ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ২
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
দোলা দিশাকে নিয়ে শুয়ে আছে,দিশা মায়ের উম পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
ইরার কথাগুলো মনে পরছে।
“মা নিজের হাতে ঘী বানাতো,জমি থেকে সবজি তুলতো,,”
অন্য কেউ যদি এই কথা বলতো তাহলে হয়তো দোলা বিশ্বাস করতো না।
কিন্তু ইরার ব্যবহার আর রুচিসম্মত আচরণেই বোঝা যায় ও ভদ্র পরিবারের মেয়ে।
একটা একচালার হাফ বিল্ডিং ঘরটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে।
মাসের প্রথমে শুভদা ওর হাতে বেতনের টাকা দিয়ে দেয় এর মধ্যেই সুন্দর সংসার চালিয়ে নিচ্ছে।
ইরা অবশ্য দুই একবার বলেছে ওর জন্য কাজ খুঁজে দিতে কিন্তু শুভ দা রাজি হয়না।
ওর মতো মেয়ের কি এসব করা মানায়?
পদ্মা পাড়ের গ্রাম নিশ্চিন্তপুর।
সেই গ্রামের খুব অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে ইরাবতী।
বাবার অনেক জমিজিরাত,
বাড়িতে বাবা মা ছাড়া আরও অনেক লোক,কেউ গরু দেখার কাজ করে, কেউ ফসলের মাঠ দেখাশোনা করে।
বাবা খুব আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিল ইরাবতী, মেয়েটার মধ্যে খুব মায়া।
মা মেয়েকে হাতে ধরে ঘরকন্নার কাজ শিখিয়েছিলেন, নানা রকম রান্না জানতেন তিনি তার সব গুণ মেয়েকে দিয়েছেন।
গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে ফাইভ পর্যন্ত তারপর গঞ্জের হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছে।
দেখতে সুন্দর ছিলো তাই অল্প বয়সেই বিয়ের প্রস্তাব আসে।
শুভর বাবা গঞ্জে ধানের ব্যবসা করতো পাশের গ্রামে থাকতো।
ইরাকে পথে দেখে নিজের ছেলের জন্য পছন্দ হয়ে যায়।শুভ তখন একটা ভালো চাকরি করে শহরে।
গ্রামে জায়গা জমি আছে আর বাড়িতে অন্য কেউ নেই।তাই আর অমত করেনি কেউ।তারপর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর ইরা বেশ সুখেই দিন কাটে।
শুভ মাসে একবার বাড়ি যায়,ইরার শশুর কাজ পাগল মানুষ সারাদিন দোকান বাজার করে সন্ধ্যার পর হিসাব নিয়ে বসে।তবে বাড়িতে বউয়ের যেন কোনো অসুবিধা না হয় তার জন্য দুজন লোক রেখে দিয়েছিলেন।
রাত নয়টায় খাবার খেয়ে শুয়ে পরে আবার ভোর পাঁচটায় দিন শুরু করে।
দুই বছর পর সপ্তর্ষি আসে তাদের জীবনে।সুখের অন্ত থাকে না ইরা আর শুভর।
ইরার বাবার বাড়ি শশুর বাড়ি সবাই ওকে মাথায় তুলে রাখে।
আস্তে আস্তে বাবাই একটু বড় হয়।ইরার স্বপ্ন ছেলেকে গঞ্জের বড় স্কুলে পড়াবে।সেই জন্য কিছু টাকা সঞ্চয় করা শুরু করে।
সবকিছুই ভালো চলছিলো কিন্তু হঠাৎ পদ্মা তার সর্বনাশা রুপ দেখানো শুরু করে।
নিশ্চিন্তপুরে ঝড় আসে,নদী গ্রাস করে নেয় ইরার বাবার বাড়ির সব জমিজমা।
বসত বাড়িটাও তিনদিনের মাথায় বিলীন হয়ে যায় ক্ষ্যাপা পদ্মায়।
বাবা অনেক আগেই চলে গিয়েছিলো তাই এই দৃশ্য তাকে দেখতে হয়নি
কিন্তু ইরার মা পাগল প্রায় হয়ে ছুটে আসে মেয়ের কাছে।
ইরার শশুর বাড়ির গ্রামে সেবার জল আসেনি।
ইরা মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারে না যে মানুষটার রান্না খেয়ে তার মনে হতো সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা সেই মা মুখে খাবার তুলে না,চোখের সামনে সব হারিয়ে যেতে দেখেছে যে নারী সে কিভাবে ভালো থাকবে?
