#উদাস_পূরবী_হাওয়া
#পর্ব_১০
#মৌরিন_আহমেদ
(ভায়োলেন্স ও অশ্রাব্য ভাষা এলার্ট!)
সাজিদ এত জোরে গলা চেপে ধরে আছে যে বিপার মনে হচ্ছে আজ ওর শেষ দিন। শ্বাস আটকে যাবে এক্ষুণি। ওর ধস্তাধস্তির মাত্রা বাড়লো; দু’হাতে ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলো। সাজিদের শরীরে যেন অসুরের শক্তি! কিছুতেই পারা যাচ্ছে না। জীবন শেষ ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেলার মুহূর্তে আচমকা গলা ছেড়ে দিয়ে ওকে ধাক্কা দিলো সাজিদ।
বিপা হুমড়ি খেয়ে পড়লো কাচের টি-টেবিলের উপর। সেখানে একটু আগে জুবায়ের আর ওর রেখে যাওয়া পাস্তার বাটি দু’টো ছিল; আচানক ধাক্কায় ঝনঝন করে উঠলো। সাজিদ ক্ষেপে গেল বাটি দু’টোকে দেখে। একহাতে ফের আঁকড়ে ধরলো চুলের মুঠি, বিপা চেঁচিয়ে উঠলো ব্যথায়। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ হলোনা ওর; মাথাটা ক্রমাগত বাড়ি দিতে লাগলো টেবিলের উপর।
— পাস্তা! শালী পাস্তা খাওয়াস লাং রে? আমারে তো পুঁইশাক দিয়া মুগডাল রান্ধে খিলাস! কচুর ঘ্যাট, লাউয়ের চচ্চড়ি ছাড়া তোর হাত থেকে আর কিছু বের হয়না —-সেইখানে লাং রে পাস্তা খাওয়াও? চিজ পাস্তা! আয় তোরে খাওয়াইতেছি!
— ছাড়, জানোয়ার! আমাকে ছাড়!
— জানোয়ার? আসল জানোয়ার কাকে বলে দেখাইতেছি…
চুল ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ওকে টেনে নিয়ে গেল রান্নাঘরে। বিপা চেঁচিয়ে , কেঁদেও বাঁচতে পারলো না। যেখানে এখনো বাটিভর্তি গরম পাস্তা তৈরি আছে। সাজিদ এসে সোজা ওর মুখটা চেপে ধরলো গরম বাটির উপর। ইতোমধ্যেই রক্তে ভিজে গেছে মুখ; আঘাতে জরাজীর্ণ চেহারায় গরম লাগতেই ভয়ংকর চিৎকার শুরু করে দিলো বিপা। ওর তড়পানো দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সাজিদ!
সাজিদ যেন একটা বদ্ধ উন্মাদ; একের পর এক অত্যাচার করেই যাচ্ছে বিপার উপর। সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ! জগতের কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নিজের স্ত্রীকে এমন নোংরা ভাষা বলতে পারে বলে বিপার জানা নেই। অনেকক্ষণ চুপ করে সহ্য করলেও এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল ওর; হাতের নাগালে কিচেন নাইফটা হাতড়াতে হাতড়াতে অবশ্য পেয়েও গেল সেই মুহূর্তে। অমনি নাইফটা সাজিদের গলার কাছে ধরে হুংকার দিয়ে উঠলো,
— এইবার! এইবার কি করবি, বল শুয়োরের বাচ্চা! দেব তোর ক;ল্লা নামায়?
সাজিদ ভাবতেও পারেনি এতো মারের পরও বিপা ঘুরে দাঁড়াবে; ওর হাতের কাছে নাইফ থাকতে পারে আন্দাজও করেনি। ভড়কে গেছে ভীষণ। আমতা আমতা করে বললো,
— বিপা! বিপা রাখো ওটা. .
