গল্প -গোপন সংসার
পর্ব – ১৪
লেখক: রিহান অরণ্য
আমাকে মেডিকেল চেকআপের কথা শুনে মাথায় আগুন ধরে গেছে,আমি ওই মেয়ে কে উত্তর দিলাম প্রায় ৪ বছর ধরে এখানে আছি চাইলে এতো দিনে ৩ টা নিতে পারতাম, আমাকে উল্টাপাল্টা না বলে নিজের জামাইয়ের কাছে যান, আমার রাগ দেখে মেয়ে টি চলে গেছে একটু পর তূর্য কে নিয়ে আসলো, তূর্যের সামনে মেয়েটি বললো তারা সিফিন কে নিয়ে যাবে ৩/৪ দিন পর, আর আমি যেন বাসার সব জিনিস পত্র নিয়ে যাই এগুলো তাদের লাগবে না, আমি তূর্য কে বললাম আপনার জিনিস আপনি নিয়ে যাবেন আমি ভিখারী না যে জিনিস পত্রের লোভে এখানে পরে আছি, তূর্য আমাকে বললো রেসি রাগ করো না এই গুলো দিয়ে আমরা কি করবো তোমার কাজে লাগবে তুমি নিয়ে যেও,গাড়ি ভারা আমি দিবো, আমি তূর্য কে বললাম আপনারা কি এখন থাকবেন নাকি চলে যাবেন?যদি চলে যান তাইলে এখনি যান আমার কাজ আছে আপনারা সময় মতো এসে সিফিন কে নিয়ে যাইয়েন, তার বেশি একটা কথাও বলার দরকার নেই।
আমার কথা শুনে মেয়েটা তূর্য কে বললো ওর তেজ দেখেছো এমন ভাবে কথা বললো মনে হয় সে তোমার বউ,এতোদিন এই মেয়ের কাছে সিফিন কেমনে ছিলো!
এইবার সত্যি সত্যি মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না তূর্যের সামনেই বলে দিলাম, বাচ্চা জন্ম দিয়ে দেখেন মানুষ করতে কেমন লাগে,তূর্য বুঝতে পারছে আমি রেগে গেছি তাই সে মেয়েটা কে নিয়ে বের হয়ে গেছে।
আমি সিফিনকে খাটে বসিয়ে আমার জিনিস পত্র রেডি করে লাগলাম, ওরা সিফিন কে নিতে আসলেই আমি বের হয়ে যাবো আমার জামা কাপর নিয়ে,
সারা দিন আমি সিফিনের থেকে দূরে দূরে ছিলাম আমি ওর কাছাকাছি গেলে হয়তো ওর জন্য নিজেকে শক্ত করতে পারবো না।
রাতে সিফিন কে শুয়িয়ে রেখে আমি ওই রুমে গিয়ে আমার সার্টিফিকেট আইডি কার্ডের ছবি তুলে চিটাগং পাঠিয়ে দিলাম,তূর্য সিফিন কে নিয়ে গেলে আমি এখান থেকে সোজা চিটাগাং চলে যাবো, সব গুছিয়ে রাখলাম, একটু পর তূর্য ম্যাসেজ দিলো রেসি তুমি কি ঘুমিয়ে গেছো, আমি সাথে সাথেই ম্যাসেজ দেখছি কিন্তু রিপ্লাই দেই নি, একটু পর আবার মেসেজ দিলো তুমি সকালে আমাকে একটু ফোন দিয়ো, তখন আমি রিপ্লাই দিলাম সকালে কেন এখন ফোন দিতে পারেন না মেসেজ না দিয়ে, একটু পর তূর্য ফোন দিলো,আমি রিসিভ করে বললাম কি বলবেন বলেন আমি যে রেগে আছি সে বুঝতে পারলো, আমাকে বলতে লাগলো রাগ করোনা, সবাই এক না, তোমার মতো এমন ভালো মনের মানুষ তো আর সবাই না।
আমি বললাম যেটা বলার জন্য ফোন দিছেন সেইটা বলেন।
