Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"কাব্যের বিহঙ্গিনীকাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৫১+৫২

কাব্যের বিহঙ্গিনী পর্ব-৫১+৫২

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৫১
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

“ডাক্তার বাইরে গাড়ি দেখলাম তুমি কোনোহানে যাইবা নাকি। আমি তো জানতামই না তুমি আজকে এতো আগেই হাসপাতাল থেইকা বাড়ি আইছো।”

তাজেলের কথায় মেহবিন হাসলো একটু আগেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসে গোসল করল। বারান্দায় দাড়াতেই তাজেল এসে উক্ত কথাটা বলল। মেহবিন বলল,,

“হ্যা নেত্রী যাবো। আজ আমি শ্বশুরবাড়ি যাবো তাই অর্ধেক সময় হওয়ার পর ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছি।”

“পুলিশ পাঞ্জাবি ওয়ালার বাড়িতে যাইবা?”

“হুম!”

“ওহ আইচ্ছা!”

“তুমি যাবে নাকি নেত্রী?”

“না আমি বিকালে আব্বার সাতে মেলায় যামু। আব্বা আইজ আমার জন্য ছুটি নিয়া আগেই বাড়ি আইবো। আব্বা কইছে আমারে মেলায় নিয়া যাইবো।”

“ওহ আচ্ছা!”

“তোমার নিগা কিছু নিয়াসমানি আমি।”

“আচ্ছা! আমিও তো বিকেলে যাবো।”

“ওহ আইচ্ছা আমি গেলাম দেহি আব্বা আইলো নাকি।”

তাজেল খুশিমনে চলে গেল। আজ অনেকদিন পর তাজেল ওর বাবার সাথে কোথাও যাবে এই জন্য সে ভিশন খুশি। মেহবিন একটু রোদে দাঁড়ালো চুল শুকানোর জন্য। তারপর হালকা কিছু খেয়ে নিল। এরপর ধীরে সুস্থে রেডি হলো। সাড়ে চারটা বাজে মেহবিন রেডি হয়ে বের হলো। মুখর দের বাড়িতে যেতে দূই থেকে আড়াই ঘন্টা লাগবে। ও রাস্তায় আসতেই দেখলো তাজেল আর ওর বাবা আসছে। পাকা রাস্তায় গিয়ে তাজেল মেহবিনের কাছে গিয়ে বলল,,

“ডাক্তার তোমারে একদম পরীর মতো লাগতাছে।”

মেহবিন মুচকি হেঁসে বলল,,

“তুমি পরী দেখেছো নেত্রী?”

“হুম একবার টিভিতে দেখছিলাম। এইরকম ড্রেস পরা থাহে। তাগো হাতে একটা কাঠিও ও থাহে জাদুর। তোমার হাতে থাকলে তুমিও একদম পরীই থাকতা।”

“আচ্ছা তাই বুঝি। তা তুমি তো মেলায় যাচ্ছো মেলা থেকে তাহলে আমার জন্য একটা জাদুর কাঠি আনিও।”

“পাইলে আনবানি।’

“আচ্ছা!”

“হ আইজক্যা তো পুলিশ পাঞ্জাবি ওয়ালা তোমার দিক থেইকা চোখই সরাইবো না। আইজক্যা তোমারে মেলা সুন্দর লাগতাছে।”

‘ধন্যবাদ নেত্রী।”

মেহবিন তাজেলের বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,,

“মেলা কোনদিকে চলুন আপনাদের নামিয়ে দিই।”

তাজেলের বাবা বলল ,,

“আপনি তো বোধহয় স্টেশনের দিকে যাইবেন আমাগো রাস্তা উল্টোদিকে আপনার আমাগো নামান লাগবো না। তাছাড়া আমরা তো হাইট্যাই যাইতে পারুম পরের গ্ৰামেই মেলা।”

“আচ্ছা। আপনার সাথে মেলায় যাবে দেখে নেত্রী আজ বেশ খুশি।”

“কাল রাইতে আবদার করলো। কোনদিন তো কিছু করতে পারি না তাই ভাবলাম মাইয়াডারে নিয়া মেলায় যাই একটু। তাজেলের মাইরেও কইছিলাম কিন্তু হেতি আইলো না। আর আরেক মাইয়ারে ও আসতে দিল না।”

তখন তাজেল বলল,,

“ওদের জন্য কিনা নিয়া আসমুনি কিছু। ডাক্তার তোমার দেরি হইতেছে তাইলে যাও গা তুমি। সাবধানে যাইয়ো।

মেহবিন মুচকি হেঁসে তাজেলের মাথায় হাত রেখে বলল,,

“তুমিও সাবধানে যেও আর হ্যা আমার জন্য মেলায় থেকে কিছু কিনতে হবে না। তুমি ওখানে গিয়ে খুব মজা কোরো।”

“আমি তো যায়া আগে তোমার জাদুর কাঠি খুজুম। কিছু হইলে তুমি সেই জাদুর কাঠি দিয়ে সব ঠিক করবা।

মেহবিন হেঁসে বলল,,

“ওসব কাঠি মেলায় পাওয়া যায় না। সত্যি বলতে ওরকম কাঠি নেই পৃথিবীতে।”

“তাও আমি খুজুম যদি পাই।”

“তোমায় বোঝানোর সাধ্য নেই।”

“আইচ্ছা যাও তুমি তোমার দেরি হইতেছে।”

“হ্যা যাচ্ছি।”

মেহবিন হাঁটা ধরলো তখন তাদের চিৎকার করে বলল,,

“তাড়াতাড়ি আইসো কিন্তু ডাক্তার!”

মেহবিন পেছনে ফিরে বলল,,

“হ্যা আসবো।”

মেহবিন গাড়িতে উঠে গাড়িটা স্টার্ট দিল একটু যেতেই একটা ট্রাক এলো রাস্তা দিয়ে আর সেটা এলোমেলো ভাবে চালাচ্ছে। মেহবিন কোন রকমে গাড়িটাকে সাইড করলো। ট্রাক চলে গেল কিন্তু এলোমেলো ভাবে চালাচ্ছে ও মাথা বের করে রাস্তায় তাকালো। তাজেল ওর বাবার হাত ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। মেহবিন নেত্রী বলে চিৎকার করে ডাক দিল। তার আগেই ট্রাক টা ওদের দিকে গেল তাজেল রাস্তার মাঝখানে দেখে ওর বাবা ওকে টান দিল কিন্তু শেষ রক্ষা হলো ট্রাকটা দুজন কেই ধাক্কা মারলো। সবকিছু নিজের চোখে দেখতে পেল এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো ওর পৃথিবীটাই থমকে গেল। ও তাড়াতাড়ি করে বের হবে তখন একটা রিক্সা এলো ধাক্কা লেগে পরে গেল । রিক্সাটা থামায় বেশি কিছু হলো না। ও একটু মাথায় আঘাত পেল । ওর দৃষ্টি তাজেলদের দিকে। ও উঠে দৌড় দিল ততক্ষণে ওখানে রাস্তা রক্তে ভিজে গেছে। মেহবিন দেখলো তাজেলের বাবা খুব শক্ত করে তাজেলকে ধরে রেখেছে। তাজেল আর তাজেলের বাবার শরীর রক্ত দিয়ে মাখামাখি। তাজেল আর তাজেলের বাবার চোখ নিভু নিভু। মেহবিন আগে তাজেলকে ধরলো। আর বলল,,

“কিছু হবে তোমাদের নেত্রী আমি এখনি হাসপাতালে নিয়ে যাবো। প্লিজ সাহায্য করুন কেউ শুনতে পাচ্ছেন এখানে এক্সিডেন্ট হয়েছে।”

যারা ওখানে ছিল সবাই চলে এলো। মেহবিন উঠে দাঁড়াবে তখন তাজেলের বাবা ওর হাত ধরলো আর বলল,,

