Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"তিক্ত বুকের বাঁ-পাশতিক্ত বুকের বাঁপাশ পর্ব-২৮ এবং শেষ পর্ব

তিক্ত বুকের বাঁপাশ পর্ব-২৮ এবং শেষ পর্ব

#তিক্ত_বুকের_বাঁপাশ
#ফিজা_সিদ্দিকী
#পর্ব_২৮( তিক্ত বুকের বাঁপাশের প্রশান্তি)
#অন্তিম_পর্ব

মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে রাফিদ দাঁড়িয়ে আছে খোলা আকাশের পানে চেয়ে। আচমকা ছাদের ওই প্রান্ত থেকে দৌড়ে আসে নম্রমিতা। বাঁধ ভাঙ্গা নদীর মতো আছড়ে পড়ে রাফিদের উপর। দুইহাতে শক্ত করে চেপে করে কোমর।

“আর কখনও বলবোনা এমন। প্লীজ তাকাও আমার দিকে।”

রাফিদ নিরুত্তর থাকতে চেয়েও পারলো না। উল্টো ঘুরে জোরসে জড়িয়ে ধরলো নম্রমিতাকে। একেবারে বুকের সাথে চেপে। পারে তো একেবারে ঢুকিয়ে নেয় বুকের ভেতর। কণ্ঠ তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা। বলে,

“নুরির জন্মের সময় যে অবস্থা আমার উপর দিয়ে গেছে, দ্বিতীয়বার হলে নির্ঘাত মৃত্যু। সেই পুরানো দিনের আঘাতগুলো বারবার এভাবে কেনো জাগিয়ে তোলো নম্র! আমার যে কষ্ট হয়! পাগল পাগল লাগে।”

নম্রমিতা বিড়াল ছানার মতো আরো খানিকটা লেপ্টে গেলো রাফিদের সাথে। অতঃপর প্রশান্তিতে দুই চোখ বুঁজে স্মৃতির পাতা হাঁতড়ে বেড়ায়।

অতীত,

জ্ঞ্যান ফেরার সাথে সাথে পরিবারের সবাইকে একজোট অবস্হায় তার কেবিনে দেখে মলিন হাসে নম্রমিতা। পুরো শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। নিস্পলক চাহনিতে দেখে সকলের খুশির রেশ। অনুভব করে তাদের আদুরে আলিঙ্গন। তবুও নম্রমিতার চোখ খুঁজে বেড়ায় বিশেষ একজন মানুষকে। তার একান্ত ব্যাক্তিগত সেই মানুষটাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে তার মন। অগত্যা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,

“রাফিদ কই? সবাইকে এখানে দেখছি, কিন্তু ওকে তো দেখছি না! বাবুকে কোলে নেবেনা! রাগ করেছে আমার উপর!”

আনোয়ারা খাতুন যত্নসহকারে হাত বুলিয়ে দেন নম্রমিতার মাথায়। অতঃপর চাপা স্বরে বলেন,

“আমার ছেলেটা ভালো ছিলোনা রে মা! তার প্রাণভোমরা যে মানুষটা, তার কষ্টে সে কিভাবে ঠিক থাকে বল! ঘুমের মেডিসিন দেওয়ায় এখন নিস্তেজ সে।”

আনোয়ারা খাতুনের কণ্ঠে চাপা বিষাদ। নম্রমিতার একাধারে যেমন কষ্ট লাগছে সেই সাথে ভালোলাগার অনুভূতিও হচ্ছে বেশ। হয়তো তার জীবনের প্রথমাংশের সময়ে ছিলো অনেকখানি তিক্ততা, তবে সময়ের গতিবিধিতে তা আজ প্রাপ্তির খাতায়। বুকের ভেতরের তিক্ততার লেশমাত্রও অবশিষ্ট নেই। বিশুদ্ধ ভালোবাসার স্বচ্ছতা ধুয়ে মুছে ফেলেছে সকল তিক্ততা।

কড়া মেডিসিনের ফলে ঘুমে জুড়ে আসছে চোখ। অথচ বুকের কাছে কী যেনো ভারী ভারী ঠেকছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলতো চোখ খুলে তাকায় নম্রমিতা। আবিষ্কার করে রাফিদের উষ্ণ শরীর। আলতো করে মাথা ঠেকানো তার বুকে। গলার কাছটা অনেকটা ভেজা ভেজা। নম্রমিতা আদুরে গলায় বলে ওঠে,

“ইশ! পাগলটা এখনও কেমন করছে দেখো! আমি ঠিক আছি তো। এখনও কান্না করতে হয়!”

