঁধে হাত রেখে মৃদু স্বরে বলে,”নামো আদিল।”

এসেছে তারা চারজন, রোদেলা, আদিল এবং মেঘলা-সাদাফ। সিএনজি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে হেঁটে ইমার্জেন্সি ইউনিটে ছুটে যায় তারা। আদিলকে যে ভদ্রলোক ফোন দিয়ে জানিয়েছিলো তাশরিফের এক্সিডেন্টের কথা সেই ভদ্রলোক এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে। আদিলের সাথে কথা বলার পরে সে জানায় একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লেগেছিলো তাশরিফের বাইকের।
সবাই যখন ডাক্তারের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত রোদেলা গুটি গুটি পায়ে এসে তাশরিফের কেবিনের সামনে দাঁড়ায়। ডান হাত এবং ডান পা টা ভেঙে গিয়েছে তাশরিফের। মাথায় আঘাত লাগার সম্ভাবনা ছিলো তবে হেলমেট পরেছিলো বিধায় রেহাই পেয়েছে। গুরুতর জখম না হলেও কমপক্ষে দুই মাস ভোগাবে লোকটাকে। তাশরিফ এখন ঘুমিয়ে আছে । ডাক্তার তাকে ব্যথা নাশক ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছে। কপালের কাছটাতে বিশ্রী ভাবে কেটে গিয়েছে। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। রোদেলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে কেবিনের দরজার কাচ দিয়ে। হঠাৎ করে মানুষটাকে তার ছোট্ট একটা শিশু মনে হচ্ছে। নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে রেখেছে,মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে। যন্ত্রনায় ফরসা মুখটা কেমন নীল হয়ে আছে। রোদেলা চোখ সরিয়ে নেয়।

“কোথায় আমার বাবা,কোথায়।”
তাহমিনার আর্তনাদ কানে যেতেই রোদেলা হকচকিয়ে উঠে তাশরিফের কেবিনের দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। একপাশে সরে মাথা নিচু করে রেখেছে সে। তাহমিনাকে এসে আগলে নেয় আদিল। ছেলের জন্য আর্তনাদ করেই চলেছে সে। মেঘলা এসে তাকে শান্তনা দেয়। তাহমিনা সেসব শোনার মতো পরিস্থিতিতে নেই। বুক চাপড়ে সে কেঁদেই যাচ্ছে।

রাত তিনটা বেজে সাত মিনিট। ওয়েটিং রুমে সবাই বসে আছে চুপচাপ। রোদেলা দূরে একটা কোনায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাহমিনার চোখের সামনে ঘুরঘুর করে তাকে বিরক্ত করতে চায় না রোদেলা। নার্স এসে জানালো তাশরিফের হুঁশ ফিরেছে। কথা বলছে সে। তাহমিনা উঠে প্রায় ছুটে গেলেন তার ছেলের কাছে। বাকিরাও তার পিছু পিছু গিয়েছে। শুধু যায়নি রোদেলা। সে চুপচাপ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলের চোখের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাহমিনা চেঁচিয়ে ওঠে,”কি খেয়ে বাইক চালাচ্ছিলি বল, বেয়াদব ছেলে,বল!”

তাশরিফ ম্লান হেসে অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়,”আমি ঠিক আছি মা। এভরিথিং ইজ ফাইন।”
_এক হাত,এক পা ভেঙ্গে এভরিথিং ইজ ফাইন? একটা থাপ্পড় মেরে তোকে….
আদিল এসে মাকে ধরে বলে,”কি হচ্ছে মা! এটা হসপিটাল। ভাইয়া যে কথা বলার অবস্থায় আছে এটা কি যথেষ্ট নয়? তুমি চলো,তুমি বাইরে চলো। পরে কথা বলবে তুমি।”

তারপর তাহমিনাকে টেনে নিয়ে যায় সেখান থেকে আদিল। আফতাব হাসান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রেস্ট নিতে বলে বাইরে যায়। কেবিনে সাদাফ আর মেঘলা দাঁড়িয়ে। সাদাফ বলে,”কি ভায়া? রেস্টুরেন্ট থেকে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে গিয়েছিলে প্রাইভেট কারের নিচে পরতে? আচ্ছা বলো তো সমস্যা কি হয়েছিলো? ওভাবে বেড়িয়ে গিয়েছিলে কেনো? প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো? তা আটকানোর জন্য ছুটছিলে বাইক নিয়ে ওভাবে?”

তাশরিফ শুকনো হাসি হাসে। মেঘলা সাদাফকে থামিয়ে দিয়ে বলে,”আপনিও না! এসব কি বলছেন ছেলেটাকে? এখন মজা করার সময়? চলেন বাইরে চলেন। ও বিশ্রাম নিক। ”

মেঘলা সাদাফ বেড়িয়ে গেলে তাশরিফ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে। কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির অস্তিত্ব খুঁজতে ব্যস্ত তার দুটি চোখ। পরক্ষনেই মনে পরে, সে এখানে কেনো আসবে? সে তো আসবে না। সে কেনো আসবে? সে তো একজন হৃদয়হীনা!

কয়েক মুহূর্ত চোখ দুটো বন্ধ করে থাকে সে। হঠাৎ কানে কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ যেতেই চোখ খুলে তাকায় । দৃষ্টি ঘুরিয়ে দরজার দিকে দিতেই কিছুটা চমকে ওঠে ।‌ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ভাবে তার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি এসে কেবিনের দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাশরিফ রোদেলার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

“আসবো?”
রোদেলা দাঁড়িয়ে আছে তার অনুমতির অপেক্ষায়। তাশরিফ ক্ষীণ কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে বলে,”ভালো লাগলে আসুন।”

রোদেলা গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢোকে। রোদেলাকে দেখে তাশরিফ ভেতরে ভেতরে যতটা খুশি হয়েছে, বাইরে সে ততোটাই গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলে,”আসলেন কেনো?”

রোদেলা তাশরিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,”আমার আত্মীয় এক্সিডেন্ট করেছে। আমার আসাটা উচিৎ নয়কি? আমি কি অসামাজিক?”
তাশরিফ ম্লান হেসে বলে,”এসেছেন,তা আপনার হবু জানে? ফোন করে বলেছেন তাকে? ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া হলো তখন দেখলাম!”
রোদেলা গম্ভীর কন্ঠে বলে,”হবু হবু করছেন কেন? সে কি আমার হবু? বিয়ে তো ঠিক হয়নি এখনো!”
_করেই তো ফেলবেন। এতো ভালো পাত্র,এতো ভালো চাকরি, এতো ভালো বডি পাত্রের!

রোদেলা বিরক্ত হয়। তারপর বলে,”আপনাকে বলেছি আমি এখানেই বিয়ে করবো? বলেছি একবারো? আমার পাত্রকে পছন্দ হয়নি।”

_যেখানে ইচ্ছা সেখানে বিয়ে করেন। আমাকে কৈফিয়ত দিচ্ছেন কেন।
তাশরিফ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,”ব্যাপার কি আপনার? এক্সিডেন্ট করেছি বলে এখানে ছুটে এসেছেন আবার আমাকে কৈফিয়তও দিচ্ছেন। আচ্ছা প্রেমে টেমে পড়েছেন নাকি আমার?”

