#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৪
আয়জা রুমে এসে দেখে নীলিমা নিশ্চিন্তে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এটা দেখে চট করে ঠান্ডা মাথাটা গরম হয়ে গেলো আয়জার। সে বিড়বিড় করে বলে,
বাহ ! আমি কষ্ট করে স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হলাম আরামের ঘুম বাদ দিলাম । এই এদিকে ম্যাডাম কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। দাঁড়া তোর আরামের ঘুম আমি হারাম করছি।
আয়জা হঠাৎ করে নীলিমাকে ঝাঁকি দেয় এবং ডেকে তুলে। নীলিমা ভয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বলে,
ভূমিকম্প! ভূমিকম্প! আম্মু ভূমিকম্প।
আয়জা নীলিমার মাথায় চড় মেরে বলে,
ঘুম থেকে উঠ । কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে না। আমি ঝাকিয়েছি তোকে।
_ তুই ? তুই কখন এলি?
_ অনেকক্ষণ হয়েছে। এই গরমে আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে বিছানায় পরে ঘুমাচ্ছিলি লজ্জা করে না তোর?
_ নাহ। লজ্জা সেটা আবার কি জিনিস? খায় নাকি মাথায় দেয়?
_ একদম ফাজলামি করবি না। মেরে ভর্তা বানিয়ে দিবো। তুই স্কুলে যাবিনা আমাকে আগে বললেই তো হতো। আমিও তাহলে ঘুমিয়ে থাকতাম।
_ আমি তো যাবো ভেবেছিলাম কিন্তু ঘুম ভাঙ্গে নি । সরি।
_ তোর সরি তোর কাছে রাখ। তোর সরি দিয়ে আচার বানিয়ে খা।
_ আর হবে না এমন সত্যি বলছি।
_ তোর একটা জামা বের করে দে।
_ কেনো?
_ জামা দিয়ে মানুষ কি করে?
_ জামা মানুষ পড়ে।
_ আমিও তাহলে বাকি মানুষদের মতো পড়বো আমি জামা দিয়ে ঘুড়ি উড়াবো না। ( বাকা চোখে চেয়ে )
_ তুই কি থাকবি?
_ হুম বিকাল পর্যন্ত। আন্টি দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছে।
_ সত্যি! ওয়াও! আমি অনেক খুশি। ( আয়জাকে জড়িয়ে ধরে )
নীলিমা আয়জাকে তার একটি রানি গোলপাপি রঙের সালোয়ার কামিজ বের করে দেয়। আয়জা হাত মুখ ধুয়ে সেটি পড়ে নেয়। আয়জা নীলিমাকে নাস্তা করতে পাঠায়। সে নীলিমার রুমে বসে রেডিও চালু করে। রেডিও শুনতে শুনতে নীলিমা নাস্তা শেষ করে এসে পড়ে। দুই বান্ধবী মিলে ছাদে উঠে। ছাদে নীলিমার মা আমের আচার বয়োমে করে রোদে দিয়েছেন। ছাদে এসেই দুই বান্ধবীর চোখ যায় আচারের বয়োম গুলোর উপর। দুজন হামলে পড়ে আচারের বয়মের উপর। ছাদের এক পাশে পা ঝুলিয়ে গল্প করতে করতে আচার খায় দুই বান্ধবী। উপর থেকে রাস্তা দিয়ে আসা যাওয়া করা মানুষদেরকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তারা খেয়াল করে আরহান দুই হাত ভর্তি বাজার নিয়ে হেঁটে বাসার দিকেই আসছে। গরমে ঘেমে তার শরীর ভিজে গেছে। ফর্সা মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কোকড়ানো চুলগুলো অগুছালো হয়ে উঠেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আয়জা ছাদ থেকে হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আরহান হঠাৎ উপরে তাকায়। তার চোখে তার দিকে চেয়ে থাকা প্রেয়সীর মুখখানা ভেসে উঠে । সে মুচকি হাসি দেয়। আয়জা সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নেয়। তার অজান্তেই সে হা করে তাকিয়ে ছিলো আরহানের দিকে। কি করে ফেলেছে বুঝতে পেরে আয়জা প্রচন্ড লজ্জা বোধ করে। নিজের মাথায় নিজে একটা গাট্টা মারে। সে মনে মনে ভাবে, না জানি ভাইয়া তার সম্পর্কে কি না কি ভাবছে। ধুর।
আরহান ঘরে ঢুকে সব বাজারের ব্যাগগুলো টেবিলে রাখে । তার মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ,
এত কিছু কি এনেছিস? আমি তো শুধু গরুর মাংস আনতে বলেছিলাম ।
_ বিরিয়ানি রান্না করো আম্মু। বিরিয়ানির জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু নিয়ে এসেছি।
_ তুই এত টাকা পেলি কই? আমি তো শুধু মাংসের টাকা দিয়েছিলাম।
_ আমার কাছে ছিলো টাকা। ইউনিভার্সিটির জন্য যে প্রতিদিন আমাকে টাকা দাও সব টাকা তো আর লাগে না। কিছু টাকা জমে ছিলো সেগুলো দিয়েই আনলাম।
_ হঠাৎ?
