Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"একটু_ভালোবাসা পর্ব-০৮

একটু_ভালোবাসা পর্ব-০৮

#একটু_ভালোবাসা
#পর্ব_৮
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
____________________

প্রিয়ু দৌঁড়ে কলপাড়ে যায়। ট্যাপ ছেড়ে বালতি পূর্ণ করে হাত ডুবিয়ে রাখে। জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে হাত। আমিন চলে যায় আবার। আলেয়া বেগম নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শাস্তি দিতে পেরেছে এতেই তাদের শান্তি। এক ঘণ্টার মতো পানিতেই হাত চুবিয়ে বসে থাকে প্রিয়ু। নিরবে পড়া চোখের পানিটুকুও যোগ হয় ঐ পানিতে। সামান্য জ্বালাপোড়া কমেছে। শরীরের জ্বরটা আরো বেড়েছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। আস্তেধীরে উঠে নিজের রুমে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ে। ঝাপসা চোখেই হাতের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে হাত ফুলে লাল হয়ে গেছে।
আশা ক্লাস শেষে বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসার আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছে প্রিয়ুকে আচ্ছামতো বকে দেবে। এত সাহস ও’কে কে দেয়? এত রাতে বাইরে বের হওয়ার! কিন্তু প্রিয়ুর ঘুমন্ত মুখটা দেখে মায়া লাগে আশার। শীতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। অথচ লেপটা গায়ে দেয়নি। টেবিলের ওপর ব্যাগ রেখে গায়ের ওপর লেপ টেনে দেয়। হাত লেপের ভেতর রাখতে গিয়ে আশার চোখ ছানাবড়া। হাতের বিধ্বস্ত অবস্থা! আশা চিৎকার দিয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ুর ঘুম ভেঙে যায়। আলেয়া বেগম দৌঁড়ে আসে আশার চিৎকার শুনে। আমিন আর মনসুর আলী খেতে বসেছিল। ওরাও চলে আসে। আলেয়া বেগম অস্থির হয়ে বলেন,
“কী হলো তোর? চিৎকার করলি কেন?”

আশা কাঁপা কাঁপা হাতে প্রিয়ুর হাতটা ধরে বলে,
“ওর হাতের এই অবস্থা কেন?”
আলেয়া বেগম ব্যাঙ্গ করে বলেন,
“এর জন্য তুই চিল্লাইলি? তুই তো খুব ভালোবাসিস ওরে। ওর খবর রাখোস? তোর আদরের বইন প্রেম কইরা বেড়ায়। আবার পোলার বাড়িতেও যায়। ঐ পোলার লেইগাই হাত কাটছে।”
“শুধু হাত কাটায় তো এমন হওয়ার কথা নয় কখনো।”
“ওর হাতে লবণ লাগাই দিছি। বজ্জাত ছেমড়ির প্রেম-ভালোবাসার খুব শখ না?” গর্ববোধ করে বলে আমিন।

আশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন মানুষের দিকে। আশা বলে,
“তুমি কি মানুষ মা? মানুষ হলে তো সামান্য মনুষ্যত্ববোধ থাকে। তুমি ভাইয়াকে আটকাতে পারলে না? অবশ্য তুমিই বা আটকাবে কেন? তুমি তো ওর সৎ মা।”

“আর ভাইয়া তুই! আল্লাহর কসম কইরা বলতেছি, তুই যদি আমার বয়সে ছোট হতি তোরে ইচ্ছেমতো থাপ্রাইতাম আমি। অমানুষ একটা।”
“মুখ সামলাইয়া কথা বল আশা।”
“অমানুষ আমার সামনে থেকে তুই যা। এখন তো মুখ চলতেছে তখন আমার হাতও চলবে।”

আশা এবার মনসুর আলীর সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুশিক্ত চোখে বলে,
“আমার মা আর ভাইয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু তুমি? তুমি তো প্রিয়ুর জন্মদাতা পিতা। তুমি সব জেনেও কীভাবে চুপ করে আছো? কিছু বলতে পারোনি ওদের? এমনকি প্রিয়ুকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যাওনি।”
“ক্যান যামু? ও ভুল করছে শাস্তি পাইছে।”

