Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"এক সমুদ্র প্রেমএক সমুদ্র প্রেম পর্ব-১৮+১৯

এক সমুদ্র প্রেম পর্ব-১৮+১৯

#এক_সমুদ্র_প্রেম!
লেখনীতে: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
(১৮)

পিউয়ের মনে বৃষ্টি নেমেছে। খড়খড়ে মরুভূমিতে ঝুমঝুম শব্দের বারিপাত,উথাল-পাতাল করে দিচ্ছে ভেতরটা। প্রশান্তির হাওয়া বারেবার ছুঁচ্ছে কোমল,স্নিগ্ধ মুখমন্ডল। লজ্জ্বায় হাতদুটো জায়গা পাচ্ছে বক্ষে। হৃদস্পন্দন হচ্ছে কয়েকশ গুন বেশি৷ ধূসর ভাইয়ের এই আচরন তার কাঙ্ক্ষিত, তবে অপ্রত্যাশিত। কল্পনাও করেনি মানুষটা এমন করবে! আজ আর কোনও দ্বিধা নেই তার। সব সন্দেহ,সমস্ত অনুমান এখন বিশ্বাসে রুপ নিয়েছে। ধূসর ভাই সত্যিই তাকে ভালোবাসেন। ভালো না বাসলে কেন চুড়ি কিনবেন? সে যে গাড়িতে বসে বলেছিল চুড়ি কেনা হয়নি,কেনই বা মনে রাখবেন সে কথা? কেনই বা পরাবেন নিজ হাতে৷ আর ওই চাউনি? ওই তাকানোর ধরন? সে কেবল এক প্রেমিক পুরুষের।

পিউ লজ্জ্বা লজ্জ্বা নিয়ে ফের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। বুকটা তখনও কাঁ*পছে। বর্ষাকে হলুদ লাগানো শেষ হয়নি, চলছে। আত্মীয় স্বজনের প্রত্যেকে আঙুলে নিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে ওর শ্যামলা গালদুটো। পিউ আশেপাশে তাকাল। ধূসর ও এসে দাঁড়িয়েছে কেবল। ওকে দেখতেই দুরুদুরু কম্পন গাঢ় হলো তার। পিউ মাথা নামায়। ক্ষনে ক্ষনে আড়চোখে তাকায়,লাজুক লাজুক হাসে। আচমকা ধূসর ডেকে ওঠে,
” এদিকে আয়।”
পিউয়ের বুক ছ্যা*ত করে উঠল তার গম্ভীর স্বরে। ওকেই ডাকল কী? সে বিভ্রান্তি সমেত নিজের দিক আঙুল তাক করে শুধাল ‘ আমি?’
‘ হু’।
পিউ চারপাশ দেখে এগিয়ে যায়। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ধূসর প্রশ্ন করল,
” হাসছিলি কেন?”
পিউ না বোঝার ভাণ করে বলল ” কই?”
” চুপচাপ গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি। এদিকে তাকাতে যেন না দেখি।”
পিউয়ের মুখ চুপসে এলো। একটু আগে কী সুন্দর করে চুড়ি পরানো,কুঁচির ভাঁজ ঠিক করে দেয়া মানুষটা আচমকা ঘোল পালটে ফেলায় তাজ্জব হলো। বলল না কিছু। ফিরে এসে মন খারা*প করে দাঁড়িয়ে থাকল।

বর্ষার নানী আর তার বয়সী কয়েকজন গীত ধরেছেন। বর্ষা আর লাগাতে চাইছেনা৷ সমস্ত চেহারা ভরে গেছে। কয়েকজন শয়তানি করে পুরো মুখ মেখে দিয়েছে। তার মধ্যে শীতের দিন,জলের ফোঁটাতেও উঠছে কাঁ*পুনি। তার কথা শুনলেও কেউ মানলো না। সে যতবার মুচড়ে উঠছে, ময়মুনা খাতুন ততবার বলছেন,
‘ আরেকটু বোস,হলুদ যত লাগাবি মুখ তত উজ্জল দেখাবে।’

পুষ্প ফোন নিয়ে পিউয়ের কাছে এসে বলল,
” আমাকে কটা ছবি তুলে দিবি?”
” আয়।”
জবা বেগমের পাশেই ও দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষন। চলে এসেছে, খেয়াল করেননি। হঠাৎ পাশে না দেখেই এদিক ওদিক চাইলেন তিনি। একটু দূরে সাদিফ কে দেখা গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৈত্রীর ছবি তুলছে। জবা বেগমের কপালে ভাঁজ পরে। তিনি উদ্বীগ্ন চোখে পুষ্পকে খুঁজলেন,পেয়েও গেলেন। তার ছবি তুলছে পিউ। জবা বেগমের রা*গ হলো। হনহনিয়ে হেঁটে এলেন । কথা বার্তা না বলেই সাদিফের হাত টেনে হাঁটা ধরলেন। ভঁড়কালো সে,হতভম্ব হলো মৈত্রী। সাদিফ ভীষণ কৌতুহলে হাবুডু*বু খেল। উদগ্রীব হয়ে শুধাল,
” কী হয়েছে মা?”
জবা বেগম নিশ্চুপ। একদম পুষ্পদের ওখানটায় এসে থামলেন। দুজন কাজ থামিয়ে তাকাল। তিনি খেঁকিয়ে ছেলেকে বললেন,
‘ তোর গলায় এত বড় একটা ক্যামেরা থাকতে পুষ্পটা ফোনে ছবি ওঠাবে কেন? তুই থাকতে পিউই বা কেন ছবি তুলে দেবে? ওদের ছবি না তুলে তুই অন্য মেয়ের ছবি তুলছিস? ”

