“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব- ০৪
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
ধূপধাপ পা ফেলে দৌড়ে ছাদ থেকে নিচে নামলো সাহিল। অবাক হয়ে তা দেখলো মোহনা। সারারাত সে একফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি। এই লোকটার জন্য শুধুমাত্র। রুহি তার পাশে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমিয়েছে। অথচ কি এক অস্থিরতা নিয়ে সে ঘুমাতে পারেনি রুহিকে দেখেই কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। এতো আরামে সে কেনো ঘুমাতে পারছেনা। ভেবেছিলো ভোরের ঠান্ডা শীতল বাতাসে হয়তো ভালো লাগবে কিন্তু সকাল সকাল এই চামচিকার চেহারা দেখে সে উপায় ও রইলো না। এখন আবার এটিটিউট দেখাচ্ছে।
মোহনা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো।
বেলা উঠতেই বাড়িতে হৈ চৈ পরে গেলো। ধীরে ধীরে আত্মীয় স্বজন সব আসতে শুরু করেছেন। মোহনার মা বাবা ভাই চলে এসেছে ইতিমধ্যে।
নিচতলার রুম গুলো খুলে দিয়েছেন ফুপি। বাকি গেস্টদের দু একজন পাশের হুমা দের বাড়িতে থাকবেন। হুমা হচ্ছে রুহির অসমবয়সী বান্ধবী। আর রাফির বন্ধুর ছোট বোন। এছাড়া হুমার বাবা ৭ বছর আগে এখানে চলে আসেন চাকরি সূত্রে এরপর থেকে এখানেই আছেন।
রুহি রাফিকে চিৎকার করে ডাকলো। রাফি ঘরে ঢুকতেই বললো বাকি মেহমানদের হুমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে। আরোও নির্দেশ দিলো ব্যাগ গুলো যেনো সে নিজে বহন করে। রাফি বিরক্ত হলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, ” আমি নিবো কেন? আমি কি কুলি? আর তাছাড়া যার যার ব্যাগ সে সেই বহন করবে।”
ধমকে উঠলো রুহি, ” এই ছোকরা, তোর সমস্যা কি? ভাইয়া শুনলে চাটি মেরে মাথা দুভাগ করে ফেলবে। ” এতক্ষন ওদের দু ভাইবোনের কথা শুনছিলো মোহনা এখনো হেসে গড়িয়ে পড়ছে যেন।
” ভাইয়ার ভয় দেখাবি না। আমি রাফি কাউকে ডরাই না। ” বলেই রাফি তার ব্যাক কম্ব করা চুল গুলো হাত দিয়ে আঁচড়ে নিলো। ঠিক তখনই সোহেল নিচ থেকে রাফি বলে গমগমে স্বরে ডাকল। রাফির পিলে চমকে গেলো মুহূর্তেই। আর তা দেখে রুহি আর মোহনার হাসি অট্টহাসি তে পরিণত হলো।
অবশেষে রাফিকে ব্যাগ সমেত হুমাদের ঘরে যেতেই হলো। হুমার মা ব্যাগ গুলো সব কোন ঘরে রাখতে হবে তা হুমাকে দেখিয়ে দিতে বললেন৷ হুমা লম্বা বেণী দুলিয়ে ব্যাগ নিয়ে রাফিকে তার পেছন পেছন আসতে। রাফি সেই অনুযায়ীই কাজ করলো। হুমাকে তার বিরক্ত লাগছে। বন্ধুর ছোটবোন সে কিন্তু ব্যবহার এতো হ্যাংলা! রুমে ব্যাগ গুলো রাখতেই হুমা রাফির দিকে করুন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” আপনি আমাদের বাড়িতে এখন আর আগের মতো আসেন না কেনো?”
” আমার এসে কি কাজ? তাছাড়া তুইতো সারাদিন আমাদের বাড়িতেই পরে থাকিস।”
” আমি তোমাদের বাসায় থাকি বলেই কি তুমি দরজা দিয়ে রাখো বাসায় সবসময়?”