এবার প্রিয়ু বলে,
“আমি কোনো ভুল করিনি। তোমাদের মানসিকতা যেমন তোমরা অন্যদেরও ঠিক তেমনই ভাবো। আর শাস্তি? আমি চাইলে এর দ্বিগুণ শাস্তি তোমাদের দিতে পারি। কিন্তু কীসের শাস্তি দেবো আমি? যেখানে নিজের বাবা-ই আমায় বোঝে না।”
“আমারও লজ্জা করে তোরে নিজের মেয়ে বলতে। জন্মের সময়ই তোর মুখে লবণ দিয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল।”
“সেটাই ভালো হতো। সত্যি বলছি। তোমার অমানুষের মতো এই রূপটা তো অন্তত আমায় দেখতে হতো না।”
“প্রিয়ু!” বলে, মনসুর আলী এগিয়ে আসে প্রিয়ুকে মারতে। মাঝখান থেকে আশা বাঁধা দিয়ে বলে,
“আর কত নিচে নামবে? এবার কি সত্যি সত্যিই প্রমাণ করতে চাইছ তুমি অমানুষ?”

সঙ্গে সঙ্গে আশার গালে থাপ্পড় বসান আলেয়া বেগম।
“বেয়াদবের সঙ্গে থেকে বেয়াদবই হইছিস।”
“দূর্ভাগ্য এটাই যে, তোমাদের মতো বেয়াদবের থেকে আদব শেখার মতো বোকামি করেছি।”
“তর্কও করিস? তোরে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করতেছি।” বলে মনসুর আলী ও আমিনের উদ্দেশ্যে বলেন,
“চলেন আপনি। চল আমিন।”

ওরা চলে যাওয়ার পর আশা প্রিয়ুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। সিয়ামের সামনে চুপচাপ বসে আছে প্রিয়ু। চোখে পাপড়িগুলো ভেজা। কিন্তু কাঁদছে না। প্রিয়ুর পাশে বসে আশা অনবরত কাঁদছে। যে কেউ হুট করে দেখলে ভাববে ব্যথা প্রিয়ু নয় আশা-ই পেয়েছে। আশার খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে সিয়াম প্রিয়ুর ব্যাপারেও জেনেছে। সৎ বোনের জন্য কারো এত ভালোবাসা থাকতে পারে? এ থেকেই তো বোঝা যায়, সিয়াম নিজের জন্য ভুল মানুষ পছন্দ করেনি। আশার পরিবার নিয়ে সিয়ামের কোনো মাথাব্যথা নেই। ওর পরিবার গোল্লায় যাক। শুধু আশাকে পেলেই হলো। আশা চাইলে বিয়ের পর প্রিয়ুকেও সাথে রাখবে। দু’বোনের হাসিমাখা মুখটা দেখবে। এগুলো এখন সব শুধু সিয়ামের কল্পনা। আর কল্পনাগুলো বাস্তব করা তখনই সম্ভব যদি আশা চায়!
প্রিয়ুর হাত যত্ন করে ওয়াশ করে দেয়। হাতে ব্যান্ডেজ করার সময় আড়চোখে আশার দিকেও তাকায়। টিস্যুবক্স আশার দিকে এগিয়ে দেয়। হাত ব্যান্ডেজ করা শেষ হলে কতগুলো ওষুধ দেয় আর বলে,
“হাতের ক্ষতি বেশ ভালোই হয়েছে। লবণ দেওয়ায় ইনফেকশন হয়ে গেছে। আমি মেডিসিন দিয়ে দিয়েছি। দু’দিন পর আবার আসবেন। হাত দেখে মেডিসিন দেবো আবার নতুন করে ব্যান্ডেজ করে দেবো।”
“ডাক্তার, মনের অসুখ ছাড়ানোর কোনো ওষুধ নেই?”
প্রিয়ুর এমন প্রশ্নে সিয়াম থতমত খেয়ে যায়। আশা প্রিয়ুকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দেয়। তারপর ব্যাগ থেকে টাকা বের করে সিয়ামের সামনে দেয়। সিয়াম বলে,
“টাকা লাগবে না।”
আশা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“টাকা লাগবে না কেন? আপনি কি ফ্রিতে চিকিৎসা করেন?”
“উড বি শালিকার জন্য তো ফ্রি-ই।” বলে প্রিয়ু।
আশা প্রিয়ুকে ধমক দিয়ে বলে,
“তুই চুপ কর।”

