#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৬
আরহান আমেরিকা চলে গেছে এক বছর হয়ে আসলো। আয়জার কাছে এই এক বছর কয়েক বছরের সমান মনে হচ্ছে। সময় যেনো কাটতেই চাচ্ছে না। দিনগুলো যেনো পাড়ই হচ্ছে না। এই পর্যন্ত আরহান তাকে তিনবার চিঠি পাঠিয়েছে। সেই চিঠি জড়িয়ে ধরে কত রাত কান্না করেছে আয়জা তার কোনো হিসাব নেই। চিঠিগুলো তাকে নীলিমা এনে দিতো। আয়জার বাবা মায়ের ভয়ে আরহান তাদের ঠিকানায় চিঠি পাঠানোর সাহস করে নি। আয়জাও তাকে তিনবার চিঠি পাঠিয়েছে। এত দূরের দেশ চিঠি পাঠালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাস লেগে যায়। তার একটু খবর পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করা লাগে। এর মাঝে আরহান মাত্র একবার টেলিফোনে কল দিয়েছিলো। কয়েক মিনিট কথা বলে কল কেটে দিয়েছে। বাহিরের দেশ থেকে কল করলে টাকা প্রচুর কাটে যার কারণে টেলিফোনে কল দেওয়া হয় না। এই কয়েক মিনিট তার আওয়াজ পেয়ে আয়জার মন যেনো আরও ব্যাকুল হয়ে উঠে।
এই সময়ে আয়জা এবং নীলিমার কলেজের এক বছর পূরণ হয়। আয়জা দেখতে সুন্দর হওয়ায় তার জন্য অনেক ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু মেয়ের জ্বীদের কাছে হেরে মেহেরুন্নেসা নিরুপায়। তিনি দিন রাত এক করে মেয়েকে কথা শোনান।
আরহান আমেরিকায় পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক চাকরি ও করে। সেখান থেকে নিজের খরচ রেখে বাকি টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তার পরিবারের সকলে তার উপর ভীষণ সন্তুষ্ট।
দেখতে দেখতে আরও দুই বছর কেটে যায়। কথা ছিলো আরহান তিন বছর পর দেশে এসে তাকে বিয়ে করে সাথে নিয়ে যাবে । কিন্তু আরহানের আসার কোনো খবরই নেই। প্রথম দুই বছর তাদের মাঝে ঘন ঘন চিঠি আদান প্রদান থাকলেও তিন নাম্বার বছরে সেটি আরহানের তরফ থেকে কমে আসে। আয়জা ঠিকই তাকে প্রতিনিয়ত নিয়ম করে চিঠি লিখে গেছে কিন্তু তার তরফ থেকে চিঠির উত্তর আর আগের মতন পায় নি। এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সে শুধু ব্যস্ততা দেখাতো। ইদানীং আয়জা খেয়াল করেছে নীলিমাও তার সাথে কথা কম বলছে এবং দুরত্ব বজায় রাখছে। এর কারণ সে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে তাদের সকলের ব্যবহার এত পাল্টে গেলো কি করে?
