#অসময়ের_বৃষ্টি
#পর্ব_৪
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
শারমিন স্মৃতির কথায় আশ্বস্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। স্মৃতি এসে বসল সোফায়, সারার পাশে। সারা মাথা নেড়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে তুমি মায়ের কথাই শুনবে? রান্নাঘরে যাবে না?”
স্মৃতি দুদিকে মাথা নেড়ে জানাল, সে বুঝতে পেরেছে এবং শাশুড়ির কথাই শুনবে।
এরই মধ্যে শারমিন ট্রে হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ট্রে-তে আফ্রিদির জন্য নাস্তা আর চা। স্মৃতি বসা থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়াল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেল শাশুড়ির দিকে, “আমার কাছে দ্যান, আম্মা।”
“দ্যান নয় স্মৃতি, দিন বলো।” পাশ থেকে সারা সুধরে দিল।
শারমিন ওদের কাণ্ড দেখে মুচকি হাসলেন। স্মৃতি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে জিভে কামড় কাটল। তারপর চট করে নিজেকে সংশোধন করে আবারও বলল,
“আমার কাছে দিন, আম্মা।”
সারা এবার হাসল। শারমিন স্মৃতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি নিতে পারবে তো এটা? পড়ে যাবে না তো আবার?”
“আবার জিগায়! একশো বার পারব।” বলেই স্মৃতি যেন আকাশ থেকে পড়ল। আবারও নিজের জিহ্বায় কামড় বসাল সে। এরপর লজ্জিত হেসে সারার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপা, আবারও ভুল হয়ে গেছে। ‘জিগায়’ বাদ… ‘জিজ্ঞেস করেন’ হবে। ঠিক আছে তো এবার?”
শারমিন আর সারা ওদের কাণ্ডে এবার হেসেই ফেললেন। শারমিন ট্রে-টা স্মৃতির হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, এবার একদম ঠিক আছে। যাও তাহলে, আফ্রিদির জন্য নাস্তা নিয়ে যাও।”
স্মৃতি একগাল হেসে ট্রে-টা শক্ত করে হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতেই শারমিন পেছন থেকে ডেকে উঠলেন। কিছুটা চিন্তিত গলায় বললেন, “শোনো স্মৃতি, আফ্রিদি যদি তোমাকে কোনো কারণে বকাবকি করে বা কোনো কটু কথা বলে, তবে মন খারাপ করবে না। এসে সোজা আমাকে সব বলবে, কেমন?”
স্মৃতি সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে বরাবরের মতোই বাচ্চাদের মতো মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা আম্মা, বলব।”
হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে মনের সুখে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে নিজের রুমের দিকে এগোতে লাগল স্মৃতি। দরজাটা খোলাই ছিল, তাই কোনো কিছু না ভেবেই সে ফুরফুরে মেজাজে ঘরের ভেতর পা বাড়াল। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল অঘটন!
মাত্রই আফ্রিদি বাথরুমের দরজা খুলে কেবল বের হয়েছে। পরনে তার কেবল একটা টাওয়াল, যা কোমরে জড়ানো। চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে চওড়া বুকে। সামনে তাকানো মাত্রই আফ্রিদিকে এমন অবস্থায় দেখে স্মৃতির চোখ যেন চড়কগাছ হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই সে এক বিকট চিৎকার জুড়ে দিল,
“ওমা গো!”
চিৎকার দিয়েই সে চট করে হাতের ট্রে-টা কোনোমতে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
আফ্রিদি তো স্মৃতির আকস্মিক গগনবিদারী চিৎকার শুনে উল্টো নিজেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। সে ধড়ফড় করে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বুক চেপে ধরল। ভাবল ঘরে বুঝি ডাকাত পড়েছে না-কি কোনো অঘটন ঘটেছে! স্মৃতি এখনো চোখ দুটো শক্ত করে বুজে বিড়বিড় করে বলতে শুরু করেছে,
“নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ! তওবা তওবা! ইয়া আল্লাহ, এডা আমি কী দেখলাম!”
আফ্রিদি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্মৃতির দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে খানিকটা উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কী হয়েছে, স্মৃতি? তুমি ঠিক আছ? চিৎকার করলে কেন এভাবে?”