‘ডাক্তার তাজেলরে বাচান। ডাক্তার আমার মনে হইতেছে আমার সময় ফুরাইয়া আইছে। আপনি তাজেলরে দেইখেন। ওরে কহনো একলা ছাইরেন না। আমার মরার পর ওর মা ওরে বাড়ি থাকবার দিবো না আমি জানি। ওরে আপনি দেইখেন আমি ওরে আপনার কাছে দিয়া দিলাম।”

মেহবিন ওনার হাত ধরে বলল,,

“কিছু হবে না আপনার। দেখুন সবাই এসে গেছে আপনাদের দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো।”

“আপনি তাজেলরে দেইহেন ডাক্তার।”

বলতেই বলতেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন। মেহবিন চেক করে দেখলো তিনি মারা গেছেন। ও এক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তাজেলের দিকে নজর পরতেই ও তাজেলকে কোলে নিয়ে দৌড়াতে লাগলো। ততক্ষণে তাজেলের পরিবার রাস্তায় এসেছে। নওশি কে দেখে ও তাজেলকে ওর কাছে দিয়ে বলল,,

“আমি গাড়ি নিয়ে আসছি ”

মেহবিন এক মিনিটের মধ্যেই তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে নওশির সামনে থামলো। মেহবিন দরজা খুলে ভেতরে আসতে বলল। মেহবিন যত দ্রুত পারলো গাড়ি চালিয়ে হাসপাতাল এলো। ও তাজেল কে চোখ খোলা রাখতে বলছিল বারবার। তাজেল ও অসহায় ভাবে মেহবিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেহবিন তাজেল কে কোলে নিয়ে ভেতরের দিকে দৌড় দিল আর বলতে লাগলো,,

“নেত্রী চোখ খোলা রাখো। এই যে তোমার ডাক্তার তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে কিছু হবে না তোমার। যাই হোক না কেন নেত্রী তুমি কিন্তু তোমার ডাক্তারকে ধোঁকা দেবে না।”

মেহবিন লিফটের এখানে এসে দেখলো লিফট ওপরে উঠে গেছে। ও দেরি না করে সিড়ি দিয়েই উঠতে লাগলো। তিন তালায় সবকিছু আছে। ও এসে দুজন নার্সকে ডাকলো আর বলল ইমার্জেন্সি। মেহবিন নিজেই তাজেলের ট্রিটমেন্ট শুরু করলো ওর হাত পা কাঁপছিল তবুও ওর নেত্রীর কথা ভেবে শুরু তো করে দিল ও তেমনভাবে আজ পারছিল না। তখন নার্স দেখে অন্য ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার আসতেই মেহবিন তাকে ট্রিটমেন্ট করতে বলে। সমস্ত সময় মেহবিন তাজেলের হাত ধরে ছিল। ডক্টর নার্সরা বলল ওকে সরতে কিন্তু মেহবিন একটুও সরলো না। তাজেলের মাথায় প্রচন্ড জোরে আঘাত লেগেছে একটা হাত আর পা ভেঙ্গেছে। ওকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলো। মেহবিন ওর সাথেই ছিল। অতঃপর ঘন্টা দুয়েক পর তাজেলের অপারেশন সাকসেসফুল হলো কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে তাজেলকে আর বাঁচানো যাবে না। মেহবিন সবকিছুই বুঝতে পারলো তবুও যেন কিছুই বুঝলো না। ওকে কেবিনে শিফট করা হলো। বাইরে এসেই দেখলো নওশি আর নওশির মা। মেহবিন ওদেরকে তাজেলের কথা বলল নওশিদের বলল বাড়ি চলে যেতে আর তাজেলের বাবার দাফন করে ফেলতে। মেহবিন কিছু টাকাও দিল যাতে তাজেলের বাবার দাফনে কোন সমস্যা না হয়। কারন তাজেলের বাবার সাথে তার ভাইদের সম্পর্ক ভালো নয়। ওরা চলে যেতেই মেহবিনের খুব একা লাগলো। ওর ভিশন তাজেলের কথা মনে পরছে। ও তাজেলের কেবিনে গেল আর তাজেলের হাত ধরে শান্ত স্বরে বলল,,

“তুমি সবসময় আমাকে বলতে আমি যেন তোমাকে ধোঁকা না দিই। আজ বলছি নেত্রী আমি তোমায় কখনো ধোঁকা দেব না। আমাকে ধোঁকা না দেওয়ার কথা বলে তুমি কেন আমাকে ধোঁকা দিতে চাইছো নেত্রী? তুমি জানো তোমার মতো করে এই তোমার ডাক্তারের কেউ খেয়াল রাখে না। তুমি যদি তোমার ডাক্তারকে ধোঁকা দাও তাহলে তোমার ডাক্তারের খেয়াল রাখবে কে? তোমার মতো।”

এটুকু বলতেই মেহবিনের কাছে একজন নার্স এসে বলল,,

“ম্যাম আপনার ফোন এসেছে?”

মেহবিন মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আমার ফোন তো আমার সাথে আনিনি তাহলে?”

“আপনার কেবিনের ল্যান্ড লাইনে আমি একটা ফাইল আনতে গিয়ে দেখলাম আপনার ফোন বাজছে। ধরলাম পরে আপনাকে চাইলো বলল খুব ইমার্জেন্সি।”

‘ঠিক আছে আপনি যান আমি যাচ্ছি।”

নার্সটা চলে গেল। মেহবিন তাজেলের হাত ছেড়ে ওর কেবিনে গেল। আর ফোন কানে নিয়ে বলল,,

‘হ্যালো?”

“কেমন হবে যদি? তোমার মায়ের মতো তোমার আরেকজন প্রিয় মানুষ তোমায় ছেড়ে চলে যায়।”

“নিশাচর!”

‘হুম আমি। আমার কেন যেন তোমার সুখ সহ্য হচ্ছিল না তাই এরকমটা করতে হলো।”

ওর জন্য আজ তাজেলের এই অবস্থা দেখে ও পাথরের মতো হয়ে গেল। ওর ভেতরে রাগের উন্মোচন হলো। ও চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,,

“এই ছোট্ট বাচ্চা আর ওর বাবা কি ক্ষতি করেছিল তোর যে তুই এরকমটা করলি।”

“না তারা কোন ক্ষতি করেনি তবে তোমার সাথে বাচ্চাটার খুব ভালো সম্পর্ক তো তাই। আমি তো বাচ্চাটাকে আঘাত করতে চাইছিলাম শুধু কিন্তু বাচ্চাটার বাবা এসে গেল এখানে আমার কি করার।”

‘তোর নূন্যতম মনুষ্যত্ব নেই তাইনা? ওহ থাকবে কি করে? তুই মানুষ নাকি তুই তো মানুষ নামের পশু।”

“আজ যাই বলো না কেন?আমার গায়ে লাগবে না। কারন আজ আমি ভিশন খুশি।”

“নিশাচর!”