তূর্য বললো রেসি সিফিনের কথা বাড়িতে এখন বলতে না করছে,বিয়ে হয়ে গেলে তার পর নাকি একটা ব্যবস্থা করবে, তুমি ওই মেয়ের সাথে আজকে নাকি খারাপ ব্যবহার করছো তাই সিফিন কে তোমার কাছে রাখবে না কালকেই নিয়ে আসবে আর তোমাকে তোমার পাওনা বুঝিয়ে দিতে বলছে, আমি বললাম ভালো কথা, সমস্যা নেই আমি কাল কে চলে যাবো আপনারা কখন আসবেন ওরে নিতে, তূর্য বললো এখনো জানি না কাল নাকি ওয় আমাকে নিয়ে বের হবে তার পর একটা এতিম খানায় যাবে সেখান থেকে সিফিন কে আনতে যাবে, আমি বললাম ঠিক আছে আমি ওরে রেডি করে রাখবো তবে একটা শর্ত, আমি প্রথম এই বাসা থেকে বের হবো তা না হলে আপনরা সিফিন কে নিয়ে চলে গেলে আমার লা*-শ টা এখানে পরে থাকবে, তূর্য বললো রেসি এই ভাবে বলো না,আমার ইচ্ছে হচ্ছে সব ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই সিফিন কে নিয়ে, বাবা হয়ে আজকে সন্তান কে এতিম খানায় রাখতে হচ্ছে,,
তূর্যের মুখে এই কথা শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম কি বললেন আবার বলেন এতিম খানায় মানে আমার ছেলে এতিম খানায় কেন, তূর্য বললো রেসি সিফিনের কথা বাড়িতে জানাতে না করছে এখন এতিম খানায় রেখে দিতে চাইছে বিয়ের পর ১/২ বছর আমরা বাচ্চা নিবো না তখন বাসায় জানিয়ে সিফিন কে এতিম খানা থেকে দত্তক নিবে বাড়িতে সবাই কে জানিয়ে তার পর সিফিন কে বাড়ি নিয়ে যাবে।
আমার হাতে টিভির রিমোট ছিলো রিমোট টা ফিক্কা মারলাম টিভির উপরে সাথে সাথে তূর্যকে বললাম তোদের সাহস হইলো কিভাবে আমার সিফিন কে এতিমখানায় রাখার, তার মা বেঁ’চে নাই তাতে কি হ’য়েছে সে আমার সন্তান আমি জীবিত থাকতে তরা কেউ আমার সন্তান কে এতিম খানায় নিতে পারবি না,আর শুনেন তূর্য সিনহা, আজকে সেই কাজের মেয়ে রেসি কথা বলছে না সন্তান টা আপনার হলেও আমি ওরে বড় করছি তার বিনিময়ে আপনি আমাকে টাকা দিছেন,কিন্তু আমার দেহ ভোগ করার কথা ছিলো না, এতোদিন যে টাকা দিছেন মনে করেন আমার দেহের জন্য দিছেন, বাকি রইলো সিফিন ওর দিকে আর কেউ চোখ তুলে তাকাবেন না,আপনি আপনার বউয়ের সাথে…. ঢুকে থাকেন, কোন দিন সিফিন কে আর আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না,
এই বলে ফোন কেটে দিছি, তূর্য বার বার ফোন মেসেজ দিতে লাগলো, আমি ফোন বন্ধ করে সিফিনকে কোলে নিয়ে ওর জামা কাপর আমার জামা কাপর নিয়ে বাসা থেকে রাতেই বেড়িয়ে গেছি, ওদের কতো বড় সাহস সিফিন কে এতিম খানায় রাখবে, ওর বউয়ের বুদ্ধিতে সারাজীবন আমার ছেলেকে এতিমখানায় রাখার চিন্তা ভাবনা করলো।
সিফিন কে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে বাস টার্মিনালে আসলাম ভাবছি বাড়ি যাবো, কিন্তু বাড়ি গিয়ে কি করবো কি জবাব দিবো তাই চিটাগাং যাবার চিন্তা ভাবনা করলাম এক জন কে ফোন দিলাম সে তো সব টাই যানে আমার বিষয়ে তারে বললাম বাচ্চা টা সাথে নিয়ে আসতেছি কিন্তু সে তার ওখানে জায়গা নাই বলে দিছে , আর আমাকে বলে দিলো একা আসলে আয়, কারো বাচ্চা নিয়ে আসবি না পরে সবাই চুরির কেসে পরমু, আমি বুঝতে পারলাম তারা মনে করছে আমি বাচ্চা চু*-রি করে নিয়ে যাচ্ছি।
