ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব- ০৫
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
হলুদের প্রিপারেশন বেশ তোরজোরের সাথে শুরু হয়েছে৷ সারাদিন ছাদে ছোট করে স্টেজ সাজানো ডেকোরেটর ডাকা সবই হচ্ছে। হলুদ উপলক্ষে চার ডেগ ভরতি বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। হবেনা হবেনা করেও বেশ মানুষ হয়ে গিয়েছে এক হলুদের দাওয়াতে। আর নাজিফা বুঝতে পারছেন না কাকে রেখে কাকে দাওয়াত দিবেন।
হুমাকে দিয়ে হলুদ বাটানো হবে। হুমাকে বলা হয়েছে যে যতই বিরক্ত করুক সে কথা বলতে পারবেনা। একদম মৌন অবস্থায় হলুদ বাটবে। হুমা নিজের কাঁধে দায়িত্ব পেয়ে নিজেকে ভীষণ বড় মনে করছে। তার মনে হচ্ছে এই সংসারের ভাড় পুরোটা তার কাঁধে দিলেও সে সামলে নিবে। রুহিই দায়িত্ব পেতো কাজটা করার কিন্তু সে এই মুহূর্তে তার বন্ধু বান্ধবীদের আপ্যায়নে ব্যস্ত৷ তাছাড়া বাড়িতে হাজার কাজ। গেস্ট ডেকে এনেতো কাজ করানো যায় না। তবুও দুপুরের রান্নার কাজে হাত লাগালেন মোহনা আর তার মা। দ্রুত দ্রুত কাজ সেরে সবাইকে খেতে ডাকলেন।
হুমা গোসল সেরে হলুদ রঙের শাড়ি পরেই চলে এসেছে। আসে পাশের বয়ঃবৃদ্ধারা গীত ধরলেন। ছেলের বিয়ে হওয়ায় ছেলেদের উদ্দেশ্য করেই গান গাইলেন। এই পুরোটা সময় হুমা নিখুঁত ভাবে হলুদ বাটলো কারো সাথে কথা বললো না। সেই হলুদ মাখা হাতেই সে উঠে হাত ধুঁতে চললো।
বেসিনের সামনে গিয়েই দেখলো রাফি একটা মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে হাহা করে হেসে কথা বলছে৷ হুমার বাছুরে প্রেম হঠাৎ পাগলা ষাড়ে পরিণত হলো। হাত ধোঁয়া বাদ দিয়ে ফুঁসতে লাগলো সে। কি মহাযন্ত্রণা হলো। বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে হাতে হলুদের দাগ রয়ে যাবে যে। এরপর মেহেদি লাগাবি কি করে গাধী? হুমার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। রাফি খিচুড়ি খেয়ে হাত ধুঁতে বেসিনের কাছে আসতেই হুমাকে দেখে চমকে গেলো। এক পেচে শাড়ি পরা হুমা লম্বা ভেজা চুলগুলো পিঠময় ছাড়া। সুন্দর সাদা হাত গুলোতে হলুদের দাগ। এই মেয়েটার নাক বোচা না হলে বিশ্ব সুন্দরী হওয়া থেকে তাকে কেউ আটকাতে পারতো না। রাফির অস্থির লাগছে। সে ধমকে উঠলো,
“হাত না ধুঁয়ে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? সর এখান থেকে।”
রাগে হুমা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে রাফির চোখে মুখে কাচা হলুদ যা তার হাতে ছিলো মেখে দিলো। রাফি ঘাবড়ে গেলো। চোখ জ্বলছে সে আরও জোরে চিৎকার করলো। বাম হাত দিয়ে চোখে হাত দিতেই হুমা রাফির হাতে কষে কামড়ে দিলো। ভীত পায়ে একদম এক দৌড়ে মোহোনার কাছে চলে গেলো।
রাফির চিৎকার শুনে রুহি দৌড়ে এসেই দেখলো রাফির অবস্থা সঙ্গীন। দ্রুত রাফির হাত ধুয়ে দিলো, রাফি ভালোভাবে চোখমুখ ধুয়ে পরিষ্কার করলো। রুহি ফ্রিজ থেকে বরফ এনে রাফির হাতে দিলো সে তা চোখের উপর চেপে ধরলো। রাফির দুই হাতে কামড়ের দাগ স্পষ্ট। রুহি জিজ্ঞেস করলো,
