#নোনা_জল #দ্বিতীয়_পর্ব
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দীপান্বিতার বিরক্তিটা এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে রূপ নিল। উস্কোখুস্কো চুল, গালে কয়েকদিনের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর বিভ্রান্তি। ছেলেটার পরনে একটা ঢিলেঢালা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা.. আর তার সাথে একটা জলপাই রঙের ট্রাউজার..দীপান্বিতা কিছু বলার আগেই ছেলেটি নিজেই দু-পা পিছিয়ে গিয়ে দরজার ওপরের রুম নম্বরটার দিকে তাকাল। তারপর কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, “ওহ গড! আই অ্যাম সো সরি… আসলে আমি ৪১২ নম্বর রুমটা খুঁজছিলাম। ভুল করে ৪২২-এর বেল বাজিয়ে ফেলেছি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি ফর দ্য ডিস্টার্বেন্স।”
“শুনুন…” দীপান্বিতার গলা দিয়ে শব্দটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো।
যুবকটি থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন একরাশ অস্বস্তি..
দীপান্বিতা একটু ইতস্তত করে বলল, “৪১২ নম্বর রুমটা এই করিডোরের একদম শেষ মাথায়, বাঁদিকের কোণায়। আপনি ভুল করে ডানদিকের উইং-এ চলে এসেছেন।”
ছেলেটি হালকা একটু হাসার চেষ্টা করল.. তারপর করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল শেষ মাথার দিকে। দীপান্বিতা দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেষেএকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা বন্ধ করে দিল…
সন্ধ্যা নেমে এল মন্দারমনিতে। সমুদ্রের গর্জন এখন আরও জোরালো, আরও গম্ভীর। রিসোর্টের আলো শোপিসগুলোর গায়ে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। দীপান্বিতা ঘরে আর টিকতে পারল না। একটা হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে ও নিচে নেমে এল..ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুকে শুধু সাদা ফেনার মতো ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে সৈকতে। ও বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রিসোর্ট থেকে কিছুটা দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে বসল। নোনা বাতাস ওর চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই কয়েক হাত দূরে ও কাউকে বসে থাকতে দেখল.. শুধু দেখল না.. কিছু শুনতেও পেল..
সমুদ্রের গর্জনের মাঝখান থেকেও একটা চেনা সুর আর গিটারের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছিল। দীপান্বিতা একটু ভালো করে তাকাতেই দেখল, বালির ওপর একটা বিয়ারের বোতল নামানো রয়েছে। আর তার পাশেই বসে আছে বিকেলে ভুল করে ওর ঘরের বেল বাজানো সেই জলপাই রঙের ট্রাউজার পরা ছেলেটি। তার হাতে একটা অ্যাকোস্টিক গিটার। উস্কোখুস্কো চুলে সমুদ্রের হাওয়া লেগে কপালে এসে পড়ছে, আর সে একমনে, যেন এই পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে একটা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে চলেছে।বিচ্ছেদের সেই সুরটা নোনা বাতাসের ডানায় ভর করে দীপান্বিতার কানে এসে পৌঁছাল—
আমার নিশীথরাতের বাদলধারা,
এসো হে গোপনে,
আমার স্বপনলোকে দিশাহারা।
ওগো অন্ধকারের অন্তরধন
দাও ঢেকে মোর পরানমন,
আমি চাই নে তপন, চাই নে তারা॥
ছেলেটির ভারী, একটু খসখসে গলায় গানটা যেন বেশ মানিয়ে গেছে..দীপান্বিতা লক্ষ্য করল, গিটার হাতে ছেলেটির ঠিক পাশেই বসে আছে আরেকটি ছেলে। সে চুপচাপ হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে গানটা শুনছে। মাঝে মাঝে বিয়ারের বোতলটা তুলে চুমুক দিচ্ছে, কিন্তু তার মুখে কোন কথা নেই..হঠাৎ করেই ছেলেটা গিটার পাশে সরিয়ে রেখে বিয়ারের বোতলটা হাতে তুলে নিল। তারপর একঝলক তাকিয়ে অন্ধকারেই কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দীপান্বিতাকে দেখতে পেল। সমুদ্রের আবছা আলো-আঁধারিতে ও প্রথমে চিনতে পারেনি, তারপর একটু সোজা হয়ে বসে বলল, “আরে! আপনি… ৪২২ নম্বর রুমে উঠেছেন না? তারপর বিয়ারের বোতলটা সরিয়ে রেখে পাশে বসে থাকা ছেলেটিকে বলল গৌরব জানিস, ওনার রুমেই আমি ভুল করে বেল বাজিয়ে ফেলেছিলাম..”