রোদেলা বলে,”একটা পা আর একটা হাত ভেঙে বসে আছেন তবুও মজা করতেই হবে? আপনি না কখনো শোধরাবেন না তাইনা? এই একটা কারনে আপনাকে আমার বিরক্ত লাগে। আর প্রেমে পরবো কোন দুঃখে আপনার? আপনি প্রেমে পড়ার জিনিস? বিরক্তিকর একজন লোক আপনি।”
তাশরিফ মুখটা শুকনো করে ফেলে, ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়,”ওও।”

_কিভাবে বাইক চালান আপনি? চোখ কোথায় থাকে?

তাশরিফ কোনো জবাব দেয়না। রোদেলা বুঝতে পারে তাশরিফ তার কথায় অভিমান করেছে। সে তাশরিফকে ঠান্ডা গলায় বলে,”এরপর থেকে সাবধানে বাইক চালাবেন।”

_আপনার বলে দিতে হবে না। আপনি যান। এখানে এতক্ষণ ধরে বসে আছেন কেনো? মা এসে দেখলে ভাববে আপনি আমায় লাই দিচ্ছেন। আপনি যান।
গম্ভীর কন্ঠে বলে তাশরিফ।

রোদেলা ম্লান হেসে বলে,”ঠিক তাই। ভালো কথা বলেছেন। আমি উঠি হ্যা? আপনি বিশ্রাম নিন।”

রোদেলা উঠে চলে যায়। তাশরিফ আহত চোখে রোদেলার যাওয়া দেখে। অভিমান করে যেতে বলেছে তাই চলে যাবে এভাবে? আর কিছুক্ষণ বসে থাকা যেতো না? পা দুটো বেশি লম্বা এই মেয়ের!

তাশরিফের ওই পা দুটো আটকানোর কোনো ক্ষমতা বা অধিকার কিছুই নেই,নয়তো ওই পা দুটো আজ এই কেবিনের বাইরে ফেলতে পারতো না রোদেলা আমিন।
শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলে ওঠে তাশরিফ,”আমায় একটু সুস্থ হতে দিন রোদেলা আমিন। আপনার খবর আছে! ওই পা দুটো পুরোপুরি আটকে ফেলবো আমি! একটুও দেরি করবো না,আই প্রমিজ! ”

***
অফিসের সবাই আজ একজোট হয়ে তাশরিফকে দেখতে এসেছে হসপিটালে। তাদের সাথে রোদেলাও এসেছে। সবাই তাশরিফের সাথে কথা বলছে তখন রোদেলা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।

খলিলুর রহমান সহানুভূতি দেখিয়ে বলে,”তুমি চিন্তা করো না তাশরিফ। একমাস ফুল বেড রেস্টে থাকো তুমি। তোমার কাজ গুলো এই একমাস রোদেলা আমিন করবে। নতুন জিএম স্যার নির্দেশ দিয়েছে।”
তাশরিফ রোদেলার দিকে তাকায়। মেহেরিন বলে ওঠে,”রোদেলাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি। কোনো সমস্যা হলে তোমাকে ফোন করে নেবে। রোদেলাকে এই একমাস তোমার কাজের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?”
তাশরিফ ম্লান হাসে। যাকে নিজের সবকিছুর দায়িত্ব দিতে চাচ্ছে সে, তাকে অফিসের দায়িত্ব দিতে কেনো আপত্তি থাকবে তার।

“একি তাশরিফ। তুমি নামছো কেনো?”
সবাই চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তাশরিফের দিকে।

একহাত দিয়ে বেডে ভর দিয়ে অন্যহাতে ক্রাচ ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় তাশরিফ। ক্ষীণ কন্ঠে বলে,”ওয়াশ রুমে যেতে হবে।”
অসহ্য যন্ত্রনা দাঁতে দাঁত চেপে বাম পা মাটিতে ফেলতেই তাল হারিয়ে পরে যেতে নেয়। কয়েক মুহূর্ত পরে সে বুঝতে পারে তাকে কেউ শক্ত করে ধরে ফেলেছে ছুটে এসে। সে আর কেউ না, রোদেলা আমিন। তাশরিফ যন্ত্রনা ভুলে বাঁকা হাসি হাসে। তাশরিফের চোখে চোখ পরতেই রোদেলা তাকে ঠিক করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়।
তাহমিনা রোদেলার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে সে এই মেয়েটার চোখে তার ছেলের জন্য উৎকণ্ঠা আবিষ্কার করলো। সে খেয়াল করলো তার খুব একটা খারাপ লাগছে না।

***
“আপু আমায় ডেকেছিলে?”
রোদেলা মেঘলার দিকে তাকিয়ে আছে। সাদাফ বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে, মেঘলা বিছানার পাশে দাড়িয়ে। রোদেলাকে দেখে আমতা আমতা করে মেঘলা বলে,”হ্যা। আয় বস আগে।”

রোদেলা কিছুটা অবাক হয়ে বলে,”কি ব্যাপার? তোমাদের মুখ এতো শুকনো লাগছে কেনো? দুটোতে কি ঝগড়া করেছো নাকি?”

মেঘলা সাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,”কি হলো! বলেন আপনি!”
_তুমি বলো।
_আপনি বলেন।
_আরে তুমি বলো।

রোদেলা বিরক্ত হয়ে বলে,”তোমাদের কারো বলতে হবে না। এই আমি গেলাম। রাত দুপুরে ডেকে এনে মশকরা করা হচ্ছে।”

রোদেলা চলে যেতে নিলে মেঘলা একটা হাত ধরে ফেলে। সাদাফ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলে,”আসলে একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়েছে রোদেলা। আমার নিজেকে ভীষণ ছোটো লাগছে। তোমাকে যে কিভাবে বলি!”
_ভাইয়া আপনি অন্তত আমার সাথে এভাবে কথা বলবেন না। কি হয়েছে ফ্রাংকলি বলুন!

_আসলে, মিহিরের একটা খালাতো বোন আছে রোদেলা। এইবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। সে নাকি ছোটো বেলা থেকে মিহিরকে পছন্দ করতো। ছোটো বলে মিহির পাত্তা দিতো না। কিন্তু গতকাল সেই মেয়ে নয়টা টা ঘুমের ঔষধ খেয়েছে মিহিরের বিয়ের কথা শুনে। দ্রুত হাসপাতালে নিতে পেরেছে বলে বেঁচে গিয়েছে। আর দুই ফ্যামিলি মিলে ঠিক করেছে মিহিরের সাথে ওই মেয়ের বিয়ে দেবে‌। মিহির খুব লজ্জা পাচ্ছে তোমায় ফোন দিয়ে বলতে এসব কথা ‌। আমার হাত ধরে বলেছে তোমায় সরি বলে দিতে।

রোদেলা কয়েক মূহুর্ত সাদাফের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুশিতে গদগদ হয়ে উচ্চশব্দে চেঁচিয়ে বলে,”তাই নাকি!”

সাদাফ আর মেঘলা দুজনে বেশ অবাক হয়ে যায়। রোদেলা হাসছে দেখে মেঘলা তার মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলে,”তোর বিয়ে ভেঙেছে আর তুই হাসছিস!”

