‘আমার দরদিয়া পাখি’ [পর্ব-০৩]
-আফরোজা আঁখি।
‘সিকদার বাড়িতে হুট করে পুলিশের আগমনে অবাক হলেন উপস্থিত সকলেই। আরহাম সিকদার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ছেলের দিকে। রাগত্ব স্বরে বললেন,
“এসবের মানে কি আসমান! বাড়িতে পুলিশ কেন?”
ভাবলেশহীন ভাবে বসে থেকেই উত্তর দিল আসমান,
“শুনলাম বাড়িতে চোরি হয়েছে!চোরি হলে তদন্ত করতে পুলিশ আসবেই আব্বু!”
কথাটা বলেই আড়চোখে সালেহা বেগম আর স্নেহার দিকে তাকাল আসমান। স্নেহার ভয়ে শরীর কাঁপছে। মুখটা ঢেকে গেছে ঘোর অন্ধকারে।আর কেউ না জানুক স্নেহা তো জানে তখন গহনাটা পুষ্পিতা চোরি করেনি বরং ওই গহনাটা রেখে এসেছিলো পুষ্পিতার রুমে। কিন্তু এই ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে আসমান কেন এতো বাড়াবাড়ি করছে? বাড়ির কাজের মেয়ের ঘাড় থেকে চোরির অপবাদ সরাতে পুলিশ ডেকে নিয়ে এসেছে বাড়িতে!আহান বেশ খুশি হলো ভাইয়ের কাজে।এই প্রথম বোধহয় আসমানের কোনো কাজ ভালো লাগলো তার।সালেহা বেগম আর আরহাম সিকদার কেউ-ই চাইছেন না বাড়িতে পুলিশের লোক তদন্ত করুক।উনারা বাধা দিলেন আসমানকে। কিন্তু আসমান যে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে,পুষ্পিতাকে কে ফাঁসিয়েছে খুঁজে বের করবেই সে। আসমান গিয়ে দাঁড়িয়েছে স্নেহার পাশে।ওর ভয়ার্ত মুখটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল আসমান,
“তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেন স্নেহা?চোরি তো করেছে পুষ্পিতা তোমার ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই।”
‘স্নেহা স্বাভাবিক করল নিজেকে। সকলের মাঝখানে গিয়ে বলে উঠলো সে,
“হ্যাঁ পুষ্পিতাই তো চোরি করেছে! তা মহারানী কোথায়?ওকে এখানে এনে পুলিশের লোকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না কেন?”
আসমান এগিয়ে গেলো স্নেহার কাছে। ওর হাত টেনে সোফায় বলিয়ে বলল,
“আরেহ! তুমি এতো উত্তেজিত হচ্ছো কেন? ধৈর্য ধরো। সবই হবে।”
স্নেহাকে কথাটা বলেই পুলিশের লোকেদের চোখ ইশারা করল আসমান। সাথে সাথেই উনারা লেগে পড়লেন নিজেদের কাজে।
————————
জানালার কার্ণিশে ভর দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে পুষ্পিতা। ওর চোখ দুটো অপেক্ষা করছে কাউকে দেখার জন্য।বার বার মনে হচ্ছে কেউ একজন আসবে!যাকে দেখলে ওর তৃষ্ণাক্ত চোখ দুটো শান্ত হয়!তাইতো নিজের মনের অজান্তেই এসে দাঁড়িয়েছে খোলা জানালার সামনে!বাইরে থেকে দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে পুষ্পিতার মুখ।মেয়েটার যেন হেলদোল নেই কোনো কিছুতেই।সে দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই।মনে মনে কি যেন ভেবে গেয়ে উঠলো পুষ্পিতা-
‘ওরা মনের গোপন চেনে না
ওরা হৃদয়ের রঙ জানে না
প্রজাপতি ডানা ছুঁলো
বিবাহ বাসরে…
কেনো সারারাত জেগে
বাড়ি ফিরি ভোরে….
