#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৩
সময় ও স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না। সময় যেনো খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সময়টা এখন ১৯৮৮। ছোট্ট আয়জা এখন বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। বয়স তার বর্তমানে ষোলো। এই বছর দশম শ্রেণীতে উঠেছে সে। বয়স বাড়লেও চঞ্চলতা কমে নি বরং বেড়েছে। সারাদিন ছুটোছুটি করে বেড়ায় এদিক সেদিক। সে যেনো পাখির মতো ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়ায় দিক বেদিক। মেহেরুন্নেসা ঘরের কাজ করছিলেন । মেয়েকে বলেছিলেন ছাদ থেকে জামাকাপড় গুলো নিয়ে আসতে। সেই যে মেয়েটা গেলো আসার এর কোনো খবর নেই। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন তার চঞ্চল মেয়ে ছাদে বাকিদের সাথে আড্ডায় মেতেছে। তিনি ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের নাম ধরে জোরে ডাক দেন। মায়ের আওয়াজ কানে পৌঁছাতেই জিহ্বায় কামড় দেয় আয়জা। মা যে তাকে কাপড় আনতে ছাদে পাঠিয়েছিলো একদমই মাথা থেকে বের হয়ে গেছে । ছাদে তার দুই বান্ধবী মৌসুমী এবং তামান্নাকে পেয়ে তাদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছিলো সে। তামান্না এবং মৌসুমী তাদেরই বিল্ডিং এ থাকে । তামান্না থাকে দ্বিতীয় তলায় এবং মৌসুমী থাকে চতুর্থ তলায়। আয়জা দ্রুত তাদের সব কাপড় গুলো রশি থেকে তুলে ছাদ থেকে নেমে যায়। সে খুব দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো। মেহেরুন্নেসা মেয়েকে ধমক দিয়ে বলেন,
এমন উড়ন্ত পাখির মতো ছুটছো কেনো? আস্তে ধীরে হাটা যায় না? এখন তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো বাচ্চা নেই তুমি আর। মেয়ে মানুষ হাটবে আস্তে ধীরে। আর তোমাকে দেখো। বেয়াদব।
_ এমন করো কেনো আম্মা। আমি তো সব সময় এভাবেই হাটি।
_ এটা পরিবর্তন করতে হবে। মানুষ কি বলবে? কয়দিন পর তোমাকে বিয়ে দিবো। তখন তাদের সামনেও কি এমন করবে?
_ কিসব বলো আম্মা তুমি? আমি এখনো বাচ্চা। কিসের বিয়ে?
_ তোমার বয়সে আমার বিয়ে হয়ে তাহমিদ আমার কোলে ছিলো। আর তুমি নিজেকে বাচ্চা দাবি করো? মেরে তক্তা বানিয়ে দিবো একদম। আমি শেষ বারের মতো বলছি আর যেনো আমি এমন ছুটাছুটি করতে না দেখি। নয়তো পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।
আয়জা আর কথা বাড়ালো না। কারণ সে জানে এখন কথা বাড়ালে পিঠে তার তাল পড়বে। এরজন্য চুপচাপ মায়ের পিছে পিছে রুমে যায় সে।
________________________
রাত তখন ৮ টা বাজে। মেহেরুন্নেসা সব কাজ শেষ করে চাল ধুয়ে চুলায় ভাত বসিয়েছেন। এই সময়টাতে প্রতিদিন উনি নিচে নামেন। সব মহিলারা একত্রিত হয়ে এই সময় গল্প করেন। মায়েদের পাশাপাশি তাদের সন্তানরাও নিচে নামে। তারাও আড্ডা দেয় আবার খেলাধুলা করে। মায়েদের সাথে আবার বাসায় চলে যায় আড্ডা শেষে। ভাত দমে দিয়ে মেহেরুন্নেসা আয়জাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
আয়জা আমি নিচে যাচ্ছি। চুলায় ভাত । পাঁচ মিনিট পর চুলাটা বন্ধ করে তারপর নিচে নামবে কেমন?