রোদেলা থতমত খায়। বিড়বিড় করে বলে,”তাই তো! আমি হাসছি কেনো! আমার তো কষ্ট পাওয়া উচিত। জীবনে প্রথম কোনো বিয়ের প্রস্তাব এক্সেপ্ট করেছিলাম…..”
সাদাফ বলে,”মন খারাপ করো না রোদেলা! আই প্রমিজ,ওই মিহিরের থেকেও ভালো পাত্র জুটিয়ে ফেলবো তোমার জন্য। আর ওই মিহির কি একটা পাত্র হলো নাকি? চেহারা অতটাও ভালো না। ”

মেঘলা আর রোদেলা দুজনেই সাদাফের শান্তনা শুনে হেসে ফেলে।

মেঘলা বলে,”আপনি যেভাবে পল্টি খেলেন তাতে বোঝাই যাচ্ছে আপনি প্রকৃত রাজনীতিবিদ! পল্টিবাজ কোথাকার!
_এই কি বললে তুমি?
_ঠিকই বলেছি। ফের কোনো বিয়ের প্রস্তাব আনার আগে দেখে নেবেন পাত্রের কোনো খালাতো বোন আছে কি না, তা না হলে আপনার খবর আছে।

রোদেলা মেঘলাকে বলে,”ভাইয়া আর তুমি ঝগড়া কনটিনিউ করো। আমি এলাম। আমার একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে। ”

***
আজ দুদিন হলো তাশরিফকে হসপিটাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। সে ক্রাচে ভর করে প্রয়োজনে হাঁটাহাঁটি করে। এছাড়া সারাদিন বিছানাতেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়।
ফোনের রিংটোনের শব্দ পেয়ে তাশরিফ ফোনটা হাতে নেয়। ফোনের স্ক্রিনে রোদেলা আমিনের নাম্বার দেখে একটা বাকা হাসি দেয় সে। সে বেশ লক্ষ্য করেছে রোদেলা আমিন তার প্রতি কনসার্ন দেখাচ্ছে।

ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরেই গম্ভীর কন্ঠে বলে,”বলুন।”

রোদেলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে , “আমার বিয়েটা ভেঙ্গে গিয়েছে।”

তাশরিফ কথাটি শুনে অতিরিক্ত খুশিতে “ইয়েস” বলে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ঝাকাতেই যন্ত্রনায় কোকিয়ে ওঠে। রোদেলা উতকন্ঠা নিয়ে বলে,”কি হলো! স্যার আপনি ঠিক আছেন?”
তাশরিফ স্বাভাবিক গলায় বলে,”হু।”

রোদেলা বলতে থাকে,”অবশ্য বিয়েটা তো আমিই ভেঙে দিতাম। ভালোই হলো,আমার কাঁধে দোষ ওঠেনি।”

তাশরিফ খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাতের যন্ত্রনার কথা ভুলে যায়। রোদেলা আমিনের এই অস্বাভাবিক আচরণ গুলো তাশরিফকে বুঝিয়ে দিচ্ছে সে তাশরিফের প্রতি ইন্টারেস্টেড। কিন্তু পেঁচা মুখী তা মুখে স্বীকার করছে না ! তাশরিফ মনে মনে ঠিক করে ফেলে পেঁচা মুখীর মুখ দিয়েই স্বীকার করিয়ে নেবে সবটা!

তাশরিফের নীরবতা দেখে রোদেলা বলে,”স্যার….আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন!”
তাশরিফ হাসি চাপিয়ে রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে,”এটা কি অফিশিয়াল কোনো কথা রোদেলা আমিন?”
রোদেলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে,”না তো স্যার।”

_বা আমি কি আপনার থেকে জানতে চেয়েছি?
_না স্যার।
_তাহলে আপনি আমায় বলছেন কেনো?

রোদেলা বিব্রত হয়ে পরে। সে তাশরিফকে এসব কথা কেনো বলছে তার ব্যখ্যা তো সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছে না।

ওপাশ থেকে তাশরিফ বলতে থাকে,”তা বিয়েটা ভাঙলো কেনো?”

_পাত্র তার কলেজ পড়ুয়া খালাতো বোনকে বিয়ে করবে।

তাশরিফ বলে,”বেশ ভালো। কচি মেয়ে পেয়েছে,তাই বিয়ে করে নিচ্ছে। পাত্র বুদ্ধিমান। আমিও ঠিক করেছি সুস্থ হলে ক্লাস টেনে পড়ুয়া মায়ের পছন্দ করা মেয়েটাকে বিয়ে করে নেবো। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। বেশি বয়সী মেয়ে বিয়ে করাটা বোকামি বুঝলেন। এরা অতিরিক্ত বুদ্ধিমতি হয়। অতিরিক্ত বুদ্ধিমতিদের সাথে সংসার করা যায় না।”

রোদেলা চুপ করে থাকে। তাশরিফের কথায় সে বেশ আহত হয়। কিন্তু সে দেখতে পারছে না তাশরিফ ফোনের ওপাশে বসে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে গা দুলিয়ে হাসছে।

কিছুক্ষণ পরে হাসি থামিয়ে বলে,”আচ্ছা ঠিক আছে। রাখছি, কেমন? ”
তাশরিফ ফোন কেটে দেয়। রোদেলা কান থেকে ফোনটা নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।

***
এক হাতে বৃষ্টি এবং তাশরিফের দেখভাল করতে হয় তাহমিনার। এই শরীরে এতো চাপ নিয়ে সেও কিছুটা অসুস্থ হয়ে পরেছে। দুপুর বেলা কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে দেখে রোদেলা দাঁড়িয়ে আছে। তাহমিনাকে দেখে সালাম দেয় সে। তাহমিনা সালামের জবাব দিতেই রোদেলা বলে,”অফিশিয়াল কাজে এসেছি। একটা ফাইল স্যারকে দেখাতে হবে।”
তাহমিনা দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। রোদেলা ভেতরে ঢুকে বলে,”স্যার কোথায়?”
_তার ঘরে। যাও।
রোদেলা ইতস্তত করে বলে,”সত্যিই যাবো?”

তাহমিনার বেশ হাসি পাচ্ছে রোদেলার প্রশ্ন শুনে। সেই অহংকারী, বদমেজাজি মেয়েটি হঠাৎ করে এতোটা বিনয়ী হয়ে উঠেছে কেনো সে বুঝতে পারে না। সে স্বাভাবিক গলায় বলে,”যাও।”

“আসবো?”
তাশরিফ মাথা তুলে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বলে,”এটা আপনারই ঘর হবে একদিন। তখন কি না আমাকেই আপনার কাছে পারমিশন নিয়ে ঢুকতে হয়।”
মুখে বলে,”আসুন।”

রোদেলা ভেতরে ঢোকে। তাশরিফ নিজের বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। রোদেলা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায়।‌ তার হাতে একটা ফাইল। সেটা সে তাশরিফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,”এটা একটু বুঝিয়ে দিলে ভালো হতো স্যার। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। যদি কোনো ভুল করে ফেলি!”
তাশরিফ রোদেলার চোখে চোখ রেখে হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নেয়। তারপর বলে,”একটা চেয়ার টেনে বসুন।”
রোদেলা একটা চেয়ার টেনে বসে পরে। তাশরিফ রোদেলাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। রোদেলা তার দিকে তাকিয়ে শুনছে তার কথা।

