“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব- ০৬
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
সাহিল একটা সাদা পাঞ্জাবী পরে ছাদের স্টেইজে বসে আছে। ভ্যাপ্সা গরম। সামনে হরেক রকমের মিষ্টি, কেইক, ফল। সবাই হাসি মুখে হলুদ দিচ্ছে আর হিহি করছে। সামনে নাচ গান হচ্ছে। সব কাজিনরা মিলে নাচছে। অথচ এত কিছুতে সাহিলের বিন্দু মাত্র মন নেই। তার মন পরে আছে সামনে একটু পর পর হেঁটে আসা যাওয়া করা ঘাসফুলের উপর। মোহোনার থেকে তার চোখই সরতে চাইছে না। সাহিলের দৃষ্টি বার বার মোহোনার দিকে গিয়ে ঠেকছে।
মোহোনা পিছনের কোনার দিকের এক চেয়ারে বসে আছে। সাহিলের কিছু বন্ধু এসেছে তারাও মোহোনার সাথে আড্ডা জমাতে চাইছে। লাকি লেডি যার কপালে জোটে তার। সাহিল দেখছে মোহোনা খুব সুন্দর করে হেসে হেসে উচ্ছ্বাসিত হয়ে কথা বলছে। ভ্যাপসা গরমে কোমরের দিকের শাড়ি খানিকটা সরে গিয়েছে। মোহোনার হুশ নেই সেদিকে৷ সাহিলের বন্ধুরা কেউ খারাপ না। তবুও পুরুষের নজর ভিন্ন৷
সাহিলের রাগ হলো খুব রাগে সে নাজিফাকে ডেকে বললো, ” আর কতক্ষণ এমন সং সেজে বসে থাকতে হবে? ”
” কি কথা! এখনোতো অর্ধেক মানুষই হলুদ দেয়নি।”
” মামী আমি গরমে অস্থির হয়ে আছি। দেখো ঘেমে কি অবস্থা আমার। ”
তিনি দেখলেন সত্যিই সাহিল কাহিল হয়ে গিয়েছে। তিনি বেচারাকে দেখে মায়া করে দ্রুত সবাইকে হলুদ ছোঁয়াতে বললেন।
সবাই দ্রুত হলুদ ছোয়ালো সাহিলকে। মোহোনার পরিবারের সবাইও এক এক করে সাহিলকে হলুদ দিলো। সাথে কিছু বখশিশও। ফুপি মোহোনাকে ডাকলো সাহিলকে হলুদ দিয়ে দিতে৷ কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। মোহোনা তখন সাহিলের বন্ধু আর রুহির বান্ধবীদের খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত৷ বেশ নাচা গানা হলো। কিন্তু সাহিল নাচলো না। এখনতো বর বউয়ের নিজের বিয়েতে নাচা একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সাহিল ট্রেন্ডে গা ভাসানোর লোক না। সে এক গুরুগম্ভীর ভাব ধরে রাখে সবজায়গায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর ধারালো ব্যক্তিত্ব সবাইকে এফোড় ওফোড় করে দেয়৷ সাহিলের সব দুষ্টামি শুধু দুজন মানুষের কাছেই এক ফুপি আরেকজন….
সবার হলুদ দিতে দিতে রাতের এগারোটা বাজলো। ট্রেডিশনাল বিয়ের জন্য এতো তামঝাম হলো না। যা হয়েছে তাই বা কম কিসে! সবার শেষে মোহোনাকে ফুপি ধরে আনলেন। সাহিলের পাশে বসিয়ে দিলেন জোর করেই। মোহোনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতে হলুদ নিয়ে সাহিলের গালে ছুতেই তার সমস্ত শরীর যেনো এক বিশাল ঝাকি দিলো। সাহিল তার হলুদ মাখা হাত মোহোনার কোমোড়ে ছুইয়েছে। কেউ কি দেখেছে? না এখন প্রায় সবাই নিচে খাবার খেয়ে বাড়ি যেতে ব্যস্ত। মোহোনা চমকে কথা বলার শক্তি হারিয়েছে যেনো।
“শাড়ি না পরতে জানলে পরেছো কেনো?সবাই তোমাকে গিলে খাচ্ছে চোখে দেখছো না?”
ব্যস হয়ে গেলো৷ মোহোনার চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে৷ কি অসভ্য লোকটা। আজ কত বছর পর “তুমি” করে সম্বোধন করলো। কি আশ্চর্য! তার এতো কান্না কেনো পাচ্ছে।
সাহিল রাগে কাঁপছে। মোহোনা জেদ করে বাটিতে যা হলুদ ছিলো সবটাই সাহিলের সমস্ত মুখে আর সাদা পাঞ্জাবি তে ভরিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়েছে। সাহিলের কি হলো কে জানে বন্ধুদের হাসি উপেক্ষা করে সেও এক হাতে হলুদ নিয়ে মোহোনার পিছু ছুটছে৷ মোহোনা কোনো দিক না তাকিয়েই দৌড়ে রুহির ঘরের দিকে গেলো কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বার দুয়েক নক করেই মোহোনা সাহিলের ঘরের দিকেই ছুটলো। খোপা করা চুল ঢিলে হয়ে গাজরা লটকে গিয়েছে। মোহোনা দরজা আটকানোর আগেই সাহিল ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। সপাট করে দরজা আটকে দিলো। মোহোনা ভয়ে সিটিয়ে গেলো। বাথরুমের দিকে ছুটে যাবার আগেই সাহিল তার হাত ধরে ফেললো।
মোহোনার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে৷ এতো জোরে হার্ট বিট করছে কেনো? হৃদক্রিয়া তো বন্ধ হবার যোগার।
মোহোনা বড় করে শ্বাসও টানতে পারছে না। সাহিল মোহোনার কাছে চলে এলো। খুব কাছে, এতো কাছ থেকে মোহোনার শ্যাম্পু করা চুলের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে৷ বিবস দেহে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাহিলের হাত দুটো মোহোনার গাল ছুলো। মোহোনা অনর। এবার আর কেঁপে উঠলো না সে। সাহিলকে আজ কিছু কঠিন কথা শোনাবে সে। আর সহ্য করা যাচ্ছে না এই অত্যাচার। আজ সে চোখের সামনে আছে। কাল কি করবে?