” হ্যাঁ। যাক বুঝতে পেরেছিস। দরজা না দিয়ে রাখলে তোর প্যানপ্যানানি শুনতে শুনতে আমার কান দুটো আর অক্ষত থাকবে না।”
” তুমি এভাবে বলতে পারলে?” হুমার কিশোরী চোখ দুটো গভীর বিষাদে ডুবে গেলো। টলটলে এক সমুদ্র জল কোথা থেকে এসে ভীর জমালো কে জানে! তবে অপরপ্রান্তে এই বাছুরে প্রেমের প্রভাব ঠিক পরলো৷ হুমার চোখের দিকে তাকাতেই রাফির বুকটা ধক করে উঠলো। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা বিপদ৷ রাফি দ্রুত ঘরে ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো।
সাহিলের বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো। সবাই তখন ঘুমে। সারাদিন বিয়ে বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকায় ক্লান্ত শরীরে সবাই এখন নিদ্রায়লীন। সাহিল চাবি দিয়ে দরজা খুলে নিঃশব্দে ভিতরে প্রবেশ করলো। বাড়ির রুম গুলো সব আত্মীয় স্বজনে ভরতে শুরু করেছে। তার রুম বাদে। তার রুমে বাসর সাজানো হবে এই অজুহাতে রুম খালি। বাকি সব রুমেই দুজন তিনজন করে থাকছে। ফুফা বাড়িতে না থাকায় ফুপির রুমও দখল হয়েছে।
সাহিলের ক্ষুধায় বমি পাচ্ছে। বাহিরের খাবার সে খেতে পারে না। দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার দুটোই মিস গিয়েছে। সাহিল ক্লান্ত শরীরে পা টিপে টিপে ডাইনিং এর কাছে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পরলো। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো দুটো বাজে। এতো রাতে ফুপিকে জাগাতে ইচ্ছে করলো না। অন্ধকারে হাতরে এক গ্লাস পানি খেয়ে বসে রইলো সে। ঘরে যেতে ইচ্ছে করছেনা। শক্তিও পাচ্ছে না৷ এতো ক্লান্ত তার কখনোই লাগে না৷
মোহনার ঘুম আসছিলো না৷ বিকেলে বেশ খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়ায় এখন নিশাচরের মতো রাত জেগে মুভি দেখায় ব্যস্ত সে। এক কাপ কফি খেলে মন্দ হতো না। এতো রাতে নিচে নামতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তবুও সে দরজা খুলে বাহিরে এলো। ঘরে দাঁড়াবার মতো জায়গাও নেই৷ জিনিসপত্রে অর্ধেক ঘর ভর্তি আর বাকিটা মানুষে। সিড়ির কাছে দাঁড়াতেই চেয়ার টানার শব্দে ঘাবড়ে গেলো সে। ভয়ে ভয়ে ডাইনিং এর দিকে তাকাতেই দেখলো সাহিল পানি খাচ্ছে। অন্ধকারে তার অবয়ব স্পষ্ট। ড্রিম লাইটের আলোয় সাহিলের লম্বা কায়া বস করে নিয়েছে যেন তাকে। মোহনা বিশাল এক ঢোক গিলে রান্নাঘরের আলো জ্বালালো। সাহিল চমকে পিছনে তাকালো। সে এতটাই ক্লান্ত যে মোহনার নিচে আসার শব্দটুকুও পায়নি। দুধের পাতিল বের করতে ফ্রিজ খুললো সে। চোখে পড়লো সাহিলের জন্য ঢেকে রাখা খাবারের প্লেট৷ মোহনার মনে পড়লো রাতে ফুপি সাহিলের খাবার বেড়ে রেখে তা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন৷ দেরি হওয়ায় ফোন দিলেন বার কয়েক সে জানালো তার আসতে দেরি হবে। তাই ফুপি প্লেট ঢেকে খাবার ফ্রিজে রেখে ঘুমাতে চলে যায়।
কিন্তু এতো রাতে এই ঠান্ডা খাবার এই লোক খাবে কি করে? তার কি! সে এতো মাথা ঘামাচ্ছে কেনো! না খেয়ে মরুক তার কি!