চকিতে চোখ তুলে তাকায় রাফিদ। অশ্রুসিক্ত চোখ আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করে খানিকটা কেশে স্বাভাবিক করে নিজেকে। অতঃপর চোরা চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে ভাঙ্গা কণ্ঠে বলে ওঠে,

“ককই কান্না করছি! ভুল দেখেছো।”

রাফিদের মিথ্যা ধরা পড়ে গেলেও আর লজ্জা দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলোনা নম্রমিতা। হালকা হেসে দুইহাত বাড়িয়ে আবারও তাকে বুকে আসার আহ্বান জানায়। রাফিদও বিনাবাক্য ব্যয়ে চুপটি করে প্রিয়তমার উষ্ণ আলিঙ্গনে মিশে রইলো।

বর্তমান,

মাঝরাতে ভিজে চুপচুপে দুই মানব মানবী মেতেছে একে অন্যেতে। বৃষ্টির ছন্দ পতনের সাথে সাথে ওঠানামা করছে তাদের উষ্ণ আলিঙ্গনের। ছাদের ছোটো চিলেকোঠার ঘরে হয়েছে আজ তাদের ঠাঁই। হয়তো বৃষ্টি ভেজা শীতল শরীরের উষ্ণতা প্রয়োজন, তাই এ আয়োজন। বাহিরের বৃষ্টির বেগের সাথে হয়তো বেড়ে চলেছে প্রিয়তমের সোহাগ।

৩৪.

দাদির ঘরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে রিফাত। আজ সে বেশ বড়সড় এক অন্যায় করেছে। এতক্ষণে হয়তো তোহা জেনেও গেছে সে ব্যাপারে। মায়ের মারের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় দাদির ঘর। সেই ভাবনা নিয়েই দাদির ঘরে এসে লুকায় রিফাত।

“রিফাত, রিফাত। কই তুমি? সামনে আসো শুধু একবার। আজ পিঠের সবকটা ছাল আমি তুলে নেবো তোমার। সামনে এসো বলছি।”

মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে দাদির শাড়ির আঁচল ধরে আরও গুটিশুটি মেরে তার পিছনে লুকিয়ে পড়ে সে। ভয়ে মুখটা কাঁচুমাচু। তোহা পুরো বাড়ি খুঁজে যখন রিফাতকে কোথাও পেলনা, অবশেষে আসলো শাশুড়ির রুমে। অতঃপর কন্ঠে রাগ বজায় রেখে ভদ্রতার সহিত বললো,

“আম্মা, আপনাকে না কতোবার বলেছি, ওই বাঁদর ছেলেটাকে একদম আস্কারা দেবেন না। আজকে স্কুলে কি কান্ড করেছে জানেন? প্রিন্সিপাল কল করেছিলো।”

“ছাড়ো না বৌমা। বাচ্চা মানুষ। এই বয়সে বদমাসি করবে না তো কখন করবে? বড়ো হওয়ার সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে সব।”

“না আম্মা। আজকের ও অন্যায় করেছে। আজ কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। এইটুকু একটা ছেলে, মাত্র চার বছর বয়স। এই বয়সেই মেয়েদের ফুল দিয়ে বেড়াচ্ছে। আবার না নিলে চড় থাপ্পড়ও দিচ্ছে। ভাবতে পারছেন আপনি! কী ডেঞ্জারাস হচ্ছে দিনকে দিন!”

তোহার অভিযোগ শুনে ঠোঁট টিপে হাসেন তিনি। কিন্তু মিছে মিছে খানিকটা গাম্ভীর্যের ভাব বজায় রেখে রিফাতকে হাত ধরে টেনে আনেন সামনে। অতঃপর খানিকটা নমনীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন,

“আমাদের রিফাত কি এমন কিছু করেছে?”