_ এমনি। আমার বিরিয়ানি খেতে মন চাচ্ছে তাই।
_ আচ্ছা যা গোসল করে এসে নাস্তা করে নে। আমি দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করি।
_ আচ্ছা।
আরহান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলো এবং নীলিমারা নিচে নামছিলো। তাদের সামনাসামনি দেখা হয়ে যায়। আরহান প্যান্টের পকেট থেকে দুটো মিমি চকলেট বের করে নীলিমার হাতে দিয়ে বলে,
নে চকলেট খা।
_ তুমি চকলেট দিচ্ছো ভাইয়া? বিশ্বাস হচ্ছে না।
_ বিশ্বাস না হওয়ার কি আছে আমি কি তোকে চকলেট কিনে খাওয়াই না?
_ না।
_ একদম মিথ্যা বলবি না । সব চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবো মিথ্যা বললে।
_ পারলে ছিঁড়ে দেখিও আব্বু তোমাকে আস্ত রাখবে না।
_ সর সামনে থেকে তোর সাথে কথা বলার আমার ইচ্ছে নেই।
নীলিমা সরে দাঁড়ালে আরহান উপরে উঠে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়,
রাক্ষসের মতো একাই সব চকলেট খেয়ে ফেলিস না। তোর বান্ধবীকেও দিস।
নীলিমা কিছুক্ষণ তার ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠে,
আমার সিন্দেহ হচ্ছে।
আয়জা প্রশ্ন করে,
কি সন্দেহ হচ্ছে তোর ?
_ আমার সন্দেহ হচ্ছে যে ভাইয়া মনে হয় তোকে পছন্দ করে।
_ কি যা তা বলছিস তুই? মাথা ঠিক আছে তোর?
_ মাথা আমার ঠিকই আছে। ভাইয়ার ব্যবহারে বুঝাই যাচ্ছে।
_ তোর মাথা। সব সময় দুই লাইন বেশি বুঝিস তুই।
_ ঠিক আছে। আমিও প্রমাণ দিবো আমার ধারণা ঠিক না ভুল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
দুপুরে সবাই খাবার টেবিলে একত্রে বসেছে। নীলিমার মা টেবিলে বিরিয়ানির হারি এনে রাখেন। বিরিয়ানি দেখেই আয়জার চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠে। সে খুশি হয়ে বলে,
আন্টি তুমি বিরিয়ানি রান্না করেছো? বিরিয়ানি আমার অনেক পছন্দ।
আরহান মুগ্ধ নয়নে আয়জাকে দেখছে। সে জানে তার প্রেয়সী বিরিয়ানি পছন্দ করে। তাই তো নিজের জমানো টাকা গুলো দিয়ে বিরিয়ানির সকল জিনিস কিনে এনেছে। এই টাকা গুলো সে জমিয়েছিলো নতুন ঘড়ি কেনার জন্য। কিন্তু ঘড়ির চেয়েও তার কাছে তার ভালোবাসার মানুষের হাসি অধিক মূল্যবান। নীলিমা আরহানের তাকানো লক্ষ্য করে। সে আয়জাকে চিমটি মেরে বলে,
দেখ ভাইয়া তোর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে।
_ চুপ ! বেশি বুঝিস তুই। এখানে তো আমি , তুই, আন্টি সবাই পাশাপাশি আছি। ভাইয়া যে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে তুই বুঝলি কিভাবে?