_ আচ্ছা।
উনি শাড়ির আঁচল লম্বা করে টেনে মাথায় ঘুমটা দেন এরপর পায়ে জুতা পরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন। নিচে এসে তিনি রীতিমত অবাক হয়ে যান। তার চঞ্চল হরিণী গুণধর মেয়ে তার আগেই নিচে এসে হাজির। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
এই তোকে না আমি ভাতের চুলা বন্ধ করে পাঁচ মিনিট পর নামতে বলেছিলাম? আর তার থেকেও বড় কথা তুই কখন নামলি আমি তো দেখলাম না। আমি না ঘর থেকে বের হওয়ার আগেও তোকে ঘরে দেখলাম?
_ ……………..
_ চুলা বন্ধ করেছিস?
_ হ্যাঁ।
_ ভাত ভালো মতো হয় ও নি। আর ও এত অধৈর্য্য ওই অবস্থায় চুলা বন্ধ করে এসে পড়েছে। পাঁচটা মিনিট সহ্য হলো না তোর?
_ ……………
_ চুপ করে আছিস কেনো? কথা বল। বাসায় যেয়ে নেই তারপর তোকে বুঝাবো আমি। তৈরি থাক তুই।
_____________________
সকাল সকাল মাথায় দুই বেণী করে স্কুল ড্রেস পরে ব্যাগ কাধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আয়জা। মেজাজ তার প্রচন্ড খারাপ। সে মূলত অপেক্ষা করছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড নীলিমার জন্য। প্রায় ১০ মিনিট ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু মেয়েটার আসার কোনো নাম গন্ধ নেই। তারা দুইজন পাশাপাশি এলাকায় থাকে। ছোট বেলা থেকে এক স্কুলে একই ক্লাসে পড়াশোনা করছে তারা। যার কারণে ছোট বেলা থেকেই তারা বেস্ট ফ্রেন্ড। আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পরও যখন নীলিমা আসলো না তখন আয়জা বিরক্ত হয়ে হাটা ধরলো নীলিমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সে মনে মনে পরিকল্পনা করলো ইচ্ছা মতো ধুলাই করবে আজকে ফাজিলটাকে।
কয়েক মিনিটের মাথায় আয়জা এসে পৌঁছালো নীলিমাদের বাসায়। এসেই নীলিমার আম্মুর সাথে দেখা হলো। আয়জা উনাকে দেখে মিষ্টি হেসে বললো,
আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
_ ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি খবর কেমন আছো? ( মুচকি হেসে )
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আসো নাস্তা খেতে বসো।
_ আমি নাস্তা করে এসেছি আন্টি। ফাজিল টা কই? আমি কতক্ষন ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
_ তোমার বান্ধবী তো ঘুম থেকেই উঠে নি। আমি কতবার ডাক দিয়ে আসলাম। একটু আগে আবার ডাক দিতে গিয়েছিলাম বললো আজ স্কুলে যাবে না।
_ ও যাবে না আমাকে আগে জানাবে না? আমি অযথাই ঘুম থেকে উঠলাম। ও না গেলে তো আমিও যাই না স্কুলে।
_ এখন তো আর সময় ও নেই। ক্লাস বোধহয় শুরু হয়ে গিয়েছে।
_ আচ্ছা তাহলে আমি বাসায় চলে যাই।
_ না না দাঁড়াও। এসেছো যখন আজকে থাকো। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে একেবারে বিকেলে যেও।
_ আরেকদিন আসবো নি আন্টি।
_ আমি কোনো কথা শুনবো না। আজ মানে আজই।
_ আমি তো আম্মুকে জানায় নি আন্টি। আর আমার কাছে জামা পান্টানোর জন্য জামাও নেই।
_ নীলিমার জামা পড়ে নিও। আর তোমার আম্মুকে আমি টেলিফোন করে বলে দিচ্ছি। তুমি নীলিমার রুমে যাও।
_ আচ্ছা আন্টি।
এই কথা বলেই সে দৌড় লাগালো। পিছন থেকে নীলিমার আম্মু বলতে লাগলেন,
_ আস্তে যা পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাবি তো।
_ কিচ্ছু হবে না আন্টি।