বিপাকে ভর করেছে একটু আগের সাজিদের সাইকোটা। ও সাজিদের উপর ঝুঁকে পড়লো; বুকের উপর চড়ে বসে ছুরিটা আরোও দাবিয়ে ধরলো; গলার চামড়া স্পর্শ করতেই চেঁচিয়ে উঠলো,
— ক্যান? রাখবো কিজন্য? তুই আমারে একটু আগে মারতে চাস নাই? আমি এখন চাইতে দোষ কি?
সাজিদ ভয়ে কথা বলতে পারলো না। ও চোখ বড়বড় করে তাকালো। বিপা নাইফটা আরেকটু চেপে ধরলো; সূক্ষ্ম একটা দাগের মতো কেটে গেল খানিকটা। র;ক্ত বেরোতে লাগলো ফিনিক দিয়ে,
— শালা ইবলিশ, লাং কে নিয়া আসছে? তুই তার আগে তোর নটিরে নিয়া বেড়াস নাই? হোটেল যাস নাই শুয়োর! আমারে গালি দেস তুই, বাঞ্চোত!
ঠিক এইসময়! ঠিক এইসময় পাশের ঘরে বিপার ফোনটা বেজে উঠলো প্রবল শব্দ নিয়ে। বিপার মনোযোগ সরে গেল ওদিকে; হাতের বেঁধ আলগা হয়ে উঠতেই সুযোগটা লুফে নিলো সাজিদ। এক ধাক্কায় ওকে বুকের উপর থেকে ফেলে দিলো। হাত থেকে নাইফটা ছিটকে মেঝেতে পড়লো। বিপা নড়বারও সময় পেল না; ঝড়ের বেগে ওই নাইফটাই তুলে নিলো সাজিদ। চড়াও হলো ওর উপর,
— খা*কি মা*! আমারে ভয় দেখাস? আজ তোর শেষ দিন হারামজাদি!
বলেই নাইফটা উঁচিয়ে ধরতেই, বিপা ‘আল্লাহ্’ বলে খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিলো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ছুরিটা ওর বুকে না বসে, ছিটকে পড়ল অদূরে। পরিবর্তে শোনা গেল সাজিদের আর্তনাদ ‘ওহ্, মাগো!’ পরপরই পরে গেল মেঝেতে।
বিপা প্রচণ্ড বিস্ময়ে চোখ মেলতেই দেখলো সম্মুখে জুবায়ের দাঁড়িয়ে; ওর হাতে একটা ফুলদানি। যেটা দিয়ে মাথায় মেরে অজ্ঞান করে ফেলেছে সাজিদকে। ও বিস্ময় নিয়ে বললো,
— তুমি!
সাজিদ ফুলদানিটা ছুঁড়ে দিলো দূরে; ভেঙে গুড়িয়ে গেল ওটা। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই দু’জনের। বরং বিপাকে উঠতে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো জুবায়ের; নিঃশব্দে ওর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা আঁকড়ে ধরলো বিপা!
______________
[পনেরো মিনিট পর]
ড্রইং রুমটা বিধ্বস্ত। বিপা বসে আছে বড় সোফাটার একপাশে। চেহারা পুরোপুরি উদ্ভ্রান্তের ন্যায়। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের দুপাশে লেপ্টে আছে; র;ক্তে ভিজেছে কিছু। মুখটায় অসংখ্য দাগ লেগেছে। ঠোঁটের কোণটা ফেটেছে; গলায় পাঁচ আঙুলের ছাপ। জুবায়ের ও-ঘর থেকে হাতে একটা বক্স নিয়ে ফিরলো; হাঁফ ছেড়ে বললো,
— অবশেষে পেয়েছি ফার্স্ট এইড। এসো, ব্যান্ডেজ করে দেই। একি তুমি বরফ ধরে রাখোনি কপালে? সব বরফ তো গলে গেলো!