“তোকে এইভাবে কামড়ালো কে?” রাফি উত্তর দিলো না। ভয়ানক রাগে ফুঁসছে সে। হাতের দাগের উপর বরফ চেপে ধরলো সে।
মোহোনা বিছানায় কাপড় গুছিয়ে রাখছিলো সন্ধ্যায় পরার জন্য। সে কোনো প্রিপারেশন নিয়ে আসেনি। শপিংয়েও যায় নি। হলুদে কি পরবে ভেবে কুল পাচ্ছিলো না। তার মাও এতো বোকা একটা হলুদ শাড়ি তার জন্যতো আনতেই পারতো। ফুপিও কি ভুলে গিয়েছে সে যে এই বাড়িতে আছে! বড্ড অভিমান হলো তার। একজোড়া সবুজ সালওয়ার কামিজ বের করছিলো সে। হঠাৎ দরজা ঝট করে খুলে যাওয়ায় ঘাবড়ে গেলো সে।
হুমা ফুপিয়ে যাচ্ছে এক নাগারে। ভয়ে মোহোনা ওর মাথায় হাত রাখলো৷ হুমা কি যে বললো বুঝতে পারলো না সে। হুমার হাতে হলুদের দাগ এখনো আছে। মোহনা তার হাত ধুয়ে দিলো ওয়াশরুমে রাখা বালতির পানি দিয়ে৷ তারপর চোখমুখ মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কান্না থামাও হুমা। খেয়েছো দুপুরে? ”
হুমা ফুলে ফুলেই মাথা নাড়িয়ে বুঝালো খায়নি। মোহোনা উঠে গিয়ে এক প্লেট ভরতি খিচুড়ি নিয়ে এলো ঘরে। হুমার পাশে বসে হুমাকে খিচুড়ি খাওয়ালো সে নিজেও খেলো। রুহি দৌড়ে ঘরে ঢুকে বললো, ” তোমার হলো কি মোহোনা আপু? তুমি খাইয়ে দিচ্ছো? তাও আবার হুমাকে? আমার ভাগেরটা কই?”
মোহোনা মুখ ভেঙচে বললো, ” হুমার হাতে হলুদ লেগে ছিলো। তাই খাইয়ে দিচ্ছি। তোকে কেনো দিতে হবে? তোর হাত দিয়ে তুই খা।”
হুমা ফিক করে হাসলো। রুহি হেসে হুমা কে লজ্জা দিতেই বললো, ” মাংস কম খা হুমা। আমার ছোট্ট ভাইটার মাংস একটু আগেই খেয়ে এসেছিস। এখন আবার খেলে পেটে সমস্যা করবে। হলুদে হলুদ ডায়রিয়া হয়ে যাবে তোর।” লজ্জায় মাথাকাটা যাবা জো।
মোহোনা এতক্ষণে ব্যাপার বুঝতে পেরে অট্টহাসি দিলো। রুহিও যোগ দিলো। হুমা আবার মাথা নিচু করে বললো, ” শয়তান টা তোমায় নালিশ করেছে?”
” নাহ! ওর হাতের দাগ দেখেই বুঝেছি এই পুরো তল্লাটে তুই ছাড়া রাফিকে কামড় দেয়ার কেউ নেই।” বলেই হেসে বিছানায় গড়ালো।
ছি ছি কি লজ্জা। হুমার ইচ্ছে হলো দৌড়ে চলে যায়। কিন্তু ক্ষুধার কাছে হার মানলো। তাই চুপ করে মোহোনার হাতে খেতে লাগলো। মোহোনা হাসছে, চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে৷ এমন স্মৃতি কি তার ও রয়েছে? রয়েছেইতো। সাহিল ভাই কে নিয়ে তার বেশ স্মৃতি রয়েছে। কিন্তু এগুলো সে আর মনে করতে চায় না। বিয়েতে সে বরযাত্রী যাবেনা বলে ঠিক করেছে। কিছু একটা বাহানা দিয়ে বাড়িতেই থেকে যাবে৷ সাহিল বিয়ে করে বউ সমেত ফিরবে আর তার সাক্ষী হওয়ার মতো উদার তো সে না।
বিকেল হতেই সবাই তৈরি হতে শুরু করেছে। মোহোনা একজোড়া সবুজ সালওয়ার কামিজ পরেছে। বেক্ষাপ্পা লাগছে যদিও সবাই হলুদে হলুদ আরণ্য হয়ে থাকবে আর সে তার মাঝে সবুজ৷ তবে এছাড়া তার কাছে উপায়ও নেই। সেজে গুজে চুলগুলো খোপা করে নিলো সে৷ এই ভ্যাপ্সা গরমে চুল ছেড়ে থাকা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।
হুমা দৌড়ে কোথা থেকে যেনো এলো এসেই মোহোনার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলো।
” এতে কি?”