“এইবার বুঝতে পেরেছেন?”
রোদেলা মাথা ঝাঁকায়।
_বেশ।

এমন সময় রান্নাঘর থেকে তাহমিনার চিতকার শোনা যায়। রোদেলা তাশরিফের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দৌড়ে রান্নাঘরে এসে দেখে তাহমিনার পায়ে গরম পানি পরেছে। সে মেঝেতে বসে গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছে। রোদেলা ছুটে গিয়ে নিচু হয়ে বসে। বৃষ্টি ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে আসে,তাশরিফও ক্রাচে ভর দিয়ে এসে দাঁড়ায় রান্নাঘরের দরজায়।

রোদেলা একটা বাটিতে কিছু বরফ নিয়ে তাহমিনার পাশে বসে পরে। তারপর তাহমিনার জ্বলে যাওয়া পা টা ধরে বাটিতে বরফ পানির ভেতরে ডুবিয়ে দেয়।
তাহমিনা গোঙাতে থাকে, হঠাৎ অস্ফুট স্বরে বলে,”পায়ে হাত দিও না।”

রোদেলা গম্ভীর হয়ে বলে,”অসুবিধা নেই। আপনি আমার মায়ের বয়সী।”
তাহমিনা রোদেলার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বলে,”এই মেয়ে? তুমি ঠিক আছো তো? তুমি এতো ভালো হলে কবে?”

রোদেলা উঠে গিয়ে বৃষ্টির কাছ থেকে একটা মলম এনে তাহমিনার পায়ে লাগিয়ে দেয়। তারপর বলে ওঠে,”আপনার বড় ছেলে অসুস্থ। বৃষ্টিও অসুস্থ। বাড়িতে আর কেউ নেই। আমি যদি আপনাকে ধরে ধরে আপনার রুমে দিয়ে আসি আপনার কোনো অসুবিধা আছে?”

তাহমিনা রোদেলার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকায়। তার কোনো অসুবিধা নেই। রোদেলা এসে তাহমিনার হাত ধরে টেনে আস্তে আস্তে উপরে তোলে। যন্ত্রনায় পা টা যেনো অবশ হয়ে গিয়েছে। রোদেলা বিড়বিড় করে বলে,”আমার কাঁধে হাত রাখুন। নয়তো পরে যাবেন।”

তাহমিনাকে বিছানায় শুইয়ে তার পায়ের কাছে বসে পরে রোদেলা। এবার বেশ ভালো করে মলম লাগিয়ে দিতে থাকে সে।
তাশরিফ ক্রাচে ভর দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে। তাহমিনা তার দিকে তাকায়। তাশরিফ মনে মনে বলে,”কি মা? এবার বলো, শশুর শাশুড়ির সেবা করতে পারবে না এই মেয়ে?”

***
#দ্বিতীয়_ফাগুন‌ গল্পের কাহিনী দুইমাস এগিয়ে যায়। এই দুইমাসে মূখ্য যে পরিবর্তন গুলো হয়েছে তা হলো,
১.”তাশরিফ সুস্থ হয়ে উঠেছে (আলহামদুলিল্লাহ, গল্পের নায়ক ল্যাংড়া থাকবে তা কি করে হয়!),
২.বৃষ্টির পেটটা আরো বড় হয়েছে,সামনের মাসে তার ডেলিভারি!
৩. সুহা সিরাতের সামনের পাটির দাঁত দুটো করে পরে গিয়েছে,মেঘলার জীবনে আপাতত এটা ছাড়া আর কোনো দুঃখ নেই।
৪.আদিল একজন দায়িত্ববান স্বামীর পাশাপাশি, দায়িত্ববান বাবা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
৫. তাহমিনা রোদেলাকে কোনো এক অজানা কারনে পছন্দ করতে শুরু করেছেন।(আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ)

#দ্বিতীয়_ফাগুন গল্পে এই দুই মাসে যে জিনিসটার পরিবর্তন হয়নি তা হলো রোদেলা আর তাশরিফের সম্পর্ক। রোদেলা তাশরিফের কাছে স্বীকারই করছে না তার অনুভূতির কথা। বলা বাহুল্য এই মেয়ে ভাঙে তবু মচকায় না। তাশরিফ এখন হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য পরিকল্পনা করেছে। তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সে লোকবল জুটিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। চলুন দেখা যাক ভীতু তাশরিফের পরিকল্পনা ঠিক কি!

***

“আপনারা সবাই রেডি তো?”

পাঁচটি মাথা একসাথে বলে ওঠে,”একেবারেই প্রস্তুত। তুমি শুধু ইশারা দেবে!”

তাশরিফ গম্ভীর হয়ে বলে,”আজ যদি কিছু না হয় তাহলে আমি নির্বাসনে যাবো।”
পাঁচ জনের একজন বলে ওঠে,”থিংক পজিটিভ তাশরিফ থিংক পজিটিভ! ওই যে দেখো রোদেলা আসছে তুমি তৈরি হও! আমরা লুকাচ্ছি।”

তাশরিফ মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে তার পেঁচা মুখী ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। তাশরিফ বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রোদেলা আমিনকে তার নার্ভাসনেস বুঝতে দেওয়া যাবে না।

রোদেলা এসে তাশরিফের সামনে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে বলে,”আজ অফিসে এলেন যে ঘটা করে, আপনার ছুটি তো আরো দুদিন বাকি আছে।”

তাশরিফ বলে,”আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে এলাম।”
_কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ?
_আপনাকে তুলে নিতে এসেছি।

রোদেলা অবাক হয়ে বলে,”মানে?”
_মানে সেটাই যেটা আপনি শুনেছেন।

রোদেলা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,”সুস্থ হতে না হতেই আবারো শুরু করে দিয়েছেন?”
তাশরিফ হাসে,হাসতে হাসতেই বলে,”তুলে নিয়ে যাবো না, যদি আমার কিছু অনুরোধ আপনি রাখেন।”

_কিছু অনুরোধ? সেগুলো কি কি?
_থেকে যান।
_মানে?
_মানে আর আমাকে অপেক্ষা না করিয়ে থেকে যান আমার জীবনে।

_আর আপনার মা? সে বুঝি আমাকে মেনে নেবে? আমি যে বড্ড অযোগ্য।
_মা মেনে নিয়েছে ,এক শর্তে।
_কি শর্ত? কি এমন শর্তে সে একজন বেশি বয়সী,রাগী, অহংকারী, বদমেজাজি মেয়েকে মেনেছেন?