সব মিলিয়ে যেই বিলটা হয়েছে সিয়াম তার অর্ধেক দাম নিয়েছে। চলে যাওয়ার সময় সিয়াম বলে,
“মনের অসুখ শুধু আপনার মনের ডাক্তারই সারাতে পারবে। আমি তো আপনার মনের ডাক্তার নই। তাই ওষুধও আমার কাছে নেই। আপনার মনের ডাক্তার যিনি তার কাছে যান। মনের অসুখ সেড়ে যাবে।”
প্রিয়ু পিছু ফিরে তাকিয়ে বলে,
“যাব। আর সময় থাকতে যার মনের ডাক্তার হবেন বলে ভাবছেন তাকে ঘরের প্লাস মনের পেশেন্ট বানাতে হলে অতি শীঘ্রই বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। মা কিন্তু ছেলে খোঁজা শুরু করে দেবে।”

আশা প্রিয়ুকে টানতে টানতে নিয়ে যায়। মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
“তোকে এত কথা বলতে বলেছে কে রে?”
“বাঃ রে! একটা ভালো মানুষ তোমায় ভালোবাসে। আর তার উপকার আমি করব না?”
“হয়েছে। বড় উপকার করেছিস তুই। এখন বল তো হাত কেন কেটেছিলি?”
“জ্ঞানশূন্য হয়ে। রিশাদ বারবার আমাকে ওর থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করছে। ওর থেকেও নাকি আমি ভালো কাউকে ডিজার্ব করি এসব আবোলতাবোল আমায় বোঝাচ্ছে। কিন্তু রিশাদ এটা কেন বুঝতে চাইছে না, আমার ভালো কাউকে না বরং ও’কেই চাই। ওর মাঝেই আমি আমার সুখের দেখা পাই।”
“কত্ত বড় সাহস তার! আমার বোনকে নাকি ভালোবাসবে না। ওর বাড়ির ঠিকানা দে তো। বাড়িতে গিয়ে কেলিয়ে আসি।”

প্রিয়ু শব্দ করে হাসে। আশা বলে,
“হাসিস কেন?”
“তোমার কথা শুনে। বাচ্চাদের মতো করছ তুমি।”
“তোর সুখের জন্য আমি সব করতে পারি।”
“কিন্তু যার মাঝে আমি সুখ খুঁজি সেই আমায় চায় না।”
“আমি তাকে বোঝাব।”
“লাভ নেই আপু। তুমি তো জানো সিয়াম ডাক্তার তোমায় ভালোবাসে। কিন্তু তুমি কি বাসো? বা বাসলেও কি রাজি হবে? হবে না। কারণ তুমি আগে তোমার জায়গা থেকে সবটা ভাববে। তেমনি রিশাদকে বুঝিয়েও লাভ হবে না। হতে পারে রিশাদও ওর জায়গায় সঠিক। আমি ওর যোগ্য যে নই এটা তো সত্যই।”
“চুপ কর। এত বুঝিস তাহলে ভালোবেসে কষ্ট পাস কেন?”
“রিশাদকে ছাড়া থাকতে পারি না যে।”
আশা প্রিয়ুর গালে হাত রেখে বলে,
“আমার এই পাগলী বোনটার ভালোবাসা কবে বুঝবে রিশাদ?”
“আল্লাহ্ জানে!”
“চল। আজ আমরা ঘুরব। খাব। তারপর বাসায় যাব।”
“আমার ভালো লাগছে না আপু।”
“তোর কোনো বারণ আমি শুনব না।”

দু’বোন মিলে হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। এটা, ওটা কিনে খাচ্ছে। গল্প করছে। কে বলবে এখানে কোনো দুঃখী মেয়ে আছে? কেউ বুঝবে না, কেউ বলবেও না। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষাদের ছায়া কেউ টেরও পাবে না কখনো। কিছু কষ্ট, বিষাদ একান্ত নিজেরই হয়। যদি বিষাদের মতো রিশাদও একান্ত নিজের একটা মানুষ হতো তবে কি খুব বেশিই চাওয়া হয়ে যেত?

