Friday, June 5, 2026







দখিনা প্রেম পর্ব-১৪

#দখিনা_প্রেম
#লাবিবা_ওয়াহিদ
|| পর্ব ১৪ ||

বাড়িতে নতুন মুখ খেয়াল করেছে সেহের কিন্তু তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে আশেপাশে পাচ্ছে না। দাদীমাকেও যে জিজ্ঞেস করবে তাও করছে না কারণ, দাদীমা তার পাশে বসে কুরআন তিলওয়াত করছে। কিছুক্ষণ আগেই ফাতেমা খালা তার ক্ষতগুলোতে আবার লতাপাতার ওষুধটা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে বলেছে বিকালে আবার আসবে। এইসব ওষুধি লতাবাটার মশলাটা অনেক কাজের। এই ধরণের লতাপাতার মাঝে কোনো কৃত্রিমতা নেই। সেহেরের ঘুমে চোখ বুজে আসছে তখনই আসিয়া ঘরে প্রবেশ করলো সাথে রুবাই। সেহের তাদের চিনতে পারলো না তবুও বিনয়ের হাসি তার ঠোঁটে বিদ্যমান। ওদের দেখে দাদীমা কুরআন বন্ধ করে বিছানা থেকে নেমে কুরআন সঠিক স্থানে রেখে আবার ফিরে আসলো। আসিয়া হাসিমুখে সেহের ডানপাশে বসে থুতনিতে হাত দিয়ে বলে,

—“এখন কেমন আছো?”

—“জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো!” বলেই সেহের দাদীমার দিকে তাকালো। দাদীমা সেহেরের দৃষ্টি বুঝতে পেরে বলে,

—“এ তোর মেজো চাচী। আর ওয় আমার আরেক নাতনি রুবাই!”

সেহের এতক্ষণে তাদের চিনতে পারলো। কোনো মেহমান আসলেই সেহেরকে রুমে বন্ধ করে রাখতো, রুম থেকে বের হলেই কঠিন সাঁজা পেতে হতো। তাই কে আসতো কে যেতো তা সেহেরের ধারণার বাইরে ছিলো। একবার তপাকে ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছিলো, সেহের তখন কলেজ থেকে ফিরেছে। ছেলে তো সেহেরকে দেখে মুখের উপর বলে দেয় সে তপাকে নয় এই মেয়ে মানে সেহেরকে বিয়ে করবে। এ নিয়ে জোহরার সে কী রাগ, এমন বিত্তশালী ছেলেকে জন্য নিজের মেয়ের জন্য পছন্দ করে রেখেছিলো সেখানে কিনা এই ছেলে অন্যের মেয়েকে পছন্দ করলো! সেদিন হাজার বুঝিয়েও ছেলেপক্ষ রাজি হয়নি তপাকে বিয়ে করার জন্য, এরপর আর কী বিয়ে ভেঙ্গে গেলো। জোহরা তো রেগে সেদিন গরম খুন্তির ছ্যাঁক দিয়েছিলো সেহেরের পিঠে। যার ফলে সেহের ১৫ দিন ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারেনি। অথচ সেহের জানতোও না তার অপরাধ কী ছিলো। তখন সেহেরের পরীক্ষা চলছিলো, সেই পরীক্ষা দিতে না পারায় সেহেরের আরও এক ক্লাস গ্যাপ গেছে। অতীতের ঘটনা চিন্তা করে সেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। রুবাই সেহেরের পায়ে কাছে বসে বলে,

—“তোমাকে সেহের বলবো নাকি ফুল?”

—“আপনার যেটা ডাকতে ইচ্ছা করে আপু!”

—“আপনি’ কী হ্যাঁ? তুমি বলবে! আমি তো তোমারই বোন। আচ্ছা তাহলে সেহের ডাকি? সকলেই তো ফুল ডাকে!” মিষ্টি হেসে বললো রুবাই! আসিয়া রুবাইয়ের কথার মাঝে বলে উঠে,

—“আমি কিন্তু ফুল ডাকবো। আমার তো ওকে গন্ধরাজ ফুল বলতে ইচ্ছে করে!!”