ইরাবতীর মা এই শোক সহ্য করতে পারেনি,তিন মাসের মাথায় দূর আকাশে পাড়ি জমায়।
দেখতে দেখতে বছর ঘুরে, এক মহামারী শুরু হয় দেশ জুড়ে।
হঠাৎ শুভর চাকরি চলে যায়,বাড়ি ফিরে আসে।বাবার কাজে বসতে চায়।কিন্তু শশুরের ধানের ব্যবসায় ভাটা পরে অনেকটা ধানের জমি চলে যায় পদ্মার কবলে।
বসত বাড়িটাই সম্বল,প্রতিটা রাত কাটে অজানা ভয়ে নদী ধিরে ধিরে কাছে আসতে শুরু করে।
একদিকে মহামারী অন্যদিকে ভয়াল পদ্মা ইরার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়।
ইরার শশুর ঘরে বসে থাকতে পারে না জোর করেই বাইরে যায় একদিন ঠান্ডা জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরে।
শুভ শিক্ষিত ছেলে তাই বাবার রোগের লক্ষণ বুঝতে পারে,ইরা আর বাবাইকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
দিন সাতেক রোগে ভুগে তিনিও পারাপারে পাড়ি দেন।
শুভ অথৈ সাগরে পরে,ব্যবসার কিছুই জানে না,জমি জমার হিসেব রাখেনি আগে কোনোদিন।
শহরে চাকরি করতো,মা চলে যাওয়ার পর বাবা একা হাতেই গ্রামের বাড়ি দেখাশোনা করেছে।সবকিছুই ওর কাছে এলোমেলো হয়ে গেছে।
একদিকে চাকরি নেই হাত খালি আর অন্যদিকে নদী ভাঙন সব চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে তবুও কিছু করার নেই।
মহামারীর প্রকোপ একটু কমার পর শুভ আবার কাজের খোঁজে শহরে আসে,কিছু অভিজ্ঞতা থাকার কারণে একটা চাকরি জুটে যায় কিন্তু বেতন আগের তুলনায় অনেক কম।
শুভ তাতেই রাজি হয়ে যায়,কাজ শুরু করার কিছুদিন পর আবার বন্যা শুরু হয়।এবার ইরাদের গ্রামের বাড়ির দিকে ধেয়ে আসে পদ্মা।
শুভ অনেক কিছু ভেবে ইরা আর বাবাইকে নিয়ে আসে শহরে।
তারপর এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে চলছে প্রতিটা দিন।
মাথা গুজার একটা ঠাই আর দুবেলা খাবারের জোগাড় করতেই কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছে।
তবুও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে শুভ বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম করছে।
অফিস থেকে ফেরার সময় একটা পত্রিকা নিয়ে আসে এই অভ্যাস তার বহুদিনের।