ওরা মনের গোপন চেনে না
ওরা হৃদয়ের রঙ জানে না,
গান থামালো পুষ্পিতা, চোখ জোড়া বন্ধ করলেই গড়িয়ে পড়ল দুফোটা পানি। অন্য হাতের তালুর সাহায্যে মুছে নিল চোখের সেই অশ্রু। বেশি কিছু না ভেবে পুষ্পিতা গিয়ে বিছানায় বসল ভাবতে শুরু করল সে,—-‘আসমান ভাইয়ের বিয়েতে তো ওর খুশি হওয়ার কথা! তবে খুশি হতে পারছে না কেন? কেন কষ্ট হচ্ছে এতো! বুকের ভেতরটায় কেমন হাহাকার হচ্ছে!চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে ওর।
কথাগুলো ভেবে নিজেই নিজেকে বকাঝকা দিল পুষ্পিতা। ও কি ভালোবাসতে শুরু করেছে ঐ গম্ভীর মানুষটিকে?ওর যে বাড়ি নেই, ঘর নেই নিজের আপন বলতে কেউ নেই।এরকম অভাগীনিদের কাউকে ভালোবাসা মানায়? না মানায় না।আকাশ পাতাল কতো কি ভেবে নিজেকে বোঝালো পুষ্পিতা। বিছানায় দফ করে পরে বন্ধ করল চোখের পাতা।আবারও একবার স্বরন করল নিজের রংহীন অতীতের কথা-
‘সিকদার বাড়ির কারোর সাথেই পুষ্পিতার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। পুষ্পিতার বাবা ছিলেন আজলান সিকদারের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট! আজলান সিকদার হলেন সিকদার বাড়ির বড় কর্তা, যিনি প্রায় কিছুদিন যাবত অসুস্থতার কারণে ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। লোকটা যতদিন সুস্থ ছিলেন, পুষ্পিতাকে কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। আদর না করলেও অবজ্ঞা করত না কেউ। তবে উনার অসুস্থতার পর থেকেই শুরু হয় ওর উপর অত্যাচার! আজলান সিকদারের কথায় অফিসের কোনো এক কাজে গিয়েছিলেন পুষ্পিতার আব্বু, কিন্তু ফিরে এসেছিলেন লাশ হয়ে। আজলান সিকদার যখন পুষ্পিতাদের বাড়িতে যান, জানতে পারেন পুষ্পিতা পৃথিবীতে আসার সময় ওর অভাগিনী মা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন! ছোট্ট বাচ্চাটাকে দেখে মায়া হয় উনার। সেদিন সাত পাঁচ না ভেবেই ওকে বাড়ি নিয়ে আসেন আজলান সিকদার। সন্তানহীন স্ত্রীর কোলে তুলে দেন ছোট্ট মেয়েটাকে। মেয়েটা আলোকিত করেছিল উনার স্ত্রীর কোল, মুখে হাসি ফুটিয়েছিল আজলান সিকদার আর বাড়ির প্রত্যেকের। সেজন্যই তো আজলান সিকদার আর উনার স্ত্রী আদর করে মেয়ের নাম রাখেন নূর! পুষ্পিতা নূর।
‘ছোট থেকে সবসময় বুকে আগলে রেখেছিলেন মেয়েটাকে, কখনো বুঝতে দেননি যে পুষ্পিতা উনাদের রক্তের কেউ নয়। পুষ্পিতা ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছে, সে সিকদার বাড়ির বড় ছেলের একমাত্র মেয়ে। কিন্তু সত্য যে আগুনের মতো, তা মাটি চাপা দেওয়া যায় না কখনোই।পুষ্পিতা যখন জানল, যাদের সবসময় নিজের মা-বাবা ভেবে এসেছে, তারা ওর মা-বাবা নয় কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই তাদের সঙ্গে,দুঃখে কষ্টে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল সে।পরক্ষণেই আবার ভাবল মেয়েটা—’এমন ভাগ্য কয়জনের হয়?কারই বা বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জায়গা হয় অন্য মায়ের কোলে? কে পায় বটবৃক্ষের মতো বাবার আশ্রয়? ওকে নিয়ে অন্যরা কেউ ভাবেনি, ভেবেছেন এই মানুষ দু’জন, যারা ওকে লালন-পালন করে বড় করে তুলেছেন। উনারা পুষ্পিতাকে অতি যত্নে বুকে আগলে নিয়েছেন! পুষ্পিতা যে কৃতজ্ঞ উনাদের প্রতি।সিকদার বাড়ির প্রতিটা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ সে।
‘কিছুদিন হলো আজলান সিকদারের স্ত্রী উনার বাপের বাড়িতে গেছেন। যাওয়ার আগে স্বামীর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন মেয়ের উপর। কিন্তু ভদ্রমহিলা হয়তো জানেনও না, উনার অবর্তমানে পুষ্পিতার উপর কত নির্যাতন চালানো হয়েছে। আসমানের আম্মু কারণে অকারণে হেনস্তা করেছেন মেয়েটাকে।কাজে কোনো ভুল ভ্রান্তি হলেও মেরে ধরে শাস্তি দিয়েছেন ওকে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখ বুজল পুষ্পিতা। কিছুসময় কান্না করে কবে যে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও জানেনা!