আয়জা দৌঁড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলো এমন সময় হঠাৎ তার সামনে নীলিমার বড় ভাই আরহান চলে আসে। সেও সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলো। হঠাৎ আয়জাকে দৌঁড়ে আসতে দেখে সে থতমত খেয়ে যায়। অন্যদিকে আয়জার ও একই অবস্থা। হঠাৎ আরহানকে দেখে সে থতমত খেয়ে যায়। যার কারণে সিঁড়ি থেকে স্লিপ খেয়ে সে পড়ে যেতে নেয় । সেই সময় আরহান তার হাত ধরে ফেলে যার কারণে সে পড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যায়। আয়জা তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং বলে,
দুঃখিত ভাইয়া আমি খেয়াল করি নি।
_ আমিও খেয়াল না করেই নিচে নামছিলাম। আমিও দুঃখিত।
আরহান আর কিছু বলার আগেই আয়জা তাকে পাশ কাটিয়ে উপরে চলে যায়। আরহান এক দৃষ্টিতে তার যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকে। তার হৃদয় যেনো খুব দ্রুত গতিতে চলছে। সে তার বুকে হাত রেখে নিজের হৃদস্পন্দন শুনে মুচকি হাসে । সে ফিসফিস করে বলে,
প্রেয়সীকে দেখে বুঝি হৃদস্পন্দন এত বেড়ে গেলো। তাকে একটিবার দেখার তৃষ্ণা যেনো মিটেই না। কি এমন জাদু করেছে সে আমায়? সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই যে প্রেয়সীর চেহারা দেখা নসিব হবে কল্পনাও করি নি। আজ দিনটা বড়ই সুন্দর।
আরহান নাস্তা খেতে টেবিলে বসে তখন তার মা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
বাবা খেতে বসার আগে একটু বাজার থেকে ঘুরে আয় না।
_ কেনো?
_ বাসায় আয়জা এসেছে। ওকে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছি। এক কেজি গরুর মাংস এনে দে না বাবা।
_ আচ্ছা টাকা দাও।
ছেলেকে এত সহজে রাজি হতে দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন। আরহান সহজে বাজারে যেতে চায় না। তাকে অনেক বলে কয়ে বাজারে পাঠাতে হয়। আর আজ এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলো। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
তুই বাজারে যাবি বাবা?
_ হ্যাঁ। টাকা দাও বললাম তো।
_ আসলেই যাবি?
_ উফ মা কি সমস্যা? এমন করছো কেনো? ( বিরক্ত হয়ে )
_ না মানে তুই তো সহজে বাজারে যেতে রাজি হোস না। আজ একবার বলাতেই রাজি হয়ে গেলি যে তাই আরকি।
_ এখন তুমি কি চাও আমি না যাই?
_ সেটা কখন বললাম?
_ তাহলে এমন করছো কেন?
_ আচ্ছা বাদ দে। আমি টাকা নিয়ে আসছি দাড়া ।
তিনি টাকা এনে ছেলের হাতে দিলেন এবং কি কি আনতে হবে বুঝিয়ে বললেন। আরহান মায়ের অগোচরে মুচকি হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বের হলো। অন্য কোনো কারণ হলে সে আসলেই বাজারে যেতো না। কিন্তু তার প্রেয়সীর জন্য সে একবার কেন হাজার বার বাজারে যেতে রাজি।
আরহান আহসান আয়জার বেস্ট ফ্রেন্ড নীলিমার বড় ভাই। বর্তমানে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছে। বয়স তার একুশ বছর। দেখতে সে বেশ হ্যান্ডসাম। এক কথায় বলা যায় আমির খানের মতো সুন্দর। তাকে সবাই আমির খান বলে বেড়ায়।তার চুল গুলো হালকা কোকড়ানো,টানা টানা চোখ, গায়ের রং ফর্সা, লম্বায় পাঁচ ফুট সাত। সে সব সময় শার্ট ইন করে পড়ে প্যান্টের সাথে। বর্তমানে এটা স্টাইল চলছে। আমির খানের স্টাইল। নীলিমার সাথে আয়জার বন্ধুত্ব থাকায় প্রায় সময় তারা একে অপরের বাসায় আসা যাওয়া করে। আয়জাকে সেই ছোট থেকে বড় হতে দেখেছে সে । আরহান যখন আস্তে আস্তে বড় হলো সে বুঝতে পারলো সে আয়জার প্রতি দূর্বল। মনের অজান্তেই সে আয়জাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আয়জা এখনো তার মনের কথা জানে না। কিন্তু সে ঠিক করেছে এবার সে আয়জাকে তার মনের কথা প্রকাশ করবে।
চলবে।