টি – টেবিলের উপর বরফ ভর্তি বাটিতে নজর দিলো বিপা। অর্ধেকবরফ গলে গেছে; বাকিগুলো ভাসছে গলা পানিতেই। কিছু বলার আগ্রহ পেলনা। জুবায়ের বুঝলো সব। নিজেই কিছুক্ষণ বরফ চেপে ধরে রাখলো ক্ষতের উপর। রক্ত পড়া বন্ধ হলে তুলো দিয়ে মুছলো; এন্টিসেপ্টিক দিয়ে পরিষ্কার করলো। সবশেষে ঔষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজটাও করে দিলো। বিপা কিছুই বললো না; ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ।
জুবায়ের তাকালো ঘরের অন্য প্রান্তে। ওদিকটায় একটা চেয়ারে বেঁধে রেখেছে অজ্ঞান সাজিদকে; যেন জ্ঞান ফিরলে অতর্কিতে আক্র-মন করতে না পারে। এমনই যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে বিপার। আবার সুযোগ পেলে নির্ঘাৎ খু-ন করবে। ভেবেই দীর্ঘশ্বাস বেরোলো,
— এখন কি করবে, বিপা? সাজিদ সব জেনে গেছে। আমরা চাইলেও আর আগের প্ল্যান মোতাবেক কাজ করতে পারবোনা। রিসোর্টে গেলে নাহয় একসিডেন্টের কাহিনীটা করা যেত; কিন্তু এখন. . দ্রুত ভাবতে হবে।
বিপা তখনো চুপ করে। তবে দৃষ্টি ঘুরে গেছে বেহুশ সাজিদের দিকে। জুবায়ের সেদিকে চেয়ে আবার বললো,
— ওর জ্ঞান ফিরতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে। এরমধ্যে বাসা থেকে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে, বিপা। জ্ঞান ফিরলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে! তারচেয়ে চলো আমরা চলে যাই। মেইন গেট আমরা বন্ধ করে যাব। ফোন তো থাকবেই; কাউকে কল দিয়ে খুলে নিতে পারবে।
— কোথায় যাব?
বিপা সেভাবেই বললো; জুবায়ের টেনশনে ঠোঁট কামড়ালো নিজের,
— আপাতত পৃথার বাসায় যাওয়া উচিৎ। আমার বাসায় যাওয়া একদমই ঠিক হবেনা। মা – বাবা নানান প্রশ্ন করবে; ওগুলোর উত্তর দিতে পারবো না। তাছাড়া বিয়ে এখনো ভাঙতে পারিনি।
পৃথার বাসা সবদিক থেকে সেইফ। ও সবকিছুই জানে; সমস্যা হবেনা। তারপর ধীরে ধীরে সব করতে পারবো। ডিভোর্স ফাইল; ভিসা এপ্লাই — সময় নিয়ে করবো! এরমধ্যে সাজিদ তোমার নাগাল পাবেনা। আর আমার ধারণা, ও সেটা করবেও না। তুমি চলে গেছো সেই আনন্দেই মেয়েটাকে নিয়ে রিসোর্টে চলে যাবে নিশ্চিন্তে। আমরা তখন আগের প্ল্যানেই স্টিক থাকবো। মাঝখানে শুধু একটু চেঞ্জ আনতে হবে। ঠিক আছে?