আসিয়ার বাচ্চামো দেখে দাদীমা হাসলো। সুফিয়াও এমন চঞ্চল ছিলো। তার মেজো বউমাও যে সোনার টুকরা তা আজ বুঝতে পেরেছে। চারজন অনেক কথা বললো, আড্ডা দিলো। এর মাঝে বড় চাচী নাস্তাও দিয়ে গেছে। আবিদ গেছে ভার্সিটি। আবিদের ভার্সিটিটা শহরে পরেছে। যেতে আসতে প্রায় এক ঘন্টার মতো লাগে। দাদীমার থেকে একে একে সবটা শুনলো রুবাই এবং আসিয়া, যে এতটাদিন কতোটা অবহেলা আর অত্যাচার সহ্য করেছে সেহের। সেহের বলতে না দিলে দাদীমা ধমক দিয়ে বলে,

—“চুপ কর, বেশি কুয়ারা করবি না, ওরা আমার আপনমানুষ, ওগো না কইলে কারে কমু!”

বলেই আবার সব ঘটনা খুলে বলা শুরু করে। সব শুনে আসিয়া এবং রুবাই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কতোটা পাষাণ হৃদয়ের হলে এরা এত নিকৃষ্টভাবে একটা অসহায় মেয়েকে অত্যাচার করতে পারে। দুজনের মনেই বেশ মায়া জম্মালো সেহেরের জন্য। মেয়েটা কতো নিখুঁত অভিনয়ে নিজের কষ্টগুলোকে চেপে রাখতে পারে তা-ই অবাক করার বিষয়! রুবাইয়ের হঠাৎ কী মনে হতেই মাকে বললো,

—“মা ভাইয়ের খবর কী কাল থেকে নিয়েছো?”

—“এই রে! পরিস্থিতির চাপে সা’দের কথা তো ভুলেই গেছি।”

—“সা’দটা কেডা আবার বউমা?”

—“আমার ছোট ছেলে মা। ও কাজের চাপে আসতে পারেনি। নাম সা’দ বিন সাবরান।”

—“মাহশাল্লাহ কী সুন্দর নাম আমার নাতিডার! ওরে আইতে কইয়ো জলদি, নাতিডারে তো হেই ছুডোবেলায় দেখসিলাম!”

—“হ্যাঁ দাদী দেখবাই তো। তোমার নাতি কিন্তু নায়কের মতো হয়েছে, লাইন টাইন আবার মারিও না।” টিপ্পনী কেটে বললো রুবাই। আসিয়া রুবাইয়ের হাঁটুতে হালকা চড় মেরে বললো,

—“এসব কোন ধরণের কথা রুবাই!”

—“আহা! মারো ক্যা! নাতনি তো আমারে সাবধান কইরা দিলো। আইচ্ছা দেহুম নে আমার নাতি কেমন নায়ক!”

রুবাই আর দাদীমা অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। এদিকে সেহেরের অজানা আতঙ্কে বুকটা ঢিপঢিপ করছে। বারংবার গতরাতের ঘটনাগুলো তার চোখের সামনে ভাসছে৷ সেহের চোখ বুজে কয়েকবার লম্বা শ্বাস ফেললো।

—“তা নাতজামাই কই নাতনি। হেয় কী আহে নাই?”

—“দাদী উনি তো ইতালিতে থাকে। কীভাবে আসবে!”

দাদীমা বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও জিজ্ঞেস করলো না কারণ, তার ছেলে আগেই দাদীমাকে রুবাইয়ের অবস্থা ব্যাখ্যা করেছে। সে একজন মা, সে নিজেও বুঝে সন্তান হারানোর কষ্ট কী পরিমাণ হতে পারে তাই কিছুই না বলে স্বাভাবিক কথা বলছে। এদিকে আসিয়া সা’দকে ফোন করে সা’দের খবরাখবর নিলো।

সা’দের অপজিট চেয়ারে গালে হাত দিয়ে তানজীল আনমনে বসে আছে। কারীব আরেকটা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। তিনজনের মাঝেই নিরবতা বিরাজমান! নিরবতা ভেঙ্গে তানজীল বললো,

—“এখনো কিন্তু বলিসনি কীভাবে এবং কার সাথে বিয়ে হলো!”

সা’দ মুখ থেকে হাত সরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে মলিন কন্ঠে বলে উঠলো,

—“দুর্ঘটনাবশত বিয়েটা হয়ে গিয়েছে ব্রো!”