“আমার কী দোষ দাদিআম্মা! নুরিকে তো আমার ভালো লাগে অনেক। আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সাথে কেনো কথা বলবে? আমি আছি না! যা কথা বলার আমার সাথেই বলবে ও।”

“নুরি তো তোমার থেকে বড়ো আব্বা। এভাবে মারতে হয়না।”

“বেশ করেছি মেরেছি। আরও মারবো। আমার কথা শোনেনি কেনো! কতো করে না করেছিলাম স্কুলে কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে। আমি তো ওর বি.এফ, যা বলার আমাকে বলবে। অন্য কারোর সাথে কেনো কথা বলবে! আবার যদি এমন করে পা ভেঙ্গে দেবো নুরি পাথরের। আর স্কুলে আসতে পারবে না। কি মজা হবে।”

ছেলের কথা রীতিমত ভিমরি খায় তোহা। বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় রিফাতের দিকে। সেইসাথে রাগী কন্ঠে বলে ওঠে,

“বি.এফ! এই ছেলে, এসব কী ভাষা! বয়স কতো তোমার! মেরে পিঠের ছাল তুলে নেবো একেবারে।”

তোহার রাগী কণ্ঠের উচ্চস্বরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয় রিফাত। কান্নারত কণ্ঠে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

“নুরি তো আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড। ঠিক আছে, আর কখনো নুরিকে ভালোবাসবো না। আমার খেলনাও দেবো না। একটা কথাও বলবো না। পচা মেয়ে একটা। মামাবাড়িও যাবনা। সবাই পচা, অনেক পচা।”

কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বের হয়ে যায় রিফাত। তোহা পিছু নেয়না। কারণ বাবার মতোই রাগ, জেদ তার। কিছুতেই কোনো কথা বলবে না এখন। খানিকটা সময় দিলে নিজে থেকেই সব ভুলে গিয়ে ফিরে আসবে। অতঃপর শাশুড়ির পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে সে। আচমকা কিছুক্ষন আগের ঘটনার কথা মনে করে শাশুড়ি বৌমা একসাথে হেসে ওঠে উচ্চস্বরে।

৩৫.

প্রকৃতি শান্ত। আকাশ মেঘলা হলেও গুমোটভাব নেই। ফুরফুরে বাতাস হুড়মুড় করে এসে বাড়ি খাচ্ছে রুমের জানালা দিয়ে। খানিকটা শীত শীত আবহাওয়া। কেমন যেনো শান্তির এক আচ্ছাদন। এতো এতো শান্তির মাঝেও অশান্ত তোহার মন। প্রতিনিয়ত ভেতরে ভেতরে পুড়ছে সে। দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। রণকের বুকে মাথা দিয়েও আর আগের মতো শান্তি পায়না যে! তাও একটু শান্তির খোঁজে বারবার অবশ দেহটার কাছে ছুটে যায় সে। মাঝরাতে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ছুটে আসে এই রুমে। যেখানে শায়িত অবস্থায় রয়েছে তার প্রিয়তম। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসে কান্নারা। আর কতো! একটা বছর তো কম সময় নয়! রনক কী আর কখনও তাকে আগের মতো জড়িয়ে ধরবে না! সময়ে অসময়ে একটুকরো ভালোবাসার আবদার নিয়ে উপস্থিত হবেনা তার দুয়ারে!

ডেলিভারির পর চারমাস কেটেছে। নম্রমিতা প্রায় পুরোপুরি সুস্থ। ছোটো নুরি এই কয়দিনে মায়ের চেয়ে বেশি বাবাকে পেয়েছে। তাই হয়তো সে বাবার প্রতি আসক্ত বেশি। পরিবারের সকলের অন্তঃপ্রাণ নুরি। নুরি হলো কুড়ানো একটুকরো সুখ। তাইতো রাফিদ প্রথমবারের মতো মেয়েকে কোলে নিয়ে এই নামেই ডেকেছিল। অজস্র আদরে ভরিয়ে দিয়েছিলো তাকে। রাফিদের আদরে অতিষ্ট হয়ে নুরি একপর্যায়ে জোরেশোরে কেঁদে ওঠে। রুম ভর্তি সকলে রাফিদের পাগলামো দেখে উচ্চস্বরে হেসেছিলো বটে।

দুই পরিবারের আলোচনায় আগামী মাসেই পূর্ণাঙ্গভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত হয় তোহা আর রনকের। তোহাও এই পর্যায়ে পুরোনো ট্রমা কাটিয়ে উঠে মন থেকে খুশিতে হয় সবকিছুতে। আগে থেকে মোটামুটি সবরকম কেনাকাটা করা থাকায় অল্পদিনের মাঝে আয়োজন করতে খুব একটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়না তাদের। হলুদের দিন সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে রনক আসে, শুধুমাত্র তোহাকে হলুদ লাগাবে বলে। এতো লোক সমাগমের মাঝে রনককে নিজের রুমে দেখে হতবাক তোহা। বিস্ময়ে কিছু বলে ওঠার আগেই উন্মুক্ত স্বল্প মেদযুক্ত পেটে শীতল ছোঁয়া পেতেই শিউরে ওঠে তোহা। রনকের মুখে মিটিমিটি হাসি। তোহার বুকের মাঝের ড্রিম ড্রিম শব্দের কম্পাঙ্ক বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। অথচ ভাবলেশহীন রনক। নিজের কাজটুকু শেষ করে তোহাকে চোখ টিপ দিয়ে যে পথে এসেছিলো সেই পথেই ফিরে যায় সে। দ্রুত ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যায় তোহা। ভীত চোখে নীচে তাকাতেই রনককে সুস্থভাবে হেঁটে বেরিয়ে যেতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে।

