ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব- ০৭
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
বিছানায় গোসল করে শুয়ে আছে সাহিল। চারপাশে অন্ধকারে ছেয়ে আছে। বাহিরে একটু পর পর মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের চমকে ঝলসে উঠছে তার কামড়া কিছুক্ষণ পরপর। সাহিলের চোখ গুলো সেই আকাশের মেঘেদের দিকে৷ চোখের কোণ বেয়ে একটা সূক্ষ্ম অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। পুরুষ মানুষের নাকি কাঁদতে নেই। কিন্তু তার যে দুনিয়া ভেঙে চূড়ে কাঁদতে মন চাইছে! বুকের ভেতর থেকে থেকেই জ্বালা করছে, কষ্ট গুলো গরল হয়ে গলা বেয়ে বুকে নামছে যেনো। একমাত্র মোহনাকে বুকে জড়ালে নিশ্চই এ জ্বালার উপশম হতো।
সাহিলের মা মারা যাবার পর সাহিল এ বাড়িতে আশ্রয় পায়। আশ্রয়? হ্যাঁ আশ্রয়ই তো। সে তো আশ্রিত এ বাড়িতে। সেদিন মায়ের লাশ দাফন করার আগ পর্যন্তও সাহিল কাঁদেনি। তারপর মামী যখন ভাতের প্লেট সহ ঘরে এসে তার মুখের সামনে খাবার তুলে ধরলেন সাহিলের হঠাৎ মনে হলো সে এতিম হয়েছে। শুধু কি পিতার মৃত্যুতে সন্তান এতিম হয়? নাহ! আসলে সন্তান এতিম হয় মায়ের মৃত্যুতে। জননীহীন জীবন যার যায় সে বোঝে। সাহিলের বাবা উচ্ছ্বল চঞ্চল স্ত্রী বিয়োগে ধীরে ধীরে মুশরে পড়ছিলেন। এ ধরণীতে তিনি হয়তো তার স্ত্রীকে ছাড়া আর কাওকেই ভালোবাসতে পারেন নি। সতেরো বছর বয়সে বউ করে ঘরে তুলেছিলেন সাহিলের মা কে। তারপর একে একে কেঁটেছে ষোলটি বছর। এ সংসারের প্রতিটা কোণে এখনো তার স্পর্শ কতটা তা শুধু তারাই জানেন। কত যত্নে গড়া সংসার তার। দ্বিতীয় সন্তানের আশায় পর পর দুবার মিসক্যারেজের পর রোগ বাসা বাঁধলী তার শরীরে৷ হঠাৎই একদিন সব চঞ্চলতা ছেড়ে শান্ত হয়ে গেলেন শাফিন। সাহিলের মা শাফিন। তেরো বছর বয়েসি সাহিল তখন বুঝলো জীবন থেকে খুব মিষ্টি কিছু একটা হারিয়ে গিয়েছে। বাবা ছেলের জীবন চলতে শুরু করলো একলা। সাহিলের বাবা স্ত্রী বিয়োগ সহ্য না করতে পেরে এগারো মাসের মাথায় এক রাতে আত্মহননের চেষ্টা করলেন৷ দুহাতের রগ কেটেছিলেন তিনি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন। সাহিলের জন্যই হয়তো। সাহিল তখন ঘুমে৷ হঠাৎ তার মনে হলো মা তাকে ডাকছে। ঘুম ভেঙে সাহিল দেখলো বাবা পাশে নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে নিচে নামতেই গরম তরল পায়ে লাগলো। সাহিলের চিৎকারে বাতাস ভারী হতে লাগলো। তের বছরের কিশোর সাহিল দেখলো তার নিষ্ঠুর বাবা তাকে একা রেখেই মায়ের কাছে পাড়ি জমাতে চাইছে৷ সে কিছুতেই তা হতে দিবে না৷ শাস্তি দিবে বাবাকে সন্তান থেকেও সন্তান হারানোর মতো শাস্তি। সে রাতে সাহিল ঘর ছেড়ে আশেপাশের লোক জড়ো করে বাবাকে হাসপাতালে নিতে সক্ষম হয়েছিলো। তারপর বাবা খানিকটা সুস্থ হতেই খুব করে ক্ষমা চেয়েছিলেন সাহিলের কাছে। ততদিনে সাহিলের চরিত্রে, স্বভাবে বিস্তর ফারাক চলে এসেছিলো। সাহিলের নির্লিপ্ততা তাকে আরও কষ্ট দিতে লাগলো। সাহিলের চাচা চাচীরা ঠিক করলেন ওনাকে আবার বিয়ে দিবেন। একটা মানুষ নিশ্চই এক জীবন এভাবে পার করতে পারেনা। সংসারের মায়ায় পড়লে তিনি আবারও সব ভুলে নতুন করে জীবন ফিরে পাবেন। তাই ভেবেই সাহিলের বাবার স্ত্রী বিয়োগের তেরো মাসের মাথায় বিয়ে করলেন রত্না কে। রত্না সাহিলের দ্বিতীয় মা,সৎ মা। রত্না কিশোরী ছিলেন না। দরিদ্র