—“ক্লিয়ার করে বল!”

সা”দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে থাকা গ্লাসের পানিটা পুরোটা শেষ করে গতরাতের ঘটনা বলা শুরু করলো,

ফ্যাশব্যাক,

সা’দ কারীবকে ফোনে পেতে বললো,
—“কারীব জলদি জঙ্গলের ভেতর আসো, জঙ্গলের শেষ পথেই একটা মাটির কুঁড়েঘর আছে সেখানে চলে আসো!”

—“কিন্তু স্যার আপনি সেদিকে কী করছেন?”

—“আহ! কাম ফাস্ট, বাকিটা পরে বোঝাবো!”

বলেই সা’দ ফোন কেটে তার মায়াবীনির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসে। সা’দ বুঝতে পারছে না সেহেরকে কোলে নেয়াটা ঠিক হবে কি না! হাজারো দ্বিধাবোধ তাকে ঘিরে ধরলো। শেষে নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে সেহেরকে কোলে নিলো আর কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। সেখান থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই প্রায় অনেক মানুষ তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো। প্রায় অনেকের হাতে আগুনের মশাল ছিলো। সেই মশালের আলোতে সকলে চোখ বড় বড় করে সা’দ আর সেহেরকে দেখছিলো। সা’দের সামনে থাকা সেই মহিলাটা তার পাশের লোকটাকে উত্তেজিত হয়ে বললো,

—“দেহেন, দেহেন! আমি কইসিলাম না এরা কোনো নষ্টামি করসে, এহন মোর কতা বিশ্বাস হইসে তো? মাইয়াটারে কী অবস্থা করসে দেহেন!”

লোকটির চেহারায় মুহূর্তেই রাগ স্পষ্ট হলো। সা’দ মহিলাটির কথায় ভ্রু কুচকে বলে,

—“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে আমি এই মেয়েটিকে বাঁচা..।”

—“এই চুপ! চোরের মায়ের বড় গলা। আমাগো গেরামে নষ্টামি করবা আবার এহন হালি হালি মিছা কথা কও। মাইয়াটারে এসব তুমি না করলে কী পশুপাখি আইয়া কইরা দিয়া গেছে? মিছা বলার জায়গা পাও না! দেইখা তো ভালা ঘরের মানুষই মনে হয় কিন্তু ভিত্রে ভিত্রে ছিঃ ছিঃ ছিঃ!” মহিলার পাশে থাকা লোকটি বললো। সা’দের তো মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই লোকেরা তাকে ধরে কোথায় নিয়ে গেলো। সকলে সা’দকে জোর করলে সা’দ সেহেরকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো আর কোল থেকে নামাতেই কিছু মহিলা ধরে সেহেরকে কোথাও নিয়ে গেলো। এদিকে বিচার বসলো। সকলে সা’দকে যা পারছে বলেই চলেছে আর সা’দ প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে। এদিকে এতো এতো অপমানে সা’দের চোখদুটো টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কেউ কখনো তাকে কিছু বলার সাহস পায়নি সেখানে সামান্য ভুল বুঝাবুঝিতে তার চরিত্র নিয়ে এতো খারাপভাবে অপমান হতে হবে তা কখনো কল্পনাও করেনি।
সা’দকে বারবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে সে কেন এইসব নষ্টামি কেন করেছে কিন্তু সা’দ বারবার একই উত্তর দিয়েছে যে, সে কিছুই করেনি। একসময় এক মুরব্বি রেগে বলে,

—“এই তুর অভিভাবক ডাক! তারপর তোর ব্যবস্থা করতাসি!”

সা’দ তৎক্ষনাৎ তার মামাকে ফোন করে সব ঘটনা খুলে বললো। মামা তৎক্ষনাৎ রওনা হলো গ্রামের উদ্দেশ্যে। সা’দের মামা নরসিংদী শহরেই থাকে তাই ৪০ মিনিটের মতো লাগবে তার আসতে। ১০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও যখন সা’দের অভিভাবক আসলো না তখন তারা আরও ক্ষেপে গেলো। তখনই এক মহিলা এসে খবর দিলো যে মেয়েটার মানে সেহেরের জ্ঞান ফিরেছে। সকলে সা’দকে ধরে নিয়েই সেহেরের কাছে গেলো। এক লোক বললো, “এবার তোর মিছা কথায় কোনো কাম হইবো না, যা বলার ওই মাইয়াই বলবে!”