একটু পর বাবাই পড়তে বসবে, পাশের ঘরের দিশা ও আজকাল পড়তে আসে।
মেয়েটা খুব চটপটে,পড়ায় খুব ভালো।
ও যদি পড়াশোনা টা ভালোভাবে করতে পারে একদিন ঠিক মায়ের কষ্ট দূর করবে।
বাবাই পড়ায় খুব ভালো।শুভ ওদের পড়ায় ঠিকই কিন্তু আজকালকার নতুন নিয়মের অংক ওর খুব কঠিন লাগে। সে নিজে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছে অনেক আগে তারপরও চেষ্টা করে।
যদি কয়েকটা বেশি টাকা আসতো সংসারে তাহলে ছেলেটাকে একটা প্রাইভেটে দিতে পারতো।
ইরা সবার জন্য চা করেছে আর বাচ্চা দুটোর জন্য “গোলা রুটি”
একটা বাটিতে কিছুটা আটা, চিনি,দুধ আর অল্প একটু লবণ একটু এলাচিগুঁড়া দিয়ে একটা পিঠার মতো মিশ্রণ তৈরি করে নেয়।
তারপর রুটি তাওয়ায় একটু তেল দিয়ে একহাতা করে গোলা দিয়ে একটু ঘুরিয়ে দেয় কিছুক্ষণের মধ্যেই নরম তুলতুলে গোলা রুটি তৈরি।
গরীবের প্যান কেক বলা যায় এটাকে।
বাবাইকে প্রতিদিন দুধ খাওয়ানোর ক্ষমতা তার নেই তাই একটা ছোট দুধের প্যাকেট কিনে এটা সেটার সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দেয়।
ঘরের একটা বাচ্চা খাবে এর একজন খাবে না এটা কখনও করতে পারে না ইরা তাই অল্প হলেও দুজনের জন্যই করে।
ওরা চা মুড়ি খেয়ে নিবে।
আজ আর টিভি দেখতে পারবে না, শুভ বিকেলে বাজার নিয়ে এসেছে।
বাজারের ব্যাগের এক কোণে উঁকি দিচ্ছে কিছু “বক ফুল”।
এই ফুল ইরার খুব পছন্দের এটা শুভ জানে তাই হয়তো নিয়ে এসেছে।
কিন্তু না জানি কতো এর কতো দাম।
দোলা দুইটা ডিম নিয়ে এসেছে রান্নার জন্য।
ওর ঘরে আজ আর অন্য কিছু নেই,দুপুরে একহালি ডিম কিনে এনেছিল তার দুটো আগেই রান্না করেছে এখন বাকি দুটো আছে।
দুপুরে ইরার ঘরে খেয়েছে এইবেলা যদি ওকে কিছু না দেয় তাহলে খারাপ দেখাবে তাই ইরার হাতে দুটো ডিম ধরিয়ে দেয়।
“এগুলো দিয়ে রাতের জন্য কিছু করে নে,আমি সবার জন্য ভাত এক হাড়িতে বসিয়ে দিচ্ছি”
অনেক সময় সব বুঝলেও মুখে কিছু বলতে হায়না,তাই ইরা ডিম গুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে।
ডিম দুইটা আর মানুপা পাঁচজন!