“আরে আস্তে আস্তে চিৎকার করো না। আচ্ছা তোমার মনে আছে আজকের মতো একটা রাতেই তোমার প্রিয়জন হাসপাতালে ছিল আর এবারের মতো সেবারও তুমি একা । এই মুহুর্তে যদি সেবারের মতো কিছু হয় তখন তুমি কি করবে? আচ্ছা আমি তো শুনেছিলাম তুমি ঘুমিয়েছিলে সেই সুযোগে তোমার মা দুনিয়া ছেড়ে চলে। যদি এবার ও তোমার অগোচরে কেউ চলে যায় তুমি তখন কি করবে। ইশশশ কি দুঃখ তাই না। কিন্তু কেন যেন তোমার দুঃখ আমায় অনেক আনন্দ দিচ্ছে।”

মেহবিন সব শুনে এক মিনিট চুপ রইলো তারপর বলল,,

“আমার ব্যাপারে যখন জেনে গেছিস। তাহলে এটাও শুনে নে কিছুদিন আগে শেখ সায়িদের সাথে যা হয়েছে সেটা আমারই কাজ। আমি ওর শরীরে হাত লাগাইনি তাই এই অবস্থা আর যদি হাত লাগাতাম তাহলে কি হতো। তৈরি থাক তোর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তোকে আমি কি করবো আমি নিজেও জানি না।”

অপরপাশ থেকে হাসির আওয়াজ শোনা গেল। আর বলল,,

“আরে তোর কথায় আমি বেশ মজা পেলাম জানিস। কারন আমিই সায়িদকে মারতে চাইছিলাম ব্যাটা বেশ ধূরন্দর কিভাবে মারবো ভাবছিলাম কিন্তু তোর জন্য কাজটা সহজেই হয়ে গেল। আর আমার সাথে কি করবি তুই শুনি। আমি কে আমাকে তুই চিনিস? আমি তো নিশাচর যার নামতো সবাই শুনেছে কিন্তু কেউ দেখেনি এরকম ভাবে আমি সবার সাথে চলাচল করি। যাই হোক সেসব বাদ!

এইটুকু শুনে মেহবিনের হাত শক্ত হয়ে এলো। কিন্তু ও জোশে হুশ হারানো মেয়ে নয় তাই ও কিছুই বললো না। তবে এইটুকু বলল,,

“এতো তাড়াতাড়ি বাদ দিলে চলে নাকি নিশাচর। নিজের নতুন অভিজ্ঞতার জন্য তৈরি হয়ে নে। কে জানে কখন কি হয়।”

মেহবিনের কথা আমলে না নিয়ে নিশাচর বলল,,

“হ্যা তা ঠিক কে জানে কখন কি হয়। দ্যাখ মনে কর সেই উনিশ বছর আগের কথা সেদিন ও তুই একা, হাসপাতালে তোর প্রিয়জন। আজ ও তুই একা আর আজকেও তোর প্রিয়জন হাসপাতালের বেড এ। আচ্ছা সেবারের মতো কিছু এবার হলে মন্দ হয় না কি বলিস। ইশশ বেচারি মেহেরুন নিসা ঘুমের মধ্যেই পরপারে চলে গেল। মেয়েটাকে রেখে ইশশ মেয়েটা মরা মায়ের বুকেই শুয়ে ছিল কি দুঃখ কি দুঃখ।”

বলেই ফোন কেটে দিল। মেহবিনের পুরোনো কথা শুনে হাত পা কাঁপতে লাগলো। ওর পুরোনো সেই দিনটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ওর ভিশন একলা ফিল হচ্ছিল ও কাউকে ওর পাশে চাইছিল। ওর ভয়গুলো চারপাশে দানা বাঁধতে শুরু করলো। ও তাড়াতাড়ি করে তাজেলের কেবিনে গেল আর তাজেলের হাত ধরে বলল,,

“এই নেত্রী তুমিও কিন্তু মায়ের মতো আমাকে ধোঁকা দিও না। এই যে তোমার ডাক্তার তোমার হাত ধরে আছে তোমাকে কোথাও যেতে দেবে না। আমি তোমাকে মায়ের মতো হারাতে চাই না। কারো স্বার্থপরতার কাছে তোমায় বিলীন হতে দিতে চাই না। মনে রেখো তোমার ডাক্তার তোমার অপেক্ষায় আছে। তোমাকে ফিরতেই হবে নেত্রী।

মেহবিন আরো কিছুক্ষণ কথা বলল তারপর চুপ হয়ে গেল। আর এক দৃষ্টিতে তাজেলের দিকে তাকিয়ে রইল। কখন কোথা দিয়ে ওর সময় চলে গেছে ও টেরই পায় নি।

******
বর্তমান,,

মেহবিনের আজকের সবকিছু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। ও পরে যেতে নিল। না অজ্ঞান হয়ে নয় জ্ঞান থেকেই। যে লোকটা ওকে জড়িয়ে ধরে ছিল সেও শক্ত করে ধরলো। মেহবিন নিজেকে সামলে বলল,,

“চলে যান এখান থেকে আমার কাউকে দরকার নেই।নিশাচর ও তার সাগরেদদের তোলার ব্যবস্থা করুন। তাদের শাস্তি দেওয়ার সময় এসে গেছে। অনেক হয়েছে আর না এবার এসপার নয়তো ওসপার কিছু একটা করতেই হবে। আমাকে ভেঙে পরলে চলবে না কঠোর হতে হবে।”

বলেই মেহবিন সামনের জনকে সরিয়ে দিল। তাকে সরিয়ে দিলেও তার মুখে অদ্ভুত হাঁসি। তারমানে সে মেহবিন কে সামলাতে পেরেছে। কিছু না বলেও। এইটুকুই মেহবিন চাইছিল কেউ ওকে সামলে নিক। লোকটা বলল,,

“ওকে পার্টনার। আর হ্যা মেহবিন মুসকানকে কঠোরতায়ই মানায় দূর্বলতায় নয়। ইনশাআল্লাহ আপনার নেত্রীর কিছু হবে না। নিজের পোষাক ছেড়ে নিন। আর অন্য একটা পোষাক পরিধান করুন যা আপনি শাস্তিঘরে পরেন।”

“মানে?”

‘আমি আপনি বলার আগেই তাদের তুলে নিয়েছি এখন শুধু তাদের শাস্তি দেওয়ার পালা।”

“তাদের শাস্তি আজ নয় সাতদিন পর হবে। আগে আমার নেত্রী একটু সুস্থ হোক। এতদিন পর্যন্ত তাদের না হয় কারেন্ট খায়িয়ে আর পচা ডোবায় চুবিয়ে বাঁচিয়ে রাখুন। সাথে একটু পোড়া রুটি আর নুন।”

“আপনার বলতে হবে না আমি তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছি।”

‘এতো বছর পর আপনাকে একটা কাজ করতে হবে বুঝেছেন পার্টনার।”

“আপনি শুধু বলুন আমি আছি।”

কথাটা শুনে মেহবিনের মুখে অদ্ভুত হাঁসি ফুটে উঠলো। তা দেখে সামনের মানুষটার ও মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো। এতোক্ষণ মুখর অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেও এবার সে এগিয়ে এলো। সেই সাথে সকলেই কেউ কিছু বলবে তার আগেই লোকটা তাড়াতাড়ি করে চলে গেল। মুখ ঢাকা দেখে কেউ দেখতে পারলো না‌। মুখর মেহবিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,,

“মেহু?”

মেহবিন মুখরের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আমার নেত্রীর কিছু হবে না তাই না কাব্য?”

হুট করে তাজেলের কথা শুনে মুখর থমকে গেল। ও বুঝতে পারছিল না হাসপাতালে কে আছে কিন্তু মেহবিনের একটা কথায় ও বুঝে গেল কে হাসপাতালে। মুখরের চোখ ছলছল করে উঠলো। ও সব ভুলে মেহবিন কে জড়িয়ে ধরলো। আর বলল,,

“ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না নেত্রীর। তার ডাক্তারের ভালোবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।”

মেহবিন কোন রিয়াক্ট করলো না। শান্ত ভাবে বলল,,

“আপনি কি দাদিজানের মতো আমার ওপর রাগ করেছেন কাব্য?