সা’দ চুপচাপ শুনলো, উত্তরে কিছু বললো না। তার কিছু বলার ইচ্ছাও নেই আপাতত। সেহের এবং সা’দ সামনাসামনি বসে আছে। সেহেরকে নানান প্রশ্ন করলে সেহের অনেক কষ্টে বলে,

—“উনি আমার কো..কোনো ক্ষতি ক…করেননি!”

লোকটি কিছু বলার আগেই আরেক মহিলা বলে উঠলো,

—“দেহেন মাইয়াটা ভয় পাইয়া আছে। এই পোলায় কেমনে তাকায় আছে মাইয়াটার দিকে আর মাইয়াটা প্রাণের ভয়ে কিছু কইতাসে না। দেহো মা তুমি ভয় পাইয়ো না কও এই পোলায় তোমার কী ক্ষতি করসে?”

সেহেরের শরীরের যন্ত্রণায় কথাই বলতে পারছে না৷ তাই সে থেমে থেমে আবারও উত্তর দিলো সা’দ নির্দোষ। কিন্তু গ্রামের মানুষ বুঝলো না, সকলের ধারণা সেহের সা’দের ভয়ে মিথ্যা ভলছে তাইতো সেহের বারবার তোতলাচ্ছে। কেউ একবারের জন্যেও চিন্তা করছে না সেহের অসুস্থ সে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। কেউ না বুঝলেও একজন বুঝলো সে আর কেউ না সা’দ। সা’দ সকলকে থামানোর চেষ্টা করে বললো,

—“এতো প্রশ্ন করা বন্ধ করুন, দেখছেন না সে অসুস্থ তাও কেন বারবার কথা বলার জন্য জোর করাছেন??? সবকিছুর একটা লিমিট আছে!”

—“এই পুলা তুমি চুপ থাকো, নিজের দোষ ঢাকার জন্য উইঠা পইরা লাগসো তাইনা? তবে তুমিও জাইনা রাখো এতো সহজে তুমারে আমরা ছাইড়া দিমু না।”

তখনই আরেকজন মহিলা নাক সিটকে বলে উঠলো,

—“আমার তো মনে হয় এরা শহরের পুলাপাইনগো মতো অবৈধভাবে মিলামেশা করসিলো!”

—“আমিও একমত, পুলা-মাইয়া দুইডায় সমান অপরাধী! ধইরা ওগো বিয়া দাও, নষ্টামি এক্কেবারে ছুইট্টা যাইবো!”

—“মানে কী পাগল আপনারা? বলছি না আমার মামা আসছেন সে আসলে সব তো হবেই নাকি!”

—“তুমার ওই মামা ফুমা দিয়া আমাগো কাজ নাই, তুমাগো আমরা বিয়া দিমুই ব্যাস! তখন নষ্টামীর ফল হারে হারে টের পাইবা বুজ্জো!”

বলে মুরব্বি কিছু লোককে কাজি ডাকানোর ব্যবস্থা করলো। সা’দের মামা আসার আগেই জোর-জবরদস্তি করে বিয়ে পড়ানো হলো। বিয়ে পড়ানোর জন্য দুজন লোক ইয়া মোটা গাছের ডাল আর গরম পেরেক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সা’দ যদি কবুল না বলে তাহলে এগুলা দিয়ে তাকে মেরেই ফেলবে বলে হুমকি দেয়া হলো৷ আর সেহের যদি বিয়েতে রাজি না হয় তাহলে তাকে নগ্ন করে পুরুষদের মাঝে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দুজনের একজনও কখনো পড়েনি। আর একটা মেয়ের কাছে তার সম্মানটা বেশি জরুরি। তাই দুজনেই কঠিন পরিস্থিতির ফাঁদে পড়ে অবশেষে “কবুল” বললো। কবুল বলার পরপর সেহের হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো। এদিকে সা’দ কঠিন ক্রোধে ফেটে পরছে। এক লোক তো খুশিতে বলে উঠলো,

—“আলহামদুলিল্লাহ, আমরা আমাগো গেরামরে পাপমুক্ত করলাম।”