কথা শুনে মনে হলো ভয়া*বহ অপ*রাধ করে ফেলেছে। সাদিফ তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে। পুষ্পর মাথার ওপর দিয়ে গেলেও পিউয়ের ভ্রঁরু টানটান হয়। সে যে জানে সব। নিজেও তাল মিলিয়ে বলল,
” তাইতো। দেখেছো সেজো মা,সাদিফ ভাইয়া কী ফাঁকিবাজ? বিয়ে বাড়িতে সুন্দর মেয়ে দেখে তাদের পিছু নেয় ছবি তুলবে বলে। আর আমরা বুঝি বানের জলে ভেসে এলাম?”
সাদিফ ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকায়। কী বিচ্ছু! কী বিচ্ছু!
এই মেয়েই তো তাকে ফাঁ*সিয়ে দিয়ে এলো তখন। সেই যে ছবি তুলতে নিয়েছে, মৈত্রী মেয়েটার না নেই। তুলতেই বলছে, তুলতেই বলছে। একটু ক্লান্তিও আসেনা। সেও মুখের ওপর মানা করতে পারছিল না বিধায়…..
অথচ দেখো,পিউটা ঠিকই রুপ পালটে নিলো। সাদিফ তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাতেই পিউ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
” দেখো সেজো মা দেখো,সত্যি কথা বলছি বলে কেমন করে তাকাচ্ছে দেখো।”
জবা বেগম চোখ রা*ঙিয়ে বললেন,
” সাদিফ, একদম ওর দিকে ওভাবে তাকাবিনা বলে দিলাম।”

সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
” আচ্ছা, তাকালাম না। এখন বলো, কী করতে হবে?”
” কী আবার,পুষ্পর ছবি তুলে দে। ”
” দিচ্ছি। এই সোজা হয়ে দাঁড়া।”
এত সবের মাঝে এতক্ষন বোকার মত চেয়েছিল পুষ্প। সাদিফের কথায় নড়েচড়ে উঠল। আস্তে করে জানাল,
” ভাইয়া,দরকার হতনা। তোমার কাজ থাকলে….”
” দরকার নেই মানে? অবশ্যই দরকার আছে। ও ক্যামেরা ঢাকা থেকে টেনে এনেছে কেন,যদি কাজেই না লাগে! ”

সাদিফ অতিষ্ঠ ভঙিতে দুদিকে মাথা নাড়ল। ক্যামেরা তুলে বাম চোখে ঠেকাল। পুষ্পও উপায় না পেয়ে সজাগ হয়ে দাঁড়ায়।
জবা বেগম বিজয়ী হাসলেন। পিউকে বললেন,
‘ চল পিউ আমরা ওদিকে যাই।’
পিউ হাত আঁকড়ে মাথা দুলিয়ে বলল ‘ চলো।’

” সেজো মা হঠাৎ তোমার ওপর ক্ষে*পলো কেন ভাইয়া? ”
সাদিফ কাঁধ উঁচু করে বলল ‘ কী জানি ?”
বিড়বিড় করল
” ক্যামেরা আনাই ভুল। যার ছবি তুলতে চাই,সে বাদে দুনিয়ার সব এসে সিরিয়াল দিচ্ছে।”

****
ধূসরের একটা অদ্ভূত ক্ষমতা আছে। যেখানে যায়,যোয়ান যোয়ান ছেলেরা ফ্যান হয়ে যায় তার। ব্যাক্তিত্বে নেতা নেতা ভাবটা ফুটে ওঠে বলেই সবাই পিছু পিছু হাঁটে। গতকাল বিকেলে ধূসর গ্রামের বাজারে গেছিল। টঙয়ে বসে আলাপ হয়েছে কয়েকজনের সাথে। নিজের পকেটের টাকা খরচা করে চাও খাইয়েছে তাদের। মুহুর্তে ছেলেগুলো তার ভক্ত হয়ে গেল। দুদিনেই চ্যালাপেলা জুটিয়ে নিয়েছে সে। যেদিক যাচ্ছে তারাও সাথে সাথে হাঁটছে। মাত্র এসে দাঁড়াল,ওমনি তিনজন ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল। গিজগিজে মানুষে শীতকালেও ঘামছিল ধূসর। সেই ক্ষনে তুহিন হাতে করে কোক বয়ে আনে। ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
” নিন ভাই,খান। ভালো লাগবে।”
” থ্যাংক্স।”
ধূসর মুচকি হেসে বোতল হাতে নেয়। চুমুক বসায়। ঘুরেফিরে তাকায় পিউয়ের পানে।
বর্ষাকে হলুদ লাগানোর ইচ্ছে জেগেছে তার। কুলোয় রাখা বাটি থেকে হলুদ তুলে স্টেজের দিক পা ফেলতেই মিনা বেগম টেনে ধরলেন। পিউ ভ*য় পেয়ে থেমে গেল।
‘ কোথায় যাচ্ছিস?’
‘ আপুকে হলুদ মাখাব।’
‘ না। দূরে থাক,আর ওকে গোসল করানোর সময় যে পানি গড়িয়ে যাবে সেটাতেও পা ছোঁয়াবি না বলে দিলাম। ‘
পিউ অবাক হয়ে বলল,
‘ ওমা,কেন? ‘
‘ অবিবাহিত মেয়েরা এসব গায়ে লাগানো ঠিক নয়। যা দূরে গিয়ে দাঁড়া। ”
পিউ নাক কুঁচকে বলল,
‘ এহহ,যতসব কুসংস্কার। ‘
মিনা বেগম রে*গে গেলেন,ক্ষে*পে বললেন,
‘ এক চ*ড় মারব। যা বলেছি তাই হবে। যা সর এখান থেকে।”

শান্তা পাশেই ছিল। কথাটায় ফিক করে হেসে উঠল। পিউ ক*ষ্ট পেল। এত মানুষ জনের মধ্যে ধ*মক, তার ওপর শান্তার হাসি, দুটোই সন্মানে লাগল খুব। অভিমান করল মায়ের ওপর । বাড়ির সবাই তাকে ব*কে,মা, আপু,ধূসর ভাই,সাদিফ ভাই। হুহু করে কা*ন্না পেল। চোখ চিকচিক করে উঠল। হাত পা ছু*ড়ে উঠোনের একদম শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। নাক পিটপিট করতেই শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নিল।

