#অবশিষ্ট
#প্রথম_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
কলমে অনিন্দিতা
ধড়মড় করে উঠে বসল দীপ। ঘড়িতে সাড়ে ছটা! কত বেলা হয়ে গেছে। কে জানে বাবা কী করছে। সকালের ব্লাডটা নিয়ে গেল কি না! ঠিক সাড়ে ছটায় একটা ব্লাড টেস্ট হয় সপ্তাহে দুদিন! মেইনলি প্লেটলেটটা চেক করে। আটটার মধ্যে পার্কস্ট্রিট থেকে একজন আসে মেডিসিন দিতে।
ওই মেডিসিনটার দাম এতটা বেশি বলে লোকাল নার্সিংহোমটায় রাখে না। ওটা সিরিঞ্জে ভরে শরীরে ঢুকিয়ে দিলে নাকি বাবা আরও কিছুদিন টিকে যাবে।
তিন বছর ধরে লড়াইটা চলছে। ক্লান্ত সবাই— বাবা ক্লান্ত, রুমি ক্লান্ত, সারাদিন দেখে যে আয়া দিদি সেও বোধহয় ক্লান্ত, শুধু দীপ! দীপ লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যেতে রাজি এখনও! মাকেও হারিয়েছে দীপ, আর যদি বাবাও না থাকে!
“কী গো, আজ আবার উঠলে কেন! আজ একটু ঘুমাও, কম ধকল তো যায়নি! কাল রাতে সব মিটতে কত রাত হলো!”— রুমি কথাগুলো বলেই পাশ ফিরল।
বসে বসে ঝিমোচ্ছিল দীপ। হঠাৎ কানে বাজল কথাটা— “কাল রাতে সব মিটতে কত রাত হলো।”সব মনে পড়ে গেল দীপের! অভ্যাসের জন্যই ভাবনাটা রোজকার মত এসেছিলো।
কাল রাত! সত্যি তো, কাল রাতেই তো সবটা শেষ হয়ে গেল! কাল সকালেই তো নার্সিংহোম থেকে ফোন এসেছিল, রাঘব বসুর অবস্থা ভালো নয়! সঙ্গে সঙ্গে ছুটেছিল দীপ!
যাওয়ার আগে মায়ের ছবির দিকে চোখ গিয়েছিল। অদ্ভুত একটা তৃপ্তি দেখেছিল মায়ের ঠোঁটে! আশা নিয়েই গিয়েছিল দীপ যে মা হাসছে মানে বাবা ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু না, দীপ যাওয়া অবধিও অপেক্ষা করেনি রাঘব! তার মানে মায়ের হাসির অন্য মানে ছিল। এটাই বোঝালো— বাবা শান্তি পেয়েছে!
সত্যি ওদের প্রেমটা মানতে হয়! দুজন দুজনের প্রতি এত ভালোবাসা! থাকুক এখন দীপের ঘরের দেওয়ালেই দুজনে পাশাপাশি। ভালো থাকুক! ভালোবাসায় থাকুক!
দীপ দেখল রুমি ঘুমাচ্ছে। ঘুমাক! ওরও কী কম ঝক্কি গেছে এই কদিন! বাবা অসুস্থ জেনেই তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে নিয়েছিল দীপ। আর এসে থেকেই রুমি যেন এই লড়াইটার একজন সৈনিক হয়ে গেল! না, ওর মুখে কোনোদিন কোনো অভিযোগ শোনেনি দীপ, বরং পাশেই ছিল!
কাল যখন ফোন করে বাড়িতে দীপ জানাল, “রুমি, বাবা আর নেই!” রুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “যাক!”
ছোট্ট কথাটা বড্ড কানে লেগেছিল দীপের। মানুষটা না থাকার সঙ্গে “যাক” কথাটা বোধহয় বড্ড বেমানান! একটা নিশ্চিন্ত, একটা শান্তির বহিঃপ্রকাশ!