বিছানাটার দিকে তাকাতেই মোহোনার কষ্টগুলো জেনো গলায় আটকে গেলো।
ধীর কন্ঠেই সে বললো,
” আগামীকাল এই সময়ে আপনি স্ত্রী নিয়ে এই বিছানায় শুয়ে থাকবেন তাই না সাহিল ভাই?”
সাহিল চমকালো না। সে জানতো মোহোনা কি ভাবছে।
সাহিল মোহোনার থেকে দূরে গিয়ে হেটে বিছানায় গিয়ে বসলো।
মোহোনার হাত ধরে টেনে এনে তার পেটের কাছ থেকে আঁচল সরালো। মোহোনা মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো। সাহিল রাগি দৃষ্টি নিয়ে বললো, ” এতো জায়গায় সেফটিপিন লাগিয়ে কি লাভ তবুও তো শাড়ি জায়গা মতো নেই। টেনে ব্লাউজের সাথে লাগানো শাড়ির সেফটিপিন খুলে তা ছুড়ে ফেললো।
সাহিল এবার মোহোনার চোখের দিকে তাকালো৷ জলে টইটম্বুর হয়ে থাকা মোহোনার ভাসাভাসা চোখ। সাহিল নিজের গালে মোহোনার পেটে স্পর্শ করালো। এবার আর শক্ত থাকতে পারলো না সে কেঁপে উঠলো৷ যেনো ভুমিকম্প হচ্ছে। সায়াহিলের গালে লেগে থাকা হলুদে মোহনার ফর্সা মশ্রিণ পেট যেনো রঙিন হয়ে গেলো। মাতাল মাতাল লাগছে। এক্ষুণি সাহিল যদি তাকে নিজের বুকের নিচে পিসে ফেলে তাতেও সে বাঁধা দিতে পারবে না মনে হয়। ভিতরের ভাঙচুর কি কেউ টের পাচ্ছে? সাহিলের কানে কি যাচ্ছে সেই শব্দ?
” ঘাসফুল। ”
মোহোনা তাকালো সাহিলের দিকে। সাহিল এখনো চোখ বন্ধ করে মোহোনাকে জড়িয়ে আছে।
” চল পালিয়ে যাই। ”
মোহোনা সপাটে চড় বসালো সাহিলের গালে।
সাহিল জানতো এমন কিছুই হবে। সে মন খারাপ করলো না, রাগও না৷
” আপনাকে দেখলে আমার বমি পায় সাহিল ভাই।”
সাহিল হাসলো৷
” বারে এখনোতো কিছু করিই নি। শুধু দেখেই বমি পায়?”
মোহোনার রাগ হলো খুব।
” আপনার মতো একটা কাউয়ার্ডের সাথে আমি থাকবো ভাবেন কি করে? আপনার লজ্জা করে না?”
” না করে না৷ ঘাসফুলের ধ্রুবতারা যে আমি৷ ”
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো মোহোনা। সাহিল কে সরিয়ে দিয়ে বললো, ” আমি আপনার সেকেন্ড কাজিন ছাড়া আর কিচ্ছু নই সাহিল ভাই। আমার ফুপি আপনার মামী হয়৷ আমি শুধু তার রিকোয়েস্টে এই বিয়েতে এসেছি। বিয়েতে এসে আরেক জনের স্বপ্ন ভঙ্গ করে বর নিয়ে পালানোর মতো মেয়ে আমি না।”
সাহিল দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বাহিরে সবাই তাদের খুঁজছে।
সাহিল ফের বললো, ” আমার ভুল হয়ে গিয়েছে মোহোনা। আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
মোহোনা হাসলো।
” আমি সহ্য করেছি সাহিল ভাই। আট বছর সহ্য করেছি। এখন আর সেই অনুভূতি আমার মধ্যে নেই। সব ধুঁয়েমুছে গিয়েছে সেই কবেই। তাই আপনার ও সহ্য হয়ে যাবে৷ তাছাড়া আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। আমি কাল চলে গেলে আপনার আর আমার কথা মনে থাকবে না। যেমন এক সপ্তাহ আগেও ছিলো না।”
সাহিল আর কিছু বলতে পারলো না৷
মোহোনা দরজা খুলে চট করে বের হয়ে চলে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো সাহিলকে। দু ফোঁটা অশ্রু যেন গাল গড়িয়ে পড়লো তার।
চলবে…