স্মৃতি কোনো উত্তর দিল না। সে দুই হাতে চোখ আরও জোরে চেপে ধরে আগের মতোই বলতে লাগল,
“নাউজুবিল্লাহ! আল্লাহ গো, আমার চোখ দুইটা আজ অপবিত্র হয়ে গেল!”
স্মৃতির অদ্ভুত কাণ্ড দেখে আফ্রিদির এবার টেনশন দূর হয়ে রাগ চড়চড় করে মাথায় উঠে গেল। সে আর সহ্য করতে না পেরে চিবুক শক্ত করে ধমকে উঠল,
“কী হয়েছে বলবে তো নাকি? এভাবে পাগলের মতো বারবার নাউজুবিল্লাহ জপছ কেন?”
আফ্রিদির কড়া ধমক খেয়ে স্মৃতি ভয়ে একটু কেঁপে উঠল। তারপর এক চোখের আঙুল সামান্য ফাঁক করে আফ্রিদির দিকে এক পলক তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। অত্যন্ত গম্ভীর আর লজ্জিত গলায় বলল,
“আপনি… আপনি ন্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?”
“হোয়াট? আমি ন্যাংটা?”
আফ্রিদি নিজের দিকে একবার তাকাল। কোমরে শক্ত করে টাওয়াল জড়ানো আছে। সে স্তম্ভিত হয়ে কপালে হাত দিল,
“আই মিন, আমি ন্যুড? তোমার কি মাথায় আসলেই কোনো সমস্যা আছে স্মৃতি? একটা ছেলে গোসল করে টাওয়াল পরে বের হলে সেটাকে ন্যাংটা বলে?”
“সব একই কথা! পুরুষ মানুষের এমন বেআব্রু হয়ে থাকা ঠিক না।”
স্মৃতি এবার আফ্রিদির দিক থেকে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে রইল। তার ঠোঁটের কোণে এখনো “নাউজুবিল্লাহ” জারি আছে।
আফ্রিদি রাগে আর কিছু বলল না। এই মেয়ের সাথে তর্ক করা আর নিজের মাথা দেওয়া সমান কথা। সে আলমারি খুলে চটপট একটা কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নিল। কাপড় পরা শেষ হতেই সে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,
“হয়েছে, তোমার নাউজুবিল্লাহর বলা এবার বন্ধ করো। আমি কাপড় পরেছি। এবার এদিকে ঘোরো।”
আফ্রিদির কথা শুনে স্মৃতি ধীরে ধীরে ওর দিকে ফিরে তাকাল। আফ্রিদিকে শরীর ঢাকা পোশাকে পরিপাটি অবস্থায় দেখে মেয়েটা এতক্ষণে বুকের ভেতর থেকে একটা স্বস্তির দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। যাক বাবা, লোকটা তবে পুরোপুরি অসভ্য নয়!
স্মৃতি টেবিলের ওপর রাখা চায়ের ট্রে-টার দিকে ইশারা করে খুব শান্ত গলায় বলল,
“আপনার নাস্তা আর চা রেখেছি এখানে। দয়া করে খেয়ে নিন।”
আফ্রিদি আর কথা বাড়াল না। সত্যি বলতে, পেটেও বেশ খিদে চড়েছে। সে সোফায় বসে টেবিলে রাখা বাটি থেকে নাস্তা মুখে তুলল। এক লোকমা খেয়ে আফ্রিদি স্মৃতির দিকে আড়চোখে তাকাল। মেয়েটা ঘরের কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
আফ্রিদি চিবানো শেষ করে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি খেয়েছ?”