আচ্ছা, রাগ হবে কেন! আজ সকালটা দীপের নিশ্চিন্ত লাগছে না? এই যে ও এতক্ষণ বিছানায় শুয়ে এত কিছু ভাবছে! অন্যদিন তো সকালে উঠে নার্সিংহোম, সেখান থেকে অফিস! তারপর এই ব্যাংক, সেই ব্যাংক, লোন, মেডিক্লেমের অফিস।
মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম— এটার সঙ্গে লড়াই করাটা যেমন রাঘবের পক্ষে অসম্ভব হচ্ছিল, দীপের জন্যও! তাও ও শেষ দেখতে চেয়েছিল!
হঠাৎ মনে পড়ল আজ এক ব্যাংকের লোক আসার কথা। পার্সোনাল লোন নিত দীপ! তাড়াতাড়ি হোয়াটসঅ্যাপ করল ভদ্রলোককে—
“লোনটার আমার আর দরকার নেই! প্লিজ কিছু মনে করবেন না!”
আসলে ওর বাবার সুস্থতাটা আরও কেউ চাইলে এই ভদ্রলোকগুলো! যারা ওৎ পেতে ছিল লোন দেবে বলে! আর সেইটাকে ভেবেছিল দীপ, আরও কিছুদিন ট্রিটমেন্ট চালাতে পারবে। আর লাগবে না লোন!
ভাবনাটা আসতেই যেন সত্যি শান্তি লাগছে দীপের। রুমিকে আর কী দোষ দেবে!
ঘুম আসছে না। এদিক-ওদিক করতে করতে উঠে পড়ল। কিন্তু উঠেই বা কী করবে! আজ থেকে তো কোনো কাজ নেই! সব কাজ শেষ!
পায়ে পায়ে রান্নাঘরে এসে দাঁড়াল দীপ। এক কাপ লিকার চা বসাল। বুকটা বড্ড খাঁ খাঁ করছে। ছোট থেকেই দেখেছে দীপ— বাবা, মা আর ও; পরিপূর্ণ সংসার! আজ সেই সংসারে একা দাঁড়িয়ে আছে দীপ!
চাটা করে সোজা বাবার ঘরে ঢুকল দীপ। স্মৃতিগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে! স্মৃতি বড্ড বেদনাদায়ক!
মায়ের তো হঠাৎ চলে যাওয়া! সুস্থ মানুষ রাতে ঘুমালো, ভোরবেলা থেকে বুকব্যথা। ডাক্তার দেখিয়ে এনেছিল রাঘব! গ্যাসের ওষুধ ছাড়া আর কিচ্ছু দেয়নি! কিন্তু বাঁচাতেও পারেনি! ঠিক বিকেল চারটে আঠাশ! সব শেষ!
রাঘব বলেছিল, “স্মৃতি সব সরিয়ে দে বাবু! স্মৃতি আগলানো মৃত্যুর সমান!”
ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বালাল দীপ। বাবা-মায়ের ঘর এটা ছিল না! মায়ের শখ ছিল দোতলা সুন্দর বাড়ির! কিন্তু সেই সুখ পায়নি শিপ্রা!
শিপ্রা যখন মারা যায়, টালির ঘর ছিল দীপের। রাঘবের রিটায়ারমেন্টের পর পাওয়া টাকা দিয়েই বাড়িটা ঠিক করেছিল। তাই বাবা-মায়ের ঘর বলে আর কিছু নেই। শুধুই বাবার ঘর।
দরজা দিয়ে ঢুকতেই নাকে ধক করে লাগল সেই চেনা গন্ধ। বাবার গন্ধ, ঘামের গন্ধ।
ঘর মোটামুটি গোছানোই! রুমি দায়িত্ব নিয়ে সব ঘর গুছিয়ে রাখে। দীপ এগিয়ে জানলাগুলো খুলে দিল। জানলার পাশের টেবিলটায় রাখা চশমা। পাশেই খবরের কাগজগুলো।
এটা যেন রাঘবের একটা নেশা। মা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করছে— “আরে বাজারটা নিয়ে এসো!”