ঘরের রত্নার বয়স ছিলো একুশ। তিনি সাহিলকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন নি কখনো। কিন্তু সাহিলকে অযত্নও করেন নি। মায়ের অভাবে বিষিয়ে ওঠা সাহিল রত্নাকে মানতে পারছিলো না এও সত্যি। প্রথম কিছু মাস স্বাভাবিক থাকলেও ধীরে ধীরে ওই ঘর সংসার সব রত্নার হয়ে যেতে লাগলো এমনকি সাহিলের বাবাও৷ রান্না ঘর থেকে আসা খুনসুটির শব্দ। রোজ রাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাবার ঘরের দরজা যেখানে অন্য এক নারী থাকে৷ যতই তার বৈধ স্ত্রী হোক। এছাড়া মায়ের গড়ে তোলা সবকিছুর ধীরে ধীরে পরিবর্তন সাহিল দিন দিন ডিপ্রেশনের অতলে হারিয়ে যেতে লাগলো। আগে বাবার সাথে কথা বললেও যখন দেখলো রত্না সন্তান সম্ভবা সাহিল তার বাবার সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিলো। রত্নার সন্তান পৃথিবীতে আসার মোক্ষম সময়ে চলছে যখন তখন রত্না সাহিলকে ডেকে বলেছিলো, ” তোমার বাবা তোমার আচরণে খুব কষ্ট পায় সাহিল, আমি চাইনা আমার স্বামী তোমার বা তার পূর্বের স্ত্রীর শোকে কষ্ট পেয়ে আমাকে এবং আমার অনাগত সন্তানকে অবমাননা করুক। তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো সাহিল৷ আমি কি বলতে চাইছি নিশ্চই বুঝতে পেরেছো। এ সন্তান শুধু তোমার বাবার নয় তোমারও রক্ত। তুমি ভাই হতে যাচ্ছো। যদিও আমার গর্ভে তবুও তোমদেরই রক্ত। তুমি কি চাইবে তোমার ভাইয়ের জীবনও তোমার মতো হোক?” সাহিল চুপ করে শুনেছিলো। এবং বুঝতে পেরেছিলো তার সময়ও এ বাড়িতে ফুরিয়ে এসেছে৷ সাহিল মেনে নিয়েছিলো সব। তবে অঘটন যা ঘটার তা তো ঘটবেই। সাহিল তার চাচাতো ভাইদের সাথে খেলছিলো। ভরা পেট নিয়ে হেঁটে আসা রত্না বেখায়েলে সাহিলের ছোড়া বলেই পা পিছলে গিয়েছিলো। সাহিলের চাচী এসে থাপ্পড় বসিয়েছিলেন তার গালে৷ সাহিলের বাবা দ্রুত এসে স্ত্রীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করেছিলেন। রত্নার ওটিতে যাওয়ার আগে ক্রন্দনরত অবস্থায় বলা শেষ কথা গুলো ছিলো, ” আমি তোমাকে তোমার বাবার কাছে আনতে চেয়েছিলাম সাহিল, তুমি তো আমার সন্তানকেই আমার থেকে দূর করে দিলে।”
সাহিলের বাবা শুনেছিলেন সে কথাটি। সাহিল গুমরে উঠেছিলো। সে তো জানে সত্যিটা কি৷ রত্নাকে সে হয়তো মা হিসেবে ভালোবাসে না তবে রত্নার কাছে সে কৃতজ্ঞ। তার বাবাকে নতুন জীবন দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞ সে। সে কেনো তার অনাগত ভাই বোনের ক্ষতি চাইবে? কেউ শোনেনি সাহিলের কথা। সাহিল বুঝে গিয়েছিলো এবার বাবার কাছেও তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সাহিলের মামা মামী খবর পেয়ে এসেছিলেন হাসপাতালে। চাচী জানিয়েছেন তাকে সবই। মামীও বুঝতে পেরেছিলেন সবটা। রত্নার অপারেশন শেষে ছোট্ট রাহিল কে নিয়ে এসেছিলেন নার্স। সাহিল চেয়েছিলো ওকে কোলে নিতে একবার। চাচী দিলেন না৷ সাহিলের বাবা রাহিলকে কোলে নিয়ে কেঁদেছিলেন। তার হয়তো মনে হয়েছিলো ছোট্ট সাহিলকে আবার ফিরে পেয়েছেন তিনি। কিংবা রত্না তাকে আবার প্রথমবারের মতো পিতা হবার সুখ দিয়েছে৷ আচ্ছা তিনি কি একবারো সাহিলের মা, সাহিলকে মনে করেছিলেন?রাহিলের মা সুস্থ, রাহিল সুস্থ৷