ধূসর বাবুর্চিখানার ওখানে গেছিল। ফিরে এসে স্টেজের কাছে পিউকে দেখল না। চোখ ঘুরিয়ে খুঁজল সে। না পেয়ে এগিয়ে আসে। আশেপাশে তাকায়। কল দেবে ভেবে পকেটে হাত দেয়। হঠাৎ চোখ যায় উঠোনের কোনায়। একা দাঁড়িয়ে মেয়েটা। ধূসর কপাল গুঁছিয়ে এগিয়ে যায়।

‘কী করছিস এখানে?”
পিউ নাক টেনে তাকাল। ধূসরকে দেখে অভিমান গাঢ় হলো তার । চোখ ভরে উঠল,রীতিমতো গড়িয়ে পরল গাল বেঁয়ে। ধূসর উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধাল,
” কাঁ*দছিস কেন?”
পিউ নিমিষেই জ্ব*লে উঠে বলল,
” সব আপনার জন্যে হয়েছে ধূসর ভাই। আপনিই সব কিছুর জন্যে দ্বায়ী।’

ধূসর তাজ্জব হয়ে বলল ‘ আমি কী করলাম?’
‘ আপনার জন্যেইত এখনও বিয়েটা হচ্ছেনা। বর্ষাপুকে হলুদ লাগাতেও পারিনি। কী হতো যদি আমায়…..”

বলতে বলতে থেমে গেল পিউ। সম্বিৎ ফিরল তার। জ্বিভ কে*টে চোখ খিঁচে ফেলল। নিভু নিভু চাউনিতে ধূসরের দিক তাকালো। অথচ সে অভিব্যক্তিহীন। শুধু বলল,
” আয়। ”
আরো একবার আঁকড়ে ধরল তার তুলতুলে হাত। হাঁটা ধরল সম্মুখে। পিউ টুকটুক করে পাতা ফেলল চোখের। ধূসর তাকে সহ এসে দাঁড়াল স্টেজের কাছটায়। সোজাসুজি বর্ষাকেই বলল
‘ বর্ষা,পিউ তোমাকে হলুদ মাখাতে চাইছে।’
বর্ষা গাল ভরে হেসে বলল
” তাই? আয় পিউ,আমিতো সেই কখন থেকে খুঁজছিলাম তোদের।’

পিউ ভ*য়ে ভ*য়ে মায়ের দিক তাকায়। মিনা বেগম বলতে গেলেন,
‘ ধূসর,এসব অবিবাহিতা মেয়েদের লাগাতে নেই।’
কথাটায় তাল মেলালেন গ্রামের আরো কজন রমনী। বর্ষার নানিও ছিলেন সাথে। ধূসর এক কথায় বলে দিলো,
” এগুলো কুসংস্কার বড় মা। তুমিতো সবার থেকে আলাদা বলেই তোমাকে ভালোবাসি আমি। তোমার মুখে এসব মানায়?”

মুখ বন্ধ হয়ে গেল ভদ্রমহিলার। উত্তরই করতে পারলেন না। ধূসর পিউকে ইশারা করল ‘ যা।’

সে খুশি হয়ে গেল। ঝলমলাল তারার ন্যায়। উজ্জ্বল পায়ে স্টেজে উঠল। দুহাত ভরে হলুদ তুলে বর্ষার দুইগালে মাখাল। তার উপচে পরা হাসি, চকচকে চেহারা দেখে আরেকদিক চেয়ে শ্বাস টানল ধূসর। পরপর মৃদূ হেসে ফিরে এলো।

শান্তার হাতে ফোন। ভিডিও ক্যামেরা অন সেখানে। ধূসর যেদিক যাচ্ছে বন্দি করছে তাকে। বিষয় টা অনেকক্ষন যাবত লক্ষ্য করছে ধূসর। ছোট মানুষ বলে কিছু বলেনি। বি*রক্ত লাগলে জায়গা পাল্টাচ্ছে। কিন্তু না,মেয়েতো পেছন ছাড়ছে না। শেষমেষ অসহ্য হয়ে উঠল সে।

আকষ্মিক ধূসর মুখের সামনে এসে দাঁড়াতেই হকচকিয়ে গেল শান্তা। তড়িঘড়ি করে ফোন নামাল। ধূসর বুকের সাথে দু হাত ভাঁজ করে দাঁড়ায়। ভণিতা ছাড়াই ভ্রুঁ নাঁচিয়ে শুধায়,
” বয়স কত তোমার? কোন ক্লাসে পড়ছো?”
শান্তা নুইয়ে গেল। ভী*ত নজরে চারপাশে তাকাল। নীচু কণ্ঠে জানাল,
” এস এস সি দিয়েছি।”
” গুড। আমার বয়স জানো?”
শান্তা চোখ তোলে। ধূসর বলল,
” তোমার থেকে গুনে গুনে বারো বছরের বড় আমি। আই মিন এক যুগ। ছোট মানুষ,তাই ঠান্ডা মাথায় বলছি,সময় আছে, শুধরে যাও।”

বলে দিয়ে চলে গেল সে। শান্তা মন খা*রাপ সমেত চেয়ে দেখল। পরপর বিড়বিড় করল,
” বয়স কোনও ব্যাপারই না।”

****
অনেক হলো হলুদ মাখামাখি। এবার নাঁচানাঁচির পালা। স্টেজ ঘিরে সবাই হৈহৈ করে উঠল। বর্ষার জ্ঞাতিগোষ্ঠীতে যত মেয়ে -ছেলে আছে সবাই নাঁচবে বলে প্রস্তুত। সাউন্ডসিস্টেমের বাংলা গান বদলে ধরা হলো হিন্দি জমকালো বিয়ের গান। যে যেই গানে প্র‍্যাক্টিস করেছে সেটাতেই পারফর্ম করবে।
একটা জায়গাকে গোল করে ঘিরে আশেপাশে প্লাস্টিকের চেয়ার পাতানো হলো। পিউ আগেভাগে একটা দখল করে বসল। পরে জায়গা না পেলে?
নাঁচতে উঠল মৈত্রী। ছাম্মা ছাম্মা গানে নাঁচবে সে। গান শুরুর সাথে সাথে পিউ উৎফুল্ল হলো। হাত তালি দিয়ে দিয়ে লিরিক্স মিলিয়ে ঠোঁট নেড়ে গাইছে সে।