মুখরের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরলো। ও বলল,,

‘না যাওয়ার জন্য একটুও রাগ করিনি বিহঙ্গিনী। তবে এখন যে রাগ করতে ইচ্ছে হচ্ছে কারন তুমি নেত্রীর পাঞ্জাবি ওয়ালার কাছে নেত্রীর খবর পৌছাও নি।”

“সবার আমার ওপর রাগ করার অধিকার আছে কাব্য আমার কেন নেই। আপনি জানেন আমারও ভিশন রাগ হচ্ছে নেত্রীর ওপর কেন সে আজ রাস্তায় বেরিয়েছিল আর কেনই বা তার বাবার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে মেলায় যাচ্ছিল। সে রাস্তায় না বের হলে তো এসব কিছুই হতো না তাই না।আপনি জানেন আজ ওর বাবা মারা গেছে। আর ওর শরীর দিয়ে কতো রক্ত পরছিল। আজ তো ওর রক্ত দেখে মনে হচ্ছিল আমার ও মিশুর মতো রক্তে ফোবিয়া আছে। আপনি জানেন আমি সর্বক্ষন নেত্রীর হাত ধরেছিলাম। আপনারা আসার আগ পর্যন্ত যাতে নেত্রী আমায় ধোঁকা না দিতে পারে।

মেহবিনের কথাগুলো আজকে বাচ্চাদের কথার মতো লাগছে। মুখর টের পাচ্ছে তার বিহঙ্গিনী ভয় পাচ্ছে। তাই সে বলল,,

“ভয় পেও না বিহঙ্গিনী তোমার নেত্রীর কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ।”

মেহবিন মুখর কে ছেড়ে বলল,,

“আরে আমি তো ভুলেই গেছি নেত্রী একা আছে ওর কেবিনে। আপনি বাড়ি চলে যান কাব্য।”

বলেই মেহবিন হাঁটা ধরলো। মুখর দুই তিনবার ডাকলো কিন্তু মেহবিন সাড়া দিল না। মুখরের চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো। ওর তাজেলের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে পরলো। ওর কানে বেজে উঠলো,,

‘পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালা তোমার কথা হুনলে আমার শরম করে।”

মুখর না চাইতেই একটু পুরোনো কথা ভেবে হেঁসে উঠলো। তবে মুহুর্তেই এখনকার কথা মনে পরে হাঁসি গায়েব হয়ে গেল।ও এগুতে যাবে তখন মাহফুজ শাহরিয়ার বললেন,,

‘কোথায় যাচ্ছিস?

“নেত্রীকে দেখতে। আচ্ছা তোমরা এর আগে এই মেহু কে দেখো তাই না। আমিও দেখি নি তবে আজ দেখলাম।”

‘নেত্রী কে?”

“মেহুর নেত্রী!”

“মানে?”

‘চলো বসো আজ ডাক্তারের নেত্রীর গল্প শোনাই তোমাদের। এই মুহূর্তে মেহুকে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। কারন ও বাকিদের মতো নয় ওর সান্তনাও পছন্দ নয়।

মুখর সবাইকে নিয়ে বসলো আর একে একে নেত্রীর সব বলতে লাগলো। প্রথম প্রথম সবাই খুব হাসলো কিন্তু শেষে এসে সবার মন খারাপ হয়ে গেল।সবাই বাইরে থেকে মেহবিনের নেত্রীকে দেখে এলো। মেহবিনের জন্য সবার খারাপ লাগল।মুখর সবাইকে বাড়ি চলে যেতে বলল। তখন আছিয়া খাতুন বললেন,,,

“মুখর আমার নাতবউ রে ছাড়া তুই শাহরিয়ার ভিলায় পা রাখবি না। আর ডাক্তারের নেত্রীরেও কিন্তু লগে নিবি।”

মুখর বলল,,

“ঠিক আছে!”

সবাই যেতেই মুখর মেহবিনের কাছে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলো। আর বলল,,

“বাইরে চলো ড্রেস চেঞ্জ করে নাও।”

মেহবিন মাথা তুলে বলল,,

“বৃষ্টি কি এখনো আছে?”

“হুম! থেমেছিল একবার এখন আবার এসেছে।

মেহবিন মুখরকে কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। আর সোজা ছাদে চলে গেল। বেশ জোরেই বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে থেমেছিল সেই সুযোগে শাহরিয়ার পরিবার সবাই চলে গেছে। মেহবিন ছাদে উঠে ছাদের মাঝখানে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করতে লাগলো। মুখর মেহবিনের পেছনেই এসেছিল। মেহবিনকে চিৎকার করতে দেখে ও গিয়ে মেহবিনকে জড়িয়ে ধরলো। মেহবিন তাও জোরে জোরে চিৎকার করলো। কারন ও কাঁদতে পারছে না ভেতরে সব কষ্ট জমে গেছে তাই চিৎকার করে কমানোর চেষ্টা করছে। একটা সময় মেহবিন বলল,,

“আপনি আমার দূর্বলতা এটা যেন নিশাচর না জানে এই জন্য আমি আপনাকে সবার আড়ালে রাখতাম। কিন্তু আমি নেত্রীকে পারি নি ওর ভালোবাসা আমাকে কারো থেকে আড়াল করতে দেয় নি। এই জন্যই তো নিশাচর আমার দূর্বলতায় আঘাত করলো কাব্য। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আমার জন্য আজ নেত্রীর এই অবস্থা যা আমায় ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে কাব্য। আমি নিজেকে কি করে ক্ষমা করবো। আমার মা বলেছিল আমার দ্বারা কারো ভালো ছাড়া যেন ক্ষতি না হয়। আর আজ আমার জন্যই আমাকে এতো ভালোবাসার মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না।”

এদিকে,,

একটা লোক হাত পা বাঁধা অবস্থায় ও হাসছে আর বলছে,,

“আমি জানতাম মেহবিন মুসকান শাহনাওয়াজ। তুমি আমায় খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলবে এই জন্যই তো শেষ চালটা চাললাম। এইবার আমি কিছুই করিনি যা হওয়ার একাই হয়েছে। তবে তোমাকে অথৈ সাগরে ভাষানোর জন্য মিথ্যা গুলো বলতে হলো। এবার তুমি নিজেই নিজের কাছে অপরাধী থাকবে। আর সারাজীবন বয়ে বেড়াবে। আমি যদি মারাও যাই তবুও তোমায় শান্তিতে বাঁচতে দেব না। সেই ব্যবস্থায় করেছি এবার। তবে তোমাকে কে সাহায্য করছে এটাই বুঝতে পারছি না। কে আছে তোমার পেছনে মেহবিন মুসকান শাহনাওয়াজ?

~চলবে,,

#কাব্যের_বিহঙ্গিনী
#পর্ব_৫২
#লেখিকা_আজরিনা_জ্যামি

মেহবিন আর মুখর দু’জনেই ভিজে যাচ্ছে। মেহবিন যখন পাগলের মতো চিৎকার করছিল তখন মুখরের ভেতরটা হাহাকার করছিল। তবে ও শক্ত ছিল আজ ওর বিহঙ্গিনীর জন্য। মেহবিন এবার শান্ত হয়ে মুখরের বুকে লেপ্টে রইলো। ওর মাথার ভেতর কি চলছে ও আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা। মুখর হুট করেই বলল,,

“বিহঙ্গিনী?”

‘আজকে ঘটে যাওয়া সবকিছুর পেছনে আমি কাব্য। নেত্রী ঠিক হয়ে যখন বলবে ওর বাবা কোথায় আমি কি উত্তর দেব?”