আরহানের পড়াশোনা শেষ। আমেরিকায় ভালো বেতনে একটি চাকরিও পেয়েছে সে। দেখতে সুদর্শন হওয়ায় সেখানকার মেয়েরা তার আগে পিছে ঘুরে। বাহিরের দেশের এত চাকচিক্য দেখে নিজের দেশের কথা যেনো সে প্রায় ভুলেই গিয়েছে। এমন কি দেশে যে তার জন্য একজন নারী তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছে সেটাও ভুলে গিয়েছে সে। আরহানের পরিবারের মনোভাব, আরহান বিদেশ থেকে পড়াশোনা করেছে তার দামই এখন অন্যরকম। সে আর আগের আরহান নেই। সে আরও ভালো ঘরের মেয়ে পাবে। এক তো সে দেখতে খুবই সুদর্শন তার মধ্যে আবার এখন বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে চাকরি করে। মেয়ের বাবারা তো তাদের কাছে দিন রাত ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মেয়েকে আরহানের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। এর জন্য তারা আরহানকে জায়গা, জমিন, সম্পদ সব কিছু দিতেও রাজি। এসব কারণে আরহানের পুরো পরিবারের মন পরিবর্তন হয়ে যায়। এসব কিছু অজানা রয়ে যায় আয়জার। বোকা মেয়েটি তো এখনো আরহানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~
দীর্ঘ দিনের অপেক্ষার পর আজ অবশেষে আরহান দেশে আসছে। আয়জার তো খুশির কোন ঠিকানা নেই। এই বুঝি তার দুঃখের দিন শেষ হতে চলেছে। অথচ সে কখনো কল্পনাও করে নি তার দুঃখের দিন তো এখন থেকে কঠোরভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। আরহান দেশে ফেরার পর আয়জার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করে নি। আয়জা তার সাথে চেয়েও যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনকি নীলিমার সাথেও কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনটা তো হওয়ার কথা না। সেই যোগাযোগ করার সুযোগ পাচ্ছে না ? নাকি তারা তাদের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ দিচ্ছে না? মেহেরুন্নেসা উঠতে বসতে আয়জার সাথে খারাপ ব্যবহার করছেন । তার ভাষ্যমতে সে আগেই বলেছিলেন এমন কিছুই হবে কিন্তু আয়জা তার কথাকে পাত্তা দেয় নি। আয়জা নীলিমাদের বাসায় যায়। সেখানে গিয়ে দেখে আরহান বাসার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। আয়জা দৌঁড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এমন জিজ্ঞেস করে,
আপনি আসার পর থেকে আমার সামনে একবারও আসেন নি কেনো? আমার সাথে যোগাযোগ করেন নি কেনো?
আরহান তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে,
কেমন আছো?
তার এমন ঠান্ডা মনোভাব দেখে আয়জার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে আরহানের দিকে ভালোমতো তাকায়। এ যেনো অন্য এক আরহান। একদম অপরিচিত। তার আরহান তাকে এত বছর পর দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতো। সে কখনোই এমন ঠান্ডা মনোভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না। আয়জা শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
আছি ভালোই। আপনি কেমন আছেন?
_ ভালো।
_ আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না যে?
আরহান কিছু বলার আগেই নীলিমা একটি বিদেশি মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। মেয়েটি সোজা এসে আরহানের পাশে দাঁড়ায় এবং তার হাত ধরে। এই দৃশ্য দেখে আয়জার মাথার উপর যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে। সে যেনো তার চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। তার শরীরে কাপনি উঠে যায়, গলায় কথা আটকে আসে। বিদেশি মেয়েটি আরহানকে জিজ্ঞেস করে,
এই মেয়েটা কে আরহান?
আরহানের সরাসরি উত্তর,
ও নীলিমার বান্ধবী। ওরা এক সাথে স্কুলে এবং কলেজে পড়াশোনা করেছে।
আয়জা বিষ্ময় নিয়ে আরহানের দিকে তাকায়। যে ছেলেটা তাকে প্রেয়সী প্রেয়সী বলে ক্লান্ত হতো না সেই ছেলেটা তাকে নীলিমার বান্ধবী বলে পরিচয় দিচ্ছে?
মেয়েটি হাসি মুখে আয়জার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
হাই! আমি এমা। আরহানের ফিয়ন্সে। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই ভালো লাগলো।
মেয়েটির মুখে আরহানের ফিয়ন্সে শুনে আয়জা চমকে উঠে। সে আরহানের দিকে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে,
ও কি বলছে? এটা কি সত্যিই?
_ আসলে….
_ আমি যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটার উত্তর দিন । ও যা বলছে এটা কি সত্যিই?
আরহান মাথা নিচু করে বলে,
হ্যাঁ।
আয়জা তার মুখে হ্যাঁ শুনে দুই কদম পিছিয়ে যায়। চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। আয়জা কাপা কাপা গলায় প্রশ্ন করে,
কেনো?
ওপর পাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না। আয়জা এবার চিল্লিয়ে প্রশ্ন করে,
কেনো? এমনটা কেনো করলেন আমার সাথে? আমার কি দোষ ছিলো?
আয়জা আরহানের সামনে গিয়ে তার শার্টের কলার ধরে তাকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করে,
আমি এসেছিলাম আপনার কাছে? নাকি আপনি এসেছিলেন আমার কাছে ভালোবাসার প্রস্তাব নিয়ে? আমি বারবার আপনাকে ফিরিয়ে দেই নি? তাও আপনি উঠে পড়ে লেগেছিলেন আমার পিছু। দিন রাত এক করে আমার পিছু ঘুরেছেন। কই গেলো সেই ভালোবাসা? হ্যাঁ?