হঠাৎ চোখ গেল মুখোমুখি উল্টোপাশের চেয়ারটায়। ধূসর তার দিক চেয়ে চেয়ে বসল কেবল। পাশের চেয়ারে সাদিফ বসে। ক্যামেরা উঁচিয়ে ভিডিও করছে। ধূসরকে দেখতেই পিউ ঠিকঠাক করে বসল। লাফ-ঝাঁপ বাদ দিয়ে শান্ত হলো। হাত দুটো এনে রাখল কোলের ওপর। মৈত্রীর নাঁচ থেকে চোখ এনে একবার আলগোছে ধূসরের দিক ফিরল। ওমনি চোখাচোখি হয়। ধূসরের সম্মোহনী চাউনী তাকে এফোড় ওফোড় করে প্রস্থান নেয়। আজ একটু বেশিই তাকিয়ে থাকছেনা মানুষটা? কী এত দেখছেন উনি?

এরপরে নাঁচতে এলো শান্তা। ‘পারাম সুন্দরি’ গানে নাঁচবে সে। আসার আগে সুপ্তির হাতে ফোন ধরিয়ে দিলো। সাথে বলে এলো, ‘প্রথম থেকে ভিডিও করবি।’ মেয়েটা না বসে ওভাবেই ফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
গানটা দু স্টেপ ঠিকঠাক চলল। তারপরপরপই বেজে উঠলো ‘কালা চাশমা ‘গানটা। সাথে ভীর করে শান্তার প্রতিবেশি বন্ধুরা। এটা আগে থেকেই পরিকল্পিত তাদের। প্র‍্যাকটিসও করেছে কয়েকদিন। নাঁচের এক ফাঁকে শান্তা টেনে নিলো বর্ষাকে। গুরুজনরা মানা করলেন। গ্রামের বিয়েতে বউ নাঁচে না কী? কিন্তু বর্ষা শুনলে তো? সে যে এতক্ষন নাঁচ-গান দেখেও চুপচাপ বসতে পেরেছে এই ঢেড় । এক কথায় লাফিয়ে নাঁচতে চলে আসে। বর্ষা আবার টেনে আনল পুষ্পকে। দুজন একই বয়সের কী না। মিল ও খুব। সবাইকে দেখে ফোন চেয়ারের ওপর ফেলে সুপ্তিও ছুটল। ভিড়ল মৈত্রীরাও। পুষ্প এসে পিউকে ধরে। সে বিনাবাক্যে উঠে যায়। তাল মেলায়। আস্তে আস্তে ছেলেরাও যোগ দিলো। মুহুর্তমধ্যে জায়গাটায় হৈ-হুল্লোড় বেঁধে গেল। নাঁচের সাথে গলা ফাঁ*টিয়ে গাইছে তারা। পিউ নিজের সুবিধায় শাড়ির আঁচল কোমড়ে পেঁচালো।
মৈত্রী এসে সাদিফকে অনুরোধ করল নাঁচার জন্যে। সাদিফ এবারেও মুখের ওপর না করতে পারল না। যোগ হলো সেও।

আনন্দে হল্লাহল্লি অবস্থা প্রায়। আচমকা পিউয়ের শাড়ি ভেদ করে পেটে চি*মটি কা*টল কেউ। চমকে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটা। আ*তঙ্কিত হয়ে সবাইকে দেখল। প্রত্যেকেই ব্যস্ত নাঁচতে। কে করল তাহলে? পিউ জটলা থেকে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে এলো । এপাশে এসে শাড়ি উঁচিয়ে জায়গাটা দেখল। চি*মটি কা*টেনি, যেন মাংস খা*বলে নেয়ার ফঁন্দি করেছিল। নখের দাগ বসেছে স্পষ্ট। জীবনে প্রথম বার এমন পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে শরীর রি রি করে উঠল তার। রা*গে,দুঃ*খে কা*ন্না উগলে এলো।

আর নাঁচবেনা। বসে থাকবে চুপ করে। পিউ চেয়ারের দিক এগোতে নিলেই আচমকা ভীষণ জোরে হাত চে*পে ধরল কেউ একজন। পিউ ভড়কে তাকায়। শক্ত চিবুক,ক্ষু*ব্ধ চোখে তাকিয়ে ধূসর। চেহারা দেখে পিউ ঘাব*ড়ে যায়, ভ*য় পায়।
একটা কথাও বলল না সে। হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। পিউ হুম*ড়ি খেয়ে পরতে পরতেও বেঁচে যায়। ধূসর হির*হির করে টানতে টানতে নিচ্ছে। একদম
বর্ষার ঘরটায় এসে কদম থামল। হাত ছাড়ার নামে,ছু*ড়ে মারল তাকে। পিউ হো*চট খেতে খেতেও খেলোনা।
” শাড়ি সামলে রাখতে বলেছিলাম না তোকে?”
তপ্ত,ভারী স্বরে পিউ ঢোক গেলে। সাফাই দেয়ার ভঙিতে বলতে যায়…
” ধূসর ভা…. ”
পথিমধ্যে থামিয়ে দিলো ধূসর। দুঃসহ, হাড় হিম স্বরে বলল,
” আমার রা*গ নিয়ন্ত্রনে থাকার মধ্যেই চেঞ্জ করে আসবি পিউ। নাহলে কথা দিতে পারছিনা তোকে কী করব।”

চলবে,

#এক_সমুদ্র_প্রেম!
লেখনীতে: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
(১৯)
শীতল হুম*কিতে পিউয়ের নেত্র পল্লব কেঁ*পে ওঠে। সমস্ত দেহ ঠান্ডায় আঁটশাঁট। ধূসরের তীক্ষ্ণ,ধাঁ*রালো চাউনি হৃদয় নাড়িয়ে দেয়।
ধূসর রুমের চারকোনায় চোখ বোলায়। খুঁজছে কিছু। পরপর এগিয়ে যায় নাক বরাবর। দাঁড় করানো লাগেজটা হাতে তোলে। পিউ ভীত নজরে দেখছে সব। কী করবেন ধূসর ভাই? ওর জামা পরবে না কী?