মোহনা দুধের পাতিল বের করে ফ্রিজ বন্ধ করে দিলো। চায়ের পাতিলে দুধ ট্রান্সফার করে সে দুধের পাতিল ফ্রিজে রাখতে ফ্রিজ খুললো। সাহিল টু শব্দটি করছে না। মাথা নিচু করে টেবিলেই বসে আছে৷ আরে এসে খাবার গরম করে নিয়ে খা৷ তা না। রাগ লাগছে হঠাৎ মোহনার। রাগে এখন কান্নাও পাচ্ছে। ইদানীং তার মন মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকে। সে দুধের পাতিল ফ্রিজে রেখে রাগ করেই শব্দ করে কাজ করতে লাগলো। ভাত – তরকারি সব গরম করলো। কফি বানানোর কথা ভুলে গিয়ে প্লেটে ভাত বাড়লো। সাহিল ঘাড়ের নিচে হাত রেখে মোহনার কান্ড দেখছে৷
প্লেট নিয়ে এসে মোহনা সাহিলের সামনে রেখে চলে যেতে নিতেই তাকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরলো সাহিল। মোহনার কোমড়ে মাথা ঠেকিয়ে অদ্ভুত আচরণ শুরু করলো। আজ তার হঠাৎ টিন এইজ রোগে পেয়েছে৷ আশ্চর্য! এই লোক সকালে যেই ভাব নিয়ে ছাদ থেকে নামলো যেনো মোহনা তার দুই চোখের বিষ৷ অথচ এখন কেমন লেপ্টে আছে। রাগটা আরও বাড়লো তার। সাহিলের হাত দুটো ছাড়িয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালো কিছু কঠিন কথা শোনাতে হবে একে। সাহিল তার কোনো সুযোগই রাখলো না৷ পরপর বেশ কটা চুমু খেলো মোহনার পেটে। অসহ্য শিহরণে মোহনা কেঁপে উঠলো৷ কান্না পাচ্ছে খুব।
“কেনো এখন কেনো? কি জন্য! আরও আগে কেনো এলো না?” চিৎকার করে তার বলতে ইচ্ছে করলো “তখন কেনো বুঝলেন না?” পারলো না। গলার স্বর যেনো কেউ রোধ করে রেখেছে। বুক ভার হয়ে আছে। তার এখানে আসা মোটেই উচিৎ হয়নি। একদম না। সাহিলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে ঘরে এলো সে। টেবিলের উপর রাখা পানির জগ থেকে পানি খেয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো। তার শরীর এখনো সেই অদ্ভুৎ স্পর্শ মনে করেই কেঁপে উঠছে। মোহনা জোর করে চোখ বন্ধ করে রইলো।
এদিকে সাহিল হাত ধুয়ে খাবার খেলো। রান্না ঘরে এসে প্লেট ধুয়ে রাখলো। দুধের পাতিল সহ খাবারের সব ফ্রিজে তুলে অপরাধীর মতো নিজের ঘরে গেলো। বিছানায় শুতেই তার নিজের উপর রাগ হলো। এমন চলতে থাকলে বিপদ, যেকোনো সময় ভুল হয়ে যাবে একটা। সাহিলের কাজ থাকে না তবুও সে বাড়ি ফেরে না৷ শুধুমাত্র মোহনার জন্য। তাকে এড়িয়ে চলার জন্য। অথচ মহারাণীকে দেখো রাত দুটোয় তার জন্য ভাত তরকারি গরম করেছে। আচ্ছা তাও বুঝলাম নিজের জন্য কফি করতে এসেছিলো। তাতে কি! ওর জন্য খাবার গরম করতে কে বলেছে! গরম করলি যখন খায়িয়ে দিলি না কেনো? অভিমান হলো তার। অথচ সব অমূলক৷ কেনো খায়িয়ে দিবে সে? কি সব আশ্চর্য কথা ভাবছে সে!
ডাইনিংয়ের করা ভুলটাও তাকে ধিক্কার দিচ্ছে। কেউ যদি দেখে ফেলতো বাড়ি ভরা মানুষ৷ ছিঃ। মোহোনাই বা বাধা দিলো না কেনো? সপাটে চর দেয়া উচিৎ ছিলো তার। যেনো অভিযোগ জানাচ্ছে সে।
সে নিজেও জানে এই চরের পরিণামে স্পর্শ গুলো আরও গভীর হতো৷ এমন ছেলেমানুষী তাকে মানায় না৷ এই অনুভূতি গুলো আগে কেনো ফিরে আসেনি!
তার বিয়ে৷ আজ সন্ধ্যায়ও মেয়েটা ফোন করে কি মিষ্টি করে কথা বলেছে তার সাথে। কন্ঠে তার উচ্ছ্বাস। সাহিল বেশিক্ষণ কথা চালাতে পারেনি তার মন পরে ছিলো অন্য জায়গায়। মেয়েটার কথা ভেবে সাহিল এতটুকু হয়ে গেলো লজ্জায়। মোহনা সামনে থাকলে তার এই লজ্জা কাজ করে না৷ চূড়ান্ত অসভ্য হতে ইচ্ছে করে। সাহিলের উচিৎ তার হবু স্ত্রীকে সময় দেয়া। কল করে দুষ্টুমিষ্টি কথা বলা। অথচ সে কি করছে? মোহোনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে? তার সর্বাঙ্গে সাতরে বেড়াতে চাইছে!
অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়। নিউরন গুলো যেনো ছিড়ে যাচ্ছে। এর মাঝেও মোহনার গায়ের ঘ্রাণ তার নাসেন্দ্রীয়তে তীব্র ভাবে ধাক্কা দিচ্ছে৷ উফফ অসহ্য। সে কিভাবে থাকবে এখন? ক্লান্ত শরীরে বেশিক্ষণ চিন্তার অবকাশ পেলো না সাহিল৷ দ্রুত ঘুম চলে এলো।
চলবে…