আয়জা একটু থেমে আবার বলে,
তিনটা বছর আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করেছি। আমার পরিবারের নানা কথা শুনেছি। এই দিন দেখার জন্য? আপনি না আমার সাথে এনগেজমেন্ট করে গিয়েছিলেন? সেটাও ভুলে গিয়েছেন? আপনি না বলতেন আমাকে ছাড়া বাঁচবেন না? আমাকে ছাড়া আপনার শূন্য লাগে? আমি নাকি আপনার গোটা দুনিয়া? এইসব কথা মিথ্যা ছিলো? বানোয়াট ছিলো? দিন শেষে যদি ধোঁকাই দেয়ার ছিলো তাহলে আমাকে কেনো আপনাকে ভালোবাসতে বাধ্য করলেন ? আমি তো আপনাকে ভালোবাসতে যাই নি। আপনি আমাকে বাধ্য করেছেন।
এই কথা বলে আয়জা আরহানের শার্টের কলার ছেড়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় এবং চিৎকার করে কান্না করতে থাকে। আরহান মৃদু কণ্ঠে তাকে বলে,
সরি।
আয়জা চোখ ভর্তি পানি নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে ,
আপনার সরি দিয়ে আমি কি করবো? আপনার সরি কি সব ঠিক করে দিতে পারবে? আপনার সরি কি আমার তিনটা বছরের অপেক্ষা ফিরিয়ে দিতে পারবে? আপনার সরি কি আমার পরিবারের মান ইজ্জত ফিরিয়ে দিতে পারবে? কিচ্ছু পারবে না। তাহলে এই সরি দিয়ে আমি কি করবো?
আয়জা এক কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা নীলিমার দিকে তাকায়। সে নীলিমার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
তুই এইসব জানতি তাই না? এর জন্যই আমার সাথে দুরত্ব বাড়াছিল্লি?
নীলিমা মাথা নিচু করে ফেলে। আয়জা নীলিমার গালে জোরে একটি চড় মারে। আরহান তাকে থামাতে আসলে আয়জা তাকেও একটি চড় মারে। আরহান গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে আয়জার দিকে তাকিয়ে থাকে। আয়জা নীলিমার দিকে তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
আজ এই মুহূর্ত থেকে আমার নীলিমা নামের কোনো বান্ধবী নেই এবং পূর্বেও ছিলো না। আমার জীবনে তোর কোনো অস্তিত্ব নেই।
আয়জা আরহানের দিকে তাকিয়ে বলে,
জীবনের কোনো পর্যায়ে আল্লাহ যেনো কখনো আপনার চেহারা আমাকে না দেখায় । এই পৃথিবীতে আমার জীবনে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হচ্ছেন আপনি।
আয়জা তার হাত থেকে এনগেজমেন্টের আংটিটি খুলে আরহানের মুখে ছুঁড়ে মেরে সেখান থেকে চলে আসে।
~~~~~~~~~~~~
আয়জা ঘরে ঢোকার সাথে সাথে মেহেরুন্নেসা তাকে জিজ্ঞেস করেন,
কি হলো ফিরিয়ে দিয়েছে?
আয়জা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মেহেরুন্নেসা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে জোরে একটি চড় মেরে বলেন,
আমি তো জানতাম দিন শেষে এমনটাই হবে। আমি বলেছিলাম না ও ছেলে হিসেবে ভালো না? এখন আমেরিকা গিয়ে চাকরি করছে চোখে রঙিন চশমা তার। এখন কি আর তোকে ভালো লাগবে ওর?
মেহেরুন্নেসা আয়জার চুলের মুঠি ধরে তাকে বলে,
ওর জন্য অপেক্ষা করে করে বয়স বারিয়েছিস। এখন কে বিয়ে করবে তোকে? আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে তোদের এনগেজমেন্ট করানো হয়েছে। তাদেরকে কিভাবে মুখ দেখবো আমরা? তখন কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসছিলো। এখন কি আর আসবে? সারাজীবন আমাদের ঘাড়ের উপর বসে খাবি?