“তোমার জন্য কিছুই হয় নি। সব নেত্রীর নিয়তি ছিল।”

“তাই বলে আমাদের দায় আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না।”

“অনেক হয়েছে এখন চলো ড্রেস পাল্টে নাও। নেত্রীকে সুস্থ করতে হলে তো নিজেকে সুস্থ থাকতে হবে। তাছাড়া তুমি কিন্তু একটা কাজ ভুলে গেছো।”

“হুম নামাজ পড়া হয় নি যেটা বেশি দরকার ছিল।”

মেহবিনের কথায় মুখর অবাক হলো। মেহবিন উঠে দাঁড়ালো। আর বলল,,

“কেবিনে চলুন ওখানে আমার জামাকাপড় আছে। চেঞ্জ করে নিচ্ছি। আপনি বরং বাড়ি চলে যান চেঞ্জ করুন। নাহলে আপনি অসুস্থ হয়ে পরবেন।”

মেহবিন হাঁটা শুরু করলো তখন মুখর বলল,,

“লোকটা কে ছিল মেহু?”

মেহবিন পেছনে তাকিয়ে বলল,,

“আমার পার্টনার। আমার জীবনে সবাই থেকেও যেমন সবাই আলাদা। ঠিক সেভাবেই আলাদা থেকেও যেন সে আমার সাথে আছে।”

বলেই মেহবিন চলে গেল। মুখর থম মেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে নিজেও নিচে এলো। নিচে আসতেই দেখলো আরবাজ দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে কিছু প্যাকেট। আরবাজকে দেখে মুখর বলল,,

“তুই এখানে?”

আরবাজ ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল,,

“এখানে তোর জন্য জামাকাপড় আর তোদের জন্য খাবার আছে খেয়ে নিস। আর হ্যা ফুলকেও খায়িয়ে দিস।”

“তোর মনে হয় ও খাবে?”

“না খেলে জোর করবি।”

“তা সে কোথায়? চেঞ্জ করেছে?”

“হুম একটু আগে তাজেলের কেবিনে গেল। হাতে জায়নামাজ ও দেখলাম।”

“তাহলে আজ আর খাওয়াতে পারবো না।”

“যখন পারবি তখন খায়িয়ে দিস।”

“তাজেলের বাবার দাফন হয়ে গেছে?”

“হুম!”

“বাড়ির অবস্থা এখন কেমন?”

“সবাই তাজেলের বাবার মৃত্যু নিয়েই শোকে আছে। তাজেলকে নিয়ে কারো মধ্যে তেমন কিছু নেই। তাজেলের দাদির একটু সহানুভূতি আছে তবে তিনিও পুত্র শোকে নাতনিকে ভুলে গেছে‌। আর তাজেলের সৎমা তাজেলকেই দায়ী করছে। কারন সেই মেলায় যাওয়ার জন্য নাকি আবদার করেছিল আর সেখানে যেতে গিয়েই এই ঘটনা ঘটে গেছে।”

“আল্লাহ নিশ্চয়ই উত্তম পরিকল্পনাকারী এবং কর্মবিধায়ক। আল্লাহ যা করেন তার বান্দাদের ভালোর জন্যই করেন।”

“হুম এখন যাওয়া উচিৎ অনেক রাত হয়েছে।”

“তোর ফুলের পার্টনার কে আরবাজ?”

আরবাজ অবাক হয়ে বলল,,

“মানে পার্টনার কোথা থেকে এলো?”

“তারমানে তুই ও পার্টনার সম্পর্কে জানিস না?”

“না!”

“আচ্ছা যা পরে এ নিয়ে কথা হবে।”

“ওহ ভুলেই গিয়েছিলাম তুই যাবি না? ফুল তো বলল তোকে নিয়ে যেতে।”

“না যাবো না। তোর ফুল অনেক ভেঙে পরেছে এই সময় ওকে একা রেখে যাওয়াটা ঠিক হবে না ‌।”

“হুম আসছি আল্লাহ হাফেজ।”

আরবাজ চলে গেল মুখর ফ্রেশ হলো‌। তাজেলের কেবিনে উঁকি দিলো। মেহবিন ওখানেই নামাজ পরছে। রাত একটা বাজে মেহবিনের কেবিনে এসে সে নিজেও নামাজ পরতে লাগলো। মুখর নামাজ আদায় করে আবার তাজেলের কেবিনে উঁকি এখনো মেহবিন নামাজ পরছে। মুখর বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালো। এখনও হালকা হালকা বৃষ্টি পরছে। ও হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি ছুয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,,

“আল্লাহুম্মা সাইয়েবান নাফিআ”,
‎আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বৃষ্টি হতে দেখতেন, তখন বলতেন, “আল্লাহুম্মা সাইয়েবান নাফিআ”
অর্থ: হে আল্লাহ্‌ মুষলধারে উপকারী বৃষ্টি বর্ষাও। (বুখারী ১০৩২)

বলেই মুখর বৃষ্টির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইল।

অতীত,,

“এই যে মিস মেহবিন আপনি এতো অসামাজিক কেন?”

পেছন থেকে কারো কথায় মেহবিন থেমে দাঁড়ালো। পেছনে তাকিয়ে দেখলো কালো রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত মুখর দাঁড়িয়ে আছে। মেহবিন ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,

“মানে?”

“দেখুন আপনাকে কাল গুনে গুনে তিনটা কল দিয়েছি। যদিও দুবার কল দিলে কেউ না ধরলে তারপর আবার ফোন দেওয়া সেটা ভদ্রতার খাতিরে পরে না। তবুও আমি তিনবার দিয়েছি। দেখলেন আপনাকে কল করা হয়েছে সেহেতু কলব্যাক করা উচিৎ ছিল নয় নাকি। কোন বিশেষ দরকার ও থাকতে পারে।”

“দেখেছিলাম তবে প্রয়োজন মনে করিনি তাই কলব্যাক করিনি। তাছাড়া আমার তো মনে হচ্ছে না আপনাদের সাথে আমার কোন বিশেষ দরকার থাকতে পারে?”

মুখর মনে মনে মেহবিন কে অসামাজিক বলে আবার ও আখ্যায়িত করলো। তবে মুখে বলল,,

“আপনার একটা জিনিস গাড়িতে পরেছিল সেটা দেওয়ার জন্যই ফোন করেছিলাম।”

“নিশ্চয়ই ব্লু রঙের কলমটার কথা বলছেন। ওটার কালি শেষ হয়ে গিয়েছে ওটা ব্যাগে ছিল কখন আপনার গাড়িতে পরলো টের পাইনি। তবে হলে ফেরার পর ব্যাগ থেকে সব বের করার সময় বুঝেছিলাম কোথাও পরেছে।”

সহজে বলা কথাগুলো মুখর সহজভাবে নিতে পারলো না। ও বলল,,

“এই জন্য আপনি আমার ফোন তুলেন নি? কারন কলমটার কালি শেষ হয়ে গেছিল।”

“না আসলে আমি ফোন ইউজ করি কম। কাল ফোনটা যেই ব্যাগে ছিলো ওভাবেই পরে ছিল। আর হয়তো চাপ লেগে সাইলেন্ট ও হয়ে গেছিল। তাই আপনি ফোন দিয়েছিলেন সেটা শুনতে পাইনি। তবে সকালে উঠে দেখেছি আপনার কল। এতো ভোরে কাউকে ভদ্রতার খাতিরে পরে না তাই দিইনি। তবে আমি অবাক হলাম সামান্য কলমের জন্য আপনি আমায় ফোন করেছেন এবং ফোন না তুলায় এভাবে ক্যাম্পাসে চলে আসবেন।”

“হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস অর্থাৎ টাকা বা অন্য কিছু পেলে তা এক বছর ঘোষণা দিতে থাক। তারপর (মালিক পাওয়া না গেলে) তুমি তা ব্যবহার কর।পরে যদি এর প্রাপক আসে তবে তাকে তা দিয়ে দেবে। [সহীহ বুখারী ৯১ ]

“তাহলে একবছর পর্যন্ত না হয় অপেক্ষা করতেন।”

“এটা দুই হাজার চব্বিশ মিস। এখন আর ঘোষণা দিতে হয় না। একেবারে সোজা তাকে দিয়ে আসা যায়। আর ওটা কুড়িয়ে পাওয়ার মালিক কে না পাওয়া গেলে এর জন্য। যেখানে আমি জানি মালিক টা আপনি সেখানে এটা ফেরত দেওয়া আমার দায়িত্ব।

“তা আপনি কিভাবে জানলেন কলমটা আমারই।”

“আপনি আসার সময় কলমটা আপনার হাতে ছিল। আমাকে দেখে আপনি কলমটা ব্যাগের সাঈড পকেটে ঢুকিয়ে ছিলেন।”

“বাহ এতটা নিখুঁত নজর রাখেন আপনি?”