সমুদ্রের আবছা আলোতেও বোঝা গেল গৌরবের চোখেমুখে এক চিলতে ভদ্রতার হাসি। সে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে একটা সৌজন্য প্রকাশ করল..সমুদ্রের জোরালো নোনা হাওয়া দীপান্বিতার গায়ের হালকা চাদরটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। ও আলতো হাতে চাদরের কোণটা সামলে নিল.. গৌরব নামের ছেলেটি বলল “মন্দারমনিতে আসলে আমরা এই রিসর্টেই উঠি.. বেশ নিরিবিলিতে দু-একটা দিন কাটিয়ে আবার শহরে ফিরে যাই.. আর তাছাড়া রিসর্টটা এমনিতেও বেশ পকেট ফ্রেন্ডলি..”
-সে তো বুঝলাম.. কিন্তু এতবার আসার পরেও তো আপনার বন্ধু ডান বাম গুলিয়ে ফেলেন..
-ছেলেটি বেশ শব্দ করে হাসলো, তারপর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল হৃদয়ে চোট পেয়েছে বুঝলেন না! এখনো তার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি.. আর ওর ধাক্কা সামলানোর সঙ্গী হতে গিয়ে আমারও গত দু বছরে বেশ কয়েকবার মন্দারমনি আসা হয়ে গেল..
গৌরবের মুখে ‘গত দু বছর’ শব্দটা শুনে দীপান্বিতা একটু অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে তাকাল। ও ভেবেছিল ঘটনাটা হয়তো একেবারেই টাটকা, যেমনটা ওর নিজের সাথে ঘটেছে মাত্র সাত দিন আগে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এই ক্ষতটা দু বছরের পুরনো, অথচ আজও তা কেমন জীবন্ত, তার মানে সময়ের প্রলেপও সব সময় স্মৃতিকে ফিকে করতে পারে না।
নিজের গিটারটার ওপর আলতো চাটি মেরে ছেলেটি গৌরবকে বলল, “নেহ্, অনেক হয়েছে, এবার তোর ইয়ার্কিটা বন্ধ কর তো! ভদ্রমহিলা কী ভাবছেন বল তো?”
-না আমি বিশেষ কিছুই ভাবছি না.. বরং আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালই লাগলো, এই ব্যস্ত জগতে দুবছর আগে হওয়া ব্রেকআপের স্মৃতি কোন পুরুষ মানুষকে আজও এতটা ঘিরে আছে দেখে কোথাও যেন একটু স্বস্তি পেলাম..
গৌরব আবার হেসে ফেলল.. “আপনি আর প্রমিত দুজনেই বেশ গভীরে গিয়ে ভাবেন দেখছি.. আমার এত গভীরতা নেই.. বেশি ডিপে চিন্তা করতে গেলে আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় নয়তো খুব খিদে পায়.. তাই ঐসবের মধ্যে আমি আর ঢুকিনা..
গৌরব এবার একটু সোজা হয়ে বসে দীপান্বিতাকে বলল, “আসলে প্রমিতের একটা স্বভাব আছে। ও যখনই খুব বেশি আপসেট হয়ে পড়ে, ও কাউকেই কিছু বলে না। স্রেফ গিটারটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে চায়.. সেই লক্ষণ দেখা গেলে আমি আর ওকে একা ছাড়তে পারিনা..ওর পার্মানেন্ট ড্রাইভার—উইদাউট স্যালারি! হয়ে কলকাতা থেকে গাড়ি ছুটিয়ে সোজা মন্দারমনি।”
দীপান্বিতার মোবাইলে তখন মালতি দির ফোন ঢুকছে.. ওদের থেকে সরে এসে ফোনটা রিসিভ করতে করতেই দেখল দুই বন্ধু ওকে হাত নেড়ে সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে… দীপান্বিতা কিছুক্ষণ এলোমেলো লনে ঘোরার পর ব্যালকনিতে এসে বসলো।
রিসোর্টের এই চারতলার ব্যালকনি থেকে রাতের সমুদ্রটাকে এক বিশাল কালো ক্যানভাসের মতো লাগছে। নিচে বাগানের আলোগুলো বাতাসে দুলছে। ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিতেই নোনা বাতাস আবার ওর চুলে বিলি কেটে গেল। নিচে সৈকতে প্রমিত আর গৌরব হয়তো এতক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। প্রমিতের সেই খসখসে গলার গানটা এখনো দীপান্বিতার মগজে গুনগুন করছে—”আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা.”