স্মৃতি মাথা নেড়ে খুব সহজ গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমি আম্মার সাথেই দুপুরে খেয়ে নিয়েছি।”
আফ্রিদি চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাবে, ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ওর ফোনটা আবারও তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আফ্রিদির চায়ের চুমুক গলায় আটকে যাওয়ার জোগাড়! পর্দায় জ্বলজ্বল করছে রাহির নাম। এবার আর কলটা কেটে দেওয়ার বা ইগনোর করার কোনো উপায় নেই। কারণ, গত আধঘণ্টার মধ্যে অলরেডি দশ-দশবার কল করে ফেলেছে মেয়েটা। এখন রিসিভ না করলে নির্ঘাত সাফোয়ানের ফ্ল্যাটে এসে হাজির হবে।
শুকনো একটা ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা আঙুলে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল আফ্রিদি। ওপাশ থেকে হ্যালো বলার আগেই যেন এক বালতি ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দিল রাহি,
“এই আফ্রিদির বাচ্চা! তোর কী হয়েছে বল তো শুনি? তুই কি মরে-টরে গেছিস? তোর জানাজার খবর তো আমি পাইনি এখনো!”
রাহির এমন চিৎকারে আফ্রিদি ফোনটা কান থেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিল। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিও আফ্রিদির ফোনের ওপাশ থেকে আসা কর্কশ চিল-চিৎকার স্পষ্ট শুনতে পেল এবং চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
আফ্রিদি নিজেকে সামলে নিয়ে একটু আমতা আমতা করে বলল,
“আরে… এত রাগারাগি করছ কেন? গ্রামে গিয়েছিলাম একটা কাজে, ওখানে নেটওয়ার্কের খুব সমস্যা ছিল, তাই…”
“তা এখন তো শহরে ফিরেছিস, নাকি এখনো গ্রামেই পড়ে আছিস?”
ওপাশ থেকে রাহি ধমকের সুরে কেটে কেটে বলল,
“এখুনি এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হ। আমি ক্যাফেতে বসে আছি, দেখা করব। আই মিস ইউ সো মাচ!”
আফ্রিদি ঘরের চারপাশটায় একবার চোখ বুলাল। একদিকে তার সদ্য বিবাহিত অনাকাঙ্ক্ষিত স্ত্রী, আর অন্যদিকে দুই বছরের প্রেম। সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিচু গলায় বলল,
“এখন না রাহি… পরে কোনো এক সময় দেখা করব।”
“কেন? পরে কেন?” রাহির কণ্ঠস্বর আরও চড়ে গেল।
“আমি একটু বিজি আছি এখন।”
“হোয়াট? বিজি? পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে মাস্তানি আর রংবাজি করা ছাড়া কোন মহান কাজে বিজি আপনি, শুনি? বাসায় কি নতুন বউ এনে রেখেছেন নাকি যে তাকে সময় দিচ্ছেন?”
রাহির খোঁচাটা তীরের মতো এসে বিঁধল আফ্রিদির বুকে। সে খুব শান্ত গলায় জবাব দিল,
“হ্যাঁ, বউ আছে আমার বাসায়।”
আফ্রিদির এমন উত্তর শুনে ওপাশ থেকে রাহি হাসল। সে ভাবল আফ্রিদি হয়তো তার সাথে ইয়ার্কি মারছে। রাহি দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“ফাজলামি করিস না আফ্রিদি! তুই কি এখন সোজা এখানে আসবি, নাকি আমি তোর বাসায় এসে তোকে কলার ধরে টেনে নিয়ে আসব?”
রাহির হুমকিতে আফ্রিদির শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে, রাহি যা বলে তা করে দেখানোর মতো মেয়ে। সে যদি সত্যি সত্যি এখন খন্দকার বাড়িতে এসে হাজির হয়, তবে আজই তার জীবনের শেষ দিন হবে!
ভয়ে আফ্রিদির কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ল। সে দ্রুত টেবিল থেকে চাবির গোছাটা তুলে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আসছি আমি। আধঘণ্টা সময় দে।”
বলেই কলটা কেটে দিল সে। আজই সবকিছু বলতে হবে রাহিকে, নইলে দেরি হয়ে যাবে। এসব ভেবে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল আফ্রিদি। স্মৃতির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আমি বের হচ্ছি। “
পরক্ষণেই চমকাল কে। বের হবে সেটা আবার স্মৃতিকে কেন বলল সে?
“ না খেয়ে কোথাও যাবেন না। “
স্মৃতি কাছে এগিয়ে এল। আফ্রিদির হাত ধরে সহজ মনে বসিয়ে দিল। আফ্রিদি অবাক দৃষ্টিতে স্মৃতির কান্ডকারখানা দেখছে।
চলবে…..