এখন চিন্তায় পরে গেলাম, সিফিন ঘুমাচ্ছে, আমাকে যে কোন একটা ব্যবস্থা করতে হবে সিফিন কে নিয়ে তো আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে পারবো না।
অনেক চিন্তা ভাবনা পর হঠাৎ মাথায় আসলো আমাদের বাসায় যে ভাবিরা থাকতো ওনার জামাই জব চেঞ্জ করাতে চলে গেছিলো, তারে ফোন দিলাম সে ফোন রিসিভ করলো, আমি বললাম শুধু কয়টা দিন সিফিন কে নিয়ে থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে দিতে ওনি ওনার বাসায় যেতে বললো ওনার বাসা ছিলো নরসিংদী তে ওনারা থার্মেক্স গ্রুপে চাকরি করে।
আমি সিফিন কে নিয়ে সেই রাতেই গাড়ি নিয়ে সোজা ওনার কাছে চলে গেছি, ঢাকা থেকে ২ ঘন্টা মতো লাগছে ওখানে যেতে, ওনার বাসায় ২ টা রুম তবে টিনের ঘর, টিনের ঘরে আমরা ছোট সময় ছিলাম আমার কোন সমস্যা নেই কিন্তু সিফিনের কেমন লাগে কে জানে, আগে দেখি যদি
সিফিনের সমস্যা হয় তাইলে অন্য জায়গায় চলে যাবো, ওই রাতে ভাবির আর আমার ঘুম হয়নি আমি ভাবি কে বললাম সে অন্য জায়গায় বিয়ে করছে তাই সিফিন কে নিয়ে চলে এসেছি, সব কিছু ওনাকে আর বলি নাই।
সকালে সিলিনের নতুন জায়গায় ওর মন ভালো না, সে আমার কোল থেকে নামে না, ভাবি কে তো সিফিন চিনেই তার পরও তার কোলে ও যায়না, ওর মন মতো হয়নি রুম টা, তাই ভাবি কে বলে অন্য জায়গায় একটা রুম দেখতে বললাম শুধু ২ মাসের জন্য, ভাবি পাশেই একটা রুম দেখে দিছে সিঙ্গেল রুম, আমার আর সিফিনের হয়ে যাবে, আমি ভাবি কে বললাম ভাবি আপনি কয়দিন সিফিন কে দিনের বেলায় একটু রাখবেন আমি একটা চাকরির খোঁজ করবো, ভাবি বললো ঠিক আছে তুমি চিন্তা করো না আমি দিনে ফ্রী থাকি।
চাকরি জন্য অনলাইনে অনেক জায়গায় খুজলাম কিন্তুু কোথাও তেমন মনের মতো পাচ্ছি না।
এই ভাবে ২ মাস বাসায় বসেছিলাম সিফিন কে নিয়ে, আমার কাছে টাকা আছে এখন ও ২ বছর বসে খেতে পারবো আমরা যে পরিমানের টাকা টাকা আছে,তার পর ও বসে থাকবো না টাকা জমাবো,সিফিন বড় হলে টাকা লাগবে তা ছাড়া এখন থেকে বাড়িতে টাকা দিবো।
২ মাস পর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটা প্রাইভেট হসপিটালে জব নিছি, এখন নরসিংদী থেকে ওখানে চলে আসতে হবে ৮ ঘন্টা ডিউটি ৩ সিফটে, আমি সিফিন কে ভাবির কাছে রেখে বাসার খোঁজ করতে গেলাম, ওখানকার বাসা গুলো ভাড়া এতো বেশি যে সেলারি ৫০% চলে যাবে বাসা ভাড়ায়, অবশেষে একটা বাসা পেলাম যেখানে হাসপাতালের আরো স্টাফ রা থাকে মেয়ে রা মেয়েরা, একটা এপার্টমেন্টের ২ টা রুম একটায় আমি বাকি একটায় আরো ৩ টা মেয়ে।
সব ঠিক ঠাক করে সিফিন কে নিয়ে এখানে চলে আসলাম।
এই রুম টা একটু ভালো কারন সিফিনের খেলার জায়গা আছে, তা ছাড়া মেয়ে গুলো ও সিফিন কে অনেক আদর করে, আমি ডিউটি তে গেলে ওরা কেউ না কেউ বাসায় থাকে আর আমি ৪ ঘন্টা পর পর বাসায় আসতে পারি, সিফিনের তেমন সমস্যা হচ্ছে না।