“প্রিয়ু! এই প্রিয়ু। দাঁড়া।”

কারো কণ্ঠে নিজের নাম শুনে প্রিয়ু দাঁড়িয়ে যায়। ঘন কুয়াশার আড়াল থেকে আসতে দেখতে পায় অরণ্যকে। হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে দাঁড়ায়।
“তোর পাগলামি কমবে কবে?”
“মানে?”
“হাত কাটছিস কেন?”
“তোমায় কে বলল?”
“রিশাদ।”
“ও’কে পেলে কোথায় তুমি?”
“খুঁজে নিয়েছি। বোন কাকে ভালোবাসে দেখব না? অনেক বুঝালাম ও’কে। বলল ভেবে দেখবে।”
“আশ্চর্য! তুমি আমার কথা বলছ কেন? আমি চাই না, আমার কারণে তোমরা কেউ ছোট হও।”
“ছোট হওয়ার কী আছে? আদরের বোনের জন্য সবকিছুই করা যায়।”
“খুব খারাপ করেছ। আর কখনো এমন করলে আমি আর তোমার সাথে কথা বলব না।”
“ওরে বাবা! রাগ হয়েছে দেখি খুব। চল আইসক্রিম কিনে দেই।”
“না, ভাইয়া। ওর এমনিতেই ঠান্ডা, জ্বর লেগেছে।” বলে আশা।
“আইসক্রিম খেলে ওর জ্বর, ঠান্ডা বাড়বে না। বরং তাড়াতাড়ি কমবে।”

এবার তিন ভাই-বোন মিলে গল্প করতে করতে হাঁটে। অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রিয়ুকে হাসি-খুশি রাখার চেষ্টা চালায়। মেয়েটার এত কষ্টের মাঝে অরণ্যর নিজের কষ্টগুলোর কথা আর বলাই হয়ে ওঠে না। তাহলে এই হাসিটুকুও মিলিয়ে যাবে বাতাসে। তিতলি বিয়েতে রাজি হয়েছে। অরণ্যর যে কতটা কষ্ট হচ্ছে সেটাও শেয়ার করতে পারছে না। থাক, দরকার কি নিজের জন্য দুঃখী মেয়েটার দুঃখ আরো বাড়াতে?
.
রিশাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রিয়ু বলে,
“আমি একটু রিশাদের সাথে দেখা করে আসি?”
আশা একবার অরণ্যর দিকে তাকায়। অরণ্য বলে,
“যা। আমরা নিচে আছি।”
প্রিয়ু ভেতরে চলে যায়। আশা আর অরণ্য সালাম চাচার সাথে কথা বলে। সালাম চাচা আফসোস করে বলেন প্রিয়ুর কথা। ভালোবাসার জন্য খুব কাতর যে দুঃখী মেয়েটা।