“সবকিছু নিখুঁত নজরে রাখতেই হয় কাজটাই এমন!”

“মানে?’

“কিছু না। বাদ দিন।”

“আচ্ছা! তবে সামান্য কলমের জন্য এতটা কষ্ট করার জন্য শুকরিয়া। তবে এটা আমার দরকার নেই। আমার ইম্পোর্টেন্ট ক্লাস আছে আমি যাই আল্লাহ হাফেজ।”

“আল্লাহ হাফেজ ফি আমানিল্লাহ!”

“দেখা নাও হতে পারে আমাদের।”

“মন বলছে হবে ইনশাআল্লাহ!”

মেহবিন কিছু না বলেই চলে গেল‌। মুখর বলল,,

“না একেবারে অসামাজিক নয় একটু সামাজিক ও আছে। তবে আমি শুধু কলমের জন্য এখানে আসিনি কলম তো বাহানা মাত্র এসেছিলাম আপনার ব্যাপারে একটু কৌতূহলের বসে । জানি না কি হয়েছিল কাল আপনার জন্য রাতে আমার ঘুমই হয় নি। তবে বুঝলাম ভুল হয়ে গেল। না আর আসা যাবে না। তকদির যদি আবার মিলিয়ে দেয় তখন এই বিষয়ে ভাববো তার আগে নয়।

বর্তমান,,

কারো ছোঁয়া পেতে মুখর অতীত থেকে বেরিয়ে এলো। পাশে তাকাতেই দেখলো মেহবিনকে। মেহবিন বলল,,

“বাড়িতে যান নি কেন?”

“না এমনিতেও যেতে চাইছিলাম না। চেঞ্জ করেই আবার চলে আসতাম। আরবাজ আবার জামাকাপড় আর খাবার নিয়ে এসেছিল তাই এখান থেকেই কাপড় চেঞ্জ করে নিলাম।”

“ওহ আচ্ছা! তাহলে আমার কেবিনে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিন।”

“তার আগে তুমি একটু খেয়ে নাও।”

“আমি কিছু খাবো না। আপনি যান একটু ঘুম দিয়ে নিন।”

“আমিও তো খাইনি বলো আমার তো ক্ষুদা লাগছে। আমি জানি তোমার ও লাগছে। এখন নেত্রী যদি উঠে শুনে তুমি তার জন্য খাওনি। তাহলে আমায় বলবে পুলিশ পাঞ্জাবিওয়ালা তুমি কি ডাক্তারের একটুও খেয়াল রাখতে পারো না। তাছাড়া না খেলে তুমিও অসুস্থ হয়ে পরবে।”

“আমি আরেকটু পর খাবো নফল রোজা রাখবো। আপনি খেয়ে নিন। আর হ্যা আমি আগেই বলছি অনেক দৌড়ঝাপ যাবে আপনার এখন রোজা রাখার দরকার নেই।”

মেহবিনের রোজার কথা শুনে মুখর ও রোজা রাখতে চাইছিল। কিন্তু মেহবিনের কথায় ও কিছুই বললো না। শুধু বলল ,,

“ঠিক আছে আমিও না হয় তোমার সাথে খাবো। আর একঘন্টা বাদেই সেহেরির টাইম হয়ে যাবে।”

মেহবিন কিছুই বললো না আবার তাজেলের কেবিনে গেল। মুখর আর কিছু বললো না ফোন বের করে কিছু করতে লাগলো। এক ঘন্টা পর মুখর মেহবিনকে ডেকে আনলো মেহবিন ও চুপচাপ খেয়ে নিল। সে নফল রোজা রাখবে যাতে তাজেল তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে। মেহবিন মুখরকে ঘুমাতে বলে তাজেলের রুমে গেল। শরীরটা আর কুলাতে চাইছেনা দৌড় ঝাঁপ তো আর কম হয় নি। সকাল হয়ে গেল। মেহবিন সবকিছু দেখলো এখনো একই ভাব‌। ও তাজেলের হাত ধরে বসে থাকতে থাকতে একটু ঘুমিয়ে পড়লো। নার্স ডাক্তার সবাই এলো মেহবিনকে ঘুমাতে দেখে কেউ জাগালো না। সকাল সকাল নওশি তাজেলের দাদি এসেছে। নওশি এসে মেহবিনকে ডাকতে গেলে নার্স বারন করলো সে সারারাত ঘুমায়নি সকাল হওয়ার পর ঘুমিয়েছে। তারা আর কিছু বললো না। একবার দুর থেকেই তাজেল কে দেখলো। কোন কিছুর জন্য মেহবিন তাড়াতাড়ি ধরফরিরে উঠলো। তাজেলের দিকে তাকাতেই দেখলো সব ঠিক। ও হাত মুখ ধোয়ার জন্য বাইরে বের হতেই দেখলো নওশি আর তাজেলের দাদিকে। তাজেলের দাদি মেহবিনকে দেখেই কেঁদে উঠলো। মেহবিন তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। নওশি জিজ্ঞেস করল তাজেলের বাবার দাফন ভালো মতো হয়েছে কি না। নওশি সব বলল আর এটাও বলল তাজেলের মা তাজেলকেই দোষারোপ করছে। কথাটা শুনে মেহবিনের বুক ভারি হয়ে আসলো। ও ওখান থেকে চলে গেল। এভাবেই দুপুর হলো মেহবিন তাজেলের সবকিছু দেখতে লাগছিল। হুট করেই ও কানে আসলো,,

“ডাক্তার!”

মেহবিন তাজেলের দিকে তাকাতেই দেখলো ও চোখ খুলেছে। মেহবিন আলহামদুলিল্লাহ বলে তাজেলের কাছে গেল আর বলল,,

“নেত্রী ডাক্তার এখানেই আছে। এখন বলো তোমার কোথাও কষ্ট হচ্ছে নেত্রী?”

তাজেল মেহবিনের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল,,

“আমার মাথার আর হাত পায়ের ওপর মনে হয় কেউ একহাজার কেজির পাথর রাইহা দিছে ডাক্তার। আর মাথাও বিষ করতেছে।”

“আর একটু ব্যাথা করবে তারপরেই সব সেড়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”

“আমারে উঠাও আমার শুয়্যা থাকতে ভাল্লাগে না।”

“কিন্তু একটু যে শুয়ে থাকতেই হবে। তুমি তো এখন অসুস্থ।”

“আমি অসুস্থ আমার জ্বর আইছে নাকি। অবশ্য শরীর ম্যাচম্যাচ করতেছে জ্বর আইতেই পারে। কিন্তু আমি উঠবার পারতেছি না ক্যান?”

“তোমার এক্সিডেন্ট হয়েছে নেত্রী।”

“যেরম ভাবে তোমার হইছিল। মেলা রক্ত পরছিল হেইরহম।”

মেহবিন বুঝতে পারলো ওর সাথে কথা বললে ও বেশি করে কথা বলবে এই জন্য ওকে এখন ঘুম পারাতে হবে। মেহবিন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,,

“হুম!”

“আইচ্ছা তুমি কি কানছো ডাক্তার?”

“যদি বলি না?”

“তাইলে ঠিক আছে!”