আজকে ৪ মাস হলো সিফিন কে নিয়ে আমি আলাদা হয়ে আছি একবারের জন্য ও আগের সিম চালু করি নাই, তূর্যের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ নেই আমার, এমন কি আমার বাড়ির কারোর সাথেও যোগাযোগ নেই, আমি বাড়িতে গেলে হয়তো তূর্য সিফিন কে খুঁজতে আমাদের বাড়ি যেতে পারে, কারন ওর কাছে আমার বাড়ির ঠিকানা আছে।
ভাবছি কয়দিন পর বাসায় ফোন দিবো সিম অন করে তূর্য সেখানে গেছে নাকি সিফিন কে খোঁজ করতে।
এই দিকে সিফিন ও তার বাবা কে খুঁজে।ওইদিন একটা ছেলে এসেছে ডেলিভারি দিতে তখন ওনারে বাবা ডাকা শুরু করছে, ওই সময় টা ভিষণ কষ্ট হয়েছিলো, তূর্য ঠিকই বলেছিলো ওর বাবার অভাব কি দিয়ে পূরণ করবো।
যতই দিন যাচ্ছে সিফিন ততই লম্বা হচ্ছে ওর বাবার মতো
সামনের বছর ওরে স্কুলে ভর্তি করতে হবে, এসব নানান চিন্তায় ভাবনায় নিজেকে সব সময় ব্যস্ত রাখতাম।
এক দিন হটাৎ একটা অপরিচিত নাম্বারে ফোন এসেছে, নতুন নাম্বার আমার তেমন কেউ জানে না, তাই ফোন ধরি নাই,
ফোন টা এসেছিলো সকালে তখন আমি ডিউটিতে ছিলাম,
আবার রাতে ও সেম নাম্বারে ফোন আসলো তখন ফোনটা রিসিভ করলাম কিন্তু কেউ কোন কথা বলছিলো না, আমি হেলো হেলো করেই যাচ্ছি, একটু পর ফোন কেটে দিলো,
আমি আবার ওই নাম্বারে ফোন দিলাম কিন্তু রিসিভ করে নাই,
পরেরনদিন সকালে আবার একটা নাম্বারে ফোন আসলো আমি রিসিভ করলাম, একটা মেয়ের কন্ঠে বললো।মেডাম আপনি কই, আমি ভাবছি আমাদের কোন পেসেন্ট আত্মীয় ফোন দিছে, অনেক জনকেই তো নাম্বার দিছি, মেয়েটির কথা শুনে আমি বললাম আমি তো ক্লিনিকেই, আপনি কে বলছেন তখন আর কোন কথা না বলে ফোন কেটে দিলো,
একটু পর আবার ফোন দিলো মেডাম আমি তো ক্লিনিক টা চিনতে পারছিনা আপনি একটু ঠিকানা টা বলেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি কোন পেশেন্টের লোক ওনি বললো, আমার আত্মীয় আপনাদের এখানে ভর্তি, ওখান থেকে আপনার নাম্বার দিছে ম্যাম, বললো আপনাকে ফোন দিলে ঠিকানা বলে দিতে পারবেন, আমি এতো কিছু না ভেবে বললাম আপনি এখন কই সে বললো আমি ঢাকাতে এখন কোন জায়গায় আসতে হবে বলে দেন, আমি ওনারে বলে দিলাম চিটাগং রোড আসেন ওখান থেকে হেটে আসতে ৫/৬ মিনিট লাগবে না হয় রিক্সা চালক কে বললে সে সোজা আমাদের ক্লিনিকে নিয়ে আসবে,আমি ক্লিনিকের নাম ও বলে দিছি, ওনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন টা রেখে দিলো,
আমি তখনো জানতাম না তূর্য আমকে খুঁজে বের করছে,
ওর কাছে আমার আইডি কার্ড কপি ছিলো আমার সব ঠিকানাই ওর কাছে, আমার এটা ধারণা ছিলো না যে এন আইডি কার্ড দিয়ে সিম নাম্বার বার করা যায়, আমি তো আমার আইডি কার্ড দিয়ে সিম কিনছিলাম, এতো সহজেই সে আমাকে খুজে বের করে ফেলবে ধারণা ছিলো না,
______________________
চলবে