এই কথা বলে মেহেরুন্নেসা আয়জাকে ছুঁড়ে মারেন। আয়জা নিচে পড়ে যায় এবং কান্না করতে থাকে। আয়জা তার বাবার কাছে গিয়ে বলে,
আব্বা আমাকে মাফ করে দাও।
জাওয়াদ আহমেদ সবাইকে অবাক করে দিয়ে আয়জার গালে চড় মারেন। ছোট থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আয়জার গায়ে ফুলের টোকাও পড়তে দেন নি। সেই মানুষটা আজ জীবনে প্রথম তার গায়ে হাত তুললো। জাওয়াদ আহমেদ বাসা থেকে বের হয়ে যান। মেহেরুন্নেসা নিজের ঘরে চলে যান। তাহমিদ সাফওয়ানকে নিয়ে বাহিরে চলে যায়। আয়জা মেঝেতে পড়ে চিৎকার করে কান্না করে। সে কান্না করতে করতে বলে,
এসবে আমার দোষটা কোথায় ছিলো? তাকে বিশ্বাস করাটাই কি আমার দোষ? আমি সব হারিয়ে ফেললাম। আমি সব হারিয়ে ফেললাম।
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৭
সেদিনের পর থেকেই আয়জার জীবনটা কঠিন হয়ে যায়। চঞ্চল হরিণী শান্ত হয়ে যায়। একদিকে দিনরাত মায়ের বকা এবং অপমান তো অন্যদিকে আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের করা কটাক্ষ। আয়জা বেশিরভাগ সময়ই তার ঘরের এক কোনায় মেঝেতে মন মরা হয়ে পড়ে থাকে। এত সুন্দর মুখটা কয়েকদিনেই মলিন হয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গিয়েছে। আগের থেকে বড্ড রোগা দেখায় এখন তাকে। আয়জার জন্য মন মতো কোনো সম্বন্ধও খুঁজে পাচ্ছেন না মেহেরুন্নেসা। যাও দুই একটা ভালো সম্বন্ধ আসে প্রতিবেশীদের কানাঘুষোয় সেগুলো চলে যায়। রাগে ক্ষোভে মেহেরুন্নেসা আয়জাকে বহুদিন মারধর করেছেন। আয়জা একটি বারও প্রতিবাদ করে নি। সে একটি বারও আটকানোর চেষ্টা করে নি। কোন মুখে করবে? সব দোষ তো তারই। সে কেনো সেই লোককে বিশ্বাস করেছে? শেষ পর্যন্ত কেনো নিজের কিশোরী মনকে বেঁধে রাখতে পারে নি? পারলে তো আজ এই দিন দেখা লাগতো না। তাই সব দোষ তারই। মায়ের হাতে মার খাওয়া তার প্রাপ্য।
উক্ত ঘটনার ঠিক এক বছর পর আয়জারা যশোর থেকে একবারের জন্য ঢাকায় চলে আসে। জাওয়াদ আহমেদ এখানে একটি ফ্ল্যাট কিনে নেন। ঢাকায় আসার পর আয়জা আগের তুলনায় বেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আগের মতন অত চঞ্চল না হলেও কিছুটা চঞ্চল হয়েছে। এখানে আসার পর তার বিয়ের জন্য কয়েকটি সম্বন্ধও এসেছে। মেহেরুন্নেসা তাদের এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে কয়েকজনের সাথে কথা বলছিলেন। তখন তাদের মধ্যে থেকে হঠাৎ একজন বলে উঠেন,
আমার ভাইয়ের জন্য ভালো মেয়ে পেলে দেখিয়েন তো আপনারা। আমার ভাই জার্মানিতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই দেশে আসছে। এবার আসলে বিয়ে করিয়ে দিবো।
এই কথা শুনে মেহেরুন্নেসা বলেন,
আমার বিয়ের যোগ্য মেয়ে আছে। আপনারা চাইলে এসে দেখে যেতে পারেন।
_ আচ্ছা আমি বাসায় গিয়ে মায়ের সাথে কথা বলে আপনাদেরকে জানাবো।
~~~~~~~~~~~~~~~~
কেমন আছিস বাপ আমার?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো মা?
_ আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ ভালোই রাখছে। দেশে আসবি কবে বাপ?