দু’বার কলিংবেল বাজানোর পর রিশাদ দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলেই প্রিয়ুর হাসিমাখা মুখটা দেখতে পায়। প্রিয়ু বলে,
“কী করছিলে?”
“তেমন কিছু না। শুয়ে ছিলাম। ভেতরে আসো।”
“না, ভেতরে যাব না। ভাইয়া আর আপু নিচে দাঁড়িয়ে আছে।”
“তাদেরও নিয়ে আসতে।”
“উঁহু! চলেই যাব।”
“একেবারে?”
“না। কখনো না। আমি তোমায় একেবারের জন্য কখনোই ছাড়ব না।”
রিশাদ মৃদু হেসে বলে,
“আজ যেই কথাগুলো আবেগে বলছ একদিন বাস্তবতায় সব ভুলে যাবে।তুমিও সুখী হবে অন্য কারো সাথে। তখন এই দিনগুলো আর নিজের বোকামির জন্য হাসবে।”
“আবেগকে এত ছোট করে দেখো কেন? ভালোবাসার অপর নাম আবেগ। সেটা কি জানো না? যার মাঝে আবেগ নেই সে কোনোদিনও মানুষ হতে পারে না। আবেগ প্রতিটা মানুষের মাঝেই থাকে। কেউ আবেগকে কন্ট্রোলে রাখতে পারে। আর কেউ পারে না। তফাৎ ব্যাস এতটুকুই। আর কি বললে? বাস্তবতা? এতটুকু বয়সে যতটা বাস্তবতার সম্মুখীন আমি হয়েছি সেটাই কি কম মনে হয় তোমার?
আমি সুখী হলে তোমার সাথেই হব। অন্য কারো সাথে নয়।”
“সময় হলেই দেখা যাবে।”
“দেখে নিও তুমি।”
“বাদ দাও! ভালো লাগে না এসব নিয়ে কথা বলতে।”
“কেন বাদ দেবো সবসময়? কেন বোঝো না তুমি আমার ফিলিংস? তোমায় ছাড়া আমার নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয় রিশাদ।” একটু চেঁচিয়েই বলে প্রিয়ু।
রিশাদ শান্তস্বরে বলে,
“এখন একটু খারাপ লাগবেই। পরে ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া যেই কষ্টকে তুমি প্রতিনিয়ত অতিক্রম করে চলেছ তার কাছে এই কষ্ট কিছুই না।”
“ওহ্ আচ্ছা! তুমি তাহলে এটাই ভেবে নিয়েছ যে, যেই মেয়ে এত কষ্ট সহ্য করতে পেরেছে সে এতটুকুও সহ্য করে নেবে? তাই না? এমনটা না ভেবে কি এটা ভাবা যায়নি, মেয়েটাকে নিজের করে নিয়ে সব কষ্ট দূর করে দেই?” রিশাদের জ্যাকেট খামচে ধরে বলে প্রিয়ু। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। রিশাদ বলে,
“প্লিজ কান্না থামাও প্রিয়ু।”
“আমি তোমার পায়ে ধরি রিশাদ, একটু তো ভালোবাসো আমায়।”
“প্লিজ প্রিয়ু!”
“আর কত কষ্ট পেলে, আর কত ছোট হলে তুমি আমায় ভালোবাসবে? নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে, ছ্যাচ্রার মতো তোমার পিছনে পড়ে আছি। শুধু একটু ভালোবাসার জন্য! একটুও কি মায়া হয় না তোমার?”
“আমায় ভালোবাসো?”
“আর কীভাবে বোঝাব কতটা ভালোবাসি?”
“তাহলে নিজেকে এত ছোট কেন ভাবো? ভালোবাসা অপরাধ নয়। ভালোবাসার জন্য মানুষ সব রকম পাগালামি করতে পারে। আমি তোমাকে এমন কিছুই ভাবি না। তুমি নিজেই নিজেকে ছোট ভাবো। তোমাকে আমি আগে যেমন সম্মান করতাম, এখনো তেমনই সম্মান করি।”
“শুধু আমায় ভালোবাসতেই তোমার যত সমস্যা!”
“তুমি শান্ত হও!”
“ঠিক আছি। আমি ঠিক আছি।”

হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে প্রিয়ু নিচে নেমে যায়। রিশাদেরও কষ্ট হয়। কিন্তু কী করবে! ভালোবাসার ওপর যে জোর খাটে না। রিশাদও যে বেঁধে আছে নিজের সীমায়। কখনো কি সম্ভব নয় নিজের সীমা অতিক্রম করে প্রিয়ুকে ভালোবেসে নিজের করে নেওয়া? এর উত্তর কখনো মিলবে?

————————————-

প্রিয়ুর জ্বর ক্রমশ বেড়েই চলেছে। হাতের অবস্থাও ভালো নয়। বিছানা থেকে ওঠার শক্তিটুকুও পর্যন্ত নেই। প্রিয়ুর দেখাশোনা সব আশাই করছে। নিজেও ভার্সিটিতে যাচ্ছে না আর প্রিয়ুকেও যেতে দেয়নি। নিজের যেটুকু জমানো টাকা ছিল তা দিয়েই প্রিয়ুর জন্য ওষুধ এনেছে। মনসুর আলীর কাছে কোনো টাকা চায়নি। বাবা নামক নিষ্ঠুর লোকটার টাকায় প্রিয়ুর চিকিৎসা করাতে আশার বিবেক বাঁধা দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়টি হলো মনসুর আলী একটাবার প্রিয়ুর খোঁজও নেয়নি। মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কী করে হতে পারে? প্রিয়ুর পাশে বসে এসবই ভাবছিল আশা। জ্বরের ঘোরে কথাও ঠিকমতো বলতে পারছে না প্রিয়ু। আস্তেধীরে বলে,
“আপু মুখটা খুব তেতো লাগছে।”
“তেঁতুল খাবি?” জিজ্ঞেস করে আশা।
মৃদু হেসে প্রিয়ু বলে,
“খাব।”

