“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব- ০৩
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
নাস্তার টেবিলে সাহিলকে না পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে। ফুপি জানালেন সাহিল কিছু কাজে বাহিরে গিয়েছে বাসায় আসতে সন্ধ্যা হবে। নাস্তা শেষ করতেই ধীরে ধীরে বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসতে শুরু করলো। মোহনাকে এতদিন পর দেখে সবাই অবাক হলো এবং খুশিও হলো। আশেপাশের প্রতিবেশিরা আর সাহিলের মামী খালারা মোহনার রূপের প্রশংসাও করলেন।আরোও লোক আসা বাকি সবাইকে ফুপি দাওয়াত দিয়েছে। দেখে বলার উপায় নেই যে এটা সাহিলের বিয়ে। মনে হচ্ছে রুহি বা রাফি বিয়ে। ফুপি প্রচুর এক্সাইটেড বিয়ে নিয়ে। মোহনার মনে হয়েছিল এখানে তার ভালো লাগবেনা। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবেশটা তার কাছে ভালো লাগতে লাগলো। বহু বছর হয়েছে সে পারিবারিক কোনো বিয়েতে বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেনি।
আজ ফুপির শশুরবাড়ি অর্থাৎ সাহিলের আরেক এক মামা মামী তাদের দুই মেয়েই এসেছে আর সাহিলের আরেক খালা এসেছেন। তার স্বামী গত হয়েছেন সন্তানেরা বিদেশ থাকেন তাই বিয়েতে আসতে পারছেন না। নাজিফা যদিও সাহিলের বাবাকে বিয়ে উপলক্ষে দাওয়াত দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সাহিলের তাতে অমত থাকায় এখনো জানাননি। দুপুর নাগাদ সবাই ঠিক করলো টুকটাক শপিং এর জন্য যাবে। মোহনার মাথাটা ধরে ছিলো। ফুপি বেশ কয়েকবার জোর করেও মোহনাকে নিয়ে যেতে পারলেন না। রাফি তার বন্ধুর বাড়িতে এখনো। ফুপা ফুপি আর বাকিরা মিলে শপিং এর উদ্দেশ্যে বের হলেন। যাবার আগে তাকে দুপুরের খাবার গরম করে খেয়ে নিতে বললেন,মোহনা বাসায় রয়ে গেলো।
দুপুরে যখন ঘুম ভাঙলো তখন ২:৩০ বাজে। ক্ষিদেয় পেট মোচড় দিচ্ছে মোহনার। উঠে কিচেনার দিকে গেলো। রান্না ঘরটাও আগের চাইতে বড় করা হয়েছে। হেহ! যদি সাহিলের বউয়ের সাথে ঠোকাঠুকি লেগে হাঁড়ি আলাদা করতে হয় তো যেনো একই রান্না ঘরে আলাদা চুলা বসানো যায় সেই ব্যবস্থাই করেছে ফুপি। খুব বুঝেছে মোহনা। ফুপির মাথার বুদ্ধি। ছেলেকে সে হাত ছাড়া করবেন না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোহনা বলেই ফেলল,” আহারে আমার ফুপি। সব মেয়েতো তোমার ভাতিজি না যে তোমার আদরের ছেলের বউ হলেই তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে! তোমার ছেলের ওই রাজ কপাল নেই…!” বলেই ঘাবড়ে চিৎকার করে উঠলো সে। কি ভয়াবহ ব্যাপার!
সাহিলে ডিমের ডালা ভরছে ফ্রিজারের দরজায়।
সাহিল কি ওর কথা শুনেছে কিছু? সাড়ে সর্বনাশ। উফফ কেনো যে এগুলো ভাবতে গেলো।
পরিস্থিতি ঠিক রাখতে সে ফ্রিজ থেকে একটা ডিম নিয়ে ভাজতে শুরু করলো। সাহিল টা দেখে আরেকটা ডিম এগিয়ে দিলো। মোহনা জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো, ” ভাত খাবো। সারাদিন খাইনি। ” ব্যস হয়ে গেলো। এই অনাহারির থেকে কোনো ভাবেই মুখ ফেরাতে পারছেনা সে। আহারে বেচারা বিয়ে নিয়ে এতো ব্যস্ত যে খেতেও পারছে না ঠিক মতো। একদলা কান্না যেনো গলার কাছে আটকে রইলো মোহনার। এমন বিয়ের দরকারটা কি যেখানে একটু খাওয়ার ফুরসৎ নেই। রাগ লাগলো তার। নিজের ডিম ভাজা বাদ দিয়ে আগে সে সাহিলের খাবার তৈরী তে ব্যস্ত হলো। সাহিল দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো। আহা! এক মন কেমন করা বাতাস পুরো রান্নাঘর জুড়ে। সাহিলের ভীষণ অস্থির লাগছে। সেদিন, হ্যাঁ ঠিক সেদিন যদি ওই কান্ড টা না ঘটতো তবে আজকের দিনটা এমন হতোই না। তার শুধু মাত্র তার একটা নীরবুদ্ধিতার জন্য আজ সব কেমন এলোমেলো। বুক ভার হয়ে আসছে। এই অস্থিরতা বয়ে নেয়া যাচ্ছেনা।