_ সামনে সপ্তাহে আসবো ইন শা আল্লাহ।
_ তোর সাথে একটা কথা ছিলো।
_ বলো।
_ তোর বয়স তো কম হলো না। বত্রিশ বছর হয়ে গেছে। এখন তো বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যা।
_ আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা মেয়ে দেখো।
_ আচ্ছা । তুই আল্লাহর নাম নিয়ে সাবধানে আসিস।
_ আল্লাহ হাফেজ।
ছেলের সাথে টেলিফোনে কথা শেষ করে কল কেটে দেন রাবেয়া বেগম। তিনি তার বড় মেয়ে আফসানাকে বলেন,
সাইফ আসছে সামনে সপ্তাহে। ওর জন্য মেয়ে দেখা শুরু করো।
_ মা কয়েক জায়গা থেকে ভালো মেয়ের সন্ধান পেয়েছি। এক এক করে দেখে আসবো?
_ হ্যাঁ যাও। সাথে তোমার ফুপুকেও নিয়ে যেও।
_ আচ্ছা।
আফসানা তার ফুপু সুফিয়াকে নিয়ে আয়জাসহ কয়েকটি মেয়ের বাসায় গিয়ে দেখে আসে। তাদের মধ্যে থেকে আয়জা এবং আরেকটি মেয়ে তাদের বেশ পছন্দ হয়। তাদের পরিবারকে এই কথা বললে রাবেয়া বেগম বলেন,
সাইফকে দুইজনকেই দেখতে যেতে বলবো। সে যাকে পছন্দ করবে তার সাথেই বিয়ে হবে।
~~~~~~~~~~~~~~~
দীর্ঘ ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখলো সাইফ। ছয় বছর আগে একবার এসেছিলো তিন মাস থেকে আবার চলে গিয়েছিলো সে। এবার তার মা আগেই বলে দিয়েছেন তাকে বিয়ে করানো হবে সে যেনো বেশি দিনের ছুটি নিয়ে আসে। তাই এবার সে ছয় মাসের ছুটিতে দেশে এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই সে দেখতে পায় তার বাবা এবং বড় দুলাভাই তাকে নিতে এসেছেন। সাইফ প্রথমেই বাবাকে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরে এরপর তার দুলাভাইকে জড়িয়ে ধরে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা বাসায় চলে আসে তারা। বাসায় এসে সবার আগেই সাইফ ছুটে যায় তার মায়ের কাছে। প্রচন্ড মা ভক্ত ছেলে সে। তার মাও সব সন্তানের থেকে তাকে বেশি আদর করেন। রাবেয়া বেগম তার বড় ছেলে সাইফ বলতে অজ্ঞান।
রাবেয়া বেগম এবং মাহবুব আলমের চার সন্তান। দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে। তার প্রথম সন্তান আফসানা। যার তাদের পাশের এলাকাতেই বিয়ে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় সন্তান শেহজাদ খান সাইফ, তৃতীয় সন্তান মেহেদী হাসান এবং সর্বশেষ এবং কনিষ্ঠ সন্তান লাবিবা। তাদের পরিবার মধ্যবিত্ত ছিলো প্রথমে। পরিবারের এতজন সদস্য নিয়ে সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলেন মাহবুব আলম। মেট্টিক পরীক্ষার পর সাইফ জিদ ধরে বিদেশে গিয়ে কাজ করার। এক বিঘা জমি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে ছিলেন তিনি। সাইফ ছোটবেলা থেকেই খুবই পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান একজন ছেলে। সে বেশ সহজেই সবার সাথে মিশে যেতে পারে। জার্মানিতে গিয়ে ছয় মাসের মধ্যেই সেখানকার ভাষা শিখে ফেলে সাইফ। তার ব্যবহার এবং মিশুক আচরণের কারণে সবাই তাকে খুবই পছন্দ করতো। প্রচুর পরিশ্রম করে সে ঢাকায় জমি কিনে এবং সেখানে বাড়ি করে। কিছু বছর পর তার ছোট ভাইকেও তার সাথে জার্মানিতে নিয়ে যায় সে। দুই ভাই মিলে বাড়িটি সুন্দর করে তৈরি করে। একটানা চার, পাঁচ বছর পর পর একবার দেশে আসে সাইফ। রাবেয়া বেগম বহু বছর ধরেই তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন কিন্তু সে রাজি হচ্ছিলো না। এবার অবশেষে তিনি ছেলেকে রাজি করাতে পেরেছেন।