ধূসর লাগেজ এনে বিছানায় রাখল। টেনে,ঘুরিয়ে চেইন খুলল। বেরিয়ে এলো পিউয়ের সমস্ত জামাকাপড়। ধূসর একটা একটা করে কাপড় বাছল। শেষে পছন্দমতো জলপাই রঙের স্কার্ট সেট, আর ওড়না হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ঘুরে তাকায় পিউয়ের দিক। এগিয়ে যায়। পিউয়ের বুকের কাছে জড়োসড়ো হাতদুটো টেনে সামনে এনে কাপড়গুলো ধরিয়ে দেয়। শান্ত কণ্ঠে তর্জন দেয়,
” সময় পাঁচ মিনিট, চেঞ্জ করবি না দাঁড়িয়ে থাকবি ঠিক কর।”

পিউয়ের সাধ্য নেই দাঁড়িয়ে থাকার। ধূসর বিরতি নিতে না নিতেই ত্রস্ত পায়ে ছুটল সে। তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমে ঢুকল।
দরজার ছিটকিনি তুলে পিঠ ঠেকাল । বুকে হাত দিয়ে শ্বাস ফেলল। দুহাতে চে*পে রাখা কাপড় গুলো একবার দেখে আয়নার দিক তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে নুইয়ে গেল লাজুকলতার ন্যায়। মুচকি হেসে মাথা নামাল।
ধূসর ভাইয়ের এই অধিকার বোধ, এই পজেসিভ নেস তোলপাড় চালায় বক্ষে। মানুষটার প্রতিটা কাজ বুঝিয়ে দেয়,কী অপরিমেয় ভালোবাসায় সিক্ত করছে তাকে। ‘ধূসর ভাই ভালোবাসেন আমায়’ শব্দটা কয়েকবার আওড়ালো পিউ। আজ প্রতিটা পদক্ষেপেই ধূসর বুঝিয়ে দিচ্ছেনা এটা? পিউয়ের বুক কাঁপ*ছে লজ্জ্বায়।
আচমকা মনে পড়ল ধূসরের বেঁ*ধে দেয়া সময়। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে চেঞ্জ করে সামনে যাওয়ার কথা! পিউয়ের ডগমগ ভাব ঢাকা পরে। তাড়াহুড়ো করে শাড়ির পিন ছোটাতে যায়। কিন্তু এখানেও যেন বিপত্তি। আঁচল ঘুরিয়ে একটা পিন পেছনে ব্লাউজের সাথেও মে*রেছিল। পরার সময় সহজে আটকাতে পেরেছিল,অথচ এখন খুলছেনা। পিউ চেষ্টা করল,অনেকক্ষন টানাটানি করল,কিন্তু ছোটাতেই পারল না। উলটে সূচালো মাথাটা বিঁ*ধে গেল আঙুলে। চট করে হাত ফিরিয়ে,আঙুল জ্বিভে ভেজাল সে। শীতের একটু ব্য*থা ভয়*ঙ্কর। পিউ ব্যর্থ হয়ে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ করে। কী করবে এখন? হঠাৎ মাথায় আসে ধূসরের কথা। মানুষটাতো বাইরেই দাঁড়িয়ে। ডেকে বলবে একবার? পরমুহূর্তে ঘনঘন মাথা নাড়ে। কী লজ্জ্বার ব্যপার এটা! পিউ আবার চেষ্টা করল। সেফটিপিনের মাথাটা নাগালে পেলেও ফস্কে যাচ্ছে। অধৈর্য হয়ে উঠল শেষমেষ। হাত মুচ*ড়ে পিঠের কাছে নিতে নিতেও ব্য*থা হয়ে যাচ্ছে। আর উপায় নেই। পিউ শ্বাস ফেলে দরজার ছিটকিনি টেনে সরায়। হাল্কা মাথা বের করে উঁকি দেয় বাইরে। ধূসর পায়ের ওপর পা তুলে বিছানায় বসে। সুনিপুণ মনোযোগ ফোনের স্ক্রিনে। পিউ ঠোঁট কা*মড়ে ভাবল। ডাকবে,না কী ডাকবেনা। বহুক্ষনের ইতস্ততা কা*টিয়ে ডেকে উঠল,
” ধূসর ভাই!”
ধূসর চোখ তোলে। উত্তর পাঠায় ‘হু?’
সে তাকাতেই পিউ কথা গুলিয়ে ফেলল। ওমন ছু*রির ন্যায় চাউনী দেখলে শব্দ বের হয়? জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল,কথা খুঁজল। ধূসর যেন বুঝে নিল তার অস্থিরতা। উঠে,এগিয়ে এলো সে। পিউয়ের হৃদস্পন্দন জোড়াল হয় তার প্রতিটি কদমে। মুখোমুখি দাঁড়ায় ধূসর। জিজ্ঞেস করে
‘ কী হয়েছে?’
পিউ হাত দিয়ে ঘাড় চুল্কায়। তার অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত চেহারা মন দিয়ে দেখল ধূসর। মোলায়েম কন্ঠে শুধাল,
” কিছু লাগবে?”
একটু সাহারা পেল পিউ। বিপ*দে সাহায্য পেতে এত লজ্জ্বা কীসের? তাও যেখানে প্রসঙ্গ তার প্রিয় মানুষটার। সে দ্বিধাদন্দ কা*টিয়ে বলল,
” ব্লাউজের সাথে সেফটিপিন আটকে গিয়েছে,একটু….”