_ ভাইয়া তোর দিকেই তাকিয়ে আছে।
নীলিমার মা বলেন,
আরহান হঠাৎ বিরিয়ানির সব জিনিস কিনে আনলো আর বললো বিরিয়ানি রান্না করতে ওর নাকি খেতে ইচ্ছে করছে।
নীলিমা বাকা হাসি দিয়ে বলে,
দেখেছিস?
_ কি দেখবো? কানে শুনিস না তুই? আন্টি কি বললো? ভাইয়ার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে হয়েছে তাই এনেছে।
_ এগুলোতো বাহানা মাত্র।
_ দেখ এসব নিয়ে ফাজলামো করবি না। আমার ভালো লাগে না। উনি তোর যেমন ভাইয়া আমারও তেমন ভাইয়া।
_ ভাইয়া থেকে সাইয়া হতে কি আর সময় লাগে রে পাগলি?
_ তুই যদি এসব বলা বন্ধ না করিস তাহলে কিন্তু আমি তোদের বাসায় আর আসবো না।
_ আচ্ছা ঠিক আছে আর বলবো না। রাগ করিস না।
_ হুম।
_ কিন্তু ভাইয়া আর তোর বিয়ে হলে ভালোই হবে । তুই আমার ভাবি হয়ে যাবি । আমরা তখন সব সময় একসাথে থাকতে পারবো।
_ তুই আবার শুরু করলি?
_ সরি।
বিকেলে তাহমিদ এসে আয়জাকে বাসায় নিয়ে যায়। বাসায় এসে কিছুক্ষণ টই টই করে ঘুরে সন্ধ্যায় মায়ের চিল্লাচিল্লিতে পড়তে বসে আয়জা। আজকে টেবিলে সে একাই বসেছে। তাহমিদ কিছু কাজে বাহিরে গিয়েছে। সাফওয়ান ঘুমিয়ে আছে। ব্যাগ থেকে বই বের করতেই একটি চিঠি পড়ে নিচে। আয়জার ভ্রু কুঁচকে যায়। তার ব্যাগে চিঠি এলো কই থেকে মাথায় ঢুকছে না তার। চিঠি টা খুলে দেখে সেখানে লিখা,
আমার প্রিয় চঞ্চল হরিণী,
তোমার এই চঞ্চলতা, তোমার এই ছুটাছুটি আমাকে গুগ্ধ করে তোমার প্রতি। তোমার মুখের মিষ্টি হাসি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আমি যে তোমায় ভালোবাসি তুমি কি বুঝতে পারো না? তুমি তো এখন এত ছোট নেই যে কিছু বুঝো না? আর কতকাল এক তরফা ভালোবেসে যাবো? তুমি কি বুঝো এক তরফা ভালোবাসা কতটা পুড়ায়? না তুমি বুঝো না। বুঝলে নিশ্চয়ই এমন অজানা হয়ে থাকতে না। আমি হয়তো আমার মনের ভাব গুলো গুছিয়ে চিঠিতে লিখতে পারছি না। কারণ আমি প্রেমপত্র লিখতে জানি না। কখনো কারো জন্য লিখিও নি। তুমিই প্রথম যার জন্য লিখছি। আমার অগোছালো বাক্যগুলো কি তোমার মন ছুঁতে পারবে? এখন নিশ্চয়ই ভাবছো আমি কে? আমি তোমার খুব কাছের কেউ। তোমার পরিচিত। তোমার আশেপাশের মানুষগুলোর মধ্যেই একজন। চিন্তা করো না খুব শীঘ্রই তোমার কাছে নিজেকে ধরা দিবো। আজ এ পর্যন্তই থাক। বাকি মনের কথা গুলো নাহয় সামনা সামনি হবে।
ইতি,
তোমার প্রেমিক পুরুষ।
চিঠিটি পড়ে ভয়ে আয়জার গলা শুকিয়ে যায়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। সে বিড়বিড় করে বলে,
এ আবার কোন ঝামেলায় পড়লাম রে বাবা? এই প্রেমিক পুরুষটা আবার কে ? কই থেকে টপকালো? আম্মা যদি এই চিঠি দেখে আমি তো শেষ।
একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আয়জা পুনরায় বলে,
জীবনে শান্তি নাই রে। একটু শান্তিতে থাকলেই কই থেকে উটকো ঝামেলা এসে পড়ে।
চলবে।