বাবার কান কোনদিকে জানা নেই। চোখ যেন সারা পৃথিবীর খবরে মেতে আছে। মা বকেই যাচ্ছে। বাবা নির্বিকার।
ছোটবেলার দৃশ্যটা যেন আজও পরিষ্কার।
টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খুলল দীপ। শুরুতেই তারিখ লেখা। তাতে কবে কোন টাকা দিয়েছে, কোথায় কী খরচ হয়েছে। বাড়ির জন্য কতটা দিতে হয়েছে, এমনকি দীপের বৌভাতে যে চার লাখ খরচ হয়েছে খাওয়া বাবদ, সেটাও পরিষ্কার লেখা।
আর নিচে এটাও লেখা—
“সব শেষের পর এখন থাকা বলতে শুধু পেনশনটুকু আর ছেলেটা রইল, শিপ্রা।আমি নিঃস্ব।
দীপ জানত বাড়ি আর দীপের বিয়েতেই রাঘব সব খরচ করে ফেলেছে। তাই তো বাবার চিকিৎসায় কোনো কার্পণ্য করেনি দীপ।কাকা, মামা, এমনকি বাবার প্ৰিয় বড় পিসিও বলেছে—
“দীপ, এবার নিজের কথা ভাব! সদ্য বিয়ে করেছিস! এত ধারদেনা টানতে পারবি না।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওষুধের বাক্সটা খুলল দীপ। অনেক ওষুধ এখনও প্যাকেট কাটা হয়নি। বাছতে শুরু করল দীপ।
গ্যাসের ওষুধ, জ্বরের ওষুধ, ORS— সব যেন থরে থরে সাজানো। পেট খারাপের ওষুধ, প্রেসারের ওষুধ— এগুলো কোনো গরিব দুঃখীর হাতে পড়লে বোধহয় যথার্থ হতো।
একটা লিস্ট করে ওদের লোকাল গ্রুপগুলোতে দিয়ে দিতে হবে। জামাকাপড়গুলো দিয়ে দিতে হবে।
ভেবেই আলমারিটা খুলল দীপ।
খুলতেই চোখে পড়ল কয়েকটা চেনা শার্ট, ফতুয়া। এই কালো চেকের শার্টটা দেখলেই দূর থেকে বুঝতে পারত দীপ যে ওটা ওর বাবাই যাচ্ছে।
সেগুলো ওপর ওপর দিয়ে রাখা। এগুলো দেবে না দীপ! এই চার-পাঁচটা জামা ও-ই পরবে।
শেষ তো সব! পরিবারের এই জামা ক’টাই বেঁচে থাক।
“বাবা…” বলে গোঙাল দীপ।
মায়ের যাওয়ার পর এত কষ্ট হয়নি, কারণ দীপ জানত ওর বাবা আছে। কিন্তু আজ!
জামাকাপড়গুলো বড্ড অগোছালো। সব কটাকেই টেনে বের করল। কিছু রাখবে, কিছু দিয়ে দেবে। আগে বাছাই করতে হবে।
এই কাঠের আলমারিটার ডিজাইনটা বড্ড আধুনিক। এই সুন্দর ঘরের সঙ্গে এরকম ডিজাইন নাকি চলে!
এই সব রুমির পছন্দের। বাবার তাতে কোনো আপত্তি ছিল না। বরং নিজের হাতে আলমারি গোছাবে বলে কী উৎসাহ! কিছুতেই হাত দিতে দিল না রুমিকে।
বাচ্চাদের মতো ব্যবহার দেখে সে কী হাসি রুমি আর দীপ।
এই তো গোছানোর নমুনা। সব অগোছালো।
জামাগুলো টেনে টেনে নামাতে নামাতে বলল দীপ।
হঠাৎ একটা পুরোনো খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
নিচু হয়ে দেখল দীপ, হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম।
উপরে বাবার হাতের লেখা—
“ব্যক্তিগত”।
চলবে।