সকাল থেকে বেশ কয়েকটা শাড়ি পরে আবারও খুলে দিয়েছে নম্রমিতা। রুমের অবস্থা বেহাল। চারিদিকে এটা সেটা ছড়ানো। বিয়েবাড়ি মানেই অগোছালো থাকবে সবকিছু। কিন্তু নম্রমিতা সেই ধাঁচের মেয়ে নয়। সবসময় সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার অভ্যস্ত সে। আজ হটাৎ করে রুমের এই করুন অবস্থা দেখে সরু চোখে তাকায় রাফিদ। বেডের এককোনে চুপচাপ বসে আছে নম্রমিতা। মাথা নীচু করে কী যেনো ভাবছে। সেই সাথে ভারাক্রান্ত মন। রাফিদ নিঃশব্দে নম্রমিতার পাশে গিয়ে বসে। এরপর তার একহাত পুরে নেয় নিজের হাতের মুঠোয়। শব্দ করে চুমু খায় নম্রমিতার ডান হাতের পিঠে। নম্রমিতা কিছু বলেনা।

“শাড়ি পছন্দ হচ্ছেনা? আমি পছন্দ করি দিই?”

চোখ তুলে তাকায় নম্রমিতা। চোখের কোনে পানি জমেছে। রাফিদ বিচলিত হয় খানিকটা। আলতো হাতে মুছিয়ে দেয় নম্রমিতার চোখের পানি।

“আমাকে দেখতে অনেক খারাপ হয়ে গেছে তাইনা? পেট কেমন মোটা হয়ে গেছে। আর একটুও ভালোলাগেনা, তাইনা?”

নম্রমিতার কথায় রাফিদ হালকা হাঁসে। এ কথা সত্য যে আগের চেয়ে দেহগত সৌন্দর্য্য অনেকখানি কমে গেছে নম্রমিতার। প্রেগনেন্সির সময় যে ঝড়ঝাপটা গেছে তার উপর দিয়ে! তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাফিদ বলে ওঠে,

“দেহের প্রেমে পড়লে, আজ তুমি অন্য কোথাও থাকতে নম্র। তাকিয়ে দেখো আম্মুর দিকে, বয়সের ফলে চামড়া ঝুলে গেছে। চোখে মুখে কুঁচকানো চামড়া। অথচ আব্বু আজও নিয়ম করে তার কপালে চুমু খায়, ভালোবাসে তাকে। দৈহিক সৌন্দর্য্যই যদি সব হতো, তবে আজ তাদের মাঝে থাকতো যোজন যোজন দূরত্ব। নম্র, তুমি আমার কাছে প্রথম দিনের মতো সুন্দর আর পবিত্র। কলঙ্ক তো চাঁদেও আছে, তাও সৌন্দর্য্যের উপমায় আমরা তাকেই বেছে নিই। কলঙ্কহীন সৌন্দর্য্য ফকফকা সাদা রঙের মতো, একেবারে ফ্যাকাশে। দৃষ্টির আকর্ষণে আসেনা।”

খানিকটা সময় কাটে একান্ত, তাদের প্রেমময় ক্ষণে। এরপর নম্রমিতার হাতে একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি ধরিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় রাফিদ।

বিদায়বেলা, বড্ডো কঠিন সময়। তোহার বিদায় বেলায় সকলের সাথে নুরিও কেঁদেছে বেশ। নিষ্পাপ শিশুমনও বোধহয় বুঝেছিল, আজ থেকে ফুফির কোলে আর সে চড়তে পারবে না। পাবেনা এতো শতো আদর ভালোবাসা। রাফিদের বুকের ভেতরটা দুমড়ে আসে। সেদিনের ছোটো বোনটাকে আজ অন্যের হাতে তুলে দিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। তবুও নিয়তিকে যে মেনে নিতেই হয়! তোহাকে গাড়িতে তুলে রাফিদ শক্ত করে আলিঙ্গন করে রনককে। অতঃপর নীচু গলায় বলে ওঠে,