বলেই তাকালো বিপার সমর্থনের জন্য। বিপা সাজিদ থেকে নজর সরিয়ে নিতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। জুবায়ের চেয়ে রইলো ওই গভীর চাহনির দিকে। কিছুটা সময় পর সংবিৎ ফিরলো দু’জনের। বিপা আগের মতই গম্ভীর স্বরে জানান দিলো,
— আমরা প্লান অনুযায়ীই সব করবো। মরতে সাজিদকে হবেই; তাও আজই। কারণ আজকের পর আর অপেক্ষা করা সম্ভব না আমার।
— কিন্তু কীভাবে! সাজিদ অলরেডি সেন্সলেস, বিপা। এই অবস্থায় ও ড্রাইভ করবে কীভাবে! আর থামা গাড়িতে ট্রাক ধাক্কা দিলে আশেপাশের লোকজন… ফেঁসে যাওয়ার চান্স অনেক বেশি।
— সেজন্যে একটা নির্জন রাস্তা লাগবে এখন; যেখানে সিসিটিভি নেই; আশেপাশে লোকজন কম। তোমার ট্রাক ড্রাইভারকে ফোন করো। ঢাকায় এরকম রুটের কথা ট্রাক ড্রাইভাররা সবচেয়ে ভালো জানবে।
তুমি এখন ওকে ইনজেশনটা পুশ করে দাও। একটুপর সন্ধ্যা নামবে। অন্ধকারে শুনশান রোডে এক্সিডেন্ট হওয়া খুবই কমন ব্যাপার। তাছাড়া ব্লাডে আলকোহল পাওয়া গেলে, সবাই এমনি বুঝবে ড্রাংক হয়ে ড্রাইভ করতে গিয়ে এক্সিডেন্ট হয়েছে। পিওর এক্সিডেন্ট। ধরা পরার চান্স নেই একদম।
বিপার কণ্ঠ আশ্চর্য রকম ঠাণ্ডা। যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধী তার অপরাধের পূর্ব পরিকল্পনা করছে। জুবায়ের সন্তর্পণে ঢোক গিললো। বলতে বাধা নেই, হঠাৎ করেই ওর শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। গা ছমছমে একটা অনুভুতি হচ্ছে।
— কিন্তু ওর তো জ্ঞান নেই। নিচে দারোয়ান আছে। বাকিসব প্লান ঠিক থাকলেও; আমরা এই ফ্লাট থেকেই বেরোতে পারব না। কারণ যেভাবেই বেরোই; দিনশেষে ধরা পরবই!
বিপা কিছুক্ষণ নিশ্চুপে ভাবলো। জুবায়েরের কথা ঠিক। এই বিল্ডিংয়ে যত মানুষের আনাগোনা সারাদিন; তাতে একমুহূর্তের জন্যও ওরা লিফট, করিডোর কিংবা গেট ফাঁকা পাবেনা। সাজিদকে বোরকা পরালে হয়তো সাময়িক ভাবে নিশ্চিন্ত হতে পারবে কিন্তু এক্সিডেন্ট হলে সন্দেহের তীর ওর দিকেই নিক্ষিপ্ত হবে।
— তাহলে?
— তাহলে আমি যা বলছিলাম, তাই করি। এসব খতরনাক প্ল্যানিং রাখো তুমি। চুপচাপ হাত খুলে দিয়ে বেরিয়ে যাই; বাকিসব পরে দেখা যাবে। এখন আমরা তো নিরাপদে পালাতে পারব!
বিপা কিছু একটা বলবে তার আগেই একটা রিংটোন বেজে উঠলো; জুবায়ের চমকে তাকাতেই বিপা বললো,
— সাজিদের ফোন বাজছে। ওর পকেটে আছে হয়তো. .
জুবায়ের এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
— রিসিভ করবো? নাকি ফোন অফ করে রাখবো?
— আগে দেখো কলটা কে করেছে!
ফোনটা নিয়ে ফিরে আসতেই দেখা গেল, স্ক্রিনে ভাসছে ‘নি ❤️’। জুবায়ের ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বিপা ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো। অজানা আশঙ্কায় ওর বুক কাঁপছে। কে এটা? সাজিদের সেই প্রেমিকা?
নীরবতা ছেদ করে ওপাশ থেকে একটা অভিমানী নারীকণ্ঠ শোনা গেল,
— হ্যালো বাবু। কল করার কথা ছিলনা তোমার? করো নি কেন? ইগনোর করছ? এরকম করলে কিন্তু আমি যাব না তোমার সাথে. .
— নিপা তুই!
বিপার বিস্ময়ের অন্ত রইলো না!
#চলবে_____
#MOURIN_AHMED