রাতের সমুদ্রের একটানা গর্জন আর নোনা বাতাসের শোঁ-শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দীপান্বিতা ইজি চেয়ারটায় এসে বসল। রুম সার্ভিসকে ও আগেই এক পট লিকার চায়ের কথা বলে রেখেছিল। একটু আগেই দিয়ে গেছে।অন্ধকারের মধ্যেই ও কাপে আলতো করে চুমুক দিল।
চড়া রোদের মন্দারমনি আর রাতের মন্দারমনির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এখন নিচে তাকালে শুধু সীমাহীন কালো অন্ধকার আর ঢেউয়ের সাদা ফেনাগুলো চিলতে আলোর মতো আবছা দেখা যায়।চায়ের কাপটা পাশে কাঠের টেবিলটায় নামিয়ে রাখল ও। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। পেটে দুপুরের সেই জোর করে খাওয়া দু-এক গ্রাস ভাত ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। এতক্ষণে শরীরটা যেন নিজের অধিকার বুঝে নিতে চাইছে—অল্প অল্প খিদে পাচ্ছে ওর। মনের অসাড়তা কাটিয়ে শরীরটা যেন এই নোনা বাতাসের স্পর্শে আবার একটু বেঁচে উঠতে চাইছে।
দীপান্বিতা চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভেতর এলো। বেডসাইড টেবিল থেকে ইন্টারকমের রিসিভারটা তুলে ও ডাইনিং হলের নম্বরটা প্রেস করল। ওপাশে রিং হতেই এক যুবক কর্মীর বিনীত গলা ভেসে এলো, “ইয়েস ম্যাম..,
দীপান্বিতা ব্যালকনির অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ। আচ্ছা, ডিনারে হালকা কী পাওয়া যাবে?”
-ম্যাডাম, রুটি পাবেন। সাথে চিকেন কষা, এগ কারি বা মিক্সড ভেজ হতে পারে। আর যদি হালকা চান, তবে গরম ভাত আর পাতলা মুরগির ঝোলও করে দেওয়া যাবে।”
পাতলা মুরগির ঝোল আর গরম ভাতের কথা শুনে দীপান্বিতার হঠাৎ কলকাতার নিজের ফ্ল্যাটের কথা মনে পড়ে গেল। এমন ক্লান্তির রাতে মালতি দি ঠিক এই খাবারটাই রেঁধে ওর সামনে দিত। ও আর দ্বিধা করল না। বলল, “ঠিক আছে, আপনি গরম ভাত, সাথে একদম হালকা করে করা মুরগির ঝোল আর একটু লেবু পাঠিয়ে দিন। তেল-মসলা যেন একদম কম থাকে।”
“আচ্ছা ম্যাম, নটার মধ্যে আপনার রুমে পৌঁছে যাবে।”
“ধন্যবাদ,” বলে দীপান্বিতা রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসতে চাইছে সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়ায়… মোবাইলে কিশোর কুমার চালিয়ে বারান্দার আলো অফ করে দিল দীপান্বিতা…চোখ দুটো আলতো করে বুজে ফেলল। ডিনারটা আসার আগে এই আধো-ঘুম, আধো-জাগরণের ক্ষণটুকু যেন ওর ক্ষতবিক্ষত মনের জন্য এক পরম শান্তি… মোবাইলে বেজে চলেছে
“ও শাম কুছ আজীব থি, ইয়ে শাম ভি আজীব হ্যায়..”
গানের প্রথম দুটো লাইন স্পিকারে বাজতেই দীপান্বিতার বুকের ভেতরটা আচমকা কেমন যেন মুচড়ে উঠল.. আর ও নিজের কান্নাটাকে আটকে রাখতে পারল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওর চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল নিঃশব্দে গাল বেয়ে নেমে আসতে লাগল..
এই বিশাল পৃথিবীর একটা একচিলতে বারান্দায়, সম্পূর্ণ একলা একটা মেয়ে সমুদ্রের হাওয়া আর কিশোর কুমারের গানের সুরের সামনে নিজের সমস্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। চোখ দুটো বুজে ও শুধু টের পেতে লাগল, কান্নার নোনা জল আর সমুদ্রের নোনা বাতাস—দুটো মিলে ওর চারপাশটাকে এক অতলান্ত বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই রুমের সদর দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল..
দীপান্বিতা ঘোর কাটিয়ে চোখ মেলল। একটা তীব্র কষ্টের কবল থেকে নিজেকে জোর করে টেনে বের করে ঘড়ির দিকে তাকাতেই বুঝলো নটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেজে গেছে..আর রুম সার্ভিস হয়তো ওর ডিনারের থালা নিয়ে এতক্ষণে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ও হাত দিয়ে গালের জলটা মুছে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দরজাটা খোলার জন্য.. দরজা খুলতে যেতে যেতে ই দীপান্বিতা এই প্রথমবার অনুভব করল একা একা নিজের কষ্টে বেশ কিছুক্ষণ মন খুলে কাঁদলে ভিতরটা বেশ হালকা লাগে..
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