_______________
রাত প্রায় ১২টার মতো। সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছেন সবাই। রুমটিতে এই মুহূর্তে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। স্নেহা নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আসমানের সামনে। ভয়ে মুখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না সে। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ঘৃণায় চোখ সরিয়েছে স্নেহার থেকে। মেয়েটার মানসিকতা এতটাই বাজে যে রাগের বসে চোর সাব্যস্ত করল নিষ্পাপ পুষ্পিতাকে! তখন কি ঘটেছিল, সবটাই পানির মতো পরিষ্কার সবার কাছে। আহান সবটা শুনে চড় বসাতে যাচ্ছিল স্নেহার গালে, মায়ের চিৎকার, চেচামেচি আর বাবার কড়া হুশিয়ারিতে থেমেছে সে। তবে এক মিনিটও দাঁড়ায়নি আহান,বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তখনই!
:আসমানের চেহারার দিকে তাকিয়ে বোঝা মুশকিল,সে মনে মনে কি ভাবছে। সালেহা বেগম ভয় পাচ্ছেন!এই সুযোগে বিয়েটা না ভেঙে দেয় উনার ছেলে!তিনি নিচু স্বরে বললেন,
“যা হওয়ার হয়ে গেছে, আসমান। তুমি নিজের কাজে যাও। আমি তো স্নেহাকে মেরেছি,শাস্তি দিয়েছি ওকে।আর কি চাইছো তুমি?”
মায়ের কথার উত্তরে গম্ভীর কন্ঠে বলল আসমান,
“আমি চাইছি,স্নেহা আর তুমি পুষ্পিতার কাছে ক্ষমা চাও।”
স্নেহা কটমটিয়ে বলে উঠল,
“কী! আমি ক্ষমা চাইব ঐ কাজের মেয়ের কাছে? কখনোই না!”
আসমানের চোখ দুটো আগুনের লাভার মতো লাল হয়ে আছে। রাগে ফুলে উঠেছে কপালের শিরা।আসমানের চোখ গেলো সেন্টার টেবিলের দিকে। ওখানে রাখা কাচের গ্লাস আর পানিভর্তি জগ ফেলে দিল মেঝেতে। গর্জে উঠল বলে,
“তোমাকে ক্ষমা চাইতেই হবে।আর আম্মু, তুমিও পুষ্পিতার কাছে ক্ষমা চাইবে।এ বাড়িতে ভুল করে কেউ কখনোই পাড় পায়নি।সে বড় হোক বা ছোট! পুষ্পিতা আমাদের বাংলো বাড়িতে আছে। কাল তোমরা দুজন গিয়ে ক্ষমা চেয়ে ওকে সসম্মানে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে।না হলে…”
আসমানের রাগী রূপ দেখে ভয় পেলেন সকলেই।আসমানের আম্মু কাঁপা গলায় বললেন,
“না.. হলে কী হবে, আসমান?”
“আমি এই বিয়ে করব না। আজ আর এক্ষুণি বিয়ে ভেঙে দেব। তুমি কি তেমনটা চাও,আম্মু?”