বিয়ের প্রায় ৫-৭ মিনিট পরে সেখানে গ্রামের মহিলা চিকিৎসক ফাতেমা খালাকে ডাকেন সেহেরের চিকিৎসার জন্য। ফাতেমা এসে সেহেরকে দেখেই চিনে ফেলে এবং সকলকে বলে সে সেহেরকে চিনে। এবং সেহেরের পুরো পরিচয়টাও সকলের কাছে বললো। কিন্তু সা’দের সেদিকে হেলদোল নেই, সে একমনে চিন্তা করেই চলেছে তার সাথে ঠিক কি কি হলো! সা’দ ভাবতেও পারেনি তার জীবনটা এভাবে মোড় নিবে। কিছুক্ষণ বাদে সা’দের মামা আসে সাথে কারীবও ছিলো। সা’দের মামা যখন নিজের পরিচয় দিলো তখন গ্রামের সকলেই চুপ ছিলো। সা’দ সেই সুযোগে সকলকে সবটা খুলে বলে এবং সেহেরের সাথে কী কী ঘটেছে সেটাও খুলে বলে। সবটা শুনে গ্রামের মানুষ বাকরুদ্ধ! তার চেয়েও বেশি অবাক হয় সা’দের পরিচয় জেনে। এতো বড় আর্টিস্টের সাথে এমন নিকৃষ্ট আচরণন করেছে ভাবতেই তারা ভয়ে কাচুমাচু হয়ে আছে। সাথে এও ভয় পাচ্ছে যদি তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়। কিন্তু তাও তারা সে ভয় প্রকাশ না করে বলে,

—“এহন কিছুই করার নাই! বিয়া যেহেতু হইসে সেহেতু আমাগো হাতে আর কিছু নাই! এহন তুমার বউ নিয়া বিদায় হও, আর যাতে এমুখো না দেহি!”

—“সে তো যাবোই! আপনাদের মতো নিকৃষ্ট মানুষদের গ্রামে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। ”

বলেই ফাতেমা খালার সাহায্যে সেহেরকে নিয়ে সেই বিচার বসার জায়গাটি থেকে চলে আসে। ফাতেমা খালার বাসায় সেহেরকে রেখে সা’দ বলে,

—“আমি ঢাকায় রওনা হচ্ছি, আপনি দয়া করে এসব ঘটনা ওদের গ্রামে বলবেন না এমনকি তার পরিবারকেও না। আমি চাই বিয়ের ঘটনাটা সকলের কাছে গোপন থাকুক। আপনি সেহেরকে সুস্থ করে তার বাড়িতে পৌঁছে দিবেন। আর এই হলো আমার কার্ড যখন যা টাকা লাগে আমাকে ফোন করে জানাবেন আমি আপনাকে টাকা পাঠিয়ে দিবো। আর এখন সেহেরের চিকিৎসার জন্য টাকা দিয়ে যাচ্ছি আপনি রাখুন!”

ফাতেমা খালা মুগ্ধ হয়ে যায় সা’দের কথায়। এতক্ষণ এতো অপমানের পরেও সে তার সেহের মায়ের খেয়াল রাখছে ভাবতেই তার আনন্দ অনুভব হচ্ছে। ফাতেমা খালা শুধু কার্ডটা নিয়ে মলিন হেসে বলে,

—“টাকা-পয়সা লাগবো না বাবা। সেহের মা আমার মাইয়ারই মতো। আর তুমি চিন্তা কইরো না, তুমাগো বিয়ার কথা কেউ জানবো না এই ফাতেমা তুমারে কথা দিলাম!”

ফাতেমা খালা টাকা নিতে আপত্তি করলেও সা’দ জোর করে তার হাতে দুই হাজার টাকা গুজে দিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে সা’দ একবার সেহেরের দিকে তাকালো। সেহেরও তাকিয়ে ছিলো যার ফলে দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। সেহের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নত করে ফেলে। “সেহের” নামটা কাজী সাহেবের মুখে শুনেছিলো সা’দ।
সারারাত সেহের ফাতেমা খালার সেবা পেলো। সেহের এখন অবধি জানে না ফাতেমা খালাকে যে সা’দ টাকা দিয়ে গেছে।

সব শুনে তানজীল বাকরুদ্ধ! তানজীল অবাক হয়ে বলে,

—“তাহলে কী এখন ডিভোর্সের চিন্তাভাবনা
করছিস?”