_সময় মতো তার নাতি নাতনি তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।

রোদেলা চুপ হয়ে যায়। তাশরিফ বলতে থাকে,”জানেন আমার ভাইয়ের বৌটা খুব মিষ্টি। ওর জা হিসেবে থেকে যান।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,”আমার মা,খুব ভালো মহিলা,বাইরে রাগী,ভেতরটা নরম। বৃষ্টির কাছে জেনে নিয়েন। তার বড় বৌ হয়ে থেকে যান।

আর সেটা না পারলে,আমার বাবা, অত্যন্ত বিশুদ্ধ একজন মানুষ,তার আদরের বড় বৌমা হয়ে থেকে যান।

আর তা না হলে,আমার ভাই! চমৎকার একটি ছেলে,তার সিমেন্ট ভাবী হয়ে থেকে যান।

জানেন আমার ভাই আর ভাইয়ের বৌয়ের শুনেছি ছেলে হবে, আপনি ওসব কিছু হয়ে থাকতে না পারলে আমার ভাইপোর বড় চাচী হয়ে থেকে যান।”

এই পর্যন্ত বলে তাশরিফ একটু সময় নেয়, তারপর বলে,”এসব কিছু না পারলে অন্তত আমার বৌ হয়ে থেকে যান। তবুও থেকে যান।”

রোদেলা নীরব থাকে। তাশরিফ উতকন্ঠা নিয়ে বলে,”আল্লাহর ওয়াস্তে এখন আমায় সম্মতি দিন রোদেলা আমিন। দেখছেন দুজনের বয়স বেড়ে যা তা অবস্থা হয়ে যাচ্ছে । এরপর দুজনের কপালে ভালো পাত্র পাত্রীও জুটবে না। দেখেন আমার দিকে তাকিয়ে,মাথার চুল উঠে মাথা টাক হতে শুরু করেছে।”

রোদেলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দেয়ালের ওপাশ থেকে পাঁচ টা মাথা উঁকি দিয়ে ওদের দেখে। রোদেলার নীরবতা সবাইকে রাগিয়ে দিচ্ছে। একজন বলে ওঠে,”এখন একটা সিএনজি ডাকতেই হবে দেখছি। তারপর গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে সিএনজিতে ওঠাতে হবে।”

আরেকজন বাঁধা দিয়ে বলে,”দাঁড়াও। আরো কিছুক্ষণ দেখি।”

রোদেলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি পরতে শুরু করেছে। রোদেলা সেদিকে তাকায়। তাশরিফ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পরে,”সম্মতি দেবেন না,তাই না?”
রোদেলা এখনো চুপ। তাশরিফ রোদেলার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর অভিমানের সুরে বলে,”আচ্ছা ঠিক আছে,সম্মতি দিতে হবে না।”

রোদেলা তাশরিফের দিকে একপলক তাকিয়ে পোর্চের বাইরে পা রাখে। সে বৃষ্টিতে ভিজছে। তাশরিফ আহত চোখে তার হৃদয়হীনাকে দেখে কয়েক মুহূর্ত, তারপর প্রস্তুতি নেয় পাঁচ সদস্যের টিমকে ইশারা করার।

এমন সময় রোদেলা মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে,”আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবেন তাশরিফ?”

কিছু সময় তাশরিফ তাকে দেখে।
তাশরিফ পেয়ে গেছে তার উত্তর। হ্যা তার পেঁচা মুখী তাকে সম্মতি দিয়ে দিয়েছে। সে প্রায় ছুটে গিয়ে রোদেলার সামনে দাঁড়ায়। রোদেলা তার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে প্রশস্ত হাসি তার।

তাশরিফ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,”আমি কি আপনার হাতটা একটু ধরতে পারি?”
রোদেলা কিছু বলে ওঠার আগেই তাশরিফ খপ করে রোদেলার বা হাতটা ধরে ফেলে। বুক পকেট থেকে একটা আংটি বের করে চোখের পলকেই রোদেলাকে পড়িয়ে দেয়।

রোদেলা হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তাশরিফ বলে,”হয়ে গিয়েছে বাগদান। এখন থেকে আগামী তিন ঘণ্টা আপনি আমার হবু।”

রোদেলা অস্ফুট স্বরে বলে,”আগামী তিন ঘণ্টা মানে? তার পরে আমি কি?”
_আমার বৌ, ভীতু তাশরিফ হাসানের বৌ।

রোদেলা অবাক হয়ে তাশরিফকে দেখছে। তাশরিফ বলে,”চলুন দেরী করবেন না। কাজীকে বসিয়ে রেখে এসেছি। আত্মীয় স্বজন সবাইকে খবর দেওয়া। মা বধূবরণ করবে বলে বসে আছে। বেশি দেরি করলে বাড়িতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে। মা বেশি রাত জাগতে পারেন না। ঘুমিয়ে গেলে বধূবরণ করবে কে? আর তাছাড়া…..”

_তাছাড়া কি?
_বিয়ে করতে যত রাত হবে বাসর রাত টা ততো ছোটো হয়ে যাবে। আমি রিস্ক নিতে চাচ্ছি না!

রোদেলা মাথা নিচু করে ফেলে। দেয়ালের ওপাশ থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে ওঠে,”এই তাশরিফ! ভাই তোমার কিছু হলো ? আমাদের মশা কামড়াচ্ছে ভাই! আর পারছিনা লুকিয়ে থাকতে।”

রোদেলা অবাক হয়ে যায় সেদিকে তাকিয়ে। দেয়ালের ওপাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে খলিলুর রহমান,মেহেরিন,তনি, রিয়াজ এবং শারমিন।

রোদেলা হতভম্ব ভাব নিয়ে বলে,”আপনারা!”

তাশরিফ রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে,”ওনাদের আজ ভাড়া করেছিলাম আপনাকে তুলে নেওয়ার জন্য। আজ যদি সত্যিই আমার সাথে উলটো পাল্টা কিছু করতেন ,তাহলে আপনাকে সত্যিই আমি তুলে নিতাম।”

রোদেলা তাশরিফের দিকে হা করে থাকে। তাশরিফ বলে,”চলুন কাজী এসে বসে আছে বাড়িতে। সব সমস্যা গুলো দুজন মিলে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে আমার নোট প্যাড থেকে ভ্যানিশ করে ফেলি! সেভেন প্রবলেম! ওয়ান সল্যুশন।”

_মানে?
_মানে কিছু না, চলুন। আচ্ছা দু’জনেই ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছি দেখছি। সমস্যা নেই,এটাই আমাদের বিয়ের সাজ। ঠিকাছে?

রোদেলা মাথা নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বলে,”ঠিকাছে!”

~সমাপ্ত~

#দ্বিতীয়_ফাগুন (২৮)
#সারপ্রাইজ_পর্ব _অথবা_২৮_পর্ব_অথবা_সেদিন_দুজনে_দুলেছিলো_বনে। (অন্তিম পর্বের পর থেকে)
#লেখিকা_Esrat_Ety

চাঁদের আলো জানালার গ্রিল ভেদ করে সরাসরি ঘরের ভেতর পরেছে। রোদেলা কিছুক্ষণ ঘরের লাইট গুলো অফ করে জোৎস্না স্নান করে নেয়। ফোনে একটা নজরুল সঙ্গীত ছেড়ে দিয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কারো পায়ের শব্দ পেয়ে গান বন্ধ করে লাইট জ্বেলে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। দরজা ঠেলে তাশরিফ ভেতরে ঢোকে। তার হাতে একটা দুধের গ্লাস আর একটা শপিং ব্যাগ। রোদেলা শাড়ির আঁচলের কোনা ধরে দাঁড়িয়ে আছে,তার দৃষ্টি তাশরিফের দিকে। তাশরিফ একটা সাদা রঙের সুতির পাঞ্জাবি পরে আছে,বুক আর পিঠের কাছটা ঘামে ভিজে গিয়েছে,তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোথাও থেকে ছুটতে ছুটতে এসেছে। শপিং ব্যাগটা বিছানার উপর রেখে দুধের গ্লাসটা বিছানার সাথে লাগোয়া টেবিলটায় রাখে। তারপর ঘুরে রোদেলার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলে,”সচারচর বাসরঘরে স্ত্রীরা দুধের গ্লাস নিয়ে ঢোকে,আর আমাদের বাসরে আমি নিয়ে আসলাম। সাদাফ ভাইয়া জোর করে দিয়ে দিলো।”
কথাটি বলেই তাশরিফ দরজার সিটকিনি টা লাগিয়ে দিতে যায়। রোদেলা মাথা ঘুরিয়ে তাশরিফের বইয়ের তাকের দিকে আঙুল তুলে বলে,”এগুলো সব আপনি পড়েন? এই এতো এতো বই?”