কথা শেষ হয়না,ধূসর এটুকু শুনেই বলল,
‘ দেখি,ঘোর।’
পিউ দরজা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সুস্থির ভঙিতে পিঠ ফেরায় তার দিকে। পরপর স্পর্শ পায় একটি হিম শীতল হাতের। ধূসর আলগোছে পিঠ থেকে চুল সরিয়ে কাঁধে রাখল। উন্মুক্ত হলো পিউয়ের ফর্সা- মসৃন পৃষ্ঠ। খুব দ্রুত চোখ ফেরায় সে। পিনের ভেতর পেঁচিয়ে যাওয়া শাড়ির ভাঁজে নজর দিতে চায়। কিন্তু না,ঘুরেফিরে দৃষ্টি ফিরে আসে, পিউয়ের পিঠের ওপর। খোলা পিঠ ধূসরের অন্তঃস্থলে শিহরন তোলে । গলা শুকিয়ে হয় কাঠ। ঢোক গেলে সে। বক্ষস্পন্দন বাড়তে বাড়তে পাহাড় ছোঁয়। সংযম,জগত,সম্পর্ক সব ভুলিয়ে ভ্রান্ত করে মস্তিষ্ক। অশান্ত,অস্থির ঢেউ আ*ছড়ে পরে ভেতরে। স্মৃতি থেকে ইহজগত মুছে ধূসর খেই হারাল। টুপ করে ঠোঁট ছোঁয়াল সেখানে৷ প্রথম বারের মত এক গভীর, খাদহীন,চুঁমু আঁকল পিউয়ের শরীরে। ওমনি পিউয়ের শরীর ঝাঁকুনি দিলো। । থরথরিয়ে কাঁ*পল হাঁটু দুটো। নিচু চিবুক উঠে এলো। বৃহৎ চোখ ছড়িয়ে গেল বাইরে। কল্পনাতীত ঘটনায় সে কিংকর্তব্যবিমুঢ়! স্তম্ভিত নেত্রে ঘুরতে চাইলে, আটকে দিল ধূসর। ফিরতে দিলো না তার দিকে। শক্ত করে বাহু চেঁপে রাখে। শান্ত হস্তে পিন ছোটায়। তারপর হনহনে কদমে ঘর ছাড়ে।

পায়ের শব্দে স্পষ্ট বুঝল পিউ,ধূসর নেই রুমে। তবুও ফিরে দেখার শক্তিটুকু হলোনা তার। বুকটা প্রচন্ড কাঁঁপছে, এইত ধড়াস করে লাফাচ্ছে । যেন ফুলেফেঁপে বেরিয়ে আসবে । পিউ হাত রাখল সেখানে। ওপর থেকে যেন হৃদপিণ্ডটা খা*মচে ধরতে চাইল। শ্বাস আটকে আসছে। লজ্জ্বায়,কুন্ঠায় ডু*বে গেল সে। ধূসর ভাই ছুঁয়েছেন তাকে। এই ছোঁয়া ভালোবাসার,এই ছোঁয়া কাছে আসার। পিউ চোখ বুজে শ্বাস নিলো। ভীষণ দ্রুত বুক ওঠানামা করল। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। দেয়াল ঘেঁষে বসে পরে মেঝেতে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিজেকে আড়াল করে,এই লজ্জ্বা, এই ভালো-লাগার হাঁসফাঁস থেকে।
_____

বর্ষাকে একটা নতুন সুতির শাড়ি পরানো হয়েছে। মাথায় আবার ঘোমটা টানা। কাঁচা হলুদের গন্ধ শরীরে ‘ম’ ‘ম’ করছে এখনও। চেহারাতে ফুটে উঠছে ঈষৎ বউ বউ ভাব। মৈত্রী শাড়ি পালটে গোসল সেড়ে পরিপাটি। থ্রিপিস পরে দ্রুত পায়ে এসে বাবু হয়ে বসল পাটিতে। বর্ষার হাত নিয়ে কোলের ওপর রাখল। বর্ষা গ্যালারি ঘেটে একটা ছবি মেলে ধরল তার সামনে। নম্র কন্ঠে আদেশ করল,
” হুবুহু এরকম ডিজাইন দিয়ে দিবি ওকে? ”
মৈত্রী মাথা ঝাঁকায়। মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনে অবলোকন করে। তারপর হাত লাগায় আঁকতে। মেয়েটার মেহেদী আঁকার হাত দারুন। যে নকশা দেখাবে,একদম কপি পেস্ট করে দেবে চোখ বুজে। জ্ঞাতিগোষ্ঠী যারই বিয়ে হোক,ডাক ওর পরবেই। এমনকি প্রতিবেশিরাও বিনে পয়সায় লুফে নেয় তার প্রতিভা। মৈত্রীর কিন্তু বেশ লাগে এসব। একটুও অনীহা নেই,বিরক্তি নেই।
বর্ষার চারপাশ ঘিরে আন্ডাবাচ্চারা বসেছে। শান্তা,সুপ্তি,পুষ্প সবাই আছে এখানে। দূর থেকে স্কার্টের দু মাথা উঁচু করে ধরে ছুটে এলো পিউ। হুটোপুটি করে বসে পরল পাশে। চঞ্চল কণ্ঠে আবদার করল,
” মৈত্রী আপু,আমাকেও দিয়ে দেবে এরপর?”
মৈত্রী ঝলমলে হেসে জানাল,
” নিশ্চয়ই। ”
কোত্থেকে ক্যামেরা হাতে উড়ে এলো সাদিফ। লেন্স চোখে ঠেকিয়ে বলল
‘ এভ্রিওয়ান স্মাইল প্লিজ!”
সবার দৃষ্টি নিক্ষেপ হয়। মৈত্রী ওমনি গুটিয়ে গেল। দুগালে ছড়াল লাল -লাল আভা। সাদিফ পরপর কতগুলো ক্লিক বসাল ক্যামেরায়। পিউয়ের দিক চোখ পড়তেই ভ্রুঁ গুটিয়ে বলল,
‘ শাড়ি পাল্টালি যে,ভালোই লাগছিল তো।’
পিউ কিছু বলতে নিয়েও থমকায়। পেছনের হৃদস্পর্শী ঘটনাটুকুন মনে করেই লজ্জ্বায় নেতিয়ে পরে মন। আস্তেধীরে জবাব দেয়,
‘ গগরম লাগছিল।’
বর্ষা চোখ কপালে তুলে বলল,
‘ অ্যাহ? তোর গরম লাগছিল? কী বলছিস পিউ,আমার গায়ে যখন কলসির পানি গুলো ঢালছিল মনে তো হচ্ছিল ফ্রিজে ঢুকে গেছি। ‘