আশা বৈয়াম থেকে কিছুটা তেঁতু্ল ছোট একটা বাটিতে নেয়। তিনটা কাঁচা মরিচ কুচিকুচি করে কেঁটে দেয়। পরিমাণমতো লবণ আর অল্পটুকু চিনি দেয়। সাথে অল্প পানি মিশিয়ে মাখা মাখা করে চটকিয়ে দেয়। এভাবে তেঁতুল মাখিয়ে খাওয়া আশা প্রিয়ুর থেকেই শিখেছে। ছোটবেলায় প্রিয়ুর মা মমতা বেগমও নাকি এভাবে তেঁতুল মেখে দিত প্রিয়ুকে। তেঁতু্লের বাটিটা প্রিয়ুর হাতে তুলে দেয় আশা। অল্প একটু মুখে দেওয়ার পরই বাহির থেকে তিতলির কণ্ঠ শোনা যায়। আশা বলে,
“তুই খা। আমি দেখছি।”

আশা বাইরে গিয়ে দেখে সত্যিই তিতলি দাঁড়িয়ে আছে। আশাকে দেখে বলে,
“প্রিয়ু বাসায়?”
“হ্যাঁ। ভেতরে আসো।”
তিতলি আশার সাথে ভেতরে যায়। প্রিয়ুকে দেখে বলে,
“অসুস্থ তুই?”
“হু। জ্বর আর ঠান্ডা।” বলে প্রিয়ু।
তিতলি ধরে আসা গলায় বলে,
“নিজের যত্ন নিস না কেন?”
“নিই তো!”

তিতলির চোখ টলমল করছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। প্রিয়ু জিজ্ঞেস করে,
“কিছু হয়েছে দি?”
তিতলি এদিক-সেদিক তাকিয়ে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে। মেকি হেসে বলে,
“না। কী হবে?”
“তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?”
“কাঁদছি না।” বলে, আশা ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে। লাল খামে সুন্দর নকশা করা বিয়ের কার্ড। প্রিয়ু কার্ডটা হাতে নিয়ে বলে,
“কার বিয়ে?”
“আমার বিয়ে। তোর ভাইকে নিয়ে চলে আসিস।”
“কী বলছ দি? তোমার বিয়ে কার সাথে? তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে?”
“এসব প্রশ্ন না হয় তোর ভাইকেই করিস।” বলে, হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে তিতলি দৌঁড়ে চলে যায়। প্রিয়ুর মাথা ঘুরছে। এটা কী করে সম্ভব! এতকিছু হয়ে গেল আর অরণ্য কিছুই বলল না? প্রিয়ু লেপ সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
“তুই অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?” জিজ্ঞেস করে আশা।
“অরণ্য ভাইয়ার কাছে যাব। আমায় সবকিছু জানতে হবে।”
“এই শরীর নিয়ে কীভাবে যাবি?”
“জানি না আমি। যেতে হবে আমায়।”
“চল। আমিও যাব সাথে।”
.
.
সূর্যের মৃদু আলোতে ছাদের এক কোণায় বসে আছে অরণ্য। দিনের বেশিরভাগ সময়টা এখন ছাদেই কাটে। প্রিয়ু আর আশাকে ছাদে আসতে দেখে অরণ্য বলে,
“কী ব্যাপার? জ্বর নিয়ে এখানে আসলি কেন?”
“তার আগে আমায় তুমি এটা বলো কী লুকিয়েছ আমার থেকে?” জিজ্ঞেস করে প্রিয়ু। অরণ্য অবাক হয়ে বলে,
“কী লুকাব?”
“সেটা তো তুমি জানো। তিতলি দি’র বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
“জানি আমি।”
“জানো মানে? জানলে এমন চুপ করে আছো কেন? কিছু করছ না কেন?”
“কী করব আমি? কী করার আছে? কিচ্ছু করার নেই আমার। তিতলির মা আমার কাছে তিতলিকে ভিক্ষা চেয়েছে। ধর্মের দেয়াল যে আমাদের মাঝে। আমার কিছু করার নেই। আমি নিজেই তিতলিকে বাধ্য করিয়েছি বিয়েতে রাজি হতে।” কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলে অরণ্য।

কাঁদতে কাঁদতেই অরণ্য প্রিয়ুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আমি তিতলিকে ছাড়া ভালো থাকব না রে বোন। জীবন্ত লাশ হয়ে যাব আমি।”
অরণ্যর সঙ্গে কাঁদে আশা আর প্রিয়ুও।

একজন একটু ভালোবাসার জন্য সর্বসময় কাঁদে আর অন্যজন ভালোবাসা হারানোর কষ্টে। ধর্মের দেয়ালের দুইপাশে শেষমেশ হারিয়ে যাবেই ওদের ভালোবাসা?

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