_পড়তাম। এখন আর এগুলো ধরা হয় না। গুছিয়ে রেখে দিয়েছি বৌ-বাচ্চার জন্য।

রোদেলা চুপচাপ বিছানার একপাশে গিয়ে বসে। বিছানার পুরো যায়গায় ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে রেখেছে ওরা,তিল পরিমাণ যায়গা ফাকা নেই। খুবই নিচু স্বরে সে তাশরিফকে জিগ্যেস করে,”সব মেহমান চলে গিয়েছে?”
_উহু,কেউ যায়নি। আপনার আর আমার শশুর বাড়ীর সবাই আছে, আমাদের কলিগরাও থেকে গিয়েছে।

_চারটা মাত্র শোবার ঘর। সবাই থাকবে কি করে রাতটা?

_অন্য তিনটে রুমের বিছানা মেঝে পুরো ব্লকড। একদলকে দেখলাম ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বিছানা পেতেছে।

রোদেলা মুচকি হাসে।‌ তাশরিফ বলতে থাকে,”পুরুষ আর মহিলারা সবাই আলাদা আলাদা শুয়েছে। আমরা ছাড়া এই বাড়িতে অন্য কোনো কাপল নেই আপাতত। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে রিফিউজি।

রোদেলা তাশরিফের দিকে তাকিয়ে বলে “টুপি পড়ছেন কেনো?”

তাশরিফ টুপিটা ঠিক করতে করতে বলে,”ওযু করে আসুন।”

_মা ওযু করিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু কেনো?

_নামাজ পরবেন আমার সাথে।

নববিবাহিত দম্পতি নফল নামাজ আদায় করে সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত ধরে। দুজনই মোনাজাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে কিছু চায়। কিন্তু কি চায় তা এই গল্পের পাঠকদের না শুনলেও চলবে। ওটা গোপনই থাক।

জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাশরিফ জায়নামাজ ভাঁজ করতে থাকে। রোদেলা কয়েক পলক তাশরিফকে দেখে বলে,”টুপিতে আপনাকে সুন্দর লাগছে।”
_আপনাকেও ঘোমটায় সুন্দর লাগছে, চমৎকার লাগছে, স্নিগ্ধ লাগছে।

রোদেলা হেসে ফেলে,বলে,”আর কি কি লাগছে?”
_পবিত্র লাগছে।

তাশরিফ পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করে সেটার ভেতর থেকে একটা মোটা দানার স্বর্ণের চেইন বের করে। তারপর রোদেলার হাত ধরে বিছানায় নিয়ে বসিয়ে নিজেও পাশে বসে।

_এটা কি?
_এটা বাসর রাতের উপহার। স্ত্রীকে কিছু না কিছু দিতে হয় এই রাতে।
তারপর রোদেলার ঘোমটা সরিয়ে চেইনটা পরিয়ে দিতে দিতে তাশরিফ বলে,”ভীষণ সরু চেইনটা। আসলে স্বর্নের যা দাম বেড়ে গিয়েছে! আপনি আবার আমায় কিপ্টে ভাববেন না।”
রোদেলা উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। তারপর বলে,”বাসর রাতে স্ত্রীরা স্বামীকে কিছু দেয়? আমি তো জানতাম না। তাই আপনাকে দেওয়ার মতো কিছু নেই।

তাশরিফ বলে,”অসুবিধা নেই। পাওনা থাকুক।”

রোদেলা মাথা নিচু করে রাখে। তাশরিফ বলে,”সেই তেজী,জেদী, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা মেয়েটাকে নমনীয় দেখতে একটুও ভালো লাগছে না আমার। আপনি আমায় একটা ধমক দিন তো।”

রোদেলা অবাক হয়ে বলে,”আপনাকে শুধু শুধু কেনো ধমক দেবো এখন?”
তাশরিফ দুষ্টুমির সুরে বলে,”ঠিকাছে ধমক দেওয়ার মতো একটা কাজ করি তবে।”
কথাটি বলেই রোদেলা কিছু বুঝে ওঠার আগে তাকে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে তাশরিফ তার গালের সেই কালো তিলটায় গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয় তাশরিফ।‌ ঘটনার আকস্মিকতায় রোদেলা কিছুটা চমকে ওঠে। তাশরিফ তাকে ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। রোদেলা তাশরিফকে ধমক দেয়না, উল্টো লজ্জার আতিশয্যে মাথা নিচু করে রাখে। তার সাতাশ বছরের জীবনে এরকম ছোঁয়া এই প্রথম পেয়েছে সে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছে।

কিছুক্ষণ পরে তাশরিফ বলে,”আমার টার্গেট ছিলো আমি প্রথম চুমোটা আপনার গালের ওই তিলেই দেবো। ওটা আমাকে বড্ড টানে।”

তারপর কিছুক্ষণ আবার তাদের মধ্যে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে। তাশরিফ ঘাড় ঘুরিয়ে রোদেলার দিকে তাকিয়ে পাশ থেকে তার আনা শপিং ব্যাগটা রোদেলার হাতে দেয়।
“এটা পরে আসুন।”
_কি আছে এতে?

তাশরিফ বিছানায় উঠে আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে বসে। তারপর বলে,”একটা সুতির শাড়ি, খুবই সফট। এখন যেটা পরে আছেন সেটা বড্ড খসখসে।”

_এটা আনতেই তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন?