মৈত্রীর হাত চলছে না। সাদিফ দাঁড়িয়ে তার পাশেই। আড়চোখে কেবল কোমড় অবধি দেখা যায়। সে ভীষণ রকম চাইছে ওর মুখটা দেখবে। চশমাওয়ালা, ফর্সা লোকটার মুখখানি হৃদয় উত্থলে দেয়। কিন্তু পারেনা। কুন্ঠায় হারিয়ে যায় ইচ্ছে। তার লজ্জ্বা এক ধাপ বাড়াতে সাদিফ বসে পরল পাটির ওপর। মুগ্ধ হয়ে বলল,
‘ বাহ! আপনি আর্টিস্ট তো বেশ!’
মৈত্রীর বুক ধুকপুক করে। অশান্ত,অমত্ত ঝড় বয়। সাদিফের গা থেকে আতরের গন্ধ ভেসে আসছে। কী মধুর সেই ঘ্রান! মৈত্রী কথা বলতে চায়,চাইল ছোট করে ‘ধন্যবাদ’ দিতে। ব্যর্থ সে এবারেও। উফ! কী জাদু করল লোকটা! তাও মাত্র একদিনে?

পিউ আশেপাশে তাকাচ্ছে। গলা উঁচিয়ে উঁচিয়ে দূরেটাও দেখছে। এক কথায় খুঁজছে সে ধূসরকে। বিকেলের ঘটনার পর তার ঘর ছাড়তে ক*ষ্ট হয়েছিল। বের হলেই ধূসর ভাই সামনে পরবেন,কী করে চোখে চোখ মেলাবে তারপর ? সেই চিন্তায় হা- হুতাশ করে পিউ ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কিন্তু তার মতো মেয়ে কী ঘরে থাকার মানুষ? নিচে এত হল্লাহল্লি হচ্ছে সে না গিয়ে থাকবে কী করে? তারওপর ঘি ঢালে সুপ্তি। সেও জামা পাল্টাতে এসেছে। ঘাড়ের কাছে গাউনের লেবেলটা খোঁচাচ্ছিল। আপাতত পালটে শান্তিমতো অন্য কিছু পরবে। পিউকে বাড়িতে দেখেই সে উদ্বেগ নিয়ে বলল,
‘ আরে পিউপু তুমি এখানে কেন? নিচে কত কী হচ্ছে জানো? আম্মু, তোমার ছোট মা সবাই নাঁচছে। যাও যাও। নাহলে সব মিস হয়ে যাবে। ”

পিউয়ের আর ঘরে থাকা হয়না। নাঁচুনে বুড়ি ঢোলে বাড়ি পেলে কী টিকে থাকে? সে ছুট্টে বের হলো তখনি। কিন্তু উঠোনে ধূসর ছিল না। পিউ ক্ষনিকের স্বস্তি পায়। অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা পার হলেও ধূসরের দেখা নেই। পিউয়ের চিন্তা হতে থাকল। এই যে এখনও হচ্ছে। মা, মেজো মা সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু তারা কেউ জানেনা । পিউয়ের ধ্যান কা*টে রিংটোনের শব্দে। পুষ্পর ফোন বাজছে। সে স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে সবার দিকে একবার একবার তাকায়। পিউ চটপট দৃষ্টি আড়াল করে। পুষ্প আলগোছে,নিশব্দে উঠে যায় সেখান থেকে। পিউয়ের সন্দেহ হলো। পুষ্পর হাবভাব অন্যরকম লাগল। আপুর চেহারায় একটা চোর চোর ভাব ফুটেছিল না? কে ফোন করেছে ওকে?
কৌতুহলি সে বসে থাকতে পারেনা। উঠে দাঁড়াতেই সাদিফ প্রশ্ন করে,
‘ কই যাস?’
” আসছি।”
পিউ হাঁটা ধরল। অনুসরন করল পুষ্পকে। সে গিয়ে দাঁড়াল একেবারে বাড়ির শেষ মাথায়। সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজ নেই, লাইটিংয়ের স্পর্শ নেই। তেমন নিরবিলি জায়গায় গিয়ে রিসিভ করল ফোন। মিহি কণ্ঠে বলল,
‘ হ্যাঁ বলো।’
পিউ একদম পেছনে এসে দাঁড়ায়। সজাগ হয়ে কান পাতে। ইদানীং এই পুষ্পকে তার অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা লুকিয়ে চুরিয়ে করছে। আড়িপাতা খারাপ,কিন্তু পিউ ভালোমন্দ ভুলে যাবে। বলা তো যায় না,কেঁচো খু*ড়তে সাপ বের হলে? পুষ্প বলতে গেল
‘ইক….’

এর মধ্যেই ওদিক থেকে ডাক ছুড়ল মৈত্রী,
‘ এই পিউ এসো,এবার তোমাকে লাগিয়ে দেই।’
পিউ ভয় পেল। পুষ্প ঘুরে ওকে দেখলে খবর করে ছাড়বে। আড়িপাতার অপরাধে না জানি কানটাই ছি*ড়ে নেয়। সে ঝটপট দৌড় লাগায়। কথা শোনার দরকার নেই। আগে প্রানে বাঁচুক।

**
‘ কোন ডিজাইন দেবে?’
‘ একটা ছোটখাটো দিয়ে দাও।’
‘ আচ্ছা। নড়াচড়া যাবেনা,তাহলে দিতে পারিনা আমি।’
পিউ মাথা দোলাল, ‘ ঠিক আছে। ‘
মৈত্রী পিউয়ের হাতে মেহেদীর মাথা ছোঁয়াতেই সাদিফ বেগ নিয়ে বলল,
‘ এই এক মিনিট, এক মিনিট… ‘
মৈত্রী তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হয়। পিউ জিজ্ঞেস করল,
‘ কী হলো?’
সাদিফ ক্যামেরা তাক করে বলল,
‘ এবার দিন। ভিডিও করে রাখছি। পরে সময় করে দেখব।’
কথাটা সে নিজের মতো বললেও মৈত্রী অনেক কিছু ভেবে বসে। মৃদূ হেসে চোখ নামায় পিউয়ের হাতের তালুতে।