সাথে সাথেই বলে উঠলেন সালেহা বেগম,
“না না, আ…আমার ভুল আমি স্বীকার করছি। আমি কালই ফিরিয়ে নিয়ে আসব পুষ্পিতাকে। ক্ষমা চাইব ওর কাছে।”
“তুমি নয়! তোমরা দুজনে।”
কথাটা বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আসমান। পিছনে ওর আম্মু ডাকাডাকি করলেও শুনল না তা। আরিয়ানা তখনই রাগে-ঘৃণায় চলে গেছে নিজের রুমে। সবটা দেখে রাগে ফুঁসছেন আরমান সিকদার। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে উনার। স্ত্রী আর হবু বউমার প্রতি প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে উনার। এতোসময় কথা বলেননি ক কেবল আসমানের জন্য। উনি জানতেন, আসমান সামলে নেবে সবটা!
________________
‘পুষ্পিতা ঘুমিয়ে যেতেই কেউ এসে ওর পাশে বসল। মেয়েটার মায়াবী মুখশ্রী অবলোকন করে ঠোঁটের স্পর্শ আঁকলো পুরো মুখে। ফ্যানের বাতাসে পুষ্পিতার চোখ-মুখে এসে পড়া চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে আওড়ালো মানবটি—
“আমার দরদিয়া পাখি!তোমার ছোট্ট বুকে একটুখানি ঠাঁই দেবে আমায়?ভরিয়ে দেবে ভালোবাসার চাদরে?আমি যে নেশাক্ত তুমিময় নেশায়!”
‘মেয়েটার কানে যায়নি কথাগুলো, তবে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে নিজের পাশে অন্য কারোর উপস্থিতি!মনে হচ্ছে কেউ হাত বুলাচ্ছে ওর গালে।কিছু সময় পর পর নিজের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ এঁকে দিচ্ছে ওর মুখে।পুষ্পিতা কি স্বপ্ন দেখছে?নাকি সত্যিই এমনটা হচ্ছে!পুষ্পিতা নিভু নিভু চোখে তাকানোর চেষ্টা করল।বিষয়টা বোঝা মাত্রই ওখানে বসে থাকা যুবকটি পালিয়ে গেল চোরের মতো!
________________
‘এসি লাগানো রুমের মধ্যে থেকেও ঘামছে আসমান। মুখের হাবভাব এমন মনে হচ্ছে এক্ষুণি কোনো অঘটন ঘটিয়ে এসেছে। ফারহান এসে আসমানের সামনে দাঁড়ালো ওকে পর্যবেক্ষন করে জিজ্ঞেস করল,
“কি চুরি করলি?”
আসমান ভ্রু কুঁচকালো।বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করল সে।চোখ মুখের গম্ভীর ভাব বজায় রেখেই বলল,
“মানে?চুরি করতে যাব কেন? নিজের বাড়িতে কেউ চুরি করে?এখানে থাকা সবই তো আমার!”
“কেউ না করলেও আসমান সিকদার করে।তা রাত বিরেতে একা একটা মেয়ের রুমে ঢুকে তুই কি করে আসলি!দেখতে গিয়েছিলি ওর ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা? নাকি অন্য কোনো….”
পুরো কথাটা বলতে দিল না আসমান।সোফায় থাকা কুশন ছুড়ে মারল ফারহানের দিকে। রাগত্ব স্বরে বলল,
“চুপ কর।”
হেসে উঠলো ফারহান। হাতে থাকা কফির কাপ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বসল সোফায়। আসমানের মুখপানে চেয়ে বলল,
“এখনও বলবি তুই পুষ্পিতাকে ভালোবাসিস না?”
‘আসমানের মুখে কথা নেই। নির্বাক সে। সত্যিই কি আসমান ভালোবাসে পুষ্পিতাকে? ভালো না বাসলে অন্য কারো চোখে ওর প্রতি ভালোবাসা দেখলে এতো রাগ হয় কেন? যার উদাহরণ আহান! আহান আসমানের এতোটা পছন্দের তবুও ওর উপর আসমানের একটা চাপা রাগ আছে! সেই রাগের কারণ আহান পুষ্পিতাকে পছন্দ করে। শুধু কি এটাই! পুষ্পিতার চোখে সামান্য পানি দেখলে কেন ইচ্ছে করে সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে! মেয়েটার প্রতি আসমানের এই অনুভূতির নামই কি ভালোবাসা! যদি সত্যিই এমনটা হয় তাহলে আসমান সিকদার ভালোবাসে! মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে পুষ্পিতা নূর নামক মেয়েটিকে।
-চলমান…..