_হু, আচ্ছা এটাকে কি সাজ বলে? এভাবে সাজিয়ে দিয়েছে কে আপনাকে?
_বৃষ্টি আর আপু। কেনো ভালো হয়নি?
_না, আপনাকে খোঁপা করলে সুন্দর লাগে। এই হেয়ারস্টাইল চেইঞ্জ করে আসুন। শাড়িটা পাল্টে খোঁপা করবেন চুলে।

রোদেলা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,”এতো রাতে আমি এতো ঝামেলা করতে পারবো না। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। যে শাড়িটা পরে আছি সেটাই ঠিক আছে। আমার অসুবিধা হবে না।”

_আমার অসুবিধা হবে।

রোদেলা তাশরিফের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,”আপনার কেনো অসুবিধা হবে?”
_আপনাকে জরিয়ে ধরতে অসুবিধা হবে।

রোদেলা আবারো ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায়। তাশরিফ আমতা আমতা করে বলে,”আপনি দেখছি মিনিটে মিনিটে লজ্জা পাচ্ছেন। আপনাকে দেখে আমি নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ। যান শাড়িটা পাল্টে আসেন।”

রোদেলা মজা করে বলে,”পারবো না।”
_স্বামীর আদেশ।
_অধিকার খাটাতে শুরু করে দিয়েছেন?
_হু।‌ স্বামী যা বলবে তাই শুনতে হবে আপনাকে।
_তা আর কি কি করতে হবে?
_আপাতত শাড়ি পাল্টে চুলে খোঁপা করে আসুন। বাকিটা পরে বলছি।

রোদেলা উঠে ওয়াশ রুমে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে শাড়িটা পাল্টে এসে চুলে খোঁপা বেঁধে নেয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তাশরিফ অপলক দৃষ্টিতে রোদেলাকে দেখতে থাকে। রোদেলা খোঁপা বেঁধে এসে বিছানায় একপাশে বসে।
“এই নিন, এসেছি, এবার বলুন আর কি কি করতে হবে?”
_স্বামীর সেবা করতে হবে।
_তা কিভাবে?
_অনেক ভাবে। আপাতত পা দুটো টিপে দিন।
গাম্ভীর্য ভাব নিয়ে কথাটি বলে তাশরিফ।

রোদেলা তাকিয়ে আছে। তাশরিফ বলে,”দেখছেন কি? কি বললাম শুনতে পাননি?”

রোদেলা আমতা আমতা করে বলে,”আপনি কি মজা করছেন নাকি সিরিয়াস?”
_মজা করবো কেনো? আপনি মুসলিম মেয়ে নন? ইসলামে কি বলা আছে জানেন না? সর্বদা স্বামীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে। দিন পা টিপে দিন। পা দুটো ব্যথা করছে খুব।
রোদেলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাত দুটো বাড়িয়ে তাশরিফের পা ছুঁতে যাবে অমনি তাশরিফ লাফিয়ে উঠে রোদেলার হাত দুটো ধরে,টেনে রোদেলাকে নিজের বুকের উপর নিয়ে আসে।

রোদেলা হকচকিয়ে ওঠে। এ কেমন পাগলের পাল্লায় পরেছে সে। একে দেখলে মনে হয়না কিন্তু এই লোক তো ভয়ংকর ধরনের পাগল!

তাশরিফ রোদেলাকে বুকে নিয়ে গা দুলিয়ে উচ্চশব্দে হাসছে,নিজের বুকের সাথে রোদেলার মাথাটা চেপে ধরে রেখেছে,রোদেলাও দুলছে। রোদেলা অস্ফুট স্বরে বলে,”আপনি পাগল!”

তাশরিফ হাসি থামিয়ে বলে,”এ টু জেড”

তাশরিফের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রোদেলা উঠে বসে। তাশরিফও উঠে বসে। রোদেলার খোঁপা আলগা হয়ে গিয়েছে। তাশরিফ টেনে তা খুলে দেয়। লম্বা চুল গুলো পিঠে ছরিয়ে যায় রোদেলার। রোদেলা অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,”খুলবেন যখন বাঁধতে বললেন কেনো?”

তাশরিফ মৃদু হেসে বলে,”খোলার জন্যই বাঁধতে বলা। প্রেমিকার চুলের খোঁপা নিজের হাতে আলগা করে দেওয়ার মধ্যে অদ্ভুত সুন্দর একটা প্রাপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়। ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন একজন প্রেমিকা ছিলো আমার,রোজ কলেজ শেষে সিঁড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম,তখন প্রতিদিন তার খোপা খুলে দিতাম। মেয়েদের চুলের খোঁপা খোলা, এটা একটা শিল্প , যেটা করতে পারলে শিল্পীর স্বর্গীয় সুখের অনুভুতি হয়। ”
এই পর্যন্ত বলে তাশরিফ থামে,তারপর অত্যন্ত নিচু স্বরে রোদেলার দিকে এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,”শাড়ীর কুচি খোলার মতো ।”

রোদেলা অবাক হয়ে বলে,”প্রেমিকার শাড়ির কুচি খোলাও হয়ে গিয়েছে নাকি?”
তাশরিফ মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়,”উহহ। আজকেই হাতে খড়ি হবে।”

রোদেলা কথাটা শুনেই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে,”প্লিজ আর কিছু বলবেন না। দোহাই লাগে।”
তাশরিফ রোদেলার হাত দুটো ধরে নিজের কাছে টেনে আনে। জরানো গলায় বলে,”আমার পেঁচা মুখী!”

রোদেলা মাথা উঠিয়ে তাশরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,”নোট প্যাডে ওসব কি লিখে রেখেছেন। সমস্যা নাম্বার অমুক, সমস্যা নাম্বার তমুক। এগুলো কি?”
_এগুলো হচ্ছে তাশরিফের জীবনের কিছু সমস্যা যেগুলো রোদেলা আমিন কবুল বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওগুলো আপনার দেখার দরকার নেই।

রোদেলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,”আপনি কি আমায় আপনি আপনি করেই ডাকবেন?”

_ইচ্ছে তো করছে সেটাই করতে কিন্তু কাল সকালেই মা শুনলে একটা লম্বা ধমক দিবে।

রোদেলা আমতা আমতা করে বলে,”আচ্ছা,এরপরে পরিকল্পনা কি?”

_আপনাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে যাবো।

রোদেলা শীতল চোখে তাশরিফের দিকে তাকিয়ে আছে। পরক্ষনেই কপাল কুঁচকে ফেলে।

তাশরিফ বলে,”ওও আচ্ছা আচ্ছা,আপনি পরিবার পরিকল্পনার কথা বলছেন? সেটা তো আগে হানিমুন যাবো, তারপর ওখান থেকে ফিরে এসে ডাক্তারের সাথে কথা বলবো। ডাক্তার যদি বলে অল ইজ ওকে তাহলে বেশি দেরী না করে বাচ্চা নিয়ে নেবো। ছোটোভাই আর কদিন পরে বাবা ডাক শুনবে, লোকজন তখন আমায় অপদার্থ বলবে। আমার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আমি তা হতে দেবো নাকি!

রোদেলা কটমট দৃষ্টি দিয়ে তাশরিফের দিকে তাকিয়ে আছে। তাশরিফ একটা ঢোক গিলে বলে,”আরে কি জালা! বলবেন তো কোন পরিকল্পনার কথা বলতে চেয়েছেন। অর্ধেক কথা বললে মানুষ তো ভুলটাই ভাববে।”

_আমি বলতে চেয়েছি, আমাদের জীবনের পরিকল্পনা। মানে ধরুন আমি চাকরি করবো কিনা এসব।
_চাকরি করবেন না কেনো? অবশ্যই করবেন। দুজনে মিলে একসাথে অফিস যাবো,অফিস থেকে একসাথে ফিরবো। বাসায় এসে একসাথে কাজ করবো। প্রমিজ, আমি অন্য স্বামীদের মতো বাড়িতে এসে খবরের চ্যানেল নিয়ে পরে থাকবো না। আপনার সাথে পেঁয়াজ কাটবো,আটা মাখিয়ে দেবো।

রোদেলা হেসে ফেলে। তাশরিফের কাছে সে হাসি বড় মধুর লাগে। জরানো কন্ঠে বলে ওঠে,”আজ একটু সাহস না দেখালে এই হাসি অন্য পুরুষ দেখতো দরজা বন্ধ করে।”