পিউ গালে হাত দিয়ে বসে। মাঝেমধ্যে আশেপাশে দেখে। ধূসর ভাই এলেন কী না! ততবার মনে পড়ে সেই দৃশ্য। ধূসর প্রথম বার তাকে চুঁমু খেয়েছে। এরপরেও লোকটা ভালোবাসেনা,বোঝার ক্ষমতা নেই কার? একটা অবুঝ শিশুও বুঝবে এসব। পিউয়ের হঠাৎ চোখ পড়ে বর্ষার দিকে। বাম হাত বিছিয়ে বসে সে। কিঞ্চিৎ জায়গা ফাঁকা নেই। তালুর মাঝখানে আবার ‘B-j ‘ লেখা । পিউয়ের ইচ্ছেরা জেগে ওঠে। সেও লিখবে এভাবে। মুখ ফুটে বলতে যেয়েও শান্তা,সাদিফ এদেরকে খেয়াল পরে। ধূসরের নামের প্রথম লেটারটা আনকমন। চৌদ্দগোষ্ঠিতে ডি দিয়ে আর কারোর নাম নেই। এদের সামনে বললে নিঃসন্দেহে বুঝে ফেলবে। যেহেতু তাদের প্রেম এখনও জোড়াল হয়নি,ধূসর তাকে মনের কথা বলেনি, সেও প্রেমিকার রুপ পায়নি, তখন কাউকে কিছু বুঝতে দেয়া বোঁকামো হবেনা? পিউ চুপ করে থাকল। তবে বলে রাখল,
‘ মাঝখানে জায়গা ফাঁকা থাকুক আপু।’
মৈত্রী দিরুক্তি করেনা। মাঝে অল্প জায়গা রেখে আশেপাশে ভরিয়ে ফেলে। শেষ করে জানায়,
‘ হয়ে গেছে। ‘
পিউ হাত ফিরিয়ে উঠে যায়। ও যেতেই ক্যামেরা বন্ধ করে সাদিফ ও চলে গেল। মৈত্রীর মুখটা ঝুপ করে কালো হলো ওমনি। বসে থাকলে কী হতো?

শান্তার দিক চেয়ে বলে,
‘ দে তোকে লাগিয়ে দেই।’
শান্তা মোটা কণ্ঠে বলল ‘ লাগবেনা।’
মৈত্রী ভ্রুঁ গোঁটায়, ‘ কেন? বললিনা লাগাবি।’
শান্তা গাল ফুলিয়ে বলল
‘ আমি আগে বলেছিলাম,তুমি পিউপুকে তাহলে আগে লাগিয়ে দিলে কেন? সিরিয়াল তো আমার ছিল।’

বর্ষা কষে ধ*মক দিয়ে বলল ‘ হিং*সুটে! বুদ্ধি কী হাঁটুতে নেমেছে? পিউ আমাদের গেস্ট না? কতবছর পর এলো ও? হিং*সে করছিস কেন? ও দিয়েছে,এখনও তুই দে। একইতো হলো। আশ্চর্য! ‘

শান্তার চেহারা বাকীটুক কালো হলো। বর্ষা পাত্তা দিলোনা। উলটে বলল,
‘ যাই ক’টা ছবি তুলে আসি। ওকে পাঠাব।’
তারপর জায়গা ত্যাগ করল সেও। মৈত্রী বলল
‘ হাত দে।’
‘ বললাম না লাগাবোনা।’
‘ আহহা রা*গ করছিস কেন? তুইতো আমার নিজের মানুষ তাইনা? পিউত গেস্ট,গেস্ট দের প্রায়োরিটি দিতে হয় সব সময়। দে সোনাপু,পিউয়ের থেকেও একটা সুন্দর দেখে ডিজাইন এঁকে দিব।

শান্তার মন নরম হলো। বাম হাতটা এগিয়ে দিলো। সাথে দেখাল,
‘ এখানে ফাঁকা রাখবে,ছোট করে লিখে দেবে ‘S-D’
মৈত্রী কপাল কোঁচকায়,
‘ ডি’তে কে? এই তুই কি প্রেম করছিস?’
শান্তা আর্ত*নাদ করে বলল,
‘ আস্তে,সবাই শুনে ফেলবে।’
মৈত্রী গলা নামিয়ে বলল ‘ ডি’তে কে?’
শান্তা মাথা নুইয়ে লাজুক হেসে বলে ‘ ধূসর ভাইয়া।’

_____

আফতাব সিকদারের মাথায় হাত। মুখটা চুপসে গেছে। মান ইজ্জ্বত সব নেমেছে রাস্তায়। জীবনে অনেক বড় ভুল করেছেন এক ছেলের বাপ হয়ে। শান্তিমত, মন ভরে একটু শাসন ও করতে পারেন নি। আর সেই না পারাই কাল হয়েছে আজ। ছেলেটাকে আদৌ মানুষ বানাতে পারলেন না। এত পড়ালেখা করানোর পরেও,গুন্ডা তৈরি হয়েছে একটা। আফতাব সিকদার ভেবে পাচ্ছেন না,ঠিক কত বড় দুঃসাহস থাকলে একটা মানুষ বেড়াতে এসেও গুন্ডা*মি করত পারে। এইত, সন্ধ্যে নাগাদ বাড়িতে খবর এসছে, ধূসর মা*রামারি করেছে। কোন ছেলেকে গাছের ঠাল ভে*ঙে পিটিয়েছে। আর সেই থেকে ওয়াশরুমের দরজায় খিল দিয়ে বসে আছেন তিনি। ভুলেও বের হবেন না। কিছুতেই মুখোমুখি হবেনা ভাইদের। হলেই বিপ*দ। অবশ্য যার নিজের সন্তানই একটা বিপ*দের গোডাউন, তার কী ঝুট-ঝা*মেলা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব?

চলবে,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