মোহনা প্লেটে ভাত, ডিম ভাজা, তরকারি সাজিয়ে ফেললো। ডাল গরম করে টা বাটিতে ঢেলে ট্রেতে রাখলো। পিছু ফিরে সাহিলকে খাবার নিয়ে যেতে বলার আগেই শরীরে কারো স্পর্শ পেলো। সাহিল! হ্যাঁ সে ছাড়াতো আর কেউ নেই বাড়িতে। আর কারো সাহসও নেই তাকে ছুঁয়ে দেয়ার। মোহনা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কাঠ ভাবে। তার পেটে সাহিলের শক্ত হাত দুটো এখনো আঁকড়ে রয়েছে। মোহনার হাঁসফাঁস লাগছে কিন্তু কোনো এক অজানা আকর্ষণে নড়তেও ইচ্ছে হচ্ছে না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। সাহিল মোহনার চুলে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে রইলো যেনো সময়টা সেখানেই থেমে আছে। আর কোনো কিছুই নেই, কোনো সত্য নেই। শুধু সে আর তার ঘাসফুল।
এদিকে মোহনা ঘাড়ে পিঠে সাহিলের নিঃশ্বাস এর আক্রমনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ফুরিয়েছে যেনো। বহু কষ্টে সে মুখ দিয়ে যা বের করলো টা হলো, ” আমার হাঁটু কাঁপছে সাহিল ভাই আমি দাঁড়াতে পারছিনা।” সাহিল ঘোরের মাঝেই ফিক করে হাসলো। হাত দুটো একগাদা হতেই মোহনা চট করে সরে দাঁড়ালো। সাহিল খাবার নিয়ে ডাইনিং এ বসলো। মোহনা স্থানু রইলো। তারপর ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের জন্য খাবার বারলো এরপর প্লেট নিয়ে রুমে এসে দরজা আটকে দিলো। ভেতরের কান্নাটা চোখ বেয়ে উপচে পরছে। মোহনা কি এক সুখে ভেসে যাচ্ছিলো এতক্ষন। কিন্তু বাস্তবটা হঠাৎ করেই সামনে চলে আসায় এখন আর সহ্য হচ্ছেনা তার। ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে। কি নিষ্ঠুর!
সারাদিনে আর মোহনার টিকিটিরও দেখা পেলো না সাহিল। বিকেলে সবাই ফিরে এলো একগাদা শপিং সেরে।সন্ধ্যায় স্নাক্স খেতে ডেকেও মোহনাকে নামানো গেলোনা নিচে। মোহনা রাতের খাবার ঘরেই খেলো শরীর অসুস্থ থাকার অজুহাতে।
রাত ১ টা বাজে সাহিল আর ঘরে টিকতে না পেরে ছাদে উঠে এলো। সারা ঘরময় মোহনার ঘ্রাণ লেগে আছে। উঁহু আসলে এটা সত্যি না। চিন্তিত মুখে একটা সিগারেট ধরালো সে। তারপর হাসলো। আসলে মোহনার ঘ্রাণ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বইছে। দুপুরের পর থেকে তা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
হঠাৎই এক সূক্ষ্ম যন্ত্রনা টের পেলো সাহিল মস্তিস্ক জুড়ে। তার দুদিন বাদে বিয়ে। বিয়েতে সে নিজে থেকেই রাজি হয়েছে কেউ জোর করেনি। তাহলে এখন কেনো এমন হচ্ছে? সে কি দ্বিচারিনী! না দ্বিচর? মোহনার কথা কেনো আগে মাথায় আসেনি? সত্যিই কি আসেনি?
মোহনা সামনে আছে বলেই কি তার এমন অনুভূত হচ্ছে? তার মানে কি আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড? সে দুদিন পর বিয়ে হলে কি একই ভাবে তার হবু বউয়ের প্রতি অনুভব করবে? ছিঃ ছিঃ। নিজেকে হীনমন্য, কাপুরুষ মনে হলো সাহিলের। ভোর হই হই করছে। কই আর কারো প্রতিতো তার এমন অনুভূতি হয়নি। সেতো মেয়ে কম দেখেনি জীবনে। কেনো মোহনাই কেনো? মোহনা কি তাকে পছন্দ করে? একই রকম অনুভূতি কি তার ও রয়েছে? নাকি সেই কিশোর বয়সের কথা সে এখনো ধরে রেখেছে! সে কি পারবে মোহনাকে ছাড়া থাকতে? অবশ্যই পারবে সে। এতদিন তো ছিলো এখনও পারবে। তাছাড়া দুদিন পর বিয়ে মনে এক সাথে আরেক কে নিয়ে থাকা সম্ভব না। তাকে পারতেই হবে নইলে ওই বেচারির উপর অবিচার হবে। মোহনাও কি সুখে থাকবে?
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সাহিল কিছুক্ষন সূর্য দেখে নিচে যাবার জন্য উদ্যোত হতেই ধাক্কার মতো খেলো। বুকটা ধরাস করে উঠলো। মোহনা!
সারা রাতের না ঘুমানো ক্লান্ত চোখ আর অগোছালো বেণী করা চুলে ছাদের দরজায় দাঁড়ানো সেও হয়তো চমকে গিয়েছে। সাহিল বুঝতে পারলো দ্রুত কিছু না করলে এই মেয়েটার মোহ তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। মোহনার মোহজাল ছিন্ন করার সাধ্য তার থাকবেনা।
চলবে…!