রোদেলা তাশরিফের চোখের দিকে তাকায়। তাশরিফ রোদেলার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে। রোদেলা বলে,”এখন মাথা টিপে দিতে বলবেন নাকি!”
_দিলে মন্দ হয়না। তবে শুধু মাথাটাই টিপে দিন,গলাটাকে আবার টিপে দিয়েন না। আপনার সাথে কমপক্ষে ৭০ বছর সংসার করার ইচ্ছা আছে।

_সত্তর বছরই কেনো? কম বেশি নয় কেনো?
_কারন জান্নাতে গেলে সত্তর জন হুর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবো আমি। তখন আপনাকে সময় দিতে পারবো না। আপনি ঘ্যান ঘ্যান করবেন। তাই সত্তর জন হুরের পরিবর্তে সত্তর বছর আপনাকে দিতে চাই জীবনের। প্লিজ আপনি আমার ইহকালের সত্তর বছর নিয়ে নেন তবুও জান্নাতে গিয়ে সত্তর জন হুরকে নিয়ে আপত্তি তুলবেন না,কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যানানি-প্যান প্যানানি করবেন না।”

রোদেলা তাশরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে অনেক কষ্টে তার হাসি চাপিয়ে রেখেছে।

তাশরিফ রোদেলার একটা হাত মুখের কাছে টেনে নিয়ে চুমু খায়। রোদেলা শিহরিত হয়ে ওঠে। রোদেলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,”কেনো এতো দেরী করলেন রোদেলা আমিন? কেনো?”

রোদেলা সে প্রশ্নের জবাব দেয়না কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে,”আপনার নোটপ্যাডে আপনার প্রেমের কাহিনী পড়লাম। আচ্ছা আপনার প্রেমের কাহিনীতে কোনো ভিলেন নেই কেনো?”

_কারন ওটা আপনি নিজেই ছিলেন রোদেলা আমিন। ভিলেন রোদেলা আমিন,গুন্ডি রোদেলা আমিন।

রোদেলা মৃদু হাসে। তাশরিফ বলে,”সবকিছুর শোধ আমি তুলবো। আমাকে অনেক হেনস্থা করেছেন আপনি। বরিশাইলারা কখনো কাউকে ছাড় দেয় না রোদেলা আমিন, আমার ধৈর্যের শোধ আমি কড়ায় গন্ডায় উশুল করবো।”

_ওও বাবা! আপনার হুমকি শুনে আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেলাম! ভয়ে আমার হাটু কাঁপছে দেখুন!
হাসতে হাসতে বলে রোদেলা।
তাশরিফ উঠে বসে রোদেলাকে কয়েক পলক দেখে, তারপর রোদেলাকে টেনে বালিশে শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শোয়। রোদেলাকে এক হাত দিয়ে এমন ভাবে জরিয়ে রেখেছে রোদেলার পক্ষে এই বাঁধন খুলে বের হওয়া অসম্ভব। তাশরিফ রোদেলার কপালের দিকে তাকিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে,”এখন সত্যি সত্যি ভয় লাগছে তাইনা? কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে দেখছি!”
রোদেলা কিছু একটা বলতে যাবে তখন তাশরিফ তার মুখ চেপে ধরে বলে,”খুব সাফার করিয়েছেন আমায় পেঁচা মুখী,খুব।”

রোদেলা তাশরিফের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।‌ তাশরিফ কিছুক্ষণ পরে হাত সরিয়ে নেয় রোদেলার মুখের উপর থেকে। রোদেলার দিকে ফিরে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,”একটা গান শোনান না!”

_আমি তো গান জানি না।
_তাহলে কবিতা?
_তাও জানি না। ছড়া জানি,বলবো?
_কোনটা?
_অনেক গুলো জানি,যেমন ধরুন “ঝক ঝকা ঝক ট্রেন চলেছে রাত দুপুরে ওই,ট্রেন চলেছে,ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই?”

তাশরিফ হা হয়ে রোদেলার দিকে তাকিয়ে আছে। রোদেলা ছড়া বলা থামিয়ে বলে,”পছন্দ হচ্ছে না? দাঁড়ান আরেকটা বলছি,”মনারে মনা, কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটবো ঘাস !”

_ব্যস ,ব্যস, ব্যস! আর বলতে হবে না। অনেক বলেছেন। থ্যাংক ইউ, ধন্যবাদ, শুকরিয়া!

রোদেলা তাশরিফের কথায় হাসছে। তাশরিফ বলে,”কি নিরামিষ একটা বৌ আমার! কি দুর্ভাগ্য! আচ্ছা সমস্যা নেই, ট্রেনিং দিয়ে এক্সট্রিম লেভেলের রোমান্টিক বানিয়ে ফেলবো আমি। আজ রাত টা বাদ, আগামীকাল রাত থেকে প্রতি রাতে একটা করে উপন্যাস ও একটা করে প্রেমের কবিতা পড়ে শোনাবেন আমায়। দেখি, কাজ না হয়ে কই যায়!”

রোদেলা চুপ করে শোনে তাশরিফের কথা। তাশরিফ রোদেলার একটা হাত টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে বলে,”আমি একটা কবিতা শোনাই?”
_শোনান।

তাশরিফ গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করে,
“পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক,
আমরা তখন প্রেমে পড়বো!
‌ মনে থাকবে?”

রোদেলা তাকিয়ে আছে। তাশরিফ চুপ হয়ে যায়। রোদেলা বলে,”শেষ? দুই লাইনের কবিতা এটা?”
_না, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।
_কোন প্রশ্নের?
_পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক,আমরা তখন প্রেমে পরবো। মনে থাকবে?

রোদেলা অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়….মনে থাকবে!

তাশরিফ বলতে থাকে,

“বুকের মধ্যে মস্ত বড় ছাদ থাকবে,
শীতল পাটি বিছিয়ে দেবো,
একটা দুটো খসবে তারা
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে
কান্ত কবির গান গাইবে
তখন আমি চুপটি করে দু’চোখ ভরে থাকবো চেয়ে
মনে থাকবে?

রোদেলা মাথা নাড়িয়ে বলে,”মনে থাকবে!”

_আমি হবো উড়নচন্ডী, এবং খানিক উস্কোখুস্কো,
এই জন্মের পারিপাট্য সবার আগে ঘুচিয়ে দেবো।
তুমি কাঁদলে, গভীর সুখে,এক নিমিষে সব টুকু জল শুষে নেবো,
মনে থাকবে….?

রোদেলা বলে,”মনে থাকবে!”

তাশরিফ বলে যায়,”পরের জন্মে তিতাস হবো,
দোল মঞ্চের আবীর হবো,
‌শিউলি তলার দুর্বো হবো
‌ শরৎকালের আকাশ দেখার
অনন্তনীল সকাল হবো ‌।

এসব কিছু হই বা না হই,
তোমার প্রথম পুরুষ হবো
মনে থাকবে?

রোদেলা আচমকা নিজের মুখটা তার স্বামী তাশরিফ হাসানের বুকে লুকিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে ওঠে,
“মনে থাকবে,মনে থাকবে,মনে থাকবে!”

“পরিসমাপ্তি”🖤

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