“যদি বলি হ্যা!”

“তাইলে ঠিক নাই। তোমারে আমি কানতে দেহি নাই আর দেখবার ও চাইনা।”

মেহবিন একটা ইনজেকশন নিয়ে এলো কিন্তু তাজেলকে দেখালো না। মেহবিন তাজেলের মনোযোগ সরানোর জন্য বলল,,

“বলতো নেত্রী কাল আমি কিরকম কিরকম ড্রেস পরেছিলাম?”

“পরীর মতো ।”

“কি রঙের?”

“সাদা কালার।”

“হিজাব কি রঙের?”

“স্বর্নের কালার!”

“আমার গাড়ি কি রঙের?’

“তোমার চকলেট এর কালার।”

মেহবিনের কাজ শেষ। কথায় কথায় ওকে ইনজেকশন পুশ করে দিয়েছে। মেহবিন এসে তাজেলের মাথায় চুমু দিয়ে বলল,,

“সব সঠিক উত্তর দিয়েছো নেত্রী।এখন একটু ঘুমাও।”

“ডাক্তার আব্বা কোনে,,

এইটুকু বলার পরেই তাজেল ঘুমিয়ে পরলো। কিন্তু মেহবিনের মনে ঝড় উঠালো। ও বাইরে এলো। মুখর বাইরেই ছিল মেহবিন ওকে তাজেলের কথা বলল মুখর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো।

দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন দিন। এই তিনদিনে তাজেল কিছুটা সুস্থ হয়েছে। তার একটাই প্রশ্ন তার আব্বা কোথায়? মেহবিন নওশিদের না করে দিয়েছে কিছু বলতে। ও নিজে বলবে। মুখর না পুলিশ স্টেশনে গেছে। বিকেল বেলা মেহবিন তাজেলকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বাইরে নিয়ে এলো বাইরে আলো বাতাস নেওয়ার জন্য। মেহবিন হাঁটতে হাঁটতে ওকে হাসপাতালের পেছনে একটা সুন্দর জায়গা আছে সেখানে নিয়ে এলো। এখানে কেউ নেই। মেহবিন তাজেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,,

“নেত্রী আমার কথা মন দিয়ে শুনবে?”

তাজেল মাথা কাত করলো মানে সে শুনবে।মেহবিন বলল,,

“তুমি জানো নেত্রী আমার মাও না এই তোমার মতো বয়সে আল্লাহর কাছে চলে গেছে। শুনো নেত্রী মানুষ তার আয়ু নির্ধারিত নিয়েই পৃথিবীতে আসি। হয়তো কারো মাধ্যমে তাদের মৃত্যু তবে এখানে তার মৃত্যু সেই পথেই লেখা থাকে। এই জন্য আমরা চেয়েও কিছু করতে পারি না।”

“হুম কিন্তু তুমি এইগুনা কইতেছো ক্যান?”

“তোমার আব্বা সেদিনের এক্সিডেন্ট এ সেখানেই মারা গেছে নেত্রী। তাই তুমি হাসপাতালে থাকলেও তোমাকে দেখতে আসতে পারে নি।”

মেহবিন তাজেলের চোখের দিকে তাকালো। ওর চোখ ছলছল করছে। মেহবিন সেদিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। ও তাজেলকে জড়িয়ে ধরলো। তাজেল শুধু বলল,,

“আমার আব্বা সারাজীবনের জন্য আমারে ধোঁকা দিল ডাক্তার।”

“তুমি সবসময় জানতে চাওনা আমি যেন তোমাকে ধোঁকা না দিই। তাহলে শুনে রাখো নেত্রী যাই হয়ে যাক না কেন তোমার ডাক্তার কখনো তোমায় ধোঁকা দেবে না। সবসময় তোমার সাথেই থাকবে।”

তাজেল কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ ওভাবে থাকার পর মেহবিন বুঝতে পারলো তাদের কাঁদছে। মেহবিন বলল,,

“কেঁদে নাও নেত্রী যতো পারো কেঁদে নাও। কাঁদলে মন হালকা হবে।”

তাজেল চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। মেয়েটা আজ বুঝতে পারলো সে এতিম হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ কাঁদার পর তাদের শান্ত হলো। তখন মেহবিন বলল,,

“আজ থেকে নেত্রী তার ডাক্তারের সাথেই থাকবে সবসময়।”

তাজেল ভদ্র বাচ্চার মতো মাথা কাত করলো। মেহবিন ওকে কেবিনে শুয়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর তাজেল ঘুমিয়ে পড়লো। মেহবিন এই সময় তাজেলকে কিছু জানাতে চাইছিল না। কিন্তু ওর মুখে একটাই কথা ওর বাবা কোথায় সেদিন কি ওর বাবার ও এক্সিডেন্ট হয়েছিল নাকি। ওর বাবা কেন ওকে দেখতে আসছে না। ওর বাবা ওকে ভুলে গেছে ‌। ওর কেউ নেই। এগুলো তাজেলের অবস্থা আরো বিগরে দিচ্ছিল তাই মেহবিন ইচ্ছে করেই জানালো। হয়তো দুঃখ পেয়েছে একটু তবে ভেতরে ভেতরে আমার কেউ নেই এর থেকে গুমরে মরার থেকে এটা বেটার। মেহবিন বাইরে এসে মুখরকে কল দিল। মুখর ধরে বলল,,

“আসসালামু আলাইকুম!”

“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনি কোথায়?

“পুলিশ স্টেশনে। কিছু দরকার? নেত্রী ঠিক আছে?”

“সব ঠিক আছে কিন্তু আপনি কি করছেন?”

“কি করলাম?”

“দেখুন কাল আলভি ভাইয়ার বিয়ে আর আপনি আজ পুলিশ স্টেশনে। আপনি ঐ বাড়ির বড় ছেলে এটা কেন ভুলে যাচ্ছেন।”

“দাদিজান বলে গেছেন আমি যেন তার নাতবউকে ছাড়া ও বাড়ি তে পা ও না ফেলি। আর নেত্রী কেও যেন সাথে নিই।”

“এটা পসিবল না এখন বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি প্লিজ বাড়ি চলে যান।”

“তুমি চাইলেই পসিবল। নেত্রীকে নিয়ে চলো ট্রাস্ট মি নেত্রীর কোন অসুবিধা হবে না।”

“আপনি পাগল নাকি এই অবস্থায় নেত্রীকে সাথে নেব। আমি দাদিজানকে ফোন দিচ্ছি আপনি বাড়ি যাবেন ব্যস।”

“আরে মেহু!”

“আর একটাও কথা না!”

বলেই মেহবিন ফোন রেখে দিল। তারপর আছিয়া খাতুন কে কল করলো। আছিয়া খাতুন ও মুখরের টোনে কথা বলল সে বলল,,

“সেদিন যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবে এখন যদি মুখরের সাথে আলভির বিয়েতে না আসো তাহলে লোকজন তোমাকে এবং আমাদেরকে নিয়ে আরো বাজে কথা শোনাবে। আর হ্যা শুনলাম তোমার নেত্রী অনেকটাই সুস্থ ওরে নিয়া আসো ওর মন ভালো হবে।”

মেহবিন এদের কাউকেই বোঝাতে পারছে না। তাজেলের অবস্থা এই অবস্থায় জার্নি করাটা কতোটা রিস্ক। তাছাড়া ও বাচ্চা এতো লোড নিতে পারবে না। ও বোঝালো ও যেতে পারবে না। মুখর যেন চলে যায় একটা সময় পর দিল এক ঝাড়ি এতে কাজ হলো। দাদিও মেনে নিল তারপর মুখরকে বলল সেও বাধ্য ছেলের মতো মেনে নিল। এতে মেহবিন একটু খুশিই হলো। সেদিনের পরদিনই আছিয়া খাতুন ফোনে মাফ চেয়ে নিয়েছেন। মেহবিন ওনার অবস্থা বুঝতে পেরে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ওর কথা বলা শেষ হলেই ও দেখতে পেল তাজেলের মা এসেছে। এই চারদিন পর আজ এলো তাজেলের মা। ওনাকে দেখে মেহবিন এগিয়ে গেল। ওকে দেখে তাজেলের মা বলল,,

“তাজেল কি করে ?’