” শাড়ি। হলুদের হলুদ শাড়ি।”
” কার শাড়ি? তুই কই পেলি?” প্রশ্ন করলো রুহি।
” মায়ের শাড়ি। আম্মুর অনেক গুলো হলুদ শাড়ি। এইটা একদম নতুন এখনো ভাঁজ ভাঙে নি। আর তাছাড়া আম্মু আরেকটা নতুন শাড়ি পরেছেতো।”
” তবুও আমি এইটা পরতে পারবো না। এমনিতেই গরম তাছাড়া ব্লাউজ পেটিকোট কোথায় পাবো সোনা?”
রুহি চট করে বললো, ” দেখি শাড়িটা বের করো দেখি।” মোহোনা শাড়ি বের করতেই রুহি খুশি হয়ে বললো, ” এই গোলাপি রঙের ব্লাউজ পেটিকোট তো আমার আছেই। খুব সুন্দর মানাবে তোমকে।” রুহি দ্রুত সরঞ্জামাদি বের করে মোহোনার হাতে ধরিয়ে দিলো। মোহোনা বললো, ” টাইট হবে তো।”
” আরে হবেনা। একদম ঠিক মাপ হবে। উলটো আমার ঢিলে হয় খানিকটা।” বলেই রুহি ঠেলে তাকে ওয়াশরুমে পাঠালো।
শাড়িতে মোহোনাকে দারুণ মানিয়েছে। হলদে ফর্সা শরীরে শাড়িটা জ্বল জ্বল করছে৷ হুমা দেখে মুচকি হাসলো৷
হলুদ উপলক্ষে রুহি শ’খানেক গাজরা অর্ডার করেছিলো তার থেকেই একটা মোহোনার খোপায় পেচালো। রুহির সোনালি কানের ঝুমকা আর ছোট মুক্তার মালায় মোহোনাকে দেখে রুহি চমকে গেলো। সে কখনো মোহোনাকে সাজতে দেখেনি। আজ প্রথম। থু থু দিলো বাম দিকে।
মোহোনা বের হবার আগেই হুমা তার হাত টেনে ধরলো। টিপের পাতা থেকে কালো টিপ্টাই পরালো সে। রুহি বললো, ” ওটা কেনো পরাচ্ছিস গোলাপিটা পরা। ”
” তুমি কিছুই বুঝোনা রুহি আপু। আজকে মোহোনা আপুর উপর সবার নজর থাকবে। তাই কালোটা পরিয়েছি। দাঁড়াও এই নাও তুমিও পরো। দেখো আমিও পরেছি। বলেই তিনজন হাসলো। ঘর থেকে বের হয়ে মোহোনা হলুদের ডালা ঠিক করে রাখলো। এদিকে ফুপি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মোহোনাকে দেখে চমকালেন। তিনি ডাকলেন,” কে গো মা তুমি?” চোখে পানি আর কন্ঠে ঠাট্টার সুর। মোহোনা ফিরে হাসলো। ফুপি তার হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে এলেন। তারপর জোর করে তার খালি হাত দুটোও স্বর্ণের রুলি পরালেন। ফুপি বললেন, ” এইতো এখন পারফেক্ট লাগছে। ওমন হাত খালি কেমন লাগছিলো। এখন একদম ঠিক আছে।” মোহোনা বোকার মতো হেসে বললো, ” হারিয়ে গেলে তুমি দাম চাইতে পারবেনা ফুপি। আমি এইসব পরি না।” মোহোনা খুলে ফেরত দিতে নিলেই তিনি কপট ধমক দিলেন।
” খবরদার খুলবি না।” পরে থাক।
ফুপির ধমকে মোহোনা হেসে ফুপিকে জড়িয়ে ধরলো।
” শাড়িটা তোকে খুব মানিয়েছে।”
” তোমার তো মনেই ছিলো না যে তোমার ভাতিজির শাড়ি লাগবে।”
” কি বলিস! সবার শাড়িই তো এনেছি। সাহিল সবার জন্যই কিনেছে৷ এটাও তো এনেছে। তোকে বলেনি?”
বোকার মতো তাকিয়ে রইলো সে৷ হুমা যে মিথ্যে বলেছে এখন বোঝা গেলো। কেনো তার হাতে দিতে পারলো না? ফুপিকে দিয়েই নাহয় দেয়াতো। ইশ! এখন এই শাড়ি খোলাও যাবে না ফুপি কষ্ট পাবেন। শুধু কি ফুপির খারাপ লাগবে!
মোহোনা আর কিছু না বলেই ছাদে রওনা হলো।
চলবে…