নতুন করে বাবা হওয়ার খুশিতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন তার সতেরো বছর প্রায় সংসার করা স্ত্রী শাফিনকে তার অংশ সাহিলকে। মামীও হয়তো কিছু বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বাড়িতে এসে চুপচাপ সাহিলের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিলেন। রত্না যখন বাসায় এলো সাহিলের চাচী রত্নার খেয়াল রাখতে লাগলেন যেনো সুযোগ পেলেই সাহিল তাদের ক্ষতি করবেন। মামী ছিলেন সাহিলের সাথে নিজের সংসার সব ছেড়ে। সাহিল তার প্রথম সন্তান মানতে দ্বিধা নেই। তার যখন বিয়ের প্রথম চার বছরে সন্তান হচ্ছিলো না। তখন শাফিনের কোল আলো করে সাহিল এসেছিলো। নাজিফার জীবনেও এসেছিলো সাহিল। শাফিন যখন অসুস্থতায় সাহিলের যত্ন নিতে পারতো না কত রাত তিনি জেগেছেন সাহিলকে বুকে নিয়ে৷ জেগেছিলো তার স্বামীও৷ বোনের পুত্রকে একবারের জন্যও কষ্টে পড়তে দেননি। সাহিলের বাবা তখন চাকরি সূত্রে থাকেন দূর শহরে।
মামী তাই সাহিলের কষ্ট আর নিতে পারলেন না। তার পরেরদিনই আকীকা করে নাম রাখা হলো রাহিলের। সাহিলের সাথে মিলিয়ে। তারপর আকীকার দিনই ভরা মজলিশেই মামী সাহিলের ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে উঠিয়েছিলেন। সাহিলের বাবা আপত্তি করেছিলেন তিনি সাহিলকে কেনো দিবেন? মামী হেসেছিলেন রত্নার কোলে রাহিলকে দেখে। বলেছিলেন, ” আমার সাহিলের প্রয়োজন আপনার কাছে ফুরিয়েছে ভাই সাহেব।”
সাহিলের বাবা বুঝতে পারেন নি কি বলতে চেয়েছিলেন তিনি। রত্না একবার হাত জড়িয়ে ধরেছিলো সাহিলের। কেনো যেন নাজিফা রাগ সংবররণ করতে পারেন নি৷ কষে চড় বসিয়েছিলেন রত্নার গালে। গর্জে উঠেছিলো সাহিলের বাবা৷ পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছিলো। মামী চিৎকার করে বলেছিলেন, ” তুমি মা হবার যোগ্য না রত্না। তোমার গর্ভের সন্তানের মা হবার যোগ্যতাও তুমি রাখো না। আমি তোমায় দেখিয়ে দিবো মা না হয়েও যে মা হওয়া যায়।”
সাহিলের বাবা তবুও সাহিলকে ছাড়তে চাননি কিন্তু স্ত্রীর অপমান তিনি সহ্য করতে পারেন নি৷ মামী হেসেছিলেন বাবাকে দেখে বিদ্রুপের হাসি। এরপর সাহিল মামার বাড়িতে থিতু হয়। মামী তাকে আগলে রাখেন। পরের সন্তান বলেই কিনা তিনি সাহিলকে সর্বোচ্চ যত্ন করতেন। রাফিদের যেভাবে শাসন করতেন সাহিলকে করতেন না। সাহিল এতে বেপরোয়া হতো৷ এবং সাহিল তার কাছ থেকে শুধু আদর না শাসনও চাইতো। মামীতো সাহিলকে ভালোবাসতেন ঠিক বুঝতে পারলেন সাহিলের মনের খবর৷ এরপরে আর ভুল হলো না। সাহিলও মার খেতো রাফি রুহীর মতো যখনই ভুল করতো সে। মামাও শাসন করতেন। সাহিলের মনে হতো এইতো তার পরিবার ফিরে পেয়েছে সে।
তারপর একে একে কতগুলো বছর পেরিয়েছে। সাহিলও বাবাকে ভুলে গিয়েছে। দেখেনা বেশ অনেক বছর এখন চেহারাটাও ঠিক ঠাক মনে পরে না। আসলেই কি তাই। ওইতো রাহিলের পর তার আরও দু সন্তান জন্মালো। রত্না এখন তার সংসারে সুখে আছে নিশ্চই। থাকতেই হবে৷ সব তো সাহিল ছেড়ে এসেছে। রত্না বার কয়েক সাহিলকে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলেন৷ সাহিলের মামী যেতে দেন নি৷ শেষ বার তিনি ফোন ধরে বলেছিলেন,” তুমি স্বামী সংসার নিয়ে সুখী হও রত্না। আমার ননদ তো চলেই গিয়েছে৷ যে আছে সে এখন আমার। আমার জিনিসকে কেউ অবহেলা করবে তা আমি মেনে নিবো না৷ তাছাড়া রোজ রোজ ফোন করে স্বামীর সিম্প্যাথি নেয়ার চেষ্টা বন্ধ করো। নারী আমিও। তোমার মনের বিষ কোথায় তা আমিও জানি। এবার নিজের উপর একটু দয়া করো।” এরপর আর মামী তাদের সাথে যোগাযোগ রাখেন নি। সাহিলের বিয়েতেও ডাকেন নি।
চলবে…!
