#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ১
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
ইরার মনটা খুব খারাপ লাগছে,ছেলেটা একটা চকলেট চেয়েছিলো কিন্তু সে দিতে পারেনি।
অন্য দিন হলে হয়তো খারাপ লাগতো না কিন্তু আজ সপ্তর্ষি স্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে তাই মায়ের কাছে আবদার করেছিলো।
মাসের প্রায় শেষ ইরার হাত একদম খালি।স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব খুবই কম প্রতিদিন হেটেই যায় আসে তাই টাকা নেয় না।
কিন্তু আজ ছেলেটার জন্য খুব খারাপ লাগছে।
তার হাতে যদি সে আরও কিছু বেশি টাকা থাকতো তাহলে হয়তো ছেলেটার সখটা পূরণ করতে পারতো।
গরিবের এই এক সমস্যা সখ অনেক কিন্তু হাত সংগতি দেয় না।
যাই হোক,ছেলেটার মন ভালো করতে হবে।
সপ্তর্ষির নামটা ইরা নিজেই রেখেছিলো,ভেবেছে ছেলেটার ভবিষ্যত তারার মতোই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে কিন্তু দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখনই হাপিয়ে উঠছে।ছেলেটা মাত্র ক্লাস ফোরে আরও তো সময় পরেই আছে।
কিভাবে কি করবে?
শুভ গার্মেন্টসে চাকরি করে ওর বেতনের টাকায় কোনো রকমে মাস চলে।
মাসে দুএকবার মুরগির মাংস কেনা হয় সেটাই ছেলেকে ভাগে ভাগে রান্না করে দেয় কিন্তু আজ তো সেটাও নেই।
ইরা ফ্রিজ খুলে দেখে কয়েক টুকরা রুই মাছ আছে আর কিছু সবজি।
আজ বাজার করা হয়নি,শুভ বলেছে কাজ থেকে ফেরার পথে ভাঙা বাজার থেকে কিছু নিয়ে আসবে
তখন সবজির দাম কিছুটা কম থাকে।
ইরা মাছটাই বের করে নেই।
রান্নাঘর বলতে সামনের বারান্দার এক কোণে চুলা রাখা সেখানেই দুই পরিবারের রান্না হয়।
পাশাপাশি দুই ঘরে দুই পরিবারের বাস।ইরা ঘর থেকেই সব কাটাকুটি করে গুছিয়ে নিয়ে যায়।
পাশের ঘরে দোলা থাকে ওর মেয়ে দিশাকে নিয়ে।
ছেলেকা ইরা আদর করে বাবাই বলেই ডাকে।
বাবাই স্কুল থেকে ফিরে দিশার সাথে খেলতে যায়।
দোলা কাজে বেরিয়ে গেলে মেয়েটা একা থাকে তাই ইরা ওর খেয়াল রাখে।
শহরে এই একটা সুবিধা এক বাড়িতে দুই বা তিন পরিবার থাকে হয়তো সম্পুর্ণ অচেনা সবাই এক ছাদের নিচে থাকতে থাকতে আপন হয়ে ওঠে।
ইরা গ্রামে থাকতে এগুলো চিন্তাও করতে পারতো না কিন্তু গত দুই বছরে সব কিছুতেই মানিয়ে নিয়েছে।
ইরা দুই টুকরো মাছ আর একটা বড় সাইজের আলু খোসা ছাড়িয়ে লবণ হলুদ মাখিয়ে অল্প তেলে ভেজে নেয় পাশের চুলায় কয়েকটা কাঁকরোল ভাপে বসিয়ে দেয়।
অন্যদিকে কিছু পেঁয়াজ, কাচামরিচ আর আদা কুচি করে নেয়।
মাছ ভাজা হয়ে গেলে সেই কড়াইয়ের মধ্যে কয়েকটা শুকনো মরিচ লাল করে ভেজে নিয়ে সেই তেলে পেঁয়াজ, মরিচ আর আদাটা একটু নরম করে ভেজে নেয়।
ততোক্ষণে কাঁকরোল ভাপ দেয়া হয়ে গেছে।
এবার সব কিছু এক করার সময়।
মাছের কাটা বেছে আলুর সাথে মেখে নেয়।
শুকনো মরিচ টা ভালোভাবে চটকে তার মধ্যে দেয় পেঁয়াজ মরিচ আদার বেরেস্তাটা।কিছুটা আলাদা করে রাখে।
তারপর মাছ আলু ভর্তার সঙ্গে সেগুলো একটু লবণ আর সরিষার তেল দিয়ে মেখে নেয়।
এবার কাকরোল এর ভেতরের বিচি গুলো ফেলে দিয়ে সেখানে মাছের পুড়টা ভরে দেয়।
ছেলে মেয়েদের একফাঁকে গিয়ে দেখে আসে।
দুজনে মগ্ন হয়ে বসে কার্টুন দেখছে, দোলার ঘরে একটা ছোট্ট টিভি আছে।
বাবাই সেটা দেখার জন্যই ওখানে বেশি যায়।
ইরা এখানো টিভি কিনতে পারেনি,গত বছর বোনাসের টাকা দিয়ে শুভ একটা ছোট্ট ফ্রিজ কিনে দিয়েছে।
এখানে এটাও একটা সুবিধা দোলার ঘরে সন্ধ্যার পর দুজনে বসে টিভি দেখে আর দোলা ওর ফ্রিজটা নিজের মতো করেই ব্যবহার করে
দুজনের মধ্যে একটা অধিকার বোধের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে এই ক’বছরে।
দোলার মেয়েটা এবার ক্লাশ টুতে পড়ে বাবাই আর ও একসাথেই শুভর কাছে পড়তে বসে সন্ধ্যায়।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পাঁচজনের একটা পরিবার।