“দুঃখকে কখনও তার ধারে কাছে আসতে দিয়নি। যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। তবে ওর জেদ নেই, আছে শুধু অভিমান। আমার বোনের বাচ্চাসুলভ মনের যত্ন নিও। শুধু এটুকুই চাইবো সারাজীবন তোমার কাছে।”

“সজ্ঞানে কখনও তার কিংবা তার মনের অযত্ন হতে দেবোনা, কথা দিলাম।”

ফোনের রিংটোনের শব্দে ধ্যানভঙ্গ হয় তোহার। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে বাস্তবে। এই অসময়ে রাফিদের কল পেয়ে বেশ অনেকটাই অবাক হয় তোহা। চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ফোন কানে ধরতেই ভেসে আসে রাফিদের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর।

“তোহা, খুব বেশি ব্যস্ত না থাকলে এখনি বাড়িতে আয়। ভীষণ দরকার।”

রণকের বুক থেকে মাথা তুলে ললাটে চুমু খায় তোহা। অতঃপর রিফাতকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে চৌধুরী বাড়ীর উদ্দেশ্যে।

নম্রমিতা মাত্রই ক্লাস শেষ করে বেরিয়েছে। ইতিমধ্যে রাফিদের কল পেয়ে মুচকি হাসে। রিসিভ করে মশকরাসূচক কিছু বলার আগেই রাফিদ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তাকে বাড়ি ফিরতে বলে ফোন রেখে দেয়। অবাক হয় নম্রমিতা। বর্তমানে সে একটা কলেজের প্রফেসর। মা আর বোনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। রাফিদ এ বিষয়ে কখনও আপত্তি করেনি। বরং চাচা চাচীর আসল চেহারা জানার পর থেকে পরোক্ষভাবে আরুশিকে সাহায্য করে ওই বাড়ি ছাড়তে। সেইসাথে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা আসতো তাদের একাউন্টে। যার সবটাই রাফিদ আড়ালে থেকে করেছে।

রুমে তিনজন মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। রাফিদ মাঝে মাঝে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবছে। নম্রমিতা আর তোহা একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে কী কারোরই বোধগম্য হচ্ছে না। ঠোঁটদুটো গোল করে বেশ জোরে জোরে বারকয়েক শ্বাস ছাড়ে সে। অতঃপর রুক্ষ কণ্ঠে বলে ওঠে,

“রণকের অ্যাকসিডেন্টটা পরিকল্পিত ছিলো।”

আঁতকে ওঠে তোহা। কথাটা যেনো ধাক্কা লাগে বুকে এসে। চোখের কোনে এসে ভীড় জমায় অনাকাঙ্ক্ষিত জলরাশিরা।

“নম্র, তোমার মনে আছে আমার আর তারিনের পিকগুলোর কথা? যেটা তোমার ফোনে পাঠিয়েছিলো কেউ!”

“হ্যা। কিন্তু ওর সাথে ভাইয়ার অ্যাক্সিডেন্টের কী সম্পর্ক!”

“সজীবের কথা মনে আছে! যে তোমাকে বলেছিলো আমার আর তারিনের সম্পর্কের কথা! আমার আর তারিনের পিক একমাত্র তৃতীয় ব্যাক্তি হিসেবে তার ক্যামেরায় ছিলো। তাই কৌশলে তার অগোচরেই এক বন্ধু মারফত অনেকদিন ধরে বিষয়টা নিয়ে খোঁজ চালাচ্ছিলাম। অবশেষে তোমার ডেলিভারির কয়েকদিন আগেই জানতে পারি এসব সজীবের কাজ। কিন্তু আসল কারণটা স্পষ্ট ছিলোনা। এরপর তোমাকে নিয়ে আর তোহা বিয়ে নিয়ে এতোটাই ব্যাস্ত হয়ে যায় যে বিষয়টা মাথা থেকে পুরোপুরিভাবে বের হয়ে যায়। হুট করেই রণকের অ্যাক্সিডেন্টের কিছুদিন আগে সজীবের সাথে দেখা হয় কাকতালীয়ভাবে। সেখানেই চেপে ধরি তাকে। অবশেষে যা জানলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি।”

এতক্ষন থম মেরে বসে রাফিদের সমস্ত কথা শুনছিল তোহা। অবশেষে অধৈর্য্য হয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠে,

“তার জন্য রণকের ক্ষতি করলো কেনো? তাকে তো আমি চিনিও না!”