সবার সাথে কথাবার্তা বলে খাবার খেয়ে সাইফ ঘুম দেয়। সে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল ভোর সাতটায়। একেবারে জোহরের আযান শুনে ঘুম থেকে উঠে সে। গোসল করে নামাজ পড়তে মসজিদে যায় সে। নামাজ পড়ে বাসায় এসে সবার সাথে দুপুরের খাবার খেতে বসে সাইফ। তখন রাবেয়া বেগম তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
আজকে বিকেলে বোনদের নিয়ে মেয়েগুলোকে দেখে আসো।
_ আচ্ছা।
_ আগে বরং জাওয়াদ আহমেদের মেয়ে আয়জাকে দেখে আসো। ওখান থেকে আসার পথে আবার রিপন হোসেনের মেয়ে নাজিয়া কে দেখে এসো।
_ আচ্ছা।
বিকেলে সাইফ সুন্দর একটি নেভিব্লু শার্ট পরে চুল গুলোকে সেট করে নেয় এবং হাতে ঘড়ি পড়ে। তার ফুপু সুফিয়া এবং তার ছেলে নাহিদ আসে সাইফদের বাড়িতে। কারণ তারাও মেয়ে দেখতে সাথে যাবে। আফসানা এবং লাবিবাও তৈরি হয়ে বসে আছে। তারা সকলে রওনা হয় আয়জাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তাদের যাওয়ার পথে সাইফ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলে,
শোনো সবাই আমিই যে ছেলে এই কথা তাদেরকে বলবে না।
লাবিবা জিজ্ঞেস করে,
কেনো?
_ আমি মেয়ের আসল রূপ দেখতে চাই। সে কেমন তার আচার আচরণ কেমন? মেয়ের পরিবার কেমন সেটাও জানতে চাই। তারা যদি জানে যে আমিই ছেলে তাহলে বাড়তি আপ্যায়ন করবে ।
সাইফের ফুপু বলেন,
সেটা নাহয় বুঝলাম । কিন্তু তাদেরকে কি বলবো তুই কে?
_ বলবে আমি ছেলের খালাতো ভাই।
_ আচ্ছা ঠিক আছে।
~~~~~~~~~~~~~
সোফায় বসে আছে সাইফরা। মেহেরুন্নেসা তাদের সামনে বিভিন্ন নাস্তা সাজিয়ে দিচ্ছেন। তিনি সুফিয়া বেগমকে বলেন,
আপনারা যে আসবেন আমাকে আগে জানাবেন না? আমি ভালোমতন নাস্তার ব্যবস্থা করতাম।
_ কিযে বলেন না আপা। এই অল্প সময়ের মধ্যে কি কম আয়োজন করেছেন আপনি?
_ সবার সাথে তো পরিচয় করিয়ে দিলেন না?
সুফিয়া উনার ছেলেকে দেখিয়ে বলেন,
এটা আমার ছেলে নাহিদ। ছেলের ফুপাতো ভাই। আফসানা ছেলের বড় বোনকে তো চিনেনই।
_ হ্যাঁ।
_ আফসানার পাশের জন হচ্ছে লাবিবা ছেলের ছোট বোন।
তারা আসার পর থেকেই মেহেরুন্নেসার নজর কেড়েছে সাইফ। যদিও তিনি জানেন না এটাই ছেলে তবুও সে খুবই চালাক এবং বিচক্ষণ নারী কিনা। তিনি সাইফের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করেন,
এটা কে?
_ এটা ছেলের খালাতো ভাই।
সাইফ তাকে সালাম দেয়। মেহেরুন্নেসা সালামের উত্তর নিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
তোমার নাম কি?
সবাই সাইফের দিকে তাকায়। সাইফ যদি তার নাম বলে তাহলে তারা ধরা পড়ে যাবে । সাইফ মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
জ্বি আমার নাম শেহেজাদ খান ।
_ ওহ।
আয়জার পরিবার ছেলের পুরো নাম জানে না শুধু সাইফটুকুই জানে। মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করেন,
ছেলে না দেশে এসেছে?
_ হ্যাঁ।
_ ছেলেকে সাথে আনলেন না যে?
_ ছেলেও কিছুদিনের মধ্যেই মেয়ে দেখতে আসবে। আপনার মেয়েকে ডাক দিন।
_ জ্বি ডাকছি।
চলবে।