—“আরে না! আমার সময় চাই।”

তানজীল সেই মুহূর্তে গ্লাস থেকে পানি খাচ্ছিলো। সা’দের জবাব শুনে তার মুখের পানি গলায় আটকে সব ফ্রুত করে বেরিয়ে গেলো। কারীবও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সা’দের দিকে। সা’দ তাদের এরূপ দৃষ্টি লক্ষ্য করে বললো,

—“কী সমস্যা?”

—“মানে সিরিয়াসলি? যেই সা’দকে কোনোদিন কোনো মেয়ের পাশে দেখা গেলো না সে কিনা অচেনা একটা মেয়েকে বিয়ে করে এখন ডিভোর্সের জন্য না করছে? মেয়েটা কী সুন্দরী নাকি সা’দ? প্রেমে-ট্রেমে পড়লি নাকি?” শেষের কথাটা টিপ্পনী কেটে বললো তানজীল। সা’দ মুচকি হেসে বললো,

—“গভীরভাবে পড়েছি!”

সা’দের কথায় দুজন আরেকদফা বিষম খেলো। দুইজনের রিয়েকশন দেখে সা’দ হুঁ হাঁ করে হেসে দেয়। হাসি থামিয়ে সে নিজেই আবার বলা শুরু করলো,

—“প্রেমের ছন্দ লিখেও প্রেম-ভালোবাসাকে বরাবরই অবিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করতাম এইসব প্রেম-ভালোবাসা শুধু গল্প-উপন্যাস এবং সিনেমাতেই হয়, বাস্তব জীবনে এর আয়োজন খুবই ঠুনকো। প্রেম মানেই ধন-দৌলত, এক আকাশ কষ্ট এবং ধোঁকাবাজি যেগুলোর এক অংশকেও আমি সহ্য করি না। কিন্তু কে জানতো, আমিও কোনো একসময় এই প্রেম নামক জালে ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে যাবো? আজ মন চাচ্ছে প্রেমিকপুরুষদের তালিকায় প্রথম নামটা যেন আমার থাকে। আজ খুব করে চাইছি, খুব!! গভীরভাবে প্রেমে পড়েছি ঠিক দখিনা হাওয়ার মতো। দখিনা হাওয়া যেমন মনকে প্রফুল্ল করে দেয় ঠিক তেমনই আমার “দখিনা প্রেম।”

—“হইসে ভাই থাম! আমাদের তোর এই বিষয় আর হজম হচ্ছে না!”

—“ঠিক! আমারও বিয়ের ব্যাপারটা একই রকমভাবে হজম হচ্ছে না। তাই আমার সময় চাই। সময়ের সাথে সাথে আমার সবটা হজম হয়ে যাবে আশা করছি।”

—“তো এখন আমি কী করবো? কোথায় যাবো? তোর বোনকে কল করলে তো বাংলাদেশি নম্বর দিয়ে কল দিতে হবে। যদি সে জানে আমি বাংলাদেশে থেকেও তার সাথে দেখা করিনি, বউ আমার সাথে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ফেলবে!”

—“তো যাও গ্রামে। সেখানে তোমার বউয়ের সাথে ইদ করিও এড্রেস আমার কাছে আছে, রুবাই আপু মেসেজ করে দিয়েছিলো!”

—“না চান্দু তোকে ছাড়া আমার যাওয়া চলবে না। তুই না গেলে আমিও যাচ্ছি না।” তানজীলের কথার মাঝে কারীব বলে উঠলো,

—“তাহলে স্যার, আমি ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে ইদ কাটাই?”

—“ঠিক আছে। তোমার আজ থেকে ছুটি। সাব্বিরকে জানিয়ে দিবা আজকে শুটিং প্লেস দেখে কাল থেকে ওরও ছুটি। আমি নাহয় এখন আমার দুলাভাইয়ের ইচ্ছা পূরণ করি!”

—“আচ্ছা স্যার জানিয়ে দিবো। আসি!”

বলেই কারীব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলো। সা’দ ফোন বের করে এড্রেস দেখতেই থম মেরে গেলো।

চলবে!!!

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের প্রত্যাশায় রইলাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