“ও ঘুমিয়েছে পরেছে। কেন কিছু বলবেন ওকে? খবরদার যদি ওকে কিছু উল্টাপাল্টা বলার চেষ্টা করেন তাহলে সেখানেই আপনার মুখ আমি সেলাই করে দেব।”

তাজেলের মা বলল,,

“না ওরে একটু দেখতে আইছিলাম। কিছু কমুনা। আসলে কার মউত কেমনে হেইডা তো আমরা জানি না। তয় মরতে হইবো এইডা সবাই জানি তহন রাগে দুঃখে ভবিষ্যতের চিন্তায় ঐসব কইছি এর জন্য আমারে মাফ কইরা দিও। এহন তো চিন্তা নাই।”

“মানে?”

****
তাজেলের মায়ের পরবর্তী কথায় মেহবিনের মুখে হাঁসি না ফুটলেও বুক থেকে পাথর টা নেমে গেল। ও শুধু বলল,,

“তাজেলের দায়িত্ব আমার ওর দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে না। এমনিতেও আপনি ঠিক ভাবে ওর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যান নেত্রী ভেতরেই আছে দেখে আসুন।”

_______________

ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। এমন সময় একটা রুমে মেহবিন ও তার পার্টনার ঢুকলো। সাতদিন হয়ে গেছে সেদিনের পর। আলভি আর মাইশার ও বিয়ে হয়েছে মেহবিন কে ছাড়া। মেহবিনের কথায় মেহরব চৌধুরী ও কিছু বলতে পারেনি। মেহবিন ও ওর পার্টনার দু’জনের মুখেই মাস্ক আর গায়ে হুডি। মেহবিন আয়েশ করে ওর নিজের চেয়ারে বসলো। তার পাশের চেয়ারে পার্টনার বসলো। মেহবিন সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে হাসলো। সামনের মানুষটার শরীরে খুব একটা শক্তি আছে বলে মনে হচ্ছে না। না শরীরে মারের দাগ নেই তবুও লাল। মেহবিন কাউকে ইশারা করতেই এক বালটি পানি তার গায়ে পড়লো।সে ধরফরিরে উঠলো। তারপর মেহবিনের দিকে তাকাতেই মেহবিন হাত নাড়িয়ে বলল,,

“হাই নিশাচর কেমন আছেন আপনি? তাহলে বলুন নতুন অভিজ্ঞতা কেমন আপনার?”

লোকটা মেহবিনের দিকে তাকিয়ে কিটকিটিয়ে হেঁসে উঠল আর বলল,,

“নিশাচর কে ধরা এতোই সহজ নাকি?”

মেহবিন হেঁসে বলল,,

“সহজ নয় বুঝি? এই কে আছো পর্দাটা সরাও দেখি।”

মেহবিনের কথায় পর্দা সরানো হলো। আর পর্দা সরাতেই লোকটা চমকে উঠলো। পর্দার পেছনে যে ছিল তার অবস্থা উনার থেকেও খারাপ। মেহবিন হেঁসে বলল,,

“তো এখন বল সোজা নয় নাকি? নিশাচর নাম্বার এক নাকি দুই। আচ্ছা শেখ আমজাদ বলুন তো আপনি মাথা নাকি সে। নাকি দু’জনেই একমাথা ।”

“মেহবিন!”

“আমার চেহারা টা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি। আচ্ছা দাঁড়ান দেখাচ্ছি। ”

বলেই মেহবিন মাস্ক খুলে ফেললো। আর বলল,,

“পাশের জনের ঘুম ভাঙাও অনেক হিসাব নিকাশ বাকি আছে।”

মেহবিনের কথায় তাকেও এক বালটি পানি মারা হলো। তবে তার আগে শেখ আমজাদ কে পর্দা দিয়ে আড়াল করা হলো। আর বলা হলো চুপ থাকতে নাহলে ওকে এখনি মেরে দেবে। তিনি আর আওয়াজ করলো না। লোকটা পানির ঝাপটায় ধরফরিরে উঠলো মেহবিনের দিকে তাকালো। মেহবিন আগেরবারের মতো এইবার ও হাত নাড়িয়ে বলল,,

“হাই নিশাচর কেমন আছেন আপনি? তাহলে বলুন নতুন অভিজ্ঞতা কেমন আপনার?”

মেহবিনের কথায় তিনিও হেঁসে উঠল আর বলল,,

‘নিশাচর কে ধরা এতোই সহজ নাকি?”

মেহবিন হেঁসে বলল,,

“আমি বুঝলাম না। দু’জনের একই আচরনের মানে কি? পার্টনার আপনি কিছু বুঝতে পারছেন?”

‘বুঝতে তো পারছি পার্টনার তবে এরা বুঝতে চাইছে এরা ধরা পরে গেছে। এই পর্দা সরাও দুজন দুজনের মুখোমুখি হোক।”

পর্দা সরানো হলো। দুজন দুজনের দিকে তাকালো তখন মেহবিন বলল,,

“তো আরিফ জামান এবার বলুন সহজ না নাকি।”এবার আবার বইলেন না আপনাদের মধ্যে কেউ নিশাচর না তাহলে কিন্তু মাথা গরম হয়ে যাবে আমার।”

দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“না, না আমরা কেউ নিশাচর না। নিশাচর তো শেখ শাহনাওয়াজ। সেই আমাদের দিয়ে কাজ করায় !”

এবার মনে হলো মেহবিনকে কেউ জোকস্ শুনিয়ে দিয়েছে। মেহবিন হাসতে লাগলো পাগলের মতো। মেহবিনের হাঁসি দেখে দু’জনেই ভয় পেল‌। মেহবিন বলল,,

“জোকস্ অফ দা ইয়ার তাইনা পার্টনার!”

“ঠিক বলেছেন পার্টনার।”

তখন আরিফ জামান বললেন,,

“জোকস্ হলেও এটাই সত্যি। তাহলে বলো সব জেনেও কেন তোমায় খুঁজলো না।

“হ্যা হ্যা সত্যিই তো শেখ শাহনাওয়াজই তো নিশাচর। ”

“তুমি আমাদের বিশ্বাস করো না।”

“না! যাই হোক আসল কথায় আসি। তো দু’জনে বলে ফেলুন তো আপনাদের মধ্যে নিশাচর কে? না দুজনে মিলেই একজন নিশাচর। একজন ডক্টর অপরজন বিজনেসম্যান দু’জনের মাথা যখন একসাথে তখন তো লাভ হতেই হবে তাইনা। তবে আমি বুঝতে পারলাম না দুজনেই একসাথে কেন আমায় মিথ্যে বললেন। তারমানে দুজনের মাথা তো একইভাবে চলে তাই একইরকম উত্তর। ”

মেহবিনের কঠোর কথায় দুজনেই দমে গেল। তারা কিছু বলছে না তখন মেহবিন ইশারা করলো আর সাথে সাথে তাদের শরীরে কারেন্ট লাগলো। এমনিতেই একয়েকদিনে কারেন্ট খেতে খেতে অবস্থা লাল। নাম শুনলেই ভয় পায়। হয়তো ফোবিয়াও তৈরি হয়েছে। কারেন্ট পেতেই দুজনে চিৎকার করে উঠল,,

“বলছি! বলছি!”

অতঃপর

~চলবে,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