মাথা নত করে নেয় রাফিদ। তোহার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস হচ্ছে না তার। নিচু গলায় বলে,

“সজীব প্রথম থেকেই নম্রকে পছন্দ করতো। ঠিক পছন্দ নয়, ওই কাছে সব মেয়েই একরাতের খেলার জিনিস। নম্রকে পেতে চাইতো সবসময়। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার ফলে সাময়িক সময়ের জন্য তার লালসা ডুবে গেছিলো। হুট করেই আবারও যখন আমার সাথে বিয়ে হলো নম্রর, নতুন করে সেই লালসা চেপে বসে তার। নম্রকে পেতে মরিয়ে হয়ে পড়ে। সে কারণেই আমাদের মাঝে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এরপর যখন সফল হলোনা, তখন ওর টার্গেট হয়ে পড়িস তুই। তোর মাধ্যমে এই বাড়িতে ঢুকতে চেয়েছিল। এরপর নম্রকে পাওয়া ওর জন্য সহজ হয়ে যেতো। কিন্তু হুট করেই রণকের সাথে তোর বিয়ে হয়ে যায়। আর সেই সময় ও দেশের বাহিরে ছিলো। আসার পর সবটা জেনে রনককে মারার চেষ্টা করে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে রনক বেঁচে গেলেও কোমায় চলে যায়।”

রাগে মুখশ্রী কঠোর হয়ে ওঠে নম্রমিতার। দাঁতে দাঁত চেপে হিশহিশিয়ে বলে ওঠে,

“ওই জানোয়ারটার ফাঁসি হওয়া উচিৎ। এতো অন্যায় করার পরও কিভাবে লাগামহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে সে!”

“প্রকৃতি ছাড় দেয় ছেড়ে দেয়না। সে নিজের করা অন্যায়ের শাস্তি পাচ্ছে। এইচ. আই. ভি রোগে আক্রান্ত সজীব। যার কোনো চিকিৎসা নেই। এতো এতো অর্থ, প্রাচুর্য্যও বাঁচাতে পারলো না আজ তাকে।”

মুখে হাত চেপে ডুকরে কেঁদে ওঠে তোহা। রাফিদ আর নম্রমিতা করুন চোখে তাকায় তার দিকে। তোহাকে শান্তনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা নেই তাদের কাছে। তোহা অপেক্ষা করবে রণকের। সারাজীবন অপেক্ষা করবে। আজও তার মনে পড়ে রণকের অভিমানী কণ্ঠ। তার দুষ্টুমিভরা আবদারগুলো। রনক কোনোদিনও আগের মতো সুস্থ হবে কিনা তোহার জানা নেই। তবে সে প্রতীক্ষায় কাটাবে আজীবন।

“প্রিয়তম, আমার তিক্ত বুকের বাঁপাশ
তুমি ছাড়া নেই আমার কোনো অবকাশ।”

নম্রমিতাকে বুকের মাঝে চেপে ধরে রাফিদ। খানিকটা সময় কাটে নিরবতায়। উষ্ণ বুকের ঠিক মাঝখানে তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়ায় নম্রমিতা। গাঢ় এক চুম্বন এঁকে দেয় রাফিদের বুকের মাঝে। অতঃপর ক্ষীণ কণ্ঠে বলে ওঠে, “ভালোবাসি।”

প্রাপ্তির হাসি হাঁসে রাফিদ। এতগুলো বছর তারা কাটিয়ে দিল একসাথে। অথচ কেউ কাউকে ভালোবাসি বলেনি। বরং প্রতিনিয়ত অনুভব করিতে গেছে একে অপরের ভালোবাসার গভীরতা।

“প্রিয়তমা, আমার প্রাণভোমর তুমি। আমার তিক্ত বুকের বুকের বাঁপাশের প্রশান্তি তুমি। হাজারো তপ্ততার মাঝে মুষলধারে বৃষ্টির মতো প্রশান্তি তুমি। আমার রিক্ত জীবনের সিক্ততা তুমি। আমার জীবন, মরণ, স্বপ্ন সবটুকুই তুমি। শুধুই তুমি।”

#সমাপ্ত।

শেষ হলো আপনাদের বহু আকাঙ্খিত এক প্রেমের উপন্যাস। এই উপন্যাস আমার কাছে স্মরণীয়। কারণ অনেকগুলো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি এর মাধ্যমে। ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে সুন্দর সুন্দর রিভিউর প্রতীক্ষায় রইলাম। ভালোবাসা অবিরাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