ইরা ভাতের চাল ধুয়ে নিয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দেয়।
একচুলায় ভাত বসিয়ে দেয়া আর তাতে দেয় একফালি মিষ্টি কুমড়া।
চালের গুড়োতে লবণ, হলুদ, মরিচ গুড়ো দিয়ে একটা পিঠালি বানিয়ে নেয় এবার সেই পুর ভরা কাঁকরোল গুলোতে পিঠালি ভরিয়ে গরম তেলে অল্প আঁচে মচমচে করে ভেজে নেয়।
বাবাই এই বড়াটা খুব পছন্দ করে ও এর নাম দিয়েছে “মাছ আলু বড়া”
অন্যদিকে ভাতে সিদ্ধ হওয়া মিষ্টি কুমড়া টা একটা থালায় নিয়ে ওর মধ্যে আলাদা করে রাখা পেয়াজ মাখাটা আরও একটু তেল লবণ দিয়ে মেখে নেয়।দু’টো পদতো হয়েই গেলো।
ইরা আবার ঘরের দিকে এগোয়,বাবাই আর দিশাকে স্নানের কথা বলে যায়।
কয়েকটা কাচা আম আছে সেগুলো দিয়ে পাতলা টক করে নেয়,বাবাই এটাও খুব ভালোবাসে।
একটা শুকনো মরিচ আর কিছু সরষে ফোড়ন দেয় তারপর ডুমো ডুমো করে কেটে রাখা আমগুলো দিয়ে দেয়,
উপর থেকে দেয় একটু হলুদ আর লবণ।
এরপর জল দিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখে।
সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি দিয়ে নামিয়ে নেয়।
এই বেলার জন্য রান্না শেষ,
দুপুর প্রায় একটা বাজতে যায়।
বাবাই একবার এসে দেখে গেছে রান্না কতদূর।
দোলা কাজ শেষ করে চলে এসেছে,ও চার বাড়িতে কাজ করে।
ঘর মোছা কাপড় ধোয়া আর অন্যান্য টুকটাক কাজ।
সন্ধ্যার পর ঠোঙ্গা বানায়।
তিন বছর আগে দিশার বাবা মারা যায়,দোলার নিজের বলতে আর কেউ নেই।এই শহরেই মেয়েকে নিয়ে থেকে যায়।
ঘুপচি বস্তিতে থাকলে মেয়েটাকে মানুষ করতে পারবে না তাই একটু কষ্ট করে একটা ভালো পরিবেশে থাকছে।
মেয়েকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াচ্ছে।
ইরা রান্না শেষ করে উঠে যায়,দোলা একটু পাতলা ডাল আর ডিম ভাজি করে নেয় দুজনের জন্য।
ইরা দোলাকে ডেকে নেয় নিজের ঘরে,
চল,আজ একসাথে খেতে বসি শুভ আজ দুপুরে আসবে না,একা খেতে ভালো লাগে না।
কথাটা বলা মাত্রই দিশা ওর ঘরে চলে আসে।
দোলা একটু ইতস্তত করছে কারণ সে বেশি কিছু করতে পারেনি শুধু ডাল কিভাবে নিয়ে যাবে?
ইরা ওর হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়।
কাঁকরোল পুর দেখে দোলার মনটা খুশি হয়ে যায়।
কতো বছর সরষে বাটা দিয়ে পুর খায় না,দিশার বাবা খুব পছন্দ করতো এসব খাবার।
কিন্তু মুখে দিয়েই বুঝতে পারে এটা অন্য রকম কিছু।অন্য সময়ে খাওয়া পুরের থেকে বেশ ভালো।
ইরার রান্নার হাত বেশ ভালো তাই খুব একটা অবাক হয়না।
দোলা জিজ্ঞেস করে, “কি দিয়ে বানালি এটা?
খুব স্বাদ হয়েছে রে,আলুর দমটাও অসাধারণ খেতে।
তুই এতো রান্না কোথা থেকে শিখেছিস?”
ইরা মুচকি হাসে,”এগুলো আমাদের বাড়িতে হর হামেশাই হতো।
আলুর দমটা কাল করেছিলাম আজ একটু জাল দিয়ে নিয়েছি তবে একটু ঘী দিতে পারলে আরও ভালো হতো কিন্তু ঘরে তো নেই।
মা নিজে বাড়িতে ঘী বানাতো,তারপর নিজেদের জমি থেকে সবজি তুলে আনতো,আর প্রায় প্রতিদিনই নতুন কিছু বানাতো।
এখন আর সেই দিন নেই,আমি কিছুটা শিখেছিলাম তাই এখন চেষ্টা করি।
কিন্তু মাছ মাংস আর ঘী কেনার সামর্থ্য তো নেই।
তাই জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি।
বাড়িতে মা শুধু মাছ দিয়ে এই পুর টা বানাতো আমার ঘরে তো আর এতো মাছ হবে না তাই কিছুটা আলু দিয়েছি।”
“তুই যা-ই বল,খেতে কিন্তু দারুণ হয়েছে।”
বাবাই আর দিশাও চেটেপুটে খেয়েছে ডাল টা ওদের দুজনের ভালো লেগেছে।
দোলা খাবার শেষ করে বাসন কটা ধুয়ে দিয়ে যায়।
দিশা মায়ের আঁচল ধরে নিজের ঘরে চলে যায়।
ইরা ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে দুপুরের ভাত ঘুমের আয়োজন করে।
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে আর ইরার মনের দুশ্চিন্তারা ভীড় করছে?
ছেলের ভবিষ্যৎ টা ভালো হবে তো?
শুভর বেতনের টাকায় এখন আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
কিভাবে কি করবে?
এসব ভাবতে ভাবতেই ইরা ডুবে যায় ঘুমের অতলে।
চলবে,,,,