রাতে ইরা রান্নাঘরে থাকলে দোলাও ওর পাশে আসে দুজনে টুকটাক কথা বলতে বলতে রান্না করে।
আর ইরা কি যে সুন্দর গুছিয়ে রান্না করে দেখতেও ভালো লাগে।
ইরা দোলাকে দেখে বললো,
একটু আলু আর কিছু পেয়াজ কুচি করে দে তো,আমি ডিমগুলো ভেজে নিচ্ছি।
দুটো ডিম একটু লবণ দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নেয়।
তারপর কড়াইয়ে তেল দিয়ে ডিমটা টুকরো টুকরো করে ভেজে নেয়।
দুইবারে পাঁচ টুকরো করে।
আবার তেল দিয়ে একটা শুকনা মরিচ,তেজপাত একটু গরম মসলা ফোড়ন দেয়।
এবার কুচোনো পেয়াজ আর কয়েকটা কাচা মরিচ দিয়ে দেয়।
পেয়াজ একটু ভাজা ভাজা হয়ে এলে আদা রসুন বাটা আর একটা টমেটো কুচি দিয়ে দেয়। আদা রসুনবাটা একটু কশিয়ে নিয়ে এর উপর হলুদ গুড়ো আর মরিচের গুড়ো দিয়ে দেয়।
মসলা আরও কিছুক্ষণ কসিয়ে নিয়ে
আলু কুচিটা দেয়।
কিছুক্ষণ ঢেকে রান্না করে,আলুটা একটু নরম হয়ে এলে এক কাপ গরম জল দেয় সিদ্ধ হওয়ার জন্য ঢাকনা দিয়ে দেয়।
অন্য পাশে বকফুলের শাঁসটা বের করে নিয়ে ফুলগুলো ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখে।
ততক্ষণে আলুর ঝোল ফুটে গিয়েছে উপর থেকে ভাজা ডিমগুলো আর কিছু চেরা কাচা মরিচ দিয়ে দেয়।
ঘরের বাইরে একটা লেবু গাছ আছে সেখান থেকে দুই তিনটা পাতা এনে দুই ভাগ করে ছিড়ে গরম ঝোলের উপর দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দেয়।
এইতো হয়ে গেলো “ডিমালুর ঝালঝোল”।
দোলা ভাত নামিয়ে দুপুরের ডালটা গরম করে নেয়।
সে চুলায় একটা কড়াই বসিয়ে দেয়
বকফুল গুলোর বড়া হবে।
ইরা চালের গুড়ায় হলুদ, লবণ আর এক চিমটি কালোজিরা দিয়ে একটা পিঠালি বানিয়ে নেয় সাদা রঙের বকফুল গুলো একটা একটা করে পিঠালিতে গড়িয়ে নিয়ে গরম তেলে মুচমুচে করে ভেজে নেয়।
বড়া ভাজার গন্ধ পেয়ে বাবাই আর দিশা একটু উঁকি দেয়।
দোলা একটা বাটিতে ওদের দুটো বড়া দেয়।
ছেলেমেয়ে দুটো খুশি হয়ে যায়,
গরীবের সুখ কতো অল্পতেই লুকিয়ে থাকে।
ওর দুজন পিঠোপিঠি বাইরে থেকে দেখলে সবাই বলে দুই ভাই বোন।
রাতে শুভ, দোলা আর ইরা একসাথে খেতে বসে।
বাচ্চারা আগে খেয়ে নিয়েছে,সারাঘর ডিমালুর ঝোলের গন্ধে ম-ম করছে।
আজকে মনে হয় সবার একমুঠো ভাত বেশি লাগবে।
দোলার মাথায় একটা কথা সেই বিকেল থেকেই ঘুর ঘুর করছে কিন্তু বলতে পারেনি।
এখনই সুযোগ!
শুভদাকে দোলা বলে,
“জানো শুভদা আমি প্রাইমারি স্কুলে পাশে একটা বাড়ি কাজ করি সেই বাড়ির বউদিটা খুব কষ্টে আছে।
মেয়েটার বাচ্চা হবে কিন্তু ঘরে কেউ নেই দাদাবাবু ব্যাবসা করে সকালে বেরিয়ে যায় আবার বিকেলে ফিরে আসে।
মেয়েটা হাত পুড়িয়ে রান্না করে ঠিকই কিন্তু কিছুই মুখে তুলতে পারেনা।
এই সময় তো কত্তো সমস্যা হয়।
বাড়িতে অন্য কেউ থাকেনা শুধু বউদি একা থাকে।আমাকে বলছে একটু বেশি সময় থাকতে রান্না করতে কিন্তু আমি তো অন্য কাজ করি।
আর রান্নাটাও ভালো পারিনা,তুমি কি ইরাকে ওই বাড়িতে নিয়ে যেতে দেবে?
ও শুধু রান্না করে দিয়ে আসবে।
ওরা বেশ ভালোই টাকা পয়সা দেবে বলেছে।
তুমি কি রাজি?”
চলবে,,,
